Home যাত্রাপথ যাত্রাপথ পর্ব ৪০

যাত্রাপথ পর্ব ৪০

যাত্রাপথ পর্ব ৪০
মাশফিত্রা মিমুই

পৃথিবী থেকে সুবহান আলী শাহ বিদায় নিয়েছেন আজ তিনদিন। তবু কোথাও কিছু থেমে নেই। আগের মতোই রোদ উঠছে, আকাশ ফুঁড়ে বৃষ্টি নামছে, বর্ষ পঞ্জিকার তারিখ বদলাচ্ছে, সিদ্দিকের চায়ের দোকানেও লেগে আছে ভিড়। বাড়ির ভেতরকার পরিবেশ রোজকার মতো স্বাভাবিক।
বিকেলে বড়ো চাচা দুই ভাইকে কাচারি ঘরে ডেকে পাঠালেন। গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,“কাইল তগো বাপ মরার চাইরদিন, মেলা করতে হইবো।”
নাজির নিশ্চুপ। নওশাদ তার নীরবতা দেখে বললো, “আপনারা গুরুজনেরা তো আছেনই, যা ভালো মনে করেন তাই করেন।”

“তা তো করমুই। সামিউল আর তোর বড়ো চাচীরে দিয়া ফর্দ বানাইয়া সব আব্বাস আর শাহরিয়াররে আনতে পাঠাইয়া দিছি। গেরামের সবাইরে ডাইল, ভাত খাওয়ামু।”
“একটা মানুষ এতকাল জীবন মরণের লগে যুদ্ধ কইরা কয়দিন আগে মরছে, হের লাইগা গেরামবাসী গো খাওয়াইতে হইবো ক্যান? উৎসব লাগছে?” নাজির বলে উঠলো কথাটা।
আমিরুল শাহর হাস্যোজ্জ্বল মুখখানায় বিরক্তির আভা দেখা দিলো। বললেন,“এইডা সমাজের নিয়ম। মানুষ মরলেই চাইরদিনের দিন, চল্লিশার দিন মিলাদ পড়ায়, লোক খাওয়ায়। তোর লাইগা কী নিয়ম বদলাইবো? উল্টা মাইনষে পিঠ পিছে কথা কইবো।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“বলুক, আমগো কী? এত বছরে তো একটা খোঁজও কেউ নেয় নাই। এহন মেলা খাইতে আইবো? শরম করবো না?”
“বেশি কথা কইস না। সবকিছুতে তোর বাড়াবাড়ি। এই যে কথায় কথায় আমগো বিরুদ্ধে যাস, সবার সামনে অপমান করোস তাও আমি তগো সাথ ছাড়ছি কহনো? আমগো জায়গায় অন্য কেউ চাচা হইলে খবর আছিলো।”
নাজির তর্কে জড়ালো না, মৌন রইল। আমিরুল শাহ বললেন,“গরুর গোশ, সাদা ভাত, ডাইল আর লেবু, শসা; এই হইলো আয়োজন। কিছু করার নাই। না খাওয়াইলে সমাজে চলতে পারমু না। পাছে লোকে কিছু কইবো। লোকের কথা খুব খারাপ, নাজির। হেগো মুখ বন্ধ করতে অনেক কিছুই বাধ্য হইয়া করা লাগে।”
নাজির আরো কিছুক্ষণ চুপ থাকলো। বললো,“যা করার করেন। যা খরচপাতি হয় তার হিসাব কিতাব কইরা আমারে কইয়েন। ট্যাহা না হয় দিয়া দিমু।”
কথাটা শুনে আমিরুল শাহ অবাক হয়ে বললেন,“তুই দিবি?”

