মৌটুসী পর্ব ২৪
ঋতস্বিনী মাহবিশ
মৌটুসী বিছানা ছেড়ে উঠল, কোম্বলটা চড়ুইয়ের গায়ে ভালো করে জড়িয়ে দিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাল একপলক—চোখ আর নাকের ডগাটা লাল হয়ে আছে। কয়েকবার ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিয়ে নিজেকে খানিকটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। এরপর ধীর পায়ে বেরিয়ে এসে বারান্দার দড়িতে ঝোলানো গামছায় মুখ মুছে নিল। এরপর আরও দুই ধাপ হেঁটে মা-বাবার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কড়া নাড়ল। ডাকল, “আম্মা, ঘুমাইছ?”
ভিতর থেকে মৃদু গলায় সাড়া দিলেন লালবানু বেগম, “কেডা, মৌ?”
”হ্যাঁ, একটু বাইরে আসো।”
লালবানু বেগম বিছানা ছেড়ে উঠে শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে দরজা খুলে দিলেন। আধো অন্ধকারে মেয়েকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী হইছে মা? এত রাইতে ডাকলি যে?”
”আমার ঘরে আসো একটু, কথা আছে।”
ভদ্রমহিলা একটু অবাক হয়ে মৌয়ের পিছু পিছু ওর ঘরে গিয়ে ঢুকলেন। দুই মা-মেয়ে সোফায় বসল। মৌটুসীর বিধ্বস্ত চেহারা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন ভদ্রমহিলা। মেয়ের হাত নিজের হাতে নিয়ে নরম গলায় বললেন, “কী হইছে মা? কেউ কি কিছু কইছে?”
মৌটুসী দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে না বুঝাল। মুহূর্তখানেক চুপ থেকে বলতে শুরু করল, “আম্মা, কয়েকদিন আগে একটা সম্বন্ধের কথা বলেছিলে মনে আছে? আমজাদ ঘটক যেটা নিয়ে আসছিল।”
লালবানু বেগম ভ্রু কুঁচকে ভাবলেন, “ওই যে পোলাটা শিক্ষা অফিসে চাকরি করে, হেইডার কতা কইতাছস?”
”হ্যাঁ। সেই ছেলের বিয়ে হয়ে গেছে নাকি কিছু জানো?”
”না, হয় নায় মনে! পরশুও ঘটকের লগে দেখা হইছিল, তখনো তো কইল। তুই হঠাৎ এসব ক্যান জিগাইতাছস, মৌ?”
মৌটুসী একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মায়ের চোখের দিকে তাকাল। কোনো ভূমিকা না করেই সরাসরি বলল, “আমি বিয়ে করব আম্মা।”
ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে আয়নায় চুল আঁচড়াচ্ছে মৌটুসী। পরনে তার খুব হালকা গোলাপি রঙের একটি থ্রি-পিস, গায়ের রঙের সাথে এমনভাবে মিশে গেছে যে মনে হচ্ছে যেন গায়ের চামড়ারই একটা অংশ। বিছানায় বসে লালবানু বেগম মুগ্ধ নয়নে মেয়েকে দেখছিলেন। এবারে তিনি বলে উঠলেন,
”বিষয়ডি আমার কাছে ভালা ঠেকতাছে না মৌ। এমনে বাইরে… পোলাডারে বাড়িতই আইতে কইলে কি হইত? এনই নিরিবিলি বইয়া কথা কইতে পারতি না?”
