মৌটুসী পর্ব ৫
ঋতস্বিনী মাহবিশ
সন্ধ্যায় বীরকে পড়াতে এলেন তার টিচার। বীরের পড়ার নিয়মকানুন আবার অদ্ভুত। সাধারণ বাচ্চাদের মতো স্টাডি টেবিলে বসে বইখাতা নিয়ে পড়ার বালাই তার নেই। তার পড়ার জায়গা হলো খেলার ঘর। আর পড়ার ধরন? খেলার ছলেই বীরকে সব শেখাতে হয়।
বইয়ের পাতায় বর্ণমালা শেখার অভ্যাস বীরের নেই। প্লাস্টিকের তৈরি বর্ণমালার রঙ-বেরঙের খেলনা নিয়ে খেলতে খেলতেই বাংলা, ইংরেজি, অংক বর্ণগুলো আয়ত্ত করেছে সে। ইদানীং তাও সামান্য কিছু লেখা খাতায় প্র্যাকটিস করে, কিন্তু বাড়িতে সে বই ছুঁয়েও দেখে না। টিচারের মুখে মুখে যেটুকু শোনে, খেলার ঝোঁকে তা-ই তার তীক্ষ্ণ মস্তিষ্কে গেঁথে যায়।
তবে এতে টিচার মোটেও বিরক্ত হন না। কারণ, বীর অন্য বাচ্চাদের মতো বেয়াড়াপনা বা অতি চঞ্চলতা দেখায় না। বরং শান্ত প্রকৃতির ছেলে সে। টিচার কোনো কথা বললে বীর তা হুবহু মেনে চলে, নিষেধ করলে একদমই তা করে না। তবে তার একটাই বায়না—”আমাল সাথে খেলো।”
সে বসে নিজের মতো খেলবে, আর তার পাশে বসে টিচারকে তাকে সঙ্গ দিতে হবে। তার ফাঁকে ফাঁকেই টিচার এটা-ওটা পড়ান। আর বীরও বাধ্য ছাত্রের মতো সবটুকু পড়া শেষ করে। এই তার নিত্যদিনের পড়ার রুটিন।
সাফওয়ান, সালমার দেনা-পাওনার হিসাবটা করো তো। আজ থেকে ও আর এখানে কাজ করছে না। এখন সে কী পাবে, তার হিসাব বলো।
আশার মুখে এমন কথা শুনে সালমা যেন আকাশ থেকে পড়ল। কী করেছে সে, হঠাৎ কাজ না করার প্রসঙ্গ? সে তো বাদ দিতে চায় না কাজ। বরং এই কাজ তো তার কাছে সোনার হরিণ। বেতন বেশি, খাটুনি কম। সালমা হকচকিয়ে বিতিব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আপামণি, কি হইছে? আমি কিডা করছি?”
”অনেক বড় কিছু।” শীতল কণ্ঠে বলল আশা।
”কি কন আপামনি? দোষ না কইলে আমি বুঝমু কেমনে?”
”আজকে বিকেলে তোমাকে বীরের ঘরে পাঠালাম তার সাথে খেলবার জন্য!”
”হ! আমি তো গেছিলাম। খেলছি তার লগে।”
আশা তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে সালমার দিকে। “আর কিছু করোনি? কী ভেবেছ, এতদিন কেউ কিছু শোনে না বা জানে না বলে তোমাদের মুখোশ কখনো খুলবে না? কী দোষ করেছিল ওইটুকু একটা বাচ্চা যে তুমি তাকে ধমকাধমকি করবে?”
সালমা অপরাধীর ন্যায় মাথা নুয়ে বসে আছে।
”কী হলো বলো!”
এবার সালমা আমতা-আমতা করে নিচু স্বরে বলল,
“আপামণি, বীর বাবু খেলে না, হুদাহুদি খালি সব খেলনা নামাইয়া সারা ঘর ছড়াই-ছিটাই রাহে। হেরে বারবার বুঝানার পরেও এমন করে। খেললে নাই মানা যাইত। তাই মাথা একটু গরম হইয়া গেছিল।”
”তোমাকে যখন এখানে কাজের জন্য ঠিক করা হয়, তখন বলা হয়নি বাড়িতে ৪-৫ বছরের একটা বাচ্চা আছে?”
