Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৭

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৭

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৭
সিমরান মিমি

শিকদার মঞ্জিলের ড্রয়িংরুম জুড়ে পিনপতন নিরবতা। কোথাও নেই টু পরিমাণ শব্দ। শুধু সোফায় বসে থাকা মানুষগুলোর শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ বিনা কিছুর’ই অস্তিত্ব নেই। আমজাদ শিকদার বসে আছেন গম্ভীর হয়ে। পায়ের উপর পা তুলে গাম্ভীর্য নিয়ে বসা লোকটার মাথা নিচু, দৃষ্টি ফ্লোরের দিকে নিবদ্ধ। মুখশ্রীতে মিশ্র অভিব্যক্তি বিরাজ করছে। তিনি আদৌ রেগে আছেন, নাকি বিষাদে আছেন — তা বোধগম্য হচ্ছে না। তার পাশেই বসে আছেন আলতাফ শিকদার। তিনিও ভাইয়ের মতোই গম্ভীর। তবে মুখশ্রীতে নেই কোনো রাগের চিহ্ন। আদরের ভাইপোর প্রতি তিনি কি রেগে থাকতে পারেন? কখনোই না। বরং সে তো বোঝাবে। সময় নিয়ে ধীরে ধীরে পথভ্রষ্ট হওয়া ভাইপো’কে ফিরিয়ে আনবে সুপথে। যে পথে গেলে তার ভাগ্য, ক্যারিয়ার সবকিছুই হবে সমুজ্জ্বল।

অপর পাশের সোফায় বসে আছেন পিয়াসা। তিনি এখনো ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছেন। আদরের ছেলেকে এভাবে বশ করে ফেললো ওই মেয়ে ! এবারে কি হবে? আয়জার পরিণতি কি কম ভয়ংকর ছিলো? এতো কিছু জানার পরেও ছেলেটা এমন কেনো করলো? কি করে এই ফাঁদে পা দিলো! বড় জা কে সামলাচ্ছেন শিউলী। তার এ বিষয়ে কোনো অনুভূতিই কাজ করছে না। শুধু পরিবারের বাকি সদস্যদের চিন্তিত দেখে কিছুটা ভূমিকা পালন করছেন।
সবচেয়ে চিন্তিত, এলোমেলো এবং বিধ্বস্ত যাকে দেখাচ্ছে, সে হলো পাভেল শিকদার। সে অনুভূতি শূন্যের মতো মাথা হেলিয়ে বসে আছে। চোখ বন্ধ, কান বধির এবং কন্ঠ নির্বাক। এতোদিন ধরে অল্প অল্প করে সাজানো ছোট্ট স্বপ্ন টা ক্রমশ গুড়িয়ে যাচ্ছে। এই শীতেও চৌচির হয়ে যাচ্ছে হৃৎপিন্ড। মন চাইছে খুব জোরে একটা চিৎকার মারতে। তবুও পারছে না।

স্পর্শী তাকে প্রেমিক রুপে পছন্দ করে না, একথা জানার পরেও আশা হারায় নি। সে মনকে সান্ত্বনা দিয়েছিলো, তার চড়ুই অনুভূতি বোঝে না। আরেকটু সময় বাড়লে ঠিক বুঝে ফেলবে । এরপর যখন বুঝলো, স্পর্শী পরশকে পছন্দ করে। তখনও সুক্ষ্ম একটা আশা ছিলো যে তার ভাই স্পর্শীকে পছন্দ করে না। কিন্তু এখন! আজকের ঘটনার পরেও পাভেল কি করে শান্ত দেখবে। তার’ই চঞ্চলা চড়ুইটা, তার চোখের সামনে অন্যকারো সাথে ছোটাছুটি করবে — এসব কিভাবে সইবে সে?
রাত প্রায় সাড়ে দশটা। রাতের খাবারের সময় প্রায় আধঘন্টা দেরি হয়ে গেছে। পরশ ব্যস্ত পায়ে ড্রয়িংরুমে ঢুকলো। সম্মুখে বাড়ির সকলকে চিন্তিত অবস্থায় বসে থাকতে দেখে আশ্চর্য’ই হলো। বুঝে উঠতে পারলো না কারন। কপাল ঘুঁচিয়ে চিন্তিত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
— কিছু কি হয়েছে?
পিয়াশা নাক টেনে উঠলেন। অভিমান জড়িত কন্ঠে বলে উঠলো,
—কিছু কি বাদ রেখেছো তুমি?
পরশ চমকালো। তাকে দায়ী করছে মা। কিন্তু কেনো? এই কেনোর উত্তর খুঁজতে গিয়েই মনে পড়লো সন্ধ্যা পরবর্তী ঘটনা। এর মানে বাড়ির সকলের এই জরুরি মিটিং তাকে ঘিরেই ডাকা হয়েছে। সে ডান হাত উঁচিয়ে কপাল চুলকালো। এগিয়ে গেলো সোফার দিকে। ক্লান্ত ভঙ্গিতে সেখানে বসে বাবার দিকে তাকালো। সোজাসাপ্টা ভাবে জিজ্ঞেস করলো,

— বলো, কি করেছি আমি?
আমজাদ শিকদার মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকালেন। তিনি কথা বলতেই চান না। আলতাফ পরিস্থিতি সামলাতে ঝরঝরে কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
— তোমার ফুপুকে কতটা সাফার করতে হয়েছে, তা কি ভুলে গেছো?
পরশ চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো। বললো,
— ঘটনাটা ভোলার মতো নয়।
— তাহলে আবারও একই ভুল করছো কোন আক্কেলে? শামসুলের বড় মেয়ের সাথে কি সম্পর্ক তোমার?
— স্পর্শীয়ার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
আমজাদ শিকদার রেগে গেলেন। ক্ষিপ্ত কন্ঠে বললেন,
—বাহ! আবারো মিথ্যে। সকালে জিজ্ঞেস করেছি তখনও একই কথা বলেছো। লজ্জা করেনা বাবা- চাচার মুখের উপর মিথ্যে কথা বলতে? কাপুরুষের মতো অস্বীকার করছো কেনো, যেটা করেছো সাহস থাকলে তা স্বীকার করো।
‘কাপুরুষ’ — শব্দটা বেত্রাঘাতের মতো কর্ণকুহরে বাজছে। পরশ মেজাজ ধরে রাখতে পারলো না। ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালো। বজ্রকন্ঠে বলে উঠলো,
— আমি যেহেতু বলেছি কোনো সম্পর্ক নেই। তার মানে নেই। এর বাইরে টু শব্দটাও শুনতে চাই না।
আমজাদ শিকদার বিস্ফোরিত নয়নে পরশের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সে ইতোমধ্যে দোতলায় উঠে গেছে, নিজের রুমে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। পিয়াশা আবারো ঢুকরে উঠলেন। আর্তনাদ করে বলে উঠলেন,
— আল্লাহ! আমার ছেলেটারে কি করছে ওই মেয়ে? আমার পরশ জীবনে ওর বাবার সামনে উচ্চস্বরে কথা বলে নায়। সেখানে আজ…..

তিনি বাক্যটুকু শেষ করতে পারলেন না। এর পূর্বেই টেবিলের উপর রাখা ফুলদানিটা শক্ত হাতে ধরে ছুঁড়ে মারলেন আমজাদ। সেটা দেয়ালে ছিটকে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়লো ফ্লোরে। আমজাদ চেঁচিয়ে উঠে বললেন,
—কাঁদবে না, একদম ওই ছেলের জন্য কাঁদবে না। ওর যা খুশি করুক। যখন এসবের পরিণতি ভোগ করবে, রাস্তার পাগল হয়ে ঘুরে বেড়াবে — তখন আমি আমজাদ শিকদার দাঁড়িয়ে হাততালি দেবো।
ক্ষিপ্ত হলো পাভেল। বাবার সামনে পিঠ সোজা করে দাঁড়িয়ে মাকে আড়াল করলো। তেজী কন্ঠে চেঁচিয়ে বললো,
— এই গলাবাজি তোমার বড় ছেলের সামনে করো। খবরদার, আম্মুর সামনে চেঁচাবে না।
হতবাক হয়ে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইলেন আমজাদ শিকদার। পাভেলের চোখ জোড়া জ্বলছে দাবানলের মতো। লাল, রক্তবর্ণ হয়ে আছে তীব্র যন্ত্রণায়। যেনো চোখ ফেটে পানি নয়, এক্ষুণি রক্ত বের হবে। পিয়াশা এগিয়ে এলেন দ্রুতপায়ে। হতভম্ব হয়ে স্বামীর দিকে তাকালেন। পরক্ষণেই পাভেলকে ঠেলেঠুলে ঘরের দিকে পাঠালেন এবং বললেন,
— তোকে কথা বলতে কে বলেছে। এসব আমরা বুঝে নেবো।

রাতের খাবারটা ঠিক এগারোটার দিকে পরশের রুমে রেখে গেলো পিয়াশা। তখন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলো পরশ। মায়ের উপস্থিতি বুঝতে পেরে পিছুও তাকিয়েছিলো। কিন্তু পিয়াশার গম্ভীর, অভিমানী মুখশ্রী দেখে আর ভেতরে আসে নি। এদিকে সেও প্লেট রেখেই ফিরে গিয়েছে। কিছুক্ষণ পূর্বে ঘটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা’টা নিয়ে পরশ মোটেও চিন্তিত নয়। এমনকি তার এ নিয়ে কোনো কৈফিয়ত ও দিতে ইচ্ছে হচ্ছে। শুধু রাগ একটা জায়গাতেই। বারবার সে অস্বীকার করার পরেও সবাই কেনো সন্দেহ করছে। শুধুমাত্র একটা অসুস্থ মেয়েকে বাড়িতে পৌছে দেওয়ার কারনে? যদি এটাই কারন হয়, তবে এ ব্যাপারে টু শব্দটাও করবে না সে।
প্রায় আরো কিছুক্ষণ বারান্দায় অবস্থান করলো। শীতকালীন ঠান্ডা হাওয়া ছুয়ে দিচ্ছে শরীরকে। যা মুহুর্তে’ই হিম করে দেয় হাত-পা। পরশ এ পর্যায়ে ভেতরে চলে এলো। খাবার খেয়ে, ফ্রেশ হয়ে তবেই বসলো বিছানায়। নির্বাচনের আর মাত্র ছয়দিন বাকি। এদিকে সরকার থেকেই নির্দেশনা দিয়েছে ঘন ঘন মিছিল-মিটিং বন্ধ। ঠিক মতো প্রচারণাও সম্ভব হচ্ছে না। অথচ শামসুল সরদার ঠিকই সরকারের নির্দেশনা অমান্য করে রোজ রোজ মিছিল করছে। নিজের ক্ষমতা দেখাচ্ছে। পরশ চোখ দুটো বন্ধ করে ভাবলো নির্বাচনের কথা। একটানা পনেরো বছর ক্ষমতায় থাকা পাকা রাজনৈতিক ব্যক্তির বিপক্ষে লড়ছে সে। যদি নির্বাচন হেরে যায়, তখন কি হবে? শামসুল সরদার এবং তার দলের লোকেরা ঠিক কতটা সহিংস রুপ নিবে! হয়তো সরাসরি তাদের সাথে পেরে উঠবে না, কিন্তু তাদের সমর্থক। তারা কি আদৌ শান্তিতে থাকতে পারবে?

বিস্তর ভাবনা-চিন্তা করতে করতে এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়লো সে। কিন্তু হুট করেই ঘুম ভেঙে গেলো মাঝরাতে। গলা শুকিয়ে আসছে বারবার। শ্বাসরোধ হয়ে আসছে। পরশ দ্রুতপায়ে উঠলো। রুমের লাইট জ্বালিয়ে পানি খেয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলো। অস্থির লাগছে অনেক। এতোটা শীতেও শরীর ঘামছে। বারবার ঘুমানোর চেষ্টা করেও চোখে ঘুমেরা দেখা দিচ্ছে না। সে এ পর্যায়ে টেবিলের কাছে আসলো। চেয়ারে বসে মাথা হেলিয়ে ভাবতে লাগলো সারাদিনের কথা। ভালো লাগছে না। কিছুতেই কিছুতে মন শান্ত হচ্ছে না। পরশ ফোন হাতে নিলো। একপর্যায়ে স্ক্রল করতে করতে চোখে পড়লো স্পর্শীয়ার মেসেজ।

‚’কংগ্রাচুলেশনস, মিস্টার শিকদার! একটা মিষ্টি মেয়ে আপনার প্রেমে পড়েছে।’
পরশ আবারো নিঃশ্বব্দে হাসলো। মেসেজটা সে বিকেলেই দেখেছে। কিন্তু তখন হাসি আসেনি। বরং রাগ লাগছিলো। তবে এখন কেনো যেনো রাগ হচ্ছে না। বরং হাসি পাচ্ছে। মেয়েটা পুরোপুরি অদ্ভুত এবং উদ্ভট। একে গুন্ডা বলে আখ্যা দেওয়া যায় না, কারন এই মেয়ের মিষ্টত্ব পরশ নিজ চোখে দেখেছে। একে জোকার বলা যায় না, কারন এর চোখের বারিধারাও সে দেখেছে। একে ঝগরুটেও বলা যাবে না, কারন সে আস্ত একটা প্রেমের ফ্যাক্টরি। তবে, এতোকিছুর মধ্যে পাগল বলে আখ্যায়িত ঠিকই করা যায়। কারন সে পুরোপুরি পাগল! যখন যা ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা আচরণ করে বসে।
স্পর্শীয়ার কথা ভাবতে ভাবতে একসময় শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়ালো পরশ। মেয়েটাকে অজ্ঞান অবস্থাতে বাড়িতে রেখে এসেছে। সে কি আদৌ সুস্থ হয়েছে, নাকি হস্পিটালে ভর্তি করা হয়েছে। আচ্ছা, এ বিষয়ে কি তার খোঁজ নেওয়া উচিত?
পরশ অনেকক্ষণ ভাবলো, চিন্তা করলো। এমনকি সময়ও নিলো। কিন্তু তবুও মন মানলো না। শেষে এক পর্যায়ে তার নাম্বারে গুটি গুটি অক্ষরে পাঠিয়ে দিলো ক্ষুদ্র একটা মেসেজ।

ঘড়ির কাঁটায় ঠিক দুটো বাজে। স্পর্শীয়ার ঘুম ভেঙেছে মিনিটখানেক পূর্বেই। চোখ এখনো জ্বলছে। মাথা ভারী হয়ে আছে পাথরের ন্যায়। ধীরে ধীরে, সময় নিয়ে হেলান দিয়ে বসলো। হঠাৎই টুং করে একটা মেসেজের আওয়াজ এলো। স্পর্শীয়া বালিশের পাশ থেকে ফোন হাতে নিলো। অন করতেই স্ক্রিনের আলোয় চোখের পাতা বন্ধ করে ফেললো। খানিক সময় নিয়ে পুণরায় তাকাতেই চমকে উঠলো।
“জ্বর কমেছে?”
ছোট্ট একটা বাক্য। শব্দ মাত্র দুটো। অথচ স্পর্শীর পুরো শরীর কেঁপে উঠেছে। কেমন মিশ্র একটা অনুভূতি জন্ম নিয়েছে মাত্র’ই। এতো রাতে পরশ শিকদারের মেসেজ। একবার মনে হলো তার খুশি হওয়া উচিত। এই ভেবে যে,পরশ শিকদার একটু হলেও মজে গেছে স্পর্শীয়াতে। পরক্ষণেই আবার অন্যরকম অনুভূতি হলো। ঠিক অপরাধীর মতো আফসোস হতে লাগলো। মন বারবার সাবধান করে বলে উঠলো — স্পর্শীয়া কি আসলেই ঠিক?

সে নিজেকেই বুঝে উঠতে পারলো না আজ। এই পরিবর্তন টুকু কি শারীরিক অসুস্থতার জন্য? হয়তো তাই’ই হবে। আর তাছাড়াও, সে তো কোনো ভুল করছে না। নিজের মায়ের সুখের সংসার নষ্ট হওয়া, বাবার জীবনটা দূর্বিষহ করে তোলা আমজাদ শিকদারের চোখে আঙুল দিয়ে বুঝিয়ে দেবে তার বোন ভুল ছিলো। মাসের পর মাস অকারণে, ক্ষোভ এবং প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে তার বাবাকে জেল খাটিয়েছে। এতোটা নির্যাতনের পরিপ্রেক্ষিতে এতটুকু তো করাই যায়।
স্পর্শীয়ার গায়ের জ্বর কমেছে। তবে দূর্বলতা কমেনি, বরং বেড়েছে। সারা শরীর অসম্ভব ব্যথা করছে। এমনকি মাথাটাও ভার হয়ে আছে। এদিকে ঘুমও আর আসছে না। কি করা যায় এই অলস সময় টুকুতে? অন্ধকার রুমে ফোনের স্ক্রিন অন করে কল করলো পরশ শিকদারের নাম্বারে, কোনোরকম ভাবনা-চিন্তা ছাড়াই। যেহেতু মেসেজ ঠিক পাঁচ মিনিট আগে দিয়েছে, তার মানে এখনো ঘুমায় নি। ঘটলোও তাই। কল করার সাথে সাথেই রিসিভড করলো পরশ। স্পর্শীয়া উত্তেজনা দমাতে ঠোঁট চেপে হাঁসলো। পরপরই নিজেকে শান্ত করে বললো,

— বলুন।
— জ্বর কমেছে?
আবারো সেই একই প্রশ্ন। যেনো মুখস্থ করে রেখেছিলো। স্ক্রিপ্টের বাইরে আর কিছুই মনে নেই তার। স্পর্শী ছোট্ট করে বললো,
—উমমম…. একটু কমেছে।
পরশ শুনলো। ছোট্ট করে বললো, ওহহ! এরপর আর কিছুই খুঁজে পেলো না বলার। বলা উচিতও কি-না তাও জানে না। ফলস্বরূপ, চুপ করে রইলো। এ পর্যায়ে স্পর্শী নিজে থেকেই আড্ডা জমাতে ব্যস্ত হলো। নড়েচড়ে আয়েশ করে বসে মিষ্টি কন্ঠে বললো,
— ঘুমান নি কেনো এখনো?
অত্যন্ত ব্যক্তিগত প্রশ্ন। কিন্তু এই প্রশ্নের উত্তর পরশ কেনো দিতে যাবে? তার তো উচিত এক্ষুনি ফোন কেটে দেওয়া। জ্বর কমেছে কি-না, এটুকু জানতে চাওয়া উচিত মনে হয়েছে বলেই সে ফোন রিসিভড করেছে। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে কল কেটে দেওয়া উচিত। সে ফোন কাটতে উদ্যত হতেই ওপাশ থেকে স্পর্শী দুষ্টুমি করে বলে উঠলো,
—আমার চিন্তায় ঘুমাতে পারেন নি। উহু! বললাম তো, জ্বর কমেছে।
“কার সাথে কথা বলছিস? ”

গভীর রাতে নিস্তব্ধ, অন্ধকারাচ্ছন্ন রুমের এক কোনা থেকে গমগমে পুরুষালি আওয়াজে কেউ বলে উঠলো কথাটা। স্পর্শী চমকে উঠলো। হাতের ফোন ছিটকে পড়লো খাটের নিচে। “আয়ায়ায়ায়ায়ায়ায়ায়া” ধ্বনিতে চিৎকার মেরে খাট থেকে লাফ দিয়ে সুইচবোর্ডের দিকে এগোলো। দ্রুত হাতে লাইট জ্বালিয়ে এ পাশে ফিরতেই বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। রুমের কোনায় ড্রয়িংরুমের একটা ডাবল সোফা রাখা। সেখানে হাটু মুড়িয়ে বসে আছে সোভাম। কপাল ঘুঁচিয়ে বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সোভামের। বোনের কান্ডে সে বেজায় বিরক্ত।
স্পর্শীয়া তৎক্ষনাৎ মনে পড়লো সোভামের কথা। ঘুমানোর পূর্বে সে ভাইয়ের কন্ঠ শুনেছিলো। কোনোভাবে পা টিপে টিপে খাটের নিচ থেকে ফোন তুলে কেটে দিলো কল। থতমত খেয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
— তুই বাসায় যাস নি?
এই রাতে সোভাম বাসায় যাবে! আর সেটাও স্পর্শী জিজ্ঞেস করছে। বিষয়টা অত্যন্ত অপমানজনক। এমনিতেও এই বাড়িতে থাকার কোনো ইচ্ছেই তার নেই। সে তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ালো। বললো,

— হ্যাঁ, এক্ষুণি যাবো।
— আয়ায়ায়ায়া! না না, এখন কেনো যাবি। দুটো বেজে গেছে। সকালে যা।
একপ্রকার দুহাত দুপাশে মেলে কাকতাড়ুয়ার মতো আড়াল করে ভাইয়ের সামনে দাঁড়ালো স্পর্শী। সোভাম থামলো। পরক্ষণেই ভ্রুঁ কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
— ফোনে কার সাথে কথা বলছিলি?
পেট পুণরায় মোচড় দিয়ে উঠলো। স্পর্শী ঘাবড়ে গেলো। বললো,
— অনন্দা, অনন্দা ছিলো।
সোভাম সূচালো দৃষ্টিতে তাকালো। বললো,
—কিন্তু আমি তো মেয়েলি আওয়াজ পাই নি।
এরইমধ্যে দরজায় ধুমধাম আওয়াজ পাওয়া গেলো। শামসুল সরদার এবং সোনালী দরজা ধাক্কাচ্ছেন। স্পর্শী দ্রুত দরজা খুলে দিলো। মেয়েকে সজ্ঞানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে শামসুলের মুখশ্রী উজ্জ্বল হয় খুশিতে। মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করেন,

— মামনি, শরীর ভালো লাগছে এখন?
— হুম।
— কিন্তু তুমি চেঁচালে কেনো আম্মু?
সোনালীর প্রশ্নে স্পর্শীয়া সোভামের দিকে তাকায়। বলে,
— আমার অনেক খিদে পেয়েছে সোনামা। কিছু কি আছে? রুমে দিয়ে যাবা, প্লিজ!
সোনালী হেসে মাথা নাড়ালো। এরপর দ্রুত ছুটে গেলো রান্নাঘরে। ফিরে এলো দুজনের খাবার নিয়ে। শামসুল বিছানার এক প্রান্তে বসলেন। সোভামের দিকে কয়েকপলক তাকিয়ে দেখে নিলেন তার যুবক বয়সের প্রতিচ্ছবিকে। ক্ষণকাল পর খাবারের প্লেট’টা ছেলের সামনে দিয়ে মলিন কন্ঠে বললেন,

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৬

— খেয়ে নিও। ভয় নেই, খাবারটা খেলে বাবার প্রতি থাকা ঘৃণা এক ফোঁটাও কমবে না। বরং বাড়বে। কারন শামসুল সরদার আজীবন সকলের ঘৃণার পাত্র’ই হয়েছেন। তাকে কেউ ভালোবাসেনি।
সোভামের মধ্যে মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে। সে প্লেট’টা ছুলো না। তাকিয়ে রইলো অন্যদিকে। শামসুল সরদার প্লেটটাকে ঠেলে আরেকটু সামনে এগিয়ে দিলেন। কাতর গলায় বললেন,
— খেয়ে নাও আব্বু, তুমি যাওয়ার পর তোমার বাবার এই খাবার টুকুও জোটেনি। জেলে জেলে পঁচেছে সে।

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ২৮