যাত্রাপথ পর্ব ৭০
মাশফিত্রা মিমুই
বছরের প্রথম রংধনু উঠেছে আকাশে। মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে ভাইকে সঙ্গে নিয়ে ফটকের বাইরে চলে এসেছে সুজাতা। সমবয়সীদের পেয়ে খেলাধুলায় মেতে উঠেছে। কন্যা বেলীকে নিয়ে পলি বসে আছে বারান্দায়। দিন তিনেক আগেই পরিবার নিয়ে নতুন দালানে উঠেছেন কাশেম আলী।
হাসপাতালের পাট চুকিয়ে নাজিরকে বিকেলের দিকে বাড়িতে আনা হলো। শাহ বাড়ি নয়; মাস্টার বাড়ি। ডাক্তার বলেছেন, ঘা শুকানোর আগ পর্যন্ত কোনো ধরণের ভারী কাজ করা যাবে না। ঠিকমতো খাওয়া- দাওয়া এবং বিশ্রাম নিতে হবে। তাই কাশেম আলী এবং তালেব জোরপূর্বক তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। মিছরি নিজেই চলাফেরা করতে পারে না, তাকে না খাইয়ে দিলে খাবার ছুঁয়েও দেখে না। আর নাজির তো এক জায়গায় স্থির থাকার ছেলেই নয়। তার বাড়ি এখন আর বাড়ি নেই। দুনিয়ার যত বিশ্বাসঘাতক দিয়ে ভরা। তাই কাশেম আলী বলে দিয়েছেন,“সুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত শ্বশুরবাড়িই তোর থাকতে হইবো। না হইলে মাইয়া নাতিন দিমু না। বাকি জীবন একলা পইড়া মরবি।”
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
না চাইতেও নাজির মেনে নিলো। গর্ভবতী স্ত্রীর যত্ন করার মতো অবস্থায় সে নেই, নেই মাথা গোঁজার ঠাঁই। শ্বশুরবাড়ি ছাড়া গতি কোথায়? তারা যা করছে নাজিরের জন্য! এতেই তো তার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। অথচ একসময় এদেরকেই নিজের শত্রু মনে করতো সে।
স্বামীর ফেরার খবর পেয়ে অসুস্থ শরীর নিয়েই দাদীর ঘর থেকে বেরিয়ে এলো মিছরি। পেটের ভারে শুধু দৌড়াতে পারলো না। দরজার কাছে এসে দেয়াল ধরে দাঁড়িয়ে হাঁপাতে লাগলো। এতটুকু পথ আসতেই ঘাম ছুটে গিয়েছে। কাঠের দরজায় নতুন রং করা হয়েছে। অসাবধানতায় হাতে লেগে গেলো। পরিধেয় পোশাকে মুছতেই আচমকা তার হাতটা কেউ খপ করে টেনে ধরলো। বুক ধড়ফড় করে উঠলো মিছরির। সামনে তাকাতেই দেখতে পেলো নাজিরকে। চোখাচোখি হলো দুজনার। মনে হচ্ছে, কত যুগ পর যেন একে অপরকে দেখছে। যুগ না হলেও বহুদিন, বহু মাস তো হবেই।
নাজির তার হাত ধরে ঘরের ভেতরে নিয়ে এলো। বিছানায় বসিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। দরজার বাইরে পায়ের আওয়াজ পেয়েই বুঝে গিয়েছিল, কে এসেছে। মেয়েটা আগের থেকে বেশ মোটা হয়েছে। সৌন্দর্যে ভাটা পড়েছে। কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করল, “কেমন আছে আমার তালমিছরি? হাসপাতালে নাকি ভর্তি আছিলা? কী হইছে, ময়না পাখি?”
