Home রং রং পর্ব ৫

রং পর্ব ৫

রং পর্ব ৫
তন্নী তনু

ভিডিও অন করে ইরফাদ সিনহা,
শত শত মানুষের ভিড়! ক‍্যামেরা!মাইক্রোফোন! সাংবাদিক! তারমাঝে হাতকড়া পড়ে দাঁড়িয়ে আছে অল্প সিনথিয়া। উৎসুকজনতার উপচে পড়া ভীর।কারণ একটাই! কি করে মেয়ে হয়ে একটি পুরুষকে গুম করে দিলো? এই প্রশ্নে পুরো শহর যেনো তোলপাড়। রাতের অন্ধকার রাস্তায় ক‍্যামেরার ফোকাসে চারদিক আলোয় আলোকিত। হাজার হাজার প্রশ্ন, কি করে করলো? রায়হান রাফি এখন কোথায়?সে বেঁচে আছে কি না? সেই প্রশ্নের সম্মুখে মেয়েটি শুকনো মুখে,দূর্বল শরীরে, নিস্তব্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে। যেনো পৃথিবীতে সে আর নেই। সবাইকে ঠেলেঠুলে সরু রাস্তা বের করে দিচ্ছে কর্মরত পুলিশ সদশ‍্য। মানুষের ফাঁকফোকর মেয়েটিকে বাহু ধরে বের করে আনছে মহীলা পুলিশ। আর সিনথিয়া তাদের সাথে তালমিলিয়ে এলোমেলোভাবে হাঁটছে।চোখ দুটো রক্তলাল, টকটকে রক্তজবার ন‍্যায় লাল হয়ে আছে নাকের ডগা।শরীরের রক্তকণা যেনো নোনতা জল আকারে চোখ ফেটে নদীর ধারার মতো পড়ছে তার।

এরকম অপ্রত‍্যাশিত, অকল্পনীয়, অসম্ভাব‍্য, ঘটনার বাস্তব চিত্র নিজের স্বচক্ষে দেখে সমুদ্রের উচ্ছাসের মতো অসংখ‍্য প্রশ্ন তীব্র গতিতে মাথায় এসে বাড়ি খেলো ইরফাদ সিনহার। মেয়েটির চোখদুটির রক্তক্ষরণ যেনো পৌষমাসের হাড়কাঁপানো হীমশীতল বাতাসের ন‍্যায় তাকে একবার কাঁপিয়ে তুললো। পরোক্ষণেই আবার লার্ভার আগুনের ন‍্যায় শরীর গরম হয়ে উঠলো। কান দিয়ে অনবরত ধোঁয়া উঠতে থাকলো।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

হেডকোয়ার্টারের কেবিনে গম্ভীর হয়ে বসে আছে ইরফাদ। সাথে আছেন ডিআইজি প্রভাতরঞ্জন সরকার
, থানার কয়েকজন এসআই সহ রিজভী শিকদার। ইরফাদ কাজের বাইরে কথা খুব কম বলে। তবে আজ তাকে আরেকটু অন‍্যরকম লাগায় প্রভাতরঞ্জন সরকার বলে,– “হোয়াট হ‍্যাপেন্ড মাই ডিয়ার! গতকালের নিউজ দেখেছো তো?”
এরপরও ইরফাদের কোনো নড়চর নেই। মুখে কোনো কথাও নেই। প্রভাতরঞ্জন সরকার আবার বললেন,
— “কেস’ টা তো এক ধাপ এগিয়ে গেলো! তুমি খুশি হও নি?”

টেবিলে হাতের উপর ভর করে রাখা কপালটুকু থেকে হাত সরিয়ে নিলো ইরফাদ।চোখ দু’টি বন্ধ করে শরীর এলিয়ে দিলো চেয়ারে। চেয়ারটা হালকা দুলিয়ে ক্ষীণ শ্বাস ছেড়ে শীতল গলায় বললো,
— “কেস” এর দায়িত্ব কার উপর ছিলো?
–অফ কোর্স! আই গেভ ইট টু ইউ “মাই ডিয়ার”। প্রভাতরঞ্জন সরকারের “সুস্পষ্ট” গলা। ইরফাদ সিনহার গলা আবারো হীমশীতল। ইরফাদ চোখ বন্ধ করেই ডিআইজি’কে বললো,
— তাহলে আমাকে না জানিয়ে – মেয়েটিকে গ্রেফতার কেনো করা হলো?
— এছাড়া তো ও’য়ে ছিলো না ইরফাদ! সব কিছু উপর থেকেই নির্ধারণ করা হয়েছে।
–স‍্যাটিসফাইড আপনি!
— কি বলতে চাচ্ছো!
— মেয়েটিকে তুলে এনে,লকাপে ভরে সবাই স‍্যাটিসফাইড কি না!
— হোয়াই নট! আসামী গ্রেফতার। ভিক্টিম’কে যত তাড়াতাড়ি উদ্ধার করতে পারবো আমাদের জন‍্যে ততো ভালো।
–আপনি কি করে সিউর হচ্ছেন স‍্যার! মেয়েটিই আসামী?

— “প্রুফ হয়নি হয়ে যাবে!রায়হান রাফির চাচা ম‍্যাজিস্ট্রেট আশিক চোধুরী ভিক্টিম এর সাথে আসামী সিনথিয়ার প্রেমের বিষয়টি সিউর করেছেন।তিনি জানিয়েছেন, পারিবারিক ভাবে জানার পর- চৌধুরী বাড়ির বউ হিসেবে সিনথিয়া’কে রিজেক্ট করা হয়। এবং রায়হান রাফি’কে অন‍্যত্র বিয়ে করানো হলে- এই মেয়েটি তা সহ‍্য করতে পারে না।মেয়েটি এতো সাংঘাতিক যে,মিসেস রাফি’কেও প্রতি রাতে কল দিয়ে হেনোস্তা করেন এবং বিভিন্ন হুমকিও দিয়েছেন। মিসেস রাফি’র কল লিস্ট এর কপি পাঠানো হয়েছে। এবং তিনি স্বশরীরে সাক্ষী দিয়েছেন। অনিমা চোধুরীর ভাষ‍্যমতে, তাকে বিবাহের পর সিনথিয়া বিরক্ত করতেন, নানা ভাবে ব্ল‍্যাকমেইল করতেন।যেহেতু বিবাহ সম্পন্ন হয়েই গেছে সেহেতু আর কিছুই করার নেই। এই বিষয়টি সুন্দরভাবে বিষয়টি বুঝিয়ে বলতে রায়হান রাফি সেদিন আসামী সিনথিয়ার সাথে দেখা করার জন‍্যে বের হয়েছিলেন।এটার ই সুযোগ নিয়েছেন আসামি।কললিস্ট সহ আরও কিছু প্রুফ দেয়া হয়েছে।”

ইরফাদ সিনহা চোখ মুখ খিঁচে সিনেমাটিক গল্পটি গিলে নিলেন। ডিআইজি প্রভাতরঞ্জন সরকারের মুখে আবারো “আসামী সিনথিয়া” শুনে চোটে গেলেন। গমগমে গলায় স্পষ্ট উত্তর দিলেন,
–আগে প্রমাণ হোক!তারপর আসামী বলবেন। যে মেয়ে হুমকি দিচ্ছে এটা জেনে কেউ দেখা করতে যাবে? এই সিনেমাটিক গল্প শুনে কি প্রমাণ হয়ে যায়! মেয়েটি আসামী?
— মেয়েটি’কে রিমান্ডে নিলেই তো হয়ে গেলো। বাকি’টা গড়গড় করে বেরিয়ে আসবে…
–যা খুশি করুন…
— তুমি কি বলতে চাচ্ছো মেয়েটি নির্দোষ!
— নো স‍্যার! তবে সত‍্য মিথ‍্যার যাচাই না করে গ্রেফতার করার পক্ষপাতিত্ব নই।
— কিন্তু রাফির পরিবার থেকে কেস করা হয়েছে। এবং ম‍্যাজিস্ট্রেট দ্বারা ইমারজেন্সি ওয়ারেন্ট পাঠানো হয়েছে। কিছু করার ছিলো না!

— “রাফি ও সিনথিয়ার” প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে চুল পরিমাণ ও তাদের দুই পরিবার জানতো না। তাহলে, এই তথ‍্য তাদের কাছে কি করে গেলো স‍্যার!
— তুমি কি বলতে চাচ্ছো?
— আপনি যেটা ভাবছেন ঐ টাই।
–কিন্তু থানা থেকে এসব কে বলবে?
— “ঐ প্রুভ যদি থাকতো। তাহলে ইরফাদ কি এখনো বসে আছে?”
ইরফাদ সিনহার গলায় কি যেনো একটা ছিলো। কিসের আভাস দিলেন তিনি!
এমন কথায়,রিজভী শিকদার নড়েচড়ে বসলেন। ইরফাদ সিনহার সুস্পষ্ট গলা,
— এ‍্যাগাইন,স‍্যরি ! কেসটা আমি আর নিতে পারছি না।
ইরফাদের এমন সিদ্ধান্তে রিজভী শিকদার যেনো এবার খুশীই হলেন। এটাই কি চেয়েছিলেন তিনি?অন্ধের চোখে শেষ পট্টি খুলে তিনি তো এটাই দেখাতে চান পুরো ট্রিটমেন্ট তার হাতেই হয়েছে। তবে প্রভাতরঞ্জন সরকারের নাকোজ করা গলা,

— ইমপসিবল! তুমি না করলে কে করবে?
— আমার অনুপস্থিতিতে যে কাজ এগিয়ে রেখেছেন। তিনি ভালো পারবেন আশা করি।
প্রভাতরঞ্জন সরকার ইরফাদকে ভালো ভাবেই চেনেন। সে য‍দি একবার বেঁকে বসে,তাহলে সে কাজ তাকে দিয়ে কেউ করাতে পারবে না। প্রয়োজনে সে জব ছেড়ে দিবে। ঘটনার জটিল মোর দেখে তিনি বললেন,
— না করছো কেনো?
— যে সম্মান আমি ফিরিয়ে দিতে পারবো না, সে কাজ হাতে কেনো নেবো?
— মেয়েটি নির্দোষ হলে অবশ‍্যেই সেটি জানানো হবে।
— পরিষ্কার একগ্লাস স্বচ্ছ জলকে নর্দমার জলে মিসিয়ে যখন ভাববেন কাজ টা ঠিক হয়নি। তখন কি ঐ জল আবার গ্লাসে আগের ন‍্যায় তুলে এনে পান করবেন?

— কিসের সাথে কি তুলনা করছো?
— এটাই আমাদের সমাজ ব‍্যবস্থা স‍‍্যার! জেল খাটিয়ে আপনি যখন ঐ মেয়েকে নির্দোষ বলে ছেড়ে দিবেন। সবাই হয়তো সামনে “আহারে” বলবে। কিন্তু মন থেকে তাকে কেউ কাছে টানবে না।
— এই আধুনিক যুগে তুমি এই সব নিয়ে ভাবো?
–হোয়াই নট?
ধরে নিন,বিশাল জনসভায় আপনি স্টেজে দাঁড়িয়ে বক্তৃতা দিচ্ছেন। আপনার একটি সুন্দর সাবলিল কথায় সকলে একজোটে উপহাসের হাসি দিলো। আর হাসতেই থাকলো। আপনি হান্ড্রেড পার্সেন্ট কনফিডেন্ট,”আপনি ভুল বলেননি” কিন্তু সকলের একজোটে হাসি দেখে, আপনার কনফিডেন্ট লেভেল জিরো তে নেমে আসবে স‍্যার। অ‍্যাম আই রাইট?
কথার মাঝে পজ দিলেন ইরফাদ সিনহা। তারপর বললেন,

— যদি পাবলিক একজোট হয়ে আপনার মতো ডিআইজি’র “কনফিডেন্স” জিরো তে নিয়ে আসতে পারে। তাহলে সাধারণ এই মেয়েটি এবং মেয়েটির পরিবারের কি হতে পারে?
— সমালোচনায় কান দেয়া উচিত নয় ইরফাদ।
— সমালোচনা বলতে ইতিবাচক ও নেতিবাচক আলোচনাকে বুঝায়। কিন্তু মেয়েটির সাথে যেটা হবে তা হলো শুধুই নেতিবাচক আলোচনা। কিছু মানুষকে এভোয়েড করা যায়, পুরো দেশের মানুষকে না। আমরা সবাই জানি, দশের লাঠি একের বোঝা।

— যা হবার তো হয়ে গেছে।এখন কি করবো বলো?
–যে সম্মান আমি ফিরিয়ে দিতে পারবো না। সেই কাজ আমি করবোনা। ব‍্যাস! আমি যাচ্ছি…..
— কিন্তু ইরফাদ! বাবা! শোনো!
কাজটা ঠিকঠাক করতে না পারলে পুরো ডিপার্টমেন্টের নাম খারাপ হবে!
— তো আমার কি? পুলিশ কি আমি একা? পুরো দেশে আর কেউ নাই?
— কাম ডাউন মাই সান! কাম ডাউন! রাগের মাথায় কোনো ডিসিশন নিও না। টেইক ইউর টাইম।
— আপনার কি মনে হয়- না ভেবেই ডিসিশন নিয়েছি?
এই কেসের কোনো ক্লু নেই। কিডন‍্যাপ নাকি অন‍্য কিছু? রায়হান রাফি কোথায়? বেঁচে আছে কি না? এসব কেবল প্রশ্ন। এর কোনোটির উত্তর আমাদের কাছে নেই। “সিনথিয়া” শুধু মাত্র মাধ্যম। রাফির সম্পর্কে সত‍‍্য তথ‍্য শুধু তার মাধ‍্যেমেই আসতে পারে।ঐজন‍্য তাকে হাতে রাখা।মেয়েটি অনেক আতঙ্ক হয়েছিলো!আপনি জানেন? তাকে নর্মালাইজ করার জন‍্যে আমার নিজের ফর্মের বাইরে যেতে হয়েছে।কতশত কথা খরচ করতে হয়েছে! যাতে রাফির সম্পর্কে আরও গভীরের তথ‍্য জানতে পারি। আপনারা কি মনে করেন। রিমান্ডে নিলাম দুটো লাঠির বারি দিলাম আর সত‍্য বেরিয়ে আসলো? কিছু সময় মানুষের আবেগের সাথে মিশে তার ভেতরের কথাগুলো বের করতে হয় স‍্যার! তবেই না সমস‍্যার দোরগোড়ায় পৌঁছানো যায়।

— ঐজন‍্যেই তো তোমাকে কাজ দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত থাকি। আমি জানি তুমিই পারবে..
— সরি স‍্যার! আমি আসছি…
বলেই চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালো ইরফাদ। আগুনে ঝলসানো চোখে রিজভী শিকদারের দিকে তাকালো। যেনো চোখ দিয়েই ভস্মীভূত করে দিবে তাকে। তার চোখেই যেনো মনের কথাটা প্রকাশ পেলো ,
“আই’ল কিল ইউ, রিজভী শিকদার! একবার শুধু প্রমাণ হোক ।” তারপর লম্বা লম্বা পা ফেলে বাইরে চলে গেলো। রিজভী শিকদার তখনও ভাবছে কি ছিলো ইরফাদ সিনহার ঐ অগ্নীশীখা চোখে?

বস্তিতে পাওয়া লাশের আপডেট এসেছে। ছেলেটিকে বিষ খাইয়ে মারা হয়েছে। এবং মুখ ভারী কিছু দিয়ে থেতলে দেয়া হয়েছে। যাতে কেউ না চেনে। নিঁখোজ সকল ব‍্যাক্তিদের পরিবারকে ডিএনএ টেস্ট করার জন‍্য ডাকা হয়েছে। লাশটা নিঁখোজ কয়েক জনের মধ‍্যে কারো হতে পারে।
এরমধ‍্যে ইরফাদ সিনহার এ‍্যসিস্ট‍্যান্ট জানালেন।”একজন তার সাথে গতকাল থেকে দেখা করতে চাইছেন।” তিনি দেখা করবেন কি না? ইরফাদ সিনহা তাকে ভিতরে নিয়ে আসতে বললেন। মিনিট দু’য়েক পর একজন বয়স্ক লোক ভিতরে প্রবেশ করলেন।বসলেন মুখোমুখি। ইরফাদ সিনহা খুব স্বাভাবিক সুমিষ্ট গলায় বললেন,
— “আসসালামু আলাইকুম চাচা!
বৃদ্ধ লোকটি উত্তর নিলেন। তবে তাকে অপ্রস্তুত হতে দেখে, ইরফাদ সিনহা আরেকটু নরম গলায় বললেন,

— ভয় নেই চাচা! নির্ভয়ে বলুন।
— আসলে বাবা!
— হুম….
— বসতিতে যে লাশডা পাইছেন? ঐডা আমার পোলার!
— আপনার ছেলে কি নিঁখোজ? থানায় ডায়েরি করেছিলেন?
— “না বাবা! আমিই ওরে খু/ন করছি!”
বৃদ্ধের কথায় ইরফাদের কপালে কিঞ্চিত ভাজ পড়লো।মনে মনে ভাবলো “কি বলে!পাগল নাকি?” কিন্তু মুখে কোনো কথা বললো না। বৃদ্ধ লোকটি আবার তড়িঘড়ি করে বললেন,
–“সব কমু বাবা!শুধু আমার একটা আবদার আছে! ঐটুকু রাখবেন দয়া করে।”
ইরফাদ কিছু বলে ওঠার আগেই,বৃদ্ধ কাঁপা কাঁপা হাতে – ইরফাদের বলিষ্ঠ হাত তার মুঠোয় পুড়ে ফেলেন।

অনিমা এসেছে কারাগারে সিনথিয়ার সাথে দেখা করতে। দু’জন মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। মাঝখানে লোহার গারদ অনিমার টলমল চোখের প্রথম কথা,
— “তুই এমন করতে পারলি সিনু?”
অনিমার বলা অবিশ্বাসের প্রথম তীরটি বুকে এসে বিদ্ধ হলো সিনথিয়ার। দিয়াশলাইয়ের কাঠির ঘর্ষনে জ্বলে ওঠা আগুনের মতো বুকটা ধক করে জ্বলে উঠলো।সে তো ভেবেছিলো তার প্রাণপ্রিয় বন্ধু তাকে অন্তত সত‍্যি/মিথ‍্যা জিজ্ঞেস করবে।কিন্তু তা না করে সোজাসুজি অপরাধীর কাঠগড়ায় তাকে দাড় করালো।
— “এতো হিংসা তোর মনে ছিলো?”
এমন কথায় সিনথিয়া কামানের গুলি খাওয়ার মতো টাল সামলাতে না পেরে দু’পা পিছিয়ে গেলো। এমন দিন কেনো আসলো তার জীবনে!এমন ভাবনার মাঝে অনিমা বললো,
— “মেরে ফেলেছিস?”
এইবার সিনথিয়া নিজের শরীরের ভার আর টানতে পারলো না।সিনথিয়া এক পা দু’ পা করে দেয়ালে ঠেকে গেলো। এসব প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই। নিজের শরীরের ভার পায়ের উপর না রাখতে পেরে সে হাঁটু ভাজ করে বসে পড়লো। অনিমার বলা এক এক’টা কথা যেনো এক এক’টা বুলেট!

ইরফাদ সিনহা কৌতুহল নিয়েই জিজ্ঞেস করলেন,
–বলুন! কি আবদার!
— আমারে ফাঁসি দেওনের আগে আমার পোলার দাফন করার সুযোগ কইরা দিবেন। পোলাডা বাঁইচা থাকতি ম‍্যালা জ্বালাইছে স‍্যার।তাই ভাতের সাথে বিষ খাওয়াইয়া মাইরা ফালাইছি। তারপর কেউ জানি চিনবার না পারে তাই ইট দিয়া মুখ ছেইচ্চা দিছি। তারপর ময়লার স্তুপে ফালাই আইছিলাম। ভাবছিলাম মাইরা ফালাইলেই বাইচ্চা যামু। কিন্তু পোলায় ময়লার মধ‍্যে ঘুমাইতাছে,আমি ঘুমাইতাছি আরামের বিছানায়।বাপ হইয়া তো আমি মাইনা নিবার পারতাছি না স‍্যার।
ইরফাদ এমন অদ্ভুত ঘটনা শুনে পজ দিলেন। খানিকটা সময় পর বললেন,

–এসব কেনো করলেন?
— আমার পোলা জুয়া খেলতো স‍্যার।ট‍্যাকা দিয়ে নেশা-পাতি করতো। জুয়া খেইল‍্যা ঋণ হইতো। তখন নেশার করবার পারতো না। তখন চুরিও করতো।পাড়ার লোক আমারে খবর দিতো। তর পোলা চুরি কইর‍্যা ধরা পরছে ওমকের বাড়িত। মারতাছে! ছাড়ায়া লইয়‍্যায়। এই রকম দুঃখের চেয়ে বড় দুঃখ দুনিয়ায় আছে? আগে আগে সহ‍্য করবার না পাইরা, মাইনষের হাতে পায়ে ধইরা পোলারে ছাড়াই নিয়া আইছি। পোলাক বুঝাইছি। কিন্তু পোলা তো বাপের দুঃখু বোজে নাই। এগুলা ছাড়বার পারে নাই। যখন শুনতাম আমার পোলারে ধইরা মাইনষে বাইন্ধ‍া রাখছে, মারতাছে! বিশ্বাস করেন! মনে হইতো বলি, “ওরে ছাইরা দিয়া আমারে মারেন!” বাপের চোখের সামনে পোলারে মাইনষে বাইন্ধা রাইখা মারে!এর থাইক‍্যা কষ্ট পৃথিবীতে মনে হয় দুইটা নাই। ঐজন‍্যে আমার পোলা আমিই মাইরা ফালাইছি! আর তো কেউ মারবার পারবো না!”
এই হৃদয়বিদারক কথা শোনার পর! এই বাবা নামক জীবন্ত লাশকে কত “ধারায়” শাস্তির আওতায় আনবে!? কোন শাস্তি তার প্রাপ‍্য? ভাবছে ইরফাদ। বৃদ্ধের চোখ দুটো শুকিয়ে যাওয়া নদীর ন‍্যায়। লোকটি থেমে গিয়ে আবার বললেন,

রং পর্ব ৪

— একসময় অতিষ্ঠ হইয়া রাগে, দুঃখে মাইরা ফালাইছি! লাশ ফালা দিয়া আইছিলাম ময়লার ভিতরে। ভাবছিলাম কেউ জানবো না। আমি এল‍্যা শান্তির ঘুম ঘুমামু। কিন্তু আমি আর ঘুমাইবার পারি নাই। পরে অনেক বার ঐহানে গেছি। ভাবছি তুইলা আইনা ঘরের মধ‍্যে কবর দিয়া বাপ-ব‍্যাটা একলগে ঘুমামু। পরে শুনলাম লাশ পুলিশ লইয়া গেছে। পরে খুঁজতে খুঁজতে এইহানে আইছি। আমি আমার দোষ স্বীকার করছি স‍্যার! আমারে ফাঁসি দ‍্যান!খালি তার আগে পোলাডারে শান্তি মতো ঘুমাইবার ব‍্যবস্থা করেন স‍্যার। দাফনের ব‍্যবস্থা করেন!ও কোনো দিন শান্তি পায় নাই স‍্যার!
শেষের কথাগুলো যেনো কিছু একটা মেশানো ছিলো। এক বাবার করুণ আহাজারি যেনো হৃদয়কে নাড়া দিয়ে তুললো ইরফাদ সিনহার।

রং পর্ব ৬