Home লাল শাড়িতে প্রেয়সী লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫৫

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫৫

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫৫
Fatima Fariyal

হলুদের অনুষ্ঠান বাড়িতে হলেও বিয়ের মূল আয়োজন হয়েছে ব্লুবেরি রিসোর্টে। ঢাকার কোলাহল থেকে খানিকটা দূরে, সবুজে ঘেরা শান্ত একটি জায়গা। কিন্তু এই মুহূর্তে সেই শান্ত পরিবেশ আর নেই। দূর-দূরান্ত থেকে আসা অতিথিদের ভিড়ে রিসোর্টটা রীতিমতো মুখর। হাসি-ঠাট্টা, নাচ-গান সব মিলিয়ে এক রমরমা আবহ। বিয়ের অনুষ্ঠান প্রায় শেষের পথে। অতিথিরা যে যার মতো বিদায় নিচ্ছে। এখন রিদিতার পরিবারের পালা। সেখানে একরকম আহাজারি শুরু হয়েছে। রিদিতা বাবা-মাকে জড়িয়ে কাঁদছে। আহাদ চাপা বিরক্তি নিয়ে সেই দৃশ্যের দিকে তাকিয়ে আছে।

“আজব! এত আহাজারি করার কী আছে? এতদিন তো আমার সাথেই ছিল। এখন কান্না করার মানে কী!”
তার পাশেই ছিল তুহিন। আহাদের কথা শুনে বিদ্রুপমাখা গলায় বলল,
“কাঁদবে না! বাবা-মা ছেড়ে তোর মতো বজ্জাতের ঘরে আসবে। ওর ও তো জানের ভয় আছে নাকি?”
“কই, আহিয়া তো কাঁদছে না!”
“আহিয়ার শ্বশুরবাড়ি আর বাপের বাড়ি একটাই। ও কাঁদবে কোন দুঃখে।”
আহাদ আবার তাকাল বাবা-মেয়ের দিকে। তারেক রায়ান মেয়েকে বুকে জড়িয়ে অঝোরে কাঁদছেন। মেয়ের কপালে পিতৃস্নেহের চুমু এঁকে দিচ্ছেন বারবার। এই মেয়েটাই তার কলিজার টুকরো। প্রতিবারই মেয়েকে রেখে যেতে তার বুক ভেঙে যায়। যদি কোনো নিয়ম থাকত, তাহলে সে মেয়েকে পরের ঘরে পাঠাতই না। নিজের বুকের মধ্যেই আগলে রাখত। কিন্তু ইসলামে নেই এমন কোনো নিয়ম, সমাজেও নেই। সে মেয়ের হাতটা দ্বিতীয়বার আমজাদ মীরের হাতে তুলে দিয়ে বললেন,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

“আমার মেয়েটাকে নিজের মেয়ের মতো করে দেখে রাখবেন, ভাইজান। মেয়েরা আমার বড়ই আদরের। যতটুকু সামর্থ্য হয়েছে, তাদের দুঃখ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছি। আমার ফুলের মতো মেয়েটাকে আজ আপনার কাছে সঁপে দিলাম।”
আমজাদ মীর শান্ত অথচ দৃঢ় স্বরে আশ্বস্ত করলেন।
“আপনি নিশ্চিন্ত থাকেন ভাই। আপনার মেয়ের জন্য আমার ছেলেই যথেষ্ট। বাকি আমরা তো আছিই।”
আড়চোখে একবার আহাদের দিকে তাকালেন তিনি। আহাদ তখনো নিশ্চুপ, স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাবার ইশারাটা বুঝে সে এগিয়ে এসে বলল,

“আপনি শুধু আপনার মেয়ের জন্য দোয়া করবেন। বাকিটা আমার দায়িত্ব। তাকে আগলে রাখব জীবন দিয়ে হলেও। কথা দিলাম।”
তারেক রায়ান মৃদু মাথা নাড়লেন। ফরিদা বেগম মেয়ের মাথায় স্নেহভরা হাত বুলিয়ে বললেন,
“সাবধানে থাকিস। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করিস। শ্বশুরবাড়ির সবার মন যুগিয়ে চলার চেষ্টা করিস। কোনো অভিযোগ যেন কানে না আসে। আমরা কিন্তু অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়ার মতো বাবা-মা নই। এটা তুই ভালো করেই জানিস।”
রিদিতা নাক টেনে মাথা নাড়ল। ঠোঁট ফুলিয়ে আবদারের সুরে বলল,