”হ, কইছিল তো।”
”তাহলে? একটা পাঁচ বছরের বাচ্চা ঘর এলোমেলো করবে না তো তুমি-আমি করব? ওটাই ওর কাছে খেলা। সে দিনে একবার-দুবার না, একশবার সব নামাবে; তোমাকে ঠিক একশবারই তা গোছাতে হবে। এটাই তোমার কাজ। এর জন্য তার ফ্যামিলি তোমাকে মোটা অংকের বেতন দেয়। অথচ যেখানে আমরা একটা উঁচু গলায় আমাদের সন্তানের সাথে কথা বলি না, সেখানে তুমি ওকে বকাবকি করছ! তোমার ধারণা আছে এতে সে মানসিকভাবে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে?”
সালমা এবার ভিনভিনে গলায় আকুতি করে বলল, “ভুল হইয়া গেছে আপামণি। আর এমন হইতো না। দয়া করে এই বারের মতন মাফ কইরা দেন আপামণি।”
আশা কঠোর মুখে মাথা নাড়ল। “আমার বলা শেষ, সালমা। তোমার দ্বারা আমাদের আসল কাজ হবে না। তাই বলব, তুমি অন্য জায়গায় কাজ খুঁজে নাও। যোগ্যতা থাকলে কাজের অভাব হবে না। সাফওয়ান, ওর পাওনা বুঝিয়ে দাও।”
পাশের সোফায় বসা সাফওয়ান এবার বলতে লাগল,
“আপু, মান্থলি আমরা উনাকে পনেরো হাজার টাকা দিই। গতকাল এক তারিখ ছিল। ডিসেম্বরের বেতন পরিশোধ। আজকে তো জানুয়ারির কেবল দুই তারিখ। শুরু মাসের। এখন কিভাবে…”
আশা কিছু ভাবল, তারপর বলল, “আচ্ছা সমস্যা নেই, তুমি এই মাসের পুরো টাকাটাই দিয়ে দাও।”
আশার নির্দেশমতো সাফওয়ান পকেট থেকে পনেরো হাজার টাকা বের করে সালমার হাতে ধরিয়ে দিল। টাকাগুলো হাতে নিয়ে সালমা একবার দরজার দিকে, একবার আশার দিকে করুণ দৃষ্টিতে তাকাল। কিন্তু আশার পাথুরে মুখ দেখে বুঝে গেল সে, তার কোনো অনুরোধেই আর কোনো কাজ হবে না। ইশ! একটা ভুলে এত ভালো একটা চাকরিটা হাতছাড়া হয়ে গেল! রাগে-দুঃখে চোখ টলমল করে উঠল সালমার।
আশা শান্ত গলায় বলল, “তুমি এখন আসতে পারো, সালমা।”
সালমা আর কথা বাড়াতে পারল না। কাঁপা-কাঁপা পায়ে ড্রয়িংরুম ছেড়ে মেইন দরজার দিকে পা বাড়াল সে।
সালমা উঠে যেতেই আশা সাফওয়ানকে জিজ্ঞেস করল,
“চাচিকে বিকেলে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিলে?”
”হ্যাঁ আপু।”
”কী বলল? এত অসুখের মাঝে কোমরের ব্যথা আবার কোত্থেকে?”
”কোমরের হাড় ক্ষয়ে গিয়েছে। বেড রেস্টে থাকতে বলেছে ডাক্তার। কিন্তু আম্মা তো শুয়ে-বসে থাকতেই চায় না। একটু আরাম পাইলেই কাজ শুরু করে দেয়। এখানেও যে দিনে কতবার আসতে চায়! আমি ধমকিয়ে বসে রাখি।”
”শুয়ে-বসে থেকে অভ্যাস নেই যে! তাই ভালো লাগে না। দেখি আমি কাল একপাক যাব। কড়া করে বলে আসব শুয়ে থাকতে। কদিন এখান থেকে খাবার নিয়ে যেও। আর হ্যাঁ, আরেকজন মেড-এর খোঁজ করো, একটু বয়স্ক যেন হয়।”
”ঠিক আছে আপু। আমি কাল থেকেই খোঁজ করব।”
”তুমি কি এখনই চলে যাবে?”
”কিছু করতে হবে? নাহলে যেতাম!”
”তোমার কোনো কাজ তো দেখছি না। বীরকেও তো ওর টিচার পড়াচ্ছে। এসো, খেয়ে তাহলে চলে যাও তুমি। এসো।”
”না না আপু। আমি বাড়িতে গিয়ে খেয়ে নিব।”
”কোনো কথা না সাফওয়ান, এসো। আমি রান্না করেছি।”
বলে আশা উঠে ডাইনিংয়ের দিকে হাঁটা দিল।
অগত্যা সাফওয়ান উঠে তার পিছন পিছন চলল। আশা সাফওয়ানের প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে বলল,
“সাফওয়ান, আরোয়ার দিকে একটু খেয়াল রেখো তো!”
সাফওয়ান খাবারের প্লেটের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন আপু, কিছু হয়েছে?”
”না, তেমন কিছু না। কিন্তু ইদানীং ও একটু বেশিই বাহিরমুখো হয়ে গেছে। সবসময় বাইরে, আর না হলে ল্যাপটপে পড়ে থাকে। দেখো, কখন সন্ধ্যা হয়েছে, এখনো আসার নাম নেই। বড় হয়েছে, সেভাবে তো শাসনও করা যায় না। কোথায়, কাদের সাথে মিশছে—একটু দেখো তুমি।”
”আচ্ছা আপু। আমি ড্রাইভারকে বলে দিব।”
”ড্রাইভার না, আমি তোমাকে দায়িত্ব দিচ্ছি। তুমি নিজে তদারকি করবে।”
সাফওয়ান এবার একটু হাসল। হাসিটা যে কী সুন্দর তার! মাথা নেড়ে বলল,
“আচ্ছা ঠিক আছে আপু। আমিই দেখব।”
এক লিটার গরুর দুধে দুই-তিন ফোঁটা ভিনেগার দিয়ে দুধটুকু নাড়াচাড়া করতে লাগল মৌটুসী। কিছুক্ষণের মাঝেই সেগুলো ছানা কাটতে শুরু করল। তা দেখে সানসেটের ওপর বসে থাকা চড়ুইয়ের কপাল কুঁচকে এল। তার জানা মতে, দুধ ফেটে যাওয়া মানেই নষ্ট হয়ে যাওয়া। নানির কাছে সে দেখেছে বাসি দুধ এভাবে চুলায় দিয়ে ছানা বানিয়ে নিতে। তাই এবার চড়ুই আতঙ্কিত গলায় বলে উঠল,
“মাম্মা! দুধ নষ্ট করে ফেলছ কেন? মিষ্টি বানাবে না?”
মেয়ের কথা শুনে মৌটুসী হাসল। পাতলা একটা কাপড় দিয়ে ছানার পানিটা ছেঁকে নিতে নিতে বলল,
“আজকে নষ্ট দুধ দিয়েই মিষ্টি বানিয়ে দিব চড়ুই পাখিকে।”
চড়ুইয়ের ঠোঁট উল্টে এল। “উম… না। ভালো মিষ্টি বানাও। মাম্মা…”
মৌটুসী এবার খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই চড়ুইয়ের কপালে আলতো করে একটা টোকা দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ মাম্মা। ভালো মিষ্টিই বানাব। আমার চড়ুই পাখিকে আমি পচা মিষ্টি বানিয়ে দিব? তুমি না সাদা-সাদা রসগোল্লা মিষ্টি খাবে? সেটা তো এভাবেই বানাতে হয় মাম্মা।”
”ওওওও।” চড়ুই মুখ গোল করে ঢের বুঝদারের মতো ওপর-নিচ মাথা নাড়াল।
বিকেলে মাসুমের চড়ুইকে দেখিয়ে দেখিয়ে মিষ্টি খাওয়া দেখে বাহ্যিকভাবে নিজেকে সংবরণ করে রাখলেও দিনশেষে চড়ুইও তো একটা বাচ্চা। তারও সাধ-আহ্লাদ আছে! চোখের সামনে এরকম লোভনীয় জিনিস খেলে তার ভেতরেও সেটা খাওয়ার ক্রেভিংস জাগবে, এই তো স্বাভাবিক। তবে ছোট হলেও তার ভেতরে প্রবল আত্মসম্মানবোধ। অন্য কারো সামনে হাত পাতার বা নিজের দুর্বলতা দেখানোর মেয়ে সে নয়। তার যাবতীয় আবদার, বায়না, সমস্ত দুর্বলতা কেবল তার মাম্মার জন্যই তোলা থাকে।
এদিকে মৌটুসীর রাজকন্যার মিষ্টির ক্রেভিংস হয়েছে, তা জেনেও মৌটুসী হাত গুটিয়ে বসে থাকবে? অপেক্ষা করবে সকাল হওয়ার? বাজারে যাওয়ার? নাহ্। সঙ্গে সঙ্গে ফ্রিজ থেকে দুধের বোতল বের করে গরম পানিতে ভিজিয়েছে সে। মেয়ের বর্ণনা অনুযায়ী বুঝতে পেরেছে, সে রসগোল্লার কথা বলছে। এর আগে যদিও কখনো রসগোল্লা মিষ্টি বানায়নি মৌটুসী। তবে রেসিপিটা তার জানা। রিলসে তো প্রায়-প্রায় রসগোল্লা বানানোর ভিডিও আসে! দেখতে দেখতে মুখস্থ হয়ে গেছে। এছাড়াও নিত্যনতুন রেসিপি ট্রাই করার অভ্যাস ওর আছে। এই তো সেদিন রসমালাই বানিয়ে খাওয়াল তার চড়ুই পাখিকে।
মৌটুসীর দেখাদেখি চড়ুইও অল্প করে ছানা হাতে নিয়ে তার ছোট তালু দিয়ে গোল গোল করে মিষ্টি বানাতে লাগল। যদিও বা সূক্ষ্মভাবে গোল হচ্ছে না। কিন্তু মৌটুসী তাকে নিষেধ করল না। তন্মধ্যে লালবানু বেগম সেলাইয়ের কাজ একেবারে শেষ করে উঠে এসে দাঁড়ালেন ওদের পেছনে। মা-মেয়ের কাণ্ড দেখে ভ্রু কুঁচকে বললেন, “এই রাতের বেলা মিষ্টি খেলে ভাত খাবি তোরা কোন পেটে? ভাত রয়ে গেলে ফেলে দিতাম? সকালে সেগুলাই গরম করে খাওয়াব তোগোরেক!”
চড়ুই চট করে পেছনে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল,
“নানিমনি কোন পেটে মানে? পেট তো মানুষের একটাই হয়। তোমার একটা, আমার একটা, মাম্মারও একটা, নানুভাইয়েরও একটা!”
মিষ্টির সংখ্যা খুব একটা বেশি হয়নি। মোটে দশ-বারোটা হবে। মৌটুসী আর লালবানু বেগম একটা করে খেয়েছে। ছামেদ আলীকে দুটো খাইয়ে দিল মৌটুসী। চড়ুই একবারেই খেয়েছে দুইটা, এখন আর তার পক্ষে সম্ভব নয়। বাকি পাঁচ-ছয়টার মতো ফ্রিজে রাখা হয়েছে। পরে বের করে দিবে চড়ুইকে।
প্রায় দেড় ঘণ্টা পড়ানোর পর বীরের টিচার চলে গেলেন। তিনি বেরিয়ে যেতেই আশা বীরকে ডাকতে ডাকতে দরজার পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকল, “আমার বীর সোনা কোথায়? বাবা!”
