Home রাজনীতির রংমহল ৩ রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪২

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪২

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪২
সিমরান মিমি

আজকের বিকালের আবহাওয়াটা বেশ মিষ্টি। নরম রোদ, শীতল উত্তুরে হাওয়া এবং হালকা মেঘ। গ্রীষ্মের সময়ে রোদ টা চড়া হওয়ার কথা থাকলেও আজ তার ঠিক উলটো। বৃষ্টি নামার পূর্বে যখন মেঘেরা হামাগুড়ি দিয়ে একে অন্যের সাথে মি লিত হয়, ঠিক সেই মূহুর্তের খানিক পূর্বের আবহাওয়া বলা যায় একে। ছোটো ছোটো উড়ন্ত মেঘের ফাঁক দিয়ে রোদেরা মলিন হয়ে উঁকি মারছে। হয়তো বলার চেষ্টা করছে, আজ আর আমরা আসবো না। কারন বৃষ্টিই তোমাদের প্রিয়।

ভীষণ চমৎকার এই বিকালে স্পর্শীয়া সরদার ব্যস্তহীন পায়ে হেঁটে আসছেন মাঠের দিকে। পড়নে গাঢ় সবুজ রঙের থ্রিপিস। ঠিক যেনো বন্যপাখি। সবুজ ঘাস-পাতার মধ্য থেকে ফর্সা শরীরটা মুক্তার ন্যায় চমকাচ্ছে। পরশের দৃষ্টি সরাসরি পড়লো ঠিক গলার উপর। সাদা স্টোনের কারুকার্য খচিত সরু চেইনটা জ্বলজ্বল করে দৃষ্টি কারছে। তার পাশেই সেই চিরাচরিত কালো তিল। যা প্রথম দিনেই নজর এড়ায়নি পরশের। সে আর বেহায়ার মতো মেয়েটাকে দেখলো না। চোখ ঘুরিয়ে অন্যত্র তাকালো। আজ তার জায়গায় পাভেল থাকলে হয়তো এভাবে লজ্জা পেতো না। বরং পাগলাটে যুবক স্পর্শীয়ার রুপের বর্ননা করতে গিয়ে বলে ফেলতো “ ঠিক যেনো একটা সবুজ বোতল হেঁটে আসছে। ”

স্থানটির নাম সোনা দিঘির পার্ক। বড্ড ছিমছাম, নিরবচ্ছিন্ন, শহর এলাকা থেকে অনেকটা দূরের জায়গা। যারা প্রকৃতিপ্রেমী নয়, তাদের কাছে মোটেও আকর্ষনীয় মনে হবে না। একদম সাদামাটা সবুজ ঘাসে ছেয়ে যাওয়া বিশাল একটা মাঠ। তারপাশে ধরে সুবিস্তীর্ণ ধানক্ষেত। পাশেই বয়ে চলেছে সরু নদী। নাম তার সোনা দিঘি। অবশ্য জায়গাটা এই নদীর নামেই পরিচিত। খুব একটা মানুষ আসে না এখানে। তবে যারা একটু নিরবতা,প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়ার ইচ্ছে পোষণ করে, তারাই ছুটে আসে কংক্রিটের শহর ছেড়ে।
আজকেও মাত্র কয়েক জোড়া কপোত-কপোতী ছাড়া এখানে তেমন ভিড় নেই। স্পর্শীয়া এগিয়ে এসে পরশের পাশে দাঁড়ালো। মাস্ক খুলে স্নিগ্ধ বাতাস টেনে নিলো ভেতরে। যেনো এতোক্ষণে প্রাণ ফিরে পেয়েছে। এরপর নদীর দিকে তাকিয়েই জিজ্ঞাসা করলো,

– খুব বেশি অপেক্ষা করিয়েছি?
পরশ আড়চোখে স্পর্শীয়াকে দেখে। চোখে মুখে প্রশান্তি ছাপিয়ে বলে,
– এতটুকু অপেক্ষা করে যদি সারাজীবন কাছে পাওয়া যায়, তবে ক্ষতি কি?
ব্যাস! পরিবেশটাই নষ্ট করে ফেললো এই শিকদার। স্পর্শীয়া চোখদুটো ছোটো ছোটো করে তাকালো। বললো,
– আপনি যে একজন এমপি, অন্তত তার একটু মান রাখুন। এভাবে ফ্লার্ট করবেন না। প্লিজ!
– এমপি হলে কি পুরুষের বৈশিষ্ট ভুলে যেতে হয়? কই, তোমার বাপ তো তা করে নি। প্রেম করে দু দুটো বিয়ে করেছে। আমি কি একটাও করবো না, স্পর্শীয়া?
কড়াভাবে কিছু বলার জন্য মুখ খুললো স্পর্শীয়া। পরক্ষণেই সে কথা গিলে ফেললো। যা বলার জন্য এসেছে, সেটুকু বলে পাঁচ মিনিটের মধ্যে এই জায়গা এবং লোকটার সঙ্গ ; দুটোই ত্যাগ করতে হবে। সে একপ্রকার অগ্রাহ্য করলো পরশকে। জিজ্ঞাসা করলো,