“তুমি কিছুদিন থাকো না আম্মু।”
“পাগলের মতো কথা বলছিস কেন? মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে কেউ কি থাকে? এখন যাই। পরে একদিন তোর আব্বুকে নিয়ে আসব।”
এক এক করে সবাই বিদায় নিল। রিদিতা আর আহিয়াকে নিয়ে সবাই বাড়ি ফিরল। ততক্ষণে রাত অনেকটাই গভীর।
রিদিতা নিজের বিয়ের ক্লান্তি ভুলে আদনানের ঘরে গিয়ে আদিল-জেরিনদের সাথে ফিতা ধরেছে। আদনান অবশ্য আহাদের মতো অত ঝামেলা করেনি। ওরা যা চেয়েছে, সঙ্গে সঙ্গেই দিয়ে বিদায় করছে। আহিয়া আগে থেকেই ঘরের ভেতর ছিল। আদনান ঢুকতেই সে সামান্য ঝুঁকে পা ছুঁয়ে সালাম করতে নেয়। ঠিক তখনই আদনান দু’কদম পিছিয়ে গেল।

“কী সমস্যা তোর? পায়ে হাত দিচ্ছিস কেন?”
কণ্ঠে ছিল স্পষ্ট বিরক্তি। আহিয়া নিচু স্বরে বলল,
“আমি শুনেছি স্বামী ঘরে ঢুকলে পা ছুঁয়ে সালাম করতে হয়।”
“কোথায় শুনেছিস? এমন আজগুবি কথা তোকে কে বলেছে?”
“সাবানা আর আলমগিরের একটা ছাঁয়া-ছবিতে দেখেছি।”
আদনানের চোখ কপালে উঠে গেল।
“এসব কবে থেকে দেখা শুরু করলি?”
“এই তো… কিছুদিন।”
আদনান একটু এগিয়ে এসে ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি খেলিয়ে বলল,
“আর কিছু দেখিসনি?”
আহিয়া বিষয়টা বুঝতে না পেরে মাথা নেড়ে বলল,
“হু, দেখেছি। চাচি আম্মাও বলেছে।”
“কী বলেছে?”
“বলেছে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়তে।”

আদনান হঠাৎ থেমে গেল। সত্যিই তো। নতুন জীবনের শুরুতে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করাই তো উচিত। সে আহিয়াকে ফ্রেশ হয়ে আসতে বলল। আহিয়া ফ্রেশ হয়ে আদনানের পছন্দমতো আকাশি রঙের শাড়ি পরে ফিরে এলো। কিছুক্ষণ পর আদনানও ফ্রেশ হয়ে এলো। দু’জনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নফল নামাজ আদায় করল। নীরবতায়, কৃতজ্ঞতায়। নামাজ শেষে আহিয়া বিছানায় বসতেই আদনান এসে তার কোলে মাথা রাখল। চোখ বন্ধ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস টানল। বহু ঝড়ঝাপটা পেরিয়ে অবশেষে এই মূহুর্তটা এসেছে।
আহিয়া একবার চোখ বুলাল চারপাশে। ঘরটা কেমন স্বপ্নের মতো লাগছে। আজ থেকে এই ঘর, এই মানুষ সবকিছুতেই তার অধিকার আছে। সে তাকাল আদনানের দিকে। এই মানুষটাই যে তার জীবনসঙ্গী হবে, তার কখনো কল্পনাতেও ছিল না। আদনান বুঝতে পেরে তার হাত টেনে নিয়ে তালুতে একটুখানি নরম চুমু এঁকে নিজের গালে চেপে ধরল। স্নিগ্ধ স্বরে বলল,

