Home যাত্রাপথ যাত্রাপথ পর্ব ৪২ (২)

যাত্রাপথ পর্ব ৪২ (২)

যাত্রাপথ পর্ব ৪২ (২)
মাশফিত্রা মিমুই

আমিরুল শাহ গভীর রাতে বাড়ি ফিরলেন। ফটক পেরিয়ে উঠোন পর্যন্ত পৌঁছাতেই মেজো ভাইয়ের ঘরের সামনে স্ত্রীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে পথিমধ্যে থেমে দাঁড়ালেন।
“রাইতের বেলা একলা একলা এনে দাঁড়াইয়া রইছো ক্যান?” প্রশ্ন করে এগিয়ে গেলেন তিনি। আশানুরূপ উত্তর পাওয়ার পূর্বে আচানক দরজা খুলে বেরিয়ে এলো সিরাজ উল্লাহ। পরনে পোশাক নেই, লুঙ্গির অবস্থা বিপদ সীমার কাছাকাছি। আতঙ্কিত গলায় বললো,“বুবু, মাগী তো নড়েচড়ে না। মইরা গেছে নাকি?”

উপস্থিত সকলে আঁতকে উঠলেন। ফরিদা দৌড়ে গেলেন ঘরে। তাঁর পিছুপিছু এলেন আমিরুল শাহও। খাটের দিকে চোখ যেতেই কিছু মুহূর্তের জন্য নিস্তেজ হয়ে গেলো তাঁর সারা দেহ। বস্ত্রহীন বিভৎস নারীদেহ পড়ে আছে বিছানায়। ভয়ার্ত চোখ দুটো খোলা। বেশিক্ষণ আর সেদিকে তাকিয়ে থাকতে পারলেন না তিনি। ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে বারান্দার মধ্যেই গড়গড় করে বমি করে দিলেন। ফরিদা সেই দেহে চাদর টেনে দিয়ে নাড়ি পরীক্ষা করলেন। হঠাৎ খাড়া থেকে বসে পড়লেন মেঝেতে। নিজের শরীরটাই বোধহয় ভয়ে অসাড় হয়ে আসছে। কম্পিত কণ্ঠে বললেন,“এইডা কী করলি, সিরাজ? শ্বাস চলে না, নাড়ি কাম করে না। হেয় তো মইরা গেছে। কী হইবো এহন?”
আতাউর রহমানও ঘরে প্রবেশ করেছেন। কপালের ঘাম মুছে বললেন,“আমি এইসবে নাই। ধরি নাই, ছুঁই নাই দোষের ভাগিদার হমু ক্যান? তোমরা বুইঝা লও। গেলাম আমি।”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

সিরাজ উল্লাহ তাকে টেনে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে বললেন,“তুমি প্রত্যক্ষদর্শী। বিপদে ফালাইয়া এমনে তো যাইতে পারো না। বেশি লাফালাফি করতাছিলো মাগী। কহন যে হইলো? এহন এইডার ব্যবস্থা কর। আমি এইসব ঝামেলায় ফাঁসতে চাই না।”
আমিরুল শাহ পেট ধরে ঘরে এলেন। হুঙ্কার ছেড়ে বললেন,“হের লগে কী করছো তোমরা? মইরা গেছে মানে? আতাউর এনে ক্যান? সুবহান কই? মেজো বউ! ওই মেজো বউ?”

