Home শান্তি সমাবেশ শান্তি সমাবেশ পর্ব ১৭+১৮

শান্তি সমাবেশ পর্ব ১৭+১৮

শান্তি সমাবেশ পর্ব ১৭+১৮
সাইয়্যারা খান

— আমি আর কখনো ওনাকে চাইব না আব্বু। হি ইজ এ লস্ট গায়।
মেয়ে’র অভিযোগ মনোযোগ দিয়ে শুনলেন মৃন্ময় হাওলাদার। এদিন তার কাছে পূর্ণ’র আবদার করেছে। কত প্রশংসা শুনেছে। যেই মেয়ে তার রাজনীতি বুঝে না সে কি না বাবা’র বুকে শুয়ে রাজনীতি’র গল্প জুড়ে দিত। কত কি জানতে চাইত। মেয়ে’র অভিমান তার অজানা নয়। মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললেন,

— আমি আগেই বলেছিলাম আম্মা। কোন কিছুকে আসক্তি বানাতে নেই। তামাকের আসক্তি যেমন ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় ঠিক তেমনই এক রোগ হলো এই প্রেমাসক্তি। ধীরে ধীরে আপনাকে মৃত্যুর দোরগোড়ায় দাঁড় করিয়ে দিবে। একদিন ছেড়ে দিবে। তখন আপনি কুল খুঁজবেন৷ বাঁচার আপ্রাণ চেষ্টা করবেন কিন্তু কেউ হাত বাড়াবে না। আপনাকে ছেড়ে চলে যাবে।
মৃত্তিকা এক দৃষ্টিতে বাবা’র দিকে তাকিয়ে রইলো। এত গভীর কথা বাবা কেন বলছে তাকে। কখনো তো এসব বলে না। বাবা’র এক গালে নিজের হাত ছোঁয়াতেই বাবা তাতে চুমু খেল। মৃত্তিকা বাবা’র চোখে তাকালো। গাঢ় বাদামী রঙের মনি। ঘন পল্লব বিশিষ্ট তার চক্ষু। মৃত্তিকা ছুঁয়ে দিলো তাতে। পলক ঝাপটালেন তিনি। মেয়ে আঙুলে চুমু খেয়ে আবারও বলে উঠলেন,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

— বাবা কখনো আপনাকে কিছুতে জোর করি নি আম্মা। আজও করব না। আপনি যথেষ্ট বড় হয়েছেন। ভেবে দেখুন ভুলটা আসলে কার?
— যেমন?
— ধরুন আজ পূর্ণ’র বুকে অন্য একজন মেয়েকে দেখলেন। পরিস্থিতি তো আপনি জানেন না। চোখের দেখা নিশ্চিত ভুল হবে না। মস্তিষ্ককে মানাতে পারবেন না। তখন ভুল ভাবাটা স্বাভাবিক। বিচলিত হওয়া টাও স্বাভাবিক। প্রিয়জন বলে কথা।
একটু থেমে আবারও বলে উঠলেন,
— ভাবুন। সময় নিন মা। নিজেকে কষ্ট দিবেন না৷ ওয়াদা করুন আব্বু’কে।
বাবা’র শক্ত হাতে হাত রেখে ওয়াদা করলো মৃত্তিকা। বেগুনি রঙের ঠোঁটটাতে হাসি ফুটে উঠলো মৃন্ময় হাওলাদারের। মেয়ে’র মন ভুলাতে বললেন,

— বৃষ্টি হচ্ছে এখনও আম্মা। পাকোড়া ভাজা আর চা হবে নাকি?
নাক টানলো মৃত্তিকা বরাবর বাবা’র কাঁধে নাকটা ঘঁষেও দিলো। উঠে বসতে বসতে বললো,
— একদম। মজা হবে।
নিমিষেই যেন মেয়ে’র মাইন্ড ডাইভার্ড করে দিলেন মৃন্ময় হাওলাদার। তবে চিন্তত মন তখনও। পূর্ণ’র থেকে এহেন আচরণ আশা করেন নি তিনি।

প্রায় রাত পর্যন্ত এই বেমৌসুম এর বৃষ্টিতে ভিজলো পূর্ণ। খোলা মাঠে সেই বট বৃক্ষের গোড়ায় বসে স্মৃতি চারণ করেছে বিগত মাসগুলোর। হঠাৎ এক মৃত্ত এলো জীবনে। একদম দমকা হাওয়ার মতো যা শীতল করে দেয় বদন’কে। ঠিক তেমনই তার মৃত্ত। এর আগেও খুব কমই নরম স্বরে কথা বলা হয়েছে তার সাথে। পূর্ণ দেখেছে। পরিক্ষা করেছে তার মৃত্ত’কে এবং তাতে সফল তার মৃত্ত। এত এত ধমক খেয়ে, গম্ভীর কণ্ঠে কথা শুনে,তেঁজ যুক্ত বাক্য শুনেও মৃত্ত’টা তার অপেক্ষা করা ছাড়ে নি। বরং পূর্ণ’কে মেনেছে তার মতো। তবে আজ কেন তার মৃত্ত মানতে পারলো না? আজ কি তার সহ্য’র বাঁধ ভেঙে গেলো৷

বুকে যেন আগুনের স্ফুরণ ঘটল পূর্ণ’র। শুভ্র পাঞ্জাবিটা গায়ে সেটে গিয়েছে একদম। আস্তে ধীরে উঠে দাঁড়ায় পূর্ণ। পকেট হাতড়ে ফোনটা হাতে নিতেই দেখলো রাত আট’টা। সেই কতঘন্টা ধরে কি না এখানেই বসা সে। হঠাৎ পূর্ণ’র মনটা বলে উঠলো, এভাবে বৃষ্টিতে ছাতা হাতে আর রোদে পুড়ে মৃত্ত’টা অপেক্ষা করতো। পূর্ণ দেড়ী করলেও তার অভিযোগ ছিলো না বরং মাঝে মধ্যে পানির বোতল এগিয়ে দিতো।