“তোকে পাওয়ার লোভটা বরাবরই ছিল আমার। আজ সেটা পূর্ণতা পেল। আমার বেঁচে থাকার স্বাদ যেন দ্বিগুণ হয়ে গেছে, আহি। তোকে নিয়ে ছোট ছোট স্বপ্নগুলো পূরণ করতে চাই। বুড়ো হওয়ার পথটা একসাথে হাঁটতে চাই। থাকবি তো আমার হয়ে?”
শেষ কথাটা বলতে বলতে সে মাথা তুলে আহিয়ার চোখে তাকাল। আহিয়ার চোখ ছলছল করে উঠল। তবুও ঠোঁটে হাসি টেনে বলল,
“আজীবন থাকব। শুধু তার বিনিময়ে আমাকে চকলেট এনে দিলে হলেই হবে।”
এবার আদনান শব্দ করে হেসে উঠল। উঠে আহিয়ার দিকে একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলল,
“তোকে তো বশ করা খুব সহজ, আহি। একটা চকলেট দিয়েই তো অশোভন কাজ করে নিতে পারব।”
আহিয়া লাজে ঠোঁট কামড়ে ধরল। মুখটা লালচে হয়ে গেল।

“কেমন কাজ?”
আদনান চুলের গোছা আলতো করে কানের পাশে গুঁজে দিয়ে নিচু স্বরে বলল,
“আজ যদি সেটা প্র্যাকটিক্যালি দেখাই… মন্দ হবে না, বল?”
আহিয়া শুকনো ঢোক গিলল। বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠল। আদনান বেডসাইডের লাইটটা বন্ধ করতেই সে চেঁচিয়ে উঠল,
“আমি আপনাকে দেখতে পাচ্ছি না! কোথায় আপনি?”
ঠিক তখনই কানের কাছে ফিসফিসিয়ে শব্দটা এসে পড়ল।
“এই তো… এখানেই। তোমার অতি নিকটে।”

ফজরের আজানের ধ্বনি চারদিক থেকে ভেসে আসছে। রিদিতার চোখ ফট করে খুলে যায়। হাত বাড়িয়ে দেখে পাশটা খালি। আহাদ নেই। মুহূর্তেই বুকের ভেতর অজস্র দোলাচল শুরু হয়। অজানা আশঙ্কা, অস্বস্তি আর এক ধরনের শূন্যতা তাকে গ্রাস করে। সে উঠে লাইট অন করে কয়েকবার ডাকল।কিন্তু কোনো সাড়া নেই। এমন অসময়ে আহাদ কোথায় যেতে পারে? আগে তো এমন হয়নি কখনো। বুকের ভেতরের অস্থিরতা আর চেপে রাখতে পারল না। একরকম ধড়ফড়িয়ে উঠে পরে। অজু করে নামাজ পড়ে নেয়।
ঠিক তখনই খট করে দরজার শব্দ। চোখ তুলে দেখে, ক্লান্ত শরীর নিয়ে ভেতরে ঢুকছে আহাদ। মুখে গভীর অবসাদ, চোখে নিদ্রাহীন রাতের ছাপ। রিদিতা এখনো জায়নামাজে বসে আছে দেখে আহাদ সোজা এসে তার কোলে মাথা এলিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ে। চোখ বন্ধ করে মোলায়েম কণ্ঠে বলে,
“আমার মাথাটা একটু টিপে দাও তো… খুব ব্যথা করছে।”
রিদিতা কিছু না বলে ধীরে ধীরে তার চুলে আঙুল চালাতে থাকে। আলতো, যত্নের সেই ছোঁয়া। কোনো প্রশ্ন করে না। যদি রেগে যায়। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর আহাদ নিজেই বলে ওঠে,

“জিজ্ঞেস করবে না কোথায় ছিলাম?”
“কাজেই ছিলেন হয়তো। কী জিজ্ঞেস করব।”
“রিদি!”
“হুম।”
“আমার খারাপ লাগছে।”
“কেন?”
“জানি না… তবে খুব অস্বস্তি হচ্ছে।”
রিদিতা শান্ত স্বরে বলে, “আপনি একটু রেস্ট করেন। কয়েকদিন তো অনেক প্রেসার গেছে। তাই হয়তো এমন লাগছে।”
তার কথামতো আহাদ বাধ্য ছেলের মতো উঠে বিছানায় শুয়ে পড়ে। কিন্তু চোখ বন্ধ করতেই রাতের ঘটনাগুলো মাথার ভেতর তোলপাড় শুরু করে।
রাতে রিদিতা একটু আগেভাগেই ঘুমিয়ে পড়েছিল। তখনই আহাদের ফোন আসে, নাদিমের। সে রিদিতার ললাটে ঠোঁট ছুঁইয়ে দ্রুত বেরিয়ে যায়। গেটের পাশে নাদিম আর শাওন অপেক্ষা করছিল। আহাদ কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফেলে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়।

