Home রোদ্দুর এবং তুমি রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ৩

রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ৩

রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ৩
ফারহানা চৌধুরী

দরজার ঠকঠক হওয়ার শব্দে অরুর ঘোর ভাঙে। তাকায় দরজার দিকে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো। দরজা খুলে দেখল শুভ্রকে। অরু ভ্রু বাঁকাল। শুভ্র অপ্রস্তুত গলায় বলল,
-‘মা-বাবা ডাকছে তোমাকে। কি কথা বলবে নাকি।’
অরু চোখ সরালো। কোনো জবাব না দিয়ে শুভ্রর পাশ কাটিয়ে বের হয়ে গেল৷ শুভ্র ভ্রু কুঁচকায়। মেয়েটা একটু বেশিই অদ্ভুত না? অবশ্য যা হয়েছে তাতে এমন ব্যবহার অস্বাভাবিক নয়। শুভ্র তপ্ত শ্বাস ফেললো। অরুর পিছু পিছু গেল বাবা-মায়ের ঘরের দিকে।
অরু মেরিনা আর আশরাফুল তালুকদারের ঘরের সামনে এসে থামলো। দরজা খোলা থাকলেও সে আওয়াজ করল। মেরিনা আশরাফুল তালুকদারের সাথে কথা বলছিল। শব্দ পেয়ে তাকাল এদিকে। অরুকে দেখে ডাকল ভেতরে,

-‘আরে! আয়, আয়। ভেতরে আয়।’
অরু মাথা দুলিয়ে ঢুকল ভেতরে। মেরিনা তাকে নিজের পাশে বসাল। অরুর পিছু পিছু শুভ্রও এলো। শুভ্রকে দেখে আশরাফুল তালুকদার বলল,
-‘তুই আমার কাছে আয়। এখানে বস।’
শুভ্র মায়ের দিকে একবার চেয়ে বসল বাবার পাশে। অরুর মাথায় হাত বুলিয়ে মেরিনা বলল,
-‘একটু ঘুমাতে হবে তোমার। চোখ-মুখের অবস্থা খুব ভালো না। রেস্ট নিস।’
অরু বলল,
-‘ঘুমাব আন্টি। এখন আসছে না।’
শুভ্র তাড়া দিল,
-‘আম্মু, কি বলবে বলছিলে?’
মেরিনা তাকাল স্বামীর দিকে। তারপর ছেলে আর বৌমার দিকে চেয়ে বলল,
-‘আমরা কালকে রাতের ফ্লাইটে দেশে ফিরছি। অরু এখানেই থাকবে।’
-‘কি!’
একসাথে বলে উঠলো শুভ্র-অরু। পরপর চমকে নিজেদের দিকে তাকাল। অরু মেরিনার দিকে চোখ ফিরিয়ে বলল,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

-‘এভাবে কি করে? মানে, আমি একা একা এখানে—’
অরু থেমে গেল। কিছু বলতে পারল না আর শুভ্র বলল,
-‘তোমরা আজ এলে কালকেই কেন চলে যাবে? কয়েকদিন থেকে তারপর যাও।’
মেরিনা ভ্রু বাঁকিয়ে তাকাল। শুভ্র অস্বস্তি নিয়ে বলল,
-‘অ-অরুর ভালো লাগবে অন্তত। ও একা একা এখানে, তাই আর কি।’
আশরাফুল তালুকদার এবার বলে বসল,
-‘তুমি এতো ওর জন্য ভাবছো কবে থেকে?’
মুখের উপর এমন করে বলে নিজেও অস্বস্তিতে পড়ে গেলেন। শুভ্র বিব্রত বোধ করল। অরুও চমকেছে ঢের। মেরিনা বলল,

-‘নিজের বাড়ি রেখে এখানে আমার মন টানবে না। অরুর পড়াশোনার ব্যাপার-স্যাপার, ক্যারিয়ারের কথা; তাই এখানে এসেছি ওকে দিয়ে যেতে। আশা করি তুমি এমন কিছু করবে না যাতে আমাদের মান-ইজ্জত ক্ষুন্ন হয়।’
শুভ্র আশ্চর্য হলো,
-‘আম্মু। কেমন কথা বলতেছ এসব? আমি কিছু এমন কেন করব?’
-‘সেটাই।’
শুভ্র শ্বাস ফেলতে নিল তখনই তার শ্বাস আটকে দেওয়ার মতো কথা বলে উঠলো আশরাফুল তালুকদার,
-‘অরুর এডমিশন নেওয়ার পর, তুমি ওকে আমাদের অফিসে ইন্টার্ন হিসেবে নিয়ে নাও। যদি জব করতে পারে তবে এক্সপেরিয়েন্সের জন্য হলেও সে ফিউচারে ভালো জায়গায় ভালো পজিশনে চাকরি করতে পারবে।’
শুভ্র পানি-টানি খাওয়া ছাড়াই বিষমটা খেল বেশ ভালোভাবে। সে চরম আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করে,
-‘হ্যাঁ? ইন্টার্ন?’

অরুও বেশ চমকেছে। প্রথমে একই বাড়ি, তারপর একই ওয়ার্কপ্লেস। কক্ষনো না! অরু মরে গেলোও এই সিদ্ধান্ত মানতে পারবে না। তবে থামাতে হবে তো। সে বলে উঠলো,
-‘এখনই এসবের কি দরকার আঙ্কেল? এখনও ভালো করে পড়ায় ফোকাস করি, তারপর—’
তার কথা শেষ হওয়ার আগে মেরিনা বলে উঠল,
-‘তুই থাম। না করিস না। এখন থেকে ইন্টার্ন করলে কাজও শিখতে পারবি৷ পড়াশোনায়ও হেল্প হবে। ইজি হবে।’
অরু পড়লো ফ্যাসাদে। সে পুরোপুরি না, আড়চোখে চাইল শুভ্রর দিকে। শুভ্র তার দিকেই তাকিয়ে ছিল। চোখে চোখ পড়তেই অরু চোখ সরিয়ে নিল। তীব্র অস্বস্তিতে যখন সে জর্জরিত তখন শুভ্র গম্ভীর গলায় বলে উঠলো,
-‘ঠিক আছে৷ যা বলবে।’
অরু চমকে তাকায়। আশরাফুল তালুকদার হেসে উঠলেন। শুভ্র অরুর দিকে শান্ত দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বেড়িয়ে গেল ঘর থেকে। অরু চোখ খিঁচে নিল। এখন একে সহ্য করবে কি করে, সে আল্লাহ মাবুদ জানে!

মেরিনা আর আশরাফুল তালুকদারের আসার সময় হয়েছে। তারা এখন এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে। ফ্লাইট কিছুক্ষণ পরেই। মেরিনা অরুর সাথে রয়েছেন। আশরাফুল তালুকদারও আছেন। শুভ্র পানি আনতে গিয়েছে। মেরিনা হঠাৎ অরুকে বলল,
-‘অরু, শোন।’
অরু তাকায়,
-‘হ্যাঁ?’
মেরিনা বড়ো করে শ্বাস ফেললো। অরুর হাত ধরে বলল,
-‘যা হয়েছে সবটা ভুলে পারলে তোরা আবার সবকিছু ঠিক করে শুরু কর।’
অরু চমকাল না। চুপচাপ তাকিয়ে রইল মেরিনার দিকে। আশরাফুল তালুকদার পাশ থেকে বললেন,
-‘দেখ অরু মা, বিয়েটা কোনো ছেলে খেলা না। এটাকে নিয়ে এভাবে—’
তাঁর কথা শেষ হওয়ার আগেই অরু বলে বসল,
-‘ছেলে খেলা কি আমি বানিয়েছি আঙ্কেল? আপনার ছেলে স্বেচ্ছায় যা করার করেছে। তার জন্য আজকে আমি এমন হয়েছি।’

অরু থামল। চোখ-মুখ কুঁচকে এসেছে তার। সে নিজেকে সামলে বলল,
-‘আপনারা, আমার মা-বাবা সবার জোরাজুরিতে বিয়েটা হয়েছিল। আমাদের ইচ্ছেয় না। আপনাদের জন্য আমরা এমন একটা পরিস্থিতি দিয়ে যাচ্ছি, সেটা আপনারা অস্বীকার করতে পারবেন? আমি আপনাদের ছেলেকে সাধু বানিয়ে দিচ্ছি না৷ তার দোষ আছে। অবশ্যই আছে। যেখানে আমার মা-বাবাই আমাকে বিয়ে দিয়ে বোঝা হালকা করতে চেয়েছে, সেখানে উনি কে? ওনার থেকে বিগত তিন বছর ধরে যেমন আচরণ আমি পেয়েছি, সেখানে আমি তার সাথে কি করে থাকবো? আমার নিজেকে ছোট মনে হচ্ছে আন্টি। এমন লাগছে, আমি সবার কাছে বোঝা। আপনারা এমন কেন করেছিলেন? আমার জীবনটা কেন শেষ করে দিয়েছিলেন?’

মেরিনার প্রচন্ড অদ্ভুত লাগল। মনে হলো এতোদিন যা হয়েছে, মাঝ থেকে মেয়েটা পিষে গিয়েছে। তিনি কিছু বলতে চাইলেন। তখন শুভ্র এল পানি হাতে। কথা আটকে এল মেরিনার। শুভ্র এসে দেখল সবাই চুপচাপ। চোখ-মুখের অবস্থাও বিশেষ ভালো না। সে ভ্রু কুঁচকায়। ভেবে নেয় মেরিনা আর আশরাফুল চলে যাচ্ছে এজন্যই। সে পানির বোতল এগিয়ে দিল মায়ের দিকে। মেরিনা উদাস হয়ে তা নিলেন। তখন এয়ারপোর্টে ঘোষণা শুরু হলো। সকলে নিজেদের ব্যাগ-পত্তর নিয়ে ছোটাছুটি লাগিয়েছে। মেরিনা আর আশরাফুল উঠে দাঁড়ালো। অরুকে এক হাতে জড়িয়ে মেরিনা বলল,

-‘ভালো থেকো। নিজের যত্ন নেবে, কেমন? আমরা পারলে মাঝে-মধ্যে আসবো। আর শুভ্র কিছু বললে, আমাকে জানাবে। ওর ব্যবস্থা আমরা করবো।’
শুভ্র ভ্রু উঁচিয়ে তাকালো,
-‘আম্মু!’
তার কথার ধার ধারলেন না মেরিনা। আশরাফুল অরুর মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
-‘আমার ছেলেকে একটু টাইটে রেখো মা। যা ঘাড়ত্যাড়া! ওকে বড়ো করেতে যেয়ে আমাদের হাড্ডিই বেঁকে গিয়েছে।’
অরু হাসার চেষ্টা করলো। আশরাফুল শুভ্রর উদ্দেশ্যে বললেন,
-‘ওর খেয়াল রেখো। আমি যেন আজেবাজে কিছু না শুনি।’

শুভ্র মাথা দোলায়। এরপর ধীরে ধীরে সময় ঘনিয়ে এলো। আশরাফুল আর মেরিনা বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। প্লেন টেক অফ করা পর্যন্ত অরু আর শুভ্র এয়ারপোর্টেই দাঁড়িয়ে রইলো। এরপর ধীরেসুস্থে বেড়িয়ে গাড়ির কাছে এলো। তখন শুভ্রর ফোন এল। সে বলল,
-‘গাড়িতে ওঠো। আমি আসছি।’
বলে চলে গেল কিছুটা দূরে। অরু তাকিয়ে দেখল শুভ্র ফোন কানে চেপে কথা বলছে। পরনের সাদা শার্টের সাথে ব্ল্যাক লেদার জ্যাকেট। অরু তীক্ষ্ণ চোখে চেয়ে ব্যাক সিটের ডোর খুলে বসে পড়লো। বিরক্তিতে মেজাজ তেঁতো হয়ে এসেছে। শুভ্র কিছুক্ষণ পর এসে অরুকে ব্যাকসিটে বসা দেখলো। সে ভ্রু বাঁকায়। ড্রাইভিং সিটে বসতে বসতে গম্ভীর গলায় বলে,

-‘সামনে এসো।’
অরু সিটে মাথা হেলিয়ে চোখ বুঁজে বসেছিলো৷ ওভাবেই বসে বলল,
-‘এভাবেই ঠিক আছি আমি।’
-‘আমি ঠিক নেই।’
অরু চোখ খোলে,
-‘মানে?’
-‘আমি কারোর ড্রাইভার না অরু। এভাবে আকার-ইঙ্গিতে অপমান করার কোনো মানে হয় না। সামনে এসো। এক কথা এতবার বলতে পারবো না।’
অরু হতবুদ্ধির মতো তাকাল। ব্যাকসিটে বসলে গাড়ি যে চালাবে তাকে ড্রাইভার হয়ে যেতে হবে? মানলো সে, এমনই হয়। তবে এখানে এতো বেশি কথা বাড়ানোর কি খুব দরকার? অরু বিরক্ত চোখে তাকাল,

রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ২

-‘একটা ছোট জিনিসকে এতোদূর টানার মানে কি?’
-‘মানে কিছুই না। যেটা বলেছি সেটা করো। নাহলে এখানেই থাকো। আমি বাসায় যাচ্ছি।’
অরু ক্ষেপাটে চোখে তাকায়। গাড়ির দরজা খুলে সামনের সিটে বসে ধরাম করে দরজা লাগালো। রাগে ফুঁসছে সে। শুভ্র আড়চোখে তাকাল। গাড়ি স্টার্ট দিতে দিতে ফিচলে হাসল। পরপরই তা মিলিয়ে স্বাভাবিক মুখে গাড়ি চালাতে মনোযোগী হলো।

রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ৪