Home লাল শাড়িতে প্রেয়সী লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪০

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪০

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪০
Fatima Fariyal

রাতের অর্ধপ্রহর চলেছে। নিস্তব্ধতার বিশাল অন্ধকারে আচ্ছন্ন চারদিক। বাড়ির বারান্দার দোলনায় স্থির হয়ে বসে আছে রিদিতা। রাতের ভ্যাপসা গুমোট তাকে অস্বস্তিতে ফেলেছে। অদূরে কোথাও থেকে মাঝে মাঝে অচেনা, অস্পষ্ট গু গু শব্দ ভেসে আসছে। আকাশ পুরোপুরি মেঘে ঢাকা, চাঁদ কিংবা তারা কিছুই নেই। শুধু কালো গভীরতার বিশাল চাদর। রিদিতার কেন জানি ঘুম আসছিল না। ভেতরের তুমুল অস্থিরতা কাজ করছে। আহিয়া আর আদনান। এই দুজনকে নিয়ে আজ সারাদিন তার মাথার ভিতর একই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। দুজনেই যে ভিতরে গভীর কিছু বহন করছে আজ যেন সবকিছু পরিষ্কার। সে একবার ভেবেছিল আহাদের সাথে বিষয়টা নিয়া আলচনা করবে, কিন্তু তার মন্ত্রী মশাই তো এমনিতেই রেগে আগুন হয়ে আছে। তার উপর যদি এখন আদনানের ব্যাপারে কথা বলতে যায় তাহলে তার মেজাজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে কে জানে!

আর কিছু ভাবতে পারল না রিদিতা। মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। গলাটা কেমন শুকিয়ে আসছিল। সে ভিতরে এসে পানির বোতল হাতে নিতেই তৎক্ষণাৎ বিরক্ত হয়ে গেল। বোতল পুরো ফাঁকা। এখন আবার নিচে যেতে হবে, কিন্তু তার একটু ভয় করছে। দিনের বেলাতেই সে এই বিশাল বাড়িতে সব গুলিয়ে ফেলে আর এখন তো রাত। একবার আহাদের দিকে তাকাল সে গভীর ঘুমে মত্ত হয়ে আছে। কিছুক্ষণ দোনোমনা করে পানির বোতল হাতে নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। পুরো বাড়িটা আধোআলোর আস্তরনে ঢাকা। হলওয়ের প্রাচীন লণ্ঠনের মত হলুদ আলোতে জায়গাটা ঘুমন্ত ভ্রমণকারীর মত দেখাচ্ছে। এমন সময় হঠাৎ রিদিতার পা থেমে গেল। তার শরীর শিউরে উঠল। একটা ভয়ংকর, করুন চাপা পুরুষালি কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। সে প্রথমে ভাবল হয়তো ভুল শুনছে। কিন্তু না, শব্দটা স্পষ্ট!

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

রিদিতা চমকে যায়। কি ভয়ংকর সেই কান্নার শব্দ!
পরমূহুর্তে সে সেই কান্নার শব্দ অুনুকরন করতে লাগল।
যত এগোয়, কান্নার শব্দ ততটাই তীক্ষ্ণ, ততটাই ছড়িয়ে পড়া যন্ত্রণায় ভরা হয়ে ওঠে। অদ্ভুতভাবে পরিচিতও লাগে শব্দটা। সে একসময় এসে থামে আদনানের ঘরের সামনে।
দরজাটা সামান্য ফাঁকা। ভয় আর বিস্ময়ের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে রিদিতা নিঃশ্বাস চেপে ভেতরে তাকাল। ড্রিম লাইটের ক্ষীণ নীল আলোয় রিদির চোখে পড়ল বিস্ময়কর একটা দৃশ্য! বিছানার ওপর বসে আছেন হালিমা বেগম। তাঁর মুখে অব্যক্ত ব্যথা আর মাতৃত্বের দোলাচল। আর তার কোলে মাথাটা রেখে মেঝেতে পায়ের কাছে গুটিশুটি হয়ে বসে আছে আদনান। আদনানের কাঁধ দুটো কান্নার দোলায় কেঁপে কেঁপে উঠছে। তার শরীর যেন যন্ত্রণায় ভেঙে পড়ছে। হালিমা বেগম নিঃশব্দে হাত বুলিয়ে যাচ্ছেন আদনানের মাথায়। হঠাৎ আদনানের কণ্ঠ ভেঙে ভেসে এল একটা ভাঙা, তছনছ করা আত্মার আর্তি,

“আমার নিশ্বাষ নিতে কষ্ট হচ্ছে চাচি আম্মা। আমার নিশ্বাষ নিতে কষ্ট হচ্ছে! আমাকে কি কোন ভাবে বাঁচানো যায় না। আমি একটু বাঁচতে চাই, খুব বেশি দিন না হলেও হবে। শুধু কয়েকটা দিন বাঁচতে চাই। জীবন অনিশ্চিত জানি। তবুও… তবুও আমি আহিকে নিয়ে কয়েকটা দিন বাঁচতে চাই.. ”
আবারও ঢুকরে ঢুকরে কেঁদে উঠল আদনান। সেই কান্নার শব্দ দেয়ালজুড়ে প্রতিব্ধনিত হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে পুরো ঘরে। রিদির বুকটা ভারী হয়ে গেল। চোখ দিয়ে আপনা-আপনি অনবরত অশ্রু গড়িয়ে পরতে লাগল। আদনান আবারও করুন স্বরে বিড়বিড় করে বলছে,

“চাচি আম্মা, ও চাচি আম্মা! ওদের সবাইকে বলেন না আমায় আহি কে যেন দিয়ে দেয়। আপনি বললে শুনবে হয়তো, বলেন না সবাইকে। একজন ভিক্ষুক ভিক্ষা চাইলেও তো মানুষ ফিরিয়ে দেয় না। আমিও আহিকে ভিক্ষা চাইছি চাচি আম্মা। ভিক্ষা চাইছি! ভিক্ষুক মনে করে দিয়ে দিতে বলুন না! এভাবে চলতে থাকলে আমি বেশি দিন বাঁচবো না চাচি আম্মা। আহিকে ছাড়া আমি বেশি দিন বাঁচবো না। শীঘ্রই আপনাদেরকে আমার দাফনের ব্যাবস্থা করতে হবে.. ওর জন্য প্রতিটা নিশ্বাষের সাথে আমি যুদ্ধ করি, কিন্তু এখন যুদ্ধ করতে করতে আমি ক্লান্ত। আমি হেরে যাচ্ছি, আমি মরে যাচ্ছি… আমাকে বাঁচন না প্লিজ! আমি বললে তো আহাদ শুনবে না, কোন দিনও মানবে না। আপনি আহাদকে বলুন না.. আমার আহিকে চাই! শুধু আহিকে.. এরপর ও যা বলবে আমি তাই শুনব..
সব কিছুর বিনিময়ে হলেও শুধু আহিকে দিয়ে দিতে বলেন না! আমার খুব প্রয়োজন ওকে, আমার ভিতরে আহি ছাড়া কিছু নেই চাচি আম্মা। কিচ্ছু নেই.. আমার…”

আজ আদনানের ভিতরের ধমিয়ে রাখা সব ব্যাথা, কষ্ট, সব দহন হৃদয় খুরে বেরিয়ে আসল। সে অনবরত ঢুকরে ঢুকরে কাঁদছে। হালিমা বেগমেও তার অশ্রু ধরে রাখতে পারলেন না। এই ছেলেটাকে এতদিন ধরে তারা কেউ বুঝতেই পারল না। কতটা ভারী বোঝা বহন করছে নিজের ভিতর, সেটা তাকে দেখলে বোঝাই যায় না। তিনি আদনানের মাথায় হাত বুলাতে লাগলেন। কি বলে শান্তনা দিবে ছেলেটাকে, আজ যে সে একটা ছোট বাচ্চার মত কাঁদছে। আহিয়াকে খেলনার মত আবাদার করে চাইছে। অথচ তিনি মায়েদের মত বলতে পারছেন না, যে ঠিক আছে দিয়ে দিব তোকে! তার গলা ভাষ্পে জড়িয়ে এলো। মিথ্যা শান্তনা দিতে লাগল,
“আদনান। বাবা শান্ত হও। তোমাকে এভাবে দেখতে যে ভাল লাগছে না আমার। আমি.. আমি কথা বলব সবার সাথে। সব ঠিক হয়ে যাবে। তুমি শান্ত হও, দেখি এখানে আসো!”

এই বলে হালিমা বেগম তাকে সামান্য টেনে বিছানায় তুললন। আদনান বাচ্চাদের মত গুটিশুটি হয়ে হালিমা বেগমের কোলে মাথা রেখে শুয়ে পরলো। কাঁধ এখনো কেঁপে ওঠে কান্নার দোলায়। হালিমা বেগম ধীরে একটা চাদর টেনে দিলেন তার শরীরে। তাকে ঘুম পড়ানোর অপ্রায়ন চেষ্টা করছেন।
এদিকে রিদিতার বুক ভিজে গেল। বুকের ভেতর চাপা ভার যেন ফেটে বেরোতে চাইছে। আদনানের ভেঙে পড়া, শিশুর মতো কাঁদা, মরিয়া হয়ে আহিয়াকে চাইতে থাকা। জীবনে কোনোদিন কল্পনাও করেনি রিদিতা! সে তার জীবনে তিন’জন পুরুষকে কান্না করতে দেখেছে। একজন তার বাবা। দ্বিতীয় আহাদ রাজা, যে তাকে প্রথম দিন বুকের ভেতর টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিল। আর আজ আদনান। যার কান্না আহাদের চেয়েও বহু গুণ বেশি তীব্র, বেশি যন্ত্রণাদায়ক। যেন ভেতরের দহন ভেঙে শব্দ হয়ে বেরিয়ে আসছে। রিদিতা ধীরেধীরে ঘুরে গেল। মনে হচ্ছে তার ভিতরে এখন কোন সত্তা নেই। কেমন নিস্তেজ হয়ে গেছে। সোজা হয়ে করিডোর ধরে হেটেই যাচ্ছে। এমন সময় পেছন থেকে গভীর পরিচিত এক পুরুষালি কণ্ঠস্বর কাঁপিয়ে দিল তাকে।

“জানু!”
রিদি স্তব্ধ হয়ে গেল। ধীরে, খুব ধীরে পিছন ফিরে তাকাল।
আহাদ দাঁড়িয়ে আছে। চুল এলোমেলো, চোখ আধঘুমে ভারী, দুশ্চিন্তায় তীরের মতো ধারালো। কপাল কুঁচকে আছে উদ্বেগে। ঘুমের ঘোরে রিদি পাশে নেই টের পেতেই সে ধড়ফড় করে উঠে যায়। কয়েকবার ডাকার পরও যখন কোন সারা পেল না। তার বুকের ভিতর অজনা ভয় কাজ করল। মনে মনে ভাবল, তার প্রেয়সী আবার রাগ করে তাকে ছেড়ে চলে যায়নি তো! সে কি একটু বেশিই রেগে গেছিল আজকে? ভাবতে না ভাবতে রুম থেকে ছুটে বেড়িয়ে আসে। সে রিদিতার দিকে এগিয়ে আসতেই রিদির হাতের পানির বোতলটা ঠক করে নিচে পরে গেল। আহাদের গভীর দৃষ্টি পরখ করল রিদির চোখ ভেজা। পাপড়ির ডগা কাঁপছে। মুখটা নিস্তেজ। সে দ্রুত তার গালে আলতো হাত রাখল। উতলা হয়ে পাগলের মত এক নাগাড়ে বলতে লাগল,

“তুমি কাঁদছিলে? কেনো কাঁদছিলে হুম? আমি একটু বেশিই রেগে গেছিলাম না? একটু বেশি রুড হয়ে গিয়েছিলাম। আমি ইচ্ছে করিনি জানু, আমার কি হয়ে যায় বুঝতে পারি না। সরি জানু, সরি! আর কখন এভাবে রাগ করব না। নিজেকে কন্ট্রোল করার চেষ্টা করব। প্রমিস!”

আহাদের কথাগুলো তার ভেতরে জমে থাকা আবেগের বাঁধটাকে আরও ভেঙে দিল। কথায় আছে না, অভিমান হলে সেটা কাছের মানুষ কাছে এলে আরো বেরে যায়। ঠিক তেমনই। রিদি ধাপ করে এসে পরল আহাদের বক্ষস্থলে, হু হু করে কেঁদে উঠল। কেন জানি আদনানের বলা প্রতিটা কথা তার ভিতরটা নাড়িয়ে দিয়েছে। আহাদ রিদির কান্নার কারন এখনো বুঝতে পারল না। শুধু নিজের বুকে তার মাথাটা জোড়ে চেপে ধরে আছে। রিদির চোখের পানিতে তার টি-শার্টের বুকের অংশ ভিজে গেছে। আহাদ কিছু বুঝতে না পারলেও তাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। যেন ভ’য় পাচ্ছে ছাড়লেই যদি রিদি হারিয়ে যায়! যখন রিদির কান্নার দম একটু কমলো। আহাদ তার মুখ দু’হাতে তুলে নিজের দিকে তাক করল। বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে রিদির গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়া অশ্রুগুলো মুছে দিয়ে ভাঙা কণ্ঠ বলতে লাগল,

“আমি খারাপ না? খুব খারাপ! তোমাকে কষ্ট দিয়েছি তাই না? আমি খুব খারাপ!”
রিদি অস্থিরভাবে মাথা নাড়তে লাগল। বোঝাতে চাইল, সে তার জন্য কাঁদছে না। কিন্তু আহাদ নিজেকে দোষারোপ করে যাচ্ছে। সে রিদির কপালে আর গালে দু’তিন বার ঠোঁট ছুয়িয়ে আবার বলতে লাগল,
“সরি রিদি। খুব করে সরি। আর রাগ করব না বললাম তো! তখন শুধুু মেজাজটা একটু খারাপ ছিল, বোঝার চেষ্টা কর। তুমি না বুঝলে আমায় কে বুঝবে বলো।”
রিদি মাথা নাড়িয়ে বহু কষ্টে বলল,
“না না। আমি আপনার উপর রাগ করিনি। আমি সে জন্য কাঁদছি না। আপনার কথায় আমি কিছু মনে করিনি। আমি তো… আমি তো..”

