মৌটুসী পর্ব ২৯
ঋতস্বিনী মাহবিশ
হঠাৎ স্কুল থেকে একটা জরুরি তলব এসেছে মৌয়ের কাছে। ফোনে বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি, কেবল বলেছে, বাচ্চাদের মধ্যে কোনো এক ঝামেলা হয়েছে! খবরটা শোনা মাত্রই আর কালক্ষেপণ না করে অফিস থেকে হন্তদন্ত হয়ে স্কুলের অভিমুখে ছুটে চলল সে।
হেড টিচার্স রুমের একপাশে ক্লাস টিচারের কোলে চড়ে ঘাড়ে মাথা গুঁজে আছে বীর, মুখটা মলিন, অশ্রু চোখের পাতার সাথে শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। পাশেই থম মেরে দাঁড়িয়ে আছে চড়ুই, মাথার ঝুটি দুটো আউলঝাউল, মুখটা ভীষণ রকমের গোমড়া তার। আর টিচার ডেস্কের সামনের চেয়ারে বসা রাহুলের মা ছেলেকে আগলে নিয়ে বসে আছেন। ছেলেটার কপালের ডান দিকে একটা ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ লাগানো।
মৌ হন্তদন্ত হয়ে ঢুকল অফিস রুমে। দরজা দিয়ে মাকে ঢুকতে দেখেই ছোট্ট চড়ুইটা একছুটে এসে শক্ত করে মৌয়ের কোমর জড়িয়ে ধরল। —”মাম্মা!”
মৌ এক হাত দিয়ে চড়ুইয়ের পিঠে হাত বুলিয়ে ব্যাকুল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল—
—”কী হয়েছে, মাম্মা? বীর কোথায়?”
ওদিকে বীরও মৌয়ের কণ্ঠ শুনে টিচারের কোল থেকে মলিন মুখটা তুলল। ভাঙা গলায় ডেকে উঠল—
—”মাম্মা…”
মৌ দ্রুত এগিয়ে গিয়ে উনার কোল থেকে বীরকে নিজের কোলে তুলে নিল, বুকটার সঙ্গে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল কলিজার টুকরোটাকে। “বাবা কী হয়েছে? ব্যথা পেয়েছ কোথাও? মাম্মাকে দেখাও!”
“চড়ুই পাখি আল লাহুল ব্যথা পেয়েছে।” মলিন মুখেই বলল বীর।
“আহ! কোথায়? চড়ুই পাখি, কোথায় ব্যথা পেয়েছ মাম্মা? দেখাও আমাকে!”
মৌটুসীকে উতলা হতে দেখে হেড টিচার বললেন,
”ম্যাডাম, আপনি একটু শান্ত হয়ে বসুন। আপনার মেয়ে তেমন ব্যথা পায়নি, সে ব্যথা দিয়েছে। বসুন আপনি।”
মৌটুসী একটা চেয়ারে বসে চড়ুইকে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। এদিকে রাহুলের মা ভেতর ভেতর রাগে ফুঁসছেন। অগ্নিঝরা চোখে তাকিয়ে আছেন মৌয়ের দিকে। তন্মধ্যেই সেখানে শাড়ির কুচি ধরে হেলেদুলে আগমন ঘটলো নীতির। পুরো অফিস রুমে একবার চিলের মতো চোখ বুলিয়ে নিয়ে সে দৃষ্টি স্থির করল মৌটুসীর ওপর। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আলগোছে ওর পাশের চেয়ারটাতে বসে পড়ল নীতি। মুখটা মৌয়ের কাছে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক সুরে ফিসফিসিয়ে উঠল—
—”কী ব্যাপার, মিস মৌটুসী? শুনলাম, মেয়ে নাকি তার ক্লাসম্রেটের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে! তোর অভিভাবকত্বের তারিফ করতেই হয়, বল! ভালোই প্রশিক্ষণ দিচ্ছিস মেয়েকে, ফিডব্যাকও ভালো!”
নীতির এই খোঁচাতেও মৌটুসীর দৃষ্টান্তমূলক ভাবান্তর হলো না। দাঁতে দাঁত চেপে নীরবেই হজম করে নিল তা। মন দিল মেয়ের দিকে।
—”মিস্টার শিকদার, আসুন।”
দরজায় বোরাককে প্রবেশ করতে দেখে হেড টিচার বলে উঠলেন।
মৃদু উৎকণ্ঠিত বোরাক মিসকে সালাম জানিয়ে চড়ুইয়ের পাশের চেয়ারটাতে বসল। মুখে কোনো প্রশ্ন না করলেও দৃষ্টিতে গভীর প্রশ্ন তার। টের পেতেই চড়ুই পাপার কোমর জড়িয়ে ধরল, বোরাকও পরম মমতায় একহাতে আগলে নিল মেয়েকে। বীরকে তখনো মৌয়ের বুকে মুখ লুকিয়ে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে বোরাক আর তাকে নিয়ে কিছু বলল না।
পরিবেশ থিতু হয়ে আসতেই হেড টিচার কথা শুরু করলেন,
”আপনাদের যে জন্য ডাকা, সেকেন্ড পিরিয়ডে বাচ্চাদের মধ্যে একটু ঝামেলা হয়। তাদের মাঝে একচুয়ালি কী হয়েছিল তা কেউ জানি না। তবে শেষ পর্যায়ে চড়ুই রাহুলকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়, পিছনেই বেঞ্চ ছিল, ওটাতে রাহুলের কপাল কেটে যায়।”
মিসের কথা শুনে মৌটুসী ঘাড় ঘুরিয়ে অবাক চোখে মেয়ের দিকে তাকায়। গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
—”চড়ুই পাখি, মিস কী বলছেন এসব? তুমি তোমার বন্ধুকে ধাক্কা দিয়েছ?”
মায়ের মুখের এই কঠোর রূপ দেখে চড়ুই ভয়ে বোরাকের গায়ে আরেকটু সিঁটিয়ে গেল। মাখার আলুথালু ঝুঁটি দেখিয়ে ভয়ার্ত কণ্ঠে মার কাছে সাফাই গেয়ে বলল—
—”মাম্মা… রাহুল আগে আমার চুল টেনে ধরেছিল! তাই আমি…”
চড়ুইয়ের কথা শেষ হতে না হতেই মায়ের পাশে বসে থাকা রাহুল চট করে দাঁড়িয়ে গেল। অদ্ভুত দাপট দেখিয়ে এক প্রকার চেঁচিয়ে উঠল সে—
—”মিথ্যা কথা মিস! তার আগে চড়ুই আমাকে খামচি দিয়েছে!”
চড়ুই এবার রাহুলের দিকে রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে উঠল—
—”কিন্তু তুমি আমার বীর বন্ধুকে তোতলা বলেছিলে কেন? তোমাকে তো মানা করেছিলাম পচা কথা না বলতে!”
—”আমি আমার মুখ দিয়ে বলেছি! আরও একশোবার বলব। তুমি মানা করার কে?”
রাহুলের বেপরোয়া আচরণ দেখে হেড টিচার দারুণ বিরক্ত হলেন। খানিকটা চোখ রাঙিয়ে তিনি ধমকের সুরে বললেন—
—”রাহুল, চুপচাপ ভদ্রভাবে বসো বলছি!”
এদিকে রাহুলের মা এতক্ষণ ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ জমিয়ে রাখলেও এবার আর শান্ত থাকতে পারলেন না। হন্তদন্ত হয়ে দাঁড়িয়ে অশান্ত কণ্ঠে ফুঁসে উঠলেন তিনি—
”বুঝে গেছি, ছেলেকে এই স্কুলে রাখা আর সম্ভব না, যেই স্কুলে ন্যায়বিচারের বদলে ধমকে ভিক্টিমকেই চুপ করিয়ে দেওয়া হয়, সেই স্কুলে বাচ্চারা কী শিক্ষা পাবে? আমি আজই টিসি নিয়ে বাচ্চাকে অন্য স্কুলে ট্রান্সফার করিয়ে নেব।”
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠতে দেখে হেড টিচার কিছুটা নমনীয় গলায় বললেন—
—”ম্যাডাম, আপনি একটু মাথা ঠান্ডা করুন। আমরা তো পুরো বিষয়টা বিশদভাবে পর্যালোচনা করে দেখছি…”
”কিসের পর্যালোচনা? এখানে স্পষ্ট, ওই মেয়েটা আমার ছেলেকে আঘাত করে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে। অথচ আপনারা কোনো স্টেপ নিচ্ছেন না। এখানে কী তামাশা দেখার জন্য বসে আছি?”
বোরাক এতক্ষণ বেশ চুপচাপ থেকে পুরো পরিস্থিতিটা লক্ষ করছিল। তবে এই পর্যায়ে উনার আগ্রাসী আচরণ দেখে মুখ খুলল সে। বোঝানোর মতো করে শান্ত স্বরেই বলল,
”আপনি অযথায় উত্তেজিত হচ্ছেন মিস। এখানে ওরা দু’জনই বাচ্চা। আর বাচ্চাদের ক্ষেত্রে স্টেপ নেওয়ার কোনো ব্যাপার আসবে কেন? আমরা জোর তাদের বুঝিয়ে বলতে পারি, যেন পরবর্তীতে তারা উভয়ই এমন কোনো আচরণ না করে।”
বোরাকের কথা শেষ হতে না হতেই রাহুলের মা আবারও ব্যস্ত হয়ে উঠলেন,
—”কী বোঝাবেন আপনি ভাইয়া? অলরেডি তো আমার ছেলেকে আঘাত করে ফেলেছে, নিজ চোখেই তো দেখছেন কীভাবে মাথাটা ফাটিয়ে দিয়েছে! আমরা কি আদরের বাচ্চা স্কুলে পাঠাই মার খাওয়ার জন্য? ইঁচড়ে পাকা একটা মেয়ে! এই টুকুন বয়সেই মারামারিতে একদম ওস্তাদ, না জানি বড় হলে আরও কী না কী করবে!”
মেয়ের নামে এমন কটূক্তি শুনে এবার সত্যিই মৌটুসীর ধৈর্যের বাঁধ ভাঙল, রাগ মাথায় চড়ে বসল যেন। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না সে, কিছুটা ঝাঁঝ নিয়ে সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠল—
—”ও হ্যালো! কোথাকার কথা কোথায় গড়াচ্ছেন আপনি? আমার মেয়েকে জাস্টিফাই করার আগে একটু নিজের সন্তানের আচার-আচরণের দিকে নজর দিন! সহপাঠীর দুর্বলতাকে ব্যঙ্গ করে কথা বলা নিশ্চয়ই আপনার আদর্শের মধ্যে পড়ে না! এই শিক্ষা দেননি সন্তানকে! অতএব…….”
মৌটুসী রেগেমেগে আরও কিছু বলতে যাবে তখনই বীরকে আগলে রাখা হাতের ওপর আরেকটি শক্ত হাতের উষ্ণতা টের পেল সে। থমকে গেল মৌ, পেটের কথা চেপে অবাক হয়ে তাকাল সেদিকে। বোরাক আলতো করে মৌয়ের হাতের ওপর নিজের হাত রেখে ইশারায় আস্থা দিল। আস্তে করে বলল,
”শান্ত হন মৌ। আমি দেখছি।”
মৌ আস্তে করে চোখ নামিয়ে নিয়ে বোরাকের ভরসায় সম্পূর্ণভাবে চুপ হয়ে গেল।
নীতি এক পাশে দাঁড়িয়ে নীরব দর্শকের ন্যায় তীক্ষ্ণ চোখে সবটা দেখেই যাচ্ছে কেবল।
এদিকে মৌয়ের প্রতিবাদমূলক কথা শুনে আরও চটে গেলেন ভদ্রমহিলা। হেড টিচারের উদ্দেশ্যে কাটকাট বলে দিলেন,
”মিস! আপনি সুষ্ঠু বিচার করবেন, না-হয় আমাদের টিসি আমাদের দিয়ে দিবেন এক্ষুনি। চোরের মায়ের বড় গলা শোনার সময় নেই আমাদের।”
হেড টিচার অসহায় ভঙ্গিতে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন—
”ম্যাডাম, একটু ঠান্ডা মাথায় বোঝার চেষ্টা করুন। এখানে সবাই ছোট বাচ্চা। বাচ্চাদের মধ্যকার এমন ছোটখাটো ঝামেলার কী বিচার করব আমরা বলুন?”
বোরাক এবারে একটু ঘুরে বসে মহিলাটির মুখোমুখি হলো। শান্ত, সংযত কণ্ঠে বলল,
—”দেখুন মিস, আমাদের বাচ্চা একটা ভুল করেছে, আমরা কেউ তা অস্বীকার করছি না। তবে এই ঘটনার ক্ষেত্রে আপনার সন্তানও কিন্তু সম্পূর্ণ নির্ভুল নয়; সেও তার সহপাঠীকে নিয়ে কটূক্তি করেছে। তবে তারা কেউ কোনো অপরাধ করেনি যে এখানে সালিশ, বিচার বা শাস্তির প্রসঙ্গ টেনে আনতে হবে। ‘ভুল’ আর ‘অপরাধ’—এই দুটোর মধ্যে বেসিক কিছু পার্থক্য রয়েছে, যা একজন সচেতন অভিভাবক হিসেবে আপনার অন্তত বোঝা উচিত। বাচ্চারা তো মাঠে খেলতে গেলেও এর চেয়ে অনেক বেশি ব্যথা পায়, তাই না? এটা তো নিছকই ছোট বাচ্চাদের একটা দুর্বুদ্ধি, এর জন্য এত বড় কাণ্ড করে স্কুল ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কি যৌক্তিক, আপনিই বলুন?”
ভদ্রমহিলাকে বোঝানোর লক্ষ্যে বেশ কাঠখড় পোড়ানো হলো, কিন্তু তাতে লাভের লাভ কিছুই হলো না। ঘুরেফিরে তিনি নিজের সেই একঘেয়ে যুক্তিতেই আটকে রইলেন। উনার একটাই দাবি—বিচার চাই! না হলে তিনি এখনই ছেলেকে নিয়ে এই স্কুল থেকে চলে যাবেন। এমন একটি স্বনামধন্য স্কুলের সুনামের জন্য বিষয়টা মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়! এ ছাড়াও উনি যেভাবে ঘটনা বর্ণনা করছেন তা বাইরের লোকেদের সামনে করলে স্কুলের রেপুটেশন নষ্ট হবে।
অবশেষে রাহুলের বাবা এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসলেন। সব শুনে একজন স্বাভাবিক, সচেতন অভিভাবকের মতোই বিষয়টাকে একদম নরমালি নিলেন। জানালেন, ছেলেকে বুঝিয়ে বলবেন পরবর্তীতে কোনো সহপাঠীর কোনো দুর্বলতা নিয়ে ব্যঙ্গ না করতে। এ ছাড়াও স্ত্রীর এমন অপ্রতিরোধ্য আচরণের জন্য ভদ্রলোক ক্ষমাও চাইলেন।
মৌটুসীর মেজাজ চটে আছে, আর তা তার চোখ-মুখের গম্ভীর অবয়বেই স্পষ্ট। বোরাকের নিষেধ করার পর অফিস রুম থেকে এই পর্যন্ত সে একটা কথাও মুখ দিয়ে উচ্চারণ করেনি।
স্কুল ভবন থেকে বেরিয়ে মাঠের দিকে আসছিল তারা, এই পর্যায়ে হুট করেই মৌটুসী থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। চড়ুইকে নিয়ে পাশাপাশি হাঁটতে থাকা বোরাক ওকে থামতে দেখে নিজেও হাঁটা থামাল। ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস করল, —”কী হলো মৌ?”
মৌটুসী দৃঢ়তা নিয়ে বোরাকের দিকে তাকিয়ে বলল, —”মি. বোরাক, আমি চড়ুইকে শাপলা শাখায় ট্রান্সফার করাতে চাই। বীরকে করাবেন আপনি?”
বোরাক কিছুটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল—
—”হঠাৎ? সব তো মিটমাটই হয়ে গেল!”
—”কীচ্ছু মিটমাট হয়নি। মেয়েকে চিনি আমি, দেখা যাবে জেদের বশে আবারও বাচ্চাটাকে কিছু করে বসবে।”
চড়ুইয়ের ওপরই দোষ আর আপত্তি আরোপ করল মৌ। অথচ তার ভয় রাহুলকে নিয়েই।
বোরাকও একটু সময় নিয়ে বিষয়টা ভেবে দেখল, রাহুল ছেলেটা ছোট হলেও ওর আচার-আচরণ বেশ উগ্র, আক্রমণাত্মক। ভবিষ্যতে যে সে আবার বীরের দুর্বলতা নিয়ে ব্যঙ্গ করবে না, তার তো কোনো নিশ্চয়তা নেই! এমন দাম্ভিক বাচ্চার সঙ্গে ওদের এক ক্লাসে রেখে মনে সত্যিই স্বস্তি পাওয়া যাবে না!
বোরাক ভেবে খুব সাবলীলভাবেই বলল,
”আচ্ছা! তাহলে, বীর আর চড়ুইকে নিয়ে বাসায় চলে যান আপনি। আমি ওদের শাখা ট্রান্সফারের ব্যাপারে টিচারের সঙ্গে কথা বলছি। আর অফিসে যাওয়ার দরকার নেই আপনার আজকে, আমি ফোন করে বলে দেব। সাফওয়ান বীরের জামাকাপড়গুলো পৌঁছে দিয়ে আসবে।একেবারে অফিস থেকে ফেরার সময় আমি নিয়ে আসব ওকে।”
ইশ! কী অধিকারবোধ মিশ্রিত নির্দেশ! রাগের মাঝেও মৌয়ের মনে কেমন একটা পুলকিত হাওয়া বয়ে গেল যেন। বোরাকের এমন সাবলীলভাবে আদেশ করা দেখে চোখ-মুখ থেকে কাঠিন্যের রেশ উবে রমনীর ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল হালকা লাজমিশ্রিত মিষ্টি হাসির আভা।
চড়ুই আর বীরকে মৌয়ের সঙ্গে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়ে বোরাক তাদের শাখা পরিবর্তনের জন্য ক্লাস টিচারের সঙ্গে কথা বলল। সব কনফার্ম করে চলে আসার সময় পরিচিত একটা ডাক কানে এল—
—”বোরাক!”
বোরাক দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকাল। নীতিকে দেখে মৃদু হেসে বলল—
—”নীতি? কী খবর? তখন তো কথা বলার বিশেষ সুযোগই হলো না।”
—”সমস্যা নেই। বলো, তোমার কী অবস্থা?”
—”চলছে! আলহামদুলিল্লাহ।”
—”তোমার সঙ্গে কিছু জরুরি কথা ছিল বোরাক, একটু সময় হবে এখন?”
—”উমম…. হুম, বলতে পারো।” একটু ভেবে বলল বোরাক। “কোথাও বসতে হবে, নাকি এভাবেই ঠিক আছে?”
—”কোথাও বসলে ভালো হয়। ক্যান্টিনে বসা যাক?”
—”আচ্ছা, চলো।”
স্কুলের নিরিবিলি ক্যান্টিনে এসে দুটো চেয়ারে মুখোমুখি বসল ওরা। কফি অর্ডার দেওয়া হলো। সামান্য বিরতি নিয়ে নীতি একটু গলা ঝেড়ে শুরু করল—
—”বোরাক, তোমাকে একটু গভীরভাবে একটা কথা বলতে চাচ্ছি। জানি না তুমি এটা কীভাবে নেবে…”
—”এত ইতস্তত করছ কেন? বলে ফেলো, শুনি।”
—”আসলে, বীরের ক্লাসম্রেট চড়ুইয়ের মা, মৌটুসী—সে আমার আপন কাজিন হয়।”
—”তাই নাকি? ভালোই তো! পৃথিবীটা আসলেই ছোট!” বলেই বোরাক হালকা হাসল। কী চমৎকার সেই হাসি! নীতি কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে ওই হাসি দেখে নিয়ে কিছুটা মলিন মুখে বলল—
“সত্যি বলতে কি বোরাক, নিজের কাজিনের সম্পর্কে এমন একটা তিক্ত সত্য বলতে আমার নিজেরই ভীষণ লজ্জা লাগছে। কিন্তু কিছু করারও নেই, না বলেও পারছি না।”
বোরাক ভ্রু কুঁচকে সামান্য কৌতূহলী কণ্ঠে বলল—
—”কিসের সত্য, নীতি?”
নীতি গভীর একটা মেকি দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এরপর বলতে শুরু করল—
—”একচুয়ালি, শি ইজ আ টাইপ অব চিট গার্ল! ওর চরিত্র নিয়ে বলার মতো অনেক ইতিহাস আছে। আগের সংসার ভাঙার পেছনেও এই একই কারণ ছিল। ওর আগের স্বামী ভাইয়াটা ভীষণ ভালো ছিল, সহজ সরল একটা লোক ছিল, কিন্তু মৌটুসীর পরকীয়ার কারণে সেই সুন্দর সংসারটা টিকল না। পরে তো তার সেই প্রেমিকও আর বিয়ে করল না। সব নেওয়া শেষে ছেড়েছুড়ে পালিয়ে গেছে বিদেশে! এরপরেও আরও কত যে কণ্টকসম কাহিনী আছে ওর… ডিটেইলসে এখন সব বলতে গেলে দুপুর গড়িয়ে যাবে। দেখতে-শুনতে ছিমছাম ভালো তো, তাই সাধারণ ছেলেরা ওর মায়াজালে খুব সহজেই কাবু হয়ে যায়।”
একনাগাড়ে সব বলে থামল নীতি।
বোরাক নির্বিকার চিত্তে বসে মন দিয়ে নীতির সব কথা শুনল। টেবিলের ওপর রাখা হাতটার আঙুলগুলো কাঠের ওপর আলতো করে ড্রাম বাজানোর মতো টোকা দিয়ে কেবল বলল—
—”ওওও! এত কিছু তো আমার জানাই ছিল না, নীতি!”
নীতি যেন এতে কথা বলার আরও একটু সুযোগ পেয়ে গেল। বোরাকের দিকে আরেকটু ঝুঁকে এসে বোঝানোর সুরে বলল—
—”দেখো, আমার কথাগুলো হয়তো তোমার কাছে একটু বেশি মনে হতে পারে বা খারাপও লাগতে পারে। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি হিতৈষী হয়েই বলছি। গত কিছুদিন ধরে দেখছি তোমাদের ঘোরাঘুরি আর একসঙ্গে চলাফেরা। তুমি হয়তো একদম সরল মনেই ওর বাচ্চাটাকে নিজের মতো করে আগলে রাখছ, ভালোবাসছ। কিন্তু মানুষের মনের ভেতরে কী চলছে, তা তো আর ওপর থেকে বোঝা মুশকিল! তাই বন্ধু হিসেবে তোমাকে জাস্ট একটু সতর্ক করে দিতে চাচ্ছিলাম, যাতে পরে পস্তাতে না হয়।”
বোরাক দাঁড়িয়ে পকেটে দুই হাত গুঁজে দিল, মৃদু হেসে বলল—
”আচ্ছা, নীতি, তোমাকে অসংখ্য ধন্যবাদ আসল বিষয়টা ধরিয়ে দেওয়ার জন্য। কৃতজ্ঞ রইলাম, আসি তবে।”
বোরাককে উঠতে দেখে বিচলিত হলো নীতি।
—”সে কী! কফি তো এল না এখনো পর্যন্ত, এটলিস্ট কফিটা খেয়ে যাও।”
—”নসিবে থাকলে কোনো একদিন। থাকো, বাই।”
বলেই বোরাক আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। পিছু ফিরে চুলে হালকা হাত বুলিয়ে ব্র্যাকব্রাশ করতে করতে ক্যান্টিনের দরজার দিকে লম্বা পায়ে হেঁটে বেরিয়ে গেল।
এদিকে নীতি গালে হাত দিয়ে বিভোর হয়ে বোরাকের প্রস্থান দেখল।
নীতির বলা মৌটুসীর বিরুদ্ধে অপবাদগুলো বোরাকের বিশ্বাসকে কতটুকু প্রভাবিত করতে পেরেছে? এক ফোঁটাও না! শূন্য! ওর একত্রিশ বছরের দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতার লেবেল এতটাও নিচে নামেনি যে, গত এক-দেড় মাস ধরে একটি মেয়ের সঙ্গে ওঠবস করে তাকে চিনতে সে এতটা ভুল করবে।
তবে এমন না যে রমনীকে নিয়ে তার মনে কোনো রূপ খটকা নেই! বরং বহুত আছে। সে খুব ভালো করেই জানে, সে যাকে দেখছে এবং যার সঙ্গে আগামী জীবনের পথ চলার সিদ্ধান্ত নিতে চলেছে—সেই রমণীর আপাদমস্তকই রহস্যে মোড়ানো। তবে সেই রহস্যের পর্দা ভেদ করবার সময় এসেছে। আর দেরি নয়! স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথিক হিসেবে এটিও তার কর্তব্য।
দুপুরের দিকে সাফওয়ান এসে বীরের জামাকাপড় ও প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র দিয়ে গেল। সঙ্গে এসেছে টাইটানও। মূলত চড়ুই আর বীরই পইপই করে বলে দিয়েছিল তাকেও যেন সঙ্গে করে নিয়ে আসা হয়। ভীষণ রকমের বন্ধুত্ব জমেছে কিনা তাদের মাঝে! এখন এই তিনজন মিলে সারাবাড়ি হইচই করে ছুটে বেড়াচ্ছে। আর তাদের এই দুরন্ত চাঞ্চল্য দেখে খুশিতে টইটম্বুর হয়ে উঠছেন শয্যাশায়ী ছামেদ আলী। প্যারালাইজড হয়ে যাওয়া ঠোঁট দুটো বাঁকিয়ে হেসে কুটি কুটি হচ্ছেন তিনি। অচল বাঁকা হাত দুটো নবজাতক শিশুর মতো সামান্য নাড়িয়ে ওদের খুশির সঙ্গে তাল দিচ্ছেন যেন।
আজকে ছামেদ আলীকে ঘরের বাইরে বের করে খোলা বারান্দার চৌকিতে শুয়ানো হয়েছে। সপ্তাহে দুই-তিন দিন—যেদিন উনাকে গোসল করানো হয়, সেদিন বাইরের খোলামেলা বারান্দায় এনে শুইয়ে দেওয়া হয়। বাকি দিনগুলোতে অবশ্য জানালার পাশের বিছানাই হয় তার সর্বক্ষণের ঠাঁই।
মৌটুসী প্লেটে করে ভাত-তরকারি নিয়ে ছামেদ আলীর চৌকির পাশের টুলের ওপর বসল। চুলের গোড়া দিয়ে এখনো টুপটাপ পানি পড়ছে মেয়েটার। প্লেটটা এক হাতে ধরে, ঝুঁকে গিয়ে বাবার কপালে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে ডেকে উঠল—
—”আব্বা! আব্বা, ভাত খাবা না?”
গোসলের পর ঝরঝরে শরীরে ভদ্রলোকের চোখ দুটো একটু লেগে আসছিল। মেয়ের চেনা কণ্ঠস্বর কানে যেতেই সেই তন্দ্রা ছুটে গেল। চোখ মেলে প্রথমেই এদিক-দিক চোখ ঘুরিয়ে ঘরের চারপাশটা দেখে নিলেন তিনি। তারপর হাত নেড়ে অস্পষ্ট স্বরে ইশারা করে জিজ্ঞেস করতে চাইলেন—
—”পাখি দুইডা কই, আম্মাজান?”
মৌটুসী মৃদু হেসে ভাত মাখাতে মাখাতে বলল—
—”আম্মা ওদের একটু বাইরের দিকে হাঁটতে নিয়ে গেছে। এক্ষুনি চলে আসবে, তুমি খাও।”
ছামেদ আলী মেয়ের হাত থেকে প্রথম গ্রাস মুখে নিয়ে চোখ ও হাতের ইশারায় বোঝাতে চাইলেন—বিকেলে মৌ যেন ওদের ওই বাগানের বা খোলা মাঠের দিকে একটু ঘুরতে নিয়ে যায়। সারাক্ষণ বাড়িতে থাকলে মন অসুস্থ হয়ে যাবে।
মৌটুসী মৃদু হেসে বলল, “যাব, বাবা, যাব! বিকেলে তোমার পাখি দুটাকে নিয়ে ঘুরতে বের হব।”
ভদ্রলোক মুখের ভাতটুকু কোনোমতে গলাধঃকরণ করে নিয়ে কষ্টেসৃষ্টে একটা শব্দ উচ্চারণ করলেন—
—”সুহ্ পাহি! (সুখ পাখি)”
বাবার ভাঙা বুলির অর্থ বুঝে মৌটুসী ফিক করে হেসে দিল,
—”সুখ পাখি? আচ্ছা! আমার আব্বাজানের বাড়ির আঙিনায় দুইটা সুখ পাখির আগমন ঘটেছে, তাই তো?”
ছামেদ আলী মানুষটা এমনই, রসিক ধরনের। ঘুরে বেড়ানো, বাচ্চা-কাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটানো, এসব তার খুবই পছন্দের। আগে একটু সময় পেলেই সন্তানদের হাত ধরে গোটা শহর ঘুরে বেড়াতেন। বর্তমানে এই শারীরিক অক্ষমতায় পড়তে না হলে তিনি যে নাতি-নাতনীদেরও একইভাবে শহর দেখাতেন, তাতে দ্বিধা নেই কোনো।
চুপচাপ খাওয়ানোর একপর্যায়ে মৌটুসী আলতো স্বরে জিজ্ঞেস করল, “আব্বা, ঘুরতে যাবা?”
ভদ্রলোক মুখে আর আলাদা করে কিছু বললেন না, তবে তার বার্ধক্যঘেরা ক্লান্ত চোখ দুটোর চাওনি আর পলকহীন দৃষ্টিতে স্পষ্ট ফুটে উঠল দুটো ডানার ব্যাকুল আকুতি। পক্ষাঘাতগ্রস্ত শরীরের এই চার দেয়ালের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে বাইরের খোলা আকাশ আর বাতাসে ডানা মেলে ওড়ার তীব্র এক বাসনা তার মনের গভীরে।
মৌটুসী পর্ব ২৮
গোপনে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল মৌ। তবে ঠোঁটের কোণে মৃত একটা হাসি বজায় রেখেই বলল—
”আচ্ছা, এই শুক্রবারে নানিবাড়ি নিয়ে যাব তোমায়। আম্মাকেও রেখে আসব, দুই দিন থেকো সেখানে। শ্বশুরবাড়ির আদর খেয়ে এসো।”