আতাউর রহমান দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সব ঘটনা শুনে থম মেরে গেলেন আমিরুল শাহ। কেমন প্রতিক্রিয়া করবেন বুঝে উঠতে পারলেন না। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুই ভাই-বোনের দিকে তাকালেন। দুদিকে মাথা নেড়ে বিড়বিড় করলেন,‘এত নিষ্ঠুর, খারাপ তাঁরা হতে পারে না।’ ফ্যালফ্যাল করে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে আচমকা গিয়ে চেপে ধরলেন স্ত্রীর গলা,“কালনাগিনী! নারী হইয়া কেমনে করতে পারলি এইডা? হায় আল্লাহ! এ কোন বেজন্মা ধইরা আনছিলাম বাড়ি! আমগো সব শেষ কইরা দিলো। এ তুই কী করলি, ফরিদা বানু?”
সিরাজ উল্লাহ দুলাভাইকে টেনে বোনের কাছ থেকে সরালো। ধমকের সুরে বললো,“চুপ থাহেন মিয়া। আমনে বুঝি ভালা মানুষ? সম্পদের লোভে পয়দা করা বাপরে জানোয়ারের মতো মারছেন। এহন ভালা মানুষি দেহান? লাশের ব্যবস্থা করতে হইবো, আতাউর। আমি ফাঁসলে কিন্তু সবাইরে লইয়া ফাঁসমু কইয়া দিলাম।”

আমিরুল শাহ মাটিতে বসে পড়লেন। দেহখানা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, মাথা কাজ করছে না। এমন কিছু কখনো তিনি ভাবেননি। পাশের ঘর থেকে বাচ্চাদের কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। চিৎকার করে ডাকছে,“মা, মা!”
ফরিদা টেবিলের উপর থেকে চাবিটা তুলে নিয়ে বললেন,“আমি গিয়া পোলাপাইন দুইডারে সামলাই। তোরা এর ব্যবস্থা কর। ভুল একটা হইয়া গেছে, এহন আর কী করার?”
বাইরে পা রাখতেই খচখচ আওয়াজ শোনা গেলো। ফরিদার ললাটে ভাঁজ পড়ল। শব্দের উৎস আন্দাজ করে ভিটের পেছনের দিকে যেতেই অবাক হলেন।দেয়ালের সাথে মিশে দাঁড়িয়ে আছে মোতালেব আর তাঁর স্ত্রী জমেলা। তৎক্ষণাৎ আতঙ্কিত হয়ে চিৎকার করে তিনি ডাকলেন,“সিরাজ! সিরাজ!”

সিরাজ উল্লাহ দৌড়ে এলেন বাইরে। কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মানুষ দুটোকে দেখে যা বোঝার বুঝে গেলেন। চেপে ধরলেন বয়স্কর ঘাড়। হুমকি স্বরূপ উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন,“কী দেখছোস, চাকরের বাচ্চা? এতক্ষণ ধইরা এনে দাঁড়াইয়া মজা নিছোস? তোরাও মরতে চাস? সবাইরে মাইরা দিমু আইজকা।”
ভয়ে নিচে বসে পড়লেন মোতালেব। জমেলা আকুতি মিনতি করে বললেন,“কাউরে কিচ্ছু কমু না, বাজান। ছাইড়া দেন আমগো। এই বাড়িত আমরা বহু বছর ধইরা কাম করি। কিছু কইরেন না।”
ফরিদা ফিসফিস করে ভাইয়ের কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন,“হেগোরে কামে লাগাইয়া দে। একলগে এতকিছু করতে গেলে মাইনষে সন্দেহ করবো, পুলিশ আইবো বাড়িত। তার থাইক্যা ওগো দিয়া খেলা শেষ কর। হেরপর না হয় মুখ বন্ধ করা যাইবো।”

বুদ্ধিটা সিরাজ উল্লাহর পছন্দ হলো। খুনের দায় একা কেন বহন করবেন তিনি? সেই নিশুতি রাতেই বদ্ধ ঘরে শলা পরামর্শ হলো। আমিরুল শাহ চুপচাপ শুধু শুনলেন। কিন্তু নিজের দুর্বলতার শিকলে বাঁধা পড়ে অপরাধগুলো দেখে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করতে পারলেন না। মিথ্যা, অন্যায় বড়ো খারাপ জিনিস। একবার এর আশ্রয় নিলে পূর্বের বলা মিথ্যা, অন্যায় ঢাকার জন্য বারবার একই পথ অবলম্বন করতে হয়।আমিরুল শাহ সেই গ্যাড়াকলেই পড়েছেন। যেখান থেকে বের হওয়ার আর উপায় নেই।
নাজির, নওশাদকে নানাভাবে ভুলিয়ে সামিউলের ঘরে নিয়ে ঘুম পাড়াচ্ছেন ফরিদা। তাই ঘটনাস্থলে আপাতত তিনি অনুপস্থিত। বাকিরা লাশটাকে বস্তাবন্দি করছে। কাপড় দিয়ে প্যাঁচিয়ে ভরার সময় বাইরে থেকে হাঁক শোনা গেলো,“নাজিরের মা! ও নাজিরের মা! কই গেলা? দেহো, কত্ত বড়ো ইলিশ আনছি। আইজ আমি তোমারে ইলিশ রাইন্ধা খাওয়ামু। কই গো!”

এক ডাকেই যে নারী ঘর থেকে ছুটে চলে আসে আজ আর সে এলো না। ঘর থেকে সাড়া দিলো না। সুবহান আলী শাহর অধরের হাসি মিলিয়ে যায়। দেরি হলো বলে কী বউ রাগ করেছে? চিন্তিত হলেন তিনি। স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়া তো দূরে থাক সামান্য ধমকটুকুও আজ পর্যন্ত দেননি তিনি। এত সুন্দর, নম্র, ভদ্র, সাংসারিক মেয়েকে কী ধমক দেওয়ার প্রয়োজন আছে? মাছটায় আগুন ছুঁইয়ে বারান্দার বেঞ্চে রাখলেন। ঘরের দরজায় হাত রাখতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলেন আমিরুল শাহ।
আচমকা নিজের ঘরে বড়ো ভাইকে দেখে অবাক হলেন ভদ্রলোক। প্রশ্ন ছুঁড়লেন,“তুমি এই ঘরে কী করো? নাজিরের মায় কই?”

কী উত্তর দেবেন বুঝে উঠতে পারলেন না আমিরুল শাহ। শোনা গেলো সিরাজের কণ্ঠস্বর। ভাইকে সরিয়েই ভেতরে প্রবেশ করলেন সুবহান আলী শাহ। হারিকেনের হলদে টিমটিমে আলোয় সবটা পরিষ্কার। সিরাজ, আতাউর মিলে প্রবল চেষ্টায় চটের বস্তায় বন্দি করছে একটি নারীদেহ। হাত থেকে টর্চ লাইটটা মাটিতে পড়ে গেলো। স্ত্রীকে চিনতে অসুবিধা হলো না সুবহান আলীর। দৌড়ে গিয়ে ওই অবস্থাতেই ঝাপটে ধরলেন। দেহটা হয়তো খানিক দোলাচল খেয়ে গেলো। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে নিস্তেজ, প্রাণহীন মুখের দিকে তাকিয়ে ডাকলেন,“নাসরিন! আমার নাসরিন, কী হইছে তোমার? ও বউ! এমনে তাকাইয়া রইছো ক্যান? আমার নাসরিনের কী হইছে? ওয় কথা কয় না ক্যান? ওর শরীরের কাপড় কই? ওর লগে কী করছো তোমরা?”

একনাগাড়ে প্রশ্ন করছেন, ডাকছেন তিনি। কিছু সময়ের ব্যবধানে শান্তশিষ্ট লোকটা হয়ে উঠেছেন উদ্ভ্রান্ত, পাগলপ্রায়। তবুও নাসরিন উঠলো না, নড়লো না। আতঙ্কিত খোলা চোখ দুটো কেউ বন্ধ করার প্রয়োজন মনে করল না। সিরাজ উল্লাহ বিশ্রী ভঙিতে বললেন,“সুন্দর একটা মাইয়া মানুষ আমনে একলাই ভোগ করবেন? আমিও একটু আইছিলাম স্বাদ নিতে। কিন্তু….মইরা গেলো। আমার ছোঁয়া এত খারাপ?” সাথে নোংরা গালি দিয়ে গা দুলিয়ে হেসে উঠলেন।
সুবহান আলী শাহ থমকে গিয়ে মাথা তুলে তাকালেন। নাসরিন নেই, নাসরিনের গায়ে পরপুরুষের স্পর্শ লেগেছে ভাবতে পারলেন না। ভাবার শক্তিটুকুও দেহে পাচ্ছেন না। যখনি মস্তিষ্কে ধরা দিলো তাঁর প্রিয় নারী, তাঁর ভালোবাসা, জীবনসঙ্গিনীর উপর দিয়ে ভয়াবহ, পৈশাচিক কিছু বয়ে গিয়েছে, সে আর এই পৃথিবীতে নেই তখনি ভয়ংকর হয়ে উঠলেন তিনি। ঝাঁপিয়ে পড়লেন অধম ওই জানোয়ারের উপর। শক্ত হাতে ঘুষি মেরে রক্তাক্ত করে ফেললেন মুখমন্ডল। মাটিতে ফেলে দিয়ে উপরে বসে গলার টুটি চেপে ধরে বললেন,“শুয়োরের বাচ্চা, বান্দীর বাচ্চা, আমগো বাড়িত থাইক্যা, আমগো খাইয়া পইড়া আমগো লগেই ধোঁকা! তুই এই নোংরা হাত দিয়া আমার নাসরিনরে ছুঁইছোস? তোরে আমি খুন করমু, কু**। তগো সবার মুখোশ খুইল্যা দিমু। আমার নাসরিন!”
দুর্বল দেহে কি শক্তি তাঁর! কেউ ছাড়াতে পারলো না। ভারী কণ্ঠে বললেন,“ভাইজান, তুমি কেমনে পারলা? তোমার কষ্ট হইলো না? নিজের রক্তের লগে বেঈমানি কেমনে করলা, ভাইজান? আব্বারে খুন করলা, এহন আবার আমার নাসরিনরে?”

চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন তিনি। আমিরুল শাহ দরজায় হেলান দিয়ে নীরব দাঁড়িয়ে রইলেন শুধু। আজ তাঁর কিছু বলার নেই, কিছু ভাবার নেই।লোকটা আসলেই বেইমান, লোভী। সুবহান আলীকে একচুল সরাতে না পেরে আতাউর সরে গেলেন। সিরাজ উল্লাহর শ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে। পায়ের গোড়ালি মাটির ঘর্ষণে ছিঁলে রক্ত বের হচ্ছে। ঠিক তখনি শক্ত কিছু জোরে আঘাত করল শক্তিশালী লোকটার মাথায়। সুবহান আলী শাহ ধীরে ধীরে মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। মাটি ভিজে উঠলো রক্তে। সিরাজ উল্লাহ গলা ধরে উঠে বসলেন। হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন,“কি জোর এই বলদার গায়ে! এত রাগ করার কী আছে? দুনিয়াত কী বউয়ের অভাব?”
সামনে তাকাতেই চমকালেন। দাঁড়িয়ে আছে মুমিনুল শাহ। হাতে কাঠের পিঁড়ি। বিরক্ত হয়ে বললেন,“ভুল না হয় একটা কইরাই ফেলাইছি। তার লাইগা এহন তগো সবারই দেইখা ফেলাইতে হইবো, সাক্ষী হইতে হইবো? সমস্যা কী, বাপ? লাশ গুম করার পর আইলে কী হইতো? তোর বউয়ের লগে তো কিছু করি নাই। এত জঞ্জাল এহন আমি কেমনে সাফ করমু?”
মুমিনুল শাহ মৃদু হাসলেন,“আমি আর চেয়ারম্যান ভাই আছি না? আমনের লাইগা এতটুকু সহযোগিতা না হয় কইরা দিমু।”

“তুই করবি? তোর ভাবির লগে এমন করলাম হের পরেও?”
“কীয়ের ভাবি? আগে নিজের ফায়দা। আমি তো সবসময় বড়ো ভাইজানের পক্ষের লোক। তয় একটা শর্ত আছে। আব্বার ব্যবসার ভাগ আমার লাগবো। শাহ গো সবকিছু অর্ধেক অর্ধেক অর্থাৎ দুই ভাগ হইবো।”
আমিরুল শাহ অবাক চোখে ছোটো ভাইকে দেখছেন। আজ তিনি টের পাচ্ছেন, বাবার কথাই সেদিন ঠিক ছিল। বাবার মতো আসলেই তিনি মানুষ চেনেন না। এই যে এত এত ভয়ানক অমানুষের সঙ্গে বসবাস করতে করতে কখন যে নিজেও অমানুষ হয়ে গেলেন তাও কী বুঝতে পেরেছিলেন? সামান্য লোভে পড়ে কী অন্যায় করে ফেললেন? সেই অন্যায় ঢাকতে আরো কত অন্যায় যে করতে হবে! অথচ সেদিন পিতার কথা শুনলে হয়তো আজ এখানে তাকে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো না। বললেন,“সুবহান এত সহজে কী সব ছাইড়া দিবো?”

“বাঁচলে তো ছাড়বো।”
“মানে?”
মুমিনুল শাহর হাসি চওড়া হলো। আতাউর যেন তার কথাটা বুঝে গেলেন। বললেন,“আমি এইসবে নাই। তগো লগে আওয়াই আমার ভুল হইছে।”
“তাইলে গদি ভুইল্যা যান। গেরামের মাইনষেরে এমন উষ্কানি দিমু না! আইজকার কথাও কইয়া দিমু। আমনের আব্বায় জানলে কী হইবো জানেন তো?”
চুপসে গেলেন তিনি। শাহদের অর্থ বিত্তের অভাব নেই। এদের বিরুদ্ধে গেলে নিজেরই ক্ষতি। সিরাজ উল্লাহ হেসে বললেন,“তোরেও তো আমি এতকাল বলদা ভাবছিলাম। কিন্তু তোর তো গাঁটে গাঁটে বুদ্ধি রে, মুমিন!”

মুমিন কিছু বললেন না। সেই রাতেই সবার চোখের আড়ালে শাহ বাড়িতে হয়ে গেলো মস্ত বড়ো সব অপরাধ। অথচ কেউ টের পেলো না, জানলো না এক নারীর সতীত্ব হারানোর গল্প, দুঃখ, লাঞ্ছনা। কেউ জানলো না, কত কষ্টেই না এই পৃথিবী থেকে সে চির বিদায় নিয়েছিল। জানলো না, স্ত্রীকে হারিয়ে মৃত্যু যন্ত্রণা সহ্য করে দীর্ঘ বছর বেঁচে থাকা এক পুরুষের কথা। যে ছলনার শিকার হয়েছিল নিজের আপন মানুষদের দ্বারাই।
পুরোনো স্মৃতি মনে করে বৃদ্ধা হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। শাড়ির আঁচলে মুখ গুঁজে কাঁদলো দূরে বসে থাকা পুত্রবধূও। ভয়ানক কিছু শোনার জন্য নাজির নিজেকে প্রস্তুত করেই এখানে এসেছিল। কিন্তু এতটা ভয়ানক হবে এমন কল্পনা সে কোনোদিন করেনি।
পাশে বসে থাকা উদাস নওশাদের চোখেও অশ্রু, মুখমন্ডলে বেদনার ছাপ। বোঝ হওয়ার পর থেকেই যে মাকে সে ঘৃণা করে এসেছে, সেই মায়ের সাথে হওয়া অন্যায়ের কথা জানতে পেরে নিজের উপরেই জন্মালো তার চরম ঘৃণা।
নওশাদ বুক চেপে কান্না জড়ানো গলায় বললো,“সব মিথ্যা, বলেন সব মিথ্যা। আমি বিশ্বাস করি না এই কাহিনী। কেমনে কী? ওরা আমাদের মাকে!”

কথা জড়িয়ে যায়, এলোমেলো হয়ে একসময় থেমে যায় নওশাদ। কিছু বলার মতো অবস্থাতে সে নেই। নাজির জিজ্ঞেস করল,“তারপর কী হইছে? আমার আম্মার কবর কই? আমনেরা জানেন নিশ্চয়ই?”
বৃদ্ধা দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বললেন,“কবর দেয় নাই। সেই রাইতেই বস্তায় ভইরা নদীতে ভাসাইয়া দিছে। তুমগো আব্বারে কুপাইয়া ওইখানেই ফালাইয়া রাইখা আইছিল। হেরও হেইদিন মরার কথা আছিলো, কিন্তু ভাগ্যে হয়তো আছিলো অন্যকিছু। আমগোও কিছু করার আছিলো না। তিনডা পোলা আমগো, লগে দুই জামাই বউ। হেগো কথা না হুনলে আমগোও হয়তো ওইদিন এই হালই হইতো। আমার সোয়ামি অনেক আফসোস আর অপরাধবোধ লইয়া মরছে। মরার আগেও আমার হাত ধইরা কানছে। পারলে তারে মাফ কইরা দিও।”
“কেউ জানলো না? কেউ না? অপরাধ করা এত সহজ? সেই লাশও কারো চোখে পড়ল না? পুলিশ তদন্ত করল না?” নাজির জিজ্ঞেস করল।

“কেডায় জানবো? শাহ বাড়ি বিশাল বড়ো। ভিতরে চিল্লাইলেও শব্দ বাহিরে যায় না। লাশ ভাসলেই কী? তহন দেশে ঝামেলা চলতাছিলো। রোজই কেউ না কেউ মরে, নদীর পাড়ে কঙ্কাল, মরা মানুষ ভাইসা উডে। পানি খাইয়া হয়তো লাশে পঁচন ধরছিলো। কেউ হয়তো পাইছে, দাফন করছে আবার না ও করতে পারে।”
পাল্লায় হেলান দিয়ে চোখ বুজলো নাজির। কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল কয়েক ফোঁটা অশ্রু। তার মা কত কষ্টই না করেছে! অথচ কেউ জানলো না। কেউ তার জন্য দোয়া করল না, সে দীর্ঘ একুশ বছর বাঁচলো ঘৃণায়। তাদের মা হারা করল কারা? যাদের সে আপন ভেবেছিল। বিশেষ করে সেই ফরিদা, যাকে সে ঠাঁই দিয়েছিল নিজ মাতৃস্থানে। এত বছর ধরে এত অভিনয় কীভাবে করে গেলো ওই মহিলা? কি নিখুঁত সেই অভিনয়! কাঁচের দেয়ালের মতো সব বিশ্বাস চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে গেলো। নওশাদ কাঁপছে। দু’দিন আগেই সে নিজের ভালোবাসার মানুষকে হারিয়েছে, আর আজ মুখোমুখি হয়েছে ভয়ানক সত্যের। কাঁপতে কাঁপতেই বললো,“ওদের আমি খুন করবো, খুন। ভাই, ভাই, ওরা কীভাবে করতে পারলো এসব? জানো, আমি মাকে অনেক ঘৃণা করেছি। আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছি। আব্বার কাছে যাইনি। কারণ চাচা বলেছিল তার জন্য নাকি আব্বা নিজে দায়ী। অথচ ওরা আমাদের আব্বা, আম্মাকে! কষ্ট হয়নি একটু? নিজের আপন ভাইকে কীভাবে?”

নাজির উত্তর দেয় না। সে জানতো, চাচারা তাদের ত্যাগ করেছিল। দুঃসময়ে পাশে থাকেনি। তাই তাদের সে ঘৃণা করতো। কিন্তু এখন! ঘৃণার পরেও কী আর কোনো শব্দ আছে? বৃদ্ধা নাক টেনে বললেন,“মাফ কইরো, বাজান। আমরা কিচ্ছু করতে পারি নাই। এই জায়গায় সপ্তাহ খানেক পরেই পলাইয়া আইছিলাম। তবুও নিস্তার পাই নাই। কত যে হুমকি ধামকি দিছে! তা থাইক্যা বাঁচতেই মুখ বন্ধ কইরা রাখছিলাম। কিন্তু মনে রাইখো, দুনিয়াতে ওরা যা করছে সবকিছুর বিচার আল্লাহ করবো। অভিশাপ লাগবো ওগো গায়ে।”
একসময় ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলো নওশাদ। ছেলেটা বাচ্চাদের মতো মুখ ধরে কাঁদছে। কাঁদছে না শুধু নাজির। ভেতরে তার ঝড় বইছে। সব সত্য এখন তার সামনে উন্মোচিত। এত এত সত্য আর দুঃখ সে বহন করবে কীভাবে? নওশাদকে সঙ্গে আনার উদ্দেশ্য একটাই; সত্যটা জানানো।
নওশাদ এখনো বিলাপ করছে। নাজির তাকে একটি মানবহীন ফাঁকা স্থানে নিয়ে বসালো। পানি এনে খাওয়ালো। দুই কাঁধ চেপে ধরে বললো,“এই বিষয়ে কাউরে কিছু কইবি না। নিজেরে সামলা, নওশাদ।”

“ওরা আমাদের আব্বা, আম্মার জীবন শেষ করে দিয়েছে। তাদের খুন করেছে। তারপরেও তুমি নিজেকে সামলাতে বলছো?”
“তো কী করবি?”
“ওদেরকে খুন করবো। সবাইকে সত্যটা জানিয়ে দেবো।”
“পারবি খুন করতে?”
নিস্পৃহ দৃষ্টিতে তাকায় নওশাদ। নাজির বলে,“ওরা আমগো দাদারেও মারছে। দোষ চাপাইছে আকবর মিয়ার উপরে‌। হুঁশে আয়, নওশাদ। উপরে আল্লাহ আর নিচে আমরা ছাড়া আমগো আর কেউ নাই। কেউ আমগো আপন না, ভাই। আমগো পথ থাইক্যা সরাইয়া দিতেও ওগো সময় লাগবো না। কী করবি তুই? ওরা একলা না। ওরা দুই ভাই একলগে। ওগো পোলারা সম্পর্কে আমগো চাচতো ভাই হইলেও আমগো বিরুদ্ধে যাইতে সময় লাগবো না। চেয়ারম্যান আছে, হের ক্ষমতা কম? সিরাজ উল্লাহরও দুই পোলা। যারা আমগো বাপ-মা, দাদারে মাইরা ধামাচাপা দিতে পারে, মাস্টর বাড়ির উপরে সমস্ত দোষ চাপাইয়া দিতে পারে তাগো লাইগা আমগো দুই আগাছা উপড়ানো কোনো ব্যাপার?”

“তাহলে? সব জেনেও চুপ থাকবো? ওদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবো?”
“হ, করতে হইবো। ওরা পারলে আমরা ক্যান পারমু না?”
“ভাই!”
“ওরা যদি জানে আমরা সব জাইনা গেছি তাইলে সব শেষ, নওশাদ‌। প্রতিশোধ নেওয়ার লাইগাও তো আমগো মধ্যে কাউরে বাইচ্চা থাকতে হইবো নাকি?”

যাত্রাপথ পর্ব ৪২

নওশাদ দুর্বল মাথাটা নামিয়ে ফেলে। নাজির তাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দেয়। বড়ো ভাই হিসেবে তার কত দায়িত্ব! ছেলে হিসেবেও দায়িত্ব বেড়ে গেলো। অথচ তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য কেউ নেই এই পৃথিবীতে। মিছরি আছে, কিন্তু মেয়েটা অবুঝ। তাকে নিজের দুঃখের ভার, দুর্বলতার কথা নাজির কখনো জানাতে চায় না।

যাত্রাপথ পর্ব ৪৩