যাত্রাপথ পর্ব ৫১
মাশফিত্রা মিমুই
‘শীতের মধ্যে বৃষ্টি’ ব্যাপারটা অদ্ভুত না? এই অদ্ভুত ঘটনাটাই আজ ঘটছে। হাড় কাঁপানো শীতের মধ্যে ভোর রাত থেকে ঝুমঝুম আওয়াজে টিনের চালে বৃষ্টি পড়ছে। কলিমের মা আধ ভেজা হয়েই বৃষ্টির মধ্যে চলে এসেছেন শাহ বাড়ি। হাত গুটিয়ে ঘরে বসে থাকার মতো জীবন যে তাঁর নয়। পেট চালাতে হবে। তাও আবার এক পেট নয়, দু দুটো পেট। দড়িতে ঝুলে থাকা গামছাটা নামিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বললেন, “হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হইলো ক্যান? অসময়ের বৃষ্টি ভালা না। এই বছর মনে হয় মাঘ মাইয়া শীত পড়ব।”
ফরিদা বারান্দায় বসে অন্যমনস্ক হয়ে চাল বাছছেন। কোথায় কী হচ্ছে, কে কী বলছে সেদিকে মনোযোগ নেই। ভাইটা ঘুম থেকে উঠেই ছাতা মাথায় চলে গেছে বাড়ি। ওদিকে গত রাতে যে কী হলো বুঝতে পারছেন না।মনে হচ্ছে যেন কোনো এক গোলকধাঁধায় আটকে পড়েছেন। সোহেল আচানক কোথায় চলে গেলো? নাজিরটাই বা বাড়ি ফিরে এলো কেন? আর মিছরি! সে তো সব জেনে গিয়েছে, জেনে গিয়েছে ফরিদার আসল রূপ। এবার কী হবে? সবই কী কাকতালীয়? নাকি পরিকল্পনা? এত বছরের সাজানো দাবার গুটি কী তবে!
“ভাবি, কই মরছেন?”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
কলিমের মায়ের ডাকে ভাবনা কেটে গেলো ফরিদার। লাফিয়ে উঠলেন কিছুটা,“কী জানি কইতাছিলি?” বলতে বলতে সজাগ দৃষ্টিতে তাকালেন নাজিরের বন্ধ দরজার পানে। কলিমের মা বললেন,“আইজ না বলে নাজমুলে বউ লইয়া বাড়ি ফিরবো? আমনের মন কই থাহে? কী কাম করতে হইবো কন না ক্যান? উঠান, খোপ তো আইজ ঝাড়ু দেওয়া যাইবো না। এত কুটুম আইবো, আয়োজন করতে হইবো না?”
“আব্বাসে বাজার কইরা আনবো। গতকাল বিকালে ফর্দ দিছি। পোলাওর চাইল, আদা, রসুন, পেঁয়াজ, মরিচ, মসলাপাতি সব ঘরে আছে। এইগুলা গুছাইয়া ফেলা।”
কলিমের মা বসে রইলেন। এই বাড়ির বড়ো ভাবিকে আজ অদ্ভুত লাগছে। জিনিসপত্র ঘর থেকে না এনে দিলে গোছাবে কী করে? নাজিরের বন্ধ ঘরের দরজা হঠাৎ খুলে গেলো। ফরিদা লাফিয়ে উঠলেন। শকুনি দৃষ্টিতে তাকালেন সেদিকে।
নাজির বেরিয়ে এলো। বৃষ্টি দেখে বেজায় খুশি হলো। হাত বাড়িয়ে চাল থেকে গড়িয়ে পড়া পরিষ্কার পানি দিয়ে বাসি মুখে ঝাপটা দিলো। ঘর থেকে মাজন এনে আঙুলের সাহায্যে দাঁত মাজতে মাজতে কলিমের মায়ের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করল,“নওশাদে এহনো ফিরে নাই?”
“না দেহি, আমি তো মাত্রই আইলাম। হঠাৎ কইরা বৃষ্টি নামছে। হেয় আবার কই গেছে?”
“আমার পুসকুনির মাছ জানি কেডায় চুরি কইরা লইয়া যায়, তাই ওয় আর মিল্টনে মিল্যা সারা রাইত পাহারা দিছে। কইছিলাম ফজরের আজান দিলে বাড়িত আইয়া পড়িস, এহনো দেহি আইয়ে নাই।”
ফরিদা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ছেলেটার দিকে। হাবভাব বোঝার চেষ্টা করছেন বোধহয়। নাজির ইচ্ছে করে ওই মহিলার দিকে তাকাচ্ছে না। তবে যা বোঝার বুঝে গেলো। ছাতা মাথায় উঠোন পেরিয়ে চলে গেলো সে কলপাড়। হাত-মুখ ধুয়ে কল চেপে টিনের বালতি ভরে পানি এনে রাখলো বারান্দায়। সাথে আরেকটি খালি বালতি এনে রাখলো চাল দিয়ে গড়িয়ে পড়া পানির নিচে।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ডাকলো,“বউ, আইয়ো মুখ ধুইয়া যাও।”
ডাকার কিছুক্ষণ পর টলতে টলতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো মিছরি। জ্বর একটুও কমেনি। বরং তাপমাত্রা আরো বেড়েছে। ততক্ষণে নাজির ভাতের চাল ধুয়ে চুলায় বসিয়ে দিয়ে কলিমের মায়ের উদ্দেশ্যে বললো, “আমার বউয়ের জ্বর আইছে, ভাত রাইন্ধা দেন তো, চাচী। আলু কয়টাও সিদ্ধ কইরা দিয়েন। ঝাল ঝাল ভর্তা ভাল্লাগবো।”
কলিমের মা আজকাল আর বউটার নামে নিন্দা বা কটু কথা বলেন না। পাছে নাজির জেনে গেলে! তার উপর মেয়ের মুখও চলে বেশি। তাই চুপচাপ রান্নাঘরে চলে গেলেন।
বারান্দার একপাশ ভেজা। মিছরি ধীরে ধীরে দাঁত মাজলো। নাজির তার দিকে মগ ভর্তি পানি এগিয়ে দিয়ে বললো,“আস্তে আস্তে কুলি করো। দুগা ভাত খাইয়া জ্বরের ওষুধ খাইতে হইবো।”
মিছরি শুধু মাথা নাড়ায়। কুলি করতেই গামছা দিয়ে তার মুখ মুছিয়ে দেয় নাজির। অনেকক্ষণ পর ফরিদা বলে ওঠেন,“ওর কপালে এইডা কী হইছে?”
তারা দুজনেই দূরের সিঁড়িতে বসে থাকা ফরিদার দিকে তাকালো। ঘৃণায় চোখ সরিয়ে নিলো মিছরি। মহিলার কণ্ঠস্বর আর চোখে জ্বলজ্বল করা ভয় দেখে স্ত্রীর পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে নাজির উত্তর দিলো, “আর কইয়েন না, খাটের কোণায় বাড়ি খাইছে।”
“এমনি এমনি?”
“না, আমনে বলে আইয়া দিয়া গেছিলেন?”
“মা…মানে?” অপ্রস্তুত হলেন ফরিদা।
নাজির উঠে দাঁড়ালো। মুখ বাঁকিয়ে বললো,“আমনের হাবভাব তো সুবিধার লাগতাছে না। কাইল রাইত থাইক্যা দেখতাছি, চোরের লাহান মতিগতি। করছেন কী?”
“কী করমু? এমনি জিগাইলাম।”
ফরিদা বসা থেকে উঠে গেলেন। ঘরের দিকে যেতে যেতে বললেন,“রান্ধা শেষ হইলে আমার কামগুলা শেষ কইরা দেইস, কলিমের মা। জিনিসপাতি বাহির কইরা রাখতাছি।”
কলিমের মা মুখে কিছু বললেন না। ভাতের সাথেই আলু দিয়েছিলেন সেদ্ধ করতে। সেগুলো ভাত থেকে আলাদা করে পাতিল উপুড় করলেন। মিছরিকে ঘরে পাঠিয়ে নাজির এসে দাঁড়ালো রান্নাঘরের সামনে। সবার হাতের ধরা ছোঁয়া খাবার সে খেতে পারে না। তাই বললো,“বাকি কাম আমি কইরা নিমু, চাচী। আমনে যান এহন। আইজ তো আবার অনেক মেমান আইবো।”
“হ, ভাবিরে তো কহন ধইরাই কইতাছি সব জোগাড় যন্ত্র কইরা দিতে। হুনলোই না। এহন দেহি গিয়া।”
ভাতে সেঁকা দিয়ে পাতিল ঘরে নিয়ে রাখলো নাজির। পেঁয়াজ কুচি করে কেটে তাতে পোড়া মরিচ, লবণ, সরিষার তেল একত্রে মাখিয়ে করল আলু ভর্তা। তারপর বড়ো একটা থালায় খাবার বেড়ে নিয়ে চলে এলো ঘরে। খাটের সাথে হেলান দিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে বসে আছে মিছরি। এক রাতের ব্যবধানে মেয়েটার সৌন্দর্যে যেন ভাটা পড়েছে। চোখের কোটর ডেবে গিয়েছে। নাজির সামনে এসে বসে গ্লাসে পানি ভরে একপাশে রাখলো। ভাত মাখিয়ে মুখের সামনে ধরে বললো,“হা করো।”
মিছরি হা করল না। নিষ্প্রাণ দৃষ্টিতে স্বামীর দিকে তাকিয়ে রইল। নাজির পুনরায় তাকে খাওয়ার জন্য তাড়া দিলো, কিন্তু এবারো সে কথা শুনলো না। বরং আচমকা ফুঁপিয়ে উঠলো, স্বামীর বুকে এসে ঠাঁই নিলো। নাজির অপ্রস্তুত হলো, দুলে উঠলো তার সারা দেহ। হাতের থালাটা পড়তে গিয়েও পড়ল না। সময় মতো ধরে নিলো। হাত থেকে কয়েক দানা ভাতও বিছানায় পড়েছে হয়তো। সে খেয়ালটাও করল না। বরং রাগ না করে মাথায় থুতনি ছুঁইয়ে পাশে থালাটা রেখে দিয়ে পরম স্নেহে এক হাতে জড়িয়ে ধরলো তাকে। নরম স্বরে বললো,“খারাপ লাগতাছে? কয়টা ভাত খাও। না হইলে শরীর আরো দুর্বল হইয়া যাইবো।”
মেয়েটা উত্তর দেওয়ার বদলে হাউমাউ করে কেঁদে দিলো। নাজির কিছু সময়ের জন্য থমকে গেলো। পরক্ষণেই চোয়াল শক্ত হলো তার। চুলের গোছা শক্ত করে ধরে বুক থেকে সরিয়ে কঠোর গলায় বললো, “কান্দোস ক্যান? জামাই মরছে তোর?”
ব্যথায় কুঁকড়ে উঠলো মিছরি। অশ্রুতে চোখ জোড়া ভরে উঠেছে। নাজির বেশিক্ষণ রেগে থাকতে পারলো না। কি এক মায়ায় পড়ল সে! মায়া নাকি ভালোবাসা? অতশত তো নাজির বোঝে না। শুধু জানে, সামনে থাকা এই মেয়েটি তার স্ত্রী, সুখ-দুঃখের সঙ্গিনী। এর সঙ্গেই তাকে দুনিয়ার জীবন পার করতে হবে। আল্লাহ চাইলে হয়তো পরকালেও পাবে। হাতটা শিথিল হয়ে এলো নাজিরের। স্ত্রীর নরম ঠোঁট জোড়া আঁকড়ে ধরলো। কিছু সময় পর ছেড়ে দিয়ে বাম হাতে চোখের অশ্রু মুছে দিয়ে নরম স্বরে বললো,“কী হইছে, বউ? কান্দে না। আমি আছি তো।”
“আমার কষ্ট হচ্ছে।”
“কোন জায়গায়? কথা না হুনলে তো হইবোই।”
“আমি একটা মানুষকে মেরে ফেলেছি।”
নাজির বিরক্ত হলো। হুটহাট তার রাগ উঠে যাচ্ছে। আবার বেশিক্ষণ সেই রাগ ধরেও রাখতে পারছে না। গাল দুটো চেপে ধরে চাপা স্বরে বললো,“চুপ, এইসব মুখে আনতে নিষেধ করছি না? তুই না মারলে ওয় তোরে মাইরা দিতো। কাইল তো ঠিকই জ্ঞানের জ্ঞানের কথা কইছো, আইজ সেই জ্ঞান কই গেলো?”
“আমি সারারাত ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি, স্বপ্নেও এসব দেখেছি। কত বড়ো পাপ করেছি!”
“এইডারে পাপ কয় না। তাকাও আমার দিকে। দেহো, এই বাড়ির কেউ আমগো নিজের না। ওরা লোভী, খারাপ মানুষ। লোভে পইড়া আমার দাদারে মারছে, বাপরে মারছে, মায়ের ইজ্জত নষ্ট করছে, আমারে আর আমার ভাইরে সব কিছু থাইক্যা বঞ্চিত করছে, আমার শেষ সম্বল তোমারেও আমার থাইক্যা কাইড়া নিতে চাইছে। হেরপরেও তাগো মধ্যে কোনো অনুশোচনা নাই, ওরা কাউরে ডরায় না, কি নিখুঁত অভিনয় করে! আমারেও হয়তো যেকোনো সময় সরাইয়া দিতে পারে। আমি সব জানি। তাও আমি ভাঙি নাই, আল্লাহ ছাড়া কাউরে ডরাই না, তাগো মতোই সুন্দর কইরা অভিনয় করতাছি। তুমি ক্যান পারবা না?
তোমার কীয়ের এত কষ্ট? তুমি জীবনে কী হারাইছো? কিচ্ছু না। তোমার সব আছে। বাপ-মা, ভাই-বোন সব। লগে একটা স্বামী আছে। আল্লাহও তোমার লগে আছে। যতবার বিপদে পড়ছো ততবার তিনিই তোমারে রক্ষা করছে। এত কিছুর পরেও চোখে পানি ক্যান? তুমি পবিত্র, সুন্দর একটা মাইয়া। তোমারে কানলে মানায় না। তুমি কোনো ভুল করো নাই। সবাই তোমার বিরুদ্ধে গেলেও আমি তোমার পাশে আছি, তোমারে বিশ্বাস করি। আর কয়টা দিন শুধু অপেক্ষা করো, মুখোশধারী সব অমানুষের পতন হইবো। নতুন বছর আমগো জীবনে সুখ নিয়া আইবো। নিজে না ডরাইয়া অন্যের চোখে ডর আনতে শিখো।”
মিছরির কান্নার বেগ কমলো। এখন শুধু ফোপাচ্ছে। নাজির পুনরায় তার মুখের সামনে খাবার ধরলো,“হা করো। না খাইয়া নিজেরে কষ্ট দেওয়ার মানেই হয় না।”
বাধ্য মেয়ের মতো হা করল মিছরি। দুই লোকমা খেতেই চোখমুখ কুঁচকে নিলো,“অনেক ঝাল।”
“ইচ্ছা কইরাই দিছি। জ্বরের মুখে ঝাল ভাল্লাগবো, শীতের মধ্যে ঘাম ছুটবো।”
“আমি এত ঝাল খেতে পারি না।”
“আইজ খাও, শরীরের লাইগা ভালা।”
বাধ্য হয়েই আরো কয়েক লোকমা খেয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো সে। পানি খেয়ে পেট ভরালো। নাজির তাকে আর জোরাজুরি করল না। অবশিষ্ট ভাতটুকু নিজে খেয়ে হাত ধুয়ে ওষুধ সেবন করালো স্ত্রীকে। জিজ্ঞেস করল,“খেজুরের রস খাইবা?”
“না।”
“ক্যান? খাও না?”
“খাই।”
“আইচ্ছা, লতিফরে দিয়া বিকালে কলস বান্ধামু।”
কিছু বললো না মিছরি। নাজির ঘর থেকে বের হলো। বৃষ্টি থেমে গিয়েছে। উঠোন ভিজে আছে। কিছু কিছু জায়গায় শ্যাওলাও পড়েছে। তখনি কলপাড় থেকে বের হতে দেখা গেলো নওশাদকে। নাজির গম্ভীর স্বরে জিজ্ঞেস করল,“কই মরছিলি? বেলা বাজে কয়টা?”
“আর বলো না, মিল্টনটা জোর করে বাজারে নিয়ে গেলো। ওখান থেকে নাশতা করে গিয়েছিলাম পাশের গ্ৰামে। বেগুন চারা, লাউ চারা আরো কীসব এনেছে যেন।”
“আইচ্ছা।”
“ভাবির কী অবস্থা?”
“জ্বর আইছে।”
“এই সন্দেহই করেছিলাম। ওষুধ আনতে হবে?”
“না, ঘরেই আছে।”
তারপর আশেপাশে তাকিয়ে আনত স্বরে নওশাদ জিজ্ঞেস করল,“বাড়ির কী অবস্থা?”
“চোরের মন পুলিশ পুলিশ। সাবধানে থাকিস, বেফাঁস কিছু কইয়া ফেলাইস না আবার।”
নওশাদ মাথা নাড়িয়ে ঘরে চলে যায়। সারারাত ঘুমায়নি সে। তাই মাথা ব্যথা করছে।
আমিরুল শাহ কেদারায় বসা। বৃষ্টির মধ্যে বের হননি কোথাও। ফরিদা ঘরে এসে অস্থির হয়ে পায়চারি করলেন কিছুক্ষণ। স্বামীর সামনে দাঁড়িয়ে অস্থিরতা নিয়েই বললেন,“নাজির সব জাইনা গেছে। এহন কী হইবো?”
চুরুট ধরালেন আমিরুল শাহ। প্রশ্ন করলেন,“কী জানছে?”
“কাইল রাইতের কথা। ওর বউ পুরা সুস্থ, কপালে দেখলাম ব্যান্ডেজ। সোহেল হঠাৎ গেলো গা, ফিরবো না কইয়াও নাজির ফিরা আইলো, মাঝ রাইতে উঠানে দাঁড়াইয়া আমার লগে হাইসা কথা কইলো, আইজ সকালেও হেঁয়ালি কইরা কথা কইলো। এইসবের মানে কী? ওর বউ তো চুপ থাকার মাইয়া না। আমি যে সোহেলরে ওর বউয়ের ঘরে ঢুকাইছি তা ওয় জাইনা গেছে।”
আমিরুল শাহ ভীষণ শান্ত। অথচ গতকালও তিনি চিন্তায় চিন্তায় অস্থির হয়ে ছিলেন। বললেন,“করার আগে ভাবা উচিত আছিলো। আমি তো বারবার তগো নিষেধ করছিলাম। কিন্তু তুই তোর ভাইয়ের কথায় লাফাইছোস। এহন বোঝ মজা। ভালা মানুষি শেষ না?”
“মজা নিতাছেন? খুব আনন্দ লাগতাছে?”
“সময় নাই এইসবের। তোর ভাইয়ে তোর আর তোর পোলাপাইনের কহনো ভালা চায় নাই। ওয় তোরে নিজের স্বার্থের লাইগা ব্যবহার করে। আমিও অবশ্য মাঝেমধ্যে তারে স্বার্থের লাইগাই তেলাই। স্বার্থ ছাড়া দুনিয়াত কেউ কারো আপন না। বুইড়া মাগী এহনো বুঝলি না। পাইলি কী জীবনে?”
“আমনে কী পাইছেন? নিজের মিহি চাইয়া দেহেন।”
“আমি শাহ বাড়ির মাথা হইছি, সমাজের মাইনষে আমারে সম্মান করে, ডরায়। ভাই, ভাই পোলা থাইক্যা শুরু কইরা নিজের পোলারাও ডরায়। চেয়ারম্যান, মেম্বার, ব্যবসায়ীরা সবাই এমনকি তোর ভাইও মান্য কইরা চলে। এহনো উল্টা প্রশ্ন করবি? অথচ তুই আগে যা আছিলি এহনো তাই আছোস। ফকিন্নি চিরকাল ফকিন্নিই থাকে।”
রাগে শরীর জ্বলে উঠলো ফরিদার। ইচ্ছে করল স্বামী নামক লোকটার গলা টিপে মেরে ফেলতে। এত ঝামেলা না করে এটাকে শুরুতে মেরে দিলেই হয়তো ভালো হতো। আমিরুল শাহ তাঁর মনোভাব হয়তো বুঝতে পারলেন, তাই বিদ্রুপপূর্ণ হাসলেন। ফরিদা দাঁতে দাঁত পিষে বললেন,“আমি ফাঁসলে আমনেও ফাঁসবেন। সত্য কয়দিন চাপা থাকে?”
“সারা জীবন। সেই ব্যবস্থা আগেই কইরা রাখছি।”
ফরিদা কিছু বলতে পারলেন না আর। বাইরে থেকে কলিমের মায়ের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। অস্থির হয়ে সেদিকেই ছুটে গেলেন তিনি। এই শীতের মধ্যেও দেহ থেকে ঘাম ঝরছে। এতদিনের গড়া সব মিথ্যা, মায়ার দেয়াল ভেঙে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। নাজির রাগী, বদমেজাজি ছেলে। সব জানার পরেও কেন চুপ করে আছে? কী চলছে তার মনে? ভঙ্গুর হৃদয়ের মানুষেরা যে খুব ভয়ংকর হয়। আজ সে জেনেছে, কাল মাস্টার বাড়ি জানবে, তারপর জানবে গোটা গ্ৰামবাসী। স্বামীর উপরেও তিনি আর ভরসা করতে পারেন না। কি এক যন্ত্রণায় পড়লেন!
নববধূ নিয়ে নাজমুল বাড়ি ফিরলো দুপুরে।অসুস্থতার বাহানায় ফরিদা আর ঘর থেকে বের হলেন না। মর্জিনা, বিথী, পারভেজ, হেলেনা আগে আগেই চলে এসেছিলেন। তারাই নতুন বধূকে বরণ করে ঘরে তুললো। মেয়েটার নাম শিউলি। মর্জিনার দুঃসম্পর্কের চাচাতো ভাইয়ের মেয়ে। বাপের বাড়ির দিক থেকে মনের মতো মেয়ে পুত্রবধূ হিসেবে আনতে পারায় তাঁর খুশি যেন ধরে না। নাজিরকে ডেকে বললেন,“এই যে আমার নাজমুলের বউ। তোর বউয়ের থাইক্যা সুন্দরী না?”
ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেলো নাজিরের। এটা কোনো প্রশ্ন হলো? একপলক লাজুক মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো সে। বললো,“তুলনা না দিলে চলে না?”
“না, তোর তো নিজের বউ লইয়া কম অহংকার না।”
“আমার বউ আরো লম্বা, স্বাস্থ্যবতী, সুন্দর।”
মর্জিনার অধর ফ্যাকাসে হয়ে গেলো। ভালো করে খেয়াল করে দেখলেন, মেয়েটা আসলেই উঁচা লম্বায় মিছরির থেকে পিছিয়ে। তবে অসুন্দর বলার উপায় নেই। কি সুন্দর মুখের গড়ন! হেলেনা মেয়েকে ধমক দিলেন,“কী লইয়া পড়লি? যতই হোক, সম্পর্কে নাজির হের ভাসুর লাগে। এসব কথা কইতে আছে? কারো লগে কারো তুলনা দেওয়া উচিত না।”
“সঠিক সময়ে তো আর মাইয়ারে শিক্ষা দিলেন না, নানী। কী আর করার? সবাই সবার জায়গায় সুন্দর।”
“তোর বউ কই? ডাক।”
“আর কইয়েন না। কাইল রাইতে আমি আইয়া দেহি খাট থাইক্যা পইড়া কপাল ফাটাইছে। আইজ আবার জ্বর। তাই আমিই কইলাম, এত মানুষের সামনে বাহির হওয়ার দরকার নাই। নজর লাগলে?”
হেলেনা চিন্তিত হয়ে মাথা নাড়ালেন,“ঠিক করছোস। কার নজর কেমন কওয়া যায় না। আমগো মর্জিনায় তো ছুডোবেলায় অনেক সুন্দর আছিলো। একবার এক মহিলা আইয়া কইলো, পরী নাকি! হেই রাইতেই জ্বর আইলো, সারা শরীরে উঠলো বিষ গোডা। কত কবিরাজ দেখাইছিল ওর বাপে!”
মর্জিনা মুখ ভার করে বললেন,“বড়োজনেরও নাকি অসুখ। তাই আর বাহির হয় নাই। আবার আইজ ভোর থাইক্যা কীয়ের বৃষ্টি শুরু হইলো!”
“মন খারাপ কইরেন না। বউ লইয়া ঘরে যান।”
মর্জিনা আরো অনেক কথা বলতে বলতে ভেতরে চলে গেলেন। হেলেনা সোজা এলেন নাজিরের ঘরে। মিছরি শুয়ে ছিল, জ্বরের উত্তাপ আগের তুলনায় কমেছে কিছুটা। অসুস্থ মেয়েটার মাথায় হাত রেখে দোয়া দরুদ পড়ে ফুঁ দিলেন তিনি। তবে মিছরি চোখ মেলে তাকিয়ে দেখতে পারলো না তাকে।
দিনটি এভাবেই কাটলো। শিউলির সঙ্গে তার ছোটো, বড়ো অবিবাহিত ভাই-বোনেরা এসেছে। দুপুরে সবাই একসঙ্গে খাবার খেলো, ঘোরাঘুরি করল। আপাতত বউ ভাত পর্যন্ত এখানেই থাকবে। একেবারে নাইওরে মেয়েকে নিয়ে বাড়ি ফিরবে।
মাস্টার বাড়িতে রোজকার মতো সারাদিনের ব্যস্ততার পর বাড়ির ছেলেরা একত্র হয়ে মুড়ি খেতে খেতে গল্প করছে। চাদর মুড়ি দিয়ে সৈয়দুন নেছা চেয়ারে বসে তাসবিহ জপছেন। চেহারা আগের থেকে শুকিয়েছে। সুজাতা, সিফাতকে মেরে পড়তে বসিয়েছে জেসমিন। পলির পেটটাও খানিক উঁচু হয়েছে।
নজরুল আলম বললেন,“শাহ বাড়ির নাজমুলেরও বিয়া হইয়া গেলো। এইবার রুহুলের বিয়াডা দেওয়া উচিত। আব্বায় তো কইছিলো কিন্তু দেইখা যাইতে পারলো না।”
শেষ কথাটা আফসোসের সুরে বললেন তিনি। সুজন রুহুলের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করল,“তোর পছন্দের কেউ আছে নাকি রে, রুহুল?”
মাসুম সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো,“ওর আবার কেডা থাকবো? মাইয়া মাইনষের পছন্দ কী এত খারাপ?”
রুহুল চোখ রাঙিয়ে তার পিঠে কিল বসিয়ে দিলো। সুজন হাসলো। কাশেম আলী অন্যমনস্ক হয়ে মাচায় বসে আছেন। শেষ রাতে আর ঘুমাতে পারেননি তিনি। মেয়েটার চিন্তায় সকাল থেকে কোনো কাজে মন বসাতে পারেননি। কাল কী একবার যাবেন ওই বাড়ি? যদি কেউ সন্দেহ করে? না গিয়েও তো মনে হয় না শান্তি পাবেন।
“কী ভাবেন, আব্বা?”
তালেবের প্রশ্নে ভাবনার রেশ কেটে গেলো কাশেম আলীর। মাথা নেড়ে বললেন,“কিছু না।”
“কাইল রাইতে কই গেছিলেন?”
চমকালেন তিনি। তবে বাইরে প্রকাশ করলেন না তা। মিথ্যে বললেন,“পায়খানায় গেছিলাম হয়তো। তুই ঘুমাস নাই?”
যাত্রাপথ পর্ব ৫০
“আমিও এর জন্যই বাহির হইছিলাম। কিন্তু আমনেরে দেখলাম দাদীর ঘরে যাইতে।”
“আওয়ার সময় আম্মারেও দেখতে গেছিলাম। বয়স্ক মানুষ, কহন কী হইয়া যায়?”
“ওহ।”
সন্দিহান চোখে পিতার দিকে তাকিয়ে রইল তালেব। তিনি যে কিছু লুকাচ্ছেন তা আর বুঝতে বাকি নেই তার।
