Home শান্তি সমাবেশ শান্তি সমাবেশ পর্ব ২৩+২৪

শান্তি সমাবেশ পর্ব ২৩+২৪

শান্তি সমাবেশ পর্ব ২৩+২৪
সাইয়্যারা খান

দলীয়ভাবে আজ দুপুরে একটা বৈঠক হয়েছিলো। অভ্যন্তরীণ সকল কার্যক্রম কিভাবে হবে না হবে তা নিয়েই আলোচনা হয়েছিলো। পূর্ণ দলের নেতা হওয়ার দরুন তার উপস্থিত কাম্য হওয়ারই ছিলো। তার বিয়ের বিষয়টা গোপনীয় এখন পর্যন্ত। কেউ জানে না। সেখানেই বৈঠক শেষে যখন মৃত্তিকা’র জন্য শপিং এ যায় পূর্ণ। যা যা নিয়েছে তার বেশির ভাগই শাড়ী। প্রথম শাড়ীতে দেখে পূর্ণ’র অবস্থা অনেকটা বেগতিক হয়েছিলো তাই তো সোজা না করেছিলো মৃত্তিকা যাতে শাড়ী না পরে। কিন্তু এখন সেটা কোন সমস্যা না। প্রতি মুহূর্তে বেগতিক হওয়ার হক এবং অধিকার দুটোই তার আছে। অল্প সল্প অবশ্য নরমলা পোশাক ও নিয়েছে। শপিং থেকে বের হওয়ার পথেই কল আসে ভার্সিটি থেকে। গাড়ি নিয়ে সোজা পূর্ণ সেখানে পৌঁছায়। চেয়ারম্যান স্যারের সাথে প্রায় ঘন্টা খানিক আলাপ হয়। যাবতীয় কাজ শেষে বের হয়ে গাড়ির দিকে আসতেই চোখ যায় গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সাফারাতের দিকে। পূর্ণ না দেখার ভান করে চলপ আসতে নিলেই পেছন থেকে ঠাট্টা’র ছলে সাফারাত বলে উঠে,

— দুই দিনের নেতা’র এমন ভাব মানায়?
মাথা চিরবিড়িয়ে উঠে পূর্ণ’র৷ পাঞ্জাবীর হাতাটা গুটাতে গুটাতে এগিয়ে এসে সোজা দাঁড়ায় সাফারাতের মুখোমুখি। চোখে তার তীক্ষ্ণতা। সাফারাত মুচকি হাসে যা গা জ্বালাতে সক্ষম পূর্ণ’র। থমথমে গলায় পূর্ণ শুধু বললো,
— মানুষ ঠিক কতটা বেহায়া হলে এতটা অপমানের পরও ফিরে আসে কথা বলতে।
— মানুষ ঠিক কতটা জোচ্চোর হলে নিজের উপর নিজে হামলা করিয়ে সবার নজর কাড়ে?
মাড়ি শক্ত হলো পূর্ণ’র। দাঁত খামটি মে’রে বললো,
— নোংরা রাজনীতি খেলাতে হাত নোংরা হবেই৷
— নোংরা নাহয় পরিষ্কার করে নিতি।
— তোর পরামর্শ তোর শু*য়ো*রে*র বাচ্চা বাপ’কে দে যাহ্।
কথাটা বলেই পা ঘুরায় পূর্ণ তখনই কানে বেজে উঠে,
— ঐ মেয়েটা…..

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

কথাটা বলার সাথে সাথে সাফারাতে’র নাক বরাবর ঘুষি মা’রে পূর্ণ। গলগলিয়ে র*ক্ত ছুটতেই তাতে হাত ছুঁয়ায় সাফারাত। না পূর্ণ মাত্রা ছাড়াচ্ছে আর সহ্য করা যাচ্ছে না। পাল্টা হামলা সরুপ সাফারাত ও পূর্ণ’র চোয়ালে ঘুষি মা’রে। মুখে নোতনা স্বাদ হয় পূর্ণ’র৷ দুই হাতের পাঞ্জাবি গুটিয়ে সাফারাতে’র কলার টেনে ধরে পরপর কতগুলো আঘাত করলো। সাফারাত আজ ছাড় দিলো না। নিজের বলিষ্ঠ দেহ দিয়ে সর্বোচ্চ প্রতিরোধ করলো। রেশপূর্ণ গলায় বললো,

