মৌটুসী পর্ব ১
ঋতস্বিনী মাহবিশ
“চুলুই পাখি, তোমাল মাম্মাকে আমিও একটু মাম্মা ডাকি?”
পাঁচ বছরের বাচ্চা ছেলেটার হটাৎ এহেন আবদার মিশ্রিত প্রশ্নে হতবিহ্বল মৌটুসী। স্তব্ধ হয়ে কতক্ষণ চেয়ে রইল ওর আদুরে মুখটার দিকে। একটা বাচ্চা ছেলের মুখে এমন আবদার শুনে প্রথমেই যেই বিষয়টা মাথায় আসার কথা, সেটাই মৌটুসীর আন্দাজকে প্রভাবিত করল। তবুও নিশ্চিত হওয়ার জন্য মৌটুসী ছেলেটির সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। আলতো করে ওর নরম গাল দুটো দুহাতের আজলায় তুলে নিয়ে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল,
“আমাকে মাম্মা ডাকলে তোমার মাম্মা তো রাগ করবে বীর!”
বীর সহসা সরল গলায় উত্তর দিল, “লাগ কলবে না। আমাল তো মাম্মাই নেই!”
ইশ! কী করুণ এক স্বীকারোক্তি। এমন আদুরে কন্ঠে এই নিষ্ঠুর বাক্য শোভা পায়? মৌটুসীর মাতৃমনটা মুচড়ে উঠল। এই জন্যই হয়তো এতগুলো দিনেও ছেলেটির পাশে তার মাকে দেখা যায়নি! আর সে একটা মৃত মানুষকে নিয়ে কতকিছু ভেবে ফেলেছিল! মৌটুসীর ভীষন মায়া হলো এই মা হারা বাচ্চাটার প্রতি,সে নিজেও তো একজন মা!সে বীরের মাথায় হাত বুলিয়ে হাসিমুখে বলল,
“আচ্ছা বীর সোনা, তোমার যখন মন চাইবে তুমি আমাকে মাম্মা ডাকবে। কোনো সমস্যা নেই। চড়ুইয়ের মতো আমিও তোমার মাম্মা, বাবা।”
মৌটুসীর কথা শেষ হওয়ার আগেই পাশ থেকে চড়ুই গম্ভীর মুখে চট করে বলে উঠল,
“না! বীর তোমাকে মাম্মা ডাকবে না। বীর, তুমি আমার মাম্মাকে মাম্মা ডাকতে পারবে না।আমি দেব না।”
মৌটুসী মেয়ের ফোলা মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কেন চড়ুই পাখি? বীর আমাকে মাম্মা ডাকলে কি সমস্যা?”
”না মানে না।” চোখমুখ শক্ত করে বলল চড়ুই।
বীর মলিন মুখে চড়ুইয়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ছোট ছোট মায়াবী চোখ দুটো স্পষ্ট আকুতি জানাচ্ছে চড়ুইকে, যেন সে তার মাম্মার আদরের একটু ভাগ তাকেও দেয়। মৌটুসীর খারাপ লাগল। মেয়ের মাথায় হাত রেখে বুঝিয়ে বলল,
“এমন করে না চড়ুই পাখি। দেখো বীরের তো মাম্মা নেই। আমাকে মাম্মা ডাকলে হয়তো তার ভালো লাগবে। বীর তো তোমার বন্ধু, তাই না?”
চড়ুই বুকে হাত গুজে গাল ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। এই পর্যায়ে মৌটুসীর দিকে তাকিয়ে অভিমানি গলায় বলল,
“আমারও তো পাপা নেই, মাম্মা! তাহলে বীর বন্ধু তোমাকে মাম্মা ডাকলে আমিও তার পাপাকে পাপা ডাকব!”