– আমায় ডেকেছেন কেনো?
– প্রেম করতে।
পরশের ভাবলেশহীন উত্তরে স্পর্শীয়া ভ্রুঁ কুঁচকায়। বিরক্ত হয়ে বলে,
– প্লিজ! আমায় যেতে হবে। আপনার সাথে রঙ্গলীলা করতে আসি নি আমি।
– তাহলে কি জন্য এসেছো?
পরশের ফিরতি প্রশ্নে স্পর্শীয়া চমকে ওঠে। লোকটার ভাবভঙ্গি সুবিধার নয়। আজকাল কেমন করে তাকায়। শরীর ঝিনঝিন করে ওঠে। ইচ্ছে হয় ছুটে অন্যত্র চলে যেতে। এই যে প্রশ্নটা করে মিটিমিটি হাঁসছে, এটাও বেশ গা জ্বালানো স্বভাবের। সেধে ঝগড়া করার ইচ্ছা। স্পর্শীয়া নিজেকে শান্ত রেখে উত্তর দিলো। বললো,
– আপনি আসতে বলেছিলেন, তাই এসেছি।
– আমি আসতে বললেই আসবে? কিন্তু কেনো আসবে?
সত্যিই তো! এই লোকের এক কথায় কোনো রকম দ্বিমত পোষণ না করে স্পর্শীয়া ছুটে এলো। কিন্তু কেনো? কি এমন দায় পড়লো? কথা তো ফোনেও বলা যেতো। সে উত্তর না পেয়ে হাসফাস করে উঠলো। অতঃপর পরশ নিজেই উত্তর দিলো। বললো,

– কারন তুমি আমায় ভালোবাসো। সেদিন ক্যাফেতে আমি তোমায় রিজেক্ট করার কারনে লজ্জায় পড়ে বলেছিলে, এগুলো নাটক। কিন্তু সত্যিকার অর্থে তুমি আমাকেই ভালোবাসো, তাই না?
স্পর্শীয়া হাসলো। বললো, ওহহ। তাই নাকি? আচ্ছা তারপর?
পরশ দৃঢ় কন্ঠে হেসে বললো, হ্যাঁ। তাই’ই। শুধু তুমি বুঝতে পারছো না।
স্পর্শীয়া চোখমুখ শক্ত করে নেয়। বলে, আমার বোঝার দরকারও নেই। শুনুন, মি: শিকদার। আমি আজ এখানে এসেছি আপনাকে সাবধান করতে। যতটুকু, যা হয়েছিলো – তা অতীতে। একটা অযৌক্তিক পরিকল্পনা করে দুজনেই এগিয়েছিলাম। কিন্তু সেসব কিছু সেদিন ক্যাফেতে শেষ হয়েছে। তাই দয়া করে এসব বিষয় নিয়ে আর সিনক্রিয়েট করবেন না। আপনার গার্লফ্রেন্ড আমার বাড়ির গেট অবধি চলে গিয়েছিলো কাল।
পরশ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। গার্লফ্রেন্ড! স্পর্শীয়া মিথ্যে মিথ্যে বানিয়ে কথা বলবে না সে ব্যাপারে সে নিশ্চিত। কিন্তু হঠাৎ এই গার্লফ্রেন্ড টাও বা কে সেটাও বোধগম্য হচ্ছে না। সে বুঝতে না পারার ভঙ্গিতে বললো,

– গার্লফ্রেন্ড মানে? কেমন দেখতে ছিলো মেয়েটা?
স্পর্শীয়া কয়েক সেকেন্ডের জন্য চমকালো। এরপর তাচ্ছিল্য করে হেসে বললো,
– বাহ! কনফিউজড হয়ে গেলেন দেখছি। তা কটা গার্লফ্রেন্ড আপনার? বুঝতে পারছিলেন না বুঝি কোন জন এসেছিলো!
পরশ এক মুহুর্তের জন্য বলতে চাইলো, তার কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই। পরক্ষণেই চিন্তাভাবনা পালটে হেসে বললো,
– হ্যাঁ সেটাই। এ বার নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট সুন্দরী নারী ভোটারদের থেকে পেয়েছি। অগোচরে কতজন’ই প্রেমে পড়েছে আমার। তাই বুঝতে পারছি না,আমার কোন প্রেমিকা তোমায় হুমকি দিতে এসেছিলো। তা তুমি বুঝি জেলাস?
স্পর্শীয়া দু পা এগিয়ে দাঁড়ালো। বললো,
– না, জেলাস নই। তবে আফসোস হচ্ছে। মেয়েগুলোর রুচি এতো খারাপ যে আপনার মতো গুন্ডা একটা লোকের প্রেমে পড়েছে!
পরশ হাঁসলো। সেও এগিয়ে এসে স্পর্শীয়ার পাশাপাশি দাঁড়ালো। ফিসফিস করে বললো,

– আমার রুচি তো আরো খারাপ। নাহলে তোমার মতো ঝগড়ুটে মেয়ের প্রেমে পড়ি?
লোকটা পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করতে চাইছে। ইচ্ছে করেই বারবার স্পর্শীয়াকে ক্ষেপাচ্ছে। কিন্তু সে তো আজ ক্ষেপবে না। বরং কড়া করে কয়েকটা কথা শুনিয়ে চলে যাবে।
– শুনুন, সে আপনি যার ইচ্ছা তার প্রেমে পড়ুন৷ এটা নিয়ে আমার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। আমি শুধু এটাই জানাতে এসেছি যে, আমি আপনাকে পছন্দ করি না। তাই আমাকে জড়িয়ে কোনো প্রকার খবর যেনো না রটে। আমার বাবার কানে এসব নিয়ে যদি কোনো কথা যায়, তবে আমি আপনাকে খুন করবো।
নদীর কিনারায় বাতাস তুলনামূলক বেশি। জামাকাপড় সব এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। স্পর্শীয়া একহাতে ওড়না সামলে অন্যহাতে কুঁচকে যাওয়া জামা ঠিক করতে লাগলো। পরশ আজ পাঞ্জাবি পড়ে নেই। তার পড়নে শার্ট প্যান্ট। স্পর্শীয়ার সামনে এমন পোশাকে এই প্রথম। প্রথম দিকে ক্ষানিক অসস্তি লাগলেও এখন ধীরে ধীরে কমে এসেছে। সে বাতাসের তীব্রতা দেখলো। এরপর দু-পা এগিয়ে ঠিক স্পর্শীয়া বরাবর তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আড়াল করলো। বাতাসটা এই মুহুর্তে সুবিশাল পাহাড়ের ন্যায় দাঁড়ানো পরশ শিকদারকে ভেদ করে স্পর্শীয়াকে খুব একটা বিরক্ত করতে পারছে না। স্পর্শীয়া সবটাই লক্ষ্য করলো। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বললো,

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪১

– আমি তাহলে এখন আসি।
– অনুমতি চাইছো? কেনো, যেতে না দিলে বুঝি যাবে না।
আচমকাই থমকে গেলো স্পর্শীয়া। পরশের দিকে স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে পিছু ঘুরলো। এতোক্ষণের কথাবার্তা দুষ্টুমিতে পরিপূর্ণ থাকলেও হঠাৎ পরিবেশ গম্ভীর হয়ে ওঠে। পরশের বাচনভঙ্গি পরিবর্তন হয়, মুখে গাম্ভীর্যতা ছড়িয়ে পড়ে। স্পর্শী ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে পা বাড়ালো। এখানে থাকা আর উচিত হবে না। সে কয়েক কদম এগোতেই পেছন থেকে আকুলতা মাখানো কন্ঠে পরশ ডেকে ওঠে – স্পর্শীয়া!
স্পর্শী থেমে যায়। পেছন ঘুরে চোখে চোখ না রেখেই বলে, বলুন।
পরশ তখনো নির্বিকার হয়ে তাকে দেখছে। লোকটা যেনো নিরুপায়। কন্ঠে অসহায়ত্ব এনে অনুরোধ করে বললো,
– আর কিছুক্ষণ থাকবে?

রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪৩