Home রুহআবিষ্ট তুমি রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১২ (২)

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১২ (২)

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১২ (২)
অধরা মিনহা

রাত তখন ১০টা। আনতারা প্রায় দুই ঘণ্টা আগে ইরাইনার রুমে গিয়েছিল কিন্তু এখনো ফিরে আসেনি। এদিকে ইফরাদ একদমই শান্ত থাকতে পারছে না। তার মাথায় শুধু ইরাইনার চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। সে বারবার ভাবছে, আনতারা এখনো ফিরছে না কেন? ইরাইনার হঠাৎ এমন অবস্থা কেন হলো, সেটাই সে বুঝতে পারছে না। ইরাইনার টেনশনে দুই ঘণ্টা আগে বাসায় ফিরেছে কিন্তু এখনো ইফরাদ ড্রেসও বদলায়নি। ইরাইনার এই অবস্থা দেখে ইফরাদ নিজেও কিছু করতে পারছে না। শুধু জানতে চায়, তার বোনের আসলে কী হয়েছে। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তায় ইফরাদের গলা শুকিয়ে গেছে। অস্থির মনে ইফরাদ সাইড টেবিলের দিকে যায়। জগটা তুলে গ্লাসে পানি ঢালে। এক নিঃশ্বাসে পানি খেতে থাকে ঠিক তখনি দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে আনতারা। ঢুকেই সে দেখে ইফরাদ দাঁড়িয়ে পানি খাচ্ছে। তবে আসলে পানি খাওয়া তখন প্রায় শেষের দিকে।
ইফরাদ আনতারাকে দেখামাত্র দ্রুত গ্লাসটা নামিয়ে আনতারার কাছে গিয়ে বিচলিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে,

— কি কথা হয়েছে? রাইনা কিছু বলেছে? কি হয়েছে ওর?
আনতারা শান্তভাবে বলে,
— চিন্তা করবেন না। ইরাইনা আপু এখন ঠিক আছে।
ইফরাদ কথাটা বিশ্বাস করতে পারে না। চোখ বড় করে বলে ওঠে,
— কি ঠিক আছে? তুমি রাইনার অবস্থা দেখেছো?
আনতারা নরম কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলে,
— দেখেছি আমি ইফরাদ। আর আমি বলছি এখন ঠিক আছে ইরাইনা আপু।
ইফরাদের ভেতরে জমে থাকা অস্থিরতাটা এবার বাঁধ ভেঙে বেরিয়ে এলো। কণ্ঠ চড়িয়ে বলে উঠে,
— ওর সাথে এমন ভেঙে পড়া যায় না। অবশ্য তুমি ওকে দেখেছোই কতটুকু? রাইনা অনেক স্ট্রং। নিশ্চয়ই অনেক বড় কিছু কারণ আছে যেটার জন্য ওর এমন দিশেহারা অবস্থা!
আনতারা আস্তে করে শ্বাস ফেলে ধীর স্বরে বলে,
— জীবনের পথে ছুটতে ছুটতে যখন আমরা আল্লাহর থেকে অনেক দূরে সরে যাই, তখনি আমাদের মাঝে হতাশা আসে। সবকিছু বিষাক্ত লাগে। আল্লাহর প্রদত্ত হয় এই হতাশা। ইরাইনা আপুর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
কথাটা শেষ হতেই ইফরাদের মুখ শক্ত হয়ে যায়। ইফরাদের মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। তার আদরের বোনের এই অবস্থা অথচ সে এখনো কারণই জানতে পারছে না। তার উপর আনতারার এসব ধর্মীয় কথা। ইফরাদ রাগে বলে উঠে,

— তোমার এসব জ্ঞানের কথা শোনার কোনো ইচ্ছে……
কথাটা ঠোঁট পর্যন্ত এসেও পুরোটা সম্পূর্ণ হলো না।ইফরাদের দৃষ্টি গিয়ে আটকায় আনতারার মুখে। হিজাবে জড়ানো শান্ত, মায়াবী মুখটা দেখামাত্র ইফরাদের সমস্ত রাগ মিলিয়ে যায়। ইফরাদের মনে হয়, এই নিষ্পাপ চেহারাটা তার রাগের বশে বলা কথাগুলো সহ্য করতে পারবে না। এই শান্ত চোখ দুটো কষ্টে ভরে উঠলে সে নিজেই অস্থির হয়ে যাবে। এক নিমিষেই ইফরাদের ভেতরের তীব্রতা নিভে এলো। বাকি কথাগুলো গিলে ফেলে। সঙ্গে গিলে ফেলে রাগটাও। কিছুক্ষণ শুধু চুপচাপ তাকিয়ে রইল আনতারার দিকে। ইফরাদের চোখের কঠিন তীক্ষ্ণতাটা নরম হয়ে আসে। শ্বাস ভারী হয়ে উঠে ইফরাদের। তারপর ফোঁস করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিচু, শান্ত স্বরে বলে,
— আমি অনেক টায়ার্ড।
ইফরাদের আকস্মিক রাগে আনতারা চমকে উঠলেও কিন্তু পরমুহূর্তেই আরও বেশি বিস্মিত হয় ইফরাদের হঠাৎ মাঝপথে শান্ত হয়ে যাওয়াটা দেখে। ইফরাদের কথাগুলো শেষ হতে না হতেই আনতারা ধীরে ধীরে মাথা তোলে।পরিস্থিতিটা একটু হালকা করতে দ্রুত বলে উঠে,

— আপনার তো বাসায় ফিরে কিছুই খাওয়া হয়নি। আমিও আপনাকে কিছুই খেতে দিইনি। আপনি কি খাবেন?
ইফরাদ একটু সরে গিয়ে বলে,
— খেতে ইচ্ছে করছে না।
আনতারা একটু থেমে আবার বলে,
— আপনি গোসল করে নিন। ভালো লাগবে। আমি আপনার জন্য খাবার আনছি।
ইফরাদ আর কিছু বলে না। ইফরাদের নীরবতাকে সম্মতি ধরে আনতারা দ্রুত রুম থেকে বের হয়ে যায়। ইফরাদ ওয়াশরুমে ঢুকে যায় গোসল করতে। কিছুক্ষণ পর আনতারা খাবার নিয়ে ফিরে আসে। এসে দেখে ইফরাদ এখনো বের হয়নি। আনতারা চুপচাপ বসে অপেক্ষা করতে থাকে। সময় গড়িয়ে যায়। এক দুই মিনিট করে পুরো ১৫ মিনিট পর ওয়াশরুমের দরজা খুলে ইফরাদ বের হয়।
আনতারা সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ে। খাবারের দিকে ইশারা করে বলে,

— খাবার এনেছি, খেয়ে নিন।
ইফরাদ ক্লান্ত গলায় বলে,
— রাখো।
আনতারা এবার একটু ইতস্তত করে জিজ্ঞেস করে,
— খাইয়ে দেই আমি?
ইফরাদ এবার তাকায় আনতারার দিকে। সেই দৃষ্টিতে কী আছে বোঝা যায় না, কেবল শান্ত আর স্থিরতা প্রকাশ পায়। আনতারা চোখ নামিয়ে আস্তে বলে,
— হাত স্যানিটাইজ করে আসছি।
ইফরাদ আর কিছু বলে না। রুমে একটা ছোট নীরবতা নেমে আসে। তারপর আনতারা ওয়াশরুমে গিয়ে হাত স্যানিটাইজ করে ফিরে আসে। এসে দেখে ইফরাদ বিছানায় বসে আছে তারই অপেক্ষায়। আনতারা টেবিল থেকে খাবারের প্লেটটা তুলে গিয়ে ইফরাদের পাশে বসে। পোলাও আর চিকেন কারি মাখাতে মাখাতে স্বাভাবিক গলায় বলে,

— পোলাও এনেছি। ভাত জাতীয় খাবার খেলে শক্তি পাবেন। ওসব আজেবাজে খাবারে শক্তি থাকে না।
ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে বলে,
— আজেবাজে খাবার কোনটা?
— ঐ যে ফাস্টফুড যে খান।
ইফরাদ ভ্রু উঁচিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— তো ফাস্টফুডে কি শক্তি নেই?
— না। কি শক্তি আছে? আমার কাছে তো একটু শক্তি লাগে না।
ইফরাদ কিছু বলে না। কেন জানি তার হাসি পায়, কিন্তু সে হাসিটা লুকিয়ে রাখে। আনতারা তরকারি দিয়ে পোলাও মাখিয়ে ইফরাদের মুখে লোকমা তুলে দেয়। ইফরাদ চুপচাপ সেটা খেয়ে নেয়। আনতারা ইফরাদকে খাইয়ে দিতে থাকে। খাওয়ার মাঝেই ইফরাদের পানি খেতে ইচ্ছে করে। সে বসা থেকে উঠতে গেলে আনতারা বলে উঠে,

— কি হয়েছে? দাড়িয়ে গেলেন কেন?
ইফরাদ স্বাভাবিকভাবেই বলে,
— পানি খাবো।
আনতারা সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে বলে,
— বসুন আমি পানি দিচ্ছি।
বলেই আনতারা ইফরাদকে সুযোগ না দিয়ে নিজেই টেবিল থেকে পানির বোতল নিয়ে গ্লাসে পানি ঢালে। ইফরাদ সেটা দেখে আবার বসে পড়ে। আনতারা গ্লাসটা নিয়ে ইফরাদকে দেয়,
— এই নিন।
ইফরাদ ডান হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা নিয়ে পানি খেতে থাকে। তখন আনতারা বলে উঠে,

— বসে, ডান হাত দিয়ে পানি খাওয়া সুন্নত। আপনি যদি জানতেন আপনি যে দাড়িয়ে পানি খাচ্ছেন আপনার সাথে এক অদৃশ্য দেখতে ভয়ংকর রকমের শয়তানও পানি খাচ্ছেন। সে দেখতে এতোটাই ভয়ংকর যদি আপনি তাকে দেখতেন তাহলে জীবনে পানি খাওয়া ভুলে যেতেন। তাই সুন্দর করে বসে পানি খেতে হয়।
ইফরাদ বুঝতে পারে, এই কারণেই আনতারা উঠে গিয়ে পানি এনে দিয়েছে। কারণ সে দাড়িয়ে পানি খেতে যাচ্ছিল। আনতারা আবার এসে ইফরাদের পাশে বসে। এবার আবার লোকমা তুলে দিতে গেলে হাত থেকে পোলাও এর কয়েকটা দানা মাটিতে পড়ে যায়। আনতারা ইফরাদকে লোকমা খাইয়ে দিয়ে ঝুঁকে পড়ে মাটি থেকে পোলাও এর দানাগুলো তুলে প্লেটে রাখে। এটা দেখে ইফরাদ মুখ কুঁচকে বলে,

— এটা কি করেছো! মাটি থেকে কেন তুলেছো!
— মাটি থেকে খাবার তুলে খাওয়া সুন্নত, ইফরাদ।
— মাটিতে যদি ময়লা থাকে?
— তাহলে ধুয়ে কিংবা পরিষ্কার করে খাবেন।
— ফেলো ঐ পোলাও! ঐ মাটিতে পড়া খাবার আমি খাবো না।
— গুনাহ হবে ইফরাদ।
— গুনাহের কি আছে?
— যেটা আমাদের নবী বলে গেছেন সেটা তাচ্ছিল্য করা গুনাহ না?
ইফরাদ বিরক্তিতে ‘চ’ শব্দ উচ্চারণ করে। এটা দেখে আনতারা আর কথা বাড়ায় না। ইফরাদের মুখের বিরক্তি দেখে আনতারা আর জোর করে না। কারণ সে জানে, এখন জোর করলে হয়তো ইফরাদ আর খাবে না, উঠে চলে যাবে। তাই আনতারা নরম হয়ে বলে,

— আচ্ছা ঠিক আছে মাটি থেকে তোলা পোলাওগুলো যে অংশে মিশিয়েছি সেগুলো আমি খেয়ে নিচ্ছি।
ইফরাদ সঙ্গে সঙ্গে বলে,
— তুমি খাবে কেন? ডাস্টবিনে ফালাও ওগুলো!
আনতারা অবিচল গলায় বলে,
— যেখানে আমি একদানা পোলাও নষ্ট করিনি সেখানে আমি এতগুলো পোলাও নষ্ট করবো?
ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে বলে,
— এমন ভান করছো যেন বাড়িতে আর খাবার নেই!
— আপনার কাছে অঢেল আছে দেখে আপনি ফেলে দিতে পারছেন। কিন্তু যে সারাদিনের ক্ষুধার জ্বালায় ছটফট করেছে সেই ব্যক্তি জানে এই মাটিতে পড়ে থাকা দানাগুলো কতটা মূল্যবান।
ইফরাদ বাঁকা হেসে বলে,

— ঠিক বলেছো এতো অঢেল সম্পত্তি কি খরচ করবো না? কিপ্টামি করবো?
আনতারা শান্ত গলায় বলে,
— খচর করুন কিন্তু অপচয় করবেন না।
ইফরাদ চোখমুখ কুঁচকে বলে,
— তুমি যেটা বলছো সেটা কিপ্টামিই!
আনতারা কিছুক্ষণ ইফরাদের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ জিজ্ঞেস করে,
— যাকাত দেন তো?
ইফরাদ স্বাভাবিক গলায় বলে,
— হুম, দেওয়া হয়।
— বলুন তো, সম্পদের কত শতাংশ যাকাত দিতে হয়?
— এভাবে তো যাকাত দেওয়া হয় না। মাম্মা একটা এনজিও চালায়, যেখানে এতিম আর অসহায়দের বড় করা হয়। ওইটার ফান্ডার আমরাই।
আনতারা একটু অবাক হয়ে বলে,

— আপনাদের এত সম্পত্তির তুলনায় এত কম যাকাত?
— তুমি কি মাম্মার এনজিওটাকে ছোট ভাবছো? ওখানে ২৫ হাজারের বেশি মানুষ থাকে।
— ২৫ হাজার হলেও তো সম্পদের ২.৫ শতাংশ, অর্থাৎ ৪০ ভাগের ১ ভাগ যাকাত দিতে হয়। আপনাদের সম্পত্তির ২.৫ শতাংশ যাকাতের টাকা তো আরো অনেক বেশি হওয়ার কথা।
— কি বলছো তুমি!
— আমি ঠিকই বলছি ইফরাদ। যাকাত একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, এটা নিয়ে হেলাফেলা করা ভালো না। সম্পদের ২.৫ শতাংশ যাকাত দিতেই হবে, যদি যাকাতের সামর্থ্য থাকে। সেখানে শুধু ২৫ হাজার শিশুর ভরণপোষণ করলেই সব শেষ হয়ে যায় না।
ইফরাদ বিরক্তিতে চোখমুখ কুঁচকে ফেলে। সেটা দেখে আনতারা আর কথা বাড়ায় না। কেননা ইফরাদ যেকোনো মুহূর্তে রেগে যেতে পারে। হয়তো না খেয়েই উঠে চলে যাবে। তাই দ্রুত পরিস্থিতি সামলাতে বলে,

— আচ্ছা, পরে এসব নিয়ে কথা হবে। আপাতত আপনি খান।
ইফরাদ মুখ শক্ত করে বলে,
— উহু, আমি আর খাবো না।
— আপনি কি মাটিতে পোলাও এর দানা তুলেছি বলে খাবেন না?
ইফরাদ কোনো উত্তর দেয় না। ইফরাদের চুপ থাকা দেখেই আনতারা বুঝে যায় কারণ তাহলে এটাই। কিছুক্ষণ নীরব থেকে আনতারা বলে উঠে,
— আচ্ছা, এগুলো সরিয়ে আমি নতুন খাবার নিচ্ছি।
ইফরাদ আড়চোখে তাকায়। আনতারার মুখটা মলিন হয়ে আছে। সে উঠে দাঁড়াতেই ইফরাদ জিজ্ঞেস করে,

— এগুলো কি করবে?
— ভাত?
— হুম।
আনতারা শান্তভাবে বলে,
— আমি খেয়ে নিবো।
এই বলে আনতারা সাইড টেবিলের দিকে যেতে নেয়, সেখানে পোলাও আর তরকারি রাখা আছে। তখনি ইফরাদ হঠাৎ আনতারার ওড়নার কোণায় টান দিয়ে ধরে। আনতারা ফিরে তাকায়।
ইফরাদ আস্তে করে বলে,
— এটাই খাবো।
আনতারা শান্ত গলায় বলে,
— সমস্যা নেই, আমি নতুন পোলাও আনছি। আমি আপনাকে জোর করছি না।
ইফরাদ এবার দৃঢ় গলায় বলে,

— তুমি আমার উপর জোর খাটাতেও পারবে না। আমি ইফরাদ রিদান চৌধুরী, নিজের মর্জির মালিক। আর এখন আমি নিজ ইচ্ছাতেই খাবো। তাড়াতাড়ি লোকমা দাও।
আনতারা আবার বসে পড়ে। তারপর এক লোকমা তুলে ইফরাদের মুখের সামনে ধরে। ইফরাদ কিছুক্ষণ আনতারার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মুখে লোকমা নিয়ে বলে,
— তুমিও খাও। একসাথে খেয়ে নাও আমার সাথে।
আনতারাও ইফরাদকে খাইয়ে দিতে দিতে নিজেও খেতে শুরু করে। খাওয়া শেষে আনতারা ওয়াশরুমে গিয়ে হাত ধুয়ে খাবারের প্লেটগুলো নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে গেল সেগুলো রেখে আসতে। কিছুক্ষণ পর আনতারা আবার রুমে ফিরে এসে দেখে ইফরাদ বিছানায় আধশোয়া হয়ে ফোন টিপছে। আনতারা আবার ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে। কিছুক্ষণ পর ওযু করে বের হয়ে এলো। তার ভেজা হাত মুখ দেখে ইফরাদ বুঝে যায় আনতারা ওযু করেছে। তাই ইফরাদ জিজ্ঞেস করে,

— এখন আবার নামাজ পড়বে?
আনতারা বলে,
— না।
— তাহলে ওযু করলে কেন?
— ওযু করে ঘুমানো ভালো।
ইফরাদ ফোনে চোখ রেখেই ব্যস্ত গলায় বলে,
— কেমন ভালো? আই মিন, বেনিফিট কী?
আনতারা হালকা স্বরে বলে,
— এতগুলো বেনিফিট আছে যে মানুষ যদি শোনে, তাহলে সবসময় রাতে ওযু করে ঘুমাবে।
ইফরাদ এবার ভ্রু তুলে আনতারার দিকে তাকায়।
— তাই নাকি? শুনি তো?
আনতারা বেডের কাছে এসে উঠে বসে। চোখ-মুখ উজ্জ্বল করে বলে,
— রাতে ওযু করে ঘুমালে পুরো রাতটা পবিত্র অবস্থায় কাটে। তখন সেই ঘুমও ইবাদতের সওয়াবের কারণ হয়। ফেরেশতারা সারারাত আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তির জন্য রহমত আর ক্ষমার দোয়া করতে থাকেন। মানে আল্লাহর ক্ষমা পাওয়ার একটা সুন্দর সুযোগ থাকে। আর যদি কেউ ওযু অবস্থায় মারা যায়, তাহলে ঈমান আর পবিত্রতার উপর মৃত্যু হওয়ার সুসংবাদও আছে।
থেমে একটা শ্বাস নিয়ে আবার বলতে থাকে,

— আর ঘুমানোর আগে ওযু করা তো রাসুল (সা.)-এর সুন্নাহ। তাই এটা পালন করলে সুন্নাহর সওয়াবও পাওয়া যায়। শুধু তাই না, ওযু করে ঘুমালে আল্লাহ একজন পাহারাদারও নিযুক্ত করেন। তখন শয়তান আর বিভিন্ন অনিষ্ট থেকে মানুষ হেফাজতে থাকে।
সবটুকু কথা এক নিঃশ্বাসে বলে আনতারা থামে। তারপর বিজয়ীর ভঙ্গিতে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে বলে,
— বুঝলেন তো? ওযু করে ঘুমানোর কত বেনিফিট!
ইফরাদ নির্বিকার মুখে ফোন স্ক্রল করতেই শান্ত গলায় বলে,
— এখন বেনিফিট পেতে চাইলে সারাদিন চলতে থাকা মুখটা বন্ধ করে ঘুমাও।
মুহূর্তেই আনতারার মুখ ফুলে গেল। এ কেমন মানুষ! নিজেই প্রশ্ন করে, আবার এমন রুক্ষ উত্তর দেয়!
আনতারা বিরক্ত চোখে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে রইল।
ইফরাদ ফোন চালাতে চালাতেই আড়চোখে সেটা খেয়াল করে। কয়েক সেকেন্ড পর সরাসরি তাকিয়ে বলে,

— কী? এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?
আনতারা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে,
— আপনার মুখ এত তিতা কেন?
ইফরাদ ভ্রু উঁচু করে চোখ সরু করে জিজ্ঞেস করে,
— খেয়েছো নাকি? টেস্ট পেয়েছো তিতা?
আনতারা থতমত খেয়ে যায়। তারপর লজ্জায় চোখ সরিয়ে নিয়ে বিড়বিড় করে বলে,
— আমি বলতে চেয়েছি আপনার মুখ থেকে এত তিতা কথা বের হয় কেন?
ইফরাদ আবার ফোনের দিকে তাকায়। ঠাণ্ডা স্বরে বলে,
— তোমার সাথে কথা বলতে গেলে মিষ্টি কথা আসে না।
— তাহলে মাঝে মাঝে যে খুব ভালো ব্যবহার করেন? সেটা?
এই প্রশ্নে ইফরাদ থেমে যায়। ফোনের স্ক্রিনে থাকা আঙুলটাও স্থির হয়ে রইল। চোখ তুলে আনতারার দিকে তাকায়। তার চোখে নেই রুক্ষতা। নেই বিরক্তি। বরং অদ্ভুত শান্ত একটা দৃষ্টি। আনতারা নিঃশব্দে ইফরাদের উত্তরের আশায় চেয়ে থাকে। কিছুক্ষণ পর ইফরাদ দৃষ্টি সরিয়ে খুব নরম স্বরে বলে,

— জানি না।
আনতারা স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়েই প্রশ্ন করে,
— সত্যিই জানেন না?
ইফরাদ আবার তাকায় আনতারার দিকে। কিন্তু উত্তরটা যেন কোথাও আটকে গেল। সত্যিই কি সে জানে না?
কেন এখন আর আগের মতো আনতারার ওপর রাগ ঝাড়তে পারে না? কেন এই মেয়েটার মায়াবী মুখটা দেখলে তার রাগ মিলিয়ে যায়? কেন এখন আনতারার কথা বিরক্ত লাগার বদলে অদ্ভুত স্বাভাবিক লাগে? কেন আগের মতো অপছন্দ হয় না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ইফরাদ নিজেও খুঁজে পায় না। ঠিক তখনি আনতারা নরম গলায় ডাকে,

— ইফরাদ?
ভাবনা থেকে ফিরে ইফরাদ দিকে তাকায় আনতারার দিকে। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে নিচু স্বরে বলে,
— ঘুমাও।
আনতারা কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে। তারপর হঠাৎই বলে উঠে,
— আমার সাথে একটু কথা বলুন?
আনতারার কণ্ঠে ছিল ছোট বাচ্চার মতো আবদার।ইফরাদ ফোন থেকে চোখ তুলে তাকায়। আনতারার কথায় মিশে থাকা গভীরতা আর আবদার দুটোই তার কানে স্পষ্ট ধরা দেয়। ইফরাদ বেখেয়ালি হয়ে বলে,
— হুম?
আনতারা আগের মতোই গভীর গলায়, কণ্ঠে স্পষ্ট একরাশ ব্যাকুলতা নিয়ে বলে,
— আমাকে একটু সময় দিবেন? বেশি না…..অল্পখানি?
ইফরাদ এবার ভালো করে আনতারার দিকে তাকায়। আনতারার মুখটা কেমন যেন মলিন হয়ে আছে। আর চোখে ভর করে আছে একরাশ নীরব প্রত্যাশা। ইফরাদের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠে। ইফরাদ আর বেশিক্ষণ সেই দৃষ্টির সাথে দৃষ্টি মিলিয়ে রাখতে পারল না। চোখ ফিরিয়ে নেয় মোবাইলের দিকে। তারপর নিরাসক্ত গলায় বলে,

— ঘুমাও। খুব টায়ার্ড আমি।
কথাটা শুনে আনতারা আর কিছু বলে না। দ্বিতীয়বার আর আবদারও করে না। হয়তো অভিমান জমে গভীর হয়ে গেছে যেজন্য সেটা আর ঠোঁট পর্যন্ত আসে না, বুকের ভেতরেই চুপচাপ জমে থাকে। আনতারা কম্ফোর্টার টেনে গায়ের উপর নেয়। তারপর চুপচাপ বসে দোয়া পড়তে শুরু করে। ইফরাদের চোখ ফোনের স্ক্রিনে থাকলেও মনটা বারবার আনতারার দিকেই ছুটে যাচ্ছিল। আনতারা কি রাগ করেছে? নাকি অভিমান? নাকি খুব কষ্ট পেয়েছে?
অবশেষে কৌতূহলটা আর ধরে রাখতে না পেরে ইফরাদ আড়চোখে তাকায়। দেখে, আনতারা এখনো বসে আছে।
ইফরাদ কিছুটা দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— কী হলো? ঘুমাচ্ছো না কেন?
কিন্তু কোনো উত্তর এল না। ইফরাদ এবার আধশোয়া অবস্থা থেকে একটু উঠে সামনে ঝুঁকে তাকায়। আনতারা ঠোঁট নেড়ে নেড়ে কিছু পড়ছে। কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থেকে ইফরাদ বুঝতে পারে আনতারা দোয়া পড়ছে।
ইফরাদ আবার শুয়ে গিয়ে কপাল কুঁচকে বলে,

— ঘুমানোর আগেও দোয়া পড়তে হয়?
আনতারা এবারও সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দেয় না। ধীরস্বরে দোয়া পড়তেই থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পর পড়া শেষ করে সে ইফরাদের দিকে তাকায়। তারপর শান্ত গলায় বলতে শুরু করে,
— ঘুমানোর আগে কিছু দোয়া আছে, যেগুলো পড়ে ঘুমালে অনেক ফজিলত পাওয়া যায়। যেমন, আয়াতুল কুরসি পড়ে ঘুমালে সারারাত আল্লাহর হেফাজতে থাকা যায়। শয়তান কাছে আসতে পারে না। তারপর তিন কুল অর্থাৎ সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক আর সূরা নাস। এগুলো পড়লে সব ধরনের অনিষ্ট, জাদু, হিংসা আর শয়তান থেকে সুরক্ষা পাওয়া যায়। রোগ-ব্যাধি আর ভয় থেকেও নিরাপত্তা মেলে। এরপর সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়ে ঘুমালে সেটা পুরো রাতের জন্য যথেষ্ট হয়ে যায়। সারারাত ইবাদতের সওয়াবও পাওয়া যায়। আর তাসবিহে ফাতেমি ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, আর ৩৪ বার আল্লাহু আকবার, এগুলো পড়ে ঘুমালে শারীরিক ক্লান্তি আর মানসিক চাপ কমে। মনে প্রশান্তি আসে। রাতটা বরকতময় হয়। ইবাদতের শক্তি বাড়ে। গুনাহ মাফ আর নেকি বৃদ্ধির কারণও হতে পারে, ইনশাআল্লাহ।
এতটুকু বলতেই ইফরাদ অবাক হয়ে বলে উঠে,

— এতগুলো দোয়া?
আনতারা হালকা গলায় বলল,
— এতগুলো কোথায়? কয়েকটাই তো। এগুলো পড়তে দশ মিনিটও লাগে না। আরেকটা দোয়া আছে….
ইফরাদ থামিয়ে বলে,,
— হয়েছে, এখন ঘুমাও। আর শুনতে চাই না।
আনতারা এবার সত্যিই চুপ হয়ে যায়। আর কিছু না বলে শুয়ে পড়ে। সে শুয়ে পড়তেই ইফরাদ প্রশ্ন করে,
— লাইট অফ করে দিবো?
আনতারা চোখ বন্ধ রেখেই বলে,
— আপনার যদি সমস্যা না হয়, তাহলে করে দিন।

ইফরাদ উঠে গিয়ে রুমের লাইট বন্ধ করে। তারপর ফিরে এসে বেডের পাশে থাকা টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালায়। মৃদু হলুদ আলোয় পুরো ঘরটা নরম এক আবছায়ায় ভরে উঠে। ইফরাদ আবার ফোন হাতে নেয়। আঙুল স্ক্রিনে চলছিল ঠিকই, কিন্তু মনটা কোথাও আটকে ছিল।
প্রায় আধাঘণ্টা পর ইফরাদ ঘাড় ঘুরিয়ে আনতারার দিকে তাকায়। আনতারা চোখ বন্ধ করে নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে আছে। সে একটু ঝুঁকে ভালো করে বুঝার চেষ্টা করে, আনতারা কি সত্যিই ঘুমিয়েছে? আসলে এতক্ষণ ইফরাদ ফোন চালানোর ভান করছিল। অপেক্ষা করছিল শুধু আনতারার ঘুমিয়ে পড়ার। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে নিশ্চিত হলো, আনতারা সত্যিই ঘুমিয়ে গেছে। ইফরাদ মোবাইলটা মাথার পাশে রেখে আনতারার দিকে আরও একটু ঝুঁকে। অন্ধকার আর ম্লান আলোয় আনতারার নিষ্পাপ, মায়াভরা মুখটা আরও শান্ত লাগছে। সেই মুখের দিকে তাকিয়ে খুব আস্তে করে বলে,

— আমার কী হচ্ছে?
ইফরাদে কণ্ঠে ছিল বিভ্রান্তি, ছিল নিজের কাছেই হার মেনে বসা এক মানুষের ক্লান্ত স্বীকারোক্তি।
— আমার মধ্যে এসব পরিবর্তন আসছে কীভাবে? ইদানীং হঠাৎ হঠাৎ কী হয় আমার? আমি কেন তোমার সাথে রাগ দেখাতে পারি না? যেখানে আমি নিজের রাগ কখনো কন্ট্রোল করতে পারিনি সবাইকে ধমকের উপর রাখি, সেখানে তোমাকে কিছু বলতে গেলেই কেন ভাবি, তুমি কষ্ট পাবে না তো?
কথাগুলো বলে ইফরাদ ধীরে হাত বাড়িয়ে আনতারার গালে আলতো করে স্পর্শ করে। স্পর্শটা ছিল খুব সাবধানী। যেন একটু জোরে ছুঁলেই আনতারার ঘুম ভেঙে যাবে। ইফরাদ গভীর দৃষ্টিতে আনতারার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে,

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১২

— ইদানীং তোমাকে মন খারাপ দেখলে আমার ভেতরটা অস্থির লাগে কেন? তোমাকে তো কষ্ট দিতে চেয়েছিলাম… কিন্তু এখন এই আমিই তোমাকে কষ্ট পেতে দেখলে সহ্য করতে পারি না কেন? কি করেছো তুমি?

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৩