— ঐ মেয়েটাকে ছেড়ে দে৷ ছেড়ে দে ওকে। কি ক্ষতি করেছে ও তোর?
পূর্ণ দিক হারা হয়ে জোরে নিজের মাথা দিয়ে সাফারাতের মাথায় বারি মে’রে হাঁফাতে হাঁফাতে শুধু বললো,
— ওনার নাম মুখে আনবি না৷
— মৃত্তিকা।
— জা*নো*য়া*র নাম নিবি না ওনার!
কথাটা বলে মুখ বরাবরই আবার আঘাত করে পূর্ণ। সাফারাত এবার হুট করে চিৎকার করে বলে,
— মৃত্তিকা হাওলাদার! মৃত্তিকা হাওলাদার!
পূর্ণ রাগে ফেটে পরে। ওর মৃত্ত’র নাম কিছুতেই সাফারাতে’র মুখে শুনতে চায় না ও। ওর রাগের মাঝেই সাফারাত জোরে পরপর তিনটা ঘুষি মা’রে ওকে৷ ছিটকে পড়ে পূর্ণ৷ ঘটনা ঠিক ভার্সিটির বাইরে হওয়াতে মানুষ জড়ো হতে সময় নিলো না৷ পূর্ণ’র দলের লোকজন ও ততক্ষণে এসে হাজির। চাইলেই সাফারাত’কে আটকাতে পারতো পূর্ণ কিন্তু আটকায় না। সাফারাত যখন চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় তখনই মৃদু কন্ঠে শুনতে পায়,
— ওনাকে কেড়ে নেয়ার কথা মাথায়ও আনিস না রাত। তোর বাপ নেকড়ে হলে আমি সিংহ৷

চোখ বন্ধ করে হেডবোর্ডে হেলান দিয়ে পূর্ণ এতক্ষণ যাবৎ সব ভেবে যাচ্ছিলো। সাফারাতের আজকের ব্যাবহার ভাবিয়ে তুলছে পূর্ণ’কে। অজানা আসঙ্কায় বুক কেঁপে যাচ্ছে বারংবার। সাফারাত ঠান্ডা মেজাজের মানুষ। এটা পূর্ণ জানে। ভয়ংকর কোন কিছু তার মস্তিষ্কে খেলা করছে। কপালের ব্যান্ডেজের উপর হাতের স্পর্শ পেতেই চোখ মেললো পূর্ণ। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্তিকা। পূর্ণ’র বড্ড মায়া লাগলো তার পূর্ণ্যময়ী’কে দেখে। একদিনের ব্যবধানে তার মৃত্ত নেতিয়ে গিয়েছিলো আর এখন বিষাদে ভরপুর পরেছে। এতটা দুঃখ আজকের দিনে না পেলেও হতো।
হাত ধরে নিজের পাশে বসালো পূর্ণ ওকে। তেমন কোন পরিবর্তন নেই মৃত্তিকা’র মাঝে। শাড়ীটা ও যেন কোনমতে জড়িয়ে আছে শরীরে। পূর্ণ’র বুকটা যেন আহত হলো বেশ এতে। এটা মোটেও তার পূর্ণ্যময়ী’র প্রাপ্য না। পূর্ণ নিজের হাতের মুঠোয় পুরে নিলো মৃত্তিকা’র হাত। কাঁটা ঠোঁট দিয়ে চুমু খেলো তাতে। নির্বিকার তখনও মৃত্তিকা। পূর্ণ নরম গলায় বললো,

— শাড়ীটা খুলে নিন মৃত্ত। ঐ যে ওখানে ব্যাগগুলোতে আপনার জন্য কিছু আছে।
মৃত্তিকা যেন যন্ত্রের ন্যায় উঠে আলমারি খুলে সামনে পাওয়া একটা নাইট ড্রেস নিয়ে ওয়াসরুমে চলে গেল। সেদিকেই নির্বিশেষে তাকিয়ে রইলো পূর্ণ। মৃত্ত’টা আজ এতটা উদাস কেন? এতটা বেপরোয়া ব্যবহার তার তো কখনো ছিলো না। মেয়েটা কেন জানি সকাল থেকেই গুমরে ছিলো যা তখন পূর্ণ’কে ওমন অবস্থায় দেখে থমকে গিয়েছিলো। পূর্ণ অবশ্য কিছুক্ষণ আগেই জিজ্ঞেস করছিলো যাতে মৃত্তিকা’কে বাবা’র বাসায় দিয়ে আসবে কিন্তু মৃত্তিকা না জানিয়েছে। আর কিছুই বলে নি।
পূর্ণ ভেবেছিলো হয়তো মৃত্তিকা যেতে চাইবে কিন্তু তার ভাবনাকে ঠুকনো করে ভালোবাসাটাকে উর্ধে রেখেছে মৃত্তিকা। এতেই যেন পূর্ণ আভাস পায় তার জন্য তার পূর্ণ্যময়ী কতটা ব্যাকুল। তবে তার এই উদাস ভাবটাও মানতে সায় পূর্ণ’র এই প্রেমিক মন।

বেশ সময় নিয়ে বের হলো মৃত্তিকা। পরণে তার ঢোলা ঢালা পোশাক। মুখ চোখ ধুঁয়ে এসেছে একদম। কিছুটা ভেজা কেশ তার গলায় লেপ্টে। পূর্ণ ঢোক গিললো। তৃষ্ণা জাগছে তার। না পানির না বরং ভিন্ন কিছুর। এই যে এখন মন চাইছে মৃত্ত’টাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে ভেজা গলায় মুখ গুজে দিতে। তখন যে লজ্জায় নেতিয়ে পরবে তার মৃত্ত সেটাও জানে পূর্ণ। অথচ এখন মাথা ভার হয়ে আছে। তবুও অদম্য উচ্ছাস নিয়ে ইচ্ছেটা পূরণে ব্যাস্ত হলো পূর্ণ। আস্তে করে উঠলো বিছানা ছেড়ে।

মৃত্তিকা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুলগুলো বাঁধার জন্য মাত্রই দাঁড়িয়েছিলো তখনই হঠাৎ পাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শে শিউরে উঠে তার দেহপিঞ্জর। কাঁপন ধরে সর্বাঙ্গে। সর্বোচ্চ পর্যায়ে তা পৌঁছাতে দায়িত্ব স্বয়ং পূর্ণ নিলো বোধহয়। গলা থেকে মুখ তুলে হাত রাখলো মৃত্তিকা’র কাঁধে। চেষ্টা করলো তা উন্মুক্ত করার। তৃষ্ণায় ধুঁকতে থাকা পথিকের ন্যায়ই তার ছটফটানো। মৃত্তিকা’র যেন পেট মুচড়ে উঠছে। আকষ্মিক ভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো পূর্ণ’কে। জোরে শ্বাস টেনে পূর্ণ ও জড়িয়ে নিলো। শব্দ হলো। বাড়তে থাকলো। মৃত্তিকা ছাড়লো না। কেঁদেই যাচ্ছে সে। কিসের কান্না তা জানা নেই। শুধু জানে কাঁদতে হবে এখন। তার কাঁদতেই হবে।

গতকাল থেকে তার মন চাইছে কাঁদতে অথচ সে অপারগ কিছুতেই সুযোগ পায় নি কাঁদার। সুযোগ দেয় নি তাকে কেউ। না গতরাতে বাবা দিয়েছে বিদায়ের সময় না এখানে আসার পর পূর্ণ দিয়েছে। অথচ মৃত্তিকা’র মন গতরাত থেকে চাইছে গলা ফাটিয়ে কাঁদতে। বাবা’র বুকে ঢুকে কাঁদতে। হঠাৎ হওয়া এতকিছুর ভার তার মন যে সইতে পারছে না। এতকিছু একবারে কেন হয়ে যাচ্ছে যেখানে পূর্ণ’র সাথে বিয়েটাই মানতে পারছে না ওর কুসুম কোমল এই মন?

