রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি পর্ব ২৩
মাহরিণ তৃণ
” নেতাসাহেবর পদধূলি পড়েছে আমার বাসায়? অবিশ্বাস্য লাগছে। এগারো বছর পরে নাসিরাবাদে..।”
” এগারো বছর পর নাসিরাবাদে নয় আপনার বাসাতে। ”
” একই কথা। তবে তোমার হঠাৎ এমন আগমনে বিস্মিত হলেও বেশ খুশি হয়েছি। ”
দুই সোফায় মুখোমুখি বসে আছে সান্নিধ্য এবং রাজ্জাক সাহেব। কালো শার্টে আবৃত পুরুষটি পায়ের উপর পা তুলে পেশিবহুল দুই হাত ছড়িয়ে বসেছে। চাহনি তার বেজায় গম্ভীর হলেও কন্ঠ বেশ শান্ত পর্যায়েই আছে ।
” আগমনে খুশি হয়েছেন কিন্তু বিদায়ে অখুশি হবেন।”
” মানে? ”
সান্নিধ্য কিঞ্চিৎ ঠোঁট প্রসারিত করে তাকায়। মাথা নাড়িয়ে বলে,
” মানে কিছু না। আপনার সাথে কিছু কথা আছে। আপনি মামা না হয়ে অন্যকেউ হলে আমার লোকেরাই আমার হয়ে কথাগুলো বলে দিতো। বাট আত্মীয় মানুষ বিশেষ করে আম্মার দিকের। একটু সেনসেটিভ। এইজন্য নিজেই আসলাম।”
” বাহ্ এতোদিনে কদর করা শিখলে তবে? ভালো লাগলো। মামা হিসেবে মানো তাহলে। ”
” কেনো কনফিউশান আছে এই নিয়ে? ”
” উঠতে বসতে তো কখনো মামা হিসেবে গুরুত্ব দাওনা । সবসময় নিজস্ব অ্যাটিটিউড নিয়ে চলো। সরফরাজ তাও একটু মামার কথা মানে, চলে। তুমি তো ধারের কাছও ঘেঁষো না।”
” আপনার ধার ঘেঁষে আমার লাভ কি? ”
রাজ্জাক সাহেব চা পান করতে গিয়ে সান্নিধ্যের বাঁকানো প্রশ্নে হালকা কেশে উঠে। পিরিচ খানা রেখে চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বলে, ” নাহ লাভের কি হবে। তুমি হচ্ছো ক্ষমতাসীন দলের প্রধান। এমপি সাহেব। আমাদের ধার ঘেঁষে লাভ কি আছে বলো?”
” এসব অবান্তর দুঃখের কথা আমি শুনতে আসিনি। যেটা বলতে এসেছি সেটা ক্লিয়ারলি শুনুন।”
” হাহা.. সবসময় এতো দাবানলের মতো গরম হয়ে থাকো কেন সান্নিধ্য ? স্পর্শ করলেই দগ্ধ হতে হয় আমাদের। বুঝতে পেরেছি তো কি কথা বলবে। ”
সান্নিধ্য বাম হাতখানা ভাঁজ করে থুতনির নিচে রাখে। কপাল কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,” আপনি জানেন আমি কি বলবো?”
” হ্যাঁ জানি কি বলবে তুমি।”
” ঠিক আছে বলুন তাহলে ।”
ধীরে সুস্থে চা পান করে টেবিলে সিরামিকের কাপটা রাখেন রাজ্জাক সাহেব। আরাম করে বসে চোয়ালে হাসি ঝুলিয়ে বলেন, ” অন্বেষাকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব দিতে এসেছো। আমি জানতাম তুমি প্রথমে যতই না.. না করো না কেনো শেষে এসে ঠিকই রাজি হবে। তার উপরে নাজনীন আমাকে কথা দিয়েছিলো তোমাকে রাজি করিয়েই ছাড়বে। আমি একটু বিভ্রান্ত ছিলাম এই নিয়ে কারণ তুমি তো একরোখা মানুষ। সহজে কারো কথা মূল্যায়ন করো না। কিন্তু এখন দেখছি আমার ধারণা ভুল হয়ে নাজনীনের কথাই সত্য প্রমাণিত হলো। যে মানুষ এগারোটা বছর স্বইচ্ছায় কখনো আমার বাসায় পা রাখেনি সেই মানুষ নিজে এসেছে বিয়ের প্রস্তাব দিতে। ইমাজিন করা যায়? ”
সান্নিধ্য মনোযোগ সহকারে কথা শোনো শেষে ঠোঁট উলটে হাসে। রাজ্জাক সাহেবের হতে চোখ নামিয়ে নিচের দিকে দৃষ্টিপাত রেখে বলে,” আপনি এই মাথা নিয়ে বন্দরে বিজনেস করেন কেমন করে? মা*রা খান না? ”
পিছন প্রান্তে দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়ানো আসিফ সান্নিধ্যের কথায় ঠোঁট কামড়ে হাসে। রাজ্জাক সাহেবের ভোঁতা মুখটার দিকে দৃষ্টি দিয়ে সে চোখ সরিয়ে নেয় সঙ্গে সঙ্গে ।