মৌটুসী চিরুনিটা নামিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে মায়ের দিকে তাকাল। কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, “আম্মা বাড়িতে আসতে বললে উনি একা কখনোই আসতেন না। দেখা যেত পরিবার-বন্ধুবান্ধব সবাইকে নিয়ে হাজির। কত খরচ বুঝতে পারছ? তাছাড়াও, কোনো দেখা-সাক্ষাৎ, আলাপ-আলোচনা না হইতেই একগাদা পাত্রপক্ষের সামনে সং সেজে বসে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব না। আমাদের মাঝখানে যদি সব ঠিক থাকে তবেই ওরা বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারবে, নয়তো না।”
লালবানু বেগম একটু ভেবে নিয়ে বললেন, “আইচ্ছা, যা ভালো মনে কর। তোর ইচ্ছাই বড়।”
মৌটুসী কথা না বাড়িয়ে চুলের বেনী করতে হাত তুলল। তা দেখে লালবানু বেগম ব্যস্ত হয়ে বলে উঠলেন, “বেনী করিস না মৌ। চুলডি খোলাই রাখ, তোরে খোলা চুলেই বেশি ভালা দেখায়।”
কিছুক্ষণ পর একটা বিশাল টেডি হাতে চড়ুই চঞ্চল পায়ে ঘরে ঢুকল। সকাল-সকাল মাকে এই বিশেষ ড্রেস-আপে দেখে কৌতূহল হলো তার ছোট্ট মনে। সে জানে, মা তার কেবল তখনই স্কার্ট ছেড়ে অন্য কোনো ড্রেস পরে যখন বিশেষ কোনো জায়গায় বেড়াতে যায় বা দাওয়াতে যায়। তাই সে এগিয়ে এসে বলল, “মাম্মা কোথায় যাচ্ছ? আমাকে নিয়ে যাবে না?”
মৌটুসী পুরোপুরি তৈরি। এখন কেবল ওড়নাটা নেওয়া বাকি। এবার সে মেয়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে দুই বাহুতে হাত রেখে বুঝিয়ে বলল, “মাম্মা অফিসের একটা কাজে যাচ্ছি চড়ুই পাখি। সেখানে তোমাকে নিয়ে গেলে আমার স্যাররা যে বকা দেবেন সোনা। তাই তোমাকে নিয়ে যেতে পারছি না। তবুও যদি সন্ধ্যার আগেই আমি কাজ শেষ করে ফিরে আসতে পারি, তোমাকে নিয়ে ঘুরতে যাব, কেমন?”
চড়ুই বুঝদারের মতো মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল, “ঠিক আছে।”
মৌটুসী হেসে আলতো করে মেয়ের ফুলোফুলো নরম গাল টেনে দিয়ে বলল, “এখন বলো তো, আমার চড়ুই পাখি কী খাবে? মাম্মা ফেরার সময় নিয়ে আসবে!”
চড়ুই ভাবুক ভঙ্গিতে গালে তর্জনী ঠেকিয়ে কিছুক্ষণ খুব গভীর চিন্তা করল। তারপর চট করে হেসে বলল, “আইসক্রিম! অনেকগুলো দিন খাইনা।”
”উহু চড়ুই পাখি! শীতের দিন কেউ আইসক্রিম খায়? শীত ফুরোলে খাবে। এখন অন্য কিছু বলো।”
”কিন্তু আমার তো শুধু আইসক্রিম খেতেই মন চাইছে, মাম্মা!” ঠোঁট উল্টে বলল চড়ুই।
”এখন আইসক্রিম খেলে ঠান্ডা লেগে যাবে মা! আচ্ছা, দই নিয়ে আসি? আইসক্রিমের মতো মজা করে চেটে খাবে!”
চড়ুইয়ের চোখের মণি খুশিতে বড় হয়ে উঠল, “হুমমম! তাহলে দই নিয়ে এসো। দই মজা!”
রিকশা চলছে, বিকেলের নরম বাতাসে রমনীর খোলা চুল উড়ছে। বাইরে থেকে তাকে যতটা স্নিগ্ধ আর শান্ত দেখতে মনে হচ্ছে ভেতরটা ততটাই অস্থির। হুট করে কী করতে যাচ্ছে, এর পরিনিতি কী—কিছুই যেন ঠিকঠাক ঠাহর করতে পারছে না মৌটুসী। এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, অথচ এখন মনে হচ্ছে পুরো ব্যাপারটা অবাস্তব! এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, রিকশা থেকে নেমে এখনই দৌড়ে বাড়ি ফিরে যেতে।
মৌটুসী চোখ বন্ধ করে এক বুক লম্বা শ্বাস নিয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল। নিজেই নিজেকে বারবার বোঝাতে লাগল, “শান্ত হ, মৌ। শুধু দেখা করতে যাচ্ছিস বলেই তো আর বিয়ে হয়ে যাচ্ছে না। এত অস্থির হওয়ার কী আছে? মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কিছুই করবি না তুই।”
মালোপাড়ায় এসে রিকশা ছাড়ল মৌটুসী। তারপর তাকে যে রেস্টুরেন্টের ঠিকানা দেওয়া হয়েছিল তার সামনে গিয়ে ঘটকের দেওয়া নাম্বারটিতে কল করল। ওপাশের ব্যক্তিটিকে নিজের অবস্থান জানিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে রইল সে।
একটু পরেই পিছন থেকে একটি গম্ভীর পুরুষালি কণ্ঠ ভেসে এল, “এক্সকিউজ মি!”