★শুরু,
বছরের দ্বিতীয় সকাল। প্রকৃতির রুক্ষ মেজাজ যেন হাড়কাঁপানো শীতে জাঁকিয়ে বসেছে। বেলা গড়ালেও বোঝবার উপায় নেই। ঘন কুয়াশার চাদরে চারপাশটা কেবলই অস্পষ্ট ধূসর। সেই সাথে রাজশাহী শহরের রেলগেটে নেমে এসেছে এক ধরনের গুমোট স্থবিরতা। কুয়াশার ভেতর জ্যামে আটকা পড়ে আছে গাড়ির লম্বা সারি।
সেই জ্যামের মাঝেই স্থির দাঁড়িয়ে আছে একটি সাদা রঙের বিএমডব্লিউ। গাড়ির ভেতরে বিরক্ত চিত্তে বসে আছে আরহাম বোরাক শিকদার। সুগঠিত কপালে ভাঁজ ফেলে বৃদ্ধা আঙুল চালিয়ে ক্রমাগত ফোনের জ্বলজ্বলে-মসৃণ স্ক্রিন স্ক্রোল করে চলেছে সে। বোরাক শিকদারের পাশের সিটে বসা পাঁচ বছরের একটি বাচ্চা ছেলে। দুজনকে একসাথে কিংবা এই ফ্রেমে দেখলে যে কেউ এক পলকেই বলে দিতে পারবে, রক্তের সম্পর্ক ছাড়া এমন মিল হওয়া অসম্ভব। দুই প্রজন্মের দুজনার গায়ের রং, চেহারার গড়ন, চুলের স্টাইল, চোখের রং এমনকি চাহনি সবকিছুই প্রায় হুবহু। আরহাম বোরাক শিকদারের একমাত্র পুত্র সে—আযান বীর শিকদার।
বীরের স্কুলের প্রথম দিন আজকে। বাবার সাথে স্কুলে যাচ্ছে বলে ভেতর ভেতর খুশির পাহাড় জমে আছে তার। কিন্তু অন্যসকল বাচ্চাদের মতো চঞ্চলতার সাথে চিত্ত ফেটে বাইরে বেরিয়ে আসছে না সেই খুশি। একটু বেশিই শান্তশিষ্ট আর আদুরে কি-না!
আজকে বীরের গেটআপও হুবহু পাপার মতো;কুচকুচে কালো রঙের উষ্ণ স্যুট-প্যান্ট, পায়ে চকচকে কালো বুট, আর মাথায় উলের কালো শীতের টুপি, সেই সাথে বাঁ কব্জিতে কালো ডায়ালের বেবি ওয়াচ। মাথা থেকে পা, পুরোটায় জুনিয়র বোরাক শিকদার।
দীর্ঘক্ষণ জ্যামে আটকে বসে থাকার এই পর্যায়ে বীর সিটে বসেই উশখুশ করতে শুরু করল। সিট বেল্টের ভেতরই তার ছোট্ট শরীরটা নড়াচড়া করছে ক্রমাগত। ছেলের এই অস্থিরতা বোরাক শিকদারের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি এড়ালো না। সে ফোন থেকে চোখ সরিয়ে একবার ছেলের দিকে তাকাল, তারপর ড্রাইভারের পাশের সিটে বসা ছেলেটার উদ্দেশ্যে নির্দেশ দিয়ে বলল,
“সাফওয়ান, ফিডার!”
ভারী কণ্ঠস্বরের জন্য স্বাভাবিক কথাটাও গাড়ির নিস্তব্ধতায় কেমন রাশভারী শোনাল!
সাফওয়ান দ্রুত কাপ হোল্ডার থেকে দুধের ফিডারটা নিয়ে ব্যাকসিটে বসা বোরাক শিকদারের দিকে বাড়িয়ে দিল। বোরাক তা হাতে নিয়ে ঢাকনাটা খুলে ছেলের মুখে ধরল। সাধারণত এই বয়সের বাচ্চারা বাঁধা ধরা নিয়ম করে ফিডার নেয় না। তবে বীরের ক্ষেত্র ভিন্ন। সেই যে চার মাস বয়সে মায়ের বুকের দুধ ছেড়ে ফিডার নিতে হয়েছিল মুখে, আজও তার অমোঘ অভ্যাস ছাড়তে পারেনি ছেলেটা। ঘণ্টায় অন্তত একবার দুধের ফিডার দিতেই হবে তাকে।
মহিলা কলেজ রোডে তিনতলা এক ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি হলুদ রঙের স্কুটি। স্কুটির ওপর বুকে হাত গুজে বসে আছে চড়ুই। তার ছোট্ট আদুরে মুখটা বাইরের কুয়াশা ঢাকা পৃথিবীর মতোই বিরক্তিতে ছেয়ে ধূসর হয়ে আছে। ভ্রু যুগলের সন্ধিস্থলে গোনা তিনটে ভাজ ফেলে সে তাকিয়ে আছে সামনেই দাঁড়িয়ে থাকা যুবতীটির দিকে। এই শীতের সকালে লং স্কার্ট আর সবুজ সোয়েটার পরিহিত মৌটুসীকে দেখতে বেশ স্নিগ্ধ লাগলেও, বর্তমানের মেজাজটা তার মোটেও তেমন নয়। কানে ফোন চেপে ধরে বারবার কপালে ভাঁজ ফেলছে সে, ওপাশ থেকে কল রিসিভ না হওয়ায় মৌটুসীর বিরক্তি এখন চরমে।
চড়ুই এই নিয়ে তিনবারের মতো অস্থির হয়ে কব্জিতে থাকা ডিজনি ঘড়িটার দিকে তাকাল। সেখানে ফুটে ওঠা ইংরেজি সংখ্যাগুলোর সময় নিয়ে ধাতস্থ করে অধৈর্য গলায় বলে উঠল,
“দেখো মাম্মা, আটটা বিশ বেজে গেল। আমার স্কুলের লেট হয়ে যাবে কিন্তু!”
মৌটুসী ফোন কানে নিয়েই রাগে-দুঃখে অসহায় মুখে মেয়ের দিকে তাকাল। চড়ুই তাড়া দিতে ঠোঁট উল্টে ডেকে উঠল,
“মাম্মা! চলো চলে যাই। আর কখন আসবে?”
মৌটুসী ঘাড় ঘুরিয়ে তিনতলা ভবনটির দিকে আরেকবার তাকিয়ে মনে মনে কাঙ্ক্ষিত ক্লায়েন্টকে ইচ্ছেমতো ধুয়ে দিল। তারপর গজগজ করতে করতে স্কুটিতে উঠে বসল সে। হেলমেটটা পরে নিয়ে কি মনে করে শেষবারের মতো আরেকবার ডায়াল করল মৌটুসী। এবার যেন ভাগ্য সুপ্রসন্ন। ওপাশ থেকে কল রিসিভ করে হ্যালো বলতেই মৌটুসী কিছুটা চড়া গলায় বলে উঠল,
“এই যে মিস! আজ সকাল আটটায় আপনার একটা কেক ডেলিভারি আসার কথা ছিল। আশা করি মনে আছে!”
ওপার থেকে কিছু একটা বললে মৌটুসী কান থেকে ফোন নামিয়ে নিল। ইতিমধ্যেই আটটা বিশ বাজে। নয়টা থেকে চড়ুইয়ের স্কুল। প্রথম দিনই লেট হবে বোধহয়। রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে মৌটুসীর। লম্বা শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করল সে। রাগের ঠিক নেই তার। দেখা যাবে ক্লায়েন্টকে সামনে পেলে দুই-চারটা কড়া কড়া কথা শুনিয়ে দেবে। যা সে একেবারেই করতে চায় না। এতে ব্যবসায়িক ইমেজ নষ্ট হবে, একটা ক্লায়েন্ট হাতছাড়া হবে। বিজনেসের এই স্টার্টিং পয়েন্টে একটা ক্লায়েন্টও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
তিন মিনিটের মাথায় ঘুম ঘুম চেহারায় এক তরুণী হন্তদন্ত হয়ে গেট দিয়ে বেরিয়ে এল। গেটের সামনে মৌটুসীদের দেখে বুঝতে বাকি রইল না, ইনিই যে কাঙ্ক্ষিত ডেলিভারি নিয়ে এসেছেন। মেয়েটি কাছে এসে ব্যস্ত গলায় বলল,
“সরি আপু। আমার একদম স্মরণে ছিল না। ফোনটাও সাইলেন্ট করা ছিল।”
মৌটুসী জোরপূর্বক মুচকি হেসে কেকের প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল,
“আসলে আমারও একটু তাড়া আছে আপু। তাই আরকি…”
মেয়েটি কেকের নির্ধারিত দাম এগিয়ে দিলে মৌটুসী টাকাটা নিয়ে বিনয়ী ধন্যবাদ জানাল। মেয়েটি হাসি হাসি মুখ করে বলল,
“আপু, আমার ফ্রেন্ডের থেকে আপনার কেকের এমন পজিটিভ রিভিউ পেয়েছি যে আমিও আর থাকতে পারলাম না, ট্রাই করতেই নিয়ে নিলাম।”
নিজের প্রশংসা শুনে মৌটুসীর এতক্ষণের সকল বিরক্তি কর্পূরের মতো হাওয়ায় মিলিয়ে গেল যেন। ছোটমোটো সুন্দর চেহারাটা চকচক করে উঠল। ঠোঁটে এবার সত্যিকারের অকৃত্রিম হাসি ফুটল তার, বলল,
“মাই প্লেজার আপু। আশা করি আপনারও ভালো লাগবে।”
”হুম, আশা করি।”
তরুণীটি উল্টো ঘুরে হাঁটা দিলে মৌটুসী চটজলদি বাইক স্টার্ট দিতে দিতে মেয়েকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“চড়ুই পাখি, শক্ত করে ধরে বসো।”
চড়ুই এতক্ষণ পিছন থেকে আলতো করে মায়ের কোমর জড়িয়ে চুপচাপ তাদের কথোপকথন শুনছিল। এবার হাতের বাঁধন দৃঢ় করল সে। পিঠে মাথা এলিয়ে দিয়ে বলল, “চলো, মাম্মা।”
বাইক চলতে শুরু করতেই শীতের হীম শীতল হাওয়া এসে ছুঁয়ে দিতে লাগল চড়ুইয়ের ছোট্ট শরীর। কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠল সে। মাম্মাকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পিঠের সাথে একেবারে মিশে গেল। মৌটুসী মেয়ের জুবুথুবু অবস্থা খেয়াল করে বলল,
“ঠান্ডা লাগছে মাম্মা? আমার চাদরটা দেব?”
চড়ুই বিজ্ঞের মতো মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না, লাগবে না। তাহলে তোমার শীত করবে।”
মৌটুসী কথা না বাড়িয়ে বাইকটা আবারো একটু সাইটে নিয়ে নিজের গলা থেকে চাদরটা খুলে চড়ুইয়ের শরীরে প্যাঁচিয়ে দিল। চড়ুই কিছু বলতে নিলে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“কোন কথা নয় চড়ুই পাখি। বাইক অনেক জোরে চালাব, ঠান্ডা লাগলে অসুস্থ হয়ে পড়বে।”
”তুমি অসুস্থ হবে না?”
”না, আমি বড় মানুষ। বড় মানুষরা সহজে অসুখে পড়ে না।”
”মাই ব্রেভ বয়! একদম ভয় পাবে না জানবাচ্চা, কেমন? সাফওয়ান চাচ্চু এখানেই থাকবে। ওই যে ওই জানালা দিয়ে সবসময় দেখবে তোমাকে।”
বীর বাধ্য ছেলের মতো মাথা কাত করে সায় জানাল পাপাকে।
বোরাক শিকদার ছেলের মাথার টুপিটা কানের দিকটায় আরেকটু নামিয়ে ভালোভাবে ঢেকে দিয়ে বলল,
“আচ্ছা কলিজা, আমি এখন আসি? তুমি চাচ্চুর সাথে বসে থাকো। পড়াশোনা করো। তারপর টিচার এসে পড়াবেন, অনেক গল্প শোনাবেন।”
”ছুটি হলে তুমি আমাকে নিতে আসবে পাপা?” উৎসাহী কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল বীর।
”না পাপা আজকে আসতে পারব না। তুমি চাচ্চু আর ড্রাইভার দাদুর সাথে চলে যেও কেমন?”
মলিন হয়ে এল বীরের মুখ। ছোট গলায় বলল, “আচ্ছা।”
ছেলের এই বিষণ্নতা বোরাক শিকদারের হৃদয়ে সূক্ষ্ম এক আঁচড় কাটল যেন। তবে বরাবরের মতোই আবেগকে শক্ত হাতে আড়াল করে সে সাফওয়ানের দিকে ফিরে বলল,
”বীরের খেয়াল রাখিস। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে এসে ফিডার দিস ওকে। ভয় বা অস্বস্তি ফিল করলে বেশিক্ষণ রাখবি না এখানে, বাসায় নিয়ে যাবি।হেডটিচারের সাথে কথা বলা আছে আমার।”
”ঠিক আছে ভাই।”
বোরাক শিকদার ছেলের সারা মুখ জুড়ে ছোট ছোট চুমু একে দিল। আদুরে গলায় বলল,
“পাপার গুড বয় হয়ে থেকো, কলিজা বাচ্চা!”
বীরও চুমু ব্যাক করল বাবাকে। বলল,
“কলিজা পাপাল গুড বয় হয়ে থাকবে।”
বোরাক শিকদার ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলে সাফওয়ান বীরের পাশে বসে বলল,
“দেখো, চাচ্চু তোমার কতগুলো বন্ধু। এরা সবাই তোমার বন্ধু।”
বীর এবার চারপাশটা চোখ বুলিয়ে দেখতে লাগল। পুরো ক্লাসরুম তার মতোই ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের কলকাকলিতে ভরে উঠছে। প্রত্যেকের সাথেই আছে তাদের মা-বাবা। বিশেষ করে মা। এটা ওটা বুঝিয়ে বলছে তাদের। স্কুল জীবনে প্রথম দিন বলে কথা! ছোট ছোট মুখগুলোতে চরম উৎসাহ লেপ্টে আছে। আবার দুই একজনের চোখে ভয়ের সূক্ষ্ম ছায়াও খেলা করছে।
”চাচ্চু তোমাকে কতগুলো টিপস দিই শোনো।”
বীর কৌতুহলী চোখে তাকাল সাফওয়ানের দিকে। চাচ্চুর টিপস মন দিয়ে শোনবার অপেক্ষা।
”প্রথমে সবার সাথে ভাব করতে হবে। গ্যাং বানাতে হবে নিজের, লিডার হবে তুমি। ক্লাসে তোমার রাজত্ব চলবে, দাপটই থাকবে অন্যরকম। বীরের নাম শুনলেই সবাই ভয়ে থরথর করে কাঁপবে।”
সাফওয়ানের ভারী ভারী কর্তৃত্বপরায়ণ বুদ্ধিগুলো বীরের সরল মাথায় ঢুকল না। উল্টো সে বলল,
“আমাকে ভয় পাবে কেন? আমি তো গুড বয়! পাপা বলেছে গুড বয়লা কাউকে ভয় দেখায় না। আমিও দেখাব না!”
বীরের এই সুন্দর যুক্তির অবশ্য যথার্থ কারণ আছে। খেলতে খেলতে মজার ছলে একদিন এক হরর কস্টিউম পরে দেড় বছরের ফুফাতো ভাই ভুবনের সামনে দাঁড়িয়ে নানান অঙ্গভঙ্গি করে ওকে ভয় দেখিয়েছিল বীর। সেদিন কি ভয়টাই না পেয়েছিল ছোট্ট ভুবন! কাঁদতে কাঁদতে কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এল তার। সেদিন বোরাক শিকদার ছেলেকে কাছে নিয়ে খুব করে বুঝিয়েছিল, এমন আর না করতে। গুড বয়দের অন্যরা ভয় পাবে কেন? তাদের তো সবাই ভালোবাসবে, আদর করবে! আর ভয় পাবে পচা ছেলেদের। ছোট বীরের সরল মস্তিষ্ক বাবার সেইদিনের সেই কথাগুলো কঠোরভাবে লালন করে আসছে।
এদিকে বীরের সরল উত্তর শুনে সাফওয়ান বাকরুদ্ধ। বুঝতে পারল নিষ্পাপ একটা প্রাণকে সে ভুলভাল জিনিস শিক্ষা দিতে যাচ্ছিল। সে নিজের ভুল বুঝতে পেরে বীরের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “হ্যাঁ চাচ্চু, পাপা একদম ঠিক বলেছে, বন্ধুদের ভয় দেখাতে হয় না। তাদের সাথে শুধু ভাব করতে হয়।”
ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে দোতলার করিডোর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় নিজের নাম ধরে ডাক শুনে থমকে দাঁড়াল বোরাক শিকদার। পেছনে ফিরতেই আধো পরিচিত এক মুখ নজরে এল। হাসি মুখে একজন যুবতী নারী দ্রুত পায়ে তার দিকেই এগিয়ে আসছে।
”হাই, বোরাক! কেমন আছো?”
বোরাক সামান্য ভ্রু কুঁচকে মুহূর্তের জন্য স্মৃতি হাতড়ে নিল, তারপর ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,
”আরে, নীতি! তুমি এখানে?”
”হুম, আমি এই স্কুলে পড়াই। কিন্তু তুমি?”
”ছেলেকে নার্সারিতে ভর্তি করিয়েছি।”
”বাহ! এরই মধ্যে বাবাও হয়ে গিয়েছ তুমি? এদিকে আমাকে দেখো, এখনো কুমারীই রয়ে গেলাম।”
বোরাক মৃদু হাসল।
”তা ছেলের নাম?”
”বীর, আযান বীর শিকদার।”
”বীর! নাইস নেম!”
বলেই নীতি এবার বোরাক শিকদারের পা থেকে মাথা নিবিড় দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে নিল। কলেজ জীবন থেকে দেখে আসছে এই সুদর্শন ছেলেটাকে। কলেজ, ভার্সিটিতে তার পিছে যে মেয়েদের লম্বা লাইন লেগে থাকত, তা কি নীতির অজানা? ইউনিভার্সিটি শেষ করার পর মাঝের বেশ কিছু বছর দেখা-সাক্ষাৎ হয়নি তাদের। আজ সেই তরুণ বোরাক শিকদার পরিপূর্ণ যুবক। বয়স বাড়ার সাথে সাথে চেহারার আভিজাত্যপূর্ণ সৌন্দর্য দ্বিগুণ হয়েছে, বেড়েছে দৃশ্যমান গাম্ভীর্য। সেই সাথে শরীরী গঠনেও এসেছে বলিষ্ঠ পরিবর্তন, কালো শার্ট-স্যুটের আদলেও তা স্পষ্ট। তার কথাবার্তা, চলাফেরা, পোশাকআশাক সবকিছুই এক লহমায় একজন মেয়ের মোহের নজর কাড়বার নিবিড় সক্ষমতা রাখে। এই যেমন এখন তার সামনে স্রেফ দাঁড়িয়ে আছে, তাতেই তার আভিজাত্যমণ্ডিত ব্যক্তিত্বের আভা ছড়িয়ে পড়ছে। বয়স কতই বা হবে, একত্রিশ-বত্রিশের বেশি হওয়ার সুযোগ নেই কোনো। নীতি আর নিজের মুগ্ধতা দমিয়ে রাখতে পারল না। বলেই ফেলল, “তুমি কিন্তু আগের থেকেও অনেক বেশি হ্যান্ডসাম হয়ে গেছ বোরাক!”
নিজের এই প্রশংসা বোরাক শিকদার কীভাবে নিলেন, তা তার অভিব্যক্তি দেখে বোঝার উপায় নেই। সে সৌজন্যের খাতিরে নিস্পৃহ স্বরে কেবল পাল্টা বলল, “তুমিও বেশ সুন্দরী হয়েছ।”
নীতি লজ্জা মিশ্রিত মুচকি হাসল। জিজ্ঞেস করল,
”ভাবি আসেনি?”
বোরাক শিকদার ছোট স্বাভাবিক একটা নিশ্বাস ফেলে খুব অবলীলায় বলল,
”না, উই আর সেপারেটেড।”
নীতি মুহূর্তখানেক থমকালো মনে হয়! পরক্ষণেই বলে উঠল,
“অহ! সরি আমি আসলে জানতাম না। ভার্সিটি থেকে বেরোনোর পরপরই একবার শুনলাম তুমি বিয়ে করে নিয়েছ। তারপর থেকে তোমার কোনো খোঁজ পাওয়া হয়নি।”
এভাবেই টুকটাক আরো দুই একটা কথা বলে প্রস্থান করল বোরাক। নীতি সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিজেও টিচার্স রুমের দিকে পা বাড়াল।
হাই স্পিডে এক টানে বিশ মিনিটের মাথায় স্কুটি এসে থামল শহরের অন্যতম নামকরা কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সামনে। নয়টা বাজতে এখনও দশ মিনিট বাকি দেখে স্বস্তির শ্বাস ফেলল মৌটুসী। চড়ুইকে স্কুটি থেকে নামিয়ে মাথার ছোট্ট হেলমেটটা খুলে দিল, তারপর গায়ের চাদরটাও খুলে সেটা নিজে পরে নিল। চড়ুইয়ের আদুরে মুখে উপচে পড়া খুশি আর একরাশ উৎসাহ। মৌটুসীর নজর এড়ালো না তা। মৌটুসীর ভেতরটা প্রশান্তিতে ছেয়ে গেল সেই খুশি দেখে। তার মেয়ে, তার চড়ুই পাখি হাসলে, মৌটুসীর কাছে এই গোটা পৃথিবীও হাসে।
চড়ুইয়ের পিঠ থেকে গোলাপি স্কুল ব্যাগটা নিজের হাতে নিয়ে নিল মৌটুসী। অন্য হাতে মেয়ের হাত ধরে মেইন গেটের দিকে যেতে যেতে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করল,
“ফার্স্ট ডে এট স্কুল, চড়ুই পাখির অনুভূতি কেমন, হু?”
মায়ের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে চড়ুই একপ্রকার লাফিয়ে উঠল। খুশিতে ডগমগ হয়ে বলল,
“অনেক খুশি খুশি, মাম্মা! চড়ুই পাখি আজকে অনেক হ্যাপি।”
মৌটুসী মেয়ের হাসিমাখা মুখের দিকে তাকিয়ে নিজেও মিষ্টি করে হাসল।
মূল ফটক আর স্কুল প্রাঙ্গণজুড়ে অনন্য দৃশ্য। চড়ুইয়ের মতো দলে দলে অসংখ্য খুদে শিক্ষার্থী তাদের অভিভাবকদের হাত ধরে ভেতরে প্রবেশ করছে। কেউ কেউ একটু বড়, মাঠজুড়ে ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছে। বিলাসবহুল এই স্কুলে পড়ুয়া প্রায় প্রতিটি শিশুই উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান। তাই সবার পোশাকেই দামী ব্র্যান্ডের চাকচিক্য। স্কুল ইউনিফর্মের ডিজাইন সম্প্রতি পরিবর্তন করা হয়েছে। নতুন মডেল এখনো প্রকাশ হয়নি বলেই এই বৈষম্যগুলো চোখে পড়ছে।
মৌটুসী এবার আড়চোখে একবার মেয়ের দিকে তাকাল। চড়ুইয়ের পরনে দামী কোনো ব্র্যান্ডের পোশাক নেই। সাধারণ একটা সাদা জিন্স প্যান্ট আর হালকা বেগুনি রঙের বেবি উইন্টার কোট তার পরনে। গলায় জড়ানো তুলোর মতো নরম একটা সাদা বেবি মাফলার। এতেই রূপকথা থেকে উঠে আসা পুতুলের মতো দেখাচ্ছে তাকে। কি আদুরে মুখ! ফর্সা গালদুটো অল্প ফোলা ফোলা, শীতের প্রদাহে নাকের ডগাটা কিঞ্চিৎ লাল হয়ে আছে। কোটটা তার ক্ষীণ দেহের মাপের চেয়ে কিছুটা বড় হওয়ায় ছোট্ট হাতগুলো প্রায় পুরোপুরি ঢাকা পড়ে গেছে, শুধু হাতা থেকে আঙুলের ডগাগুলো একটুখানি উঁকি দিচ্ছে। এক কথায় আপাদমস্তক সাক্ষাৎ একটা কিউটের ডিব্বা।
তবুও মৌটুসীর মাতৃমনে মলিনতা নেমে এল। কেন যেন নিজেকে একজন ব্যর্থ মা মনে হয় তার। এই প্রতিযোগিতামূলক পৃথিবীতে তার সন্তানকে সে সুন্দর একটা পরিবেশ দেওয়ার চেষ্টায় নেমেছে ঠিকই, কিন্তু তাতে তাল মিলিয়ে চলতে প্রয়োজনটুকু হাতে তুলে দিতে পারছে না। জীবনযাত্রায় নিজেকে ত্রুটিপূর্ণ পথিকের মতো মনে হয় মৌটুসীর।
অথচ তার ছোট্ট চড়ুই পাখির মনে বিন্দুমাত্র অভিযোগ নেই। মায়ের সামর্থ্যের বাইরে পছন্দের জিনিস নিয়েও তার কোনো আবদার নেই, নেই কোনো বায়না। এতটুকু বয়সেই প্রয়োজনের তুলনায় ঢের বেশি বুঝদার সে।
দুতলার নার্সারি ক্লাসে প্রবেশ করল তারা। ইতিমধ্যেই ক্লাসের সামনের সারির সকল বেঞ্চ পূর্ণ। তা দেখে মন খারাপ হয়ে গেল চড়ুইের। এখন কি একেবারে পেছনের দিকে বসতে হবে তাকে? মৌটুসী মেয়ের হাত ধরে তৃতীয় সারির একটি বেঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে বীর বসে আছে, আর সাফওয়ান মাথা নিচু করে তাকে কিছু একটা বলছে। মৌটুসী মৃদুস্বরে ডাকল,
“এক্সকিউজ মি!”
সাফওয়ান মাথা তুলে তাকালে মৌটুসী সবিনয়ে বলল, “এই সিটটা মনে হয় খালি আছে!”
”জি আপু, অবশ্যই।” বলেই সাফওয়ান দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে বেঞ্চের জায়গা করে দিল। মৌটুসী ইশারায় চড়ুইকে বসতে বলল। চড়ুই গিয়ে বসল বীরের পাশেই। মৌটুসী ওপরের বেঞ্চে ওর ব্যাগটা রেখে দিল।
এর মধ্যেই একজন পিয়ন এসে অভিভাবকদের বাইরে যেতে তাড়া দিলেন।
সাফওয়ান চড়ুইকে দেখিয়ে দিয়ে বীরের উদ্দেশ্যে বলল,
”চাচ্চু, তোমার আরেকটা বন্ধু। বন্ধুর সাথে মিট করো তুমি, আমি এখন বাইরে গিয়ে দাঁড়াই। তোমাদের মিস এখনই চলে আসবে।”
বীর মাথা নেড়ে বলল,
“এখানেই থাকবে চাচ্চু। আমি যেন তোমাকে দেখতে পাই।”
”আচ্ছা বাবা। আমি এই যে এই জানালা বরাবর মাঠে দাঁড়িয়ে থাকব।”
মৌটুসী বেরিয়ে যাওয়ার আগে চড়ুইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল,
“চড়ুই পাখি যেমন বলেছি, একেবারে দুষ্টুমি করবে না। টিফিনে নুডলসটুকু খেয়ে নিবে। বোতলের সবটুকু পানি ফিনিশ করবে। ছুটি হলে আমি নিতে আসব তোমাকে।”
চড়ুই এক পাশে মাথা কাত করে সায় দিল,
“ওকে মাম্মা।”
মৌটুসী যেতে যেতেও পিছন ফিরে সতর্ক করল মেয়েকে।
“আমি না আসা পর্যন্ত মেইন গেটের বাইরে এক পাও দেবে না কিন্তু!”
চড়ুই হাতের তালু নেড়ে বড়দের মতো করে বলল,
“আচ্ছা আচ্ছা, বুঝেছি। এখন এসো তুমি। টাটা।”
মৌটুসীর চোখের আড়ালে চলে যেতেই চড়ুই এবার ঘাড় ঘুরিয়ে বীরের দিকে তাকাল। বীর কোলের ওপর হাত দুটো ভাঁজ করে চুপচাপ হয়ে বসে আছে, একমনে তাকিয়ে আছে চড়ুইয়ের ব্যাগে থাকা ডিজনি স্টিকারটার দিকে। চড়ুই এবার বীরের দৃষ্টি আকর্ষণ করে সহসা মিষ্টি হেসে বলল, “হাই ফ্রেন্ড, তোমার নাম কী?”
চড়ুইয়ের কথায় বীর চোখ তুলে ওর চোখের দিকে তাকাল। সুন্দর করে তার নাম বলল, “আযান বীল শিকদাল।”
”আযান বীল শিকদাল?”
”না, আযান বীল শিকদাল।”
”আমিও তো সেটাই বলছি, আযান বীল শিকদাল।”
বীর এবার ব্যাগ থেকে একটা খাতা আর কলম বের করল। খাতা খুলে সেখানে কাঁচা হাতে বড় বড় অক্ষরে লিখল,
Azan Bir Shikdar.
বয়সে খুব ছোট হলেও অসাধারণ চড়ুই ইংরেজি ডিকোডিং অর্থাৎ বানান করে পড়া মুটামুটি ভালোই পারে। সে এবার সময় নিয়ে একটা একটা করে অক্ষর পড়ে শব্দগুলো বানান করার চেষ্টা করল। তারপর খণ্ড খণ্ড করেই উচ্চারণ করল,
”আ-জা-ন… বীর… শিক-দার।”
তারপর বীরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“অহ! তোমার নাম আযান বীর শিকদার?”
বীর মাথা নাড়িয়ে সায় দিল।
“হ্যাঁ।”
”অনেক সুন্দর নাম। কিন্তু অনেক বড়ও। আমার তো মনে রাখার জন্য মুখস্থ করতে হবে।”
”তোমাল নাম কী?”
”আমার নাম চড়ুই, তুমি আমার ফ্রেন্ড হতে চাইলে চড়ুই পাখি বলে ডেকো।”
”চুলুই পাখি?”
”চুলুই না। চড়ুই পাখি, চ-ড়ু-ই।”
”চ-লু-ই!”
”অহ!” চড়ুই হতাশ। এবার বড়দের মতো করে বলল,
“আচ্ছা বুঝতে পেরেছি। তুমি হয়তো তোতলিয়ে কথা বলো। সমস্যা নেই, তুমি তোমার মতো করেই ডেকো।”