মনে পরে পূর্ণ’র। দুই মাস আগের কথা। মৃত্তিকা তখন ভালোই ভয় পায় তাকে। শুধু বুঝি ভয়? হাড় কাঁপানো ভয় যাকে বলে সেটাই পেত মৃত্তিকা। পূর্ণ সেদিন সকালে না খেয়ে বাসা থেকে বের হয়। দুপুরে ক্লান্ত শরীরে যখন মৃত্তিকা’র কাছে এলো তখন দেখলো মৃত্তিকা তার জন্য দুপুরের খাবার এনেছে। পূর্ণ চেয়েও না খেয়ে থাকতে পারে নি। এক বক্সেই ভিন্ন চামচে দুজন খেয়েছিলো সেদিন। তৃপ্তি’র পরিমাণটা ঠাওড় করে পারে না পূর্ণ। রান্নাটাও বেশ চমৎকার ছিলো। মৃত্তিকা বেশ গর্বের সহিত জানায় তার বাবা’র করা রান্না সেটা। পূর্ণ বিস্মিত হয় সেই কথায় তবে প্রকাশ করে নি।
এমন ছোটখাট টুকিটাকি বেশ ঘটনা আছে তাদের। সেগুলো মনে করে করেই পুলকিত হয় পূর্ণ। বাঁধা না থাকলে আজ বেশ সময় কাটাতো ও ওর মৃত্ত’র সাথে।
ফোন কলে ধ্যান ভাঙলো পূর্ণ’র। নাম্বারটা দেখেই তাড়াতাড়ি রিসিভ করে। ওপাশ থেকে শুনা যায়,

— ভাই শ্যালা’রে পাওয়া যাচ্ছে না। মনে হয় পালিয়েছে। লোক তবুও লাগিয়ে রেখেছি।
মাড়ি শক্ত করে পূর্ণ বলে উঠলো,
— ঐ জা*নো*য়া*রে*র বাচ্চা’কে আমার চা ই চাই। মাটির নিচে ঢুকলেও খুঁড়ে নিয়ে আয়। ওর হাত না ভাঙলে আমার মন শান্ত হবে না। আমার মৃত্ত’কে ছোঁয় ওর ঐ হাত…
পূর্ণ কল কেটে দিলো। খাঁমচে ধরলো চুল৷ কিসের জন্য এত কষ্ট? কার জন্য এত দূরত্ব? যার জন্য এতকিছু তাকে হারিয়ে শেষ মুহূর্তে কি না ওর চোখ ফাঁকি দিয়ে হারিয়ে গেলো? পূর্ণ দ্রুত কদমে হাটা দিলো। কিছুতেই হারানো যাবে না। খুঁজতেই হবে। বেঁচে থাকলে এই ঢাকা শহরের চাপ্পা চাপ্পা খুৃঁজে পূর্ণ তাকে বের করবে।

সাফারাত দাঁড়িয়ে আছে ওর বাবা’র সামনে। শোয়েব মির্জা ইজি চেয়ারটাতে হেলান দিয়ে চোখ বুজে আছেন। সাফারাত হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিলো। বাবা’র দিকে আরেকপলক তাকিয়ে বললো,
— যা বলার বলো আব্বু। নামাজ কাজা পড়া পছন্দ না আমার।
শোয়েব মির্জা চোখ মেললেন। ছেলেকে দেখে নিলেন ভালোভাবে। ছেলের লাল হওয়া চোখ দেখে কিছু ভাবলেন। পরপর বলে উঠলেন,

— পূর্ণ কিছু বলেছে আবারও? কেঁদেছো?
সাফারাত লজ্জা পেলো বাবা’র কথায়। এ যেন সে পাঁচ বছরের সাফারাত’কে জিজ্ঞেস করছেন যে ছেলে কারো বকা শুনে কেঁদেছে কি না? এই প্রসঙ্গে কথা বাড়াতে চাইলো না সাফারাত। তাই প্রসঙ্গ বদলাতে বলে উঠলো,
— দলের ছেলেরা আজ কাঁকড়াইল মোড়ে ঝামেলা পাকিয়েছিলো৷ সেদিকটা সামাল দিলাম। তোমার ওমরার কি খবর আব্বু? ফ্লাইট কবে?

শোয়েব মির্জা বুঝলেন ছেলে এই বিষয়ে কথা বাড়াতে চায় না। কি দরকার ছেলেটার শুকনো ঘাঁ খুঁড়ে? আদৌ ঘা শুকিয়ে বলে সন্দিহান তিনি। বাবা’র থেকে বিদায় নিয়ে রুমে চলে গেল সাফারাত। ওযু করে নামাজে দাঁড়িয়ে যায় শক্তিবান শক্ত পুরুষটা। বাইরের শক্ত খোলসটা মুহূর্তেই চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়। সেজদায় কেঁদে ফেলে সেই আগের ছোট্ট সাফারাত। এমন কেন হলো তার জীবনটা? খুব কি বেশি ছিলো তার চাওয়া? আজ মৃত্তিকা’কে দেখে তার বুকের ছাই চাপা আগুন ফুঁসলে উঠেছে। সেই চেহারাটা কিভাবে ভুলবে সাফারাত? সেই চোখ, সেই চাহনি কি আদোও ভুলার? এতটা সহজ হলে আজ সাফারাত এমন থাকতো না। কোনদিন ও এমন থাকতো না। জীবনটা তার ও পুষ্পসজ্জিত হতো। একদম তার ছোট্ট পুষ্পটার মতো।

আজ প্রায় দুই দিন হলো মৃত্তিকা কোন প্রকার কথা তুলে নি পূর্ণ’কে নিয়ে। বাবা’র সাথে আগের মতো ই থাকছে। তার কষ্ট যে বাবা মাত্রারিক্ত কষ্ট পাচ্ছিলো সেটা মৃত্তিকা টের পেয়েছিলো গভীর রাতে যখন হঠাৎ সজাগ পেয়ে দেখেছিলো গভীর রাতেও বাবা ঘুমায় নি। তার মাথায় বুলাচ্ছিলো গভীর ভাবে। কোন এক অদৃশ্য চিন্তায় ছিলো বাবা। মৃত্তিকা যখন ঘুমুঘুমু কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো কেন ঘুমায় নি তখন মৃন্ময় হাওলাদার কোন এক ঘোড়ের মাঝেই মেয়েকে পাল্টা প্রশ্ন করে,

— আম্মা আপনি কাকে বেশি ভালেবাসেন? আমাকে নাকি পূ….
— তোমাকে আব্বু। পুরো পৃথিবী একদিকে তুমি একদিকে। না ভুল বললাম আমার সবটুকু জুড়ে তুমি আব্বু। মাই লাভ। কারো সাথে নিজের তুলনা দিবে না আব্বু। আই ডোন্ট লাইক ইট।
মেয়ের হঠাৎ ঘুমন্ত কন্ঠ থেকে এহেন তাঁজা কন্ঠে বেশ চমকান তিনি। বেরিয়ে আসেন ঘোর কেটে। ততক্ষণে মৃত্তিকা বাবা’কে জড়িয়ে কেঁদে ফেলে। বিচলিত হন মৃন্ময় হাওলাদার। প্রথমে ভাবেন পূর্ণ’র কথা মনে পরাতে কাঁদছে পরক্ষণেই তার ভেতরের বাবা সত্ত্বাটা টের পায় ভিন্ন কিছু। এই কান্না তার জন্য। নিশ্চিত এতরাতে তার ওমন প্রশ্নে ভয় পেয়েছে তার ছানা। তাতক্ষণিকভাবে মেয়ের মাথাটা বুকে চেপে নেন। অভিযোগ করে মৃত্তিকা কান্নারাত গলায়,
— আ…আর কখনো বলবে না। কখনো না। আমি তোমাকে অনেক ভালেবাসি বাবা। অনেক অনেক। তুমি কোথায় ছিলে? রাতে হঠাৎ চলে গেলে। আমি অপেক্ষা করতে গিয়ে ঘুমিয়ে গেলাম।
মৃন্ময় হাওলাদার মেয়ের মাথায় চুমু খান। আদর করেন তার শ্যামা রাজকণ্যাকে। কোঁকড়াচুলে হাত বুলাতে বুলাতে বলেন,

— আপনাকে খারাপ কিছু ছুঁয়ার আগেই বাবা তা গায়াব করে দিবে আম্মা। কখনো কিছুর আঁচড় লাগতে দিবে না।
বাবা’র বুকে তখনও ছোট্ট বাচ্চার ন্যায় ঢুকে ছিলো মৃত্তিকা। মেয়ে’কে ভুলাতে ডেকে উঠেন মৃন্ময় হাওলাদার,
— আমার ছানা ঘুমাবে না?
— হুলো বিড়াল ইদুর মা’রতে গিয়েছিলো তাই ছানা তার অপেক্ষা করছিলো।
পরপর শুনা গেলো বাবা-মেয়ে’র হাসির ঝঙ্কার। ছানা ডাকলেই মৃত্তিকা বাবা’কে হুলো বিড়াল ডাকবে।

জ্বরে’র ঘোরে মাথা কাজ করছে না পূর্ণ’র। এতটা ভয়াবহ তার শেষ কবে হয়েছে মনে পরে না। এরমধ্যে যোগ দিয়েছে মারাত্মক শরীর ব্যাথা। পাশেই ওর মা মাথায় জল পট্টি দিচ্ছেন একবার আর আঁচলে চোখ মুছছেন একবার৷ পূর্ণ’র শক্ত বলিষ্ঠ দেহের উপর দুটো কম্বল দেয়া তবুও যেন কাঁপুনি থামে না। মায়ের আঁচলের এককোণা মুঠোয় পুরে রেখেছে। বাবা গিয়েছে ডক্টর ডাকতে৷
ছেলের কপালে হাত রাখলেন তিনি। এখনও ছোঁয়া যাচ্ছে না। একবার কম্বলের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে বুকে হাতড়ে দিলেন। পূর্ণ একদম ছোট বাচ্চার মতো মায়ের কোল ঘেঁষে। এতেই যেন ওর মা’র বুক ফেটে কান্না পায়। ছেলেটা তার কঠিন শিলা’র মতো। আজ এমন অবস্থা সেই তার রাগি,জেদি ছেলেটার কিভাবে সহ্য করবেন তিনি?
তখনও বাবা এলেন ডাক্তার নিয়ে৷ জ্বর এখনও একশত তিন ডিগ্রি। পূর্ণ’কে কোনমতে উঠে বসানো গেলো না। মাথা ঘুরিয়ে পরে যেতে নেয় সে। এবার মা কেঁদে ফেললেন। পূর্ণ অস্পষ্ট স্বরে বললো,

— উহহু কাঁদে না।
এরপর আর মনে নেই পূর্ণ’র। সম্পূর্ণ অচেতন হয়ে যায় সে।
একে ঐদিন কয়েক ঘন্টা বেমৌসুম বৃষ্টিতে ভিজেছে তার মধ্যে ঐ ভেজা পোষাকেই ছিলো রাত দুটো পর্যন্ত। কিসের চিন্তা তা কেউ জানে না। বাবা-মা হাজার জিজ্ঞেস করেও তেমন কিছু জানতে পারে নি। গত দুই দিন ধরে নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে পাগল হয়ে ঘুরছে পূর্ণ। এদিক ওদিক কল দিচ্ছে। লাভ হচ্ছে না। হন্ন হয়ে খুঁজার ফল ছিলো শূন্য।
গতরাতে তার সকল অভিযানের অবসান ঘটে। সেই বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে সারারাত রাস্তায় ছিলো। গা গুলিয়ে উঠতেই পা বাড়ায় বাড়ীর দিকে। দলের ছেলে গুলো বাড়ী পর্যন্ত রেখে যায় তাকে৷

এত এত ধকল। রাজনৈতিক কাজ। দলের কাজ। সাথে গুরুত্বপূর্ণ সেই কাজ। এরমধ্যে খাওয়া দাওয়া, নিজের যত্ন ত্যাগের ফল আজকের এই পূর্ণ। অথচ পূর্ণ জানে তার এই অবস্থার জন্য দায়ী এক নারী। বিষাক্ত নারী নামকরণ করেছে পূর্ণ তাকে। সেই বিষেই জড়জড়িত সে। সেই নারী’র অভাবেই পূর্ণ আজ এতটা ভেঙে গিয়েছে। তার সুঠাম দেহ ভেঙে পড়েছে৷ আঙ্গার হয়েছে তার হৃদয়। বিষবাষ্প দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তার শিরা উপশিরায় অথচ বেখবর সেই নারী। তার পূর্ণ্যময়ী।

কাঁচা বাজারের ব্রিজের নিচে হাত কাটা লা*শ ভেসে উঠেছে। পঁচা অর্ধগলিত দেহ। এক দেখায় চেনা গেলো না। বুঝা গেলো না কে সে। পুলিশে খবর দিতে দিতেই শোরগোল ভেসে উঠলো। মেতে উঠলো জনগণ। নাহলেও দুই দিন আগে এ ঘটনা ঘটেছে। পুলিশ আসতেই ডেঞ্জার জোন এর বর্ডার দিয়ে দিলেন। হৈ চৈ লেগে গেল এই রাতে৷ টর্চ হাতে জঙ্গলে পাঠানো হলো কয়েকজন পুলিশ’কে৷ তাদের নিকট তেমন কোন নিখোঁজ রিপোর্ট নেই৷ ফুলে উঠেছে পঁচা শরীরটা। বিভৎভাবে হাতটা ছিন্ন করা হয়েছে৷ চোখ দুটো উপড়ানো। পুলিশ অফিসার জোহানেরই গা গুলাচ্ছে৷ নাকে রুমাল চেপে ও রক্ষা নেই। মানুষ জনও তীব্র গন্ধে দূরে দূরে সরে। ম*রা মানুষের গন্ধ বুঝি এতটাই বাজে৷ বলিষ্ঠ দেহটা পঁচা ডোবার পানি খেয়ে খেয়ে ফুলে উঠেছে। লা*শ*টা উল্টো হওয়া ছিলো৷ মূলত ভেসে উঠেছে। যেই না উল্টানো হলো ওমনিই চমকে তাকালেন অফিসার জোহান।
এতক্ষণ চলছিলো লাইফ টেলিকাস্ট। খবরের সেই অর্ধগলিত শরীর এবং চেহারাটা দেহেই ধপ করে বসে পরলেন শোয়েব মির্জা। মাথা ভনভন করছে তার।

সকালের আলো ফুটলো। বেশ ঝলমলে দিনটা। তবে কারো কারো কাছে বিষাক্ত বটে। মৃত্তিকা’র বাসায় আজ হিমু আর উজ্জ্বল আসবে। মূলত বাবা’র সাথে দেখা করাবে ও। বাবা ও তো বাসায়।
ওদের সাথে প্রায় ঘন্টা দুই এক কাটিয়ে বাবা অফিসে যান। মিঠি’র মা মিঠি’কে ডাকতেই মৃত্তিকা বলে উঠলো,
— থাকুক না। তুমি যাও। ও থাকুক আমার সাথে।
মিঠি’র মা যেতেই উজ্জ্বল তাকালো মিঠি নামক মেয়েটার দিকে। ছিমছাম গড়নের রোগা পাতলা একটা মেয়ে অথচ সুন্দর। বয়স সতোরে বা ষোল হবে। আন্দাজ করা যায়। ফিনফিনে শরীরে অতি সাধারণ একটা থ্রি পিস পড়া। মাথা এমন ভাবে ঢেকেছে যে মুখটা ও ঠিকঠাক দেখা যায় না। ওর ভাবনার মাঝেই হিমু মৃত্তিকা’কে বললো,

— ভাইয়ের সাথে কথা হয় নি?
মৃত্তিকা বেশ স্বাভাবিক ভাবেই উত্তর করলো,
— ওনার বিষয়ে কথা বলতে চাই না আমি হিমু৷ ইনায়া কোথায়? ও না আসবে?
— হ্যাঁ আসছে। রাস্তায় আছে।
উজ্জ্বল উত্তর দিয়ে আবারও বললো,
— পূর্ণ ভাইয়ের সাথে কি হইসে তোর বা*ল? মেজাজ চটে যায় একদম। শ্যালা মাইয়া মানুষ ই ঝামেলা তোরা।
মৃত্তিকা আর হিমু উভয়ই কপাল কুঁচকে তাকালো৷ উজ্জ্বল পাত্তা না দিয়ে বললো,
— ওমনি তাকায়া লাভ নাই। তুই ক্যান ওনার সাথে কথা বলস না। ভাই কি না করলো তোর জন্য।
মৃত্তিকা থমকালো। নিজেকে শক্ত করে বললো,

— তুই জানিস না উনি বাজে কথা বলেছে আমাকে উজ্জ্বল। সেই সব কথা শুনার যোগ্য ছিলাম না আমি।
একমাস চৌদ্দ দিন পাগলের মতো ছিলাম। এত অবহেলা সহজ ছিলো না। মেয়ে হয়েও যথেষ্ট সহ্য করেছি ওনার সকল কিছু তবুও বলবি আমার দোষ?
উজ্জ্বল চুপ রইলো কিছু সময়। একে একে খুলে বললো মৃত্তিকা’কে কিছু কিছু। সবটুকু তারাও জানে না। শুধু বললো,
— আমাকে আর হিমু’কে ডেকে নিলো ভাই প্রায় দেড় মাস আগে। একটাই দায়িত্ব দিলো তোকে দেখে রাখতে। তোর সাথে নাকি দেখা করতে পারবে না কিছু কারণে সেটা পরিক্ষা তোকে বলেছে কিন্তু সত্যিটা ভিন্ন। অন্য কিছু আছে। রাজনৈতিক ব্যাপার। তিনি বলেন নি আমরাও ঘাটি নাই।
এতটুকু বলে থামলো উজ্জ্বল। তখনই হিমু বললো,

— রোজ তোর খবর নিতো। একদিন ভোর চারটায় পড়া শেষ করে আমাকে কল করে। প্রায় এক ঘন্টা লাগিয়ে পইপই করে তোর হিসেব নেয়। তুই যে সিঁড়িতে হোচট খেলি সেটা শুনে কেমন করছিলো। আমি না দেখলেও বুঝেছিলাম মৃত্তিকা। পূর্ণ ভাই আর যাই হোক খারাপ না। তোকে ভালোবাসে।
তখনই পেছন থেকে মেয়েলী কন্ঠে একজন বললো,
— আমিও তোর বান্ধবী কম চামচা বেশি জান।
ইনায়ার কন্ঠে সবাই পেছনে ঘুরলো। উজ্জ্বল হেসে বললো,
— পূর্ণ ভাই তোর জন্য ওকে কাজের বুয়া রাখসে।
অবুঝ গলায় মৃত্তিকা জিজ্ঞেস করলো,
— মানে?
ইনায়া দুঃখী দুঃখী কন্ঠে বললো,

— জান পূর্ণ ভাই তোকে দেখে রাখতেই আমাকে তোর সাথে মিশতে বলেছিল বাট ট্রাস্ট মি আমি মন থেকেই তোকে ভালোবাসি।
মৃত্তিকা থ বনে আছে। সিনিয়র ভাই’টার কোন রুপ এটা? এত এত কেয়ার কোথায় ছিলো এতদিন? মৃত্তিকা তো একবার ও দেখলো না। কেয়ার বলতে চাপা ধমক আর গর্জন ই শুনেছিলো এতদিন মৃত্তিকা।
মস্তিষ্কে তখনই তুখোড় ভাবে ধাক্কা খেলো উজ্জ্বলের কথা,
— ভাই তো দুই দিন ধরে জ্বরে ভুগছে৷ ডেঙ্গু টেস্ট করালো কিন্তু ডেঙ্গু হয় নাই। অবস্থা ভালো না। হাসপাতালে ভর্তি ও রাখতে পারে।
মৃত্তিকা উঠে দাঁড়ালো। মাথাটা ভনভন করছে যেন। ঢোক গিললো অনবরত। মনে পরলো বাবা’র কথা। বাবা বারবার বলে “তারাহুরোর সিদ্ধান্ত শয়তানের”।

বোকা। শুধু ই কি বোকা? একদম মাথা থেকে গোড়া বোকা মৃত্তিকা। সবাই ঠিক বলে। সেই থেকে সারা রুম জুড়ে পাইচারি করে যাচ্ছে ও। পূর্ণ ভাই অসুস্থ। তার সাথে এখন কিভাবে যোগাযোগ করবে ও? মানুষ ঠিক কতটা বোকা হলে এত মাসের পরিচয় থাকার পরও নাম্বার নেই তার। বিরক্তিতে মুখ তেঁতো হয়ে যাচ্ছে মৃত্তিকা’র। অসহায় চোখ তাকিয়ে রইলো ফোনটার দিকে। হিমু বা উজ্জ্বল থেকেই নাম্বার নেয়া যেত। কিছুটা আড়ষ্ঠতার কারণেই তা সম্ভব হলো না। এখন উপায়? মাথা কাজ করে না মৃত্তিকা’র। ভালোবাসাটা তার পূর্ণ’র প্রতি অসীম। সীমাহীন এই ভালোবাসা কাছে পূর্ণ’র ঐদিনের ব্যাবহার নিতান্ত তুচ্ছ ঠেকলো মৃত্তিকা’র কাছে। বাবা যা বলেছে সেটাও বুঝার চেষ্টা করেছে ও৷ আসলেই তো যেদিন ইশিতা নামক সিনিয়র আপু ওকে পূর্ণ থেকে দূরে থাকতে বলছিলো তখন মনের অন্তস্তলে চিনচিন ব্যাথা হয়েছিলো ওর। যতটা কষ্ট তার কটু বাক্যে পেয়েছিলো ঠিক তার দ্বিগুন পেয়েছিলো যখন ইশাতা বলেছিলো সে ভালোবাসে পূর্ণ’কে।

আশাহত হয় মৃত্তিকা। যেখানে কথা শুনা মাত্র ওর নতুন মনটা বিষিয়ে ছিলো সেখানে পরপর দুই দুইবার সাফারাতের বুকে দেখে ভুল ভাবাটাও স্বাভাবিক। আর এতদিনের অসহনীয় দূরত্বটা ও ইচ্ছাকৃত ছিলো না। সব শুনে এখন মৃত্তিকা’র নরম মনটা ফুলেফেঁপে উঠেছে। সিনিয়র ভাই পূর্ণ’কে একপলক দেখার জন্য উদগ্রীব তার চক্ষুদ্বয়।
লাজলজ্জার মাথা খেয়ে কল লাগায় হিমু’কে। এক দুইবার রিং হতেই কলটা ধরলো উজ্জ্বল। মৃত্তিকা কিছু বলার আগেই গলা খেঁকিয়ে বলে উঠলো,

— বলসিলাম না এই শ্যালা একটা হাঁদা। মিললো তো আমার কথা। আইসা দেখ ধেই ধেই কইরা ওর ***রুপার লগে গেসে। মোর কথা তো কানে তুলস না তুই। আই কি মিছা কই?
মৃত্তিকা পরপর দুইটা ঢোক গিললো। গলা ভেজালো ঠিকঠাক ভাবে। উজ্জ্বল রেগে গেলেই ওর ভাষা আহত নিহত হয়ে যায়৷ নোয়াখালী আর বরিশাল মিশিয়ে কোন এক স্বাদহীন খিচুড়ি বানিয়ে কথা বলে। মৃত্তিকা মিনমিন করে কিছু বলার চেষ্টা করলো কিন্তু সুযোগ পেলো না। উজ্জ্বল আরেক দফা কবিতা শুনালো ভিন্ন ভাষায় যার সবটা জুড়ে ছিলো রুপা’র দোষ। ছেলেটা চটপটে স্বাভাবেরই। হঠাৎ ই দারুণ করুন শুনালো ওর কন্ঠ,

— মৃত্তিকা ওরে বোঝা। ওর মা অনেক ভালো রে। ছেলেকে একা এই ভীরের শহরে পাঠিয়েছে জমি বিক্রি করে। আজ মা নেই বলে বুঝি মা কি জিনিস। ওর থাকতেও ও একটা *** এর পেছনে সময় অপচয় করছে।
মৃত্তিকা’র মনে হয় ও ইদানীং বেশ বড় হয়ে গিয়েছে। নাকি সঙ্গ দোষে লোহা ভাসছে? যেই মৃত্তিকা আদৌ কানে কখনো এসব গালি শুনেছে কি না সন্দেহ সে এখন সাচ্ছন্দ্যে পূর্ণ আর উজ্জ্বলের কঠিন কঠিন গালি শুনে। কি স্বাভাবিক ভাবে মানুষকে গালি দেয় তারা। মৃত্তিকা হতাশার সুর টেনে বললো,

— আচ্ছা কাল কথা বলব ওর সাথে ক্যাম্পাসে।
— হু।
চট করে কিছু মনে করার ভঙ্গিতে কিছুটা জোরেই উজ্জ্বল বলে উঠলো,
— কি রে তুই ক্যান কল দিলি সেটা তো বল।
— তুই সুযোগ দিলি কোথায়?
ভাবহীন ভাবেই উজ্জ্বলের সুর,
— দেশ তোকে জায়গা দিবে না। নিজের স্থান নিজের করে নিতে হবে। সেভাবেই নিজের কথা বলার জন্য গলার জোর বাড়াতে হবে।
মৃত্তিকা কুটকুট হয়ে হাসলো। মজার ছলে বললো,
— তুইও শেষ মেষ রাজনৈতি’তে যোগ দিলি?
— উহু। পূর্ণ ভাই এর অঘোষিত শীর্ষ আমি।
মৃত্তিকা’র হঠাৎ আসল কথা মনে পরলো। কেন কল দিলো সেটা মনে পরতেই দেনা মোনা করে জিজ্ঞেস করলো,

— তোর কাছে পূর্ণ ভাই এর নাম্বার আছে?
উজ্জ্বল জানপ্রাণ অবাক হয়ে বললো,
— আর ইউ কিডিং মৃত্তিকা? এত মাস রামলীলা খেইলা এখনও রামের নাম্বার জানস না! হায় আল্লাহ!
শব্দটা পছন্দ হলো না মৃত্তিকার। কিছুটা বিরক্ত ভঙ্গিতে বললো,
— এসব ওয়ার্ড ভালো লাগে না উজ্জ্বল।
উজ্জ্বল বুঝলো। নাদান মৃত্তিকা এত ডোজ একসাথে নিতে পারে না। তাই দাম্ভিকতা বজায় রেখে বললো,
— মেসেঞ্জারে ঢুক। নাম্বার পাঠাচ্ছি।
চাপা শ্বাস ফেলে কল কাটলো মৃত্তিকা।

গত কালের সেই ঘটনা কারোই অজানা রইলো না। রাজনীতিক নেতা’র ছেলে হ*ত্যা হয়েছে। এতটা বিভৎস ভাবে কষ্ট দিয়ে মা’রার কারণ কারোই জানা নেই। পুলিশ অভিজান চালিয়ে দিলো। মন্ত্রীর ছেলে জুবায়ের। চার সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হলো যাতে অতিদ্রুত তথ্য বের করা যায় কিন্তু তেমন কিছুই পাওয়া গেলো না। অফিসার জোহানের ঘাড়েই দায়িত্ব পরলো। অফিসার জোহান ও কেসটার কোন কুল পাচ্ছেন না। ময়নাতদন্তের ফলাফলে এটা স্পষ্ট যে জুবায়ের ছিলো নেশায় বুদ। এছাড়াও তার বডি থেকে নেয়া স্যাম্পল থেকে জানা গিয়েছে সে ড্রাগস নিতো প্রতিনিয়ত। কিন্তু মা’রা যাওয়ার কারণ স্পষ্ট না। হাত কেটে তাকে ফেলে দেয়া হয়। তার আগে বা পরে কোন ক্ষত নেই।
শুধু মাত্র মন্ত্রীর ছেলে বলে এতটা জোরালো ভাবে তদন্ত করা হচ্ছে নাহলে নেশাখোরদের কেস ততটাও গুরুত্ব দেন না তারা।

শোয়েব মির্জা’র ওমরাহ যাওয়ার ফ্লাইট পেছালেন। আপাতত এমন গরম পরিস্থিতিতে রেখে যাওয়া ঠিক হবে না। পাশ থেকে মাহিন মিয়া তার স্যারকে উদ্দেশ্য করে বললো,
— স্যার আপনি কি সরাসরি যাবেন নাকি…..
— যাব।
মাহিন মিয়া’কে থামিয়ে কথাটা বলেন তিনি। কথা বাড়ালেন না মাহিন মিয়া। তার স্যারের বাধ্য ভৃত্যের ন্যায় মাথা ঝাকালেন।
শোয়েব মির্জা’র মুখ জুড়ে চিন্তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ভাবতেই তার মাথা ঝিমিয়ে উঠে। ছেলেটার এই দশা কে করলো?

আকাশে সাদা সাদা শুভ্র রঙা মেঘের বিচরণ। তারা যেন খুব করে বলছে হেমন্তের ছোয়া লেগেছে তাদের বদনে। আবহাওয়া গুমোট নয় আর নাই একদম ফকফকা। রোদ আজ কাল কম দেখা যাচ্ছে। সূর্যটা মেঘের আড়ালে থাকেই যেন সাচ্ছন্দ্য বোঁধ করে। নাতিশীতোষ্ণ একটা ভাব চারিদিকে। এত সুন্দর একটা মিঠা ঋতুতে মুখ তেঁতো হয়ে আছে পূর্ণ’র। দুই দিন প্রায় বেহুস ছিলো। হাজার বলেও হসপিটালাইজ করা যায় নি। বাড়িতেই স্যালাইন চলেছে যা আপাতত অফ। কোন কিছুতেই স্বাদ পাচ্ছে না ও। আজকে কিছুটা ভালো লাগছে। ভালো লাগা বলতে মাথা ঘুরানো থেমেছে। জ্বর তখনও ওকে আঁকড়ে।
বুক চিনচিন করে পূর্ণ’র।

পূর্ণ্যময়ী টা নারাজ। এই দূরত্ব কেন বাড়লো। বোকারাণীটা সবসময় ওকে সমিহ করলেও ঐ দিন কেন ওর মুখ ফসকে বেফাঁস কথাগুলো এতটা সিরিয়াস নিয়ে নিলো। পরক্ষণেই ভাবে পূর্ণ, কথাগুলো একটা মেয়ের জন্য বিশেষ করে মৃত্তিকা’র জন্য বিষাক্ত ছিলো যা তার কর্ণ ভেদ করে মস্তিষ্ক ছেদ করেছে। আঘাত হেনেছে হৃদকুঠুরিতে। মনটা চায় ছুটে যেতে। শরীরের দূর্বলতার তোয়াক্কা পূর্ণ করে না। তার মৃত্ত’র জন্য তো না ই। কিন্তু সমস্যা অন্যদিকে। হাজার চাইলেও দেখা করা মানে তার নিজের হাতে নিজের ক্ষতি করা। এতটা দিন তাহলে কেন এত লুকোচুরি খেললো পূর্ণ। ঐ মৃত্ত’র জন্য ই তো। শেষ মুহূর্তে কোন বোকামি করা যাবে না।
হাতে স্যুপের বাটি নিয়ে রুমে এলো ওর মা। পূর্ণ কিছু বলার আগেই ওর বাবা হুরমুর করে রুমে এসে বলে উঠলেন,

— পূর্ণ জোহানের লা*শ পাওয়া গিয়েছে কাঁচা বাজারের ব্রিজের নীচে।
ভাবশালীন ভাব পূর্ণ’র। কিছুট্টি বললো না সে। ওর মা স্বামী’কে চোখ রাঙিয়ে বলে উঠলেন,
— ছেলে আমার জ্বরে ম’রে তুমি আছো লা*শ নিয়ে।
পূর্ণ মায়ের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা স্বর বের করলো গলা দিয়ে,
— খাব না আম্মু।
— বেশ তো এটা না খাও। অন্য কি খাবে বলো?
“তুমি” ডাকটা বুঝিয়ে দিলো পূর্ণ’কে মা রেগে আছে। বাবা’র দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় কিছু বললো। পরপর কয়েক চামুচ খেয়ে নিলো মায়ের হাতে।
অরুচি প্রকাশ করায় মা আর জোড় করলেন না। পূর্ণ মায়ের আঁচলে মুখ মুছে তার কোলেই মাথা রাখলো। জ্বরের প্রকোপে লাল হওয়া চোখ অথচ অধরে দুষ্ট হাসি ফুটিয়ে বললো,
— আম্মু দেখো আব্বু কেমন হিংসুটে চোখে তাকিয়ে আছে। তোমার কোলে আমাকে দেখলেই এমন ভাবে তাকায়।
আজ আর রাগ করলেন না পূর্ণ’র বাবা। ছেলের অবস্থা কিছুটা তার জানা। আলতো হেসে ছেলের শিয়রের কাছে বসে রইলেন।

না আর অপেক্ষা করা যাচ্ছে না। মৃত্তিকা অনবরত কল করে যাচ্ছে অথচ কল রিসিভ করছে না পূর্ণ। অধৈর্য হয়ে পার্স হাতে মিঠি’র মা’কে বিদায় জানিয়ে রিক্সার চলে বসলো। গন্তব্য পূর্ণ’র বাড়ী। লোকটাকে না দেখে থাকা যাচ্ছে না। বুকে ছটফটানি হয়। এক পলক দেখা দরকার। এতটা ভালোবাসা লুকিয়ে কেন লোকটা ওকে ঠেলে দিলো? এই রাজনৈতিকে তাদের মাঝে আসতে দিবে না মৃত্তিকা। একদমই না।
বেহায়ার মতো উজ্জ্বল থেকে আবার ঠিকানা নিয়েছে ও। অনেক ভেবেছে কোন অজুহাত খুৃঁজে না পাওয়াতে মৃত্তিকা ভাবলো সোজা বলে দিবে, দেখতে এসেছে ও পূর্ণ’কে। নিশ্চিত চমকাবে সিনিয়র ভাই।
ওর ভাবনার মাঝেই মৃত্তিকা পৌঁছালো নিদিষ্ট স্থানে। বিল্ডিংটার দিকে তাকিয়ে নিলো দুই একবার। বেশ সুন্দর গোছালো একটা ছোট্ট বাগান সম্মুখে এরপরই বাড়ী। যদিও মৃত্তিকাদের বাসার বাগান আরো বড় তবে ওর ভালো লাগলো এই ছোট্ট বাগানটা।
রিক্সা ওয়ালা ডাকতেই মৃত্তিকা নেমে গেলো। লোকটাকে ভারা বেশি দিয়ে সরস গলায় বললো,
— চাচা দোয়া করবেন আমার জন্য।
লোকটা পান খাওয়া দাঁত কেলিয়ে হেসে বললেন,
— পরিক্ষা নি মামুনি?
মিনমিন করে মৃত্তিকা বলে উঠলো,
— অনেক বড় পরিক্ষা চাচা।

ধীর পায়ে এগিয়ে কলিং বেল চাপার মিনিট দুই পরই মাঝ বয়সী সুন্দরী এক নারী এগিয়ে এলেন। মৃত্তিকা মাস্ক আর হিজাব পরিধান করাতে ওর চেহারা বুঝা গেলো না নাহয় পূর্ণ’র মা এক দেখায় চিনে ফেলতেন৷ ছেলের ফোনে অসংখ্য ছবি দেখেছেন।
সম্মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মৃত্তিকা’কে না চিনতে পেরে জিজ্ঞেস করলেন,
— কে তুমি?
— আসসালামু আলাইকুম আন্টি।
পূর্ণ’র মা মিষ্টি হাসলেন। মেয়েটার গলার স্বর বেশ নমনীয়। সালামের জবাব দেয়ার পরই মৃত্তিকা কথা গুছিয়ে নিলো,
— আসলে আমি পূর্ণ ভাইয়ার ভার্সিটিতে পড়ি। তিনি অসুস্থ তাই একটু দেখা করতাম আরকি যদি অনুমতি দেন তো।
ইতিমধ্যে অনেকেই দেখা করে গিয়েছে পূর্ণ’র সাথে তাই অতশত না ভেবে দুই তলার রুমটা দেখিয়ে বললেন,
— ডানপাশের রুমেই আছে।
মৃত্তিকা’কে ভেতরে নিয়ে কি খাবে জিজ্ঞেস করলেই মৃত্তিকা অল্প হেসে বললো,
— অন্য দিন খাব আন্টি। আজ দেখা করে চলে যাব। বাবা’কে বলে আসিনি।
পূর্ণ’র মায়ের চমৎকার লাগলো মেয়েটাকে। এতটা নরম, সরল মেয়ে এই যুগে দেখা দুষ্কর। হাতে থাকা খুন্তি দেখিয়ে বললেন,

— পূর্ণ’র পছন্দের চপ বানাচ্ছি। রুমে যাও। খেয়ে যাবে।
মাথা দুলিয়ে পা বাড়ালো মৃত্তিকা। এক একটা সিঁড়ির ধাপ যেন তার আড়ষ্টতা বাড়িয়ে তুলছে। এতক্ষণের সাহস গুলো লজ্জায় পরিণত হচ্ছে। পা ঠেলেঠুলে উঠলো সিঁড়ি ভেঙে। দরজাটা আধ খোলা৷ ভদ্রতা সহিত নক করতেই ভেতর থেকেই গম্ভীর ও ভাঙা স্বর ভেসে উঠলো,
— আসো।
ধ্বক করে উঠলো মৃত্তিকা’র বুক। হৃদপিণ্ড লাফাতে লাগলো। মুখের মাস্কটা খুলে দরজা ঠেলে ঢুকতেই হতবাক হলো দুইজনই। পূর্ণ’র লাল চোখ,ভাঙা চোয়াল আর দূর্বল শরীরটা দেখে কেঁপে উঠে মৃত্তিকা’র চড়ুই সমান মন। কেঁদে উঠে তার অক্ষিকোটর। এদিকে হতভম্ব হয়ে বসে আছে পূর্ণ। চোখ ঝাপটে আবারও বুঝার চেষ্টা চালালো। না সঠিক দেখছে ও। তার প্রাণনাশী মৃত্ত দাঁড়িয়ে। মৃত্তিকা ছুটন্ত পায়ে এগিয়ে এলো। চোখ উপচে পড়া পানি। ভাঙা স্বরে শুধু বলে উঠলো,

— আপনাকে এমন দেখাচ্ছে…..
আর কিছু বলা হলো না। গলায় আটকে যায় কথা। পূর্ণ নিজেকে ধাতস্থ করলো। না গলা যাবে না। এই নারী এতটা এগিয়ে আসবে তা তার ভাবনার অতীত। কিভাবে চলে এলো এতদূর? রাশভারি গলায় পূর্ণ বলে উঠলো,
— এখানে কিভাবে এলেন আপনি?
জিজ্ঞেস করলো না ধমকালো বুঝলোনা মৃত্তিকা। কিছু বলার ভাষা হারিয়ে ফেললো পূর্ণ’র রাগী দৃষ্টি দেখে। লোকটা রেগে কিন্তু কেন? পূর্ণ গমগমে গলায় আবারও জিজ্ঞেস করলো,
— কি কাজ? একা এসেছেন?
— হু।
— কেন?
— আ..আপনাকে দেখতে।
— হয়েছে দেখা? যান এবার। জাস্ট গো মৃত্ত।
মৃত্তিকা’র আটকানো পানি বেরিয়ে এলো। ধরা গলায় আকুল আবেদন করলো,
— আপনি রেগে কেন? আ’ম সরি। আরেকটু থাকি? আপনি এত অসুস্থ কিভাবে হলেন? আমি ঐ দিন ইচ্ছে করে ওনার উপর পরি নি। বিশ্বাস করুন।
এত আবেগ ও দমাতে পারলো না পূর্ণ’কে। জোরে এক ধমক দিয়ে বললো,

— জিজ্ঞেস করেছি আমি? হ্যাঁ? যান এখান থেকে। আর কখনো যেন না দেখি। বলিনি দূরে থাকতে? কেন আসলেন?
ধমক গুলো ছিলো ঘর কাঁপানো সেখানে ছোট্ট শরীরটা ও মৃত্তিকা’র কেঁপে উঠা স্বাভাবিক। এতটা অপমান কি না বাসায় একটু দেখতে আসাতে। দৌড়ে বেরিয়ে গেল গেলো মৃত্তিকা। পূর্ণ উঠে দাঁড়ানোর আগেই জোরে শব্দ হলো। মুখ থুবড়ে হুমরি খেয়ে ফ্লোরে পড়েছে মৃত্তিকা। চোটটা লাগলো একদম চেহারাতে। সাদা মেঝেতে লেগে গেলো নাক থেকে পড়া র*ক্ত। দূর্বল শরীরটা টেনে দাঁড় করিয়ে ডেকে উঠলো পূর্ণ,
— মৃত্ত? মৃত্ত? ঠিক আছেন? কথা বলুন! মৃত্ত!
বহু কষ্টে উঠে দেয়ালে ভর দিয়ে রুম থেকে বের হতেই দেখলো মৃত্তিকা নেই। ফ্লোরে র*ক্ত দেখেই বুঝে গেলো মৃত্তিকা পড়েছে এখানে। ঝুঁকে হাত দিলো র*ক্ত’তে।
বুক ক্ষতবিক্ষত হলো পূর্ণ’র। তখনই ওর মা দৌড়ে এসে ছেলেকে দেখে জিজ্ঞেস করলেন,

— এই পূর্ণ, তোকে দেখতে মেয়েটা এলো। কি হয়েছে ওর? মুখে ভরা র*ক্ত নিয়ে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো?
পূর্ণ চোখ বুঁজে নিলো। মাথা ঘুরাচ্ছে তার। আস্তে করে রুমে ঢুকে বিছানায় বসে কাঁপা হাতে ফোনটা নিলো। কল লাগালো এক নাম্বারে।
মৃত্তিকা আসার ঠিক আগ মুহূর্তে কল এসেছিলো অপরিচিত এক নাম্বার থেকে। পূর্ণ’র ক্ষতি করার জন্য ওত পেতে আছে কিছুজন। তাদের থেকে মৃত্ত’টাকে লুকাতেই তো এতকিছু। এক ঝামেলা মিটলো সেখানে আরেকটার উৎপত্তি। মৃত্তিকা’কে ওর বাসায় যদি ওদের কেউ ঢুকতে দেখে তাহলে নিশ্চিত এবার পূর্ণ’কে হটাতে মৃত্তিকা’র ক্ষতি করবে। মাথা কাজ করে না পূর্ণ’র।
ওর মা ছেলেকে এতটা ভেঙে পড়তে দেখায় পাশে বসে কাঁধে হাত রাখলেন। পূর্ণ মাথা রাখলো মায়ের কাঁধে। শুধু বললো,

— সব এত জটিল কেন আম্মু? ও কেন এলো?
— কে কেন এলো? মেয়েটা কে ছিলো পূর্ণ?
মায়ের এহেন প্রশ্ন বুঝলো না পূর্ণ। মৃত্তিকা’কে দেখে তো চিনার কথা। পূর্ণ অবাক স্বরে বললো,
— তুমি চেনো না কে?
— না তো। মুখে মাস্ক পড়া ছিলো যখন এলো। আর যখন গেলো তখন তো মুখে র*ক্ত লাগা দেখলাম। বুঝলাম না চেহারাটা তবে ভারি মিষ্টি মেয়েটা।
দীর্ঘ শ্বাস ফেললো পূর্ণ। শুকরিয়া আদায় করলো। তাহলে কেউ দেখে নি ওর মৃত্ত’কে।
মায়ের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বললো,
— আব্বু’কে ডাকো।
ওর বাবা আসতেই পূর্ণ ওর মা-বাবা’র দিকে একপলক তাকিয়ে সহজ সরল গলায় বললো,
— আমি বিয়ে করব। ব্যাবস্থা করো।
হতভম্ব, হতবাক হয়ে পরলেন দুইজন। পূর্ণ তাদের চাহনি উপেক্ষা করে বললো,

— কিচ্ছু লাগবে না। জাস্ট যা আছে তা নিয়ে তৈরী থাক৷ আজই বিয়ে করব আমি।
ওর বাবা হতভম্ব ভাব কাটিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন,
— পাগল তুই? কাকে বিয়ে করবি? শরীর ভালো না তোর? আর এখন বিয়ের সময়?
পূর্ণ ঠান্ডা গলায় প্রতিত্তোরে বললো,
— পাগল না উন্মাদ আমি। শরীর বউ পেলেই ভালো হবে। শরীর তার সেবা চায়। নিজের তো বউ আছে তুমি তো বুঝো নাকি? আর বিয়ে, জন্ম, মৃত্যু এর আবার সময় লাগে নাকি। মৃত্ত’র বাবা’কে ফোন লাগাও। আর চিন্তা করো না। বউ পালার বয়স, সামর্থ্য দুটোই আছে আমার।
ছেলের কথা বার্তা লাগামহীনতায় ওর মা আলত মারলো বলিষ্ঠ বাহুতে। পূর্ণ অসহায় চাহনি দিলো। মুখ ফুটে আবারও বললো,

শান্তি সমাবেশ পর্ব ১৫+১৬

— বউ লাগবে আম্মু।
— এনে দিব।
— এখনই লাগবে। আজকেই।
— আগে ঠিক হ।
— ওকে এনে দাও তাহলেই ঠিক হয়ে যাব।
উঠে দাঁড়ালেন পূর্ণ’র মা। স্বামী’র দিকে তাকিয়ে শুধু বললেন,
— আমি গোছগাছ করি চলো আমার সাথে।
বাবা ধাতস্থ করলেন নিজেকে। অসহায় লাগে মাঝে মধ্যে নিজেকে। একটা মাত্র ছেলে এভাবে বিয়ে করবে?

শান্তি সমাবেশ পর্ব ১৯+২০