” এসব কি বলছো? মা*রা কেন খাবো? আমার বিজনেস সম্পর্কে তোমার কোনো আইডিয়া আছে? ”
” এসব আইডিয়া শুনে আমার কোনো কাজ নেই। আপনি ভাবলেন কি করে আমি সান্নিধ্য আপনার ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করবো? আপনার মেয়েকে বিয়ে করার জন্য নিজে এসে প্রস্তাব দিবো? ভাত খান নাকি পাতা খান? ”
” বেয়াদবি করছো কিন্তু তুমি আমার সঙ্গে ।”
” বিলিভ মি, আপনি যদি আমার সম্পর্কে মামা না হতেন এখানেই একদম শেষ করে দিয়ে যেতাম। পিছনে পিঠে ছুরি চালানো সারাজীবনের জন্য বন্ধ করে দিতাম। সুবিধা করতে পারছেন না জন্য মেয়েকে লাগিয়ে দিয়েছেন।
আমার সঙ্গে সুবিধা খুঁজতে আসবেন না। একদম জানে মেরে ফেলবো।”
রাজ্জাক সাহেব শক্তচোখে এক দৃষ্টিতে থাকে তাকিয়ে সান্নিধ্যের কড়া চাহনির দিকে। কয়েক সেকেন্ড আগের ঠান্ডা চাহনির হঠাৎ এমন উত্তাপ্ত রুপ দেখে সে খানিকটা নিজেকে দমিয়ে নেয়।
” সমস্যাটা কি? ”
” সমস্যা কিছুই না। কালকে বেলা বারোটার মধ্যে ফুল ফ্যামিলি নিয়ে চট্টগ্রাম ছাড়বেন। চট্টগ্রামে থাকার সুযোগ আপনি হারিয়ে ফেলেছেন। আমি দুই বার ভালোমতো ওয়ার্নিং দেই আমার পিছন ছাড়ার জন্য কিন্তু তিনবার নয়।”
” ক্ষতি আমার হ’য়েছে। তোমার নয়।”
“সেই ক্ষতি পূরণ করতে আপনার মেয়েকে আমার ঘাড়ে দিতে চাইছেন। আমার ফ্যামিলিকে কনভেন্স করছেন। আম্মাকে ইমোশনালি অ্যাটাক করছেন।”
” তোমার আম্মা নিজে তোমার জন্য আমার মেয়েকে পছন্দ করেছে। এতো বছর ধরে বিয়ের জন্য আশা দেখিয়ে রেখেছে।”
সান্নিধ্য বাঁকা হাসে। থুতনি হতে হাত সরিয়ে বলে, ” আর আপনি সেই আশায় ঢোল পিটিয়ে নেচেছেন৷ এতোই সোজা দাবার গুটি নিজের দিকে টেনে নেওয়া? ”
” এখন আমার ভুল ধরতে এসেছো?তোমার জন্য আমার কত বড় ক্ষতি হয়েছে ভুলে গিয়েছো? আজ যে ক্ষমতা তুমি আমাকে দেখাচ্ছো এটা আমার দেখানোর কথা ছিলো। গাদ্দারি করে আমাকে টেনে নামিয়েছো নিচে। ”
” আপনাকে শুধু নিচে টেনে নামিয়েছি মাটিতে যে পুঁতে ফেলি নাই শুকরিয়া করুন। আমি গাদ্দারি করি না, যা করি চোখে চোখ রেখে করি। এসব বচন আমাকে শুনাতে আসবেন না। যেটা বললাম সেটা মাথায় রেখে চুপচাপ চট্টগ্রাম হতে বিদায় হন।”
রাজ্জাক সাহেবের মুখোরেখায় পরিবর্তন আসে সান্নিধ্যের প্রতিটা ধারালো কথায় । ক্রুব্ধ নয়নে তাকিয়ে বলেন,
” চট্টগ্রাম বাবার নাকি? তুমি বলবে আমি চলে যাবো? ”
” চট্টগ্রাম আমার বাবার প্রমাণ করতে কি আমাকে মাঠে নেমে আপনাকে তাড়াতে হবে? আপনি যদি চান আমি নিজহাতে সরিয়ে দেই তাহলে বলুন। আমি রেডি আছি।”
” শান্ত হও সান্নিধ্য। তোমার সঙ্গে আমি লাগতে চাই না। এজন্য কিন্তু নিজের ডাউনফল মেনে নিয়েও তোমাদের ফ্যামিলির সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছি্। নাজনীন নিজে ইচ্ছে পোষণ করেছে দেখে আমরাও মত দিয়েছি। বুঝতে পারছি আগের ঘটনাগুলোর জন্য তুমি আমাকে সন্দেহ করছো। কিন্তু সত্যি কথা বলতে তোমার সঙ্গে অন্বেষার বিয়ের পিছনে কোনো ফায়দা লুটার চিন্তা আমার নেই। আমি জানি তুমি কেমন ধরনের মানুষ। চাইলেও সে সুযোগ দিবে না। আর তোমার সঙ্গে আমার ঝামেলা তুমি আমার ফ্যামিলি টানছো কেন?”
” কারণ আপনারা তিনজনই এক একটা বিষ। আপনার মেয়ে তো অন্য লেভেলের নাটকবাজ। যে কাজটা করেছে ভাগ্য ভালো ও মেয়ে। ছেলে হলে… ”
” ভাই থাক বাদ দেন। ”
আসিফের বাঁধায় সান্নিধ্য থেমে যায় । হাত ঘড়িতে সময় দেখে পায়ের উপর হতে পা নামিয়ে সে সোজা হয়ে উঠে দাঁড়ায়।
একইসাথে রাজ্জাক সাহেবও উঠে দাঁড়ান। দুজন মুখোমুখি হতেই সান্নিধ্য ফের ধারালো স্বরে বলে, ” কালকে ঠিক বেলা বারোটা বিশে আমার লোকজন এসে এই বাসা দেখে যাবে। মানুষ হোক বা জিনিস পত্র হোক চোখ পড়লেই তারা তাদের মতো ব্যবস্থা নিবে। আমার কোনো হাত থাকবে না। শুধু নির্দেশনা থাকবে।
আর যেহেতু একদিন পরেই আমি বিয়ে করতে যাচ্ছি । আমি চাই না আপনারা আম্মার কাছে গিয়ে নতুন নাটক শুরু করেন বা কোনো ধরনের ঝামেলা সৃষ্টি করেন। তাকে উল্টোপাল্টা বুঝান। চট্টগ্রামের বাহিরে যদি কোথাও থাকার জায়গা না হয় আমাকে বলবেন ব্যবস্থা করে দিবো।”
” শুধু মাত্র তোমার বিয়ের জন্য আমাদের চট্টগ্রাম হতে তাড়াচ্ছো? ”
” আপনারা হচ্ছেন আত্মীয়ের নামে কালসাপ। ভরসা নেই। আম্মার মনে আমার ওয়াইফকে নিয়ে যে বিষ ছড়াবেন না এটা হতেই পারে না৷ এছাড়া আপনাকে তিনবার ওয়ার্নিং দেওয়া ও শেষ, আত্মীয়ের কোঠায় বারবার পার পেয়ে যাচ্ছেন এইতো অনেক। কিন্তু হ্যাঁ, যেদিন ধরবো…সেদিন কোনো কোঠা দেখবো না। ”
রাজ্জাক সাহেব বিদ্রুপ কন্ঠে হেসে বলেন, ” এতো ভালোবাসা নেতাসাহেবের মনে, জানা ছিলো না। তবে ভুল করছো। ”
” আপনি চট্টগ্রাম ছাড়ুন। আমি ভুল শুধরে নিচ্ছি। আসি।”
সান্নিধ্য পকেটে দু’হাত রেখে নির্বিকারচিত্তে বেরিয়ে যায় কক্ষ হতে। আসিফ স্থির মূর্তি হয়ে দাঁড়ানো রাজ্জাক সাহেবের দিকে এগিয়ে আসে। কন্ঠ নামিয়ে বলে, ” মামা সময়টা কিন্তু বারোটা বিশ। মনে যেনো থাকে। আর না মনে থাকলে দেখা হবে, সাক্ষাৎ হবে মোলাকাতও হবে। ভালো থাকুন। আসছি।”
” জানো*য়ার গুলো।”
|সকাল দশটা, বৃহস্পতিবার, পাহাড়তলী|
কাল শুক্রবার। শেহরিন সান্নিধ্যের বিয়ে। রিজওয়ান সাহেব যখনই এই বিশেষ কথাটা সবার সামনে উন্মুক্ত করেছেন তখনই বিস্ময়ে বিয়ের কনেসহ শফিক সাহেব, শাহিদা বেগম সবাই চোখ বড় বড় করে তাকিয়েছেন। বিশেষ করে শেহরিন। যে মানুষটার সাথে কাল সে দিনের অর্ধেকটা সময় পার করে এসেছে, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের মাঝে নিজেদের ভালোবাসার স্বীকারোক্তি দিয়ে এসেছে সে তার অজান্তেই একদম বিয়ের দিনক্ষণও ঠিক করে ফেলেছে বাবার সাথে? কখন করলেন উনি? ম্যাজিক জানে নাকি !!
” দুলাভাই আমি একটা অনুরোধ রাখতে চাই। বিয়েটা যেহেতু হচ্ছেই আমি একমাত্র মামা হিসেবে আমার ভাগ্নির বিয়েটা আমার নিজ বাসা হতে দিতে চাই। আপনার কোনো প্রকার না আমি শুনবো না। ”
” আচ্ছা ঠিক আছে ব্যস্ত হতে হবে না। আমি দুটো কমিউনিটি সেন্টারের সঙ্গে কথা বলেছি। এখনও কনফার্ম করেনি। দেখা যাক।”
শেহরিন গোল গোল চোখ করে তাকায় বাবার দিকে। মুমুর হাত চেপে ধরে নাজুক কন্ঠে বলে, ” কমিউনিটি সেন্টারও ঠিক করে ফেলেছো বাবা? এতোকিছু কবে হলো? কখন হলো? আমি কোথায় ছিলাম?”
” সান্নিধ্য কিছু বলেনি তোমাকে? ”
” কিছুই বলেনি। ”
মুমু শেহরিনের হাতে চিমটি কাটে। সরু চোখে তাকিয়ে কানের কাছে ফিসফিস কন্ঠে বলে, “উহ অনিভা আপু নাটক করো না। হাতের আঙুলে এতো সুন্দর একটা রিং জ্বলজ্বল করছে। ভেবেছো কেউ বুঝতে পারবে না তাই না? ঠিক বুঝতে পেরেছি। এমপি সাহেবের সাথে চুপিচুপি এনগেজমেন্ট সেড়ে এসেছো তাই না?”
শেহরিন আড়চোখে তাকায় মুমুর দিকে। সাবধানী কন্ঠে বলে,” ছোট মানুষ হয়ে বেশি বুঝো তাই না? কে বলেছে এটা এনগেজমেন্ট এর রিং? অন্য কিছুও তো হতে পারে। ”
” আমাকে উল্টো বুঝ দিতে এসো না মেয়ে। এনগেজমেন্ট এর রিং এমনই হয় আমি জানি। তলে তলে এমপি সাহেবের সাথে এতো গভীর প্রেম ছিলো আর আমি জানতাম না। আমার আর আরশির ক্রাশ ছিলো উনি জানো? এভাবে আমাদের হৃদয় ভাঙতে পারলে? ব্যথা লাগলো না তোমার? “.
” তোদের জন্যই বোধহয় ইঁচড়েপাকা বাগধারাটা তৈরি হয়েছে মুমু। ক্লাস নাইনে পড়া বাচ্চা মেয়ে আমার মতো ভার্সিটি পড়া মেয়ের সাথে টক্কর দিতে আসিস? তোর বয়স কত? আর আমার বয়স কত?”
” বয়স দিয়ে কি হবে। নেতাসাহেব তো তোমার চেয়ে অনেক বড়।”
” বড় হলেও মানানসই আছে। কিন্তু তোরা তো চুনোপুঁটি। চোখই ফোটেনি ঠিকঠাকভাবে আবার ক্রাশ খাস? কি এমন আহামরি দেখতে নেতাসাহেব যে এমন ক্রাশ খেতে হবে জনে জনে ? ”
মুমু শেহরিনের কথা শুনে তাজ্জব বনে যায়। চোখ একদম ছোট ছোট করে মুখ বাঁকিয়ে বলে,” খারাপই যখন দেখতে তাহলে আমাকে দিয়ে দাও নেতাসাহেবকে। ”
” মামার বাড়ির আবদার? ”
” হু আমার বাবা তো তোমার মামাই হয়। আবদার তো করতেই পারি। ”
” বেশি কথা বলো না মেয়ে। মামিকে বলে দিবো? ”
“তোমাকে সেদিন দেখেই বুঝেছি আপু, তোমার আর নেতাসাহেবের কিছু একটা আছে। টিভির রিমোট পর্যন্ত ভার্সিটিতে নিয়ে গেলে যাতে আমরা দেখতে না পাই । ভাবা যায়? রন্ধ্রে রন্ধ্রে জেলাসি।”
শেহরিন দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মামিকে ডাকার জন্য মুখ খুলতেই শক্ত করে হাত চেপে ধরে মুমু।জোরপূর্বক হেসে বলে,” এমনি এমনি বলছি তো আপু৷ সত্যি সত্যি না। আমরা হচ্ছি চুনোপুঁটি আর তুমি হচ্ছো জেলিফিশ। টান তো তোমার দিকেই থাকবে বেশি।”
দুবোনের গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুরে বিরক্ত হন শাহিদা বেগম। নিজেদের মাঝে চলমান কথা থামিয়ে ভারী কন্ঠে বলেন,” চুপ করো একটু তোমরা। দরকারি কথা চলছে। একটা দিনের মধ্যে বিয়ের আয়োজন সহজ কথা নয়।”
” অনিভা মা। ”
” জ্বি মামা।”
” আমার বাসা থেকে যদি তোমার বিয়েটা হয়। খুব কি খারাপ হবে? ”
শেহরিন মামার প্রশ্নে দ্বিধা দ্বন্দ্বে ভোগে। সে তো এমনিতেই এসব বিষয়ে কিছু জানতো না। তাদের মতোই মাত্র শুনছে। বিয়ে কোথায় থেকে হবে কোথায় থেকে হলে ভালো হবে এতোকিছু তো ভাবেইনি।
” বাবা..”
” তুমি এতো বোকা কেনো মুমুর বাবা? জানোই তো অনিভা নিজে কখনো কোনো কিছুতে সিদ্ধান্ত নেয় না। যা নেওয়ার দুলাভাই নেয়। দুলাভাইকে জিজ্ঞেস করো।”
শাহিদা বেগমের আজকে এমন ভোলবদল দেখে অবাক না হয়ে পারে না শেহরিন । একদম পুরো অন্যরকম। চেনা দায় যেনো।
দুদিন আগে যে মানুষটা বেয়া’দব ইউএনও এর সাথে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলো আজ সেই কিনা নেতাসাহেবের সঙ্গে বিয়েতে এতো আগ্রহ দেখাচ্ছে? কাহিনী কি এরকম রূপ পাল্টানোর? অন্যান্য দিন যেমন মুখে আঁধার ঘনিয়ে রাখে আজ একদম পরিষ্কার আকাশের ন্যায় ঝকঝক করছে।
” কানা বগীর বড় মায়ের হয়েছেটা কি? ”
মনে মনে বিরবির করতে করতে শেহরিন মুমুকে টেনে একটু দূরে সরে নিয়ে আসে। হাত পাকড়ে ধরে বলে, ” একটা সত্যি কথা বল তো মুমু। ”
” কি হয়েছে আপু? ”
” ওই ব্যাটা ইউএনও কে নিয়ে কি কিছু হয়েছে তারপরে আর? ”
” ইউএনও এর কথা বলছো তুমি? তোমাকে যে ওই ব্যাটাই কিডন্যাপ করেছিলো এটা মনে হয় ফুপাজান বাবাকে বলেছে। সেই থেকে বাবা তো ভীষণ রাগ। মামণিকে মনিকা আন্টিকে অনেক কথা শুনিয়েছে।”
“কিন্তু মামাকে দেখে মামি তো ভয় পায় না। আজকে মামি এতো পজিটিভ কেন আমার বিষয়ে ? ”
” মামণি সাজতে পছন্দ করে। তোমার বিয়ে উপলক্ষে একগাদা শপিং করতে পারবে, পার্লারে যেতে পারবে এজন্য হয়তো পজিটিভ। ”
মুমুর বোকা বোকা উত্তরে শেহরিন চাপা নিঃশ্বাস ছাড়ে। যতটুকু বুঝতে পারছে সেদিনকার ঘটনার পর হতে মামা একটু শক্ত হয়েছে। তবে, মামির পরিবর্তনটাও মনে প্রশ্ন রেখেই যায়।
” আমার ইচ্ছে ছিলো ঢাকা থেকেই বিয়ের আয়োজনটা সম্পন্ন করার। কিন্তু সান্নিধ্য যে এতো তাড়াহুড়ো করে বিয়ের ডেটটা কালকে নিয়ে আসবে জানা ছিলো না।”
” আচ্ছা সমস্যা নেই। বিয়েটা যেহেতু ঘরোয়াভাবেই হচ্ছে তাহলে আর এতো চিন্তা কিসের দুলাভাই। যে সমস্ত আয়োজন না করলেই নয় সেটা আমরা অনায়াসে কম্পিলিট করে ফেলতে পারবো। আপনি শুধু রাজি হন আমার বাসায় থেকে মেয়ের বিয়ে দিবেন।”
রিজওয়ান সাহেব স্থির ভাবনায় মশগুল হন। পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে বলেন,” তোমার একার সিদ্ধান্তে আমি কোনো কথা দিতে পারছি না শফিক। বিয়ে যতই ছোটোখাটো করে করা হোক আয়োজনটা একটু ভালোভাবে না করলেই নয়। আই মিন আপ্যায়নের কথা বলছি আর কি। এক্ষেত্রে শাহিদার মতামত কি? ”
শাহিদা বেগম স্বামীর পানে এক পলক তাকিয়ে মুখে বিস্তর হাসি ঝুলায়। উৎসুক কন্ঠে বলে, ” দুলাভাই অনিভা কি আমার মেয়ে নয় বলুন? এর জন্য আমাকে আলাদাভাবে মতামত দিতে হবে? আমি মন থেকে চাই অনিভার বিয়েটা আমাদের বাসা থেকে হোক।”
” কোনো সমস্যা হবে না তো? ”
” লজ্জা দিবেন না দুলাভাই দয়া করে।”
রিজওয়ান সাহেব ধীরগতিতে মাথা নাড়িয়ে বলেন, ” আচ্ছা তোমরা যখন বলছো তাহলে তাই হোক। খুলশী ফাইনাল।”
” ধন্যবাদ ধন্যবাদ দুলাভাই। খুশি হলাম। ”
” অনিভা তোমার প্রয়োজনীয় সবকিছু প্যাক করে নাও। একসঙ্গেই বের হই। আর এখানে যেসব ফ্রেন্ড আছে চাইলে তাদের বলতে পারো।”
” মামণি আমরা নিজেরা হলুদের একটা প্রোগ্রাম করবো। ”
” আচ্ছা সেটা সন্ধ্যায় হবে।”
রিজওয়ান সাহেব বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। পকেট হতে ফোনটা বের করে সোজা চলে যান বেলকনিতে। যত ছোট করেই বিয়ে হোক মেয়ের গহনা সহ প্রয়োজনীয় কিছু তো দিতেই হবে। শেহরিনের জন্য নিজস্বভাবে গহনা করা হয়নি। যা গহনা সব তার মায়ের। মায়েরটাই মেয়ের জন্য রেখেছেন রিজওয়ান সাহেব। যে কঠিন সময় পার করে এসেছেন তখন এসব নিয়ে কোনো ভাবনা চিন্তা ছিলো না৷ মেয়ে, বিজনেস সামলাতে গিয়ে প্রচুর হিমশিম খেতে হতো তাকে সবসময় ।
” কাদের। ”
” জ্বি ভাইজান।”
” কালকে অনিভার বিয়ে।”
ফোনের অপর পাশে থাকা ব্যক্তিটি এক মুহূর্তের জন্য নিশ্চুপ হয়ে যায়। ভাইজানের বলা কথাটা ঠাহর করতে একটু সময় লাগে তার। অতঃপর অবিশ্বাস্য কন্ঠে বলে, ” আল্লাহ। আমার অনিভা মায়ের বিয়া? কি কন ভাইজান!! ”
” তুমি আজকেই চলে আসো। ”
” আমি..? আমি ক্যামনে যাই বাড়ি থুইয়া? ”
“কোনো সমস্যা নেই। শেহরিন বারে বারে তোমার কথা বলেছে। না আসলে ও ভীষণ মন খারাপ করবে। ”
“ভাইজান এসব কি কন। আমি একটা মানুষ হইলাম। কেয়ার টেকারের জন্য কেউ এই কথা কয়?”
রিজওয়ান সাহেব মৃদু হেসে প্রতিত্তুর করে বলেন,” তুমি নিজেকে কেয়ারটেকার ভাবো। কিন্তু আমি আর আমার মেয়ে তোমাকে আপনজন ভাবি। দুঃসময়ে যে মানুষটা ছায়ার মতো পাশে থেকেছে সুসময়ে তাকে কিভাবে ভুলে যাই? আমার মেয়ের বিয়েতে তুমি হচ্ছো সবচেয়ে বড় মেহমান। তুমি না আসলে কোনো আত্মীয়ই দাওয়াত পাওয়ার যোগ্য নয়।”
” ভাইজান… ”
“কোনো কথা শুনতে চাই না। তুমি আসছো ফাইনাল। ”
” বাড়ি এমন একা একা রাইখা।”
” সিকিউরিটি গার্ড আছে। তুমি শুধু মেইন ডোরের লকটা লাগিয়ে আসবে ভালোভাবে। এবার কাজের কথায় আসি।”
“জ্বি ভাইজান বলেন ।”
” আমার বেডরুমের লক খুলে ভিতরে যাবে। বেডের পাশে কেবিনেটের উপরের তাকে চাবি আছে সেটা নিয়ে আলমারি খুলবে। আলমারির ডান পাশে সাজানো তিন নাম্বার বাক্সটা নিয়ে আসবে সাথে করে। ওখানে শেহরিনের সব গহনা রয়েছে।”
” ভাইজান.. কি বলেন আমি আলমারি..? ”
” কাদের সময় হাতে নেই বেশি। এসময় গহনা কেনার জন্য আলাদাভাবে সময় বের করতে হবে সেটাও নেই। তুমি প্লিজ দেনামোনা করো না। ”
কাদের নিজেকে থিতু করে কাঁপা কন্ঠে বলে, ” ভাইজান আপনি আমাকে এতো বিশ্বাস করেন? আপন ভাই ও তো এতো বিশ্বাস করে না। আমি যদি কোনো ভুল করি এই অবিশ্বাস আসে না আপনার মনে? ”
” অবিশ্বাসের মতো কিছু করলে চাবি তোমার কাছে দিয়ে আসি বোকা। আমি তোমাকে বিশ্বাস করি একযুগ ধরে। এই এক যুগে তুমি নিজেকে আমার কাছে এমনভাবে প্রমাণ করেছো যে, আমার মুখে বলতে হয়নি তুমি সৎ। আমার অন্তর বলেছে তুমি সৎ।আর সবশেষে আমার কর্ম, তোমার ধর্ম। ”
” আমি খুশি ভাইজান। এতেই খুশি। আমি সহিসালামতে আপনার জিনিস আপনার হাতে তুইলা দিমু। আমার অনিভা মায়ের গয়না বলে কথা। জীবন থাকতে খোয়াইতে দিমু না।”
” হাহা। আচ্ছা ভালোভাবে এসো।”
” জ্বি ভাইজান।”
|সন্ধ্যা ছয়টা, নিকুঞ্জ মহল |
ঋতমা, সানজি, তাকওয়া, নিতুসহ মুমুর ফ্রেন্ড আরশি মিলে সুন্দর করে ছাদে হলুদের ডেকোরেশন করেছে নিজেদের মতো করে। চারপাশে কাঁচা হলুদ রঙা গাঁদা,গাঢ় কমলা রঙা গাঁদা, তরতাজা গোলাপের সমাহার সাজিয়েছে। রজনীগন্ধার সুবাসিত সুঘ্রাণ পুরো ছাদ জুড়ে মৌ মৌ করছে। যদিও বিকেলে বেলায় আষাঢ়ে মেঘ হালকা গর্জন তুলেছিলো কিন্তু সন্ধ্যা গাঢ় হতেই আকাশ হতে মেঘ কেটে যায়। খুশিতে মুখোরিত হয়ে উঠে সবাই।
ছাদটা এমনিতেও সুন্দর করে সাজানো থাকে সবসময়। নানারকম ফুলের গাছে আবৃত। শাহিদা বেগম বিশেষ যত্ন নেন। ধরতে গেলে এই একটা কাজই সে একটু মন দিয়ে করেন। লাল সবুজ হলুদ রঙের বাতি জ্বেলে উঠতেই চারপাশটা আলোকিত হয়ে উঠে। শেহরিনের বসার জায়গাটা লাল রঙা মখমলের কাপড় বিছানো হয়েছে। তার চারপাশে গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো।
” ছেলেপক্ষ হয়ে মেয়ে পক্ষের হলুদে অ্যাটান্ড করতে এসেছো তোমরা আপু।”
” কপাল খারাপ হইলে যা হয় বোন। ভাই আমার নিরামিষ। সে শুধু বিয়ে করবে। কোনো প্রকার হলুদ টলুদের ধার ঘেঁষবে না। তাই উপায় না পেয়ে এখানেই আশ্রয় নিলাম।”
” এমপি সাহেবের বিয়ে বলে কথা। সারা চট্টগ্রাম জানবে। হৈ হুল্লোড় হবে। এলাহি আয়োজনে বিয়ে হবে তা নয় একদম নিশ্চুপ হয়ে বিয়ে করছে।”
সানজি দু-হাতে লেহেঙ্গাটা তুলে চেয়ারের উপরে উঠে। দুই ঠোঁটের মাঝে তার ছোট কাঁচি চাপানো্। একহাতে গাদা ফুলের মালাটা একপাশে বাঁধতে বাঁধতে বলে,”এভাবে বলবেন না। ভাই আমার অতি লাজুক। এজন্য চুপিচুপি বিয়ে করছে।”
“ওরেহ বোন রে। ভাইয়ার নামে এতোবড় অপবাদ দিস না। সে যদি লাজুক হয় তাহলে বুঝে নিতে হবে পৃথিবীতে কোনো ঠোঁট কাটা মানুষই নেই।”
” এভাবে বলিস না। শেহরিনকে আমার ভাই একটু বেশিই ভালোবেসে ফেলেছে। যার কারণে আর তড় সইছে না..
” বাসর করার….
” ছিহঃ এসব কি বলিস। বাচ্চারা আছে মুখে লাগাম টান।”
আরশি গোলাপের মালা গাঁথা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। রিনিঝিনি কাঁচের চুঁড়িহাতে মুমুর হাত টেনে ধরে ছাদের কার্নিশে নিয়ে আসে।
” কি হয়েছে? ”
“আমার বুকে ব্যথা করছে মুমু।”
“কি বলিস ! চল নিচে যাই তাহলে। মেডিসিন দিচ্ছি ..
” ইশ্ এই ব্যথা সেই ব্যথা নয়। মেডিসিনে সারবে না এটা..। ”
মুমু ভ্রু কুঁচকায় আরশির কথায়। মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে বলে,” তাহলে? ”
” নেতাসাহেব এটা করতে পারলো ? কেন আমাকে নিয়ে, আমার স্বপ্নগুলোকে নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেললো? তার যখন অনিভা আপুকেই এতো পছন্দ তাহলে কেন টিভির পর্দায় এসে হাসতো? কেন ওতো সুন্দর করে কথা বলতো? ”
” এই আরশি.. তুই ঠিক আছিস? কিসব আবোলতাবোল বকছিস? ”
“আবোলতাবোল নয় মুমু। আর দুইটা বছর কি অপেক্ষা করা যেতো না? ইন্টারে উঠলেই বাবাকে বলে আমি উনাকে বিয়ের জন্য প্রস্তাব দিতাম।”
“এসব কথা বাদ দে। অনিভা আপু শুনলে খবর আছে। আজকে সকালে আমি একটু বলেছিলাম আর আপু বলেছে আমরা নাকি চুনোপুঁটি। চোখই ফোটেনি আবার ক্রাশ খাই ।”
“তোর ক্রাশ কিন্তু আমার তো ভালোবাসা।”
মুমু হতাশার নিঃশ্বাস ছেড়ে কোমড়ে দুহাত চেপে ধরে। শক্ত গলায় বলে,” তো এখন কি এইটা নিয়েই পড়ে থাকবি নাকি ওখানে যাবি। অনেক কাজ এখনো বাকি। এসব দুঃখের আলাপন করার সময় নেই। নেতাসাহেব এমনিতেও আমাদের পাত্তা দিতো না।অনিভা আপু তাও বলেছে চুনোপুঁটি। উনি হলে নিশ্চিত বলতো মাছের ডিম।”
” এতোটাও ছোট নয় আমরা। ক্লাস নাইনে পড়ি। হাইট পাঁচ ফিট। ”
” আর নেতাসাহেবের হাইট ছয় ফিট। অনিভা আপুর পাঁচ ফিট তিন।”
” একটুই তো..”
