রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ৫
ফারহানা চৌধুরী
তখন ফোন বাজলো তার। অরুর কান্না থেমেছে তখন। সে ফোন হাতে নিয়ে দেখল আননোন নাম্বার। গলা পরিষ্কার করে কল রিসিভ করে কানে ফোন ঠেকাল,
-‘হ্যালো?’
ওপাশ থেকে পরিচিত গলা ভেসে এল,
-‘অরু! মা, আমার। কেমন আছিস সোনা?’
অরুর হাত কেঁপে উঠল। প্রচণ্ড বিস্ময়ে যেমন লোকে হতবুদ্ধির মতো চেয়ে থাকে, অরুর অবস্থাও তখন ওমন। সে সাথে সাথে কান থেকে ফোন নামিয়ে সেদিকে চাইল। নাম্বারটা ভালো করে দেখল। না, সে সত্যিই চেনে না নম্বরটা। তবে ওপাশের মহিলাটাকে চেনে। খুব ভালো করেই চেনে। অরুর বুক কাঁপছে হঠাৎ। এতদিন মা-বাবার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল৷ যেই নাম্বার থেকেই ফোন করুক না কেন, চরম নিষ্ঠুরতার প্রমাণ দিয়ে অরু সেগুলো ব্লক করে দিত। মাঝেমধ্যে দেখা করতে এলে ঘর আটকে বসে থাকতো, নয়তো বাড়ির বাইরে চলে যেতো। তবুও ঐ লোকগুলোর সামনে পড়া এড়িয়ে গিয়েছে প্রতিবার। এতগুলো দিন পর আবারও, আবারও তাদের সাথে কথা বলতে হচ্ছে। অরুর গা গুলিয়ে উঠলো প্রকান্ড ঘৃণায়। রাগেরা কুন্ডুলি পাকিয়ে উঠছে যেন। সে নিজেকে সামলানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে। ফোনটা তখনও কোলে রাখা। ওপাশ থেকে শব্দ আসছে। অরু ফোন তুলে আবারও কানে ঠেকায়,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
-‘কে বলছেন?’
সাবিনা অবাক হলো কিছুটা। মেয়ে তার গলা চিনছে না? কিসব অবিশ্বাস্য ব্যাপার-স্যাপার ঘটছে আজকাল? আদৌ চিনছে না, নাকি ইচ্ছে করে বলছে এমন? তা নয় তো কি আর! এতো রেগে আছে সে এখনো? তিন বছর তো হলো। আর কত? তিন বছর তো কম সময় না। সাবিনা এবার তড়িঘড়ি করে বলল,
-‘আমি মা অরু। চিনতে পারছিস না?’
অরু দায়সারাভাবে বলল,
-‘আচ্ছা। বলো।’
সাবিনা অত্যন্ত কোমল গলায় বলল,
-‘এখনো রেগে আছিস মা? তিন বছর তো হলো। কম সময় তো না। এবার একটু রাগ কমা?’
অরু বিশেষ প্রতিক্রিয়া দেখাতে চাইলো না। বিরক্তিতে মেজাজ চটে আছে। এতো আহ্লাদীপনা এখন কেন করছে? যখন করার কথা ছিল, তখন কোথায় ছিল? যখন এতোবার বারণ করেছিলো সে বিয়ের জন্য, তখন কোথায় ছিল এসব? কাঁধ থেকে বোঝা তো নেমেছেই। তাহলে এখন এমন আহ্লাদ দেখিয়ে কি বোঝাতে চাইছে? অরু বলল,
-‘কি দরকারে ফোন করেছো সেটা বলো। ফাউ প্যাচাল কেন করছো?’
ভাষাটা অত্যন্ত জঘন্য শোনালো সাবিনার কাছে। সে হতবাক হয়ে বলল,
-‘এসব কি ভাষা অরু? কিভাবে কথা বলছিস?’
অরু এবার রেগে গেলো। জেদি গলায় বলল,
-‘আমি তো বেয়াদবই। আর বেয়াদবরা তো এভাবেই কথা বলে। তাদের থেকে আদবের কিছু কি করে আশা করো? আর ভাষা? এর চেয়ে ভালো ভাষায় আমি কথা বলতে পারি না। এবার কেন ফোন করেছো বলতে হলো বলো, নাহলে ফোন কাটো।’
সাবিনা কথা হারিয়ে ফেললেন। কেমন ব্যবহার করছে অরু তার সাথে? এতো বাজে, এতো জঘন্য! সময় নিয়ে পরিস্থিতি সামলাতে বললেন,
-‘আচ্ছা, শান্ত হ। তুই দেশের বাইরে, শুভ্রর সাথে গিয়েছিস, সেটা আমাদের জানালি না কেন? তোর শ্বশুর-শ্বাশুড়ির থেকে জানতে হলো।’
-‘জানানোর প্রয়োজন বোধ করিনি, তাই।’
সাবিনা ধমকে উঠলেন মেয়েকে,
-‘অরু! কিসব কথা এগুলো? মাথা খারাপ তোর? এভাবে মায়ের সাথে কথা বলে? এগুলো শিখিয়েছি তোকে?’
অরুর মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। বিরক্তিকর লাগছে সব। অতীতের করা অপমানগুলো মনে পড়ে দম বন্ধ লাগছে আরো। এবার সে প্রচন্ড ক্ষোভের সাথে বলে বসল অসহ্যরকম কথাগুলো,
-‘মা হয়ে তুমি কি করেছো? নিজের মেয়েকে বুঝেছ কখনো? বুঝতে চেয়েছো আদৌ? ঘাড় থেকে বোঝা তো নামিয়েছোই। আবার ফোন করে নাটক কেন করছো? নিজেদের বোঝা নামাতে গিয়ে আমার জীবন শেষ করে দিয়ে দিয়েছ তোমরা। ঐরকম একটা লোকের সাথে বিয়ে দিয়েছ। না করেছিলাম তো আমি। করিনি? আমার কথা কেন শোনোনি? কাঁধ হালকা করতে চেয়েছিলে। আমার, ভাইয়াদের হাজারবার না করা স্বত্বেও তোমরা বিয়েটা দিয়েছ। তোমাদের ভুলে আমি কেন ভুগবো?
যেই লোকের জন্য দেশে থাকতে বাইরের লোকের কাছে অপমানিত হয়েছি, ইভেন এখন সেই লোক নিজে আমাকে অপমান করছে। সে তো সম্পূর্ণ নির্দোষ। তাকে তোমরা কখনো দেষ দিয়েছো? সব ভুল তো আমার কপালের। তোমাদের মেয়ে হওয়াটা ভুল ছিলো আমার। ভরন-পোষণটুকু যদি নাই নিতে পারো, তাহলে দুনিয়াতে কেন এনেছিলে? অন্তত এসব সহ্য করতে হতো না আমাকে।’
সাবিনা হতবাক হয়ে গেলেন৷ পাশে বসা স্বামীর দিকে তাকালেন। ফারুক খান তখনও ফোনের দিকে তাকিয়ে আছেন, এক দৃষ্টিতে। কথা বলার শেষ শক্তিটুকুও যেন খুঁয়ে বসেছেন তিনি। এতকিছু হয়ে গেল? এতবড় ভুল কি করে হলো? তখন কেন মেয়ের কথা শোনেননি তারা? আজ এসব হতো না তাহলে। মেয়েটার সাথে সম্পর্কটা অন্তত ঠিক থাকতো।
মুখে রোদ পড়লে অরু মুখ কুঁচকে নিল। পাশ ফিরে আবারও ঘুমোতে চাইল। তখনই বিরক্তিকর আওয়াজ তুলে এলার্ম-ঘড়িটা বেজে উঠলো। অরু কম্ফোর্টারের নিচ থেকে হাত বের করে, অভ্যাসগত ভঙ্গিতে এলার্মটা অফ করল। আবারও কম্ফোর্টারে হাত ঢুকিয়ে নিল৷ একটু চোখ ঘুমে লেগে এলে আবারও এলার্ম বেজে উঠলো। অরু এবার উঠল। উঠে বসে শান্ত হলো একটু। এলার্ম-ঘড়িটা হাতে নিয়ে ব্যাটারি খুলে পাশের টেবিলের উপর আবার রেখে দিল।
একটু দম নিতেই দেয়াল ঘড়িতে চোখ পড়ল। কিছুটা ঝাপসা দেখাচ্ছে দূরের সব কিছু। টেবিল থেকে চশমা নিয়ে চোখে পরলো। ঘড়ি দেখতেই চোখ কপালে। সে ধরফরিয়ে উঠে বিছানা ছেড়ে নামল। চশমা খুলে রেখে ওয়্যারড্রব থেকে জামা-কাপড় বের করে ওয়াশরুমে ছুটলো। বেড়িয়ে এলো সতেরো মিনিটের মাথায়। মাথায় পেঁচিয়ে রাখা ভেজা তোয়ালে খুলে চুল মুছে নিল৷ পাশের চেয়ারে তা মেলে রেখে চলে এলো ড্রেসিং টেবিলের সামনে। ড্রয়ার থেকে হেয়ার ড্রায়ারটা বের করে প্লাকে লাগালো। অন করে চুল শুকাতে লাগল কৃত্রিম গরম হাওয়ায়। ক’মিনিট শুকিয়েই অফ করে রেখে দিলো। সাধারণত সে এগুলো ব্যবহার করে না খুব একটা প্রয়োজন ছাড়া। এখন দ্রুত চুল শুকাতে হবে বলে ব্যবহার করছে। অরু কানে ছোট্ট সাদা টপটা পরে, বিছানার কাছে গেলো দৌড়ে। বিছানা থেকে ওভার কোটটা তুলে গায়ে জড়িয়ে নিলো। ব্যাগে ফোন ভরে, কাঁধে নিয়ে নিল। ড্রেসিং টেবিল থেকে ঘড়িটা নিয়ে হাতে পরতে পরতে বেরিয়ে এলো ঘর ছেড়ে।
ঘর থেকে বেরোতেই দেখলো ডাইনিং টেবিলে বসা স্যুট-বুট পরিহিত শুভ্রকে। তার একহাতে কফির মগ, অন্যহাতে ফোন। ভ্রু-দ্বয়ের মাঝে অসম্ভব ভাঁজ ফেলে ফোনের নীল আলোতে ডুবে আছে। ফাঁকে ফাঁকে কফিতে চুমুক দিচ্ছে। অরু তপ্ত শ্বাস ত্যাগ করে। এতগুলো দিন এসব দেখা তার নিত্যদিনের কান্ড। ঘর থেকে বেরিয়েই যেই দৃশ্য তার সামনে সবার প্রথমে পড়ে তা হলো, এইটা। তবে মাঝে মধ্যে সৌভাগ্যবশত দেরিতে ঘুম থেকে উঠলে এইসব আর দেখতে হয় না। অরুর মতে; যেইদিন সকালে তার শুভ্রলকে দেখতে হয় না, সেইদিনটা তার খুব হাসিখুশি যায়। ভার্সিটিতেও, বাড়িতেও।
অরু নিজের দিকে তাকালো একবার। কালো টপস্-এর সাথে কালো ফর্মাল প্যান্ট। উপরে হাঁটু সমান ব্রাউন রঙের একটা ওভারকোট।
আজ মাসের এক তারিখ। অরুর অফিস জয়েনিং ডে। সকাল সকাল এতো তাড়াহুড়ো করার পেছনের প্রধান কারণ এটা। শুভ্র গতরাতে পইপই করে বলে রেখেছে, সকালে যেন টাইমলি অফিসে পৌঁছায় সে৷ এক মিনিটও যেন দেরি না হয়। বলা চলে, এই একটা কথা বলে বলে তার কানের পোকাটাকেও পর্যন্ত অতিষ্ঠ করে ফেলেছে।
-‘হয়েছে তোমার? এত দেরি কেন হলো?’
অরু শুভ্রর কথায় তাকায়। ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে দায়সারাভাবে বলে,
-‘ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেছে।’
শুভ্র তীক্ষ্ণ চোখে চায়। হাত ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে শান্ত-শীতল গলায় বলে,
-‘এখন আটটা ষোলো বাজে। অফিস নয়টায়। তোমার খাবার খেতে খেতে কমপক্ষে পনেরো মিনিট লাগবে, যেহেতু তুমি পাখির মতো ঠুকরে ঠুকরে খাও। এরপর জুতো পরবে, নিচে নামবে; আরো আট-নয় মিনিটের মতো লাগবে৷ ততক্ষণে আটটা ঊনল্লিশ বেজে যাবে। এখান থেকে অফিস পৌঁছুতে আধ ঘন্টা লাগে। তাহলে তোমার অফিসে পৌঁছাতে পৌঁছাতে নয়টা এগারো বেজে যাবে। ইট’স মিন, ইউ আর গোয়িং টু বি ইলেভেন মিনিটস্ লেইট।’
অরু হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে। এতো হিসাব কে করে ভাই? কে? শুভ্র আবারও বলল,
-‘অফিসের প্রথম দিনেই এমন অবস্থা হলে বাকি দিনগুলো কি করবে?’
অরু হিসাব-নিকাশ করে ফট করে বলল,
-‘খাবো না আমি। তাহলে তো আপনার হিসাব অনুযায়ী আমি পাঁচ মিনিট আগে পৌঁছাবো।’
শুভ্র শীতল চোখে তাকায়,
-‘একটা খাবারও যদি প্লেটে থাকে, তোমার খবর আছে।’
শান্ত হুমকি শেষে, সে পকেট থেকে মানি ব্যাগ বের করল। কয়েকটা রঙিন কাগজ অরুর দিকে এগিয়ে দিলে অরু ভ্রু কুঁচকায়। শুভ্র এবার সেগুলো তার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
রোদ্দুর এবং তুমি পর্ব ৪
-‘তোমাকে আমি নিয়ে যেতে পারবো না। অফিস এড্রেস এসএমএস করে দিয়েছি, আলাদা চলে যেও। এইগুলো রাখো, তোমার হাত খরচ। অফিস থেকে সেলারি পেলে তখন আমি আর তোমাকে এসব হাত খরচ দেবো না। নিজের টাকায় চলবে। আর হ্যাঁ, অফিসে যেন কেউ কোনোভাবে আমাদের সম্পর্কের ব্যাপারে কিচ্ছু জানতে না পারে। এন্ড বি কেয়ারফুল এবাউট ইট।’