মৌটুসী ঘুরে তাকাল। লম্বা শ্যামলা রঙের একটা লোক দাঁড়িয়ে তার সামনে। পরনে ফরমাল শার্ট, চোখে চশমা। লোকটা মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করল, “মিস মৌ?”
মৌটুসী মাথা নেড়ে জানাল, “জ্বি।”
”আমিই মিহাল হাসান। আসুন, ভেতরে বসা যাক।”
রেস্টুরেন্টের ভেতরে আজ অনেকটাই ভিড়। ছুটির দিনের বিকেল বলে কথা! একটা খালি টেবিল দেখে বসল তারা। মিহাল ওয়েটারকে ডেকে কিছু খাবার অর্ডার করে মৌটুসীর দিকে তাকাল। তার দৃষ্টিতে মুগ্ধতা আর সন্তুষ্টি স্পষ্ট ফুটে উঠছে। ঘটকের বর্ণনা ভুল নয়। ছবিতে যেমন দেখেছিল, মেয়েটা বাস্তবে যেন তার থেকেও অনেকটা স্নিগ্ধ। এদিকে মৌটুসী বড্ড অস্বস্তিতে। বারবার এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে, হাতের আঙুলগুলো ওড়নার কোণ খুঁটছে।
মিহাল ওর এই অস্বস্তি এড়িয়ে গেল না। মৃদু হেসে পানির গ্লাসটা মৌটুসীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “আপনাকে কিছুটা ক্লান্ত দেখাচ্ছে, পানিটা খেয়ে নিন।”
মৌটুসী হালকা হেসে গ্লাসটা নিল। দুই ঢোক পানি খেয়ে গ্লাসটা ফের টেবিলের ওপর রেখে দিল।
মিহাল কথা শুরু করল, “তো মিস মৌ, আমার সম্পর্কে কী জানেন?”
মৌটুসী ছোট করে জবাব দিল, “তেমন কিছুই জানি না।”
মিহাল হাসল। “আচ্ছা, তাহলে আমিই পরিচয় দিয়ে শুরু করি। আমি মিহাল হাসান। ৪১তম বিসিএস, নন-ক্যাডার। বর্তমানে রাজশাহী শিক্ষা বোর্ডে সহকারী সেকশন অফিসার হিসেবে কর্মরত আছি। আর হয়তো জেনে থাকবেন, আমি একজন সিঙ্গেল ফাদার। গত বছরের মার্চ মাসে আমার স্ত্রী মারা গিয়েছে, আর তিন বছরের একটা ছেলে আমাদের।”
”জ্বি!”
”এবার আপনার সম্পর্কে কিছু শোনা যাক!”
”আমি মৌ। গত বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স শেষ করেছি। বর্তমানে একটা ইলেকট্রনিক্স শোরুমে সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভ হিসেবে কাজ করছি। আর… আমার পাঁচ বছর বয়সী একটা মেয়ে আছে।”
”আচ্ছা, যা বলার সরাসরি বলছি। আমি যেহেতু একজন সিঙ্গেল বাবা। তাই কেবল আমার জন্য স্ত্রী নই, আমার ছেলের জন্য একটা মা খুঁজছি। বর্তমানে আমার ছেলে আমাদের গ্রামের বাড়ি নাটোরে আমার মার কাছে থাকছে। তবে বিয়ের পর সে রাজশাহীতে আমাদের সাথেই থাকবে। আপনার এতে কোনো সমস্যা নেই তো?”
মৌটুসী দুদিকে মাথা নাড়াল, “না, আমার কোনো সমস্যা নেই।”
মৌটুসী আরো কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই ওয়েটার খাবারের ট্রে নিয়ে এল। খাবার পরিবেশন করে চলে যেতেই মিহাল বললেন, “আচ্ছা, আগে খাবারটা খেয়ে নিন, ঠান্ডা হয়ে যাবে। পরে কথা বলছি।”
বলেই মিহাল খেতে শুরু করল। হয়তো আগে থেকেই ক্ষুধার্ত ছিল! ব্যাচেলর মানুষ বলে কথা। মিহাল মাথা নিচু করে নিবিষ্ট হয়ে খাচ্ছে। এই সুযোগে মৌ আড়চোখে তাকাল তার দিকে। ক্লিন-সেভ করা উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণের মুখটা মায়াবী, চোখে চারকোনা ফ্রেমের একটা চশমা। বয়স ৩৫-এর আশেপাশে হবে হয়তো, ঠিক ঠাউর করতে পারল না মৌ। কথাবার্তা, আচার-আচরণ বেশ সাবলীল, ম্যাচিউর। এত এত যৌতুক দাবি করা সম্বন্ধ আর ছেলেদের ভিড়ে এই মানুষটা ব্যতিক্রম মনে হলো তার কাছে। সব কিছু ঠিক থাকলে এগিয়ে যাওয়াই যায়! লোকটা মাথা তুলে মৌকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে বলল, “খাচ্ছেন না যে? অন্য কিছু অর্ডার করব?”
মৌ দ্রুত মাথা নেড়ে বলল, “না না, এতেই হবে।”
খাওয়া শেষে আবারো আলাপ শুরু হলো। মিহালই আগে শুরু করল, “তারপর বলুন, মেয়ে বর্তমানে কার কাছে থাকছে?”
মৌটুসী সহসা বলল, “আমার কাছে, আর ভবিষ্যতেও আমার কাছেই থাকবে।”
এই এক কথাতেই মিহালের উজ্জ্বল মুখটা হুট করেই ফ্যাকাশে হয়ে এল যেন। কিছুটা ইতস্তত করে বলল, “কিন্তু আমজাদ চাচা তো বলেছিলেন, মেয়েকে তার বাবার কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।”
মৌটুসী অবাক হয়ে প্রশ্ন করল, “কে? ঘটক বলেছে?”
”হ্যাঁ!”
মৌটুসী একটা গভীর শ্বাস টেনে নিল। তারপর বলতে লাগল, “তাহলে উনি ভুল বলেছেন। আমার মেয়ে সারাজীবন আমার কাছেই থাকবে। এবং অবশ্যই আমার ফিউচার হাজবেন্ডের পরিচয় ধারণ করে বড় হবে। উনাকে বাবার মতোই সকল দায়িত্ব পালন করতে হবে। আশা করি বিষয়টা বুঝাতে পেরেছি।”
মিহাল কিঞ্চিৎ চিন্তিত হয়ে প্রশ্ন করল, “আপনি কি এই সিদ্ধান্তে একেবারে নিশ্চিত?”