“কী অবস্থা? শাহীন কই?”
নাদিম গাড়ির দিকে ইশারা করে। সেখানে শাহীন মনমরা হয়ে গাড়ির ধাতব গায়ে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শাওন চোখের ইশারায় সব বোঝায় তাকে। সে একটা ভারী নিশ্বাস ফেলে বলল,
“চল, আমার সাথে।”
“কোথায় যাবেন ভাই?”
শাওনের প্রশ্ন শুনেই আহাদের মেজাজ চড়ে যায়। দাঁত কিঁচিয়ে বলল,
“জাহান্নামে যাব, জাহান্নামে। যাবি? গর্দভ!”

দুজনেই চুপসে যায়। গতকাল হলুদের অনুষ্ঠান শেষে শাহীন যখন আনিকাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে আসে, তখন আনিকার বাবা দুজনকে একসাথে দেখে ফেলে। সেখান থেকেই ঝামেলার শুরু। রাগের মাথায় সে মেয়ের গায়ে হাত তোলেন। শাহীন প্রতিবাদও করতে পারেনি। এরপর থেকেই সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন। এই বিষয়ে রিদিতা কয়েকবার প্রশ্ন করলেও শাহীন প্রতিবারই এড়িয়ে গেছে। কারন তাদের আনন্দময় মূহুর্তটা নষ্ট করতে চায়নি।
কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই মিরপুর–১৪ ক্যান্টনমেন্টের সামনে এসে পৌঁছায়। আনিকার বাবা একজন নেভি অফিসার। নেভি কলোনিতেই তাদের বাসা। আহাদ কোনো ঝামেলা ছাড়াই ভেতরে ঢোকে। কিন্তু আনিকার বাসার গেট কেউ খুলছে না। একপর্যায়ে আহাদ রেগে গেলে গেট খুলে দেন আনিকার বাবা। দৃঢ় গলায় প্রশ্ন করেন,

“স্যার, আপনারা? এত রাতে আমার বাড়িতে আসার কারণটা জানতে পারি?”
“আপনার মেয়ে কোথায়? ডাকুন।”
আহাদের কর্কশ স্বরে বেরিয়ে আসে কথাগুলো।
“দেখুন স্যার, আমি আপনাদের সম্মান করি। কিন্তু তার মানে এই না যে আপনারা আমার বাসায় এসে ক্ষমতা দেখাবেন।”
আহাদ সামান্য ঝুঁকে সামনে আসে। চোখে আগুনের ঝিলিক। “ক্ষমতা দেখাতে চাইলে দরজায় দাঁড়িয়ে সময় নষ্ট করতাম না। ভদ্রভাবে বলছি, আপনার মেয়ে আর শাহীন একে অপরকে ভালোবাসে। বিয়ে করতে চায়। এই সম্পর্কটা মেনে নিন।”

আনিকার বাবা কিছুক্ষণ চুপ থাকে। ভেতরে ভেতরে তীব্র রাগে জ্বলছে সে। আমজাদ মীর, আহাদ রাজা এই লোকগুলোকে সে বরাবরই অপছন্দ করেন। এই দলাদলিও তার সহ্য হয় না। তবুও ক্ষমতাবান মানুষের সামনে গলা নিচু করাই বুদ্ধিমানের কাজ। তিনি নিচু স্বরে বললেন,
“আমি ভদ্র ভাষাতেই বলছি স্যার। আমার মেয়েকে আমি এমন ছেলের কাছে বিয়ে দেব না। আপনারা সময় নষ্ট করবেন না।”
আহাদ আরও তেতে ওঠে। একবার শাহীনের দিকে তাকিয়ে এরপর গর্জে উঠল।
“আপনার চাওয়া–না চাওয়ার তোয়াক্কা করি না আমি। আপনার মেয়েকে ডাকুন। ওর সাথে কথা বলব।”
ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসে আনিকার বাবা। ডাক দেয় আনিকাকে।
মাথা নিচু করে এসে দাঁড়ায় আনিকা। চোখ ফুলে আছে, কান্নায় বিধ্বস্ত চেহারা। শাহীন এক পলক তাকিয়ে থাকে। এই মেয়েটা কি সত্যিই তাকে ভালোবাসত?

