রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৫০
সিমরান মিমি
ধীর পায়ে সদর দরজার সামনে এসে স্পর্শীয়া দাঁড়িয়ে পড়লো। দোর ভেতর থেকে লক করা। অনেক ডাকাডাকির পর বাহাদুর চাচা গেট খুলে দিয়েছে। বাড়ির এরিয়ার ভেতর ঢুকতেই পরশ চলে গেছে গাড়ি নিয়ে। হয়তো রেগে ছিলো খানিকটা। তবে এসবে মন দেওয়ার সময় এখন নয়। জামাই মানুষের রাগ একটা চুমুতেই গায়েব হয়ে যায়।
রাত দেড়টা বাজে। স্পর্শীয়া অনর্গল বেল বাজাতে লাগলো। একসময় বিরক্ত হয়ে ভেতর থেকে এগিয়ে এলেন পিয়াসা। তিনি জেগেই ছিলেন। দরজা খুলে স্পর্শীকে সামনে দেখে টু শব্দটাও করলেন না। চুপচাপ চলে গেলেন সোভামের ঘরে।
ভেতর থেকে দরজা লক করে স্পর্শীয়া সিঁড়িতে উঠলো। শামসুল সরদারের রুমের দরজা মাত্রই খুলেছিলেন। হয়তো এতো রাতে কে এসেছে তা দেখার জন্য। স্পর্শীয়াকে দেখে তিনি পুণরায় ঘরে ঢুকে বন্ধ করে দিলেন দোর। ছুটে গিয়েও বাবার নাগাল পেলো না স্পর্শী।
– আব্বু, দরজা খোলো। আমার তোমার সঙ্গে কথা আছে।
স্পর্শীয়া দরজায় কয়েকবার টোকা দিলো। বাবাকে ডাকলো। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না। সে ওভাবে আরো কিছুক্ষণ ডাকতে লাগলো। নিস্তব্ধ রাতে এই কন্ঠস্বর সরদার বাড়ির চার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। পাশের রুম থেকে বেরিয়ে এলো রিহান সরদার। পেছনে তার স্ত্রী। সে তাচ্ছিল্য করে বললো,
– কিহ! বের করে দিয়েছে? নাকি ঘরেই তোলেনি। যদি তাই ’ই হয় তবে নির্লজ্জের মতো আবার এ বাড়িতে ঢুকেছো কেনো?
স্পর্শী শক্ত চোখে রিহানের দিকে তাকালো। তেজ দেখিয়ে বললো,
– চুপ থাকুন। আমি আপনার সঙ্গে কথা বলছি না ভাইয়া। আব্বুর কাছে এসেছি।
হুমায়রা সহ্য করতে পারলো না। স্বামীর অপমানে মুখ থমথমে করে বললো,
– তুমি একটা বেয়াদব। একেই তো বাড়ির সবার মুখে চুনকালি দিয়েছো — তার উপর বড় ভাইয়ের মুখে মুখে কথা বলছো।
কিঞ্চিৎ হাসলো স্পর্শী। ভ্রুঁ উঁচিয়ে বললো,
– তাই নাকি। তাহলে আপনি তো আরো বড় বেয়াদব ভাবী। আপনি নিজেও তো পরিবারের অমতে রাতের অন্ধকারে ভাইয়ার সাথে পালিয়ে এসেছেন। এখন অবধি বাপের বাড়ির সাথে সম্পর্ক নেই। সেখানে আমি তো সবার সামনে দিনের আলোয় বিয়ে করেছি। সেটাও আবার সবাইকে জানিয়ে।
সোনালী সবটাই শুনতে পেলেন। চোয়াল শক্ত করে এগিয়ে এসে বললেন,
– কথায় লাগাম টানো স্পর্শীয়া।
ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যাচ্ছে। কিন্তু এতে স্পর্শীরও বা কি দোষ! সেতো ইচ্ছে করে ঝামেলা বাধাচ্ছে না। কেউ যদি জেনে শুনে খোঁচায়, তাহলে কতক্ষণই বা চুপ থাকা যায়? সে সোনালীর দিকে তাকালো না। মাথা নত করে বললো,