মৌটুসী কোনো দ্বিধা ছাড়াই উত্তর দিল, “একেবারে। আপনি সময় নিন, ভাবুন—তারপর বিয়ের বিষয়ে আপনার মতামত জানান। আমি চাই না এ নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি বা ঝামেলা সৃষ্টি হোক।”
রাত দশটার দিকে মিহালের কল এল মৌটুসীর কাছে। খোলামেলাভাবেই নিজের মতামত পোষণ করল সে, মৌকে তার পছন্দ হয়েছে। তার আগের বিয়ে-বাচ্চা এসব মেনে নিতেও কোনো আপত্তি নেই। তবে আপত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে তার ছোট্ট মেয়েটা। মিহালের কথা—তার সংসারে স্ত্রী হিসেবে মৌয়ের জায়গা হলেও, চড়ুইয়ের জায়গা মিলবে না। অন্যের সন্তানের বাবা হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। তবে মিহাল এটুকু আশ্বাস দিল, চড়ুইয়ের ভরণপোষণের ভার সে নিতে পারবে, সমস্যা নেই, কিন্তু চড়ুইকে সশরীরে নিজের বাড়িতে নেওয়া সম্ভব নয়। কারণ এতে নাকি তার পারিপার্শ্বিক অনেক সমস্যা দেখা দেবে। প্রভাব পড়বে তার সন্তানের ওপর।
মিহালের মতামত শুনে মৌ হাসবে নাকি কাঁদবে বুঝতে পারল না। যেমন তার রাগে শরীর জ্বলছে, তেমনি চরম অবজ্ঞায় হাসিও পাচ্ছে খুব। হয়তো মিহালের মতো একটা শিক্ষিত মানুষের থেকে এমন সংকীর্ণ মন্তব্য আশা করেনি সে।
মিহাল নিজের অবস্থান জানিয়ে এবার মৌয়ের থেকে তার চূড়ান্ত মতামত জানতে চাইল। মৌটুসী এক মুহূর্তও দেরি না করে নির্দ্বিধায় উত্তর দিল, “মি. মিহাল, আমারও আপনার অতীত নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। তবে সমস্যা আপনার বাচ্চাটাকে নিয়ে। চলুন, আমি আমার মেয়েকে তার বাপের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আর আপনিও আপনার ছেলেকে কোনো নিঃসন্তান দম্পতির কাছে দত্তক দিয়ে দিন। ব্যাস, শোধবোধ! এরপর আমরা নতুন করে সংসার বাঁধব।”
প্রতিউত্তরে মিহাল একরাশ বিস্ময় ও বিরক্তি প্রকাশ করে বলে উঠল, “মানে কী? আপনাকে তো আমি আগেই বলেছি আমার ছেলেকে নিয়ে আপনার কোনো সমস্যা আছে কি-না? আপনি বলেছেন কোনো সমস্যা নেই! তাহলে এখন কেন মত পাল্টে যাচ্ছে?”
ফোনের এপারে মৌ একটা গভীর শ্বাস ফেলে নিজের রাগ সংবরণ করার চেষ্টা করল, তারপর তীক্ষ্ণ স্বরে বলল, “মি. মিহাল, একটা উপদেশ দিই শোনুন, আপনি আমার মতো একজন সিঙ্গেল মাদারকে চুজ না করে আনম্যারেড কোনো সুন্দরী মেয়েকেই চুজ করেন। কেননা আপনার ডিমান্ড একজন সিঙ্গেল মাদার কখনোই মেনে নিতে পারবে না। অন্তত আমার মতো মা, কোনোদিনও না।”
মিহালের প্রস্তাবকে সরাসরি না করে দিয়ে ফোন রাখল মৌটুসী। চড়ুই পাখিটা তার বাহুতে মাথা দিয়ে চুপটি করে ঘুমিয়ে আছে। মেয়েকে আরেকটু কাছে টেনে নিল মৌ। কপালে চুমু এঁকে দিল পরম মমতায়। মনের সবটুকু আক্ষেপ ঢেলে দিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, “সরি মা, তোমাকে একটা সত্যিকারের পাপা দিতে চেয়েছিলাম। একটা সুস্থ, সুন্দর পরিবার দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মা ব্যর্থ হয়েছি সোনা। এই সমাজ বড় আজব, তার থেকেও বেশি আজব সমাজের মানুষগুলো। একজন নারীকে নিজের সন্তানের মা হিসেবে গ্রহণ করার প্রস্তাব রাখে ঠিকই, কিন্তু সেই নারীর সন্তানের পিতৃত্ব স্বীকার করতে নিজের আপত্তি। কী বিচিত্র তাদের মানসিকতা!”