“আনিকা, চলো। ভয় পাবে না। আমি তোমাদের বিয়ের দায়িত্ব নেব।”
আহাদের কথায় চমকে ওঠে আনিকা। বাবার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
“আমি কোথাও যাব না। আমি কখনো বলিনি আমি উনাকে বিয়ে করব। আপনারা দয়া করে চলে যান, আহাদ ভাই।”
শাহীন এক ধাপ এগিয়ে আসে। “আপনি এসব কী বলছেন আনিকা?”
“আমি যা বলেছি সেটাই আমার সিদ্ধান্ত। চাইলে আপনারা ভিতরে বসে চা-নাস্তা করতে পারেন। কিন্তু বিয়ে নিয়ে আর কথা বলবেন না।”
শাহীনের ভেতরটা হঠাৎ ভেঙে পড়ল। এত যন্ত্রণা কেন হচ্ছে? তাদের সম্পর্ক তো অত গভীর ছিল না। তবু এই চিনচিনে ব্যথা কেন? সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। দ্রুত বেরিয়ে আসে। আহাদও তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সবার দিকে একবার তাকিয়ে বেরিয়ে যায়। নাদিম চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল,

“ভাই, কিছু বললেন না?”
“আমি কী বলব নাদিম?”
“শাহীন যে এতোদিন একটুকরো আশা নিয়ে বসে ছিল! তার কী হবে?”
আহাদ শাহীনের দিকে তাকিয়ে কঠিন স্বরে বলল,
“যেখানে আনিকা নিজেই রাজি না, সেখানে আমার কথা বলা বোকামি। ও রাজি থাকলে আমি ওর বাপের বাপকেও পরোয়া করতাম না।”
রিদিতা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আহাদের দিকে। আহাদের কথাগুলো শুনে ধীরে ধীরে সব হিসেব মিলে যাচ্ছে তার মাথার ভেতর। আনিকা কেন বিয়েতে আসেনি, কেন ফোন বারবার বন্ধ পেয়েছে, কেন শাহীন সারাদিন মনমরা হয়ে ছিল। সবকিছুর উত্তর যেন এক সুতোয় গাঁথা হয়ে গেল। বুকের ভেতর এক ধরনের চাপা ব্যথা জমে ওঠে রিদিতার। সে আলতো করে আহাদের চুলে আঙুল বুলিয়ে দেয়। নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

“এখন কী করবেন?”
আহাদ ক্লান্ত চোখে তাকায়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“কীই বা করতে পারি?”
রিদিতার কণ্ঠে অনুনয়।
“আমি জানি আনিকাও শাহীনকে পছন্দ করে। হয়তো খুব কষ্ট পেয়েই এসব কথা বলেছে। আপনি কোনোভাবে ওর বাবাকে রাজি করান না, প্লিজ।”
আহাদ উঠে বসে। বালিশে পিঠ ঠেকিয়ে মাথা নিচু করে রাখে কিছুক্ষণ। তারপর ভারী গলায় বলল,
“তোমার কী মনে হয়, আমি চেষ্টা করিনি? সব করেছি রিদি। কিন্তু এখন সবটাই আনিকার ওপর নির্ভর করছে। আমি শাহীনের কষ্ট দেখতে পারছি না। ও সারাজীবন নিজের সবকিছু আমার জন্য সপে দিয়েছে, আর আমি… আমি ওর জন্য এতটুকুও করতে পারলাম না।”

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫৪

রিদিতা ঠোঁট কামড়ে চুপ করে থাকে। কিছুক্ষণ ভেবে সিদ্ধান্ত নেয়। ধীরে তাকিয়ে বলল,
“আমি আর আহিয়া যদি ওদের বাসায় গিয়ে কথা বলি? যদি বুঝাতে পারি?”
আহাদ মাথা নাড়ে।
“কাজ হবে বলে মনে হয় না।”
“তবুও… চেষ্টা তো করা যায়।”

লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫৬