মৌটুসী পর্ব ১৪
ঋতস্বিনী মাহবিশ
স্কুলের বিশাল এক হল রুমে মিটিং বসানো হয়েছে। সারি সারি সাদা কাপড়ে মোড়ানো প্লাস্টিকের চেয়ার পাতানো সেখানে। ইতিমধ্যেই সকল অভিভাবক এসে উপস্থিত হয়েছেন। প্রতি স্টুডেন্টের তরফ থেকে একজন করে অভিভাবক ডাকা হয়েছে।
মৌটুসী আর বোরাক দুটো আলাদা সারিতে বসেছে। তবে মৌটুসীর এখান থেকে বোরাকের বসার জায়গাটা স্পষ্ট। এই যেমন সে এখন দেখতে পারছে, নীতি বোরাকের পাশে বসে তার সাথে মিষ্টি গল্পে মেতে উঠেছে! বেশ হাসিমুখেই কথা বলছে দুজন। পূর্ব পরিচিত হয়তো! অসম্ভব না, দুর্নীতির তো আর বড়লোক বন্ধুর অভাব নাই। মৌটুসী চোখ ফিরিয়ে নিল সেদিক থেকে। এমনিতেই এসব পিচ্ছিল স্বভাবের মেয়েদের দেখলে তার গা জ্বালা করে।
কিছুক্ষণ মধ্যেই প্রধান শিক্ষক এবং আমন্ত্রিত অতিথিরা মঞ্চে এসে উপস্থিত হলেন। মৃদু গুঞ্জনে মুখরিত হল রুমটি এক নিমেষে শান্ত হয়ে গেল। শুভেচ্ছা বক্তব্য ও কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষকের ছোট ছোট বক্তব্যের পর এবার মূল বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রধান শিক্ষক মাইক্রোফোন হাতে নিলেন। সাবলীলভাবেই বলতে শুরু করলেন ভদ্রলোক,
”সম্মানিত অভিভাবকবৃন্দ, আপনাদের সকলকে আজকের এই সভায় স্বাগত। আমাদের মূল আলোচনার প্রথম বিষয় হলো বাচ্চাদের স্কুল ইউনিফর্ম। আপনারা জানেন, আমরা ইউনিফর্মের মডেলে কিছু পরিবর্তন আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। নতুন মডেলটি আজই চূড়ান্ত করা হয়েছে এবং আজই আপনাদের হাতে তা পৌঁছে দেওয়া হবে। অনুরোধ থাকবে, যত দ্রুত সম্ভব আপনারা ইউনিফর্মগুলো সংগ্রহ করে নেবেন।”
একটু বিরতি নিয়ে তিনি আবার বলতে শুরু করলেন, “দ্বিতীয়ত, আমরা এই সপ্তাহের বৃহস্পতিবারে স্কুলের পক্ষ থেকে একটি ছোট শিক্ষাসফরের আয়োজন করেছি। গন্তব্য আমাদের খুব কাছের নওগাঁর পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার। আগামী সপ্তাহের আবহাওয়ার পূর্বাভাস খুব একটা অনুকূল নয়, তাই আবহাওয়াকে বিবেচনা করে আমরা পিকনিকটি এ সপ্তাহের বৃহস্পতিবার রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বৃহস্পতিবার সফর শেষ হলে শুক্রবার শিক্ষার্থীরা বিশ্রামের পর্যাপ্ত সময় পাবে। সফরের প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য খরচ নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার পাঁচশ টাকা। আপনারা যারা আপনার সন্তানকে পাঠাতে ইচ্ছুক তারা দয়া করে নিজ নিজ ক্লাস টিচারের কাছে আজ-কালের মধ্যেই কনফার্ম করে দেবেন। এছাড়া, প্রতি শিক্ষার্থীর পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ দুইজন অভিভাবক আমাদের সাথে এই সফরে যোগ দিতে পারবেন।”
প্রধান শিক্ষকের কথা শেষ হতেই অভিভাবকদের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। মৌটুসীর পাশেই বসা দুইজন অভিভাবক নিজেদের মধ্যে নিচু স্বরের কথোপকথন ওর কানে এল।
এক মহিলা ভ্রু কুঁচকে পাশের জনকে বলছেন, “এত কম ফি? মাত্র দেড় হাজার টাকায় সব কীভাবে ম্যানেজ করবে বুঝতে পারছি না! যাতায়াত, খাবার—সব মিলিয়ে তো খরচ অনেক বেশি হওয়ার কথা।”
দ্বিতীয় মহিলা হালকা মাথা নেড়ে বললেন, “খাবারের মান কেমন হবে সেটাই ভাবছি। এমনিতেই আমার মেয়ে মনে হয় না ওদের খাবার খেতে পারবে। আমি ওর জন্য বাসা থেকেই কিছু একটা বানিয়ে নিয়ে যাব। বন্ধুদের সাথে আনন্দ করতে পারবে এটাই লাভ।”
মহিলা দুটোর কথা শুনে মৌটুসী মনে মনে একটু হাসল। দেড় হাজার টাকার অংককে কত তুচ্ছভাবে দেখছে এরা। অথচ দেড় হাজার টাকা দিয়েই তাদের মতো মধ্যবিত্ত পুরো একটা পরিবার ঘুরে আসতে পারবে সেখান থেকে। এই জন্যই হয়তো আর্থিক সুখ-স্বাচ্ছন্দ সম্পূর্ণ আপেক্ষিক আর পারিপার্শ্বিক একটা বিষয়।
সমাবেশ শেষে প্রত্যেক অভিভাবকের হাতে একটা করে স্ন্যাকসের প্যাকেট আর নতুন স্কুল ড্রেসের মডেলের ছাপানো কাগজ দেওয়া হলো। মৌটুসী কাগজটা হাতে পেয়েই তা উল্টে-পাল্টে দেখতে লাগল।
মেয়েদের জন্য হালকা হলুদ রঙের ফুল শার্ট আর নেভি ব্লু স্কার্ট, সাথে টাই। আর ছেলেদের একই শার্ট, প্যান্ট আর টাই। কাগজের অপর পৃষ্ঠে কয়েকটা দোকানের নাম উল্লেখ করা, যেখানে একেবারে তৈরি করা ইউনিফর্ম পাওয়া যাবে।
হল রুম থেকে বেরিয়ে এসে মৌটুসী মাঠের একপাশে এসে দাঁড়াল। আজকে উত্তুরে হাওয়া বইছে বেশ। পরনের তার আসমানি রঙের লং স্কার্টটা একদিকে উড়ছে। সাথে বাতাসের ঝাপটায় মাথার ঢিলে পনিটেল ও কপালের বেবি হেয়ারগুলোও এলোমেলো হয়ে পড়েছে। মৌটুসী এক হাতে গায়ের চাদরটা ধরে অন্য হাত দিয়ে বেবি হেয়ারগুলো গুছিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিল। তখনই বোরাক এসে দাঁড়াল তার সামনে। সৌজন্যমূলক কণ্ঠে বলল, “মিস আপনি কি এখানেই থাকবেন এখন?”
মৌটুসী হালকা মাথা নেড়ে বলল, “জি আছি, ছুটি হলে একেবারে চড়ুইকে সাথে নিয়ে যাব।”
”ওহ, আমাকে চলে যেতে হচ্ছে। আপনি যেহেতু থাকছেন, বীরের দিকে একটু নজর রাখবেন প্লিজ। যদিও বা আমার ড্রাইভার থাকবেন!”
”জি অবশ্যই চিন্তা করবেন না, আমি দেখে রাখব।”
”ধন্যবাদ, নিশ্চিন্ত হলাম। ছুটির সময় সাফওয়ান আসবে।”
”ওকে।”
বোরাক উল্টো ঘুরে হাঁটা শুরু করল। মৌটুসী স্বাভাবিক দৃষ্টিতেই তার যাওয়ার পথের দিকে চেয়ে রইল। বাঁ হাতটা কোটের পকেটে গুঁজে গটগট পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে মানব, যার ফলে কোটের একপাশটা খানিকটা ঝুলে আছে। ডান হাতটা স্বাভাবিকভাবে নিচে ঝুলে আছে, হাঁটার তালে তালে আলতো করে দুলছে তা। কিছুটা পথ পেরোতেই সে ডান হাতটা তুলে কবজির ঘড়িতে সময় দেখে নিল। তারপর একসময় গেট পেরিয়ে মৌটুসীর চোখের আড়াল হয়ে গেল। মৌটুসী তবুও সেদিকে একধ্যানে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। ভাবলেশহীন নির্লিপ্ত সেই দৃষ্টি। বোরাক তো সেই তখনই ওর মাথা থেকে বেরিয়ে গেছে, তবুও দৃষ্টি ফিরছে না। তন্মধ্যেই চড়ুইয়ের টিফিনের ঘণ্টা বেজে উঠল। মৌটুসী সদ্ভব ফিরে পেয়ে হাঁটা দিল দোতলার সিঁড়ির দিকে।
ক্লাস রুমে ঢুকতেই দেখল, বীর আর চড়ুই খুব ব্যস্ত হয়ে নিজেদের বই-খাতা, পেন্সিল সব ব্যাগে গুছিয়ে রাখছে। মৌটুসী মুখে এক চিলতে হাসি নিয়ে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “বাচ্চারা, কী করছ তোমরা?”
মৌটুসীর কণ্ঠস্বর শোনা মাত্রই চড়ুই মুখ তুলে মিষ্টি হেসে বলল, “মাম্মা, পড়াশোনা অনেকগুলো করেছি, এখন আমরা টিফিন খাব।”
“আচ্ছা!”
”হুম।” চড়ুই ব্যাগ থেকে ওর ছোট্ট টিফিন বক্সটা বের করল। মৌটুসী আজকে টিফিনে পাটিসাপটা বানিয়ে দিয়েছে ওকে। বীরদের ড্রাইভারও বীরের টিফিন, পানির পট আর দুধের ফিডারটা নিয়ে ক্লাসে এল। সেগুলো বীরের সামনে রেখে বীরকে বলল, “বীর দাদু তুমি একা খাইতে পারবা না?”
বীর বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে মাথা কাত করে বলল, “পালব।”
“আইচ্ছা, তুমি খাও। আমি পরে আইয়া নিয়া যামু।” বলেই ড্রাইভার আর দাঁড়াল না সেখানে। ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গেল।
নার্সারি ক্লাসের বাচ্চারা সবাই খুব ছোট, প্রতিটি বাচ্চার পাশেই অভিভাবকরা বসে আদর করে তাদের খাইয়ে দিচ্ছে। মৌটুসী দাঁড়িয়ে থেকে এসবই দেখছিল। চড়ুই এবার বেঞ্চ থেকে বেরিয়ে এসে তার আর বীরের মাঝখানের জায়গাটা মৌটুসীকে বসার জন্য ইশারা করে বলল, “মাম্মা, তুমি ওখানে বসো।”
বেঞ্চটা মোটামুটি বড়। তিন-চারজন অনায়াসেই বসা যাবে। মৌটুসী ভেতরে ঢুকে বসল, তারপর চড়ুইও বসল।
বীরের টিফিন বক্সটা এখনো বন্ধ অবস্থায় টেবিলে পড়ে আছে। আর সে চড়ুইয়ের বক্স থেকে পাটিসাপটা নিয়ে খাচ্ছে। খাচ্ছে বললে ভুল হবে, লম্বা পিঠাটা ভালোভাবে ধরতেই পারছে না। এক বাইট খেতে গিয়েই মুখ মাখিয়ে ফেলেছে, তার ওপর পাটিসাপটার ভেতরকার ক্ষীর গড়িয়ে পড়ার উপক্রম। মৌটুসী বিষয়টি লক্ষ্য করল। সে স্পষ্টই বুঝল, এই আদরের ঘরের দুলালীর নিশ্চয়ই নিজ হাতে খাওয়ার অভ্যাস নেই। অগত্যা সে বীরের হাত থেকে পিঠাটা নিয়ে নিজেই খাইয়ে দিতে লাগল। বীর এতে বেশ খুশি হলো। মৌটুসীর হাত থেকে খুব তৃপ্তি নিয়ে খেতে লাগল সে। এতক্ষণ নিজ হাতে খাওয়া চড়ুইও এবার বীরের দেখাদেখি ওর হাতের পিঠাটা রেখে দিল। তারপর মুখ হা করে বলল,
“মাম্মা, বীর বন্ধুর মতো আমাকেও খাইয়ে দাও।”
মৌটুসী হেসে এবার দুজনকেই একসাথে খাইয়ে দিতে লাগল। মৌটুসী খাওয়ানোর ফাঁকে ফাঁকে গভীর মনোযোগে দেখল বীরকে। চড়ুই আর বীর একই ক্লাসে পড়লেও চড়ুই ছোট হিসেবেও যথেষ্ট আত্মনির্ভরশীল, সে নিজের অনেক কাজ নিজে নিজেই করতে পারে, কিছু কিছু বিষয়ে তার আচরণ বুঝদারের মতো। অন্যদিকে বীর ততটাই অবুঝ ও পরনির্ভরশীল। তাহলে তার মায়ের উচিত ছিল না ছেলের সাথে সাথে থাকা? এখানকার অন্য সব মায়েদের মতো স্কুলে এসে ছেলের দেখাশোনা করা! পরক্ষণেই ভাবল, হয়তো তিনি পেশাজীবী। কিংবা সেকেন্ড বেবি ঘটিত ব্যাপারও থাকতে পারে। কারো সম্পর্কে না জেনেই তাকে নিয়ে খারাপ মনোভাব পোষণ করা উচিত নয়।
বিকেলে চড়ুইকে নিয়ে একটু মার্কেটের দিকে বেরুলো মৌটুসী। প্রথমেই গেল স্কুল ইউনিফর্মের দোকানে। সবকিছুই ঠিকঠাক এগোচ্ছিল; সেলসম্যান চড়ুইয়ের মাপ অনুযায়ী এক সেট ইউনিফর্ম বের করে দিলেন। মৌটুসীও বেশ ফুরফুরে মেজাজে চেঞ্জিং রুমে গিয়ে চড়ুইকে ড্রেসটা পরিয়ে ভালোভাবে চেক করে নিল। কিন্তু বিপত্তি বাঁধল বিল পেমেন্ট করার সময়। একটা শার্ট-টাই, একটা স্কার্ট আর একটা সোয়েটার। এই তিনটা কাপড়ের মূল্য তিন হাজার হলেও একটা কথা ছিল। কিন্তু সেলসম্যান ফিক্সড মূল্য চেয়ে বসল গুনে গুনে ছয় হাজার, ছয়ের উপরেও না, নিচে আসার নাকি প্রশ্নই ওঠে না। ব্যস, মৌটুসীর ঠান্ডা মাথার তারগুলোতে শর্ট সার্কিট হয়ে আগুন ধরে গেল তাতে। দোকানির সাথে কোমর বেঁধে এক দফা ঝগড়া করে শেষমেশ সেলসম্যানকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে এল, এই ইউনিফর্ম সে তিন হাজার টাকার মধ্যে বানিয়ে তাদের মুখের ওপর হিসেব ছুড়ে আসবে।
রাগে গজগজ করতে করতে চড়ুইয়ের হাত ধরে সেই দোকান থেকে বেরিয়ে এল সে। তারপর সোজা চলে গেল গজ কাপড়ের দোকানে। নেভি ব্লু রঙের কাঙ্ক্ষিত কাপড়টা এখানেই পেয়ে গেল, কিন্তু শার্টের জন্য হলুদ কালারের নির্ধারিত শেডটা কোথাও মিলছে না। সারা মার্কেট চষে ফেলার পর অবশেষে একটি ছোট দোকানে সেম শেডের হলুদ কাপড়টাও পাওয়া গেল। তারপর আউটলেট থেকে দামাদামি করে এক হাজার দিয়ে একটা নেভি ব্লু রঙের স্কুল সোয়েটার কিনে নিল। এখন শুধু স্কুল থেকে ব্যাজগুলো সংগ্রহ করলেই এইদিকের সব কাজ শেষ।
দোকান থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে মৌটুসী মনে মনে হিসেব কষল। গজ কাপড়গুলো কিনতে লেগেছে দেড় হাজার, আর সোয়েটার এক হাজার। সেলাইয়ের মজুরি ফাউ, কারণ সেই দায়িত্ব লালবানু বেগমের। সব মিলিয়ে খরচ দাঁড়াচ্ছে আড়াই হাজার টাকা। তার মানে সাড়ে তিন হাজার টাকা সেভ হলো! এই টাকা দিয়েই তাদের মা-মেয়ের পিকনিকের খরচ অনায়াসেই উঠে আসবে। মৌটুসী মনে মনে নিজেকে বাহবা দিল, ঘটে একটু বুদ্ধি না থাকলে চলে না! বড়লোকেরা এসব ম্যানেজমেন্ট বোঝে না, ঠিকই ছয় হাজার টাকা গচ্চা দিয়ে চলে যাবে। নিজের বুদ্ধির তারিফ করতে করতে মৌটুসীর মেজাজটা পুনরায় ফুরফুরে হয়ে উঠল। ভাবল, জামাগুলো বানানো শেষ হলে একদিন ওই দোকানদারের সামনে গিয়ে পইপই করে হিসেবটা বুঝিয়ে দিয়ে আসবে তাদের।
এরপর মনের আনন্দে চড়ুইকে নিয়ে সে বাটা শোরুমে ঢুকল। চড়ুইয়ের স্কুলের সুজোড়া কিনে ফিরে আসার সময় মৌটুসীর চোখ গেল পাশের লেডিস কর্নারে। ডিসপ্লেতে রাখা এক জোড়া ফ্ল্যাট জুতায় নজর আটকাল তার। মৌটুসী চড়ুইয়ের হাত ধরে সেদিকে এগিয়ে গেল। জুতাটা হাতে নিয়ে দেখল, খুব বেশি গর্জিয়াস নয়, তবে বেশ সুন্দর, এক কথায় বলতে গেলে ওর পছন্দ হলো খুব। সোল পার্টের গায়ে লাগানো দামের ট্যাগটার দিকে তাকাল ও, সেখানে অংকে লেখা, উনিশশো টাকা।
দোকানের স্টাফ এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, “ম্যাম, জুতাটা কি পছন্দ হয়েছে? প্যাক করে দেব?”
মৌটুসী জুতাটা আবার র্যাকে রেখে দিল। মৃদু হেসে বলল, “না, তেমন একটা পছন্দ হয়নি।”
বিকেলের সোনাঝরা রোদ মিলিয়ে গিয়ে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। আকাশে কিছুটা নীলাভ আভা লেগে আছে এখনো। চারপাশের গাছপালাগুলো ম্লান অন্ধকারে লুকিয়ে নিচ্ছে নিজেকে। বাতাসে সন্ধ্যা নামার মৃদু হিমেল পরশ, মুয়াজ্জিন মাগরিবের আযানের প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন। এমন সময়েই মৌটুসী আর চড়ুই বাড়িতে ফিরল। স্কুটির হ্যাঙ্গার থেকে ছোট ছোট ব্যাগগুলো খুলে দিতেই চড়ুই সেগুলো নিজের হাতে নিয়ে খুশি মনে বাড়িতে ছুটে গেল। মৌটুসী স্কুটিটা ঢুকিয়ে ভালো করে লক করে ঘরে এলো। চড়ুই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আজকে কিনে আনা হেয়ার ক্লিপগুলো একটা একটা করে চুলে গাঁথছে। মৌটুসী সেদিকে একবার তাকিয়ে দ্রুত হাতে বাইরের কাপড় বদলে সুতির একসেট থ্রিপিস পরে নিল।
এরপর বাথরুম থেকে অজুর বদনায় পানি নিয়ে সে সামাদ আলীর ঘরে গেল। বিছানায় শায়িত বাবাকে পরম মমতায় নিজ হাতে ওযু করিয়ে দিল সে। ভদ্রলোক বিছানায় শুয়ে থেকেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেন। লালবানু বেগমও ওযু সেরে গামছা দিয়ে ওযুর পানি মুছতে মুছতে ঘরে ঢুকলেন।
মৌটুসী বেরিয়ে যাওয়ার সময় মাকে বলল,
“আম্মা নামাজ পড়ে তাড়াতাড়ি ওঘরে আসো তো।”
মৌটুসী নিজেও বাথরুম থেকে ওযু করে ঘরে গেল। তাকে দেখামাত্রই চটপটে চড়ুই বলে উঠল, “মাম্মা আমার পড়ার টেবিলটা সোজা করে দাও। আমি লেখাপড়া করব।”
আজকে বাজার থেকে চড়ুইয়ের পড়ার জন্য একটা পোর্টেবল ল্যাপটপ টেবিল কিনে নিয়ে এসেছে। মৌটুসী তা খুলে মেঝের একদিকে সোজা করে বসিয়ে দিল। চড়ুই তার ওপর বই-খাতা রেখে দুই হাঁটু ফেলে আরাম করে বসে পড়ল তার সামনে। এখন সে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মনোযোগী স্টুডেন্ট।
নামাজ শেষ করে মৌটুসী তার বই আর ফোনটা নিয়ে চড়ুইয়ের পাশে এসে বসল। চড়ুইকে পড়া দেখিয়ে দিয়ে ফোনটা হাতে নিল, ইউটিউবে শার্ট আর স্কার্ট বানানোর টিউটোরিয়াল সার্চ করল সে। বেশ কয়েকটা ভিডিও এলো। সেগুলো থেকে বেছে বেছে একটা ভিডিও ওপেন করল, তারপর পাশে বসে পান সাজাতে থাকা লালবানু বেগমের হাতে ধরিয়ে দিল ফোনটা। ভদ্রমহিলা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আমারে আবার এই মোবাইল দিলি কেন মৌ?”
মৌটুসী নিজের বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতে বলল,
“ভিডিওটা মন দিয়ে দেখো। চড়ুইয়ের স্কুল ড্রেস বানাতে হবে।”
লালবানু বেগম কিছুটা দ্বিধা নিয়েই বললেন, “টেইলরে দিলেই তো পারতি? অত ঝামেলার কী দরকার?”
”ঘরে দক্ষ দর্জি থাকতে বাইরের দর্জির কাছে মজুরি দিতে যাব কেন? তুমিই ভালো পারবে। ভিডিওটা ভালো করে দেখো।”
ভদ্রমহিলা খুব মন দিয়ে কয়েকবার ভিডিওটা দেখলেন। তারপর উঠে গিয়ে কাঁচি, ফিতা, চক নিয়ে এসে মৌটুসীকে বললেন কাপড়গুলো বের করে দিতে। উনার সেলাইয়ের অভিজ্ঞতা বহু বছরের। তবে তিনি সচরাচর শার্ট-প্যান্টের, স্কার্টের মতো ভারী কাজগুলো করেন না। কিন্তু পারবেন না যে এমনটাও নয়। কাটিংয়ের নিয়মগুলো কয়েকবার দেখেই অভিজ্ঞ মস্তিষ্কে সবটা আয়ত্ত করে ফেলেছেন তিনি।
রাতে খাবারের সময় লালবানু বেগমকে প্লেটে ভাত-তরকারি নিয়ে বারান্দা ছেড়ে বাইরে যেতে দেখে মৌটুসী জিজ্ঞেস করল, “প্লেট নিয়ে কোথায় যাচ্ছ আম্মা?”
লালবানু বেগম থেমে গিয়ে বললেন, “রবিনরে দিতে।”
মৌটুসী ভ্রু কুঁচকাল, “কেন? তার বউ নাই?”
”না, নাইয়র গেছে।”
মৌটুসী চেয়ার ছেড়ে উঠে এগিয়ে আসতে আসতে বলল, “এত ঘনঘন বাপের বাড়ি কি? নাগর জুটাইছে নাকি ওখানে?”
তারপর লালবানু বেগমের হাত থেকে প্লেটটা নিয়ে বলল, “আমি দিয়ে আসতেছি। তুমি আব্বার প্লেটে ভাত বাড়ো।”
মৌটুসী আঙিনা পেরিয়ে বড় ভাইয়ের ঘরের সামনে এসে দরজায় কড়া নাড়ল, কিছু সময় নিয়ে রবিন দরজা খুলে দিল।
মৌটুসী সামনে তাকাল। লম্বা-চওড়া এক যুবক দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে, পরনে লুঙ্গি আর জ্যাকেট। একসময়ের ঝকঝকে ফর্সা মুখটাতে এখন অগোছালো দাড়ি, মাথার চুল উসকোখুসকো। উজ্জ্বলতার সেই ছাপ আর নেই, কেমন মলিন হয়ে গেছে। কেন যেন মৌটুসী তার সামনে নিজের সেই চেনাপরিচিত ভাইকে নয়, বরং এক লেউটা কুকুরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছে।
মৌটুসীকে স্তব্ধ হয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে রবিন গলা খাকারি দিয়ে বলল, “মৌ, তুই? কিছু বলবি?”
”হুম কথা ছিল।”
রবিন এবার দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়িয়ে বলল, ভেতরে আয়।
মৌটুসী পা বাড়িয়ে ঢুকলো ভেতরে। ঢুকতেই ঢুকতেই একবার চোখ বুলিয়ে নিল পুরো ঘরে। তাতেই আরেক দফা বিরক্তিতে ভ্রু কুঁচকে গেল তার। ঘরের ভেতর পুরোনো কিছু ফার্নিচার, তবে দেখে মনে হবে না এই ঘরে কোনো মহিলা মানুষের বসবাস। একটা মহিলা মানুষ এতটা অগোছালো আর নোংরা হয় কীভাবে? বিছানার চাদর, বালিশের কভার যে কতদিন ধরে ধোয়া পড়ে নি, কে জানে?
”বস।” বসতে ইশারা করল রবিন।
মৌটুসী খাবারের প্লেটটা টেবিলের ওপর রেখে বিছানায় পা ঝুলিয়ে বসল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সোজা গলায় বলল, “বউ দুইদিন পরপর বাপের বাড়ি দৌড় দেয়, কিছু বলিস না কেন? মাসুমের স্কুল কামাই হয় না?”
রবিন নির্লিপ্ত গলায় বলল, “কিয়ের স্কুল কামাই? স্কুলে যায় হেয়? বাড়ি থাকলেও তো যায় না।”
”কেন যায় না কোনো দিন কাছে ডেকে জিজ্ঞেস করছিলিস?”
”কি জিগাইতাম?”
ভাইয়ের উদাসীনতায় মৌটুসী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“পোলারে পড়াশোনা শিখাইয়া মানুষের মতন মানুষ করতে চাইলে ভালো একটা স্কুলে ভর্তি করা।”
”কিয়ের ভালা স্কুল? স্কুল কি পড়া গুলাইয়া খাওয়াইব? পড়া হলো নিজেত্তে।”
”স্কুল পড়াশোনা গুলিয়েই খাওয়ায়। পোলার স্কুলে গিয়ে কোনো দিন দেখছিলি, পড়ায় না কি করায় ওইখানে? পড়াশোনার নাম করে খাইটা নেয় বাচ্চাদের দিয়ে। মাস্টার না পড়াইলে অট্টুক পোলাপাইন একা একা কি পড়বে? পোলারে যদি শিক্ষিত করবার চাস শহরের ভেতর একটা ভালো স্কুলে ভর্তি করা। আর যদি নিজের মতন অশিক্ষিত করে কামলা খাটাইতে চাস তাইলে আর কি? থাক!”