”কিন্তু তুমি চিন্তা করো না মা। এই বিষাক্ত সমাজের সংকীর্ণতার আঁচ আমি কোনোদিন তোমার গায়ে লাগতে দেব না। মা ঢাল হয়ে দাঁড়াব। কোনো পরিস্থিতিই আমাদের আলাদা করতে পারবে না। দরকার হলে আমরা একাই এই একটা জীবন পার করে দিব। তবুও কোনো অশুভ ছায়া আসতে দেব না আমাদের মাঝে।”
রাত পেরিয়ে গেল… শীতের সকালের ঘোর কুয়াশা না কাটতেই সরগরম হয়ে উঠেছে স্কুল প্রাঙ্গণ। শ্রেণিকক্ষের ভেতরে রঙিন দেয়াল, ছোট ছোট চেয়ার-টেবিল আর দেয়ালে টাঙানো বর্ণমালার চার্টগুলো সকালের স্নিগ্ধ আলোয় ঝলমল করছে। ক্লাসরুমের বাতাসে খুদে শিক্ষার্থীদের হাসি, চিৎকার আর দৌড়ঝাঁপের এক চঞ্চল আবহ।
সেই হইচইয়ের মাঝে ছেলের পাশে একমনে বসে আছে বোরাক শিকদার। দৃষ্টি ক্লাসের দরজার দিকে। একে একে অনেক মা তাদের সন্তানদের হাত ধরে ক্লাসে ঢুকছে, কিন্তু বোরাকের চোখ কেবল একজনকেই খুঁজে চলেছে, কাঙ্ক্ষিত সেই মুখটার দেখা নেই। এদিকে ক্লাসের সময় হয়ে এল বলে।
অভ্যাসবশত বাম হাতের কনিষ্ঠ আঙুলে থাকা প্লাটিনামের আংটিটা বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে বারবার ঘোরাতে লাগল বোরাক। অস্থিরতা কাটাতে এই টিপস দারুণ কাজের।
পাশেই বসে থাকা বীরের অবস্থাও অনেকটা বাবার মতোই—সেও অধৈর্য হয়ে নিচের ঠোঁটটা একটু উল্টে দরজার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এক পর্যায়ে ছোট্ট বীর আর অপেক্ষা করতে না পেরে বলেই ফেলল, “পাপা, মাম্মা আল চুলুই পাখি এখনো আসছে না কেন?”
”কে জানে বাবা, কেন যে তোমার মাম্মা আর চড়ুই পাখিটা আসছে না!” বোরাকের কণ্ঠে কিছুটা অস্পষ্টকতার সুর। কথাটা বলতে বলতেই প্যান্টের পকেট থেকে ফোনটা বের করল সে। ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে কল লিস্টে ঢুকল, লিস্টের সর্বপ্রথম নাম্বারটাতে ডায়াল করতেই শুনল, “পাপা! এসেছে! চুলুই পাখি, মাম্মা এসেছে!”
বোরাক চট করে মাথা তুলল। চড়ুইয়ের হাত ধরে এগিয়ে আসছে চড়ুই পাখিটা। বীর খুশিতে উঠে দাঁড়িয়েছে। বোরাক বেঞ্চের ভেতর থেকে বেরিয়ে পাশে দাঁড়াল।
চড়ুই মায়ের হাত ছেড়ে দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে বোরাকের কোমর জড়িয়ে ধরল। “পাপা!”
বোরাক কোনো ভূমিকা বাদ দিয়ে আগেই চড়ুইকে কোলে তুলে নিল। গালে স্নেহের চুমু এঁকে বলল, “স্পেরো, কেমন আছো মা? কালকে সারাদিন একবারও কথা বলোনি কেন?”
চড়ুই কিছুই বলল না। কেবল আড়চোখে মায়ের দিকে তাকাল। সে কি এখন বলবে যে, মাম্মা কথা বলতে দেয়নি? ফোন করতে বললেই বকা দিয়েছে!
ততক্ষণে মৌটুসীও এগিয়ে এসেছে। বোরাক এবার তাকে উদ্দেশ্য করে বলল, “মিস, পরশু থেকে আপনাকে কতবার কল করেছি। দেখেছেন আশা করছি!”
”সরি মি. বোরাক, একটা সমস্যার মধ্যে ছিলাম।” চড়ুইয়ের ব্যাগটা টেবিলে রাখতে রাখতে মৃদু স্বরে বলল মৌ।
”অন্তত ত্রিশ সেকেন্ডের জন্য কলটা রিসিভ করে তা বলতে পারতেন! অথবা সময় করে একটা টেক্সট!”
মৌটুসী মাথা নিচু করে বলল, “সরি। খেয়াল করিনি ওভাবে।”
”মাম্মা, বীল মিসড ইউ!”
মৌটুসী নিজের সাথে জড়িয়ে নিল বীরকে।কিছুটা সিক্ত গলায় বলল,”মি টু বাবা।”
বীর অভিমানী গলায় আবারো বলল,
”কালকে পাপা অনেকগুলো ফোন কলেছিল তোমাকে। আমি কথা বলতে চেয়েছিলাম।”
মৌটুসীর এবার সত্যিই খুব খারাপ লাগল। ভেতর থেকে কোন এক অপরাধবোধ ঘিরে ধরল তাকে। কিসের ভিত্তিতে এই ছোট্ট প্রাণটাকে কষ্ট দিল সে? অনুতাপ ঝড়িয়ে পরল তার কন্ঠে, ”সরি বাবা। মাম্মা খুব সরি।”
এভাবে টুকটাক কথা বলার মাঝেই ক্লাসের ঘণ্টা বেজে উঠল। বীর আর চড়ুইয়ের থেকে বিদায় নিয়ে একসাথে বেরিয়ে এল বোরাক-মৌটুসী। করিডোর ধরে সিঁড়ির দিকে যাচ্ছে তারা। বোরাক কিছুটা ধীর পায়ে হাঁটছে, ওর দৃষ্টি মৌটুসীর দিকে। কিন্তু মৌটুসী সামনের দিকে তাকিয়ে দ্রুত পায়ে হাঁটছে, যেন কোনো নীরবে কিছু এড়িয়ে যেতে চাইছে সে।
এই পর্যায়ে বোরাক মৃদু হেসে বলে উঠলো, “ঠিক আছেন মিস মৌ?”
ওর ঠিক সামনেই ছিল মৌ, বোরাকের কথায় কিছুটা চমকে উঠল। সামান্য থেমে ওপর-নিচ হালকা মাথা নেড়ে বলল, “হুম।”
এবার বোরাক মৌয়ের একেবারে পাশাপাশি হাঁটতে লাগল, বলল, “দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে না ঠিক আছেন।”
মৌটুসী বোরাকের দিকে না তাকিয়েই এক টুকরো কৃত্রিম হাসির চেষ্টা করে বলল, “কই? আ’ম ওকে, নো প্রবলেম।”
বোরাক এবার সহসা বলে দিল, “তাহলে অন্য দিকে তাকিয়ে কথা বলছেন কেন? আমার চোখে চোখ রাখতে আজ কেন এত জড়তা? নাকি কোনো কারণে এড়িয়ে যেতে চাইছেন?”
মৌটুসী এবারও না তাকিয়েই বলল, “ভুল ভাবছেন মি. বোরাক, কোনো জড়তা নেই। আর এড়িয়ে যাব কেন?”
বোরাক মৃদু হাসল। কণ্ঠস্বর একটু নামিয়ে বলল, “আপনি কি কোনোভাবে আপনার প্রফেশন নিয়ে সংকোচ বোধ করছেন, মিস মৌ?”
মৌটুসী এবারে থামল, সিঁড়ি পেরিয়ে মাঠের ধারে একটা গাছের নিচে এসে পৌঁছেছে তারা। “এমন কিছু না।” বলেই মাথা নামিয়ে নিল মৌ।
বোরাকও হাঁটা থামিয়ে মৌয়ের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “কিন্তু আমি তো এমন কিছুই বুঝতে পারছি।”
মৌটুসী কিছু বলল না, কেবল শক্ত করে একটা ঢোক গিলল।
গাছের গায়ে হালকা করে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াল বোরাক। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল, “আপনি ভীষণ বোকা মিস, নিজের অবস্থানটা আপনি অনুভব করতে পারছেন না। আপনার শোরুমের চাকরিটা বেছে নেওয়ার কারণ আমি জিজ্ঞেস করব না। শুধু বলব, পৃথিবীর সকল নারীর মতো আপনিও একজন নারী। কিন্তু সকল নারী আপনার মতো ‘মহীয়সী’ হয়ে উঠতে পারে না।”
মৌটুসী এবারে নিজেকে বিদ্রুপ করতে ফিক করে হেসে উঠল। মাথা নেড়ে বলল, “হাসালেন! আমি আর মহীয়সী?”
