শান্তি সমাবেশ পর্ব ১১+১২
সাইয়্যারা খান
— দেখ সাফারাত আমার থেকে দূরে দূরে থাকার চেষ্টা কর। সেটা তোর জন্য ও ভালো আমার জন্য ও।
–সাফারাত? তুই আমাকে সাফারাত বলে কবে থেকে ডাকিস?
— যে দিন… বাদ দে। আমার জীবনে রাত নামক বন্ধু আগেই মরে গিয়েছে। এখন যে আছে সে শুধুই সাফারাত। সাফারাত মির্জা।
–পূর্ণ আমার কথাটা শুন। চাইলে আমরা এখনও…
— একদম চুপ জা*নো*য়া*রে*র বাচ্চা৷ চাইলে কি হ্যাঁ? কি? আমাকে মানুষ চিনাস তুই? তোর ঐ *** বাচ্চা বাপ’কে বলিস রাজনীতি করে সে চুল সাদা করলেও পূর্ণ’কে টেক্কা দিতে দম লাগবে।
— দেখ পূর্ণ মুখ খারাপ করবি না। ভালোভাবে কথা বল। বুঝি না এত গালি কবে শিখলি তুই?
— এই যা তো। যা।
বিরক্তির স্বরে পূর্ণ এটা বলতেই সাফারাত মজার ছলে চেয়ারটা পূর্ণ’র কাছে টেনে বসলো। ঝট করে উঠে দাঁড়িয়ে গেল পূর্ণ। সাফারাত এতে বেশ ভালোই চমকালো। এখন কি পূর্ণ তাকে এতটুকুও সহ্য করতে পারছে না? সাফারাত কিছু বলার আগেই জঘণ্য কান পঁচা গালি দিলো পূর্ণ। সাফারাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো। গায়ের পাঞ্জাবি টেনে ঠিক করে বেশ শান্ত স্বরে বললো,
–আয় না পূর্ণ এককাপ চা খাই। অনেকদিন খাই না।
পূর্ণ মুখ খুলার আগেই সাফারাত বলে উঠলো,
— কাউকে গালি দিলে এমনকি সেটা মজা করে হলেও এক গালির বিনিময়ে একটা করে বিচ্ছু তৈরী হয় কবরে। আমাকে গালি দিলে ক্ষতি কিন্তু তোর হবে।
পূর্ণ নিজেকে দমন করার চেষ্টা চালালো। সে এমন নয়। কথা যথেষ্ট মেপে বলা ছেলে সে। বড় বড় শ্বাস টেনে নিজেকে ঠান্ডা করে বললো,
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
— আমার থেকে দূরে থাক সাফারাত। তুই সারারাত মির্জা আমার কাছে রাত না। রাত’কে যতটা ভালোবাসতাম ঠিক তার দ্বিগুণ ঘৃণা করি এখন এই সাফারাত’কে।
সাফারাতে’র মতো শক্ত পুরুষটার চোখে পানি জমলো। কথাটা বেশ ভারি। পূর্ণ কিভাবে বললো এতটা ভারি কথা? মুখটা কাঁপলো না। সাফারাতের ফর্সা মুখটা লাল হওয়া ধরলো যেটা পূর্ণ খেয়াল করেছে। হাতে থাকা পানির বোতলের পুরোটা ওর মাথায় ঢেলে ঝাঁঝালো কণ্ঠে বললো,
— জাস্ট দূরে থাকবি আমার থেকে।
কথাটা বলেই গটগট পায়ে চলে গেল। মৃত্তিকা’র সাথে দেখা করতে হবে। এছাড়াও আজ একজন সংসদ সদস্য ডেকেছে তাকে দেখা করতে পার্সোনাল ভাবে। পূর্ণ’র জন্য বড়সড় একটা অপরচুনিটি এটা যা কোনভাবেই মিস করা যাবে না।
পূর্ণ’র যাওয়ার দিকে অপলক তাকিয়ে রইলো সাফারাত। “পুরুষ কাঁদে না” কথাটা মিথ্যা করে দিয়ে সাফারাতে’র চোখ গলিয়ে আবারও পানি পরলো। একটু কাঁদা দরকার তার। ত্রস্ত পায়ে ছুটে গাড়িতে বসলো। স্টেরিং এ মাথা ঠেকিয়ে কেঁদেও ফেললো। এতবড় শরীরটা কান্নার প্রকোপে কেঁপে কেঁপে উঠল।
পেছনে তার দলের কয়েকজন। জুহান পানির বোতলটা সাফারাত’কে এগিয়ে দিয়ে বললো,
–ভাই পানিটা খান।
— আপনার এই ভীত চাহনি আমার বেশ লাগে মৃত্ত।
কথাটা বলেই পকেটে ফোনটা রাখলো। মৃত্তিকা তখনও গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পূর্ণ একপলক মৃত্তিকা’কে দেখে নিলো। একপলক হলেও দেখেছে পুরোটা। মাথায় একটা ঝুঁটি করে নিজের কোঁকড়ানো চুলগুলো একসাথে আটকে রেখেছে। অবাধ্যগুলো কেও ছাড় দেয় নি। ক্লিপ দিয়ে আটকে রেখেছে। শ্যামলা মুখটা সুন্দর। ভয়ংকর সুন্দর। পূর্ণ’র হৃদয় পোড়ানো সুন্দর। হালকা রঙের গোল ফ্রকটা বেশ মানিয়েছে তাকে। পূর্ণ’র অবাধ্য পুরুষ মনটা বলে, “দে না পূর্ণ একটু ছুঁয়ে দে। কি হবে একটু ছুঁয়ে দিলে?”
পূর্ণ ধমকায় সেই অবাধ অনুভূতিকে, “মোটেও না। আমার সকালের অঝড়া ফুল এই মৃত্ত। একে ছুঁয়ে যদি ঝড়ে পরে?” ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো পূর্ণ।আজকাল অনুভূতি’রা জ্বালায় তাকে। একটু ঝুঁকতেই মৃত্তিকা পিছিয়ে গেলো। পূর্ণ বিরক্ত হলো বটে। আরেকটু এগিয়ে মৃত্তিকা’র চুলে আলগা হওয়া ক্লিপটা পট করে শব্দ তুলে লাগিয়ে দিলো। মৃত্তিকা স্বস্তি’র শ্বাস ফেললো। পূর্ণ ঘড়িতে একবার দেখে বললো,
— আজকে একটা মিটিং আছে মৃত্ত। আপনি কথা বলুন প্লিজ। আমার কান দুটো যে আপনার কন্ঠ শুনার জন্য ব্যাকুল হয়ে আছে। একটু কিছু বলুন।
মৃত্তিকা ঢোক গিললো। এমনিতেই ভয় পায় পূর্ণ’কে। দুই দিন ধরে কেমন কেমন অনুভূতি গুলো জন্মালেও তা দমিয়ে রেখেছিলো। আজ সকালে ভার্সিটি আসার পরই সকল অনুভূতি গুলো ভয়ে রুপ ধারণ করেছে।
–ইশিতা আপু আ*ত্ম*হ*ত্যা করতে চেয়েছিলো। এর পেছনে কি আপনার হাত আছে?
ভয়ে ভয়ে প্রশ্নটা করেই ফেললো মৃত্তিকা। পূর্ণ স্বাভাবিক ভাবে বললো,
— আমি কি খু*নি মৃত্ত?
সারাদেহ কেঁপে উঠল মৃত্তিকা’র। তড়িৎ গতিতে বলে উঠলো,
— না না আমি সেটা বলি নি।
— তাহলে কি বলেছেন মৃত্ত?
— আ…আমি।
— আপনি আবারও তোঁতলাচ্ছেন কেন?
— কই নাতো।
— হু ভালো।
কিছুক্ষণ নীরবতা পালন হলো। বিস্তর এই নীরবতা ভেঙে পূর্ণ বলে উঠলো,
— শুনলাম গতকাল ওর কোন ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। হয়তো সহ্য করতে না পেরে সুইসাইড করতে চেয়েছে।
একটু থেমে আবারও বললো,
— সেসব বাদ দিন মৃত। খারাপের সাথে খারাপ হবে। তাই না?
— কিন্তু।
— কোন কিছু না মৃত্ত। চলুন আমার সাথে।
মৃত্তিকা দাঁড়িয়ে রইলো ঠাই। মাথা খালি খালি লাগছে ওর। কিছুক্ষণ পরই খেয়াল করলো পূর্ণ গভীর চোখে ওকেই দেখছে। মৃত্তিকা হকচকালো।
–কি দেখেন?
পূর্ণ শীতলতা ঢালা গলায় বললো,
— আমি ম’রে গেলে রোজ আমার কবরে যাবেন মৃত্ত। আপনাকে দেখা আমার কোনদিন ও শেষ হবে না।
একটু থেমে জিজ্ঞেস করলো,
— বিচ্ছু ভয় পান মৃত্ত?
— না। আগে পেতাম। একদিন আব্বু মারা শেখালো।
— আপনার আব্বু ভালো একটা কাজ করেছে।
— কেন?
অবুঝ গলায় প্রশ্নটা করতেই পূর্ণ বলে উঠলো,
— আমার কবরে থাকা বিচ্ছু গুলো তাড়িয়ে দিবেন মৃত্ত। আমার ভয় লাগে ওটা। বলুন দিবেন? ওটা দেখতে পারি না আমি। ওটার সাথে কিভাবে থাকব আমি মৃত্ত। আপনি পাশে থাকলে ভয়টা কম লাগবে।
পূর্ণ’র র*ক্ষরণ কারী কথা শুনে হাত পা যেন আসার হয়ে আসছে। পূর্ণ’র কন্ঠে কিছু একটা ছিলো। কিন্তু কি? ছোট্ট বাচ্চার পাওয়া কোন ভয়? কান্না? আকুলতা? কি ছিলো? সহজ সরল মৃত্তিকা ঠিক ঠাওড় করতে পারলো না কিন্তু খেয়াল করলো ওর চোখ ভিজে উঠেছে৷ হয়তো পূর্ণ’র মৃত্যু’র কথা শুনে।
বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব থাকলেও বৃষ্টি’র দেখা নেই সারাদিন। মৃত্তিকা আলসেমি ঝেড়ে বারান্দায় গেলো। সেখানে ছোট বড় কিছু গাছের চারা আছে। তাতেই কয়েকটা ফুল ফুটেছে। সদ্য ফুটা ফুলগুলোকে বেশ যত্ন করছে মৃত্তিকা। হাতে তার পানি’র পাইপ। সেটা দিয়েই পানি দিচ্ছে। এই কাজ করতে গিয়ে নিজেকে ভিজিয়ে অনেকখানি। বুঝা দায় সে গাছে পানি দিয়েছে নাকি নিজেকে। বেশ আনন্দ সহিত কাজটা করছে সেটা স্পষ্ট। মনটা ও ফুরফুরা অনেক। ঐ দিন পূর্ণ’র ঐসব কথায় বেশ ভয় এবং অসস্তি’তে পরেছিলো ও। আজ পূর্ণ স্বাভাবিক ছিলো। তার স্বাভাবিক হওয়া মানে ঐ যে আগের পূর্ণ। মৃত্তিকা’র সাথে গম্ভীর অথচ ভালোবাসাময় আচরণ। কিছু কথায় দুষ্টামী যা ধরা দায়। কখনো বা কথার মাঝে লুকায়িত হাসি সেটাও বুঝা কষ্ট সাধ্য। মোট কথা চমৎকার ছিলো আজ দেড় ঘন্টা। এই সময়গুলোতে ও ছিলো পূর্ণ’র সাথে।
তাদের প্রেম চলে। অঘোষিত প্রেম। বুঝা যায় না। প্রেমময় আলাপ হয় না। হাত ধরাধরি হয় না। কাঁধে মাথা রাখা হয় না। কখনো হয়তো ভালোবেসে বুকে নেয়া হয় না। তবুও প্রেমটা কিন্তু চলছে। বেশ ডুবাডুবা প্রেম। অতলে হারিয়ে গেলেও পূর্ণ টেনে তুলে তাকে গম্ভীর স্বরে। অনুভূতি’র পাচার ঘটায় তারা কিন্তু খুবই সুক্ষ্ম ভাবে। মৃত্তিকা এখন কারো কথার ধার ধারে না। সিনিয়র কেউ ওকে জ্বালাতনও করে না। ইশিতার ব্যাপারটা পরে হিমু’র কাছে জানতে পেরেছিলো মৃত্তিকা। ইশিতার রিলেশন ছিলো কোন এক ছেলের সাথে। ঐ ছেলে ছিলো পূর্ণ’র দলের একজন। তাদের ই কিছু অতি গোপনীয় ছবি ভাইরাল হয়েছিলো ভার্সিটির বিভিন্ন গ্রুপে। সবসময় দাপটে চলা মেয়েটা হয়তো সহ্য করতে পারে নি নিজের এমন অপদস্ত হওয়া তাই বেঁছে নিয়েছিলো সহজ কিন্তু নিকৃষ্ট উপায়। ভাগ্যের জোরে বেঁচে এখন বাসায়ই আছে।
মৃত্তিকা’র শুনে আফসোস হয়েছিলো। পরক্ষণেই মনে পরেছিলো পূর্ণ’র বলা কথাটা, “খারাপের সাথে খারাপ ই হবে”।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজে পরে থাকা একটা অলকানন্দা কুড়িয়ে নিলো। পুরো তাজা ফুলটা কিভাবে যেন পরে গিয়েছে। হঠাৎ খেয়াল হলো আজ পূর্ণ’র বড় কোন কাজ আছে। সিটি’র মেয়রে’র সাথে কোন সেবামূলক কার্যক্রমে কথাবার্তা হবে। মৃত্তিকা মাঝেমধ্যে অবাক হয়। পূর্ণ নিজের অভ্যন্তরীণ সকল খুঁটিনাটি কাজের কথা সব জানায় মৃত্তিকা’কে। আসলে ওদের কথাবার্তা হয়ই এসব নিয়ে। পূর্ণ নিজের দলের কথা, কোথায় কি হবে, কবে হবে এসবই বলতে থাকে। মৃত্তিকা মনোযোগ দিয়ে তা শুনে। কেন না না বুঝা সেইসব বিষয় তার কাছে প্রচুর আকর্ষণীয় মনে হয়। আসলে মানুষটাই আকর্ষণীয় তার কাছে।
— আম্মা? কোথায় আপনি? মা বাবা খুঁজছি না? বেরিয়ে আসুন।
বারান্দা থেকেই গলা উঁচিয়ে জবাব দিলো মৃত্তিকা,
— আব্বু। এখানে আমি। বারান্দায়। আসো তুমি।
প্রায় মিনিটের ব্যবধানে ওর বাবা হাজির হলেন। হাতে একটা ছোট্ট ট্রে। সেটা বারান্দার টেবিলে রেখে মেয়ের হাত থেকে পানির পাইপ’টা নিয়ে সাইডে রাখতে রাখতে বললেন,
— কতক্ষণ ধরে ডেকে যাচ্ছি আপনাকে বাচ্চা। বাবা ভয় পাই তো।
— আমি তো এখানেই ছিলাম।
কথাটা বলতে বলতে বলতে গাছ থেকে একটা অলকানন্দা ছিঁড়ে বাবা’র কানে গুজে দিয়ে আহ্লাদী কন্ঠে বললো,
— দেখো আমরা সেইম সেইম।
মৃত্তিকা’র বাবা হাসলেন। চমৎকার হাসি তার। মেয়ের ডান হাতটা নিজের হাতে নিয়ে চুমু খেয়ে বললেন,
— ধন্যবাদ প্রিন্সেস।
মেয়ের মুখের হাসির দিকে কিছুক্ষণ অনির্মেষ তাকিয়ে রয়ে আদুরে গলায় বললেন,
— পুরো ভিজিয়ে ফেলেছেন নিজেকে আম্মা। বাবা অপেক্ষা করছি এখানে। যান চেঞ্জ করে আসুন।
মৃত্তিকা বাবা’র চোখের সামনে দুই আঙুল দেখিয়ে বললো,
— দুই মিনিটে আসছি আমি।
বলেই দৌড়ে। পেছনে বাবা’র কন্ঠের চমৎকার হাসিটা ও অগচড়ে শুনে নিলো।
ওর বাবা এক নজর বাইরে দিলেন পরপর ফুলের চাড়াগুলোতে। প্রত্যেকটা চাড়ায় তার মৃত্তিকা’র ছোঁয়া আছে। ছোট থেকেই মেয়েটা বাবা পাগল। একা পালার দরুন পেলেছেন ও ঠিক বুকে রেখে। চোখে’র পাতায় পাতায় রেখে। ক্লাস টেইন পর্যন্ত তো মৃত্তিকা ঠিক মতো নিজ হাতে খেতেও পারত না। অফিস থেকে দুপুরে এসে মেয়ে খায়িয়ে আবার যেতেন। কখনো কারো ভরসায় মেয়েকে ছেড়ে দেন নি। স্বার্থ, ক্ষমতা দুটোই ছিলো। ছিলো ভরা যৌবন। চাইলেই নারী সুখ বেছে নিতে পারতেন। তিনি বেছে ও নিয়েছেন। তার একান্ত নারী। তার মা। তার প্রিন্সেস। তার ছোট্ট রাজ্যের রাণী। তার বোকারাণী। মেয়েটা এখন পর্যন্ত চালাক হলো না। তিনি হতে দেন নি। থাক না রাবণ ভর্তি দুনিয়ায় কিছু রাম। বাজপাখির ভিরে থাকুক একটা বোকাপাখি। বাবা’র বাবুই পাখি।
এতসব ভাবনার মাঝেই মৃত্তিকা হাজির। একটা গোল গোল ছাপার ঢোলা প্যান্ট সাথে বড় সূর্য আঁকা একটা টিশার্ট পড়ে হেলেদুলে বাবা’র কাছে এসে একদম গা ঘেঁষে। মাথাটা রাখলো ঠিক বাবা’র বুকের কাছে। লম্বা লম্বা শ্বাস টেনে বললো,
— তোমার ঘ্রাণ আমার খুব ভালোলাগে আব্বু।
ওর বাবা মেয়ে’র মাথায় তখন হাত বুলাতে ব্যাস্ত। মৃত্তিকা অল্প মাথা তুলে আবারও বললো,
— আচ্ছা আব্বু তুমি বুড়ো না কেন? এত হ্যান্ডসাম আব্বু হয় কারো? তুমি কত সুন্দর।
মেয়ের মাথায় থাকা এবড়োখেবড়ো সিঁথিতে একটা চুমু খেয়ে উত্তরে বলে উঠলেন,
— আমার আম্মা যে সুন্দর তাই তার বাবা ও সুন্দর।
ট্রে তে থাকা কাপে চা ঢেলে বাপ-বেটি মজা করে খেলো। বিকেল। সুন্দর একটা বিকেল বিলাস একেই বলে। রং তুলির আঁচড়ে আঁকা সুন্দর একটা মিঠা মিঠা অনুভূতি জড়িত তাদের এই সময়।
হঠাৎ বাবার গলায় চমকালো মৃত্তিকা। বাবা শুধু মিঠি’র মাকে ডেকে বলেছেন তেল এনে দিতে। এতেই মৃত্তিকা লাফিয়ে কুদিয়ে উঠেছে। ওর হাতের কবজি বাবা’র বড় হাতের মাঝে আটকানো। নরম কন্ঠে অনুরোধ করে উঠলো মৃত্তিকা,
— আজকে তেল দিব না আব্বু।
— উহু কোন কথা নেই। আমার এত সুন্দর চুলগুলো কি করেছেন দেখেছেন?
— তোমার চুল এগুলো?
— হ্যাঁ।
মৃত্তিকা গাল দুটো ফুলিয়ে চুপ করে বসলো। ওর বাবা তখন ঠোঁট টিপে হাসছেন। আল্লাহ জানে কি সমস্যা এই মেয়ের। তেল দেখলেই লাফাবে। আবার চুল ঝড়া ধরলেই কাঁদো কাঁদো গলায় বাবা’কে বলবে,”আব্বু আমার চুল পড়ে যাচ্ছে”।
মেয়ের মাথায় তেল লাগিয়ে আঁচড়ে সুন্দর মোটা একটা বেণী করছেন তিনি। মিঠি’র মা মন ভরে দেখছেন সেই দৃশ্য। বাবা-মে একজন ছাড়া একজন থাকতে পারে না। মৃত্তিকা ফুলের দিকে তাকিয়ে আচমকা বলে উঠলো,
— আব্বু দেখো আমার ফুলগুলো দিন দিন সুন্দর হচ্ছে না?
— আপনার ফুল? কয়বেলা পানি দেন?
— এই যে আজ দিলাম।
বেশ গর্বের সহিত বললো মৃত্তিকা। ওর বাবা আনমনেই বলে উঠলেন,
— আপনিও আমার অনেক যত্নে ফুটানো একটা ফুল আম্মা যাকে একদিন অন্য কেউ এসে নিজের দাবি করে নিয়ে যাবে যদিও সে আপনার মতো এই একদিন গাছে পানি দেয়া মালি।
— নিজেকে ঠিক করো। এভাবে তোমার সাথে বেড় হতে লজ্জা লাগে আমার।
হিমু মাথা নামিয়ে রেখেছে। রুপা রুষ্ট কন্ঠে আবারও বলে উঠলো,
— গত কাল না বললাম আমার সিমে টাকা পাঠাতে? পাঠাও নি কেন? এতটুকু ও করা যায় না?
— টাকা ছিলো না সাথে।
— বেতন পাও নি?
এবার কিছুটা নরম কন্ঠে বললো রুপা। হিমু সস্তির শ্বাস ফেলে বললো,
— কত তারাতাড়ি রেগে যাও তুমি।
— কিছুটা।
— অনেকটা।
দুজনই হেসে ফেললো হঠাৎ। রুপা চিন্তিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
— পড়াশোনা কেমন চলে?
— এই তো ভালোই।
— হুম। আচ্ছা গত মাসের টাকাটা কি করেছো?
— উজ্জ্বল থেকে হাওলাদ নিয়েছিলাম। ওর টাকা ফরত দিলাম।
রুপা’র চোখে তখন ক্রোধ দেখা দিলো। উজ্জ্বল ছেলেটা অতিরিক্ত বাদর। ফাঁতরা স্বভাবের। রুপা’কে দেখলেই কেমন শয়তান শয়তান লুক দেয়। রুপা কিছুটা বিরক্ত হওয়া স্বরে বললো,
— ওর থেকে দূরে থাকবে একদম। সহ্য হয় না আমার ওকে একদম।
হিমু চুপ রইলো। চাইলেই কি এমন বন্ধুত্ব নষ্ট করা যায়? আবার রুপা ও কেন জানি উজ্জ্বল কে সহ্য করতে পারে না। উজ্জ্বল’টা রাগ চটা তবে নরম সত্তা’র। ওর ভাবনার মাঝেই রুপা বলে উঠলো,
— আমার একটা কাজ করতে পারবে হিমু?
হাতে চাঁদ পাওয়ার ন্যায় হাসলো হিমু। দুরবোধ্য হাসলো রুপা।
দলের কিছু কাজ শেষে বাড়ি ফিরবে পূর্ণ। আজ মেয়রের সাথে মিটিং ছিলো। এগুলো হলো ছোট ছোট ধাপ যা পার করছে পূর্ণ তার রাজনৈতিক জীবনটা শক্ত করতে। ঐ দিনের ঐ বো*মা হামলার কারণেই আজ সে মন্ত্রীদের নজরে নজরে। অবশ্য আগে থেকেই সে যথেষ্ট চর্চিত ছাত্রনেতা হিসেবে। এখন হয়তো একটু বেশি। এখন সন্ধ্যা। তার যেতে হবে কোচিং এ। মাসের টাকা তুলা হবে আজ। আগে কোচিং এ পড়াতো। ভালোই ইনকাম হতো। বছর দুই হতে চলছে সে নিজের কোচিং সেন্টার খুলেছে। সেখানে স্টুডেন্ট ও অনেক। সাইড ইনকাম থেকে এখন মেইন ইনকাম সেটা। বাইকে উঠতেই নীল তাদের দলের একজন ছেলে বলে উঠলো,
— ভাই সাফারাত মির্জা আসছে এ দিকে।
প্রচন্ড বিরক্তিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলো পূর্ণ। এমনিতেই আজ মৃত্তটার সাথে বেশি সময় কাটাতে হয় নি৷ মেজাজ তাই বেজায় খারাপ। এখন আবার কি না এই উটকো ঝামেলা। পাঞ্জাবীর হাতাটা গুটাতে গুটাতে বাইকে চাবি ঘুরাতেই তার দলের ছেলে পুলেরাও নিজেদের বাইকে উঠে পরলো। পূর্ণ গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলো,
— আমি কোচিং এ যাচ্ছি। তোরা যা এখন।
পূর্ণ ভক্ত ছেলেপুলে’রা গেলো না। তাদের ভাই আগে থাকে তারা থাকে পেছনে। সেখানে ভাইকে রেখে একা যাবে না তাও কি না সামনে আসছে সাফারাত মির্জা। পূর্ণ ওদের যেতে না দেখে কিছুটা চাপা ধমক দিতেই তারা বাইকে ঘুরালো। পূর্ণ জানে সবগুলো অলি গলি তেই থাকবে। পূর্ণ’র যথেষ্ট বাধ্য বলে কথা মানতে সরেছে শুধু।
সাফারাত এগিয়ে একদম পূর্ণ’র সামনে দাঁড়িয়ে হাসি মুখে সালাম দিয়ে বললো,
— কোথায় যাচ্ছিস পূর্ণ?
— তোর কবর খুঁড়তে।
বেশ শান্ত স্বরে বলে উঠলেও সাফারাত গায়ে মাখলো না। ও জানে পূর্ণ কেমন। কিছু না বলে সোজা পূর্ণ’র বাইকের পেছনে বসতেই পূর্ণ থমকে গেলো। সাফারাতও নাছোরবান্দা। ও জানে পূর্ণ বাইক চালাবে না তাই পেছন থেকে কোমড় আঁকড়ে ধরে বসে রইলো। এবার যেন পূর্ণ হতভম্ব হয়ে গেল সাফারাতের এহেন আচরণে। দাঁত চেপে শাসিয়ে উঠলো,
— নাম আমার বাইক থেকে। নাম বলছি। আর ছাড় আমাকে।
সাফারাত নামবে তো দূর উল্টো জড়িয়ে ধরলো পেছন থেকে। দুষ্টামীর স্বরে বললো,
— দোস্তানা…..
— জাস্ট স্যাট আপ রাত…
সাফারাত’কে থামিয়ে কথাটা বলতে গিয়েও থেমে গেলো পূর্ণ। মুখ ফসকে রাত নামটা বেরিয়ে গিয়েছে। সাফারাতের চোখ ভিজে উঠলো যেন। হোক না মুখ ফুসকে তবুও তো আজ এত বছর পূর্ণ রাত নামে ডাকলো ওকে। নিজেকে সামলে সাফারাত বলে উঠলো,
— সামনে গিয়ে বামে। এরপরই চাচার টঙ। চল চা খাই।
বিনিময়ে গালির দুইটা অক্ষর উচ্চারণ করেও থেমে গেলো পূর্ণ। বাইক ঘুরিয়ে টানলো টঙের দোকানে।
সামনা সামনি বসে আছে দুইজন। দু’জনের হাতেই চায়ের কাপ। পূর্ণ নিজের মতো চুমুক বাসাচ্ছে। সাফারাত হঠাৎ ই বলে উঠলো,
— কি লাভ হলো ঐদিন বো*মা মেরে?
পূর্ণ চমকালো না। ও জানতো সাফারাত বুঝে যাবে যে এই কাজ পূর্ণ’ই করেছে। পূর্ণ’র নির্লিপ্ততা দেখে সাফারাত যথেষ্ট গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
— তোর ও তো ক্ষতি হতে পারত পূর্ণ। কেন করেছিলো এমন? নামটা আমার পরলো। কতটা হ্যাসেল পোহালাম। মানুষ মা*রা যেতে পারত পূর্ণ।
— মরে নি কেউ।
— যদি মরতো?
— সেই সুযোগ রাখিনি।
বলেই পন্চাশ টাকা টঙে’র দোকানে’র চাচাকে দিয়ে চলে গেল। সাফারাত দীর্ঘ শ্বাস ফেলে দোকানের চাচা’র দিকে তাকিয়ে বললো,
— চাচা চা দুই কাপ বিশ টাকা। আমার বন্ধু তো দিলো পন্চাশ টাকা। বাকি ত্রিশ টাকা ফেরত দিন।
দোকানী মুখটা ভার করে টাকা ফেরত দিলেন। সাফারাত পকেটে টাকা ভরে সামনে চললো৷ দোকানদার বেশ অবাক এমন আচরণে। দেখে তো কত বড়লোক মনে হয় অথচ ত্রিশ টাকা ছাড়লো না।
— সামনের মাসে পরিক্ষা শুরু। আপাতত সব থেকে বিরত থাকব। হয়তো দেখা হবে না অনেকদিন। আশা করি আমার জন্য হলেও নিজের খেয়াল রাখবেন৷ অবশ্য আমি জানি আপনার আব্বু আপনার জন্য যথেষ্ট তবুও আমার জন্য নিজের প্রতি যত্ন নিবেন। ভার্সিটি আসবেন। পড়বেন। চলে যাবেন। কারো সাথে কোথাও ঘুরতে যাবেন না। ঠিক আছে? আর হ্যাঁ উজ্জ্বল আর হিমু তো আছেই ওদের সাথে থাকবেন। আমি কি বুঝাতে পারলাম?
মৃত্তিকা’র কান কথাগুলো শুনতেই মস্তিষ্কের নিউরনে উদ্দীপনা সৃষ্টি হলো। এক ঝটকায় বুঝে গেলো একমাস। টানা একমাস পূর্ণ’র দেখা মিলবে না। এটাই শেষ বর্ষ তার। এককথায় বলা যায় ছাত্র জীবনের সমাপ্তি। যদিও মানুষ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ছাত্র থাকে। শিক্ষা মানুষ আমৃত্যু গ্রহণ করতে থাকে। কিন্তু ধারাবাহিক শিক্ষার সমাপ্তি এখানেই পূর্ণ’র। মৃত্তিকা’র বেজার হওয়া মুখটা দেখে পূর্ণ গম্ভীর কণ্ঠে শাঁসালো,
— আমি কি আপনার মন খারাপ করতে এসব বলেছি মৃত্ত?
মৃত্তিকা মাথা নাড়লো। পূর্ণ এবার কিছুটা রাগ চাপার চেষ্টা করলো। ঠান্ডা স্বরে বুঝাতে চাইলো,
— বেশি দিনের ব্যাপার না মৃত্ত। আসলে আমি সারাবছর তেমন পড়াশোনা করি না। এত কাজের চাপে হয়ে উঠে না। পরিক্ষার আগে যথেষ্ট সিরিয়াস হয়ে যাই।
— তাতেই এত ভালো সিজিপিএ আসে?
— আসে তো। একেকজন একেকভাবে পড়াশোনা করে মৃত্ত।
— হুম।
— আচ্ছা। আমার পূর্ণময়ীর মন ভালো করতে এই পূর্ণ কি করতে পারে?
— ঘুরতে চলি?
— প্রেম করতে চাইছেন। কিন্তু আমি তো আগেই বলেছি আমার দ্বারা প্রেম হবে না।
মৃত্তিকা থতমত খেলো। সেই ভাব কাটিয়ে উঠতে নিলেই পূর্ণ আবার বলে উঠলো,
— আপনার অনেক সখ প্রেম করার অথচ কপালে জুটলাম কি না আমি। আফসোস হয় মৃত্ত? হলেও লাভ নেই। আমাকে নিয়েই থাকতে হবে। অন্য কোন চিন্তা থাকলে তার দাফন দিন নাহয় আমি দিয়ে দিব৷ কথাটা জানি মনে থাকে।
মৃত্তিকা মুখ হা করে বসে রইলো৷ কি থেকে কি বললো পূর্ণ? প্রথম প্রথম নরম গলায় বললেও পরেরগুলো দিলো ধমক। কিন্তু কেন? কাকেই বা দাফন দিবে? মৃত্তিকা থতমত খেয়েই জিজ্ঞেস করলো,
— ক..কি বলছেন? কে থাকবে আমার মনে?
— কু*ত্তা*র বাচ্চা চিনেন মৃত্ত? ঐ কাব্য ও তেমন। একবার যেমন রুটি খাওয়ালে কুকুর পিছ ছাড়ে না তেমনই কাব্য ও পিছ ছাড়বে না আপনার। কি ভেবেছেন আমি টের পাব না? পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চির এই শরীর নিয়ে আমার থেকে কথা লুকান? কতটা বড় কলিজা আপনার মৃত্ত? কিভাবে বড় করলেন? নিশ্চিত কারো আস্কারা পেয়েই বড় হয়েছে? আস্কারা টা কে দিলো? কে দিলো? কাব্য? ঐ ****বাচ্চা কাব্য! এই কথা বলুন? কথা বলুন বলছি? আমার রাগ কিন্তু মাথায় উঠে যাচ্ছে মৃত্ত। বলুন ওর সাথে আপনার কি?
পূর্ণ ঠান্ডা স্বরে বললো প্রথম টুকু অথচ চেঁচিয়ে উঠলো শেষ দিকে। মৃত্তিকা সেই প্রথম প্রথম পাওয়া ভয়টা আজ পেলো। দীর্ঘদিন পর আবারও পূর্ণ’র সেই চেহারা তার সামনে। আগে অবশ্য তার সামনে গালি দিত না। আজ বিশ্রী দুটো গালিও দিলো তার সামনে। গাছের গুড়ি খামচে ধরলো মৃত্তিকা। বুকের ভিতর ধ্রীম ধ্রীম শব্দ হচ্ছে। উঠার চেষ্টা করলেও লাভ হলো না। শক্তি কুলাচ্ছে না উঠতে। পূর্ণ সজোরে এক আঘাত করে বসলো মোটা গাছটায়। ছাল বাকল উঠানো হওয়াতে হাতে লাগলো বেশ। মৃত্তিকা ঝট করে উঠলো। নিজের দুই হাতে ধরে ফেললো পূর্ণ’র শক্ত সেই হাতটা। ছাড়িয়ে নিতে চাইলো পূর্ণ কিন্তু হলো না। তার মৃত্ত থেকে নিজেকে কিভাবে নিজেকে ছাড়াবে সে? এটা অসম্ভব। মৃত্ত’র এই ছোঁয়া পাওয়ার জন্য তার হাতের আত্নহুতি দিতেও সক্ষম সে। মৃত্তিকা পূর্ণ’র হাতটা চেপে ধরলো। কোন প্রকার জড়তা ছাড়া একটা চুমু খেয়ে নিলো সেই শক্ত হাতে। ঠান্ডা বরফের খন্ড তখন পূর্ণ। রা নেই মুখে। চোখে মুখে তার অন্ধকার হানা দিয়েছে। মাথা নামানো। মস্তিষ্ক বললো, ” দে পূর্ণ ধমকে দে এই মৃত্ত’কে। কত সাহস! যেখানে তুই ছোঁয়া দিস না সেখানে সে চুমু খায়”। মস্তিষ্ক একথা বললেও প্রেম লোভী মন বললো ভিন্ন কথা। সায় দিলো সে মৃত্ত’কে। পূর্ণ’কে বুঝিয়ে বলতে লাগলো, ” থাক না একটু। একটুই তো। তোরই তো। একটা চুমুই তো। খাক। তুই তো ধমকালি বিনিময় হিসেবে চুমুটা রেখে দে পূর্ণ। যত্নে রেখে দে”।
পূর্ণ যখন মন মস্তিষ্কের ঝগরা থামাতে মশগুল তখন মৃত্তিকা ব্যাগ থেকে পানি বের করে তার হাতে ঢালতে ব্যাস্ত। ব্যাস্ত ভঙ্গিতে বলেও যাচ্ছে,
— ভুল ভাবছেন আপনি। ঐ ভাইয়াটা আমাকে নোটস দিতে চাইছিলো। তার সাথে কোথাও যাই নি আমি। কোথাও না। বিশ্বাস করুন। তিনি আমাদের সাথে গিয়েছিলেন। সে সাথে থাকায় আমি ফুচকাও খাই নি। বাসায় চলে গিয়েছিলাম। আমি আব্বুর সাথে ছিলাম। বিশ্বাস না করলে উজ্জ্বল আর হিমু’কে জিজ্ঞেস করুন।
— বিশ্বাস করলাম।
ঠান্ডা স্বরে বললো পূর্ণ।
মায়ের কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে পূর্ণ। মনোযোগ সম্পূর্ণ তার বইয়ের পাতায়। পাশেই ওর বাবা বসা। ভদ্রলোক টিভির সাউন্ডটা একদম শূণ্যতে দিয়ে খবরের চ্যানেল দেখছেন। পূর্ণ বারকয়েক আওড়ালো বাবা’কে যাতে প্রয়োজন অনুযায়ী সাউন্ড দিয়ে দেখে কিন্তু তিনি তা করেন নি। ছেলে পড়ছে তাই ডিসটার্ব করতে নারাজ তিনি। পূর্ণ’র মা ছেলের মায়াবী মুখটাতে তাকিয়ে রইলেন। পরপর নিজেকে নিজে বলতে লাগলেন, “এভাবে দেখা ঠিক না যদি নজর লাগে তার সোনার টুকরোর”?
পূর্ণ প্রায় আড়াই ঘন্টা ওভাবেই পড়েছে। এটা তার একটা অভ্যাস। এভাবে এতবড় হয়েও বাবা-মায়ের বেড রুমে তাদের খাটে তাদের প্রাইভেসি নষ্ট করে সে পড়ে। যদিও অন্য ছেলেপুলে’রা বাবা-মা’কে প্রাইভেসি দেয় কিন্তু পূর্ণ দেয় না। পরিক্ষা’র সময় তো মোটেই না। বাবা কতবার বলে, এত বড় ছেলে হয়োছো দুই দিন পর বিয়ে করবে এখনও কি না মা-বাবার বেডরুমে শুয়ে থাক? পূর্ণ তখন দুষ্ট হেসে বাবা’কে বলে উঠে, আমার মৃত্ত অনেক আদুরে আব্বু। সে আসলে তোমরাই তখন তাকে আদর করে কুল কিনারা পাবে না।
পূর্ণ বাবা-মা’কে মৃত্তিকা সম্পর্কে জানিয়েছে। জানিয়েছে বললে ভুল হবে। সোজা সোজা বলেছিলো,”আব্বু একটা পূর্ণময়ী পেয়েছি। ভালো একটা কালক্ষণে তাকে বিয়ে করে নিব”। ছেলে তাদের বরাবরই বাবা-মা’কে জানিয়ে কাজ করে। মৃত্তিকা সম্পর্কে ও তারা জানে। পূর্ণ জানায়। রোজ জানায়। কিন্তু দেখা হয় নি চোখের। পূর্ণ’র কাছে কোন ছবি নেই মৃত্তিকা’র।
আড়মোড়া ভেঙে পূর্ণ সোজা হলো। বাবা’র দিকে তাকিয়ে বললো,
— নাও তোমার বউ তোমাকে দিয়ে গেলাম। একটু পরই আসছি আবার।
ওর বাবা ছেলের কথায় হাসলেন। বুঝেন না এমনটা না। ছেলের এমন সব কান্ড তার বরাবরই জানা। পূর্ণ যেতে যেতে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো,
— আম্মু ক্ষুধা লেগেছে খেতে দাও।
ওর মা তারাতাড়ি বিছানা ছাড়লেন। পেছন থেকে স্পষ্ট শুনা গেলো বাবা’র কন্ঠ,
— কোথায় দিলি আমার বউ? সেই তো তোর কাছেই নিয়ে গেলি।
পূর্ণ’র মা স্বামী’র দিকে চোখ রাঙিয়ে তাকালেন। মৃদু ধমকের সুরে বলে উঠলেন,
— বুড়া হচ্ছো অথচ পাগলামি ছুটলো না। এতবড় ছেলেকে কিসব বলো তুমি?
— কই কি বললাম। হায় আল্লাহ! এই ছেলে বাসায় থাকলেই আমি বউহীনা ভুগি আর তুমি কি না আমাকেই দোষ দাও?
ওর মা আর স্বামী’র কাছে থাকলো না৷ গটগট পায়ে চলে গেল খাবার গরম করতে।
এতসবের আড়ালে হাসে পূর্ণ। অতিসূক্ষ্ণ হাসিটুকু যা পরিবার বাইকে কাউকে সে দেখায় না। রাখে একদম আড়ালে। আবডালে। বাবা-মায়ের রুমে পড়ার অন্যতম উদ্দেশ্য হলো তাদের সময় দেয়া। তাদের বুঝানো এখনও তারা অতটাই গুরুত্বপূর্ণ সন্তানের কাছে। তাদের ভূমিকা কমে নি বরং বেড়েছে। মা’কে একটু বেশি আগলে রাখে পূর্ণ। বাবা’কে ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখে এতসব উদ্ভব কথা বলে।
— আব্বু মায়ের কথা শুনো। এসব ছেড়ে দাও। ভালো না এসব আব্বু। নোংরা এসব।
— কিচ্ছু হবে না আম্মু। তুমি ভয় পাচ্ছো খামাখা। আমি নিজেকে নোংরা হতে দেব না।
পূর্ণ’র মা ছেলের পাতে মাছ বেছে আরেকটু দিলেন। পূর্ণ’টা মাছ বাছতে পারে না। আবারও বললেন,
— ড্রেন দিয়ে ময়লা গেলেও সেটা নোংরা তেমনি দুধ গেলেও নোংরা আব্বু। ছেড়ে দাও। মা ক্লান্ত এসবে।
পূর্ণ নিজের প্লেট থেকে এক লোকমা ভাত তুলে দিলো মায়ের গালে। পরপরই টুপ করে একটা চুমু খেয়ে বললো,
— দেখ আব্বু কিভাবে হিংসাত্মক ভাবে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। হিংসুটে আব্বু।
ওর বাবা মুখ সিটকে বলে উঠলেন,
— আমার বয়েই গেছে।
— গেছেই তো।
বলেই পূর্ণ হাসলো। প্রতিবারের ন্যায় অতিসূক্ষ্ণ ভাবে এরিয়ে গেলো মায়ের কথা। রাজনীতি সে ছাড়তে নারাজ। যেকোনো ভাবেই নারাজ। এই রাজনীতি তার লাগবেই। হোক সেটা নোংরা তবুও চাই। এই নোংরা রাজনীতি করেই দম নিবে পূর্ণ। কিছু মানুষকে দেখিয়ে ছাড়বে নোংরা রাজনীতি করেও কিভাবে নিজেকে শুদ্ধতম রাখা যায়।
শোয়েব মির্জা বরাবরই হতাস হচ্ছেন। কোন দিকেই কুলিয়ে উঠতে পারছেন না। এভাবে কিভাবে হবে? মাহিন মিয়া তাকে সাহস দিয়ে বলে উঠলো,
— স্যার চিন্তা করবেন না। চাল পাল্টা খেতে কতক্ষণ?
— আমি নিজের উপর অবাক মাহিন। দুই দিনের চিনেপুটি আমাকে চিন্তায় ফেললো? চুল আমি….
— রাজনীতি করে সাদা করেছেন।
মাহিন মিয়া তার স্যারকে থামিয়ে বলে উঠলো। শোয়েব মির্জা মাথা ঝাকিয়ে সম্মতি দিলেন। মানে আসলেই এই চুল সে রাজনীতি করে করেই সাদা করেছেন। এই হাতে হাতড়েছেন প্রিয় জনের র*ক্ত। আর যাই হোক রাজনীতি করতে পিছু পা হবেন না তিনি।
মাথাটা ইজি চেয়ারে রেখে বেশ গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন,
— সাফারাত’কে ডাকো।
— ছোট বাবা তো বাসায় নেই।
শোয়েব মির্জা’র বৃদ্ধ কপালে চিন্তার ভাজটা স্পষ্ট দেখা দিলো।
শান্তি সমাবেশ পর্ব ৯+১০
সাফারাত নরম গদিতে গড়াগড়ি খেলো। শরীর বেশ ক্লান্ত তার। পড়নে তার একটা টাউজার শুধু। খালি গায়ে বিছানায় লেপ্টে আছে তার দেহ। এখন একটা নারী হলে মোটেও মন্দ হতো না। তাকে এই বুকে নিয়ে গড়াগড়ি খেতো সে। ফর্সা বুকে তার লোমের আনাগোনা। অতি আকর্ষণীয় তার বলিষ্ঠ দেহখানা৷ নিঃশ্বাসের দরুন পেটটা উচু নিচু হচ্ছে বারংবার। অলস ভাঙ্গিতে পাশ থেকে ফোনটা হাতড়ে নিলো। ডায়াল লিস্টে তিন নাম্বার নামটায় চাপ দিয়ে কল লাগালো। একবার দুইবার তিনবার রিং হতেই শুনা গেলো নারী কন্ঠ। এই কন্ঠ খুবই সুন্দর। অতি সুন্দর। সাফারাত নিজের হাতটা বুকে বুলাতে লাগলো। আওড়ালো গভীর কন্ঠকে খাদে ফেলে,
— বড়ই ভয়ংকর এই কন্ঠ। শক্ত পুরুষকে ঘায়েল করার মতো ভয়ংকর। বুকে খঞ্জর চালানোর মতো ভয়ংকর। ভয়ংকর সুন্দর তোমার কন্ঠ নারী।
