লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫৯
Fatima Fariyal
সন্ধ্যা নামলেই ঢাকার চিপাচাপা অলিগলিগুলো ধীরে ধীরে রূপ বদলাতে শুরু করে। দিনের আলোয় যেসব গলি নিরীহ মনে হয় রাত নামার সাথে সাথে সেগুলোই ভয়ংকর হয়ে ওঠে। সন্ত্রাসীদের উৎপাত বেড়ে যায় আর সাধারণ মানুষের কোলাহল কমে আসে। কামারপট্টির এমনই এক সরু গলিতে ঢুকল শামিম পোদ্দার। গলির ভেতরেই আছে বড়সড় একটা চাপাতি আর সর ছুরির কারখানা। সাদা লুঙির এক কোন ধরে, মুখভর্তি পান চিবুতে চিবুতে ঢুকে ভিতরে যায়। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, এটা স্রেফ কামারের দোকান। কিন্তু আসলে এটা কোন কারখানা না। এটা চাঁদাবাজি আর চোরা চালানের একটা শক্ত ঘাঁটি।
শামিম পোদ্দার ভেতরে ঢুকে মুখে থাকা পানের চিপটি ফেলে চারপাশে একবার তাকাল। এরপর এগিয়ে গিয়ে একগাল হাসি হেসে বলল,
“আরে… আরে… আরে! এইডা আমি কী দেখতাছি? মাতব্বর গরিবের আস্তানায়? হঠাৎ ঠ্যাং মারলেন কী মনে কইরা?”
খলিল মাতব্বর মাঝখানে রাখা একটা কাঠের চেয়ারে এক পায়ের ওপর আরেক পা তুলে বসে আছে। গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে সামনে। তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার কয়েকজন বিশ্বস্ত লোক। শামিম পোদ্দারের কালু নামে এক চ্যালা এগিয়ে এসে বলল,
“ওস্তাদ, আমনের লাইগ্গা হেয় আধা ঘণ্টা বয়া রইছে।”
শামিম পোদ্দার পানমাখা ঠোঁট মুছে বলল,
“খালি বঅয়া রাখলে হইবো? চা-কফির ব্যাবস্থা করন লাগবো না? আমি কি হেইডা কইয়া দিমু খাতিরদারি কেমনে করত অইব?”
কালু ছেলেটা মাথা নিচু করে বলল,
“আমি তো আনতেই চাইছিলাম মিয়া। হেয় মানা করছে।”
পোদ্দারের চোখ লাল হয়ে উঠল। কিছু বলতে যাবে, এমন সময় খলিল মাতব্বর হাত তুলে থামিয়ে দিল। পা নামিয়ে সোজা হয়ে বসল সে। গলা এবার ভারী আর কড়া,
“আমি এইখানে চা-কফি খাইতে আসি নাই।”
একটু থেমে ফের বলল,
“আমি তোর জন্য একটা অফার লইয়া আসছি।”
শামিম পোদ্দার একটু অবাক হলো। তারপর নিজেও একটা চেয়ার টেনে সামনে বসে পড়ল। শরীর সামনের দিকে ঝুঁকিয়ে আগ্রহ নিয়ে বলল,
“অফার? আমার লাইগ্গা?”
খলিল মাতাব্বর নির্লিপ্ত গলায় বলল,
“হ। চাইলে আমি অন্যভাবেও কাজটা ম্যানেজ করতে পারতাম। কিন্তু শুনলাম আহাদ রাজার সাথে তোরও ঝামেলা চলতাছে। তাই ভাবলাম, আগে তোরেই অফারটা দেই।”
পোদ্দারের চোখে কৌতূহল জ্বলে উঠল।
“কী করতে চান?”
খলিল মাতাব্বরের মুখ শক্ত হয়ে গেল। গলায় জমে থাকা রাগ এবার বেরিয়ে এল, “ধ্বংস! আমি আহাদ রাজাকে ধ্বংস করতে চাই। আমার অপমানের প্রতিটা হিসাব আমি আদায় করব। ওর তেজ আমি মাটির সাথে মিশাইয়া দিতে চাই।”
“আমার কাছ দিয়া কিতা চান?”
“আমি চাই কাজটা তুই কর।”
এই কথা শুনে শামিম হঠাৎ উঠে দাঁড়াল। মুখ শক্ত করে বলল, “পারুম না। আমি এই কাম করতে পারুম না। আমি আহাদ রাজারে কথা দিছি, ওর সাথে টেক্কা নিমু না। সেই কথার বরখেলাপি আমি করুম না।”
খলিল মাতব্বর ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল, কিন্তু হাসিটা ভয়ংকর এক হাসি ছিল। সে নিজের চকচকে টাক মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
“এক থালায় খাইতে বসে অন্য থালায় চিকেন দেখলে থালা বদলানো মানুষের মুখে এইসব কথা শোভা পায় না, পোদ্দার!”
একটু থেমে ধীরে ধীরে যোগ করল, “তুই কাজটা কইরা দিলে কারওয়ান বাজার আবার তোর দখলে আসবে। একবার ভেবে দেখ।”
শামিম পোদ্দার চুপ করে গেল। নিজের লাভের কথা ভাবল। ক্ষমতা, এলাকা, টাকা সব একসাথে ফিরে পাওয়ার সুযোগ। একটু সময় নিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“কী করত অইবো?”
মাতাব্বরে এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তার চোখে তখন হিংস্র প্রতিশোধের আগুন। টেবিলের ওপর এক বান্ডিল এক হাজার টাকার নোট রেখে বলল,
“আপাতত এইটা রাখ। বাকিটা সময়মতো জানবি।”
একটু থেমে কণ্ঠ আরও ভয়ংকর করে যোগ করল,
“কিন্তু! কিন্তু.. যদি কোনো চালাকি করার চেষ্টা করিস, তাইলে কাকপক্ষিও তোর হদিস পাইবো না। মাথায় রাখিস কথাটা।”
এই কথা বলেই হনহন করে বেরিয়ে গেল খলিল মাতব্বর।
ঘরে নেমে এল নীরবতা। শামিম পোদ্দার ধীরে ধীরে টেবিল থেকে টাকার বান্ডিলটা তুলে ওজন মাপার মতো করে নেড়েচেড়ে দেখল। তারপর নাকের কাছে নিয়ে গিয়ে গন্ধ শুঁকতেই পান খাওয়া মুখে একগাল হাসি ফুটে উঠল। পাশে দাঁড়ানো কালুর দিকে তাকিয়ে বলল,
“বুঝলিরে কালু! এই কাগজের গন্ধ নেশারেও হার মানায়। একবার ধরলে সহজে ছাড়ে না।”
কালু বলে উঠল, “এত স্বাদ ক্যা এইডাতে!”
দুজনেই উচ্চ স্বরে হসে উঠল। খুব বিশ্রী হাসি। যেখানে কোনো মনুষ্যত্বের লেশ নেই।
সকালের নরম আলো চোখে পড়তেই রিদিতার ঘুম ভাঙল। আধোচোখে সে কিছু বুঝে ওঠার আগেই নিজেকে আবিষ্কার করল এক উষ্ণ, শক্ত বুকের মাঝখানে। মুহূর্তের জন্য বিভ্রান্ত হলেও পরবর্তীতে নাক ঘষে নিল একবার, দু’বার। পরিচিত সেই পুরুষালী গন্ধটা নাকে আসতেই তার ঠোঁটে অজান্তেই একটুকরো মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল। এই গন্ধটা তার খুব ভালো করেই চেনা আছে। সে নড়েচড়ে আরও একটু কাছে সরে গেল। যেন বুকের ভেতর মাথাটা গুঁজে থাকতে চায়। কিন্তু আহাদের খোঁচা খোঁচা দাড়িতে তার চুল বারবার আটকে যাচ্ছে। আহাদ তখনই একটু আতঙ্কিত গলায় বলে উঠল,
“কী করছো তুমি হেহ? সোজা হও। এইভাবে শোয়া যাবে না। সোজা হও।”
রিদিতা চমকে গিয়ে চোখ খুলল। দেখল আহাদ চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। চোখে ঘুম নেই বললেই চলে। বরং মনে হচ্ছে সে পুরো রাতটাই নির্ঘুম ছিল। রিদিতা একটু সরে এসে ধীরে স্বরে প্রশ্ন করল,
“আ… আপনি ঘুমাননি?”
আহাদ বিরক্তির সাথে উত্তর দিল,
“আমি জানতাম। আমি জানতাম তুমি এমন নড়াচড়া করে একটা গন্ডগোল বাঁধাবে। তাই ঘুমাইনি। তুমি কাত হয়ে আছো কেন? সোজা হও। বেবিরা কষ্ট পাচ্ছে।”
রিদিতা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। এই লোকটা বলে কী! সে তো তেমন কিছু টের পাচ্ছে না! অথচ আহাদ এমনভাবে বলছে যেন সে অনেক বড় অপরাধ করে বসেছে। রিদিতা উঠতে চাইলে আহাদ সঙ্গে সঙ্গে তাকে সামলে নিল। পিছনে একটা বালিশ ঠেস দিয়ে বসিয়ে দিল। রিদিতা চোখ পিটপিট করে বলল,
“আমাকে কি অসুস্থ রুগী মনে হচ্ছে? যে আপনি সারা রাত পাহারা দিচ্ছেন বসে বসে?”
আহাদ নাক টেনে বলল,
“তুমি উল্টাপাল্টা মুভমেন্ট করো। এতে ওদের সমস্যা হতে পারে। আমি কোনো ঝুঁকি নিতে চাই না। না তোমাকে নিয়ে, না ওদেরকে নিয়ে।”
রিদিতা হতবাক তাকিয়ে রইল। অভিমানে শব্দগুলো যেন হারিয়ে গেছে। আহাদ ফুস করে একটা নিঃশ্বাস ছাড়ল,
“কী হলো? এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?”
“আপনি এমন কেন?”
“কেমন? খারাপ?”
“হুম।”
“বেশি খারাপ?”
“হুম।”
আহাদ হালকা হেসে উঠে বলল,
“শুধু ভালো দিয়ে দুনিয়া চলে না। একটু আধটু খারাপ হতেই হয়।”
রিদিতা জানে, কথায় সে কখনোই আহাদ রাজার সাথে পেরে উঠবে না। তাই আর কিছু না বলে চুপ করে গেল।
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল। আহাদ উঠে গিয়ে দরজা খুলতেই ভেতরে ঢুকল আহিয়া, আর দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে আছে আদনান। আহাদের কণ্ঠ সঙ্গে সঙ্গে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল,
“সকাল সকাল এখানে কী চাই?”
আহিয়া সরাসরি রিদিতার কাছে গিয়ে বলল,
“আমরা সবাই মিলে বাইরে যাচ্ছি। তুইও চল। একটু ঘুড়েফিরে কেনাকাটা করে চলে আসবো।”
কথা শেষ হওয়ার আগেই বজ্রপাতের মতো আহাদের কণ্ঠ আছড়ে পড়ল, “রিদি কোথাও যাবে না। আর না তুই যাবি।”
তারপর দৃষ্টি আদনানের দিকে ঘুরিয়ে বলল,
“আর বাকিরা যাবে কি যাবে না, সেটা যার যার ব্যাপার।”
আহিয়ার মুখে সঙ্গে সঙ্গে কালো মেঘ জমল। অসহায়ের মতো ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“কেন? গেলে কী হবে? একটু কেনাকাটা করেই তো ফিরে আসবো।”
“আমি যখন বলছি না, তার মানে না।”
“কিন্তু…”
“আহি! থাপ্পড়ায়া তোর চেহারার নকশা পাল্টায়া দিবো। আমার উপর কথা বলবি না। রিদির এই অবস্থায় বাইরে যাওয়া ঠিক না। আমরা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাংলাদেশে ফিরে যাবো।”
রিদিতা এবার আর চুপ থাকতে পারল না।
“আমার না যাওয়ার সাথে আহিয়ার কী সম্পর্ক? ও যাক না। আপনি এমন করছেন কেন?”
আহাদ রক্তচক্ষু করে আদনানের দিকে তাকাল। আদনান বিরক্ত হয়ে ভেতরে এসে আহিয়ার হাত নিজের মুঠোয় নিল। শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“অনেক হয়েছে। চল আহি।”
“আহি যাবে না।”
“যাবে।”
“না।”
“আমি আমার বউ নিয়ে যেখানে খুশি সেখানে যাবো। তোর সমস্যা কোথায়? তোর বউকে তো নিয়ে যাচ্ছি না। তুই তোর বউ নিয়ে বসে থাক।”
এই কথা বলেই সে আহিয়াকে নিয়ে বেরিয়ে গেল। আহাদ রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে একটা কুশন ছুড়ে মারল।
“আদনান!”
কিন্তু ততক্ষণে তারা চলে গেছে। পরিস্থিতি সামলাতে রিদিতা হালকা অভিনয় করে বলল,
“শুনুন না… আ… আমার…”
আহাদ সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে গেল। দৌড়ে এসে উৎকণ্ঠায় বলল,
“কী হয়েছে জানু? হুহ? মাথা ঘুরছে? খারাপ লাগছে?”
রিদিতা মাথা নেড়ে বলল, “উহু।”
“তাহলে?”
রিদিতা ঠোঁট ফুলিয়ে শিশুর মতো বলল, “আমার খুদা লাগছে।”
আহাদ কিছুক্ষণ চুপ করে তাকিয়ে রইল। প্রেয়সীর সেই নিষ্পাপ মুখটা দেখে মূহুর্তেই মন গলে গেল। ধীরে ধীরে তার দিকে ঝুঁকে বলল,
“তুমি কি আমাকে বশ করার চেষ্টা করছো?”
রিদিতা ইনোসেন্ট মুখ বানিয়ে বলল, “মানে! আ… আমি?”
আহাদ আরও কাছে এগিয়ে এল। তার গরম, তপ্ত শ্বাস-প্রশ্বাস রিদিতার ঘাড়ে লাগতেই সে কেমন কুঁকড়ে গেল। নিজের অস্থিরতা সামলাতে না পেরে মুখ লুকিয়ে ফেলল আহাদের বুকে। আহাদ তার এলোমেলো চুল সরিয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে বলল,
লাল শাড়িতে প্রেয়সী পর্ব ৫৮
“এতটা দুর্বল করে দিও না জানু। শেষমেশ ক্ষতিটা কিন্তু তোমারই হবে।”
রিদিতা মুখ লুকিয়েই কাঁপা গলায় বলল,
“আপনার কাছে থাকলে ক্ষতি কেন? ক্ষতবিক্ষত হলেও আমার কোনো আফসোস নেই।”
আহাদ গভীর একটা হাসি দিল।
“আচ্ছা?”
“হুম।”