বোরাকও তাল মিলিয়ে মৃদু হাসল। “হেসে উড়িয়ে দিলেন! মহীয়সীর সংজ্ঞা জানেন?”
মৌটুসী একটু গম্ভীর হয়ে মাঠের দূর দিগন্তের দিকে তাকাল। মাথা নেড়ে বলল, “না। আপনিই বলুন, শুনি।”
”পৃথিবীর কোনো বিশেষণেরই গাণিতিক কোনো সংজ্ঞা হয় না। তেমনই ‘মহীয়সী’-এর কোনো নির্দিষ্ট সংজ্ঞা নেই। এটা উপলব্ধির বিষয়। আপনার হৃদয়ই এই স্বীকৃতি দিতে সক্ষম। যেমন—আমার কাছে পৃথিবীর সকল সিঙ্গেল পেরেন্টস একেকটা মহীয়সী। বিশেষ করে একজন একক মা। আমাদের সমাজে একজন নারী হয়ে সন্তানের জন্য একা লড়াই করাটা হলো মহা যাত্রা। ত্যাগ, সংগ্রাম, ধৈর্য, মহত্ত্ব, অকুতোভয় আর নির্ভরযোগ্য হয়ে ওঠা—একজন মহীয়সী হিসেবে স্বীকৃতি পেতে এর চাইতে বেশি আর কী লাগে?”
মৌটুসী চুপ করে দাঁড়িয়ে, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বোরাকের পানে। বোরাক বলেই চলেছে,
“এখানকার প্রতিটি শিরোনামের সাথে জড়িয়ে আছেন আপনি। মহত্ত্বের সাথে সন্তানের জন্য সংগ্রাম করছেন, আপনি তো গর্বিত মিস। অথচ আমি সেই পরশু শোরুমের ঘটনার পর থেকে লক্ষ করছি আপনার এই সুক্ষ্ম দ্বিধা, জড়তা। দৃষ্টি, চলাফেরায় হীনম্মন্যতা স্পষ্ট। এখানে শুধু আমাকে কেন্দ্র করে বলছি না; যে কারো কাছে, যে কোল পরিস্থিতিতে নিজেকে দৃঢ়, আত্মবিশ্বাসী দেখানোর চেষ্টা করবেন সবসময়। বুঝা গেল, ম্যাডাম?”
খোলা মাঠের বাতাসে মৌটুসীর অল্প ভেজা চুলগুলো উড়ছে। বুকে পড়ে থাকা ওড়নার প্রান্তটাও ছুটে যেতে চাইছে একদিকে। তার সেসবে ধ্যান নেই। সে নিবিড় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সামনে দাঁড়ানো মানুষটার গভীর চোখের দিকে।এই মানুষটাকে নিয়ে পরশু নীতির করা মন্তব্যগুলো এখন তার কাছে নিছকই ভুল বলে মনে হচ্ছে। যার ব্যক্তিত্বে এত গভীরতা, সে কোনো নারীকে কেবল নিজের প্রয়োজনে সো কল্ড ব্যবহার করার মতো সংকীর্ণ মানসিকতা রাখতে পারে—তা কোনোভাবেই বিশ্বাসযোগ্য নয়।
মৌটুসী পর্ব ২৩
তবে মনের গহীনে এখনো কেন এই দ্বিধার রেশ? থাক না তাদের এই নামহীন সুন্দর সম্পর্কটা! এতে তো কোনো ক্ষতি নেই। বরং জীবনের কঠিন পথে চলার জন্য প্রেরণা আর মনোবল জোগাতে এমন একজন দৃঢ় মানুষের সঙ্গ তার ভীষণ প্রয়োজন। তবে হ্যাঁ, এর চেয়ে বেশি কিছু প্রত্যাশা করা হবে তার নিজের জন্য চরম এক বোকামি, যা মৌ কোনোভাবেই করবে না।