– ভাই-ভাবীকেও থামতে বলো সোনামা। আমায় যেনো শুধু শুধু অপমান করতে না আসে। শাসন আর অপমানের তফাৎ বোঝার বয়স হয়েছে আমার। তাদেরকে সাবধান করে দিন। আমায় ঘাটতে আসলে কিন্তু আমিই একদম ঘেটে দেবো।
এই বলে থমথমে পায়ে সে নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেলো। ভালো লাগছে না। এমনিতেই মুড সুইং হচ্ছে, সবকিছু বিরক্ত লাগছে। তারমধ্যে আবার হুদাই ঝামেলা পাকাতে আসে লোকজন। স্পর্শীয়া একটা বিষয় খুব ভালো করে খেয়াল করেছে। সে এবং সোভাম আসার পর থেকে এ বাড়ির বাকিরা খুশি হলেও চক্ষুশূল হয়েছে রিহান এবং হুমায়রার। দুজনেই কেমন খিটমিট করে তাকিয়ে থাকে।
সে রাতে বাবাকে আর বিরক্ত করলো না। সময় দিলো রাগ ভোলার।
ভোরের আলো ফুটেছে অনেকক্ষণ। স্পর্শীয়া আজ সকাল সকাল জেগেছে। ভেবেছিলো ব্রেকফাস্ট টেবিলে বাবা-ভাইয়ের মুখোমুখি হবে। কিন্তু দুজনের কেউই আসেন নি। সোভামের তো কোনো পাত্তাই পাওয়া যাচ্ছে না। এমনকি গলার আওয়াজও নয়। খাবার সময় প্লেট টা নিয়ে রুমে ঢোকে পিপাসা। এরপর দরজা আবারো বন্ধ! শামসুলেরও একই কান্ড। স্পর্শীয়া বুঝে উঠতে পারে না এই সমীকরণ। আজব ব্যাপার! কারো উপর রাগ হয়েছে, তো বাইরে এসে মন খুলে ঝগড়া করো। এভাবে দরজা আটকে বসে থাকার মানে কি?
স্পর্শীয়া একবার ভাবলো সে সোভামের ঘরে যাবে। মা ঢোকার সময় জোর করে ঠেলেঠুলে ঢুকে পরবে। এই ভেবে সে মায়ের পিছু পিছু হাটলো। কিন্তু দরজা অবধি যাওয়ার পূর্বের কেউ একজন তার নাম ধরে ডাকলো। বাহাদুর চাচা। তার হাতে ছোটো একটা বক্স। স্পর্শী এগিয়ে যেতেই হাত বাড়িয়ে বক্সটা দিলো। হাতের নক খুটতে খুটতে বললো,
– আপনের জামাই দিয়া গেছে।
জামাই শব্দটা শুনেই পিয়াশা রক্তচক্ষু নিয়ে বাহারের দিকে তাকালো। ড্রয়িংরুমে খলিলুর সরদার বসা। বাহাদুর এক মুহুর্তের মধ্যে জিভ কেটে সংশোধন করলো। বললো,
– পরশ শিকদার….
এই বলে সে ছুটে পালালো একপ্রকার। স্পর্শী মৃদু হাসলো। মন পুলকিত হয়ে গেলো মুহুর্তেই। তার জামাই! হ্যাঁ, তার জামাই দিয়ে গেছে। উফফ! বিষয়টাই কেমন অদ্ভুত ভালো লাগার। সে সোজা ঘরে চলে গেলো। বক্স খোলার ভেতরে আরো একটা বক্স দৃশ্যমান হলো। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এটা মোবাইল। সে ফুরফুরে মনে ফোন অন করে পরশকে কল করলো। ওপাশের ব্যক্তি যেনো অপেক্ষাতেই ছিলো। স্পর্শী উড়ুউড়ু মন নিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো,
– আপনি এলেন, অথচ আমায় ডাকলেন না কেনো?
– এমনিই!
