Home রুহআবিষ্ট তুমি রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৩

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৩

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৩
অধরা মিনহা

সময় এখন সকাল দশটা। আজকের সকালটা চৌধুরী বাড়িতে অন্যসব দিনের থেকে একেবারেই আলাদা।সাধারণত এই বাড়ির ডাইনিং টেবিলটা প্রায় ফাঁকাই থাকে। পরিবারের সবাই একসাথে বসে নাস্তা করে, এমন দৃশ্য বহুদিন দেখা যায়নি। কিন্তু আজ বহু মাস পর পুরো পরিবার একসাথে ডাইনিং টেবিলে বসে নাস্তা করছে।টেবিলে বসে আছেন ইখতিয়ার চৌধুরী, শার্লিন ইমরোজ, ইফতিন এবং ইফরাদ। অন্যদিন সকালে শুধু ইখতিয়ার চৌধুরীকেই নাস্তা করতে দেখা যায়। নাস্তা করেই অফিসে চলে যান। শার্লিন ইমরোজ সাধারণত সকালে ঘুম থেকে ওঠেন না। কিন্তু আজ কী মনে করে যেন সকাল সকাল উঠে পড়েছেন।

ইফতিন আর ইফরাদকেও সাধারণত একসাথে বসে নাস্তা করতে দেখা না। কারণ তাদের ঘুম থেকে ওঠার সময় কখনোই এক হয় না। একজন যখন জেগে ওঠে, অন্যজন তখনো ঘুমিয়ে থাকে। কিন্তু আজ দুই ভাই-ই সকাল সকাল উঠে পড়েছে। ইফতিন আজকে দেশের বাইরে যাচ্ছে। নতুন একটা সিনেমার শুটিংয়ের জন্য তাকে বিদেশে যেতে হবে। তার ফ্লাইট আজ সন্ধ্যাতেই। তবে ফ্লাইটের আগে তাকে শুটিং সেটেও যেতে হবে কিছু জরুরি কাজের জন্য। তাই আজ সকাল থেকেই সে ব্যস্ত। আর ইফরাদেরও আজ অফিসে যেতে হবে।

প্রায় তিন দিন হয়ে গেছে ইরাইনা অফিসে যাচ্ছে না। ফলে আপাতত ইরাইনার দায়িত্বের কাজগুলোও ইফরাদকেই সামলাতে হচ্ছে। এই কারণে তার নিজের চলমান একটা প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপনের শুটিং পর্যন্ত বন্ধ রাখতে হয়েছে ইফরাদকে। ডাইনিং টেবিলে সবাই উপস্থিত থাকলেও একজনের অনুপস্থিতি স্পষ্ট। সে হলো ইরাইনা। এদিকে সবার খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। ইফতিনের নাস্তা শেষ হয়ে গেছে। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে হাত ধুচ্ছিল। হাত ধোয়ার সময় হঠাৎ তার চোখ চলে যায় সামনের আয়নার দিকে।
আয়নার ভেতর একটা দৃশ্য দেখে তার চোখ স্থির হয়ে যায়। ডাইনিং রুমের একজন মেয়ে হেঁটে আসছে। মেয়েটার পুরো শরীর ঢাকা কালো বোরখায়। মুখে নিকাব পরা। ইফতিন প্রথমে মেয়েটিকে চিনতে পারে না। ভালোভাবে দেখার জন্য ঘাড় ঘুরিয়ে সরাসরি তাকায়।
শুধু ইফতিনই না, মেয়েটার হেঁটে আসার শব্দ শুনে টেবিলে বসে থাকা সবাই তার দিকে তাকায়। মেয়েটাকে প্রথম দেখেই ইখতিয়ার চৌধুরীর মনে করেন, মেয়েটা ইফরাদের স্ত্রী। কিন্তু শার্লিন ইমরোজের তা মনে হলো না। কারণ আনতারার উচ্চতা আরো কম।
আর এই মেয়েটা বোরখার আড়ালেও বেশ স্মার্ট এবং আকর্ষণীয় লাগছে। বিশেষ করে নিকাবের ফাঁক দিয়ে দেখা যাওয়া আইলাইনার দেওয়া চোখ দুটো খুবই দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। আনতারা সাধারণত এভাবে বোরখা পরে না। তার চোখও ঢাকা থাকে। সে খিমার পরে। তাই এটা আনতারা হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু তাহলে মেয়েটা কে?
ইখতিয়ার চৌধুরী কৌতূহলী হয়ে ইফরাদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেন,

— তোমরা কি কোথাও যাচ্ছো?
ইফরাদ ফিরে ইখতিয়ার চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বলে,
— আমরা মানে?
ইখতিয়ার চৌধুরী মেয়েটাকে দেখিয়ে বলেন,
— তুমি আর তোমার বউ।
ইফরাদ ভ্রু কুঁচকে মেয়েটার দিকে তাকায়। তারপর বলে,
— ও আমার বউ না। ও কে?
কথাটা বলেই সে আবার মেয়েটার দিকে তাকায়। তার সাথে বাকিরাও তাকিয়ে রইল। সবাই আসলে মনোযোগ দিয়ে দেখে চেনার চেষ্টা করছে মেয়েটা কে? এবার মেয়েটা সবার এমন তাকানো দেখে একদম স্বাভাবিক গলায় বলে,

— আমি রাইনা।
কথাটা শোনার সাথে সাথে যেন পুরো ঘরে বজ্রপাত হলো।কেউ নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। এটা কীভাবে সম্ভব? রাইনাকে কখনো কেউ এই লেবাসে দেখেনি। যে মেয়েটাকে সবাই সবসময় শর্ট ড্রেস পরে দেখতে অভ্যস্ত, তাকে হঠাৎ একদিন সকালে বোরখা নিকাব পরে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলে কেই বা সহজে বিশ্বাস করবে? কিন্তু কণ্ঠস্বরটা তো রাইনারই।সন্দেহ দূর করার জন্য এবার সবাই আরো ভালোভাবে তাকিয়ে দেখল মেয়েটাকে।
সবাই বিস্মিত হলেও ইফরাদের মাথায় তখন অন্য চিন্তা চলছে। মুহূর্তের মধ্যেই ইফরাদের কাছে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেল। গত কয়েকদিন ধরে ইরাইনার আচরণ, তার হঠাৎ করে ঐদিনের পাগলামি আর আজকের এই নতুন রূপ, সবকিছু মিলিয়ে ইফরাদ বুঝে গেল এই কাজ আর কারোর না, এটা তার হাফেজা বউয়ের কাজ। কিন্তু বিষয়টা বুঝতে পেরেই তার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে।কারণ এখন সবাই যখন জানবে এসবের পেছনে আনতারা তখন আনতারার উপর দিয়ে ঝড় যাবে। সবাই কথা শুনাবে। বিশেষ করে শার্লিন ইমরোজ।
হঠাৎ শার্লিন ইমরোজ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। স্বাভাবিক পায়েই হেঁটে গিয়ে ইরাইনার সামনে এসে দাড়িয়ে চোখ একটু সরু করে, ভ্রু সামান্য কুঁচকে বলেন,

— দেখি, মুখ খুলো।
ইরাইনা কোনো কথা না বলে নিকাবটা ওপরে তুলে দেয়।
নিকাবের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো হিজাব পরা ইরাইনার মুখ। মুখটা দেখার সাথে সাথে সবার সন্দেহ দূর হয়ে গেল। এটা সত্যিই ইরাইনা। ইখতিয়ার চৌধুরী আর ইফরাদ চেয়ার ছেড়ে বেড়িয়ে আসে।
এবার শার্লিন ইমরোজ বিস্মিত কণ্ঠে বলে উঠেন,
— রাইনা, এটা তুমি কী পড়েছো?
ইরাইনা শান্তভাবে বলে,
— হিজাব নিকাব পড়েছি, মাম্মা।
ইখতিয়ার চৌধুরীর মুখে বিস্ময় আর সংশয়ের মিশ্র ছায়া খেলে গেল। কুঁচকে থাকা ভ্রুর একপাশ সামান্য উঁচু হয়ে আছে। চোখ দুটো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ইরাইনাকে। এবার তিনি ভারী স্বরে বলেন,

— এগুলো কেন পড়েছো?
ইরাইনা স্বাভাবিক মুখেই উত্তর দেয়,
— অফিসে যাবো। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, এখন থেকে আমি এভাবেই অফিসে যাবো।
ইফতিন হাত ধুয়ে টাওয়াল দিয়ে হাত মুছতে মুছতে সামনে এগিয়ে এলো। অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে ইরাইনার দিকে তাকিয়ে বলে,
— পাগল হয়েছো তুমি?
— পাগল হবো কেন? বোরখা কি পাগলেরা পরে?
ইখতিয়ার চৌধুরী এবার শক্ত গলায় বলেন,
— বোরখা পাগলরা পরে না। কিন্তু তুমি পরায় মানুষ তোমাকে পাগলই বলবে!
ইরাইনা দৃঢ় কণ্ঠে বলে,
— মানুষ কেন পাগল বলবে? আমার ইচ্ছে করেছে, তাই আমি পড়েছি। আর আমি ইরাইনা! আমাকে পাগল বলার দুঃসাহস কেউ দেখাবে না।
ইখতিয়ার চৌধুরী কিছুক্ষণ চুপ করে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। কিছু সময় ইরাইনাকে পরোক্ষ করে তারপর জিজ্ঞেস করেন,

— হঠাৎ করে তুমি বোরখা কেন পড়ছো? এমন চেঞ্জেস কেন?
ইখতিয়ার চৌধুরীর প্রশ্নের উত্তরে ইরাইনা নরম গলায় বলে,
— জীবনে না জেনে, না বুঝে অনেক গুনাহ করেছি। কিন্তু এখন বুঝতে পেরেছি। তাই বোরখা পরব। এটাই আমার পরিবর্তনের কারণ।
ইরাইনার কথা শুনে ইখতিয়ার চৌধুরী আরো বিস্মিত হয়ে গেলেন। তিনি অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলেন,
— কিসব বলছো তুমি, রাইনা? তিন দিন ধরে রুমে বন্দি ছিলে আর এখন বের হয়ে পাগলের মতো কথা বলছো!
ইখতিয়ার চৌধুরীর কথা শেষ হতে না হতেই শার্লিন ইমরোজ ঠান্ডা গলায় বলেন,
— ও পাগল হয়নি। ওর ব্রেইন ওয়াশ করা হয়েছে।
ইখতিয়ার চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে তাকান।

— কাকে মিন করছো?
শার্লিন ইমরোজ তীক্ষ্ণ স্বরে বলেন,
— তুমি বুঝতে পারছো না কে? এই বাড়িতে এসব ফালতু লেবাস আর এমন ধরনের কথা কার সাথে যায়?
কথাটা শুনে ইখতিয়ার চৌধুরী ইফরাদের দিকে তাকান।তিনি বুঝে গেছেন, শার্লিন ইমরোজ কার কথা বলছেন।
শুধু তিনি না, সেখানে উপস্থিত সবাই বুঝে গেছে যে তিনি আনতারার কথাই বলছেন। তখনি ইরাইনা শক্ত গলায় বলে উঠে,

— মাম্মা, আনতারাকে কিছু বলবে না।
শার্লিন ইমরোজ সাথে সাথে বলে উঠেন,
— একশো বার বলব! ওই ফাজিল মেয়েটাকে পেয়েছেটা কী?
মায়ের মুখে আনতারার সম্পর্কে এমন কথা শুনে ইফরাদ আর নিজেকে সামলাতে পারে না। সে জোরে ধমক দিয়ে উঠে
— মাম্মা! আমার সামনে দাঁড়িয়ে আমার বউ…….
কিন্তু বাকিটুকু আর বলতে পারে না। কথা মাঝপথেই থেমে যায়। তার মনে পড়ে কয়েক দিন আগে আনতারার বলা কথাগুলো। আনতারা তাকে বলেছিল, মায়ের সাথে কখনো উঁচু স্বরে কথা না বলতে। আনতারার সেই বুঝানোটা। সেই কথাটা মনে পড়তেই ইফরাদের মন তাকে আটকে দেয়। সে আর বাকিটা বলতে পারল না। চুপ করে গেল। নিজের রাগকে জোর করে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলল।ইফরাদের এমন আচরণ দেখে শার্লিন ইমরোজ অবাক হয়ে গেলেন। এক মুহূর্ত আগেও যে ছেলে রাগে ফেটে পড়ছিল, সে হঠাৎ করেই শান্ত হয়ে গেল।
বাকিরাও বিস্মিত হয়ে তাকিয়ে রইল। ইফরাদ গভীর করে একটা শ্বাস নেয়। ইদানীং তার নিজের মধ্যেই অনেক পরিবর্তন আসছে। সে নতুন করে আবার সবকিছু শিখছে।
ছোটবেলা থেকে সে প্রচণ্ড রাগী স্বভাবের। রেগে গেলে নিজের মা বাবার সাথেও উঁচু স্বরে কথা বলতে দ্বিধা করত না। কিন্তু আজ সেই ছেলেই নিজের বউয়ের কথার সম্মান রাখতে গিয়ে রাগ গিলে ফেলছে। তবে সে শান্ত হলেও তার কণ্ঠের দৃঢ়তা একটুও কমে না।
ইফরাদ শক্ত গলায় বলে,

— মাম্মা, আমি আমার বউ সম্পর্কে একটা উল্টাপাল্টা শব্দও শুনতে চাই না।
শার্লিন ইমরোজ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলেন,
— তোমার বউ এসব করবে আর আমি চুপ করে থাকব? ও নিজেকে কি মনে করে? ওর সাহস কী করে হয় আমার মেয়েকে এসব ভুজুংভাজুং বুঝানোর?
— মাম্মা, রাইনা কোনো বাচ্চা না। আর সবচেয়ে বড় কথা, রাইনা যথেষ্ট বুদ্ধিমতী। আনতারা ওকে কিছু বুঝালেই সে অন্ধের মতো আনতারার কথা শুনবে, এমন না।
এবার ইরাইনা বিরক্ত হয়ে বলে উঠে,
— মাম্মা, তুমি চুপ করবে? আমার কিন্তু রাগ হচ্ছে!
কিন্তু শার্লিন ইমরোজ মেয়ের কথার কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি যেন শুনতেই পেলেন না এমন ভান। উল্টো ইফরাদের দিকে তাকিয়ে বলেন,

— রাইনা বাচ্চা না, ঠিক আছে। কিন্তু ও ইনোসেন্ট। তাই ওই মেয়ের নোংরা পরিকল্পনা ধরতে পারছে না। ওই মেয়ে চায় না রাইনা সফল হোক। ও নিজে সারাদিন চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি হয়ে থাকে। জীবনে কোনো সাফল্য নেই। তাই হিংসা করে। আর সেই হিংসা থেকেই এসব ভুজুংভাজুং কথা বুঝিয়ে রাইনাকে সবকিছু থেকে সরিয়ে দিচ্ছে। রাইনার ক্যারিয়ার নষ্ট করছে।
মায়ের এসব কথা শুনে এবার ইফরাদের ধৈর্য প্রায় শেষ হয়ে এলো। সে এবার আগের চেয়ে জোর গলায় বলে,

— মাম্মা, আনতারা এমন না। তুমি ভুল বুঝছো!
শার্লিন ইমরোজও পিছু হটার মানুষ না। সঙ্গে সঙ্গে বলেন,
— ওই মেয়ে তোমার জীবনে অনেক বড় ক্ষতি করেছে! কিন্তু রাইনার বেলায় এমনটা হতে দেব না।
কথা শেষ করেই তিনি হাঁটতে শুরু করেন। ওনাকে এগিয়ে যেতে দেখে ইখতিয়ার চৌধুরী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেন,
— কোথায় যাচ্ছো?
শার্লিন ইমরোজ উত্তর দিলেন,
— ওই মেয়ের কাছে।
ইরাইনা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠে,
— কেন? তুমি আনতারার কাছে যাবে কেন?
শার্লিন ইমরোজ রাগি গলায় বলেন,

— আমার ইচ্ছে!
এই বলে তিনি আবার সামনে এগোতে নিলেন। ঠিক তখনি ইফরাদ শক্ত কন্ঠে বলে উঠে,
— মাম্মা, আমি চাই না তোমার সাথে আমার ঝগড়া হোক।আমি নিজেকে কন্ট্রোলে রাখছি। তুমিও নিজের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করো আমার বউয়ের সাথে! নয়তো আমি নিয়ন্ত্রণ হারালে এই বাড়ির একটা ইটও আস্ত থাকবে না।
কথাটা শুনে শার্লিন ইমরোজের পা থেমে গেল। তিনি আর সামনে এগোতে পারলেন না। ছেলের মুখে এমন ঠান্ডা হুমকি শুনে আর সাহস হলো না সামনে পা বাড়ানোর।
তিনি ফিরে তাকালেন ইফরাদের দিকে। কয়েক সেকেন্ড শুধু ইফরাদের দিকেই তাকিয়ে রইলেন। ইফরাদের চোখমুখ শক্ত হয়ে আছে। দেখেই বুঝা যাচ্ছে কথা আর কাজে একটু বেমিল হবে না। শার্লিন ইমরোজ এবার ইখতিয়ার চৌধুরীর দিকে তাকালেন। ইখতিয়ার চৌধুরীও গম্ভীর মুখে দাড়িয়ে আছেন। ইফরাদের কথাগুলো ওনাকেও কিছুটা থামিয়ে দিয়েছে, তা ওনার চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ইখতিয়ার চৌধুরী গম্ভীর কণ্ঠে বলেন,

— আচ্ছা, শার্লিন যাবে না।
তারপর ইফরাদের দিকে তাকিয়ে বলেন,
— তোমার বউ এখানে আসুক। আমি তার সাথে কথা বলতে চাই।
ইফরাদ সাথে সাথে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করে,
— কী কথা বলবে? আমাকে বলো। আমি ওর হাসবেন্ড!
ইখতিয়ার চৌধুরী কর্তৃত্বপূর্ণ গলায় বলেন,
— যেহেতু ব্যাপারটা আমার মেয়েকে নিয়ে, তাই তার সাথে কথা বলার অধিকার আমার আছে।
ইফরাদ আর কিছু বলে না। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে যায়। ইফরাদ চাইলেও কিছু বলতে পারছে না, কারণ আনতারা তাকে মানা করেছে। নাহলে আগের ইফরাদ হলে এতক্ষণে একটা কঠিন ধমক দিয়ে দিতো আর তার বাবা মাও দ্বিতীয়বার কিছু বলার সাহস পেত না। কিন্তু আনতারা তাকে এসব করতে নিষেধ করেছে। তাই এখন তাকে ধৈর্য ধরতে হচ্ছে। তবে ইফরাদ নিজেও জানে না সে আর কতক্ষণ এভাবে নিজেকে আটকে রাখতে পারবে, কারণ সে স্বভাবতই অনেক রাগী। তার উপর এমন পরিস্থিতিতে শান্ত থাকা তার জন্য আরো কঠিন।

ইখতিয়ার চৌধুরী মেইডকে পাঠান আনতারাকে ডেকে আনার জন্য। রাইনা অবশ্য এতে বাধা দিয়েছিলো কিন্তু ইখতিয়ার চৌধুরী তার কথা শুনেন না। কিছুক্ষণ পর আনতারা ডাইনিং রুমে প্রবেশ করে। তার পুরো শরীর কালো বোরখায় ঢাকা, হাত-পা মোজায় আবৃত। মেইড যখন তাকে নিচে আসতে বলে, তখন আনতারা কারণ জানতে চেয়েছিল। মেইড সংক্ষেপে পুরো ঘটনা জানালে সে বুঝে যায় যে ইফতিন ও ইখতিয়ার চৌধুরীর সামনে তাকে আসতে হবে। যেহেতু ইফতিন গায়রে মাহরাম সেজন্য তাদের সামনে পর্দা করার বিধান দিয়েছেন আল্লাহ। তাই আনতারা বোরখা পড়ে এসেছে।
ডাইনিং রুমে ঢুকেই আনতারার প্রথম নজর যায় ইরাইনার দিকে। বোরখা পরা ইরাইনাকে দেখে নিকাবের আড়ালেই আনতারার ঠোঁটে আলতো হাসি ফুটে ওঠে। ইরাইনার এই পরিবর্তনে সে মন থেকে খুশি হয়। সাথে সাথেই মনে মনে দোয়া করে, আল্লাহ যেন ইরাইনার এই পরিবর্তন কবুল করেন। আনতারা আসতেই ইফরাদ দ্রুত নিজের জায়গা থেকে সরে এসে আনতারার পাশে দাঁড়ায়। তার এভাবে এসে পাশে দাঁড়ানো টা আসলে আনতারাকে সাহস দেওয়ার জন্য। যেন আনতারা উপলব্ধি করে সে একা না, ইফরাদ তার পাশে আছে। শুধু আনতারাকে না বাড়ির সবাইকেও এই ব্যাপারটা বুঝায়।
আনতারা দেখামাত্রই শার্লিন ইমরোজ বিদ্রুপের সুরে বলে ওঠেন,

— এমন ভাব ধরে এসেছে, মনে হচ্ছে জান্নাত থেকে নেমে এসেছে!
আনতারা শান্তভাবে বলে,
— এই কথাটায় কবিরা গুনাহ হয়েছে। আপনি আমাকে তাচ্ছিল্য করতে গিয়ে ইসলাম ধর্মকেই তাচ্ছিল্য করছেন।
শার্লিন ইমরোজ বিরক্ত হয়ে বলেন,
— ওর কথা শুনলে মনে হয় ও একাই জান্নাতি। আর আমরা সবাই জাহান্নামী!
আনতারা আগের মতোই উত্তর দেয়,
— কে জান্নাতে যাবে আর কে যাবে না, এটা আপনি, আমি কিংবা দুনিয়ার কোনো মানুষই নির্ধারণ করতে পারে না, পারবেও না। হাজারটা ভালো কাজ করেও কেউ জান্নাতে যেতে নাও পারে, আবার কোটি কোটি খারাপ কাজ করেও কেউ আল্লাহর রহমতে ক্ষমা পেয়ে জান্নাতে যেতে পারে। আর তাছাড়া আমি নিজেকে এতটা ইমানদার ভাবি না যে অন্য কাউকে দেখে কাফের বা মুশরিক মনে করব। নিজেকে এতটা আত্মবিশ্বাসীও ভাবি না যে আমি নিশ্চিতভাবে জান্নাতে যাবো, আর অন্য কাউকে দেখে জাহান্নামী বলে ধরে নেবো। কারণ কে জান্নাতে যাবে আর কে জাহান্নামে যাবে, সেটা একমাত্র মহান আল্লাহই জানেন। কে ক্ষমা পাবে আর কে পাবে না, সেটাও শুধু আল্লাহই জানেন। তবে আল্লাহ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুক, দয়া করুক।
শার্লিন আগের তুলনায় দ্বিগুণ বিরক্ত হয়ে বলেন,

— ওর এসব নাটকের কথা শুনলে আমার গা জ্বলে ওঠে। ওর মধ্যে ন্যূনতম ভয়ও নেই, ও কি করেছে!
— ভয় আছে, তবে সেটা আল্লাহর জন্য। আর যা করেছি, আল্লাহর ভয়েই করেছি।
এই কথা শুনে শার্লিন ইমরোজ তেতে উঠেন। ইখতিয়ারের দিকে তাকিয়ে বলেন
কথাটা শুনে শার্লিন ইমরোজ ক্ষোভে ফেটে পড়েন।মুখমণ্ডল মুহূর্তেই কঠোর হয়ে যায়। ইখতিয়ারের দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ স্বরে বলেন,
— দেখেছো? দু’দিন আগেও অসহায়ের মতো ছিল! মুখ থেকে একটা শব্দও বের হতো না। আর এখন গলার জোরটা দেখো! ফকিন্নি রাজত্ব করতে পেয়ে নিজেকেই রানি ভাবতে শুরু করেছে!
ইফরাদ এবার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রুম কাঁপিয়ে চিৎকার করে ওঠে,
— মাম্মা!

ইফরাদের বজ্রনিনাদের মতো চিৎকারে শার্লিন ইমরোজ শিউরে উঠেন। চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে উঠে ভয়ের ছাপ। ইফরাদ আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল তখনি আনতারা দ্রুত ইফরাদের হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে ইফরাদকে থামিয়ে দেয়। ইফরাদ থেমে গিয়ে আনতারার দিকে তাকালে আনতারা মাথা নেড়ে না বোঝায়। ইফরাদ রাগ থাকা সত্ত্বেও আনতারার কথার বিপরীতে কিছু বলে না। মেনে নেয়। চুপ করে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে গভীর শ্বাস নেয়, নিজের রাগ শান্ত করার চেষ্টা করে।
ইখতিয়ার চৌধুরী, শার্লিন ইমরোজ আর ইফতিন নীরবে এই দৃশ্য দেখতে থাকে। তারা স্পষ্ট উপলব্ধি করেছে আনতারার প্রভাব। যে ইফরাদ আগে কাউকে পরোয়া করত না, সেই ইফরাদ আজ একমাত্র আনতারার ইশারায় থেমে গেলো। যে ইফরাদকে শান্ত করা অসাধ্য, সেই ইফরাদকেই আনতারা শুধু একটা ইশারাতেই শান্ত করে ফেলেছে। ইফরাদের জীবনে আনতারার গুরুত্ব কতটা গভীর, তা উপস্থিত সবাই খুবই ভালো করে উপলব্ধি করেছে।
পরিস্থিতি ঠিক করতে ইখতিয়ার চৌধুরী এবার গলা খাকারি দিয়ে বলে উঠেন,

— আচ্ছা, আমি কথা বলতে ডেকেছি। সবাই চুপ থাকো।
এরপর তিনি একটু থেমে গভীর শ্বাস নিলেন। তারপর আনতারার দিকে তাকিয়ে বলেন,
— তুমি এই বাড়ির বউ। তুমি আমাদের সবার থেকে আলাদা। তোমার চালচলন, চিন্তাভাবনা সবই আলাদা। এতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তুমি তোমার মতো থাকো। কিন্তু আমাদের আপত্তি হলো, তুমি কেন নিজের মতো করে আমার মেয়েকে গড়তে চাইছো? ওর মধ্যে কেন এসব অহেতুক চিন্তা ঢোকাচ্ছো? তুমি তোমার চিন্তাভাবনা, ধর্মভীরুতা নিয়ে থাকো, কিন্তু আমার পরিবারের সদস্যদের থেকে দূরে থাকো। আমাদের সোসাইটিতে তোমার মতোভাবে চলা যায় না।
তার কথা শেষ হতেই ইরাইনা আর নিজেকে সামলাতে পারে না। এগিয়ে গিয়ে ডাইনিং টেবিল থেকে একটা গ্লাস তুলে মাটিতে ছুড়ে ফেলে। কাঁচ ভেঙে ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। রাগে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠে,

— কী শুরু করেছো তোমরা? আমাকে কি বাচ্চা মনে হয়? নাকি আমি নির্বোধ? আমি নিজের ইচ্ছাতেই এসব করছি। তোমরা সেটা বুঝতে চাইছো না কেন? তোমরা শুধু আনতারাকে না, আমাকেও অপমান করছো!
সবাই একসাথে তাকায় ইরাইনার দিকে। ইরাইনা রাগে কাঁপছে। তাকে এমনভাবে উত্তেজিত হতে দেখে আনতারা নরম স্বরে বলে,
— শান্ত হন আপু। যেহেতু কথাটা আমাকে বলা হয়েছে, উত্তরটা আমিই দেবো।
ইরাইনা কাঁপা কণ্ঠে বলে,
— আমি শান্ত হতে পারছি না! ওরা শুরু করেছে কি? আমার যা ইচ্ছে আমি করব! ওরা কেন তোমাকে এখানে এনে এসব বলছে?
আনতারা ধীর স্বরে বলে,

— আমার এখানে আসায় কিছুই হয়নি। ওনারা বয়সে বড়। আমাকে ডাকতেই পারেন। আপনি শান্ত হন, আপু। আমি অশান্তি চাই না। আমার জন্য অন্তত শান্ত হন।
আনতারার কথাটা ইরাইনা আর উপেক্ষা করতে পারল না। সে চুপ হয়ে গেল। আর কিছু বলল না। ইখতিয়ার চৌধুরী কেবল আনতারার দিকেই তাকিয়ে আছেন। চারপাশের এমন পরিস্থিতি এবং নানা আজেবাজে কথার শুনেও আনতারার এমন শান্ত উপস্থিতি ওনাকে অবাক করে। আনতারার কথায় তিনি বুঝতে পারেন, মেয়েটা যথেষ্ট পরিণত, ভীষণ বুঝদার এবং মানসিকভাবে দৃঢ়।
আনতারা এবার ইখতিয়ার চৌধুরীর দিকে ফিরে তাকিয়ে বলে,
— আপনি আপনার কথার উত্তর পাবেন। তার আগে আমি একটা প্রশ্ন করতে চাই। আপনি কি ইরাইনা আপুকে খুব ভালোবাসেন?
হঠাৎ আনতারার এমন প্রশ্নে ইখতিয়ার চৌধুরীর কপালে ভাঁজ পড়ে যায়। এমন প্রশ্ন কেন? তিনি স্বাভাবিক মুখেই বলেন,

— রাইনা আমার একমাত্র মেয়ে। আমি ওকে জানের চেয়েও বেশি ভালোবাসি!
আনতারা আবার বলে,
— আচ্ছা। ইরাইনা আপু কি কখনো রান্না করেছে?
— হ্যাঁ, একবার করেছিল। আমাদের জন্য কফি বানিয়েছিল।
— তারপর আর কখনো কিছু রান্না করেনি?
ইখতিয়ার সরাসরি উত্তর দেন,
— না।
— শুধু একবারই? বাবার জন্য শুধু একবারই ভালোবেসে কিছু রান্না করেছিল?
এই কথাটা আনতারা ইরাইনার দিকে তাকিয়ে বলে। ইরাইনা লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে ফেলে। ইখতিয়ার চৌধুরী স্বাভাবিক গলায় বলেন,
— তারপর থেকে আমি আর কখনো আমার মেয়েকে চুলার কাছে যেতে দেইনি।
আনতারা জিজ্ঞেস করে,

— কেন?
বলেই আনতারা থেমে আবার বলে,
— বেয়াদবি মনে করবেন না। শুধু জানতে চাইছি।
ইখতিয়ার চৌধুরী স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলেন,
— প্রথমবার কফি বানাতে গিয়ে ওর হাত পুড়ে গিয়েছিল। তাই এরপর আর কখনো চুলার কাছে যেতে দিইনি।
আনতারা এবার ইরাইনার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
— অনেক বেশি পুড়েছিল?
ইরাইনা স্বাভাবিক গলায় বলে,
— না, সামান্যই। আঙুলে একটু লেগেছিল।
ইখতিয়ার চৌধুরী এবার গম্ভীর গলায় বলেন,
— অন্যদের কাছে সেটা সামান্য হলেও আমার কাছে সেটা অনেক বড় ছিল। আমার মেয়ের কোনো কষ্টই আমার কাছে ছোট না।
— যেখানে ইরাইনা আপু একবার রান্না করতে গিয়ে শুধু আঙুল পুড়িয়ে ফেলেছিল, সেই জন্য আপনি আর তাকে চুলার কাছে যেতে দেননি। অথচ সেই বাবা আপনি কিভাবে নিজের মেয়েকে আখিরাতে জ্বলন্ত জাহান্নামের আগুনের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন?
ইখতিয়ার চৌধুরী চোখ কুঁচকে কপালে ভাজ ফেলে প্রশ্ন করেন,

— তুমি কী বলতে চাইছো?
আনতারা অবিচল কণ্ঠে বলে উঠে,
— আল্লাহ পাক কুরআনে আদেশ দিয়েছেন নারীদের পর্দা করার জন্য। পর্দা করা প্রতিটা নারীর জন্য ফরজ। পর্দা করা এতটাই আবশ্যক প্রতিটা নারীর জন্য যে যদি পুরো দুনিয়ায় কোনো পুরুষ না থাকে তবুও নারীদের পর্দা করতে হবে। যখন একটা মেয়ে বেপর্দায় থাকে এবং তাকে বেপর্দা অবস্থায় যারা দেখে তাদের সকলের চোখের জেনা হয়। এবং এতে করে ঐসব মানুষের পাপের শাস্তি সেই বেপর্দা মেয়েও পাবে। একটা মেয়ের মাহরাম ছাড়া বেপর্দা হয়ে গায়রে মাহরামের সামনে যাওয়ার জায়েজ না। আল্লাহ নিষেধ করেছেন। আর যেই ব্যক্তি আল্লাহর আদেশ অমান্য করবে আল্লাহ তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবে। আমাদের রাসুল (সা) বলেছেন, যে নারী বেপর্দা হয়ে চলবে সেই নারী জান্নাতে যাবে না। শুধু তাই না জান্নাতের ঘ্রাণ পর্যন্ত পাবে না।

আনতারা থামে। চারপাশে নীরবতা নেমে আসে। ইখতিয়ার চৌধুরীর মুখ কিছুটা চুপসে গেছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে উত্তর দেওয়ার মতো কোনো কথা নেই। ইফতিন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আনতারার দিকে। তার ঠোঁটের কোনে হালকা বাঁকা হাসি। এদিকে ইরাইনা কাঁদছে নিরবে। নিজের অতীতের করা গুনাহের কথা মনে পড়ে অজান্তেই চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। ভয়ও কাজ করছে তার মনে আনতারার কথা শুনে। শার্লিন ইমরোজের মুখটাও কেমন হয়ে আছে। কেউই কিছু বলার উত্তর পাচ্ছে না। আনতারার পেছনে ইফরাদ একদম শান্ত। তার মুখে কোনো অভিব্যক্তিই নেই।
আনতারা আবার বলে উঠে,

— এখন শুনুন জাহান্নামের আগুন কতটা ভয়ংকর। জাহান্নামের এক বিন্দু আগুন যদি পৃথিবীতে পড়ে এই পৃথিবী জ্বলে পুড়ে ছাড়খাড় হয়ে যাবে। এই যে আপনি আপনি ইরাইনা আপুর সামান্য হাত পুড়ে যাওয়াটা সহ্য করতে পারছিলেন না আপনি কি এটা সহ্য করতে পারবেন? কল্পনা করুন তো আপনি বাধা দেননি কিংবা আবার কথায় ইরাইনা আপু বেপর্দা হয়ে জাহান্নামে যাচ্ছে। সহ্য করতে পারবেন সেই জাহান্নামের আগুনে ইরাইনা আপু জ্বলছে?
ইখতিয়ার চৌধুরী ঢোক গিলে ফেলেন। ওনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা হাঁটু বয়সী মেয়েটা পুরো পরিস্থিতিটাই বদলে দিয়েছে। তার কথাগুলো কেবল মুখ বন্ধ করে দেয়নি বরং ভেতরটা অস্থির করে তুলেছে। কপালে ঘাম জমে উঠেছে ওনার। নিজের সবচেয়ে আদরের মেয়েকে আগুনে পোড়ার দৃশ্য কল্পনা করতে পারছেন না তিনি। সহ্যও হচ্ছে না।
আনতারা শান্ত গলায় বলে,

— কি সহ্য করতে পারছেন না তো? তাহলে কেন ইরাইনা আপু যখন হেদায়েত প্রাপ্ত হয়ে সঠিক পথে ফিরে এসেছে তাকে আবার ভুল পথে টানছেন? আপনি বললেন না সোসাইটির কথা? সেদিন হাশরের ময়দানে কি সোসাইটির মানুষগুলো কি ইরাইনা আপুকে বাঁচাতে পারবে? কিংবা তার ভাগের শাস্তি নিজের কাঁধে নিবে? তারা নিজের করা পাপের জবাব দিয়েই পেরে উঠতে পারবে না। তাহলে মানুষের জন্য কেন মেয়ের আখিরাতটা নষ্ট করছেন?
আনতারা এক মুহূর্ত থেমে ঘাড় ফিরিয়ে ইফরাদের দিকে তাকায়। ইফরাদ একদম স্বাভাবিক। আনতারা আবার সামনে ফিরে শান্ত স্বরে বলে ওঠে,
— তাছাড়া কোনো নারী যদি বেপর্দার কারণে জাহান্নামে যায় তাহলে সে একা যাবে না। চারজনকে নিয়ে জামাতের সাথে যাবে। প্রথমজন তার বাবা, দ্বিতীয়জন তার স্বামী আর তৃতীয়জন বড় ভাই আর চতুর্থজন তার বড় ছেলে। অর্থাৎ ইরাইনা আপু যদি বেপর্দার কারণে জাহান্নামে যায় তবে আপনি আর ইফরাদ কে সাথে নিয়ে যাবে। কারণ বিয়ের আগে সে আপনাদের দুজনের দায়িত্বে ছিলো। আপনারা তাকে পর্দায় রাখতে পারেননি। তাকে বাধা দেননি।
ইখতিয়ার চৌধুরী আর ইফরাদ একে অপরের দিকে তাকায়। ঠিক তখনি ইফতিন হাত তালি দিয়ে বলে উঠে,

— তাহলে আমি বেঁচে গেছি। ব্রো আর ড্যাড চিপায় পড়ে গেছে!
সবাই বিরক্ত দৃষ্টিতে ইফতিনের দিকে তাকায়। কিন্তু ইফতিন সেদিকে পাত্তা দেয় না। স্বাভাবিকভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে।
হঠাৎ শার্লিন ইমরোজ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলেন,
— তুমি যে এতো হাদিস শুনাচ্ছো তুমি নিজে কি? এতো এতো হাদিস জানো, গুনাহ সম্পর্কে জানো আর এটা জানো না বরকে নাম ধরে ডাকতে নেই। অথচ সারাদিন বেয়াদবের মতো ইফরাদ ইফরাদ করো। তখন তোমার হাদিস গুনাহ কোথায় যায়?
আনতারা এবার শান্তি ইমরোজের দিকে তাকিয়ে বলে,
— ইসলামে স্বামীর নাম ধরে ডাকলে কোনো গুনাহ নেই! উল্টো আপনি যে বলছেন, স্বামীর নাম ধরে ডাকা গুনাহ আসলে এই কথাটা গুনাহ, সেটার জন্য আপনার গুনাহও হতে পারে। স্বামীর নাম ধরে থাকা নবী ইব্রাহিম (আ.) এর সুন্নত। নবী ইব্রাহিম (আ.) এর স্ত্রী হাজেরা ইব্রাহিম (আ.) কে নাম ধরে ডাকতেন। সেজন্য স্ত্রী স্বামীর নাম ধরে ডাকলে গুনাহ নেই। তারপরও যদি ইফরাদের আপত্তি থাকে তাহলে আমি ইফরাদের নাম ধরে ডাকবো না।
শেষের কথাটা আনতারা ইফরাদের দিকে তাকিয়ে বলে।
কথা শেষ হতেই ইফরাদ বলে উঠে,

— আমার এত সুন্দর একটা নাম দিয়েছো এটা যদি আমার বউই না ডাকতে পারে তাহলে আর নাম রেখে লাভ কি?
শার্লিন ইমরোজ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বলেন,
— তোমার নাম কি আমি রেখেছিলাম এই মেয়ে নাম ধরে ডাকার জন্য?
কথা শেষ হতেই ইফরাদ দেরি না করে আনতারার হাত ছেড়ে দেয়। পরক্ষণেই নিজের ডান হাতটা আনতারার কোমরে জড়িয়ে আনতারাকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে এলো। দুজনের মাঝে দূরত্ব একেবারে কমে এল। আনতারা তার শরীরের সাথে লেগেছে। ইফরাদ জোর গলায় বলে উঠে,
— এই মেয়েটা আমার বউ। আর আমার সবকিছুর ওপর আমার বউয়েরই সবচেয়ে বেশি অধিকার। তাহলে আমার নামের ওপরও তো আনতারারই বেশি হক থাকে, তাই না?
ইফরাদের এমন আচরণে আনতারা মুহূর্তেই চমকে উঠে। অপ্রস্তুত লজ্জায় তার চোখ নেমে আসে। বড় এবং ছোটদের সামনে ইফরাদের এমন ঘনিষ্ঠতায় আনতারা সংকুচিত হয়ে পড়ে। তবে কিছুই বলে না, মাথা নিচু করে রইল। ইফরাদের কথায় শার্লিন ইমরোজের রাগ আরো বেড়ে গেলো। কণ্ঠে ক্ষোভ চেপে বলেন,

— হুজুর বউয়ের সাথে থাকতে থাকতে হক সম্পর্কে বেশ ভালোই জ্ঞান অর্জন করেছো!
ইফরাদ এবার শ্বাস ছেড়ে বলে,
— মাম্মা এখন তুমি কি চাও? আনতারা আমাকে এগো শুনছো? ওগো শুনছো করে ডাকুক? এগো, ওগো বলে ডাকগুলো ইজ টু রোমান্টিক!

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১২ (২)

শেষের কথাটা সে হালকা হাসি দিয়ে বলে। আনতারা এই কথা শুনে আরো লজ্জায় পড়ে যায়। ইখতিয়ার চৌধুরীও অল্প লজ্জা পান, ছেলের বউয়ের সামনে ছেলের এমন কথা শোনে। শার্লিন ইমরোজের সহ্য করতে পারেন না ইফরাদের এমন ফাজলামো। তিনি কিছুতেই মানতে পারছেন না আনতারার সাথে ইফরাদের এমন ঘনিষ্ঠতা।
তিনি শক্ত গলায় বলেন,
— আমি কিছুই চাই না। তোমার বউ যা চায় তাই করো!
কথাটা বলেই শার্লিন ইমরোজ রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে দ্রুত পায়ে সেখান থেকে বেরিয়ে যান।

রুহআবিষ্ট তুমি পর্ব ১৩ (২)