কথাটা বলতে নিয়েও রিদি থেমে গেলো। কারন এই মূহুর্তে এসব হুট করে বলা ঠিক হবে না। আগে ধীরেসুস্থে, কৌশলে জানতে হবে আহাদ আর আদনানের মধ্যে আসলে ঝামেলাটা কি? আদনান কেন বারাবার বলছিল, আহাদ মেনে নিবে না। আহাদ তার কাছে আহিয়াকে দিবে না। আহাদকে বোঝাও, যেন আহিয়াকে আমায় দিয়ে দেয়!
রিদির গালে আবারও হাত রাখল আহাদ,

“ঠিক আছে, ঠিক আছে। কিছু বলতে হবে না। হুহ?”
আহাদ রিদিকে নিয়েই আবার নিজের ঘরে আসে। রিদিকে ধীরে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে চাদরটা টেনে দেয়। নিজেও শুয়ে তাকে পিছন থেকে কোমর টেনে নেয়। তার ঘাড়ে চিবুক ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করে নিল। কিন্তু রিদি কোন ভাবেই আর চোখ বন্ধ করতে পারল না। স্থির রইতে পারল না। ঘুরে ফিরে বারাবার তার কানে ভাসছে আদনানের যন্ত্রণাদায়ক কথাগুলো। সে মনে মনে ভাবছে, আদনানের কথাগুলো শুনে তারই এমন লাগছে। আর যদি আহিয়া শুনতে পেত, তাহলে কেমন করে নিজেকে ঠিক রাখত!

রিদিতার রাতে তেমন আর ঘুম হয়নি। শেষ প্রহারের দিকেই সে উঠে যায়। চারদিক থেকে ফজরের আজান শোনা যাচ্ছিল। সে উঠে ওযু করে নামাজটা পড়ে নেয়। কিছুক্ষণ জায়নামাজে বসে থেকেই রাতের ঘটে যাওয়া ঘটনাটা চিন্তা করতে লাগল। হঠাৎ তার মাথায় এলো হালিমা বেগমের কথা। একমাত্র তাকে জিজ্ঞেস করলেই সবকিছু জানা যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। সে জায়নামাজ গুটিয়ে রেখে নামাজের হিজাব পরেই নিচে নেমে আসে। হালিমা বেগম যেহেতু নামাজ পড়তে উঠে তাই রিদিতা নিচে আসতেই তাকে পেয়ে গেল। তাকে দেখে হালিমা বেগম কিন্চিৎ হাসলেন।
“কিছু লাগবে রিদিতা? সকাল সকাল তোমার চা টা খাওয়ার অভ্যাস আছে নাকি? বলো, কিছু করে দিই?”
রিদিতা মাথা নাড়াল। গলা শুকনো। সে একটু কাছে এসে নিচু স্বরে বলল,

“আমার কিছু জানার আছে, চাচি আম্মা। আপনি কি আমাকে বলবেন?”
হালিমা বেগমের চোখ ধীরে সরু হলো। যেন তিনি ইতিমধ্যেই আন্দাজ করছেন প্রশ্নটা কোনদিকে যাবে।
“কি জানতে চাও? আহাদ কিছু বলেছে?”
“না চাচি আম্মা। আমি আদনান ভাইয়ের ব্যাপারে জানতে চাই।”
“আদনানের ব্যাপারে?”
হালিমা বেগমের মূহুর্তেই গতরাতের বেদনাময় ঘটনা মনে পরে গেল। রিদিতা মাথা ঝুলিয়ে বলল,
“হ্যাঁ। গতরাতে আমি সব শুনেছি। কিন্তু একটা বিষয় বুঝতে পারছি না। উনির আর আদনান ভাইয়ের মধ্যে আসলে শত্রুতা কি নিয়ে? আর আদনান ভাই যদি আহিয়াকেই ভালোবাসে তাহলে আমায় কেন বিয়ে করতে চাইলেন?”
হালিমা বেগম এবার আস্তে করে সোফায় বসে পড়লেন। যেন ভেতরের ভারটা তার কাঁধ নামিয়ে দিয়েছে। রিদিতা তার পাশে এসে বসল। চোখে সম্পূর্ণ কৌতূহল, উৎকণ্ঠা আর অজানা সত্য শোনার ভয়। হালিমা বেগম ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন,

“এতদিন আমিও কিছু জানতাম না রিদিতা। গতকালের আগে পর্যন্ত আমি ভাবিইনি সবকিছু এত গভীর। এখন মনে হচ্ছে, আদনান তোমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল মূলত আহাদকে জব্দ করার জন্য, তার জেদের জবাব দিতে। যাতে তোমার জায়গায় সে আহিয়াকে দাবি করতে পারে।
কিন্তু তুমি অসুস্থ হওয়ার পর… সবকিছু বুঝে সে পিছিয়ে যায়। নিজেকে দোষী মনে করত তোমার অবস্থার জন্য। নিজের ওপরই অপরাধবোধ তৈরি হয়েছিল।”
রিদিতা চুপচাপ শুনছিল। এবার ধীরে জিজ্ঞেস করল,
“বুঝলাম। কিন্তু উনিদের দুই ভাইয়ের ঝামেলা কি নিয়ে। কেন সবাই আদনান আর আহিয়ার সম্পর্ক মেনে নেবে না?”
“সবাই না, রিদিতা। সবাই মেনে নিলেও আহাদ.. আহাদ কখনোই মানবে না।”
“কিন্তু কেন, চাচি আম্মা!”
হালিমা বেগমের মুখ আরও ক্লান্ত দেখাল। তিনি ধীরগতিতে পিঠটা সোফার সাথে ঠেকালেন। রিদিতা নিঃশ্বাস বন্ধ করে চোখ নিবদ্ধ করে রেখেছে হালিমা বেগমের দিকে।
সময় পিছিয়ে যায়…….

মীর হাউজের বড় বউ ছিলেন শার্লিনা শারমিন। কিন্তু তার কোন সন্তান ছিল না। সালমান মীর আর শারিমনের বিয়ের সাত বছর পেরিয়ে গেল। তবুও একটা সন্তানের জন্য তারা চাতক পাখির মত অপেক্ষা করত। সন্তান জন্মের আশায় তারা ডাক্তার থেকে কবিরাজ কোনকিছু বাদ রাখেনি। নামাজ, দোয়া, মানত যা যা সম্ভব সবই করেছে। অবশেষে সেই প্রতীক্ষার অবসান হলো। অনেক প্রতিক্ষার পর তাদের ঘর আলো করে জন্ম হয় পুত্র সন্তান, আদনান মীর। তবে সন্তান জন্ম দেয়ার আনন্দ থেকে তখন আতঙ্কে ছিল সবাই। সন্তান জন্মের পর শারমিন শ্বাসকষ্ট আর রক্তক্ষরণে মৃত্যুর দুয়ারে পৌঁছে গিয়েছিলেন। এক কথায় মৃত্যু পথ যাত্রী হিসেব ঘুরে এসেছেন শার্লিনা শারমিন। কোনরকম বেঁচে ফিরলেও সারা জীবনের জন্য আর কখনো সন্তান জন্ম দিতে পারবে না বলে ডাক্তার জানিয়ে দেন। অবশ্য এতে কারোর আপসোসও ছিল না। মা আর ছেলে যে সুস্থ আছে, বেঁচে আছে এতেই সবাই সন্তুষ্ট ছিল।
আদনানের ছয় মাস পর জন্ম হয় মীর পরিবারে আরো এক পুত্র সন্তানের, আহাদ রাজা মীর। দু’জনের মাত্র ছয় মাসের গেপ ছিল। পিঠাপিঠি হওয়াতে দু ভাইয়ের বনিবনা হতো না। বিশেষ করে আহাদ ছিল একটু চটপটে, হিংসুটে একগুঁয়ে স্বভাবের। যেটা তার সেটা একমাত্র তারই। সেখানে একবিন্দু পরিমান ভাগ দিতে রাজি নয়। শেয়ার করা শব্দটা যেন তার জন্য না।

এরপর আরোও এক পুত্র সন্তান আসে মীর বংসে। পরপর তিন ভাইয়ের তিন পুত্র জন্ম হয়। এরপর এক কন্যা সন্তানের জন্ম হয়, আহিয়া। মীর পরিবারের একমাত্র কন্যা আর তিন ভাইয়ের এক মাত্র বোন হওয়াতে আহিয়া হয়ে উঠে সকলের চোখের মনি। সবার মত আদনানও খুব খুশি ছিল একটা বোন পেয়ে। কিন্তু এই খুশি আহাদের সহ্য হত না। আহিয়া একমাত্র তার বোন। আদনান কেন ওকে আদর করবে? আদনানকে নিজের বোনের কাছেও ঘেঁষতে দিত না। সবাই কত বোঝাতো, কিন্তু আহাদ ছিল একগুয়ে, আমার বোন মানে আমারই বোন! আদনানের এখানে কোন হক নেই। তবুও আদনান চুপিচুপি সুযোগ পেলেই আহিয়ার কাছে যেত। তার সেই নিষ্পাপ হাসি তাকে অদ্ভুত শান্তি দিত!

একদিন ঘটল এক অপ্রতাসিত ঘটনা। আদনানের বয়স ছিল চোদ্দ বছর। আর আহিয়ার চার। আদনান স্কুল থেকে ফিরতেই আহিয়া ছুটে এসে তার কোলো উঠল। আদনান আহিয়াকে আদর করে কোলে নিয়ে উপরে নিজের ঘরে চলে যায়। সেখানে বিছানায় তাকে বসিয়ে দিয়ে নিজে হাটুমুড়ে বসল তার সামনে। আহিয়ার ছোট্ট হাত দুটো নিজের মুঠোয় নিয়ে আহ্লাদী স্বরে বলে,
“তুমি জানো আমি তোমার জন্য কি এনেছি?”
আহিয়া মাথা নাড়ে, অর্থাৎ সে জানে না। সে তো শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। আদনান আহিয়ার সাথে মজা করে বলে,

“তোমার চোখ বন্ধ করো। তোমার জন্য একটা সারপ্রাইজ আছে।”
অবুজ আহিয়া তার কথা মত চোখ বন্ধ করে নেয়। আদনান নিজের ব্যাগ থেকে একটা ব্রাউন চুলওয়ালা পুতুল বের করে আহিয়ার হাতে দেয়। আহিয়া চোখ খুলে নিজের পছন্দের পুতুল দেখতে পেয়ে খুশিতে আত্নহারা হয়ে লাফিয়ে উঠল। আদনান আবার একটা চকলেট বক্সও ধরিয়ে দেয়, কারন আহিয়ার চকলেট পছন্দ। সে যাওয়ার সময় বায়না করে বলেছিল যেন তার জন্য চকলেট নিয়ে আসে। আদনান সেই ছোট খাটো আবাদার ভুলল না। আহিয়া পুতুলটা নিয়ে খুশিতে বিছানার উপর লাফাতে লাগল। আর আদনান তখনও হাটুমুড়ে বসে ছোট্ট আহিয়ার খুশি দেখছে। ঠিক তখনই দরজায় ভূতের মতো দাঁড়িয়ে থাকা আহাদের দৃষ্টি তাদের দুজনকে আঘাত করল। তার চোখে হিংসা, একরাশ আগুন।
“আহি!”
তার কণ্ঠ বজ্রের মতো। আহিয়া সেটা বুঝল না। সে খুশি হয়ে ভাইকে দেখাতে যায় উপহার পাওয়া পুতুলটা,
“ভাইয়া দেখ। আদনান ভাই আমার ফেভারিট পুতুল এনেছে। আমার খুব পছন্দ হয়েছে। আর এতগুলো চকলেটও এনেছে।”

আহাদ রাগে আহিয়ার হাত থেকে পুতুলটা নিয়ে ছুড়ে ফেলে দেয়। জোড়ে একটা থমক দিয়ে বলে উঠে,
“তোকে কতবার বলছি, তোর যা লাগে আমাকে বলবি আমি এনে দিব! প্রয়োজন হলে নিজের কিডনি বিক্রি করে এনে দিব। তোকে বলেছি না আদনানের কাছ থেকে কিছু নিবি না। তোর ভাই আমি! যা লাগে আমি দিব।”
আহিয়া ভাইয়ের এমন রাগ দেখে ভয় পেয়ে যায়। ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদতে লাগল। আদনান এগিয়ে এসে আহিয়াকে দ্রুত কোলে নিয়ে সান্তনা দেয়ার চেষ্টা করল। রাগ চেপে বলল,

“তুই সীমা ছাড়াচ্ছিস, আহাদ। তোর মাথা খারাপ হয়ে গেছে। আহি এখনো ছোট, ওর সাথে এভাবে কথা বলছিস কেন? আর তাছাড়া আহি আমারও বোন। আমারও ওকে কিছু দেয়ার অধিকার আছে।”
“আহি শুধু আমার বোন, আমার! আমি ওর সাথে কিভাবে কথা বলব না বলব সেটা একমাত্র আমার ব্যাপার।”
আদনান আর কথা বাড়াল না। কারন আহিয়া তখন ভয় পাচ্ছে। সে মেঝে থেকে পুতুলটা তুলে আহিয়াকে কোলে নিয়েই ঘর থেকে বের হয়ে গেল। কিন্তু আহাদ পিছন পিছন দৌড়ে এসে আহিয়াকে নিজের দিকে টানতে লাগল। আহিয়া আদনানকে শক্ত করে ধরে কাঁদতে লাগল,
“আমি তোমার কাছে যাব না! তুমি পচা! তুমি শুধু বকো!”
আদনান যেন খুশি হলো। সে একটা বাঁকা হাসি দিল।আহাদের চোখে তখন রাগে অন্ধ। সে চেঁচিয়ে উঠল,
“আহি, এবার কিন্তু মারব তোকে!”

আদনান চট করে আহিয়াকে কোল থেকে নামিয়ে দেয়। আহাদের মুখমোখি হয়ে দাঁড়াল। তার কন্ঠ ঠাণ্ডা,
“এই জন্যই। এই জন্যই আহি তোকে না। আমাকে বেশি ভালোবাসে।”
এই কথাটা আহাদকে পুড়িয়ে দিল ভিতর থেকে। কথাটা আহাদের মোটেও পছন্দ হয়নি। তার বোন তার থেকে বেশি ওকে ভালবাসে? সে আদনানের কলার ধরে সোজা তার নাকে ঘুষি বসিয়ে দিল। এরপর গলা চেপে পেছনে ঠেলে নিয়ে যেতেই ধস্তাধস্তি শুরু হলো দু’ভাইয়ের মধ্যে। আদনান জোরে ধাক্কা দিলে আহাদ পিছন দিকে ছিটকে পড়ে যায়। ভারসাম্য হারিয়ে সিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে নিচে পড়ল। আহাদের কপাল সহ আরে কয়েক জায়গায় কেটেও যায়। বাড়ির বড়রা ততক্ষণে ছুটে এলো। দুই ভাইয়ের লড়াইয়ে পরিবারের সবাই বিরক্ত, ক্লান্ত এবং আতঙ্কিত!
অবশেষে সিদ্ধান্ত হলো, আদনান বিদেশ চলে যাবে।
সালমান মীর ও শারমিন তাকে নিয়ে জার্মান চলে যাবেন। আদনান কোনোভাবেই যেতে চাইছিল না। আহিয়াকে ছেড়ে যেতে হবে এটা তার কাছে মৃত্যুর মতই ছিল। তবুও তাকে যেতে বাধ্য করা হলো। যাওয়ার আগে শেষবার আহাদের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তোর কি মনে হয়? আমি চলে গেলেই আহি আমায় ভুলে যাবে? আমি গেলেও আহি আমাকে আগের মতই ভালোবাসবে। যখন আহি বড় হবে, তখন আমি আবার ফিরব। ও আগের মতোই আমার কাছে ছুটে আসবে।”
আহাদ ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল,
“চ্যালেঞ্জ করছিস? তাহলে চ্যালেঞ্জ নিলাম। ফিরে এসে দেখবি আহি তোকে চিনতেই পারবে না। আহি তোর থেকে এক’শহাত দূরে দূরে থাকবে। আমার থেকে বেশি, তোকে ভ’য় পাবে। তোর সাথে কথা বলতেও তিনবার ভাববে। কারন আমি আহিয়াকে এমনভাবে তৈরি করব। যে ওর জন্য ওর ভাই-ই যথেষ্ট থাকবে।”

সেদিন আদনান চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে বাড়ি ছাড়ল। তার বিশ্বাস ছিল, আহিয়া তাকে ভালোবাসে। বদলাবে না।
কিন্তু সে ভুল ছিল। আহাদের মত বিচক্ষণ ভাইয়ের কাছে হেরে গেলো। বড় হয়ে আহিয়া সত্যিই আদনানের থেকে দূরে সরে গেল। সে ছোট বেলার মতো কথা বলে না। হাসে না। খোশামতি করে না। আদনান পুরোপুরিভাবে ভেঙে যায়। ধীরেধীরে নিজেকে নিজের মধ্যে গুটিয়ে নেয়। আহিয়ার প্রতি তার ভালোবাসার রুপটাও ধীরেধীরে পরিবর্তন হতে থাকে। নিষ্পাপ ভালোবাসা ধীরে ধীরে পাল্টে গেল গোপন, গভীর, অপ্রকাশিত অনুভূতিতে। আরো গাঢ়ো আরো গভীর হতে থাকে। কিন্ত আদনান সেটা নিজের মধ্যেই ধমিয়ে রাখে। শুধু নিজের ভিতরে আগুনের মতো পুষে রেখেছে!

হালিমা বেগমের বলা দীর্ঘ ঘটনাপুঞ্জ শুনে রিদিতা পুরো স্তব্ধ হয়ে গেছে। এতক্ষণ ধরে কেবল শুনছিল, কিন্তু মাথার ভেতর প্রতিটি বাক্য প্রতিটি ঘটনার মতো কাঁপছিল। হালিমা বেগম নিজের শাড়ির কোন দিয়ে চোখের পানি মুছে নিলেন। রিদির চোখও ছলছলে, তার মানে দুই ভাইয়ের ঝামেলার শুরু আহিয়াকে নিয়েই হয়েছে? আর আহাদের ভ্রুতে যে কাটা দাগ। যেটা সে বহুবার দেখেছে। অথচ ভাবত কোনো সাধারণ দুর্ঘটনা। কিন্তু আজ জানল, সেটা আদনানের সঙ্গে লড়াইয়ের দাগ।
কিন্তু সামান্য এই বিষয় নিয়ে কোন মানুষ এত সিরিয়াস হয়? তাছাড়া এখন তো আহিয়াও আদনানকে ভালোবাসে! আহিয়ার চোখে মুখে সেটা স্পষ্ট! রিদিতার একটু নড়েচড়ে বসে তাকাল হালিমার দিকে,
“আচ্ছা চাচি আম্মু। আম্মা আর বাবা, চাচুকে এই বিষয়ে জানালে হয় না?”
“আমি কথা বলব রিদিতা। আদনানের কষ্ট আমার সহ্য হয় না। কিন্তু ভাবছি আহাদ জানতে পারলে যদি তুলকালাম শুরু করে দেয়।”

“আমি উনিকে বুঝিয়ে বলব। আপনি আম্মার সাথে কথা বলেন না চাচি আম্মা। আম্মা তো মনে হয় মানা করবে না।”
“দেখি আজকে সুযোগ বুঝে বলার চেষ্টা করব।”
এমন সময় উপরের করিডোর থেকে আহাদের ভারী কণ্ঠ ভেসে এল,
“রিদি, উপরে আসো।”
রিদি চমকে মাথা তুলল। সিঁড়ির গ্রিলে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আহাদ। অর্ধনিদ্রাভরা কিন্তু বিরক্ত মুখে। রিদি বোঝো না। এই মানুষটা আসলে কি? এইতো গভীর ঘুমের রাজ্যে ডুবে ছিল। সে উঠে এলেই কি তার ঘুম ভেঙে যায়?
ভাবনা কাটিয়ে সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। যে করেই হোক ছলেবলে কৌশলে আহাদকে রাজি করতে হবে। রুমে ঢুকতেই আহাদ কটমট গলায় বলল,

“এতো সকালে উঠে গেলে কেন? আমার ঘুম বারবার নষ্ট করো কেন?”
“আমি কি করছি? আপনিই…”
“বসো।”
কথা কেটে ফেলল আহাদ।
“কেন?”
“আমি ঘুমাবো। মাথা ব্যথা করছে। আমার ঘুম পুরা হয়নি।”
আর কোনো আগাম সতর্কতা ছাড়াই সে এসে রিদির কোলে মাথা রেখে দিল। যেন এটাই তার স্বাভাবিক অধিকার। রিদি বিস্ময়ে স্থির। আহাদের ভারী নিশ্বাস তার উদরে এসে পড়ছে। ঐ মুহূর্তে আহাদের কণ্ঠ নরম হয়ে গেল। রিদির কোমল হাত টেনে নিজের মাথায় রেখে অদ্ভুত স্বরে বলল,
“মাথাটা টিপে দাও তো! খুব ব্যথা করছে।”
রিদি ধীরে ধীরে তার ঘন চুলে হাত বুলাতে লাগল। মনে মনে ভাবল এটাই সূবর্ন সুযোগ। এখন বললে হয়তো শুনবে। সে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে সাবধানতার সাথে বলল,
“একটা কথা বলবো মন্ত্রী মশাই?”

আহাদের ঠোঁটে আধো ঘুমন্ত হাসি, “একটা না হাজারটা বলো। আমি শুনছি।”
রিদি সাহস সঞ্চয় করল, “যদি আহিয়া কাউকে ভালোবাসে, কোনো ছেলেকে। আপনি কি মেনে নেবেন?”
“হুম। যদি সেটা আদনান না হয় তাহলে অবশ্যই মেনে নেব।”
“কিন্তু কেন? আদনানের সাথে সমস্যাটা কোথায়?”
আহাদের কণ্ঠ এক লহমায় বদলে গেল,
“এতো কিছু জানতে হবে না। আর আমার সামনে আদনানের নাম উচ্চারণ করবে না। তাহলে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না।”
হঠাৎ রিদির আঙুল স্পর্শ করল তার ভ্রুর কাটা দাগে।
“ছোটবেলার একটা ঘটনা নিয়ে আজও আপনি জেদ করে বসে আছেন। এটা কি ঠিক? একটা কথা মনে রাখবেন জেদ কিন্তু মানুষকে ধংস করে।”
এক ঝটকায় আহাদ তার হাত সরিয়ে দিল। চোখ দুটো আগুনের মতো লাল। যেন শয়ং অগ্নিকুণ্ড। তার মুখের দিকে তাকানোও কঠিন। সে গর্জে উঠল,

“বলেছিলাম এসব বিষয়ে কথা বলবে না। কেনো আমার মেজাজটা খারাপ করছিস জানু?
রিদি গিলে ফেলল ভয়টা। কিন্তু এবার সে পিছিয়ে যাওয়ার মেয়ে নয়। সে ঠোঁট শক্ত করে বলল,
“কেন বলব না? আপনি যেমন আমাকে ভালোবাসেন। আদনান ভাইও তো আহিয়াকে ভালোবাসে! তাহলে কেন..”
কথাটা শেষ করার আগেই কাঁচ ভাঙার বিকট শব্দ! আহাদ টেবিলের ওপরের পানির বোতল তুলে সোজা ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় ছুড়ে মারল। আয়নাটা মুহূর্তেই চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে মেঝেতে ঝরে পড়ল। রিদি আতঙ্কে চোখ বুজে নিলে। তার বুক ধড়াধড় করছে। আহাদ গর্জে উঠল,

“আদনান আদনান আদনান! কতবার বলেছি চুপ থাকতে কতবার! আমার কথা কানে যায় না? সকাল সকাল একই পকর পকর শুনছি কখন থেকে। মাথাটা এমনিতেই ধরে আছে। তার উপর এখন..”
তার নিঃশ্বাস যেন আগুনের মতো। ড্রেসিং টেবিলের টুকরোতে আলোর প্রতিফলনে আহাদের চোখ আরও লাল দেখাচ্ছিল। রিদি ভয়ে গুটিয়ে গেল। তার চোখে থেকে অনবরত পানি পড়ছে। নিচের তলা থেকে দৌড়ে এল আফরোজা শেখ, হালিমা বেগম আর বানি। আহাদ তখনও তীব্র রাগে ফুঁসছে। টেবিল থেকে ফোন আর ওয়ালেটটা তুলে সেই অবস্থায়ই গটগট করে বেরিয়ে গেল।

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৩৯

যাওয়ার সময় ভারী দরজায় একটা লাথি মারল। শব্দটা যেন গোটা রুমটাকে কাঁপিয়ে দিল। আফরোজা শেখ কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। কিন্তু হালিমা বেগম সব আন্দাজ করে ফেললেন। রিদিতা ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আফরোজা শেখকে জড়িয়ে ধরল। আফরোজা শেখ তাকে বুকের মধ্যে টেনে নিলেন। সে রিদিতাকে কি শান্তনা দিবেন। তার নিজের চোখেই ক্ষোভ, হতাশা আর পরাজয়ের ছাপ। দিন যত যাচ্ছে তার ছেলের রাগ, জেদ, উন্মত্ততা তত বাড়ছে!

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৪১