অতি সংক্ষিপ্ত উত্তর। এই একটা শব্দেই প্রকাশ পাচ্ছে সমস্ত অভিমান। স্পর্শীয়া হাসলো। দুষ্টুমি করে বললো,
– এমনিই! আচ্ছা বেশ। আমি ভাবছিলাম দু-তিন মাস এখানেই থাকবো।
পরশ প্রত্যুত্তর করলো না। কিছুক্ষণ থেমে সম্মতি জানিয়ে অভিমান জড়িতে কন্ঠে বললো,
– বেশ! থাকো।
নাহ! এভাবে ভালো লাগছে। সদ্য বিবাহিত দম্পতির মধ্যে এমন মান অভিমান থাকা ভালো নয়। তাই সন্ধি করতে স্পর্শীয়াই এগিয়ে এলো। আহ্লাদী কন্ঠে বললো,
– মাত্র তো একদিন হলো। আর দুটোদিন প্লিজ! এরপর চলে আসবো। কথা দিলাম।
– বেশ! সাবধানে থেকো। কোনো ঝামেলা হলে আমায় জানাবে। রাখছি….
পরশের সঙ্গে আজ ফোনালাপ দীর্ঘক্ষণের জন্য হলো না। হয়তো নব্য এমপি ভীষণ ব্যস্ত। স্পর্শীয়া নেমে এলো নিচতলায়। সোভামের দরজা অর্ধ খোলা অবস্থায় রয়েছে। ফাঁক পেয়ে তক্ষুনি ঢুকে পড়লো। ভেতরের অবস্থা দেখে স্পর্শীয়া স্থির থাকতে পারলো না। টেবিলে অনেকগুলো ওষুধ জড়ো করে রাখা। পাশেই আধখাওয়া স্যুপ। গায়ে মোটা কম্বল জড়িয়ে শুয়ে আছে সোভাম। চোখমুখ লাল হয়ে আছে। প্রতিটা নিঃশ্বাসের সঙ্গে কেঁপে উঠছে যেনো। পিপাসা মাথায় জলপট্টি দিতে ব্যস্ত। স্পর্শীয়া হতবাক হয়ে আর্তনাদ করে উঠলো। বললো,
– ওর কি জ্বর এসেছে আম্মু?
পিপাসা উত্তর দিলো না। স্পর্শীয়ার আওয়াজ পেয়ে খানিকটা গুমড়ে উঠলো সোভাম। দূর্বল কন্ঠে বললো,
– ওকে যেতে বলো। আমার রুমে ওর উপস্থিতি সহ্য করতে পারছি না।
পিপাসা তবুও চুপ রইলেন। সোভামকে স্যুপ খাওয়ানোর চেষ্টা করে বললেন,
– কথা বলিস না, একটু ঘুমানোর চেষ্টা কর। সারা রাত ঘুমাসনি।
স্পর্শীয়া বাকহারা হয়ে গেলো! সোভাম অসুস্থ! এ জন্যই তার কোনো আওয়াজ পাওয়া যায় নি। এমনকি বাড়ির কেউ তাকে বলার প্রয়োজন বোধ টুকুও করেনি। ভাবনার মধ্যেই রুমে প্রবেশ করলেন শামসুল সরদার। তার কপালে চিন্তার ভাঁজ। ব্যস্ত পায়ে এসে সোভামের পাশে বসলো। কপালে হাত দিয়ে জ্বরের মাত্রা অনুভব করার চেষ্টা করলো। বললো,
– জ্বর তো আবার বেড়েছে। সকালের ওষুধ কি খাইয়েছিলে?
পিপাসা মৃদু কন্ঠে জবাব দিলো। বললো,
– স্যুপটাই খায় নি এখনো।
স্পর্শী এগিয়ে এলো। ঝুঁকে ভাইয়ের কপালে হাত ছোয়াতে গেলো। এরইমধ্যে আটকে দিলো সোভাম। রেগে ছুড়ে ফেললো স্যুপের বাটি। চিৎকার করে বললো,
– তুই একদম আমার কাছে আসবি না। আম্মু, ওকে যেতে বলো। আমি কিন্তু কোনো ওষুধ খাবো না। বের হয়ে যাবো বাড়ি থেকে।
এতোক্ষণে মুখ খুললেন শামসুল। গম্ভীর কন্ঠে স্পর্শীয়াকে বললেন,
– রুমে যাও!
শব্দদুটো শূলের মতো বিধলো। দুচোখ ছলছল করে উঠলো মুহুর্তেই। সোভামের দিকে একবার তাকিয়ে স্পর্শীয়া চুপ করে বের হয়ে আসলো। তবে নিজের রুমে গেলো। ঢুকলো বাবার ঘরে। দরজা চাপিয়ে লুটিয়ে বসলো খাটের কাছে। দু হাতে মুখ ঢেকে কাঁদলো অনেকক্ষণ। মন টা কেমন করছে। সে-রাতে বাগানে বসে তাকে পাহারা দিয়েছিলো সোভাম। নিশ্চয়ই মশা কামড়েছিলো খুব। বৃষ্টিভেজা রাতে ঠান্ডাও লেগেছিলো। সেজন্যই জ্বর এসেছে। স্পর্শীর মন কু ডাকতে লাগলো। সোভামের কি ডেঙ্গু হয়েছে! নাহলে এভাবে গা কাঁপিয়ে জ্বর কেনো হবে? উফফফ! চারপাশ টা কেমন তেতো লাগছে।
“তোমার এখন ঘরের অভাব নেই। যেখানে মন চায় সেখানে যাও। তবুও আমার ঘর ছাড়ো। ”
ঘুম ভেঙে গেলো স্পর্শীর। চমকে জড়োসড়ো হয়ে তাকালো বাবার দিকে। সে এখনো ফ্লোরের উপর বসে। বিছানায় মাথা রেখে এভাবে কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলো তা মনে নেই। হঠাৎ বাবার স্বর কানে যেতেই ধড়ফড় করে উঠলো। সময় নিয়ে স্বাভাবিক হওয়ার পর বুঝতে পারলো বাবার কথার মর্মার্থ। স্পর্শী বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকালো। মৃদু আর্তনাদ করে বললো,
– আব্বু!
শামসুল উত্তর দিলেন না। হেঁটে চলে গেলেন বারান্দায়। স্পর্শীয়া স্থির হয়ে বসে রইলো। অনেকটা সময় নিরব থাকার পর সেও বারান্দায় গেলো। বাবার থেকে অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে কঠোর কন্ঠে বললো,
– আমায় ত্যাগ করেছো?
শামসুল বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে পেছনে তাকালো। চোখেমুখে প্রশ্নের ছাপ। স্পর্শীয়া কাঠিন্যতা বজায় রেখে পূর্বের মতো বললো,
– তাহলে খোলাখুলি বলে দাও। কখনো অধিকার নিয়ে এ বাড়িতে আর ঢুকবো না।
– এসব কি ধরণের কথা হচ্ছে?
স্পর্শীয়া দমলো না। একই সুরে বললো,
– কেনো? বাড়ির সকলের ব্যবহার দেখে তো তাই’ই মনে হচ্ছে। আমি এ বাড়িতে এসেছি বলে নির্লজ্জ, বেহায়া, যা নয় তাই শুনতে হচ্ছে।
– তুমি যে আচরণ করেছো, তার’ই উত্তর পাচ্ছো।
স্পর্শী গায়ে মাখলো না। মাথা ঠান্ডা করলো। শান্ত কন্ঠে বললো,
– বেশ! মানছি আমার ভুল। এবার তুমি এমন কিছু কারন বলো, যেগুলোর জন্য পরশ শিকদারকে বিয়ে করা আমার উচিত হয়নি।
শামসুল সেকেন্ড সময়ও ব্যয় করলেন না। চেচিয়ে বললেন,
– সবচেয়ে বড় কারন ও আমজাদ শিকদারের ছেলে।
– এটা কোনো কারন হতে পারে না আব্বু। একজন মানুষের দোষ, গুণ তার বাবার উপর নির্ভর করে না। এমন যদি হয় তবে আমিও দোষী। কারন আমি শামসুল সরদারের মেয়ে। যেই শামসুল সরদার স্বার্থপরের মতো নিজের অজ্ঞাত ছেলে-মেয়েকে শত্রুর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে। ছেলেকে পরিকল্পনা করে মার খাইয়ে ফায়দা তুলেছে। এমনকি ওই সময়ে তুমি আমার পেছনে কতগুলো গুন্ডা পর্যন্ত লেলিয়ে দিয়ে ভয় দেখাতে চেয়েছো, যাতে আমি ওদেরকে পরশ শিকদারের লোক ভেবে প্রেস মিডিয়ায় তার নামে কলঙ্ক রটাই। সম্মানহানী চেষ্টার মামলা দেই। আমি সেই শামসুল সরদারের মেয়ে যে কি-না জেনেশুনেও পরশ শিকদারকে মার্ডার করতে চাওয়া আসামীকে হেফাজতে রেখেছো, এমনকি তাকে পুষছো পরবর্তীবার ছোবল দেওয়ার জন্য। তাহলে কি এবার বাইরের লোকজনও আমায় ঘৃণার চোখে দেখবে? বলবে ও শামসুল সরদারের মেয়ে। ওও অপরাধী!
শামসুল হাসফাস করছে অসস্তিতে। হয়তো লজ্জাও পাচ্ছেন। তা উপলব্ধি করে স্পর্শীয়া পুণর্বার সাবধান করলো। বললো,
– আব্বু প্লিজ! আমার মুখ খুলিয়ো না। ভেবো না স্পর্শী বোকা। আমি ঘাসে মুখ দিয়ে চলি না। রাস্তায় বেরোলে আমার অগোচরে লোক তোমার নামেও কম কথা বলে না। সেসব কানে আসে আমার। প্লিজ!!
থেমে,
আব্বু, আমি জানি পৃথিবীতে কেউ’ই নির্দোষ নয়। প্রত্যেকেরই দোষ, ভুল অগণিত আছে। তুমিও যা করেছো নিশ্চয়ই তার বিপরীতে বিপরীত পক্ষ থেকেও কিছু করেছে। ক্ষমতায় টিকতে গিয়ে নানাভাবে, নানা কাজে জড়িয়ে গেছো। কিন্তু, কিন্তু প্লিজ আমায় এভাবে অবহেলা করো না। অনেক বছর পর তোমায়, তোমাদের একসাথে পেয়েছি। একটু ক’টা দিন শান্তিতে থাকতে চেয়েছিলাম…
শামসুল মেয়ের দিকে এগিয়ে এলেন। মেয়ের গাল আকড়ে ধরে করুন কন্ঠে বললেন,
– কিন্তু তুমি তো থাকোনি মা। আমার কাছে একটা বছরও থাকো নি। তিন মাসের মধ্যেই নিজের পথ নিজেই বেছে নিয়েছো।
শামসুলের চোখের কোটরে পানি। স্পর্শীর কলিজা ছিড়ে এলো যেনো। সে আলতো করে বাবার বুকে মাথা রাখলো। ধীর কন্ঠে বললো,
– ভাইয়ার ফ্লাটে যেদিন এসেছিলে, সেদিন কি বলেছিলে মনে আছে? যে তৃষ্ণাকে ছেড়ে এক মুহুর্ত থাকাও তোমার পক্ষে অসম্ভব ছিলো, তাকে ছেড়েই গত দুই যুগ কাটিয়েছো। শুধুমাত্র ভাগ্যে ছিলো বলেই দিনের পর দিন অসহায় হয়ে ভাগ্যের সাথে তাল মিলিয়েছো। অথচ আজ আমার বেলা কেনো ভাগ্যকে মানছো না? কেনো বুঝতে পারছো না, যে পরিবারকে তুমি সারাজীবন শত্রু বলে এসেছো, সেই পরিবারটাই তোমার মেয়ের গন্তব্য। আচ্ছা আব্বু, ভাগ্যে না থাকলে — আমি চাইলেই কি যে কারো সাথে জড়িয়ে যেতে পারতাম?
শামসুল স্পর্শীয়ার কথার গভীরে ঢুকে গেলেন। সত্যিই কি তার মেয়ের ভাগ্যে ওই পরিবার ছিলো! যদি তাইই হয়, তবে আল্লাহ কেনো তার মেয়ের ভাগ্যে এতোটা অবিচার করলেন? এর চেয়ে স্কুলের একজন শিক্ষকের সাথেও বিয়ে হলেও তিনি নিশ্চিন্তে থাকতে পারতেন। হঠাৎ একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে বললেন,
– যেখানে আমি জানি আমার মেয়ের ভবিষ্যৎ ভয়ানক হতে চলেছে, সেখানে বাবা হিসেবে ভাগ্যের উপর দোহাই দিয়ে কি করে নিশ্চিন্ত থাকবো মা? ওরা আমাকে আজও আয়জার খুনী মানে। আমি তোমাকে কি করে ঐ বাড়িতে রেখে চোখ বন্ধ করবো?
– তুমি কেনো চিন্তা করছো আব্বু? ওরাও তোমার মতই ভয় পাচ্ছে। তারা আমাকে নিয়ে আতংকিত। উলটো ভাবছে, তোমার উপর হওয়া অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতে ও বাড়িতে ঢুকেছি। আমি নাকি যে কোনো সময় ওদের ছেলেকে গলা টিপে মেরে ফেলবো!
বলতে বলতে স্পর্শী হেসে ফেললো। আকুল কন্ঠে বললো,
-আব্বু, তুমি তো নিজের পছন্দ মতোই আম্মুকে বিয়ে করেছিলে। এমনকি সে চলে যাওয়ার পরেও তোমার দ্বিতীয় স্ত্রীকে মানতে পারো নি। তাহলে আমি কি করে আমার পছন্দের মানুষটাকে ছেড়ে অন্য কাউকে বিয়ে করবো? ও ভীষণ ভালো একটা মানুষ। হয়তো তোমরা রাজনৈতিক ভাবে শত্রু। কিন্তু তাই বলে ও কখনোই তোমাকে অসম্মান করেনি। ও চাইলে এ অবধি অজস্র বার আমার ক্ষতি করতে পারতো। এজন্য আলাদা করে বিয়ে করার দরকার ছিলো না। তুমিই বলো না, পরশ কি আমার জন্য অযোগ্য? মানুষটা শিক্ষিত, ভদ্র, মার্জিত, ভালো একটা অবস্থানে রয়েছেন, আমায় সম্মান করে, এমনকি চরিত্রহীন ও নয়। তাহলে তাকে নিজের জীবনের সাথে জড়াতে বাধা কিসের? বিশ্বাস করো, আমাদের খুব সুন্দর একটা সংসার হবে। তুমিই নিজেই একদিন বলবে – আমার মেয়ের সিদ্ধান্ত ভুল নয়।
শামসুল দোটানায় পড়ে গেলেন। কি বলবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না। সবকিছু এড়িয়ে গিয়ে ছোট্ট করে বললেন,
– যাকে বিয়ে করবে, সে শুধু যোগ্য হলেই হয় না। মেয়েদের সংসার সুন্দর করার জন্য একটা ভালো পরিবার লাগে। সেটা তোমার নেই মা। পরশের মতো হাজারটা যোগ্য পাত্র পাওয়া যাবে, কিন্তু দিনশেষে একটা ভালো পরিবারের অভাব তোমায় কুড়ে কুড়ে খাবে।
স্পর্শীয়া বাবার কথা শুনে গম্ভীর হয়ে উঠলো। বুক থেকে মাথা সরিয়ে কঠোর কন্ঠে বললো,
– বেশ! এবার খোলামেলা কথায় আসা যাক। মানছি আমি ভুল করেছি। এবার তুমি সমাধান বলো। কি করবো? ও বাড়িতে আর যাবো না? পরশকে ডিভোর্স দিয়ে দেবো? আচ্ছা বেশ! এডভোকেটকে ফোন দাও। আমি ডিভোর্স দিতে তৈরি।
শামসুল চমকে উঠলেন। রেগেও গেলেন খানিকটা। হঠাৎ নাকের পাটাতন ফুলিয়ে হাত উঁচিয়ে বললেন,
রাজনীতির রংমহল ৩ পর্ব ৪৯
– তুমি এক্ষুনি আমার রুম থেকে বের হও। আর কখনো আসবে না। যাও।
স্পর্শীয়া যেতে যেতে হাসলো। বললো,
– আশ্চর্য! বিয়েটাও মানবে না, আবার ডিভোর্স দিতেও দিবে না। তুমি আসলে চাইছো টা কি? আমি দু বাড়ির গেটের সামনে বসে থাকি!