“তো হাইটে কি। নেতাসাহেব অনিভা আপুকে অস্থির ভালোবাসে। আপুকে এতো সুন্দর একটা রিং গিফট করেছে। দারুণ।”
আরশি নাজুক চোখে তাকায় মুমুর দিকে। ভেজা ভেজা কন্ঠে বলে, ” এই স্বপ্ন তো আমারও ছিলো।”
” এসব স্বপ্ন গিলে খেয়ে ফেল। চল এখন।”
“সত্যি বুকে ব্যথা হচ্ছে আমার মুমু্”
“এতোই যখন ব্যথা হচ্ছে তাহলে এতো সাজুগুজু করে এসেছিস কেন? ”
“এমপি সাহেব যদি আসে। সেজন্য। ”
“লাভ নেই। এলেও চোখ তুলে তাকাবে না। তার চোখ অনিভায় বাঁধা। ”
“এখন উপায়? ”
“নতুন ক্রাশ খুঁজতে হবে।”
” আবার? ”
“হু আবার। কবি বলেছেন, ‘একবার না পারিলে, দেখো শতবার।’
হলুদের আমেজ পুরোপুরি শুরু হয়ে গিয়েছে। চারদিকে সাজ সাজ রব। হাতে গোনা কয়েকজন আত্মীয় স্বজন হলেও পুরো ছাদটা কিভাবে কিভাবে যেনো পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে মানুষে। অদূরে স্বল্প আওয়াজে গানের সুর বইছে বক্সে। সেই তালে গুনগুন করে ঠোঁট নাড়িয়ে যাচ্ছে সবাই।
গোল্ডেন ইয়েলো রঙা শাড়ি,চওড়া নকশা করা পাড়। সেই সাথে মেরুন রঙের ব্লাউজ। টুকটুকে লাল রঙের গোলাপ দিয়ে সাজানো হয়েছে নববধূকে। কাজল টানা চোখদুটো তার ঢেউ খেলে যায় গভীরভাবে। হালকা গোলাপি শেডের লিপস্টিক ঠোঁট ছুঁইয়ে তার।
” ইশ্ নেতাসাহেব যদি তোমাকে একবার দেখতে পেতো শেহরিন। দৃষ্টি একদম আটকে যেতো বিশ্বাস করো। আমরাই তো চোখ সরাতে পারছি না তোমার থেকে।”
লাজকন্যা লজ্জায় গালদুটো রঙিন করে মৃদু হাসে। চোখদুটো নামিয়ে সে নিচ দিক তাকিয়ে থাকে। নেতাসাহেবের কথা মনে হতেই তার হৃদমাঝারে এলোপাতাড়ি হাওয়া বয়। লোকটার সাথে সেই যে কালকে বিকেলে তার শেষ কথা হয়েছে এরপরে আর কোনো কথা বা যোগাযোগ হয়নি। অথচ বিয়েটা তার জোরাজোরিতেই হচ্ছে কালকে। এখন একেবারে নিরুদ্দেশ।
” শেহরিন তোমার মামি, মণিকা আন্টি এতো সেজেছে কেন? ”
” সাজতে ভালোবাসেন উনারা।”
“তাই বলে এতো? না জানি কালকে কি সাজ দেয়।”
ঋতমা মুমু মিলে শেহরিনকে ছাদে নিয়ে আসতেই তাকওয়া নিতু সানজি এগিয়ে আসে হাসিমুখে । অন্যদিকে সানজিকে দেখা মাত্র নবকায়া আবারো লজ্জায় গুটিয়ে নেয় নিজেকে।
“আমাদের সামনে এতো লজ্জা পেয়ে কি হবে ভাবিজান? ভাইয়ার জন্য লজ্জাগুলো তুলে রাখুন।”
“বাহ বাহ ভাবিজান? ”
“আরে যতই ছোটো হোক, বড় ভাইয়ের বউ। ভাবিজান তো ডাকতেই হবে।”
সানজি আদুরে হাতে শেহরিনের থুতনিতে হাত রেখে মুখ উপরে তোলে।নরম হেসে বলে, ” মাশাল্লাহ। আমাদের মিষ্টি বউ।”
” আমি সাজিয়েছি আপু। কিছু ক্রেডিট আমাকেও দাও।”
“ওরে বাচ্চা। খুব সুন্দর হয়েছে।”
শেহরিন আশেপাশে মৃদু নজর বুলিয়ে সানজির পানে তাকিয়ে বলে, ” আপু তাসিন আসেনি? ”
” তাসিন? ওতো জানেই না এখনো অব্দি ইয়ো সানি আর ইয়ো পানির বিয়ে। তবে কালকে আসবে। এসে যে কি করবে আল্লাহ ভালো জানেন।”
” বেচারার মনে অনেক দুঃখ বইবে কালকে শিউর।”
তাসিনের পাগলামির কথা উঠতেই একসঙ্গে সবাই হেসে উঠে। বেবি মানকি তো ইয়ো পানিই বলতে পাগল। কাল কি যে রণক্ষেত্র তৈরি করবে কে জানে।
রাত তখন আটটা কি পৌনে আটটা। নিকুঞ্জ মহলের সামনে দাঁড়িয়ে আছে কালো রঙের একখানা গাড়ি। ঘর্মাক্ত পাঞ্জাবি সুঠাম দেহের সঙ্গে লেগে রয়েছে। চুলের নিচে কপালের ভাঁজে বিন্দু বিন্দু ঘাম জড়ানো। সকাল হতে টানা বিকেল অব্দি কাজের মধ্যে ব্যস্ত থেকে পরপর দুটো সেমিনার শেষ করে মাত্র ছাড়া পেয়েছে এমপি সাহেব। তবে খুলশীতে আসার কথা তার ছিলো না। রিজওয়ান সাহেব ফোন করেছিলেন আলাদাভাবে একটু দেখা করার জন্য। সান্নিধ্য পাঁচলাইশ থানায় থাকার কারণে জানিয়েছিলো যাওয়ার সময় দেখা করে যাবে তার সঙ্গে।
“অনেক কষ্ট দিয়ে ফেললাম মনে হচ্ছে তোমাকে। প্লিজ ভেতরে এসো।”
“সমস্যা নেই। এখন আর যাবো না।”
“অনেক টায়ার্ড লাগছে তোমাকে দেখতে। ”
সান্নিধ্য ক্ষীণ হেসে বলে, “অভ্যাস আছে। ”
” আচ্ছা তাহলে বেশি সময় না নেই। অল্প কথাতেই সেরে ফেলি।”
“প্লিজ।”
রিজওয়ান সাহেব কন্ঠস্বর পরিষ্কার করে বলেন,” দেখো বাবা বিয়েটা তো অনেক তাড়াহুড়ো করে হচ্ছে। অনেক কিছু ইচ্ছে থাকলেই করতে পারছি না।”
“কোনো সমস্যা হয়েছে? ”
“সমস্যা না। আবার একটু সমস্যা মনে হচ্ছে। শেহরিনের জন্য যেসব গহনা ঢাকা থেকে এনেছি সেগুলো ওর মামি আন্টিরা দেখে বলছে ওল্ড ডিজাইন। এগুলো বর্তমানের সঙ্গে যায়না। আসলে গহনাগুলো ওর মায়ের। আলাদাভাবে গড়ানো হয়নি ওর জন্য। বিষয়টা আমার মাথাতেও আসেনি। ভেবেছি যখন বিয়ে হবে তার আগে কিনে রাখবো ওর পছন্দমতো। বাট এতো দ্রুত হওয়ার কারণে সেড়ে উঠতে পারিনি। তোমার ফ্যামিলি মেম্বাররা যদি ওল্ড ডিজাইনের গহনা নিয়ে লো ফিল করে.. আই মিন স্টান্ডার্ড না মনে হয়। সেজন্য তোমাকে আগেই একটু জানিয়ে রাখলাম।”
সান্নিধ্য বৃদ্ধা আঙ্গুলি দিয়ে কপালের ঘাম মুছে নেয়। কপাল তার ভাঁজ হয়ে থাকলেও শান্ত কন্ঠে বলে,
“প্রথমমত, গহনার ওল্ড নিউ ডিজাইন সম্পর্কে আমার কোনো ধারনা নেই আংকেল। দ্বিতীয়ত,গহনা নিয়ে কথা উঠবেই বা কেন?”
“পরিবেশের সঙ্গে মানানসই এর একটা ব্যাপার আছে বাবা। কথা উঠে যায়।”
” না কথা উঠবে না। কারণ, আপনার স্ত্রীর গহনা আপনার কাছে থাকবে, আমার স্ত্রীর গহনার ব্যাপারটা আমি দেখবো। ”
” মানে? ”
“মানে সিম্পল্। শুধু গহনা নয় শেহরিনের বিয়ের শাড়ি থেকে সমস্ত কিছু আমার পক্ষ থেকে আসবে। আমি আমার সামর্থ্য অনুযায়ী আমার ওয়াইফের জন্য এগুলো ম্যানেজ করবো। সেখানে আপনার কোনো কিছুই আমি নিবো না।”
” আমি বাবা হয়ে কিছুই দিবো না? ”
“মেয়েটাকেই তো দিয়ে দিচ্ছেন । একজন বাবার কাছে এর চেয়ে বড় এবং দামি সম্পদ আর কি কিছু হতে পারে? ”
রিজওয়ান সাহেব দমে যায় শেষ কথাটা শুনে। নিস্তব্ধ চাহনিতে তাকিয়ে থাকে সে এক শিরদাঁড়া সম্পন্ন ব্যক্তির সামনে। সান্নিধ্য হালকা হেসে বলে,” আপনি আপনার মেয়েকে আমার হাতে দিচ্ছেন,তাকে সাজিয়ে গুছিয়ে রাখার দায়িত্ব আমার এবং সেটা বিয়ে থেকেই শুরু হবে সারাজীবনের জন্য।”
” আমার আসলে কি বলা উচিত বুঝতে পারছি না।”
” যে দামি উপহারটা এতো সহজেই আমাকে দিয়ে দিচ্ছেন সেটার জন্য আমি কৃতজ্ঞ আপনার কাছে।”
“সহজভাবে কই পেয়েছো । মেয়ে তো বেশ ঘুরিয়েছে।”
” না ঘুরালো এ প্লাস পেতাম না।”
রিজওয়ান সাহেবের চোখে সূক্ষ্ণ জলের কণা চিকচিক করে। জড়িয়ে আসা কন্ঠস্বর ভেদ করে বলে, ” আমি কি একটু জড়িয়ে ধরতে পারি তোমাকে? ”
রাজনীতি বনাম প্রেমনীতি পর্ব ২২
” আমার অবস্থা তো…”
” অনুরোধ মনে করতে পারো।”
নিঃসঙ্কোচ নিবেদনে সান্নিধ্য ঠোঁট চেপে হেসে ফেলে। দু হাত বাড়িয়ে শীতল গলায় বলে, “প্লিজ.. ”
রিজওয়ান সাহেব সান্নিধ্যের সঙ্গে সস্নেহে মোলাকাত সম্পন্ন করে। খুব নিরবে চোখ দিয়ে তার একফোঁটা জল বেয়ে যায়। পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলে, ” জীবনের শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত এই শিরদাঁড়া ধরে রেখো চ্যাম্প।”