”আমি এখানে!” আশার ডাক শুনে বীর টেন্ট হাউসের ভেতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল।
আশা বীরের দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে ভুবনকে মেঝের কার্পেটের ওপর বসিয়ে দিল। ভুবনের হাতে ওর দুধের ফিডারটা ধরিয়ে দিয়ে সে বীরের দিকে এগিয়ে গেল। তারপর বসে ওকে কোলে তুলে নিয়ে ওর ফিডারটাও মুখে ধরিয়ে দিল। আশার বুকে মাথা এলিয়ে দিয়ে ফিডারের দুধ খেতে লাগল বীর। সেই সাথে এক হাত দিয়ে পায়ের মোজা টানাটানি করছে সে।
এদিকে ভুবন ফিডার রেখে হামাগুড়ি দিয়ে আশা আর বীরের কাছে চলে এল। তারপর বীরের ফিডার ধরে টানাটানি শুরু করে দিল। বীর বিরক্ত হয়ে ফিডার সরিয়ে নিয়ে বলল,
“ভুবন তুমি তোমাল মিল্কি খাও। আমালটা নিচ্ছ কেন?”
ভুবনও কম যায় না! সেও আধো বুলিতে বীরকে দিল এক ধমক। বীর ভ্রু কুঁচকে আশার দিকে তাকাল। “ভুবন খুব পঁচা ছেলে!”
এদিকে আশা ওদের কাহিনি দেখে ভেতর-ভেতর হাসতে হাসতে কুটি কুটি। হাত বুলিয়ে বীরের খাড়া সিল্কি চুলগুলো এলোমেলো করে দিয়ে বলল,
“হ্যাঁ বাবা, ভুবন পঁচা। আমার বীর বাবা ভালো, গুড বয়।”
তখনই আরোয়া ঘরে এসে ঢুকল। হাসি মুখে এগিয়ে আসতে আসতে জিজ্ঞেস করল,
“আমার বীর আর ভুবন বাবাদুইটা কী করছে?”
বীর বলল,
“আলোয়া ফুপুমনি, তুমি এসেছ? ভাল্সিটি শেষ?”
”হ্যাঁ বাবা।”
ওদের কাছে গিয়ে বসল আরোয়া। পকেট থেকে দুটো চকলেট বের করে বীর আর ভুবনকে দিল। তারপর আশার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার ফোন কোথায় আপু? দুলাভাই ফোনে পাচ্ছে না তোমাকে!”
”নিচে আছে। ওদেরকে দেখো, আমি আসছি।” বলেই উঠে চলে গেল আশা। বীর ওর চকলেটটা আরোয়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“ফুপুমনি ছিলে দাও।”
ওর দেখাদেখি ভুবনও তার চকলেট বাড়িয়ে দিল।
এরই মধ্যে ঘরের কর্নার টেবিলের ওপর রাখা ল্যান্ডফোনটি বেজে উঠল। ফোনের ক্রিং-ক্রিং আওয়াজ শুনেই বীরের চোখ চকচক করে উঠল এক প্রকার। সে জানে কে ফোন করেছে। বীরের ঘরের এই ল্যান্ডফোনটা বীর আর বোরাক শিকদারের ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যম। বোরাক কাজের ফাঁকে একটু সময় পেলেই এখানে ফোন দিয়ে বীরের সাথে কথা বলে। বীর উঠে এক দৌড় দিল সেদিকে।
”বীর আস্তে বাবা, পড়ে যাবে।”
বীর ফোন তুলে কানে ধরল। মিষ্টি করে ডেকে উঠল, “পাপা!”
ইশ! বোরাকের এক হাত আপনাআপনি বুকের বাঁ-পাশে উঠে গেল। এত শান্তি কেন এই স্বরে? বোরাকের সারাদিনের সকল ক্লান্তি, পেরেশানি, ব্যবসায়িক জঞ্জাল সব কিছু কোথাও মিলিয়ে গেল এই এক ডাক শুনেই। নিজ কেবিনে হাইড্রোলিক চেয়ারে বসে আছে বোরাক। এবার মাথাটা পেছনে এলিয়ে দিয়ে চোখ দুটো বুজে নিল। তারপর সেও পৃথিবীর সবটুকু আবেগ দিয়ে পাল্টা ডেকে উঠল,
“আযান! বাবা আমার!”
”পাপা, তুমি কখন আসবে?”
”আসব পাপা। আগে বলো আমার বাবাটা কী করছে?”
”আমি তো চকলেট খাচ্ছিলাম। আলোয়া ফুপুমনি এনেছে।”
”গুড বয়! শোনো পাপা, তুমি ফুপুমনির হাতে খেয়ে, ফুপুমনির সাথেই ঘুমিয়ে যেও, কেমন?”
”না, আমি তোমাল সাথে ঘুমাব। এসো।”
”আসব তো পাপা। কিন্তু একটু দেরি হবে যে! তোমার তো ঘুম চলে আসবে, তুমি ফুপুমনির সাথে শুয়ে পইড়ো। পাপা অফিস থেকে ফিরে তোমাকে আমার কাছে নিয়ে আসব।”
”তাহলে আমি ঘুমাবই না। তুমি আসলে তারপরই ঘুমাব।”
পাপা না আসলে বীর ঘুমাবে না বলেছিল ঠিকই। কিন্তু দশটা পার হতে না হতেই ওর চোখের পাতা জড়িয়ে আসতে লাগল। সেটা দেখে আশা ওকে বুকে জড়িয়ে কিছুক্ষণ পিঠ চাপড়ে থাকতেই বীর গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।
এদিকে বোরাকের আসার খবর নেই। যদিও এটা তার প্রতিদিনের রুটিন নয়। যত ব্যস্ততায় থাক না কেন বোরাক সন্ধ্যা সাতটার মধ্যেই বাসায় ফেরার চেষ্টা করে। তারপর সবটুকু সময় ছেলের সাথে কাটায়, তাকে খাইয়ে দেয়, গল্প করে। এবং এগারোটার মাঝেই বীরকে নিয়ে শুয়ে পড়ে। তবে আজকে আশা আছে বলে নিশ্চিন্ত হয়ে রাতেই এক জরুরি মিটিং রেখেছে বোরাক। তাই ফিরতে আজ তার এত দেরি।
চড়ুইকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে কেক ডেকোরেশন করতে বসেছে মৌটুসী। তখনই পানের বাটা হাতে লালবানু বেগম এসে বসলেন পাশে। বাটাটা সামনে রেখে সুপারি কাটতে লাগলেন তিনি। নীরবতা ভেঙে হাতের কাজ অব্যাহত রেখেই মৌটুসী জিজ্ঞেস করল,
“দুপুরে কী নিয়ে লাগছিল আম্মা?”
ভদ্রমহিলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। মৌটুসী ধরেই নিয়েছিল মা মুখ খুলবেন না, কিন্তু হঠাৎই লালবানু বেগম বলতে শুরু করলেন, “দুদিন আগে বাপের বাড়ি গেছিল, পরশু আইয়া দেখে একটা মুরগি নাকি নাই। সন্ধ্যায় খোপে ঢোকে নাই, সকালেও পায় নাই। তারপরই শুরু হইয়া গেল—আমরা নাকি হের মুরগি ধইরা খাইছি!”
মৌটুসীর হাতের কাজ থেমে অবাক হয়ে মায়ের দিকে তাকাল। বলল,
“সে গেলেও তার স্বামী তো ছিল বাড়িতে। সে জানে না আমরা খাইছি কি-না? অপবাদ দেওয়ার সময় কোথায় ছিল তোমার পাঠা?”
মৌটুসী পর্ব ৪
লালবানু বেগম অত্যন্ত নির্বিকার ভঙ্গিতে সুপারিতে চুন মাখাতে মাখাতে বললেন,
“ঘরেই আছিল, পরে বাইর হইয়া গেছে।”
নিজের বড় ভাইয়ের প্রতি ঘৃণায় চোখমুখ কুঁচকে এল মৌটুসীর। ব্যথিত চিত্ত চিরে বেরিয়ে এল কিছু ঘৃণিত উপমা, “কাপুরুষ একটা! মাগীর ভাউরা। পুরুষ জাতের কলঙ্ক।”