“হ, আর কেডায় দিবো? বাপ তো আমারই। নওশাদ আছে, আব্বাস ভাইয়ের লগে না হয় ওয় যাইবো।”
এখানেই কথার সমাপ্তি ঘটিয়ে উঠে চলে গেলো নাজির। চাচার থেকে বিদায় নিয়ে নওশাদও ভাইয়ের পিছু ছুটলো। আমিরুল শাহ চুপচাপ বসে রইলেন। বাবা হারিয়ে ছেলেটা একেবারে শান্ত হয়ে গিয়েছে। যা বলা হচ্ছে তাই মেনে নিচ্ছে। এই নাজিরকেই তো তিনি এতকাল দেখতে চেয়েছিলেন!
নওশাদ পিছুপিছু হাঁটছে। নাজির তার উদ্দেশ্যে বললো,“হেগো হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলাবি না, আর সরাসরি না কওয়ারও দরকার নাই। হেইদিন ভূমি আফিসে গিয়া তো সব নিজের চোখেই দেখলি। আরো অনেক কিছু দেখার আছে। মিলাদ শেষ হোক তারপর এক জায়গায় লইয়া যামু। আপাতত যেমন আছোস তেমন সাইজাই থাক।”
নওশাদ মাথা নাড়ালো। নাজির পুনরায় বললো, “এনেই থাক। শহরে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন নাই। আমার ক্ষেত, খামারের দেখভাল কর, হিসাব রাখ। বউয়ের লগে সব ঝামেলা মিটাইয়া ফেল। সংসার করলে এনেই করতে হইবো। আব্বার ঘর পরিষ্কার করা শেষ, এই ঘরে আইয়া পড়।”

“ভেবেছিলাম রেজাল্ট বের হলে চাকরি পরীক্ষা দেবো।”
“এই দেশে চাকরি কইরা লাভ নাই। চত্বর বাজারের এক মুদি দোকানদার আছে, হের পোলায় আইয়ে পাস করার পর বিদেশ পাঠাইয়া দিছে। মাসে ভালা রোজগার করে। এই তো গত বছর বড়ো একটা বাড়ি করছে, গেছে মাসে শহরে জমি কিনছে। সপ্তাহ পার হোক, তার লগে কথা কইয়া তোরেও পাঠাইয়া দিমু। হেরপরে কামাই রোজগার কইরা দেশে সম্পদ গড়ার পর এনে থাকবি নাকি বিদেশ থাকবি হেইডা তোর ব্যাপার।”
“বিদেশ যেতে অনেক টাকা লাগে, ভাই। আমার ইচ্ছে ছিল মাস্টার্স করার।”

“যত ট্যাহা লাগে লাগুক, আমি ব্যবস্থা করমু। মাস্টার্স করতে হইলে বিদেশ গিয়া কর‌। তবু এই দেশে থাকার দরকার নাই। আর হ, পাঁচ বছরের মধ্যে সব ট্যাহা আমারে শোধ কইরা দিতে হইবো। যা দিমু ধার দিমু।”
চুপচাপ মেনে নিলো নওশাদ। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এই ধরণের বৃত্তির সুযোগ রয়েছে। অনেক সিনিয়ররাও উচ্চ শিক্ষার জন্য দেশের বাইরে চলে গিয়েছে। কদিন পর দুজন বন্ধুও নাকি যাবে। নওশাদের অবশ্য ইচ্ছে ছিল কিন্তু অর্থ আর সমর্থনের অভাবে মনের ইচ্ছে মনেই চেপে রেখেছিল সে। তবে এবার যেন তা পূরণ হওয়ার পথে। ভাই তার মনের কথাগুলো এত সহজে বুঝে যায় কীভাবে?
দুপুরের রোদ ফিকে হয়ে গিয়েছে। অবেলায় গোসল সেরে ঘরে আসতেই ভাত নিয়ে স্ত্রীকে বসে থাকতে দেখলো নাজির। গায়ে শার্ট জড়িয়ে বললো,“মেলা কাম পইড়া রইছে, এহন খামু না।”
মিছরি ভাত বাড়লো। বড়ো মাছের টুকরোটা দিয়ে বললো,“রাতে ঠিকমতো খাননি, সকালে তো কিছু মুখেই তুলেননি। এভাবে না খেয়ে কীভাবে চলবে? শরীরের সব জোর কমে যাবে। আপনার মতো এত শক্ত সামর্থ্য মানুষের সেবা করা কী আমার পক্ষে সম্ভব?”

“করতে হইবো না সেবা। এসবে আমার অভ্যাস আছে। দুই তিনদিন না খাইয়া থাকলে কেউ মরে না।”
ভাতের থালা নিয়ে বসা থেকে উঠে এলো মিছরি। ঝোল দিয়ে মাখিয়ে এক লোকমা মুখের সামনে ধরে বললো,“আপনি বেশি কথা বলেন। হা করুন তো।”
“তুমি খাও। জোর কইরো না, মনমেজাজ এমনিতেই ভালা না। কী না কী কইয়া দিমু পরে কানবা।”
সেকথা শুনলো না মিছরি। পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে উঁচু হয়ে স্বামীর মুখের মধ্যে ঠেসে দিলো বিশাল এক ভাতের লোকমা। নাজির চুল আঁচড়ে সবে ঘুরেছিল। স্ত্রীর আচমকা দুরন্তপনায় চমকালো, মুখ মেখে গেলো এঁটোতে। বিছানায় সে বসে পড়ল। মিছরির ওড়না টেনে মুখটা মুছতে মুছতে ধমকালো,“কত্ত বড়ো সাহস মাইয়ার! গিন্নীগিরি দেখানো হইতাছে?”

“দেখানোর কী আছে? আমি তো গিন্নীই। নাজির শাহর একমাত্র গিন্নী।”
সামান্য হাসলো নাজির। অবাধ্য না হয়ে বাধ্য ছেলের মতো হা করল। ছেলেটাকে হাসতে দেখে স্বস্তি পেলো মিছরি। খেতে খেতে নাজির বললো,“কার লগে তর্ক করছো? চিল্লাচিল্লি হুনলাম একটু আগে।”
“আপনার ভাবির সাথে।”
“ক্যান?”
“সবসময় অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি করে, যেন আমরা বিনে পয়সায় তাদেরটা খাই। খাবার আনতে গেলে মেপে মেপে অল্প ভাত দেয়, উচ্ছিষ্টের মতো তরকারি দেয়। আজ নিজ থেকে নিতে যাওয়ায় প্রত্যেকবারের মতো এক কথা, তিনি খাবার বেড়ে দিবেন।”
“তুমি কী কইছো?”

“প্রথমে জিজ্ঞেস করেছি, আমি বাড়লে সমস্যা কোথায়? সঙ্গে সঙ্গে তিনি বললেন, আমি নাকি বেশি নিয়ে ফেলবো, পরে সবার কম পড়বে। আমি সবার থেকে বেশি খাই।”
“তারপর?”
“অনেক এদের তালবাহানা শুনেছি, সম্মান করেছি তবে আর নয়। তাই বলে দিয়েছি, আমি আপনার স্বামী বা শ্বশুরের পয়সায় খাই না যে আপনি ধরে ধরে হিসাব রাখবেন। আমাদের যতটা প্রয়োজন তার থেকেও বেশি আমার স্বামী বাজার করে। তাই আমার যতটুকু ইচ্ছে ততটুকুই খাবার খাবো। যা করার করে নিন।”
মুখের খাবার চিবোতে চিবোতে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল নাজির। শেষ লোকমা মুখে তুলে দিয়ে মিছরি জিজ্ঞেস করল,“আরো আনবো?”
“না, পেট ভইরা গেছে। এইবার তুমি খাও।”
“আর কথাগুলো? ঠিক বলেছি না?”
মৃদু হেসে উঠে দাঁড়ালো সে। মাথা নাড়িয়ে বললো, “এক্কেবারে ঠিক কইছো। এইবার মনে হইতাছে, নাজির শাহর বউ।”
আলমারি থেকে কী যেন একটা নিয়ে ঘর থেকে বের হলো নাজির। মিছরি এবার নিজে খেতে বসলো। গত কয়েকদিনের ঘটনা আর দাদা, বাবার কথায় শাহ বাড়ির লোকগুলোর উপর থেকে তার ভয়, সম্মান সব উঠে গিয়েছে। কোথা থেকে যেন অদ্ভুত এক সাহসের সঞ্চার হয়েছে। এইটুকু একটা মেয়ে ঠিকই বুঝতে পেরেছে, এই বাড়িতে টিকে থাকতে হলে মাথা উঁচু করে, গলার জোর আর বুদ্ধিতে টিকে থাকতে হবে।

নওশাদ আর আব্বাস মিলে জেলা শহর থেকে গিয়ে বাজার করে এনেছে। কোনো কিছুর কমতি নেই সেখানে। সকাল হতেই নাশতা সেরে বাড়ির মেয়ে বউরা বসেছে বিভিন্ন কাজে। কেউ মশলা বাটছে, কেউ কুটনো কাটছে, কেউ আবার গোশত ধোয়ার কাজে নেমে পড়েছে। আশেপাশের মহিলারা এসেও হাত লাগিয়েছে সেই কাজে। সবার মধ্যে চলছে নানান গল্পগুজব।
মিছরি বসে বসে শসা, লেবু কাটছে। মর্জিনা জিজ্ঞেস করলেন,“তোমার ছুডো জা কই? আইলো না তো।”
কী উত্তর দিবে বুঝতে পারলো না মিছরি। এই বিষয়ে নাজির তাকে জানায়নি কিছু। জিজ্ঞেস করার সুযোগ পায়নি। তবুও কিছু একটা বলতে যে হবে তা সে ঠিক জানে। তাই বললো,“বাবার বাড়িতে।”

“এনে শ্বশুর মরছে, তার মেলা করতাছে আর হেয় বাপের বাড়ি পইড়া রইছে? এইডা কেমন মাইয়া মানুষ?”
কলিমের মা কথা কেড়ে নিলেন,“আমার তো মনে হয় নওশাদের লগে ঝামেলা হইছে। মাইয়া তো এমনিতেও সুবিধার না। বাপ-মায়ের কথায় নাচলে কী আর সংসার চলে? এইডা লইয়াও দেখবেন লোকে কত কথা কইবো।”
ফরিদা বললেন,“কইবো মানে? কওয়ার বাকিও নাই। ওই বাড়ির সেলিমের মা-ই তো কাইল জিগাইলো।”
“কী আর করবেন, ভাবি? শাহ বাড়ির সব মানসম্মান সুবহান ভাইয়ের পোলা দুইডাই ডুবাইতাছে।”
“শুধু পোলা না, বাপ কী কম আছিলো? কীর্তিকলাপ তো কম করে নাই। মাস্টার বাড়ির কাছে মাইর খাইয়া ওই বাড়ির মাইয়াই পোলা দিয়া ধরাইয়া আনছে। সবই লোভ।” হঠাৎ সবার মাঝখানে কথাটা বলে উঠলো বিথী।
মর্জিনা চাপা স্বরে ধমক দিলেন,“তুমি নাজিরের বাপ সম্পর্কে কতটুকু জানো? বাড়ির বউ বউয়ের মতন থাকো। বয়স্ক গো মতন খালি পাকনা পাকনা কথা।”

কলিমের মা বললেন,“ভুল কী কইছে গো, ভাবি?”
মর্জিনা কিছু বলার জন্য ঠোঁট ফাঁক করতেই মিছরি বলে উঠলো,“শুনেছি আপনি নাকি স্বামীর সংসার করতে পারেননি, তালাক হয়েছিল? কেন হয়েছিল? ঘরের কাজকর্ম তো ভালোই পারেন। পাক্কা গৃহিণী, চরিত্রে দাগও নেই, তবুও কেন?”
কলিমের মায়ের অধরের হাসি ঝট করে নিভে গেলো। মাসটা কার্তিক হলেও ললাটে জমেছে আষাঢ়িয়া মেঘ। এমন একটি কথা অনাকাঙ্ক্ষিত মানুষের মুখে কেউ আশা করেনি যেন। পেঁয়াজ ছিঁলে শেষ করে আদা ছিঁলতে লাগলো মিছরি। একপলক তাকালো মহিলার মুখের দিকে। বললো,“অনেকদিন ধরেই প্রশ্নটা মাথায় ঘুরছিল কিন্তু সময় সুযোগের অভাবে জিজ্ঞেস করা হয়নি। তবে আপনি বলতে না চাইলে সমস্যা নেই।”
মহিলা আর কথা বললেন না। হাতের মুঠো শক্ত হয়ে গেলো তাঁর। তাও মিছরির নজর এড়ালো না। ঠোঁট টিপে হাসলো সে। একেবারে জায়গামতো দিয়েছে। তাও যেন মন ভরলো না। কুচুটে মহিলাটা এখনো পর্যন্ত তাকে কম অপমান তো আর করেনি! তাই শেষ আরেকটা খোঁচা দেওয়ার উদ্দেশ্যে বলেই ফেলল, “আচ্ছা, কলিম কী আপনার আর আপনার স্বামীরই সন্তান?”

কলিমের মা এবার তেতে উঠলেন,“কী কইতে চাও তুমি? কেমন প্রশ্ন এইগুলা?”
মিছেমিছি মুখ ভার করল মিছরি,“রাগ করবেন না, চাচী। আমি তো এমনি জিজ্ঞেস করলাম। মানে, বাপ কীভাবে নিজের সন্তান ত্যাগ করতে পারে? আর আপনার বাবা-মা? আপনি যদি সৎ হন তাহলে তারাই বা কেন আপনাকে এবং আপনার সন্তানকে গ্ৰহণ করেননি?”
কলিমের মা জবাব দিতে পারলেন না। বিভিন্ন বয়সী এতগুলো মানুষের সামনে চক্ষু লজ্জা আর রাগে চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। আঁচলে সেই অশ্রু মুছে মাথা নিচু করে চাল বাছতে লাগলেন। মর্জিনা বললেন,“সমাজ বইল্যা একটা শব্দ আছে। এর জটিলতা তুমি বুঝবা না। সব বাপ, পুরুষ একরকম হয় না। কিছু কিছু বাপ আর পুরুষ অমানুষও হয়। ধইরা নেও তেমন কিছুই কলিমের মায়ের কপালে পড়ছে।”
কথাটা বলে অনেকক্ষণ চুপ রইলেন মর্জিনা। তারপর বললেন,“সবার সামনে সব কথা কইতে নাই। অন্যের চোখে পানি আইয়া পড়ে এমন কথা তো আরো না।”

“এটা যদি আপনারা বুঝতেন!” দীর্ঘশ্বাস ফেলল মিছরি।
ভ্রু কুঁচকে নিলেন তিনিসহ বাকি নারীরাও। বিথী বললো,“কয়দিন ধইরা তোমার মুখে একটু বেশিই খই ফুটতাছে না? ব্যাপার কী? বেশি বাড় বাড়লে কিন্তু ঝড়ে মুখ থুবড়াইয়া পড়বা‌। এইডা শাহ বাড়ি।”
চমৎকার হাসলো মিছরি। কোমল স্বরে বললো,“ঝড় আমার কিছুই করতে পারবে না। আমার স্বামী আছে না? সে ঠিক ধরে নেবে।”
“হ, তোমারই শুধু স্বামী আছে। আমগো তো নাই।”
“থাকবে না কেন? নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু আমার স্বামীর মতো নয়।”
“ক্যান? তোমার স্বামী এমন কী করতে পারে যা আমগো স্বামী পারে না?”
“আমার স্বামী কখনো রাতের আঁধারে নেশা করে এসে আমার গায়ে হাত তোলে না। পরনারীর কাছেও যায় না। তারচেয়েও বড়ো কথা তিনি যথেষ্ট সৎ। অন্য কারো অর্থ, সম্পদ কব্জা করেও খায় না।” বলেই চট করে মাথা তুলে বিথীর দিকে তাকালো মিছরি।

বিথী হতভম্বতার সহিত আশেপাশে একপলক তাকিয়ে দেখলো সবাইকে। তার মতো করে ফরিদার মুখের রং ও বিবর্ণ হয়ে গেলো। কথাগুলো তাদেরকে খোঁচা মেরেই যে বলা হয়েছে বুঝতে আর বাকি রইল না। মর্জিনা ফিক করে হেসে দিলেন। বাকিদের তাড়া দিয়ে বললেন,“তাড়াতাড়ি হাত চালাও তোমরা। বেলা হইয়া যাইতাছে, রাঁধুনি আইয়া পড়ব। নামাজের পরে সবাই খাইতে বইবো কিন্তু।”
জায়ের উপর ফরিদার সন্দেহ হলো। এসব কথা ওই মহিলা ছাড়া আর কে শেখাবে একে? তাঁরই তো মনে মনে যত হিংসা!

সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো। রাঁধুনির রান্না সময়মতোই শেষ হলো। যহরের নামাজ শেষে সবাই চলে এসেছে শাহ বাড়ির দোরগোড়ায়। তাদের নিয়ে বসানো হলো নির্দিষ্ট স্থানে। তবে মাস্টার বাড়ির সবাইকে নিমন্ত্রণ করলেও উপস্থিত হয়েছে শুধু কাশেম আলী, নজরুল আলম আর মাসুম। মৃত মানুষের নাম করে লোক খাওয়ানো নামক মিলাদ আকবর মিয়ার পছন্দ নয়। নাতিগুলোও হয়েছে তাঁর মতোই। বাকিরাও আসতো না শুধু নাজিরের কথা ভেবেই এসেছে। ফতেহ আলী শাহর দুই পুত্রকে তাঁরা বিশ্বাস করে না। বাপ মরা শোকাতর ছেলেটাকে না আবার কোণঠাসা করে দেয়! আর মাসুম এসেছে বোনের জন্য। আবার কবে না কবে দেখা হয়!
তাদের নিয়ে গিয়ে টেবিলে বসালো নওশাদ। বাকি ভাইরা সবকিছুর তদারকি করছে, সবাইকে বেড়ে খাওয়াচ্ছে। নাজির সেসবে আজ আর গেলো না। দূরে দাঁড়িয়ে চুপচাপ শুধু দেখতে লাগলো। এদের কর্মকান্ড তার বিরক্ত লাগছে, যেন তার পিতার মৃত্যুতে চারিদিকে খুশির জোয়ার ভাটা বসেছে। সেই ভাবনার মধ্যে কোন ফাঁকে এসে যে পাশে দাঁড়ালো মাসুম, সেই খেয়ালই হলো না। খেয়াল হলো তখন যখন পাশ থেকে তীরের মতো ছুটে এলো একটি প্রশ্ন,

“কী অবস্থা তোর? ঠিক আছোস?”
ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো নাজির। মাসুমের দৃষ্টি দিকহীন কোথাও। অপ্রস্তুত হলেও স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর দিলো,“ক্যান, কী হইবো? আমি সবসময়ই ভালা।”
“চাপা!”
“এনে কী করোস? ভিতরে যা, পরে ভাগে আর পাইবি না।”
“নিজেরে শক্ত রাখ। ‘জন্মাইলে মরিতে হয়’ কথাটা চিরন্তন সত্য। যত দুর্বল হবি ততই এই দুনিয়াতে টিকা থাকা মুশকিল। দুর্বলতা তোর লগে যায় না।”
“জ্ঞান দেওয়া সহজ কিন্তু এমন পরিস্থিতি পার করা সহজ না। জন্মের পর থাইক্যাই বাপ-মা, ভালা দাদা, চাচা পাইছোস তো তাই বুঝবি না কিছু।”
“এতে আমার কোনো হাত নাই। সবই ভাগ্য। আল্লাহ যে কহন, কারে, কেমনে পরীক্ষায় ফেলায় তা বুঝা বড়োই মুশকিল। তবে এমন পরিস্থিতি আমি পার না হইলেও তুই ঠিকই হইছোস। তাই তোর অভিজ্ঞতা বেশি, দুনিয়া সম্পর্কে জ্ঞান বেশি, উপস্থিত বুদ্ধি ভালা, যেকোনো পরিস্থিতিতে নিজেরে সামলাইতে পারোস। এমন কিছু যে হইবো তা তো আগে থাইক্যাই জানতি।”

নাজির আর উত্তর দেয় না। অন্যদিকে চলে যায়। বাবা ছাড়া এই বিশাল বাড়িটা তার ফাঁকা ফাঁকা লাগে। রোজ নিয়ম করে দুবেলা খাবার খাওয়াতে যাওয়া, মন খারাপ হলে নিজের মতো বকবক করা আর কখনো হবে না। তবুও মৃত্যু পরবর্তী জীবনে লোকটা ভালো থাকুক, শান্তিতে থাকুক। এতটুকু দোয়া সে আল্লাহর কাছে করে। এই দুনিয়ার বদলে যেন তিনি জান্নাত পান।

যাত্রাপথ পর্ব ৩৯

খাওয়া শেষে একে একে সবাই চলে গেলো, পুরোনো কত কথা নিয়ে হাসিঠাট্টা করল‌। সিরাজ উল্লাহ, আমিরুল শাহ, মুমিনুল শাহ, আতাউর, দেলোয়ার সবাই মিলে পান খেতে খেতে গল্পে মেতে উঠলো। অথচ যেই উদ্দেশ্যে আজ এত আয়োজন তার কিছুই হলো না। কেউ ভুল করেও মৃত লোকটির নাম উচ্চারণ করল না, স্রষ্টার দরবারে হাত তুলে একটু দোয়া করল না। পরিশেষে, আল্লাহ ছাড়া আর কেউ আপন নয়।

যাত্রাপথ পর্ব ৪১