ফ্যাচফ্যাচ করে কেঁদে দিলো মিছরি। এতদিনের জমানো সব অভিমান চোখের অশ্রু হয়ে ঝরে পড়ছে। নাজির তাকে কাঁদতে দিলো। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল, এটাই তার শেষ কান্না। আর কখনো স্ত্রীকে সে কষ্ট দেবে না। কখনো ছেড়ে যাবে না। মান ভাঙানোর জন্য কথা ঘুরালো,“অ্যা হে, কী অবস্থা হইছে চেহারা সুরতের? ঘুমাও না কয়দিন? আমি তো প্রথমে চিনতামই পারি নাই। আমার আম্মা তার মায়রে খুব কষ্ট দিতাছে, তাই না?”
বুক থেকে মাথা তুললো মিছরি। বাম হাতের পিঠে অশ্রু মুছে জিজ্ঞেস করল,“কে কার আম্মা?”
“তোমার পেডে যে আছে। মাইয়া তো বাপের আরেক মা।”
“মেয়েই যে হবে বুঝলেন কীভাবে?”
“মনে হইলো।”
“আমার তো মনে হয় ছেলে হবে। সময়ে অসময়ে জোরে জোরে লাথি মারে। একেবারে বাপের মতন খারাপ। আমায় শুধু কষ্ট দেয়।”
মিছরির উঁচু পেটে হাত ছোঁয়ালো নাজির। মাথা নুইয়ে আলতো চুমু খেয়ে বললো,“ওর বাপেও আর কষ্ট দিবো না।”
“আর দেওয়ার সুযোগ পাবে? যে কষ্ট দিয়েছে তাতেই তো আমার অবস্থা খারাপ। বাঁচবো কিনা সন্দেহ। মনে হয়, ও পাড়ার বিন্দুর মতো আঁতুড়ঘরেই মরে যাবো। শরীর আর চলে না।”
নাজিরের মেজাজ খারাপ হলো। গাল দুটো চেপে ধরে ধমক দিয়ে বললো,“মরার কথা মুখে আনলে খবর আছে। আমি থাকতে তুই মরবি ক্যান? তোর মরার লাইগা নিজের জীবন নরক বানাইছি?”
“ভালো তো বাসেন না। নইলে এতদিন দূরে থাকতে পারতেন? অসুস্থতার বাহানা দিবেন না। তার আগে কেন আসেননি? আমি মরলেই আসতেন।”
নাজির কী জবাব দেবে ভেবে পেলো না। তার সব যুক্তিই এখন অযৌক্তিক। মিছরি আশা ক্ষুন্ন হলো। টেনে ধরলো স্বামীর পরিধেয় শার্ট। বোতাম খুলে দৃষ্টি স্থির করল ব্যান্ডেজ করা ক্ষত স্থানে। নাজির বাঁধা দিলো না। বালকের মতো চুপ করে বসে রইল। মিছরি নাক টেনে বললো,“পিশাচ একেকটা। কখনো ওদের ভালো হবে না। দুনিয়াতেই সব কৃতকর্মের শাস্তি ভোগ করবে। কীভাবে মেরেছে! খুব কষ্ট হয়েছে তাই না? আমি কতবার বাবাকে বললাম, আমায় নিয়ে যেতে। সন্তানের দোহাই দিয়ে নিলো না। এ কদিন চোখ দুটো এক করতে পারিনি, একটুও ঘুমাতে পারিনি।”
পুনরায় কেঁদে দিলো সে। নাজির এবার নিজেই তার চোখের পানি মুছে দিয়ে বললো,“আমি তোমার কাছে আইয়া পড়ছি। এইবার আর কোনো দুঃখ নাই, চিন্তা নাই।”
“যদি কিছু একটা হয়ে যেতো? আমার কী হতো?”
“কিছু হয় নাই তো। দেহো, কোত্থাও কোনো বিষ নাই। আমি একেবারে সুস্থ।”
আবার একটা মিথ্যে! মিছরি কাঁদতে কাঁদতে বললো, “আপনাকেও আমি মাফ করবো না। কোনো অন্যায় না করেও অনেক শাস্তি পেয়েছি। এমন কষ্ট আমায় কেউ কখনো দেয়নি।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলল নাজির,“কইরো না। তাতে যদি আমার শিক্ষা হয়।”
“কথাও বলবো না।”
বুকের সাথে তাকে আঁকড়ে ধরলো নাজির।
“আইচ্ছা, কইয়ো না। তোমার বদলে আমি কমু।”
“আপনি জঘন্য, খারাপ লোক।”
“আইচ্ছা।”
মিছরি বিরক্ত হলো। বিপরীত পাশ থেকে প্রতিক্রিয়া না পেয়ে ইচ্ছেমতো বুকে কিল ঘুষি মেরে শান্ত হলো। নাজির তবুও কিছু বললো না, বাঁধা দিলো না, দাঁতে দাঁত পিষে সমস্ত ব্যথা সহ্য করে নিলো।
বহুদিন পর স্বামীকে পেয়ে রাতে শান্তির ঘুম ঘুমালো মিছরি। তার সমস্ত চিন্তা, দুঃখের সমাপ্তি যেন স্বামীর কাছেই। অথচ সকাল হতেই মেয়ের বদন, চালচলন বদলে গেলো। সত্যি সত্যি সে নাজিরের সাথে সপ্তাহ খানেকের জন্য কথা বলা বন্ধ করে দিলো। দূরে দূরে থাকলো। এটাই তার অপরাধের একমাত্র শাস্তি। লোকটা বুঝুক, অবহেলায় কত স্বাদ।
আরো সপ্তাহ খানেক কর্মহীন, অলস দিবস কাটলো নাজিরের। সারাক্ষণ ঘরে বসে আরাম করার ছেলে সে নয়। সাতাশ বছরের জীবনে এত বিশ্রাম বোধহয় কখনো সে নেয়নি। অন্যের উপর নির্ভর করেও চলা হয়নি। এর মধ্যে গ্ৰামের অনেক মানুষ বাড়ি বয়ে তাকে দেখে গিয়েছে। আফসোস করেছে। এত নিষ্ঠুর চাচা আগে মনে হয় কেউ পায়নি। কত নির্দয়, নির্মম হলে নিজের আপন ভাতিজার প্রাণ কেড়ে নিতে চায়? যদিও তাদের জন্য এটা বড়ো কিছু নয়। আগেও তো বাপ, ভাইকে মেরেছে। তবুও আল্লাহ পাক রক্ষা করেছেন, বাপ দাদার পরিণতি নাজিরটার অন্তত হয়নি।
গায়ে শার্ট জড়িয়ে ঘর থেকে বের হলো সে। ফটকের দ্বারে মাসুমের সাথে দেখা হয়ে গেলো। মাসুম সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,“যাস কই?”
“জাহান্নামে। যাবি?”
“না, তোর উপযুক্ত জায়গায় আমি যামু ক্যান?”
“সর।”
“আব্বায় বাহির হইতে নিষেধ করছে।”
“ঘর জামাই থাকি বইল্যা এহন সব কথা মাইনা চলতে হইবো?”
“তা তো হইবোই।”
“উপকার কইরা মাথায় চড়তাছোস তোরা।” হাঁটু দিয়ে মাসুমের পিঠে গুঁতা মেরে ভেতর থেকে বের হলো নাজির।
“এহনো বেয়াদবি করা ছাড়লি না। সম্বন্ধি গো সম্মান করতে শিখ।”
“হাঁটুর বয়সী পোলার বড়ো বড়ো কথা।”
মূল ফটক দিয়ে বেরিয়ে গেলো নাজির। মাসুম চেঁচিয়ে বললো,“আল্লাহ গো, মিছরির জামাই যায় গা।”
নাজির শুনেও প্রত্যুত্তর করল না। মেঠোপথ ধরে সারা গ্ৰাম ঘুরে বেড়ালো। পথে কত মানুষের সঙ্গে দেখা হলো, কথা হলো! সন্ধ্যা নামার পূর্বে সে এসে দাঁড়ালো শাহ বাড়ির দোরগোড়ায়। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কিছুদিন আগে যেই স্থান তার নিবাস ছিল, আজ তা দীর্ঘশ্বাস। নাজির ভেতরে ঢুকলো। পূর্বের সেই পরিপাটি বাড়ির জৌলুসে ভাটা পড়েছে, উঠোনে শ্যাওলা পড়েছে, এখানে সেখানে জন্মেছে আগাছা। মনে হয়, কতদিন কেউ ঝাড়ু দেয় না।
নাজিরের গোয়াল ঘর ফাঁকা। উত্তরের জমিতে নতুন গোয়াল ঘর তুলে গরুগুলো সেখানে স্থানান্তর করেছে মিল্টন আর লতিফ। বাকি দুই চাচার গোয়ালও ফাঁকা, ফাঁকা মর্জিনার মুরগির খোপটা। কলিমের মা এমুখো এখন আর হন না। তাঁর ব্যস্ততা আকাশচুম্বী। মেম্বার বাড়িতেই নতুন কাজ পেয়েছেন।
নাজির ধীর পায়ে হেঁটে পুকুর পাড়ে এলো। পুকুরের পানি ঘোলা, শুকনো পাতা পড়ে যাচ্ছে তাই অবস্থা। সিঁড়ি হয়ে আছে পিচ্ছিল। এখানেও কেউ গোসল করে না হয়তো। দেড় মাসে এত পরিবর্তন! অথচ এসবের জন্যই তো কত মানুষের প্রাণ গেলো।
নাজির ফিরে এলো। তালা খুলে নিজের ঘরে প্রবেশ করল। স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ ভেতরে। জিনিসপত্রেও ধূলো জমেছে। তার খুব মায়া হলো। এই ঘর তুলতে প্রায় ছয় মাস সময় লেগেছিল। একটা দেয়াল শুকিয়ে আবার নতুন আরেকটা দেয়াল তোলা কী চারটে খানি কথা? এই ঘর, বাড়ি নাজিরের শান্তির জায়গা। এখানে সে শৈশব কাটিয়েছে। অথচ এখন বিদায় নেওয়ার যত তাড়া।
ওদিকে নতুন টিন, কাঠ এসেছে। মিস্ত্রীরা ঘরের কাজ শুরু করে দিয়েছে। টিনের ঘর তুলতে কত সময়ই বা লাগে? ধরা যায়, তিন চারদিন আর লাগবে। পুরোনো রেডিওটা সঙ্গে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে তালা দিলো সে। নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আর আসবাব নিতে তাকে আরেকবার আসতে হবে এখানে।
বারান্দা থেকে নামতেই পরিচিত নারী মুখের সাথে দেখা হয়ে গেলো। পুরোনো ভিটের বারান্দার পিঁড়িতে বসে পড়ল নাজির। হেসে বললো,“আরেহ মাজেদা চাচী যে! খবর কী? আমি তো মনে করছি, বাপের বাড়ি হয়তো গেছেন গা।”
মর্জিনা সিঁড়িতে দাঁড়িয়েছিলেন। উঠোন পেরিয়ে পাশে এসে বসলেন। অন্য কোনো সময় হলে নাম বিকৃত করার অপরাধে মারার জন্য নাজিরের দিকে তেড়ে যেতেন। কিন্তু আজ তা করলেন না। কোমল স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
“কেমন আছোস?”
“আল্লাহর রহমতে ভালা।”
“ফিরতে এত দেরি করলি যে?”
“অপেক্ষা করতাছিলেন?”
“হুনছি, অনেক রক্ত নাকি বাহির হইছে? ক্ষত সারছে? পরে সমস্যা হইবো না তো?”
“কী জানি?”
কথা আর এগোতে চায় না। হঠাৎ করেই নীরবতা ঠাঁই নেয়। আজ তাদের মধ্যে শব্দের খুব অভাব। নীরবতা ভেঙে নাজির বললো,“বাড়ির এই অবস্থা ক্যান?”
“বাড়ির মাইনষেগো অবস্থাই তো ভালা না, বাড়ির অবস্থা আর কেমন হইবো?” দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “জিগাইবি না, এহনো এনে পইড়া রইছি ক্যান?”
“ইচ্ছা নাই।”
“ক্যান? বাপ, মায়ের খুনির বউ দেইখা জিগাবি না?”
নাজির উত্তর দিলো না। মর্জিনা অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন,“এনে আর থাকবি না? নতুন ঘর তুলোস হুনলাম।”
“এনে থাইক্যা আর কী করমু? এই বাড়ি আমার লাইগা অভিশাপ।”
“হ, অভিশাপই।”
“গরু, হাঁস মুরগি কই গেলো?”
“সব বেইচ্চা দিছি। যামুগা এনতে।”
“এত সহজে? মায়া লাগবো না? সংসার লইয়া কম বাহাদুরি তো আছিলো না।”
“আর শরম দেইস না। এমনিতেই আমি ভালা নাই। মরণের থাইক্যাও আপন মাইনষেগো কাছে ঠইকা যাওয়া অনেক কষ্টের। আগে ভাবতাম, আমি মনে হয় মানুষ চিনি। বড়জন আর তার জামাই শুধু খারাপ। এহন দেহি….
“পোলাগো কী খবর?”
“জানি না, আমার এহন একটাই পোলা। তার নাম জাহিদ। মা হইয়া মরণ তো আর চাইতে পারি না। না হইলে এতক্ষণে ঠিকই চাইতাম।”
নাজির শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। মর্জিনা পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন,“হেইদিন তুই কইছিলি, তোর মায়রে নাকি হেরা মারছে। গেরামেও কথাডা ছড়াইয়া গেছে। আমি সব জানতে চাই। তোর ছুডো চাচায় মারছে?”
“না, ফরিদা বানু আর তার ভাইয়ে মিল্যা মারছে। আমনের জামাই আমার বাপরে মারছে। আমার মায়ের লাশ গুম করছে।”
মর্জিনার দুর্বল দেহ কেঁপে ওঠে। দেড় মাস ধরে কম কান্না তো আর করেননি। বললেন,“সব জাইনাও সহ্য করছোস কেমনে, আব্বা? মাথায় খুন চাপে নাই? যদি সুযোগ থাকতো তাইলে অমানুষটারে আমিই জবাই করতাম গিয়া। সারাডা জীবন আমারে মিছা কইয়া গেলো, অন্ধকারে রাখলো। আমি তারে কত বিশ্বাস করলাম, ভালোবাসলাম! শেষ বয়সে এই প্রতিদান দিলো? আত্মহত্যা যদি পাপই হয় তাইলে আল্লাহ এমন দিন ক্যান দেখাইলো?”
“যতই হোক, আমনের সোয়ামি তো। আমনের লগে কোনো অন্যায় করে নাই। জিগানের পর উত্তর দিলো, ‘তাগো সাথ না দিলে তোর মায়ের জায়গায় আইজ আমার বউরে থাকতে হইতো।’ হেরপর আর কী কমু কন?”
“যতই সোয়ামি হোক, অপরাধীর কোনো মাফ নাই। আমি আমার জীবনে কহনো অন্যায় সহ্য করি নাই, করমুও না। তোর লাইগাই এত অপেক্ষা আছিলো। পারলে আমারে মাফ কইরা দেইস। জীবনে যা পাস নাই আল্লাহ তার দ্বিগুণ তোরে ফিরাইয়া দিক। তবে এই অমানুষগো কহনো মাফ করবি না।”
মর্জিনা আরো অনেক কথাই বললেন। তারপর চলে গেলেন ঘরে। নাজির উঠে দাঁড়িয়ে সোজা আমিরুল শাহর দালানে প্রবেশ করল। পারভেজ তেমন একটা বাড়ি ফেরে না। গরুগুলো বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করেছে। ব্যবসাও মনে হয় সামলায়। ছেলেটা নাকি তাকে দেখার জন্য মাস্টার বাড়ির দোরগোড়া পর্যন্ত একবার ছুটে গিয়েছিল। তবে কেউ ঢুকতে দেয়নি। নাজির যদিও জানে, পারভেজ এসবে নেই। তার থেকে ভালো ওই ছেলেকে আর কে চিনবে?
ফরিদা নিজের ঘরে বসে আছেন। এভাবেই রোজ বসে থাকেন। পূর্বের দাপট, গা ভর্তি স্বর্ণালঙ্কার, দামি শাড়ি, চেহারার সরলতা কিছুই নেই। এখন আর কেউ খোঁজ নিতেও আসে না। এলেও অপমান করে শুনিয়ে যায় কটু কথা। যারা কখনো শাহ বাড়ির কর্ত্রীর মুখের দিকে তাকানোর সাহস পেতো না তারা পর্যন্ত গালমন্দ করে সামনাসামনি।
নাজিরকে দেখে তিনি অবাক হলেন। চোখ দুটো কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। নাজির ধপাস করে তাঁর মুখোমুখি বসলো। সেলাইতে টান অনুভব করল। কিঞ্চিৎ ব্যথাও পেলো। তবুও পাত্তা দিলো না। হেসে জিজ্ঞেস করল,
“শাহ বাড়ির কর্ত্রীর কী খবর? এমনে বইয়া রইছেন ক্যান? দুপুরে খাওয়া-দাওয়া কিছু হইছে? ভাবিরে দেখলাম না যে? কই গেলো?”
ফরিদার ঠোঁট জোড়া ফাঁক হয়ে গেলো। এটা সেই পুরোনো নাজির, যে এভাবেই গাছাড়া ভাব নিয়ে তাঁর সঙ্গে হেসে কথা বলতো। বাড়ি ফিরে গোসল সেরে এসেই বলতো,“মেলা ক্ষুধা লাগছে, চাচী। খাওন দেন। আমনে খাইছেন?”
ফরিদার জবাব ‘না’ হলে সে রাগ করে বলতো,“ক্যান খান নাই? ওই বান্সু** লাইগা? দুইবেলা ছ্যাচা দেওয়ার পরেও এত মোহাব্বত আইয়ে কইত্তে?”
ফরিদা মিছে চোখ রাঙিয়ে বলতেন,“বড়ো চাচা হয়। চাচারে এইসব কেউ কয়? চুপ কইরা খা।”
তারপর ছেলেটার বিয়ে হলো, ঘরে নতুন বউ এলো, যাদের সাথে মেশা উচিত নয় তাদের সাথে গিয়েই মিশলো। শাহ বাড়িতে এলো বিপদ! সব এলোমেলো হয়ে গেলো। ধ্বংস হলো সাজানো সংসার, সম্পর্ক। নাজির তার নীরবতা দেখে মুখ ভার করে বললো, “জিগাইবেন না কেমন আছি? কেমনে মৃত্যুর মুখ থাইক্যা ফিরা আইছি? নাকি যত ভালোবাসা শুধু নিজ পোলা আর ভাইয়ের পোলাগো লাইগা?”
ফরিদা দৃষ্টি সরিয়ে নিলেন। বললেন,“প্রতিশোধ নিতে আইছোস? এহন বুঝি আমার পালা?”
“কী যে কন না? আমি প্রতিশোধ নেওয়ার কেডা? যা করার আল্লাহ করবো। তিনি ন্যায়বিচারক। তাই এসব ছাইড়া দিছি।”
“তাইলে এনে আইলি ক্যান?”
“আমনেরে দেখতে।”
“ঘৃণা হয় না?”
“করুণা হয়।”
চোখ বন্ধ করে নিলেন ফরিদা। নাজির দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,“কী লাভ হইলো এইসব কইরা? কাউরে মাইরা কেউ সুখ পায়? কহনো পাইছেন? আইজ আমনে একলা। আমনের কেউ নাই। বড়ো বাড়িডায় চিরকাল আমনের একলা থাকতে হইবো। এতক্ষণে সবাই সব জাইনা গেছে। সবাই জাইন্না গেছে, শাহ পরিবার ধ্বংসের মূল ছলনাময়ী নারী ফরিদা বানু। যে কিনা এতকাল ভালা মানুষির মুখোশ পইরা আছিলো। আমনের কী একটুও আফসোস হয় না? মনে হয় না, আমার লগে আমনে অনেক অন্যায় করছেন? সামিউল ভাই আমার পেডে ছুরি ঢুকাইছে, আমার চাচারা আমারে ঠকাইছে, আমার মা পলায় নাই। এসব সত্যের মুখোমুখি হইয়াও আমি এত কষ্ট পাই নাই, যত কষ্ট পাইছি সবকিছুর পেছনে আমনে আছিলেন জাইন্না। ছুডো চাচী আমারে কত সাবধান করছিল! আমি হুনি নাই। মায়ের কথা কহনো ভাবি নাই। সেই জায়গা তো আমনেরেই দিছিলাম। অথচ দেহেন! শেষ ছোবল আমনেই দিলেন। আমগো প্রতি এত ক্ষোভ আমনের? এত লোভ? পাইছেন সেই সম্পদ? সারা জীবন তো বান্দিই খাটলেন।”
ফরিদা উত্তর দিলেন না। আসলেই কী তিনি কখনো নাজিরকে ভালোবাসেননি? তাহলে সেদিন কেন মুমিনকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলেছিলেন,“ওগোরে কিছু কইরো না। ওরা আমার কাছে থাউক।” ঝুঁকি জেনেও কেন বলেছিলেন? কেন এতকাল ছেলের মতো যত্ন করে রেখেছিলেন? প্রশ্নের উত্তর জানা নেই তাঁর। জীবনে কখন এবং কেন কী করেছেন ফরিদা জানেন না। তাই আজও তিনি জবাব দেওয়ার মতো কিছু খুঁজে পেলেন না। চোখের পানি আটকানোর চেষ্টায় চুপ করে বসে রইলেন। বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।
নাসরিনও কী খুব ভালো ছিল? সে কী বাঁকা চোখে ফরিদাকে দেখেনি? ধনী পরিবারের মেয়ে হওয়ার অহংকার করেনি? আড়ালে শাশুড়ির মন ফরিদার বিরুদ্ধে বিষিয়ে দেয়নি? সবার সামনে ভালো, আর ফরিদার সামনে বিষাক্ত রূপ দেখায়নি? সে কেমন ছিল, কী ছিল ফরিদা খুব ভালো করেই জানে। সময় আর কর্মের গুণে সব বদলে গিয়েছে শুধু। আজ নাসরিন সবার চোখে সৎ নারী, যে অন্যায় সহ্য করে দুনিয়া ত্যাগ করেছে। আর ফরিদা ষড়যন্ত্রকারী, লোভী।
যাত্রাপথ পর্ব ৬৯
সেদিন অনেকক্ষণ নাজির সেখানে বসে ছিল। সন্ধ্যা নামার পর সারা বাড়িতে আলো দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। দাঁড়ালো মসজিদের সামনে এসে। মোয়াজ্জিন মাইকে আজান দিচ্ছে। কোনোকিছু না ভেবেই ওযু করে ভেতরে প্রবেশ করল নাজির। রবের সাথে দীর্ঘদিন সাক্ষাৎ হয় না, পাপের জন্য ক্ষমা চাওয়া হয় না। রব যে ক্ষমাশীল। তিনি ক্ষমা না করলে মানব জীবনই তো বৃথা।
