Home লাল শাড়িতে প্রেয়সী লাল শাড়িতে প্রেয়সী সারপ্রাইজ পর্ব

লাল শাড়িতে প্রেয়সী সারপ্রাইজ পর্ব

লাল শাড়িতে প্রেয়সী সারপ্রাইজ পর্ব
Fatima Fariyal

“মাম্মাম… আমি বিয়ে তব্বো!”
আলমারিতে কাপড় গুছিয়ে রাখছিল রিদিতা। মেয়ের এমন কথায় হত্বব্বিল হয়ে তার হাত থেমে যায় মাঝপথে। আহাদের সাদা পাঞ্জাবিটা বিছানার উপর রেখে তড়িঘড়ি করে মেয়ের সামনে গিয়ে বসল। অরিতা কেবলই ঘুম থেকে উঠেছে। চুলগুলো উষ্কখুষ্ক হয়ে আছে। আধবোজা চোখ, গোলাপি গাল দুটো এখনও বালিশের চাপে লাল হয়ে আছে। মুখভর্তি নিরীহ ভাব নিয়ে সে নিজের ছোট্ট আঙুল দিয়ে মাথা চুলকাচ্ছে। রিদিতা কপাল থেকে তার চুল সরিয়ে নরম গলায় বলল,

“কি বললে মা? আবার বলো তো?”
অরিতা এবার আরও নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে ঘোষণা দিল,
“আমি বিয়ে তব্বো মাম্মাম।”
রিদিতার চোখ এবার কপালে উঠে গেল। প্রথমে সে ভেবেছিল হয়তো ভুল শুনেছে। এখন ছাব্বিশ মাস বয়সী মেয়ের মুখে বিয়ের কথা শুনে সে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে রইল। অতঃপর কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল,
“তোমাকে এসব কথা কে শিখিয়েছে?”
অরিতা বিন্দুমাত্র দেরি না করে উত্তর দিল, “পাপা।”
“কী-ই? পাপা?”
রিদিতার স্বর খানিক উঁচু হয়ে গেল। মেয়েটা গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে স্বাভাবিক কথাটাই বলেছে সে। রিদিতা এবার উৎকণ্ঠিত চোখে জিজ্ঞেস করল,
“পাপা আর কী বলেছে?”
অরিতা ঠোঁট ফুলিয়ে, ভাঙা ভাঙা স্বরে বলতে লাগল,

“পাপা বলেতে আমি ভাত না থেলে আমায় বিয়ে দি দেবে। আমি ভাত থাবো না মাম্মাম। আমি বিয়ে তব্বো!”
কথা শেষ করে সে এমন এক গর্বিত মুখভঙ্গি করল, যেন জীবনের বিরাট কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। পাশেই গাড়ি নিয়ে খেলছিল আব্রাহাম। এবার সেও উঠে এসে মায়ের কোলে গা এলিয়ে দিল। ছোট্ট হাত দিয়ে মায়ের গাল ছুঁয়ে খুব আগ্রহ নিয়ে বলল,
“মাম্মাম, আমি ও বিয়ে তব্বো! আমি ও ভাত থাবো না!”
একটার পর একটা বিষম খাচ্ছে রিদিতা। এইটুকু দুই বাচ্চার মাথায় বিয়ের ধারণা ঢুকিয়েছে তাদের বাপ! সাধে কী আর সে বজ্জাত বেডা বলে! মনে মনে আহাদকে দশবার গালি দিল সে। আব্রাহাম এবার আরও উৎসাহ নিয়ে বলল,
“আমাদেল বিয়ে দিয়ে দেও মাম্মাম!”
রিদিতা ঠোঁট চেপে নিজের হাসি সামলাল। রাগও হচ্ছে, আবার এই দুটো পুঁচকের কথা শুনে হাসিও পাচ্ছে ভীষণ। তবুও মুখ গম্ভীর করে বলল,
“বিয়ে করলে ভাত খেতে হবে না? শশুড় বাড়ি গিয়ে না খেয়ে থাকবে? তাহলে তো ভালোই, আমারও কষ্ট কমে যাবে। তোমাদের পিছনে অযথা খাটতে হবে না। তোমাদের পাপাকে বলে বিয়ে দিবো। চলে যেও শশুড় বাড়ি।”
অরিতার মুখমণ্ডল মুহূর্তেই ফ্যাকাসে হয়ে গেল। টলটলে চোখে তাকিয়ে কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল,

“থতুল বালি যাব না।”
“কেন যাবে না? একটু আগেই না বললে বিয়ে করবে?”
“বিয়ে তব্বো… তিন্তু থতুল বালি যাব না। এথানেই তোমার আর পাপাত থাতে থাব্বো।”
“তা হবে না। বিয়ে করলে শশুড়বাড়ি যেতেই হবে। আর ভাত না খেলে আমি কাউকেই রাখব না।”
আব্রাহাম বেশ কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে গভীরভাবে চিন্তা করল। তারপর অত্যন্ত যুক্তিসঙ্গত ভঙ্গিতে বলল,
“তই? ফুপ্পি ও তো বিয়ে তলেচে… ডাত্তার চাচু ও বিয়ে তলেচে… থুতুল বালি তো যায় নি! আমলাও যাবো না মাম্মাম!”
রিদিতা হতাশ হলো। এখন এই দুটো বাচ্চাকে কীভাবে বোঝাবে যে তাদের ডাক্তার চাচু ফুপ্পিকেই বিয়ে করেছে। আর তার স্বামী-স্ত্রী? এই বয়সে এসব বোঝার ক্ষমতা কি ওদের হয়েছে?
ঠিক তখনই দীর্ঘ সময় শাওয়ার নিয়ে বাথরুম বেরিয়ে এলো আহাদ। ভেজা চুল থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরছে। কাঁধে তোয়ালে ফেলে চুল মুছতে মুছতে সে ঘরের ভেতর ঢুকতেই খেয়াল করল অরিতা টলমল চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। যে কোনো মুহূর্তে কেঁদে ফেলবে মনে হচ্ছে। আহাদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল রিদিতার দিকে।

“কি হয়েছে?”
রিদিতা ঠোঁট শক্ত করে বলল,
“আপনার আদরের বাচ্চারা বিয়ে করতে চায়। ভাত খাবে না। বিয়ে করে শশুড়বাড়ি যাবে।”
অরিতা সঙ্গে সঙ্গে মাথা ঝাঁকিয়ে প্রতিবাদ করল,
“না! থতুল বালি যাব না। ভাতও থাব না। পাপা… আমি থতুল বালি যাব না।”
মেয়ের কাঁদো কাঁদো মুখ দেখে আহাদের প্রথমে কিছুক্ষণ বোঝার চেষ্টা করল। তারপর পুরো ব্যাপারটা মাথায় আসতেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। ঠোঁট চেপেও হাসি আটকাতে পারল না সে। রিদিতা চোখ রাঙিয়ে তাকাতেই আহাদ কোনোমতে হাসি সামলে মেয়ের সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। দুই হাত দিয়ে ছোট্ট মুখখানা আলতো করে ধরে আদুরে স্বরে বলল,
“আচ্ছা আচ্ছা… যেতে হবে না, মা। আমার রাজকন্যা কোথাও যাবে না। সবসময় পাপার কাছেই থাকবে। ঠিক আছে?”
অরিতা সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাবার গলা জড়িয়ে ধরল। যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিপদ থেকে রক্ষা পেয়েছে সে।
রিদিতা এবার বিরক্ত গলায় বলল,

“আপনি ওদের মাথায় তুলছেন দিন দিন। এখন ওরা আমার কোনো কথাই শোনে না। এমন চলতে থাকলে কিন্তু আমি সত্যিই একদিন বাড়ি চলে যাব!”
কথাটা বলা মাত্র আহাদের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
এক নিমিষে তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। বাদামি চোখদুটো লালচে হয়ে এলো বিরক্তিতে। অরিতাকে সোফায় বসিয়ে রিদিতার একদম সামনে দাঁড়াল সে। চাপা গলায় দাঁতে দাঁত চেপে হুংকার ছাড়ল,
“এই আল্লাহর বান্দি… সমস্যা কী তোমার? কথায় কথায় ছেড়ে যাওয়ার হুমকি দাও কেন? জানের ভয় নাই? মেরে দেই একদম?”
রিদিতা থম মেরে তাকিয়ে রইল।সব সময়ের মতোই অভিমানে ঠোঁটজোড়া শক্ত করে।আহাদ সেই মুখটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কর্কশ স্বরে বলল,
“এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? বলেছি না আমার দিকে এভাবে তাকাবে না।”
“আপনি খুব খারাপ।”
আহাদ কিছুটা ঝুঁকে এল। ঠোঁটের কোণে ধীর একটা হাসি ফুটিয়ে বলল,
“আমি খারাপ না হলে… তুমি মাম্মাম হতে পারতে?”
কথাটা শুনে রিদিতার কান গরম হয়ে উঠল। মুখটা লালচে হয়ে গেল মুহূর্তেই। বিরক্ত, লজ্জিত আর অসহায় স্বরে বলে উঠল,

“বজ্জাত বেডা!”
এই বলে সে দ্রুত সরে যেতে নিল। কিন্তু আহাদ কি আর এত সহজে ছাড়ার মানুষ? এক টানে পিছন থেকে তাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল সে। রিদিতা হকচকিয়ে উঠল। আহাদের ভেজা শরীরের গন্ধ, গরম নিঃশ্বাস আর শক্ত বাহুর বাঁধনে মুহূর্তেই অস্থির হয়ে গেল সে। আহাদ নির্বিকার ভঙ্গিতে বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বাচ্চারা, চোখ বন্ধ করো। পাপা আর মাম্মাম এখন রোম্যান্স করবে।”
আব্রাহাম আর অরিতা বাবার এই নির্দেশের সাথে বেশ পরিচিত। তারা দুজনেই বিন্দুমাত্র দেরি না করে ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে চোখ চেপে ধরল। অরিতা তো আবার দায়িত্বশীল বড়দের মতো বলেও উঠল,
“আমলা এত্তু ও দেব্বো না!”
আহাদ হেসে ফেলল। প্রেয়সীর লতানো কমোর টেনে নাকের ডগায় জোরে একটা চুমু খেল। রিদিতা সঙ্গে সঙ্গে চোখ বড় বড় করে তাকাল।

“কি করছেন?”
ওদিকে আব্রাহাম কৌতূহল সামলাতে না পেরে আঙুলের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিতে গিয়েছিল। কিন্তু বাবার তীক্ষ্ণ নজর এড়ালো না সেটা।
“আব্র! নো চিটিং!”
ধরা পড়ে যাওয়া চোরের মতো আব্রাহাম দ্রুত আবার চোখ বন্ধ করে ফেলল। অরিতা খিলখিল করে হেসে উঠল।
রিদিতা ভীষণ অস্বস্তিতে পড়ে গেল। বাচ্চাদের সামনে এসব আদিখ্যেতা সে কখনোই স্বাভাবিকভাবে নিতে পারে না। মুখ গম্ভীর করে আহাদের বুক থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলল,
“কি করছেন মন্ত্রী মশাই? ছাড়ুন তো! এটা কোনো সময় হলো?”
আহাদ আরও নির্লজ্জের মতো বলল,
“আদর করার আবার টাইমটেবিল আছে নাকি? আমার যখন ইচ্ছে হবে, আমি করব।”
“আপনার বাচ্চারা দেখছে।”
“দেখতে দাও। ওদেরও তো শিখতে হবে।”

“আপনি এসব কি বলছেন? তাই বলে ওদের রোম্যান্স শিখাবেন?”
“অবশ্যই। রোম্যান্স স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী জিনিস। আমি চাই না আমার বাচ্চারা এসব থেকে বঞ্চিত থাকুক।”
একটু থেমে ইচ্ছে করেই আরও যোগ করল,
“তাছাড়া এখন না শিখলে বড় হয়ে নিরামিষ হবে। একদম তোমার মতো।”
কথাটা স্পষ্টই জ্বালানোর জন্য বলা। আর সেটার ফলও হলো সঙ্গে সঙ্গে। রিদিতার নাকের ডগা ফুলে উঠল। সে অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
“আমি নিরামিষ?”
আহাদ শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“তো কী? একটু আদর করতে গেলেই বলো, আমার খুদা লাগছে, ঘুম পাচ্ছে, মাথা ব্যথা করছে।”
রিদিতা এবার পুরোপুরি ক্ষেপে গেল।

“ঠিক আছে।”
“কি ঠিক আছে?”
রিদিতা দাঁত চেপে বলল,
“আজকে আপনি আমার ধারেকাছেও আসবেন না।”
“ও আচ্ছা?”
“শুধু আজকে না। আজ থেকে আপনি আসবেনই না। আমি আজকে থেকে আদিবার সাথে ঘুমাব। থাকুন আপনি আপনার বাচ্চাদের নিয়ে!”
কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে দরজার দিকে হাঁটা দিল সে। আহাদ দ্রুত তার পিছনে যেতে নিতেই রিদিতা ঘুরে দাঁড়িয়ে আগুনঝরা চোখে বলল,
“খবরদার! আমার পিছনে আসবেন না।”
আহাদ থেমে গেল। রিদিতা আঙুল তুলে হুমকি দিল,
“আর এক পা এগোলে আমি আপনাকে আপনার ডেমো ঘরে নিয়েই ডেমো দিব বলে দিলাম!”
কথাটা বলেই হনহন করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল সে।আহাদ অসহায়ের মতো দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
বাবার চুপসে যাওয়া মুখখানা দেখে আব্রাহাম আর অরিতা খিলখিল করে হেসে উঠল। বাচ্চাদের দিকে আহাদ নিজের মাথায় হাত বুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“আমার সহজ-সরল জানুটা এমন ডেঞ্জারাস হলো কবে থেকে?”

আদনান কেবল ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়েছে। ভেজা চুল থেকে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে গলা বেয়ে। মাথা মুছতে মুছতে ঘরের ভেতর ঢুকেই থমকে গেল। আাহিয়া কোথাও নেই। বিছানার চাদরটা সুন্দর করে টানটান করা। টেবিলের উপর পানির গ্লাস রাখা। আর খাটের একপাশে নিখুঁতভাবে ভাঁজ করে রাখা তার শার্ট-প্যান্ট রাখা। আদনানের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠল।
এই মেয়েটা না থাকলে তার জীবনটা কেমন অগোছালো হয়ে যেত, মাঝে মাঝে সে ভাবেই অবাক হয়। এখন তো অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে আহিয়া ছাড়া নিজের পোশাকও ঠিকমতো বেছে পরে না সে। আহিয়ার পছন্দ, আহিয়ার দেওয়া রঙ, আহিয়ার সাজিয়ে রাখা জামা সবকিছুতেই মেয়েটার অস্তিত্ব লেগে থাকে। কিন্তু সেই আদুরে মেয়েটার একটা স্বভাব দিন দিন ভয়ানক রকম বেড়েছে। জেলাসি। আগে এতটা ছিল না। অথচ এখন হাসপাতাল থেকে ফিরলেই শুরু হয় একের পর এক জেরা।
“আজকে ওই নার্সটা আপনার দিকে এত তাকাচ্ছিল কেন?”
“আপনার ফোনে যে ‘ম্যাম’ লিখে কল এসেছিল সে কে?”
“আপনি ফোনে কথা বলার সময় হাসলেন কেন?”

আদনান প্রতিবার ধৈর্য ধরে উত্তর দেয়। কারণ সে জানে আহিয়ার ভয়টা অমূলক নয়। মেয়েটা নিজেকে কখনোই যথেষ্ট মনে করতে পারে না। নিজেকে শ্যামলা, সাধারণ ভাবতে ভাবতেই বড় হয়েছে। আর আদনান অসম্ভব সুন্দর একজন মানুষ। লম্বা, ব্যক্তিত্বময়, চোখে-মুখে তীক্ষ্ণ একটা আকর্ষণ। তাই আহিয়া ভয় পায়। অকারণেই ভয় পায়।
আর আদনান সেই ভয়টুকু গোপনে খুব উপভোগও করে।
কারণ এই ভয় মানেই মেয়েটা তাকে ভীষণ ভালোবাসে।
আদনান তৈরি হয়ে নিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের টাই ঠিক করল। চুলে হালকা জেল সেট করল। তারপর হাতে দামি ঘড়িটা পরতে পরতে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। কিন্তু হঠাৎই তার চোখ আটকে গেল দরজার পাশে রাখা ময়লার ঝুড়িতে। ভ্রু কুঁচকে গেল তার। কেন যেন অস্বস্তি হলো। দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল ঝুড়িতে পরে থাকা প্রেগন্যান্সি কিটটার দিকে। স্পষ্ট দুটো লাল দাগ। তার গলা শুকিয়ে এলো। অস্পষ্ট স্বরে ফিসফিস করে আওড়ালো,
“আহি প্রেগন্যান্ট?”

অদ্ভুতভাবে কোনো আনন্দ অনুভব করল না সে। একটুও না। বরং বুকের ভেতর জমাট বাঁধতে লাগল আতঙ্ক। ভয়ংকর এক ভয়। আহিয়ার এর আগে একবার মিসক্যারেজ হয়েছল। আরেকবার অ্যাবরেশন করতে হয়েছিল। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে। সেই সময়টা মনে পড়লে আজও আদনানের বুক কেঁপে ওঠে। সে বাচ্চা চায় না। কখনোই চায়নি। তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান হলে আহিয়া। সে শুধু আহিয়াকে নিয়েই বাঁচতে চায়। বাকি সবকিছু তুচ্ছ। তাহলে এবার? আবার যদি কিছু হয়? আবার যদি…
ভাবনাটা শেষ করতেই পারল না সে। হুট করে ঘর থেকে বেরিয়ে দ্রুত নিচে নেমে এলো। ড্রয়িংরুমে এসে দেখল আহিয়া সোফায় বসে আব্রাহামের সাথে খেলছে। হালিমা বেগম রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বললেন,
“আদনান, নাস্তা করবে না বাবা?”
আদনান জোর করে স্বাভাবিক গলায় বলল,
“এখন না চাচি আম্মা। একটু পরে আসছি।”
তারপর আহিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল,
“আহি, একটু উপরে আয় তো। আমার ওয়ালেটটা খুঁজে পাচ্ছি না।”
আহিয়া বিনা বাক্যে উঠে দাঁড়াল। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে তাড়াহুড়ো করে ধপধপ শব্দ তুলে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে লাগল। আর তাতেই আদনানের বুক ধক করে উঠল। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে মাঝসিঁড়িতেই আহিয়াকে কোলে তুলে নিল। আহিয়া চমকে উঠল।
“আরে! কি করছেন?”

“একটু সাবধানে চলতে পারিস না? এত জ্বালাস কেন আমাকে? তোর কিছু হয়ে গেলে আমার কী হবে ভেবেছিস? আমি কীভাবে বাঁচব?”
আহিয়া হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল। হঠাৎ এমন কথার মানে বুঝল না। ঠোঁট ফুলিয়ে অভিমানী গলায় বলল,
“কি হয়েছে আপনার? সকাল সকাল এসব কথা কেন বলছেন?”
আদনান কোনো উত্তর দিল না। সোজা ঘরে এসে দরজাটা লাগিয়ে দিল। খুব সাবধানে আহিয়াকে সোফায় বসাল।
আহিয়া এবার সত্যিই অস্বস্তি অনুভব করল। আদনানের ফর্সা মুখটা রাগে টকটকে লাল হয়ে আছে। চোখদুটো রক্তিম। চোয়াল শক্ত। সে খুব কষ্টে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে বলল,
“আমি তোকে মেডিসিন দিয়েছিলাম। খাসনি কেন?”
আহিয়া থমকে গেল। আদনান এবার কণ্ঠ উঁচু করল,
“বোকা পেয়েছিস আমাকে? মেরে ফেলতে চাস?”
আহিয়ার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

“ম- মানে!”
আদনান পকেট থেকে প্রেগন্যান্সি কিটটা বের করে সামনে ধরল। তার চোখে তখন ভয়, রাগ, অসহায়তা সব মিলেমিশে এক অদ্ভুত তীব্রতা। চাপা গলায় বলল,
“এটা কী আহি?”
আহিয়া মাথা নিচু করে নিল। আদনানের হাতে ধরা প্রেগন্যান্সি কিটটার দিকে আর একবারও তাকানোর সাহস হলো না তার। ছোট্ট করে ঠোঁট কামড়ে বসে রইল শুধু। যেন ধরা পড়ে যাওয়া কোনো অপরাধী। আদনান সব বুঝে গেল। সে রোজ নিজ হাতে আহিয়াকে বার্থ কন্ট্রোল মেডিসিন দিত, অথচ মেয়েটা চুপচাপ সেগুলো না খেয়ে লুকিয়ে ফেলে দিয়েছে। ইচ্ছে করেই। কারণ সে মা হতে চায়।
আজ সকালে টেস্ট করতেই পজিটিভ এসেছে। সেই আনন্দটা বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিল আহিয়া।আদনানকে এখনই বলবে না ভেবেছিল। কিন্তু তার আগেই সব জেনে গেল। আদনান কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে আহিয়ার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। আহিয়া চোখ তুলল না। আদনানের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল।মেয়েটা তাকে ভয় পাচ্ছে।।সে খুব আলতো করে আহিয়ার গালে হাত রাখল। কণ্ঠস্বর নরম হয়ে এলো মুহূর্তেই, কষ্টভরা গলায় বলল,

“আহি… কেন করলি এটা? আমি তোকে বারণ করেছি না? তাহলে কেন এমন পাগলামি করলি?”
একটু থামল। চোখদুটো লাল হয়ে উঠছে আবার।
“তোর কোনো আইডিয়া আছে তোর মা হওয়া কতটা রিস্কি? আমি তোকে নিয়ে কোনো রিস্ক নিতে চাই না আহি। একটু তো আমাকে বোঝার চেষ্টা কর। আমি তোকে ছাড়া থাকতে পারব না।”
আহিয়া এবার ধীরে ধীরে মুখ তুলল। চোখে টলটলে পানি।
কিন্তু সেই পানির মাঝেও জেদ আছে। অভিমান আছে।
ভালোবাসা আছে। সে খুব আস্তে বলল,
“কিন্তু আমি বেবি চাই…”

আদনান চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। আহিয়া এবার কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে লাগল,
“আমার বেবি চাই। আপনি কেন বুঝতে পারছেন না আমার বেবি চাই। মা হওয়া প্রতিটা মেয়ের স্বপ্ন।”
তার চোখ বেয়ে টুপ করে পানি গড়িয়ে পড়ল।
“আমি চাই আপনার অস্তিত্ব বহন করতে। অনুভব করতে।”
আদনান নিঃশ্বাস ফেলল গভীর করে। আহিয়া এবার আরও কাছে সরে এলো। গলায় শিশুসুলভ অভিমান।
“এবার যদি আপনি কিছু করতে চান না… তাহলে কিন্তু আমি বাড়ি ছেড়ে চলে যাব। আপনাকে ছেড়ে চলে যাব। সবকিছু ছেড়ে চলে যাব।”
“থ্রেট দিচ্ছিস?”
“হ্যাঁ।”
“আমি তো এমনিতেই তোকে হারানোর ভয়ে থাকি। এমন করলে তো হার্ট অ্যাটাক করে মরে যাব।”
তারপর খুব আস্তে আহিয়ার পেটের দিকে তাকাল। চোখের দৃষ্টি কেমন বদলে গেল। ভয় মেশানো কোমলতা।
“তখন আমার বেবিটার কী হবে?”
আহিয়া সঙ্গে সঙ্গে মুখ ফুলিয়ে বলল,
“আপনার না। ও আমার বেবি। আপনি তো বেবি চান না।”

আদনান শুধু তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। কি করে বোঝাবে সে আসলে বেবিকে অপছন্দ করে না? সে শুধু ভয় পায়।
ভীষণ ভয় পায়। কারণ এই পৃথিবীতে আহিয়ার চেয়ে মূল্যবান কিছু নেই তার কাছে। একটা বাচ্চা আসবে, তারপর যদি সেই বাচ্চাকে পৃথিবীতে আনতে গিয়ে আহিয়া… না। ভাবতেও পারে না সে। তবুও এসবের কিছুই বুঝতে দিল না আহিয়াকে। বরং ধীরে ধীরে তাকে নিজের কাছে টেনে আনল। আহিয়া বাধা দিল না। আদনান খুব আলতো করে তার ঠোঁটে দুটো ছোট্ট চুমু খেল। কপাল ঠেকিয়ে নরম গলায় বলল,
“আমি চাই না তো কী হয়েছে? আমার বউ তো চায়।”
তারপর আরও নিচু স্বরে যোগ করল,
“আর আমার বউয়ের বাচ্চা মানেই তো আমার বাচ্চা। তাই না?”
আহিয়ার বুকটা কেমন হালকা হয়ে গেল। সে আনমনে আদনানের শার্টের বোতাম নিয়ে খেলতে খেলতে নিচু গলায় বলল,

“এবার… সব ঠিক হবে তো?”
আদনান দুহাতে আহিয়ার মুখ তুলে নিজের দিকে তাক করল। তার কণ্ঠে দৃঢ়তা।
“আল্লাহ চাইলে হবে। আমি আমার সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করব। ভরসা রাখ আমার উপর।”
আহিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে আদনানের গলা জড়িয়ে ধরল।
চোখ বন্ধ করে গা এলিয়ে দিল তার বুকে। এই বুকটাই তো তার সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। আহ্লাদী স্বরে ডাকল,
“আদনান।”
আদনান ওর গলায় মুখ গুঁজে নাক ঘষতে ঘষতে বলল,
“বলো, শুনছি।”
আহিয়া চোখ বন্ধ রেখেই ফিসফিস করল,
“আই লাভ ইউ্যু”
আদনান হেসে ফেলল। ভীষণ তৃপ্তির একটা হাসি।
মনে হলো এই এক মুহূর্তেই তার পুরো জীবনটা পূর্ণ হয়ে গেছে। তার তো চাওয়াই ছিল খুব ছোট্ট, এই মেয়েটা।
শুধু এই মেয়েটা। সে আহিয়ার দুই গালে আলতো হাত রেখে মুখটা তুলে ধরল। গভীর চোখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর নেশাভরা নিচু কণ্ঠে বলল,
“আই লাভ ইউ টু, আহি। ইন এক্সেস ফর এভরিথিং… আই অনলি লাভ ইউ।”
আহিয়ার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। এই মানুষটা যখন গম্ভীর মুখে ভালোবাসার কথা বলে, তখন কেন যেন পৃথিবীর সব ভয় দূরে সরে যায়। মনে হয়, সে পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী নারী।

মীর হাউজে সন্ধ্যা নামার আগ থেকেই ঈদের আমেজ নেমে এসেছে। হলঘরের ঝাড়বাতির উজ্জ্বল আলো, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা সেমাই আর পায়েশের গন্ধ, বাচ্চাদের ছুটোছুটি, সব মিলিয়ে পুরো পরিবেশটাই উৎসবমুখর। ঈশানী বিকেলেই মাহিকে নিয়ে চলে এসেছে। আর একটু আগেই শাহীন নীলাকে নিয়ে ঢুকেছে বাড়িতে। এখন সবাই মিলে হলঘরের কার্পেটের উপর গোল হয়ে বসে মেহেদি পরছে। আহিয়া খুব মনোযোগ দিয়ে নীলার হাতে মেহেদি দিচ্ছিল ল। যদিও নীলা প্রথম থেকেই না না করছিল। কিন্তু আহিয়া কি আর ছাড়ার পাত্রী!
অবশেষে জোরাজুরিতেই রাজি হয়েছে নীলা। তবে বিপদ একটাই। তার এক বছরের মেয়েটা বারবার কান্না করে উঠছে। মায়ের কোলে উঠতে চাইছে। অথচ নীলার এক হাতে টাটকা মেহেদি, অন্য হাতে কোনোমতে বাচ্চাকে সামলাচ্ছে সে। মেয়েটা আবার মা-বাবা ছাড়া অন্য কারও কোলে যেতেই চায় না। ঠিক তখনই লাইব্রেরি রুম থেকে বেরিয়ে এলো শাহীন। এতক্ষণ সে আমজাদ মীর, আসফাক মীর আর আহাদ রাজার সাথে গুরুত্বপূর্ন আলোচনা করছিল। কিন্তু মেয়ের কান্নার শব্দ কানে আসতেই আর বসে থাকতে পারেনি। তাকে দেখে নীলা অপ্রস্তুত গলায় বলল,

“আসলে আমি মেহেদি দিতে চাইনি… আহিয়া জোর করল তাই…”
শাহীন খুব শান্ত গলায় বলল,
“ইট’স ওকে নীলা। তুমি সাফাকে আমার কাছে দাও। আমি দেখছি।”
নীলা মেয়েটাকে তুলে দিল শাহীনের কোলে। আর আশ্চর্যজনকভাবে সাফা সঙ্গে সঙ্গেই চুপ হয়ে গেল।
ছোট্ট মাথাটা বাবার বুকের সাথে এলিয়ে দিয়ে গা লেপ্টে রইল। যেন এটাই তার পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা।
শাহীন খুব যত্ন করে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে একপলক তাকাল নীলার হাতের দিকে। গাঢ় মেহেদির নকশার মাঝখানে ইংরেজি গোটা গোটা অক্ষরে খুব সুন্দর করে লেখা “SHAHEEN”
কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল সে। অদ্ভুত এক প্রশান্তি নেমে এলো বুকের ভেতর। তার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হালকা হাসি ফুটল।

“সুন্দর লাগছে।”
নীলা চমকে তাকাল, “কি?”
“তোমার হাতে আমার নামটা… সুন্দর লাগছে। মানিয়েছে বেশ।”
মুহূর্তেই নীলার গাল লাল হয়ে উঠল। আজকাল শাহীন প্রায় সবকিছুতেই তার প্রশংসা করে। কখনো শাড়ি নিয়ে, কখনো চুল নিয়ে, কখনো হাসি নিয়ে। আর এসব শুনলেই কেমন ভীষণ লজ্জা লাগে নীলার। সে দ্রুত চোখ নামিয়ে ফেলল। পাশে বসা আহিয়া আর রিদিতা মুখ টিপে হাসছে। শাহীন সেটা দেখেও কিছু বলল না। শুধু মেয়েকে বুকের সাথে আরও একটু জড়িয়ে নিয়ে আবার লাইব্রেরি রুমের দিকে চলে গেল।
ঠিক তখনই হলঘরে এসে প্রবেশ করলেন আফরোজা শেখ। তার চিরচেনা রাজকীয় ভঙ্গিতে কিংসাইজের চেয়ারটায় বসতেই অরিতা দৌড়ে গিয়ে তার কোলে উঠে পড়ল। হাতদুটো সামনে বাড়িয়ে উচ্ছ্বসিত গলায় বলল,
“গ্র্যান্ড মা, দেকু! আমি থুন্দর লাগিয়েছি!”
আফরোজা শেখ হেসে নাতনির হাত ধরে আদুরে স্বরে বললেন

“বাহ! আমার পুতুলটাকে তো খুব সুন্দর লাগছে। কে দিয়ে দিয়েছে?”
“ফুপ্পি!”
“ফুপ্পি?”
অরিতা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল। এদিকে আব্রাহামও পিছিয়ে থাকার ছেলে না। সে গিয়ে মায়ের কোলে উঠে বসে বলল,
“মাম্মাম, আমিও দিব। আমিও দিব মাম্মাম!”
পাশ থেকে আদিবা হেসে বলল,
“আব্র, ছেলেরা তো মেহেদি লাগায় না। দেখনি তোমার পাপা লাগায়নি, চাচু লাগায়নি?”
আব্রাহাম সঙ্গে সঙ্গে মুখ গোমড়া করে ফেলল। নাকের ডগা ফুলিয়ে বলল,
“বেশি থতা বব্বা না! তোমার নতশা পাল্তায়া দিব!”
এক মুহূর্তের জন্য সবাই হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল তার দিকে। অতঃপর একসাথে হো হো করে হাসিতে ফেটে পড়ল সবাই। ঈশানী তো হাসতে হাসতে বলল,
“রিদি, তোর ছেলে তো বাপের থেকেও এক ডিগ্রি উপরে!”
রিদিতা বিরক্ত মুখ করে বলল,
“হবে না? হাতে-কলমে সব শয়তানি শিক্ষা দিচ্ছে। বজ্জাত বেডা একটা!”
“রিদি!”
উপরতলা থেকে তক্ষনই আহাদ রাজার গম্ভীর ডাক ভেসে এলো। সবাই চমকে তাকাল। আহাদ সিঁড়ির ধারে দাঁড়িয়ে নিচের দিকে তাকিয়ে আছে।
“উপরে আসো। কুইক!”

রিদিতা বুঝে গেল, এখন না গেলে বিপদ আছে। যদিও সে এখনও রেগে আছে মন্ত্রী মশাইয়ের উপর। কিন্তু সবার সামনে সেটা প্রকাশ করার ইচ্ছে নেই তার। আর আহাদ রাজা যদি দ্বিতীয়বার ডাকে, তাহলে পুরো বাড়ির সামনে নাটক শুরু করবে। সে চাচি আম্মাকে বাচ্চাদের দেখার কথা বলে উপরে উঠে গেল। ঘরে ঢুকতেই দরজা বন্ধ করে দিল আহাদ।।একটানে রিদিতাকে দরজার সাথে চেপে ধরল। গলায় বিরক্তি মেশানো চাপা রাগ।
“এই আল্লাহর বান্দি, এই! একবার ডাকলে কথা কানে যায় না?”
রিদিতা মিনমিন করে বলল,
“কোথায়… এক ডাকেই তো আসলাম।”
“ফোন কোথায় তোমার? কতবার মেসেজ দিয়েছি দেখেছো?”
“নিচে সবাই ছিল… তাই খেয়াল করিনি। আপনি কেন ডেকেছেন, সেটা বলুন।”
“মাথা ব্যথা করছে। একটু টিপে দাও তো।”
এই বলে সে রিদিতাকে বিছানায় বসিয়ে মাথাটা তার কোলে রেখে দিল। রিদিতা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপচাপ মাথা টিপে দিতে লাগল। এটা তাদের প্রতিদিনের অভ্যাস। দিন শেষে এই মানুষটার মাথা এসে ঠেকে তার কোলেই। আহাদ চোখ বন্ধ করেই হঠাৎ নিচু স্বরে ডাকল,

“জানু।”
“হুম?”
“আমার খারাপ লাগছে।”
রিদিতা চিন্তিত হয়ে বলল, “কফি খাবেন?”
“না।”
“তাহলে চা?”
“চা-কফি কিছুই খাব না।”
“তাহলে কি লাগবে?”
আহাদ ধীরে ধীরে তার হাতটা ধরে নিজের বুকের উপর চেপে ধরল। গলার স্বর নেশামাখা।
“আই নিড ইউ, জানু… ইমিডিয়েটলি।”
রিদিতার বুক ধক করে উঠল। আহাদ আরও নিচু স্বরে বলল,
“আমার বুকটা কেমন করছে দেখো! প্রতিটা স্পন্দনে শুধু জানু জানু করছে।”
রিদিতা সঙ্গে সঙ্গে হাত সরিয়ে নিল। মুখ গম্ভীর।

“লাভ নেই।”
“কেন? তোমার পিরিয়ড শুরু হয়েছে?”
“না।”
“তাহলে সমস্যা কোথায়?”
রিদিতা ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
“আপনি বলেননি? আমি নিরামিষ। তাহলে এখন আমাকে চাইছেন কেন?”
আহাদ ঠোঁট চেপে হাসি সামলাল। তারপর আরও উসকে দিয়ে বলল,
“তুমি নিরামিষ না?”
“উহু। মোটেও না।”
“ওকে ফাইন।”
আহাদ ধীরে ধীরে উঠে বসল। তারপর প্রেয়সীর চোখে চোখ রেখে ফিসফিস করে বলল,
“দেন প্রুভ ইট।”

কথাটা যেন সরাসরি গিয়ে লাগল রিদিতার অহমে। সে কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। তারপর আচমকাই নিজের ওড়নাটা দূরে ছুড়ে ফেলল। আহাদ ভ্রু তুলে তাকাল। পরমুহূর্তেই রিদিতা তার শার্টের বোতাম খুলতে শুরু করল। যেন নিজের সমস্ত অভিমান, রাগ আর ভালোবাসা একসাথে উজাড় করে দিতে চাইছে। আহাদের প্রশস্ত বুকে ঝুঁকে ছোট ছোট উষ্ণ চুমু এঁকে দিতে লাগল সে। আহাদ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল শুধু। তার বুকের ভেতরটা কেমন উথালপাথাল করছে। শার্টটা খুলে ফেলে দিয়ে রিদিতা তার বুকের উপর উঠে বসল। ঝুঁকে গিয়ে গলার কাছে একটা উষ্ণ চুমু রাখল।
আহাদ বুঝতে পারল, তার কথাটা সত্যিই রিদিতার ইগোতে লেগেছে। তবে সেটা যে তার জন্য এমন সুখকর হবে, ভাবেনি। সে আলতো করে রিদিতার পিঠে হাত রাখল। আঙুলের স্পর্শে মেয়েটা শিউরে উঠে আচমকাই তার গলার ডানপাশে একটা জোরে কামড় বসিয়ে দিল। আহাদ চোখ বন্ধ করে শ্বাস ফেলল। কিন্তু প্রতিবাদ করল না। বরং আরও কাছে টেনে নিল তাকে। প্রেয়সীর সরু ওষ্ঠদ্বয় নিজের চওড়া ঠোঁটে চেপে ধরল। বিচরন করল ইচ্ছে মতো। রিদিতা হাসফাস করতে লাগল। হাত মুঠো হয়ে শক্ত হলো আহাদের চুলের ভাজে। কয়েক মুহূর্ত পর আহাদ তাকে ছেড়ে দিয়ে কপালে কপাল ঠেকিয়ে নিচু স্বরে ডাকল,

লাল শাড়িতে প্রেয়সী শেষ পর্ব

“রিদি!”
রিদিতা আধো নিশ্বাসে সাড়া দিল, “হুঁ”
আহাদ নাক ঘষে ফিসফিস করল,
“আরও দুটো ব্যাঙের বাচ্চা আনলে মন্দ হয় না, বলো?”
রিদিতা সঙ্গে সঙ্গে মাথা তুলে তাকাল। চোখ বড় বড়।
এই দুটোকে সামলাতেই তার প্রাণ বের হয়ে হয়ে যায়।
এখন আবার দুটো!

লাল শাড়িতে প্রেয়সী সারপ্রাইজ পর্ব ২