Home মৌটুসী মৌটুসী পর্ব ১৩

মৌটুসী পর্ব ১৩

মৌটুসী পর্ব ১৩
ঋতস্বিনী মাহবিশ

বাড়ির বাইরে বাগানে রাতের ডিনারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। একটা পিকনিক পিকনিক ভাইব দিচ্ছে ব্যাপারটা। আশা সকালের কেকটা এনে রাখল টেবিলের উপর, তারপর সবাইকে ডাকল, “গাইস এদিকে এসো, কেক কাটা হবে এখন।”
আশার কথা শুনে সবাই হুড়মুড় করে এসে জড়ো হলো টেবিলের কাছে। স্নেহা চোখ বড়বড় করে বলল “ওয়াও, চকলেট কেক? কী উপলক্ষে?”
​স্নেহার কথার রেশ না কাটতেই শুভ চট করে বলে উঠল, “তোর বিয়া উপলক্ষে!”
​স্নেহা এবার বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে রেজিয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল, “খালামনি, তোমার ছোট ছেলেকে যত তাড়াতাড়ি পারো বিয়ে দিয়ে দাও, বুঝলে। তার বিয়ের পিনিক উঠছে। বিয়ে ছাড়া আর কোনো কথা বের হয় না মুখ দিয়ে।”

​রেজিয়া বেগম মেকি গম্ভীর হয়ে বললেন, “বিয়ে তো দিব, কিন্তু বউকে খাওয়াবে কি মা? না পারতে তো এখন আমাকে একটা ষাঁড় পুষতে হচ্ছে ঘরে, সাথে আবার গাভীও বরণ করে আনতে বলছিস? দুইদিন পর সেই গোয়ালে গোণ্ডায় গোণ্ডায় বাছুর দিবে। এত খড়-কুটা আর খাবার পাব কোথায় মা আমি?”
​ভদ্রমহিলার রসিকতায় একদফা হাসাহাসির রোল পড়ে গেল।
​তখনই হাসান বীরকে কোলে করে এসে উপস্থিত হলো সেখানে। ওকে চেয়ারের উপর দাঁড় করিয়ে হাতে চাকু ধরিয়ে দিয়ে সকলের অ্যাটেনশনে বলে উঠল, “এই কেক হলো আমার বীর সোনার মাম্মা খোঁজার মিশন আরম্ভ করা উপলক্ষে। বীর! বাবা কেকটা কেটে আমাদের বহুল কাঙ্ক্ষিত মিশনের উদ্ভাবনটা এবার করে দাও তো সোনা।”

​বীর এত কিছু না বুঝেই খুশি মনে কেক কাটল। সকলেই এক-দুই পিস করে খেয়ে বেশ সুনাম করল কেকের। মোটামুটি এখান থেকে মৌটুসীর কেকের একটা ভালো রিভিউ এল। নেহা তো বোরাকের থেকে মৌটুসীর পেইজ লিংকের শেয়ারও নিয়ে রাখল। যাতে সেও সময় করে অর্ডার করতে পারে।
​খাওয়া-দাওয়া শেষে আজকের মূল আলোচনা নিয়ে বসল সবাই। রেজিয়া বেগম আর লামিয়া বেগম ছেলেমেয়েদের স্পেস দিয়ে বীরকে নিয়ে বাড়ির ভেতর চলে গেলেন। এসব খোলামেলা আলোচনায় তারা উপস্থিত থেকে অস্বস্তিতে ফেলতে চান না। বোরাকের সামনে মেয়েদের ছবি আর বায়োডাটার স্তূপ। না চাইতেও মেয়েগুলোর ছবিগুলো একটা একটা করে টেনে দেখতে হচ্ছে তাকে। তবে সে ভেবে পাচ্ছে না, মাত্র দুই দিনের মধ্যে এতগুলো বায়োডাটা তারা জোগাড় করল কীভাবে? তাও একজন সিঙ্গেল ফাদারের জন্য! সব মেয়ে তো এই কন্ডিশন এক্সেপ্ট করবে না।

শেষমেশ বোরাক বলেই ফেলল, “এতগুলো বায়োডাটা, এরা সকলেই আমার কন্ডিশন জানে তো? না-কি আমি যে সিঙ্গেল ফাদার তা না জানিয়েই নিয়ে এসেছিস?”
​আসাদ বলল, “সবাইকে সব জানিয়েই নিয়ে এসেছি ভাই। এত টেনশন নিতে হবে না তোকে। তোর কন্ডিশন জানার পরেও পাত্রীর বাবারা তোর কাছে কন্যা সম্প্রদান করার জন্য সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে আছে। শিকদার বাড়ির একমাত্র ছেলের কদর তো আর কম নয়!”
​আশা এবার বোরাকের দিকে একটা ছবি এগিয়ে দিয়ে বলল, “ভাইয়া এটা দেখো। আমাদের সবারই মোটামুটি পছন্দ হয়েছে। মেয়ে, মেয়ের ফ্যামিলি, ব্যাকগ্রাউন্ড—সবকিছুই পারফেক্ট।”
​বোরাক হাত বাড়িয়ে ছবিটা হাতে নিল। বেশ সুন্দরী এক তরুণীর ছবি। বোরাক একনজর দেখে নিয়ে বলল, “বয়স কত এই মেয়ের?”
​জুয়েল বলল, “প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে অনার্স থার্ড ইয়ারে পড়ে। তাহলে কতোই আর হবে, বড়জোড় তেইশ-চব্বিশ!”
​বোরাক বলল, “আমার বয়স কত?”

​আরোয়া মনে মনে হিসেব করে বলল, “একত্রিশ বছর চার মাস বারো দিন। কেন ভাইয়া?”
বোরাক এবার শান্ত দৃঢ় কন্ঠে বলল ,​“তাহলে, আঠাশ থেকে তেত্রিশ, এই রেঞ্জের মধ্যে মেয়ের বয়স হতে হবে। কোনোভাবেই আঠাশের নিচে যেন না হয়।”
​হাসান বলল, “এই বয়সী অবিবাহিতা মেয়ে পাওয়াটা হয়তো একটু টাফ হবে বোরাক। কেননা বাংলাদেশের অধিকাংশ মেয়েরই পঁচিশের মধ্যেই বিয়ে হয়ে যায়। আর যাদের পাওয়া যাবে তাদের বেশির ভাগই দেখা যাবে ডিভোর্সি, আর নয়তো তোমার কন্ডিশন মেনে নিবে না।”
​“ডিভোর্সি হলেও আমার কোনো সমস্যা নেই ভাইয়া, যদি তার ডিভোর্সের কারণটা যথার্থ হয়। আহামরি সুন্দরীও হতে হবে না, বরং বাহ্যিক রূপ যত কম হবে ততই ভালো। জীবনসঙ্গী হিসেবে আমার এখন কেবল একজন ম্যাচিউর বুঝদার কাউকে চাই। যে কেবল আবেগ নয়, আমার সিচুয়েশনও বুঝবে।”
​হাসান মাথা দুলিয়ে সায় জানিয়ে বলল, “না, তোমার যুক্তি ঠিকই আছে। ইমম্যাচিউর মেয়েরা আবেগে হয়তো এখন তোমার কন্ডিশন মেনে নিবে। কিন্তু পরে দেখা যাবে সে তোমার বাস্তব পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে পারছে না।”

​আশা এবার স্বামীর উপর তিতিয়ে উঠল। “হাসান তুমি ভাইয়ার সাথে তাল মিলিয়ে না প্লিজ! আমাদের বাড়িতে ডিভোর্সি কোনো মেয়ে বউ হয়ে আসবে না। এর আগে এমন কিছু হয়নি, সামনেও হবে না। এখন ম্যাচিউর-ইমম্যাচিউর যাই খোঁজ না কেন, তাকে একেবারেই অবিবাহিতা হতে হবে, প্লাস আমাদের এবং ভাইয়ার সাথে মানানসই হতে হবে। ব্যাস!”
​বোরাক শান্ত স্বরে বলল, “আশা অন্যকে বিবেচনা করার আগে তোর ভাই কি সেটা আগে বিবেচনা কর। আই এম নট ওনলি আ ডিভোর্সি, আই এম অলসো আ সিঙ্গেল ফাদার। আই হ্যাভ আ চাইল্ড। এটা ভুলে যাস না?”
​এই পর্যায়ে আরোয়া বেশ উৎসাহ নিয়ে টুপ করে বলে উঠল, “তাহলে কাইরি আপু আমার ভাবি কেমন হয়? আপু তো ভাইয়াকে অনেক আগে থেকেই পছন্দ করে! সব দিক দিয়েও পারফেক্ট।”
​আশা চোখ রাঙিয়ে কিছু একটা ইশারা করল আরোয়াকে। আরোয়ার উৎসাহী মুখটা মুহূর্তেই চুপসে গিয়ে চুপ হয়ে গেল সে।
​মুহূর্তেই চঞ্চল পরিবেশটা কেমন নীরব-শান্ত হয়ে উঠল। জুয়েল বলল, “তাহলে তো এখানকার কোনো মেয়েই চলবে না। এরা সবাই লেস দ্যান টুয়েন্টি এইট।”
​আসাদ বলল, “বোরাক আরেকটু ভেবে দেখ, অনেক মেয়েই তো আছে বয়স কম হলেও তারা মানসিকভাবে পরিপক্ব হয়। তুই কথা বলে দেখ।”

​“তোরাই দেখ ভাই, আর সব কিছু মিলে গেলে পরেই আমাকে জানাস। এর আগে প্লিজ আমাকে এসবে জড়াস না। এমনতেই মাথায় হাজারটা টেনশন নিয়ে ঘুরতে হয়।”
বোরাক আর বসল না। সবার থেকে বিদায় নিয়ে উঠে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল সে। তবে পথিমধ্যেই কিছু একটা মনে হতেই ফিরে এসে সাফওয়ানকে উদ্দেশ্য করে বলল, “সাফওয়ান চড়ুইয়ের একটা খোঁজ নিয়েছিস?”
​“হ্যাঁ ভাই। একটু আগেই ফোন করেছিলাম। ব্যথা নেই আর।”
​কথাটা শুনেই ফের ফিরে হাঁটা ধরল বোরাক।
​আসাদ কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল, “চড়ুই কে?”
​সাফওয়ান বলল, “বীরের ক্লাসে পড়ে একটা বাচ্চা মেয়ে। আজকে পেট ব্যথা নিয়ে ওর মা ডাক্তারের কাছে নিয়ে এসেছিল, আমরাও তো বীরকে নিয়ে গিয়েছিলাম, তখনই দেখা হয়েছিল। বাচ্চাটা খুব আদুরে আর মিশুক। ওইটুকু সময়ের মধ্যে ভাইয়ের সাথেও মিশে গিয়েছে।”
​আশা বলল, “বীর ‘চুলুই পাখি চুলুই পাখি’ করে যার কথা সবসময় বলে?”
​“হ্যাঁ, হ্যাঁ ওই চড়ুই-ই। বীরের সাথে খুব ভাব।”

​শুভ কথা ঘুরিয়ে নিয়ে বলল, “আচ্ছা, মূল টপিকে এসো, এখন কি করবে? এগুলো তো একটাও হলো না।”
​আসাদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কি আর। ঘটককে বলব, এখন একটা বুড়ি খুঁজে দিতে!”
​আশা চট করে প্রতিবাদ করে বসল, “একদম না! ভাইয়া যাই বলুক। বুড়ি, ডিভোর্সি কিছুই চলবে না। আঠাশ থেকে ত্রিশ এর মধ্যেই একটা অবিবাহিতা সুন্দরী মেয়ে খুঁজতে হবে। আমার ভাইয়া বুড়ো নাকি? সে কত্ত হ্যান্ডসাম। তার পাশে তো আর যাকে তাকে মানাবে না!”
​সাথী বলল, “আচ্ছা গ্রাম অঞ্চলের কোনো মেয়েরা তো মনে হয় একটু বেশিই বুঝদার হয়।”
​স্ত্রীর কথার পিঠে জুয়েল বলল, “এখানেও সমস্যা আছে সাথী, গ্রাম অঞ্চলের মেয়েদের আরও তাড়াতাড়ি বিয়ে হয়ে যায়। দেখা যাবে আঠাশ বছরে তারা দুই-তিনটা বাচ্চার মা হয়ে গিয়েছে।”
​প্রত্যেকেই বিরাট সমস্যায় পড়ে বাকরুদ্ধ হয়ে বসে আছে।

​এরই মাঝে নেহা আক্ষেপ করে বলে বসল, “বিগত এক বছর ধরে কোনো বিয়ে খাই না, ভেবেছিলাম এবার বোরাক ভাইয়ারটা খেতে পারব। কিন্তু হলো না। আমার মনটাই ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।”
​পাশ থেকে স্নেহা বোনের পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে লাগল। “থাক আপু কষ্ট পাস না। হৃদয় তো আমাদেরও ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছে। তা কি আর আমাদের বোরাক ভাইয়া দেখতে পায়?”
​শালীদের আক্ষেপ শুনে হাসান মৃদু হেসে বলল, “এসব কাজে সময় লাগবে শালীকারা আমার। এক-দুই দিনেই তো সম্ভব না। লম্বা সময়ের ব্যাপার, আবার হুট করে কখন মিলে যাবে বুঝতেই পারবে না। তার উপর আমার সম্বন্ধী বাবুর তো শর্তের শেষ নেই। সম্বন্ধী যা আছে আছে তার বোন তো আবার আরো এক ধাপ এগিয়ে। কোন হতভাগিনীর কপালে এমন দজ্জাল ননদ লেখা আছে কে জানে?”
আশা ভ্রূ কুঁচকে স্বামীর দিকে তাকিয়ে আছে। এই বুঝি বোমা ফাটল।

​স্কুলে আজ পেরেন্টস মিটিং ডাকা হয়েছে। তার উপর কালকেই চড়ুই অসুখ থেকে উঠল, আর আজকেই ওকে একা স্কুলে রেখে শোরুমে গিয়ে স্বস্তি পেত না মৌটুসী। তাই আজকের দিনটা শোরুম থেকে ছুটি নিয়েছে সে। যদিও ছুটি দিতে চায়নি, নানা টালবাহানা করতে হয়েছে এর জন্য।
​মৌটুসীরা মাঝরাস্তায়, তখনই ব্যাগে থাকা তার ফোনটা বেজে উঠল। বাইকের গতি কমিয়ে তা রাস্তার এক পাশে সাইড করল মৌটুসী। ফোন বের করে দেখল স্ক্রিনে আলিফের নাম। কল রিসিভ করতেই অপর প্রান্ত থেকে আলিফের কণ্ঠস্বর ভেসে এল, “হ্যালো মৌ? কই আছস তুই?”
“চড়ু​ইকে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছি।”
​“আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি তাহলে চড়ুইয়ের স্কুলের সামনে আসতেছি।”—বলেই আলিফ লাইনটা কেটে দিল।
​বাইকটা স্কুলের সামনের রাস্তায় উঠতেই গেটের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা চিকনচাকন গড়নের এক ছেলের দেখা মিলল। কালো একটা জ্যাকেট পরনে। জিপার খোলা বলে ভেতরের খয়েরি শার্টটা দেখা যাচ্ছে। গলায় মাফলার আলতো করে ফেলে রাখা। কাঁধে বড় একটা ট্রাভেলিং ব্যাগ। দুই হাত জ্যাকেটের পকেটে ঢুকিয়ে ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে।
আলিফকে দেখামাত্রই চড়ুই তর্জনী উঠিয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠল, “মাম্মা! দেখো, আলিফ মামা! ওই যে গেটের সামনে।”

​মৌটুসী হকচকিয়ে উঠে বলল, “চড়ুইপাখি হাত নামাও। সাইড দিয়ে গাড়ি আসবে।”
​মৌ বাইক সাইড করতেই আলিফ দ্রুত পায়ে সেদিকে এগিয়ে এল। এক গাল হেসে বাইক থেকেই চড়ুইকে কোলে তুলে নিল। আদুরে ভঙ্গিতে গালে চুমু খেয়ে বলল, “চড়ুই পাখি কেমন আছে? অসুখ ভালো হয়েছে?”
চড়ুই আলিফের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ​“অসুখ তো কালকেই ভালো হয়ে গেছে! তুমি কেমন আছো? তোমাকে অনেকদিন দেখি নি।”
​আলিফ চোখ পিটপিট করে চড়ুইকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা! তাহলে চড়ুই পাখি আলিফ মামাকে মিস করে?”
​“হ্যাঁ, মিস করে তো!”

​আলিফ এবার আড়চোখে মৌটুসীর দিকে তাকাল। সে ভাবলেশহীন দাঁড়িয়ে আছে। আলিফ চাপা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল, “চড়ুই পাখি কি খাবে?”
​চড়ুই দু-দিকে মাথা নাড়াল। “কিছু না। আমি তো নাশতা করে এসেছি।”
​“তো কি হয়েছে? এখন মামার থেকে আবার খেতে হবে। কি খাবে লিস্ট করো তো!”
​আলিফ সামনের দোকানটার দিকে এগিয়ে যেতে নিলে মৌটুসী বাধা দিয়ে বলল, “আলিফ, চড়ুইয়ের বাইরের খাবার খাওয়া নিষেধ, ডাক্তারের মানা আছে।”
​“রাখ তো তুই তোর ডাক্তারের নিষেধাজ্ঞা! ডাক্তাররা বলেই। একটু খেলে কিচ্ছু হবে না। চলো মামা।”
​মৌটুসীকে উপেক্ষা করে চড়ুইকে নিয়ে চলে গেল আলিফ।
​চড়ুইকে হাতভর্তি চিপস-চকলেট কিনে দিয়ে ফিরে এল আলিফ। তা দেখে মৌটুসীর ভ্রূ কুঁচকে উঠল। কপট রাগ দেখিয়ে বলল, “তোকে বললাম চড়ুইয়ের এসব খাওয়া নিষেধ আর তুই গোটা দোকানটাই কিনে দিয়েছিস ওকে?”

​আলিফ তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাত দুটো ছড়িয়ে দিয়ে হাসল। মৌটুসী তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “এই জন্যই বলি, আবেগ দিয়ে জীবন চলে না।”
​মুহূর্তেই আলিফের প্রসারিত ঠোঁট দুটো চুপসে গেল। চোখমুখ কেমন অন্ধকারে ছেয়ে উঠল তার।
​মৌটুসী চড়ুইয়ের হাতে কেবল একটা চকলেট রেখে বাকি সবগুলো খাবার কেড়ে নিল। মায়ের কাণ্ড দেখে চড়ুই ঠোঁট উল্টে বলল, “মাম্মা, এগুলো তো আমার মজা! তুমি কেড়ে নিলে কেন?”
​মৌটুসী খাবারগুলো নিজের টোট ব্যাগে ভরতে ভরতে দৃঢ়স্বরে বলল, “আজকে ওটাই খাও। এগুলো আরো দুই দিন পর পাবে তুমি।”
​“তাহলে আরেকটা দাও, বীর বন্ধুকেও দিব।”
​“ওখান থেকেই অর্ধেক দিও।”
​কিছুক্ষণ চুপ থেকে মৌটুসী জিজ্ঞেস করল, “বাড়ি কবে গিয়েছিলি?”
​“পরশু।”
​“ভালো আছেন বাড়ির সবাই?”
​“আলহামদুলিল্লাহ ভালো।”
​“হলে তো মনে হয় যাস নি!”
​“না। এখন যাব।”

​“আচ্ছা, আয় তাহলে। আমাদের যেতে হবে। চড়ুইয়ের ক্লাসের ঘণ্টা পড়ে যাবে।”
​“তুই শোরুমে যাবি না?”
​“না, আজকে ছুটি নিয়েছি। এখানেই থাকব।”
​“আচ্ছা।”
আলিফ এবার চড়ুইয়ের সারা মুখে ছোট ছোট স্নেহের চুমু এঁকে দিতে লাগল।
​সেই মুহূর্তেই বোরাকের গাড়ি তাদের পাশ দিয়ে ধীরগতিতে গ্যারেজের দিকে এগিয়ে গেল। গাড়িতে বাঁ দিকে বসে থাকা সাফওয়ান ও বোরাক, উভয়ের দৃষ্টি এক পলকের জন্য আটকে গেল সেই সুন্দর দৃশ্যটিতে। সাফওয়ান কৌতূহল সামলাতে না পেরে বোরাককে বলেই বসল, “চড়ুইয়ের বাবা নাকি, ভাই?”
​“হতে পারে!” বোরাকের নির্লিপ্ত কণ্ঠস্বর। যেন এতে তার কোনো কিছুই যায় আসে না।
​সাফওয়ান ভাবুক ভঙ্গিতে আবার বলল, “কিন্তু দেখে তো মনে হচ্ছে চড়ুইয়ের বাবা একটু বেশিই ইয়াং।”
​ড্রাইভার গাড়ি পার্ক করলে গাড়ি থেকে নামার সময় হুট করেই আজকের পেরেন্টস মিটিংয়ের কথা বোরাকের স্মরণে এল। অগত্যা সে সাফওয়ানের দিকে একটা ফাইল এগিয়ে দিয়ে বলল, “সাফওয়ান তোর একটা কাজ আছে, এখন অফিসে গিয়ে ম্যানেজারকে এই ফাইলটা দিয়ে বাসায় চলে যাবি।”

​সাফওয়ান হাত বাড়িয়ে ফাইলটা নিল, তবে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি অফিসে যাবে না ভাই?”
​“স্কুলে পেরেন্টস মিটিং আছে। ওটা শেষ করে যাব। তোকে আর এখন এখানে আসতে হবে না। একেবারে ছুটির আগে এসে বীরকে নিয়ে যাবি।”
​“তুমিও তো অফিসে চলে যাবে, তাহলে বীর একা থাকবে?”
​“ড্রাইভার থাকবে। বীর এখন অনেকটাই সহজ হয়েছে, সমস্যা হবে না। তুই এখন বাসায় গিয়ে ভদ্র ছেলের মতো পড়তে বসবি। এবার ফার্স্ট ক্লাস না এলে বুঝাব তোকে।”
​সাফওয়ান মাথা চুলকাতে চুলকাতে বীরের দিকে তাকিয়ে বলল, “থাকো চাচ্চু, ছুটির সময় দেখা হবে। টাটা।”
​বীর হাত নেড়ে বলল, “টাটা চাচ্চু।”
​সাফওয়ান গাড়ি থেকে নামতে নিলে বোরাক বলল, “নামছিস কেন? গাড়ি নিয়ে যা।”
​“না ভাই থাক। চাচা আবার যাবে আসবে? আমি একটা রিকশা ধরেই চলে যাব।”

​আলিফ চলে গেলে মৌটুসী আর চড়ুই ক্লাসরুমে গিয়ে বসল। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বীরকে নিয়ে আগমন ঘটল সেখানে। চড়ুইয়ের পাশেই বসে ছিল মৌটুসী। বীরকে দেখামাত্রই সে উঠে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে বলল, “বীর! কেমন আছ বাবা?”
​বীর আলতো কণ্ঠে বলল, “আমি ভালো আছি, তুমি কেমন আছো?”
​“আমিও ভালো আছি বীর সোনা।” মৌটুসী নিজেই বীরকে আলতো করে ধরে বেঞ্চে বসিয়ে দিল।
​বীর এবার চড়ুইয়ের দিকে ফিরে ওকে জিজ্ঞেস করল, “চুলুই পাখি, তোমাল অসুখ ভালো হয়েছে?”
​“আমার অসুখ তো কালকেই ভালো হয়ে গেছে বীর বন্ধু।”
​বোরাক মুচকি হেসে হাত বাড়িয়ে চড়ুইয়ের মাথায় বুলিয়ে দিল। “স্পেরো ভালো আছে? হাতে ব্যথা করছিল?”
​চড়ুই ঘনঘন মাথা নাড়িয়ে বলল, “না, ব্যথা করছিল না। আর আমি ভালো আছি। তুমি কেমন আছো আঙ্কেল?”

​পাশ থেকে মৌটুসী মেয়েকে মৃদু শাসিয়ে বলল, “চড়ুই পাখি! উনি বড়ো হন না! আপনি করে বলো।”
​বোরাক এবার মৌটুসীর দিকে তাকিয়ে বলল, “ইটস ওকে মিস। ছোটদের মুখে তুমি ডাকটাই ভালো মানায়।”
​বোরাক চড়ুইয়ের সাথে গল্পে মগ্ন হলো, দেখে মনে হচ্ছে দুইজনই বেশ সিরিয়াস কিছু আলোচনা করছে। মৌটুসী আড়চোখে একবার তাকাল বোরাকের দিকে। কথায় আছে নিষিদ্ধ আর দুর্লভ জিনিসের প্রতি আগ্রহ বেশি থাকে। মৌটুসীও তেমনি খুব আগ্রহ নিয়ে বোরাকের আগাগোড়া পরখ করতে লাগল। লোকটাকে আজ কালকের থেকে আলাদা দেখতে লাগছে। কালকের গেটআপ ছিল খুবই কেজুয়াল। ব্যাগি জিন্স আর শার্ট, তার উপর স্লিভলেস জ্যাকেট। অথচ আজকে কোট-প্যান্ট-টাই মাথা থেকে পা অব্দি সবকিছুই ফরমাল। মাথার চুলগুলো পর্যন্ত জেল দিয়ে সেট করানো। মুখে অল্প চাপ দাড়ি। তার মাঝেও থুতনির খাঁজটা অল্প বুঝা যাচ্ছে। ডান ভ্রূর উপরে ছোট্ট একটা লালচে আঁচিল আছে মানুষটার। শিরদাঁড়া টান টান করে বেশ আভিজাত্যের সাথে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে চড়ুইয়ের সাথে কথা বলছে। মৌটুসীর এই অ্যাঙ্গেল থেকে একেবারে ছবির হিরোর মতো দেখতে লাগছে তাকে। বড়লোকেরা মনে হয় এমনই হয়। তাদের পোশাক-আশাক চলাফেরা সবকিছুতেই ফিল্মি ফিল্মি একটা ভাইব থাকে। সবকিছুই টাকার কারসাজি!

​মৌটুসী ধীরস্থির দৃষ্টি নামিয়ে নিল। হঠাৎ ভেতরে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি টের পেল সে। এখানে বসে থাকলে এই অস্বস্তি বাড়বে বৈকি কমবে না। তাই সে চড়ুইকে বলল, “চড়ুই পাখি তুমি থাকো। আমি বাইরে গিয়ে বসি!”
​চড়ুই বোরাকের দিক থেকে চোখ না সরিয়েই বেশ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল, “আচ্ছা।”
​আচ্ছা? আর কিছুই না? মৌটুসী মেয়ের কাছে কোনো পাত্তা না পেয়ে ভ্রূ কুঁচকাল। তবুও চড়ুইয়ের তার দিকে কোনো মনোযোগই নেই, সব মনোযোগ সামনের লোকটার উপর। মৌটুসী বিরক্ত, বড়লোকদের সাথে এত ভাব মারার কি আছে? তার মেয়েটাও হয়েছে না! সে টোট ব্যাগটা ঘাড়ে তুলে অসহায়ের মতো মুখ করে ঘুরে দাঁড়াতেই পেছন থেকে বীর হাত টেনে ধরল।
​মৌটুসী থমকে কৌতূহলী দৃষ্টিতে ফিরে তাকাল বীরের দিকে।
​বীর সরল মুখে আবদার করল, “আমিও বাইলে যাব, আমাকে নিয়ে যাবে তোমাল সাথে?”
​মৌটুসী এবার চোখ তুলে বোরাকের দিকে তাকাল। বীরও তাকাল বাবার দিকে, বলল, “পাপা আমি চুলুই পাখির মাম্মা আন্টির সাথে একটু বাইলে যাই?”
​বোরাক বলল, “আমিও যাব পাপা, চলো।”
​সাথে সাথেই চড়ুই বলে উঠল, “আঙ্কেল তোমার সাথে আমার গল্প শেষ হয় নি তো! যেও না, এখনো অনেক গল্প বাকি।”
​মৌটুসী মেয়ের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলল, “চড়ুই পাখি, এটা কেমন কথা? আঙ্কেলের কাজ থাকতে পারে!”

​“না না কাজ নেই, তবে….” বোরাক এবার হাত উঠিয়ে কবজিতে বাঁধা সিলভার ডায়ালের ঘড়িটির দিকে তাকাল। বীরদের ক্লাস শুরু হতে এখনো দশ-বারো মিনিটের মতো বাকি। বোরাক কব্জি থেকে চোখ সরিয়ে মৌটুসীর দিকে তাকিয়ে বলল, “মিস, আপনি কি ক্যাম্পাসের বাইরে কোথাও যাবেন?”
​“না না। ভেতরেই, মাঠে বসব।”
​“তাহলে বীরের একটু খেয়াল রাখবেন প্লিজ।”
​“অবশ্যই। এসো বীর।” মৌটুসী হেসে বীরের হাত ধরে ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেল।
​মৌটুসী চলে গেলে চড়ুই এবার বীরের সিটে সরে গিয়ে নিজের সিট ফাঁকা করে দিয়ে বোরাককে বলল, “আঙ্কেল এখানে বসো।”
​বোরাক ফেলল না চড়ুইয়ের আবদার। তাকে করে দেওয়া ছোট্ট জায়গাটিতে বসল কোনমতে। খুশি খুশি চড়ুই মাথা উল্টিয়ে বোরাকের দিকে তাকিয়ে গাল ভরে হাসল। তারপর আবার মেলে বসল তার গল্পের ঝুড়ি। অদ্ভুত অদ্ভুত সব গল্প তাদের। এই যেমন, সকালে তারা কী নাশতা করেছে তা খুব উৎসাহ নিয়ে একে অপরকে জিজ্ঞেস করছে। আবার, কার কী খাবার পছন্দ! কি করতে পছন্দ! অবশ্য চড়ুই নিজের এইসব প্রশ্নের সূচনা করছে। বোরাক সেগুলোর উত্তর করে এই একই প্রশ্ন পাল্টা চড়ুইকে করছে।
​এই পর্যায়ে চড়ুই জিজ্ঞেস করল, “আঙ্কেল, তুমি কোথায় কাজ করো?”

​“আমি? আমি তো অফিসে কাজ করি মামনি।”
​“অনেক বড়ো অফিস?”
​বোরাক এবার একটু ভাবুক ভঙ্গিতে বলল, “উমম… হুম বড়ই, কিন্তু অল্প বড়।”

মৌটুসী পর্ব ১২

​ছোট্ট চড়ুই এবার অবুঝ গর্ব নিয়ে বলল, “আমার মাম্মা ফ্রিজ-টিভির অনেক বড় দোকানে কাজ করে।”
​চড়ুইয়ের কথায় বোরাকের ধারণা হলো, মৌটুসী হয়তো কোনো ইলেকট্রনিক্স শোরুমের ওনার। মনে মনে মৌটুসীকে নিয়ে সে একবার বিড়বিড় করল, “আচ্ছা! বিজনেস ওম্যান!”

মৌটুসী পর্ব ১৪

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here