”ভালা স্কুলে পড়াইবার এত টেকা পামু কই?”
”কেন? দুই বেলা ভাত গিলিস না? নিজের সাথে সাথে তো শ্বশুরবাড়ির পেটেও দায়িত্ব নিয়ে রাখছিস। আর নিজের পোলার বেলা টেকা বাইর হয় না?”
রবিন সামান্য মাথা নুইয়ে টুলের ওপর বসে আছে। মুখে কোনো রব নেই তার। মৌটুসী উঠে দাঁড়াল, এখানে থাকলে মুখ দিয়ে আরো নয়-ছয় বেরিয়ে যাবে তার। কিন্তু বড় ভাইয়ের সাথে এই মুহূর্তে ঝগড়া করবার কোনো ইচ্ছা নেই তার।
দরজার কাছে এসে সে থামল, পেছন ফিরে বলল,
“শ্বশুরবাড়ির সংসারে টেকা না ঢেলে নিজের পোলার পেছনে ঢাল। ভবিষ্যতে তাও অন্তত কাজে লাগবে।”
বলেই আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল মৌটুসী।
শিকদার বাড়ির ডাইনিং টেবিলে প্রতিদিনের ব্যস্ততা নেমে এসেছে। বোরাক নিজের হাতে খাইয়ে দিচ্ছে ছেলেকে। টেবিলে পাশে বসা আশা আর আরোয়াও ধীরেসুস্থে রাতের খাবার সারছে। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে টুকটাক আলাপ-আলোচনাও চলছে নানা বিষয় নিয়ে।
হঠাৎ স্কুলের পিকনিকের কথা মনে পড়তেই বোরাক কথা শুরু করল, “সামনের বৃহস্পতিবারে বীরের স্কুল থেকে ওদের পিকনিকে নিয়ে যাচ্ছে।”
আশা আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “বাহ! খুব ভালো তো! কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?”
“পাহাড়পুর।”
আশা আদরের ভঙ্গিতে বীরের থুতনি ছুঁয়ে বলল, “বীর! পিকনিকে যাবে আমার সোনা বাবা?”
বীর মুখের খাবারটুকু দ্রুত শেষ করে বলল, “হুম, যাব তো!” তারপর মাথা ঘুরিয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে কৌতুহলী স্বরে প্রশ্ন করল, “পাপা, চুলুই পাখি যাবে?”
বোরাক মৃদু হেসে উত্তর দিল, “জানি না পাপা, হয়তো যাবে।”
আরোয়া বলল, “আচ্ছা, ইদানীং বীর হঠাৎ এত ‘চড়ুই পাখি চড়ুই পাখি’ করছে কেন?”
বীর চট করে বলল, “আলোয়া ফুপুমনি, চুলুই পাখি আমাল বন্ধু হয়!”
বোরাক আপনমনেই একটু হাসল, “চড়ুই বাচ্চাটা আসলেই খুব আদুরে।”
আরোয়া ভ্রু কুঁচকে বলল, “যতই আদুরে হোক না কেন, আমাদের বীরের চেয়ে বেশি তো আর হতে পারবে না! বীর আমাদের কিউটেস্ট বেবি বয়!”
বীরের মুখে ভাতের গ্রাস তুলে দিয়ে বোরাক আবার বলল, “স্কুল থেকে প্রতি শিক্ষার্থীর সঙ্গে দুইজন অভিভাবক যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। তোরা কেউ যাবি?”
আরোয়া কিছুটা আক্ষেপ করে বলল, “আমি যেতাম ভাইয়া। কিন্তু ওই দিন আমার ভার্সিটিতে একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রেজেন্টেশন আছে।”
মৌটুসী পর্ব ১৩
আশা ঘাড় নাড়িয়ে বলল, “আমাকে ধরো না ভাইয়া। ভুবনকে সাথে নিলে তোমাদের সবার জার্নির বারোটা বাজিয়ে দিবে ও। ছোট বাচ্চাকে সামলে অতদূর যাওয়া আমার পক্ষে অসম্ভব!”