আস্তে ধীরে ওকে বুকে নিয়ে বিছানায় বসলো পূর্ণ। সময় দিলো ঠান্ডা হতে। মন চাইলেও আবার সময়টা দিতে পারলো না। কেন জানি সহ্যই হয় না এই কান্না। তার নারীটির এই অশ্রু ঝরা কোনভাবেই তার মন মানতে নারাজ। এবার বুক থেকে তুলার চেষ্টা করে চোখ মুছতে চাইলো পূর্ণ। লাভ হলো না। নরম ভাবে থামতে বললেও থামলো না মৃত্তিকা। অধৈর্য হলো পূর্ণ। ধমকে উঠলো কিছুটা,
— থামতে বলেছি না আমি? বলেছি? কেন কাঁদছেন এত?
ছিটকে পূর্ণ থেকে সরে গেলো মৃত্তিকা। কান্না গিলে নেয়ার চেষ্টা করলো। হচ্ছে না কোনমতেই। অস্পষ্ট স্বরে ডেকে উঠলো,”বাবা”।

মৃন্ময় হাওলাদারের সামনেই দাঁড়ানো মিঠি’র মা। মিঠি বসা পাশের সোফায়। আলতো হাসলেন মৃন্ময় হাওলাদার। কিছুটা পানি গিলে গলা ভিজিয়ে বললেন,
— আম্মা যাতে কিছু টের না পায় মিঠি’র মা। ব্যাপারটা ভালো হবে না। আশা করি আমার কথা দুইজনই মানবে।
মিঠি প্রশ্ন করলো,
— মামা আপা কেন এলো না আজ?
— পূর্ণ মাথায় আঘাত পেয়েছে।
আঁতকে উঠলো সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুই ব্যাক্তি। আহাজারি করতে করতে মিঠি’র মা বললেন,
— দেখতে যাবেন না আপনি?
— আগামী কাল যাব। আম্মা একটু সামলাক নিজেকে,এরপর। আমাকে দেখলে এখন দুর্বল হয়ে যাবেন।
কথাটা বলে উঠে দাঁড়ালেন। পুণরায় মিঠি’র দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বললেন,
— মিঠি আবার আপা’র সামনে যেন মুখ না খুলে। ব্যাপারটা ভালো হবে না। বুঝাতে পারলাম।
মিঠি মুখ নামিয়ে বসে রইলো। চোখ দিয়ে টুপটাপ ফোঁটায় ফোঁটায় পানি পরছে। একবার শক্ত কন্ঠে এমন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে চাইলো কিন্তু দমে গেলো আবার। এই বাড়ী ছাড়া আশ্রয় স্থল বলতে কিছুই নেই তার আর তার মায়ের। মিঠি চুপ করে বসে থাকাতে ওর মা’ই বলে উঠলো,

— ও কিছু বলবে না কাউকে।
গম্ভীর দৃষ্টিতে একবার তাকিয়ে মৃত্তিকা’র রুমে চলে গেলেন মৃন্ময় হাওলাদার। দরজাটা লক করে বসলেন তার রাজকন্যাহীন খাটে। চোখ দিয়ে পানি গড়ালো দুই ফোঁটা অনুতাপের। জীবনটা আজ ভিন্ন হলে মন্দ হতো না। একটা সুন্দর সংসার হলে খারাপ হতো না। পরক্ষণেই ভাবলো তার সংসারটা সুন্দর ই ছিলো। রাজকন্যা ছিলো তার। কখনো কোন অভাব মনে হয় নি তার অথচ আজ নিজেকে নিঃস্ব মনে হয়। তার রাজকন্যা দান করে আজ ভিখারির ন্যায় হয়ে গিয়েছেন তিনি৷ হাত পা ছড়িয়ে বেডে শুয়ে বালিশে মুখ গুজলেন। মা মা ঘ্রাণটা তীব্র ভাবে নাসারন্ধ্রে ধাক্কা দিচ্ছে। অতলে হারিয়ে যান তিনি। বাঁচানোর যেন কেউ নেই। কেউ নেই তার এখন।

মৃত্তিকা গুটিয়ে শুয়ে আছে। এদিকে ছটফট করে যাচ্ছে পূর্ণ। ছটফটানি’র কারণ শুধু তার দেহের যন্ত্রণা না বরং পাশের এই নারী’র যন্ত্রণা। পূর্ণ এখন মনে হয় নীল রঙা বিষ এই মৃত্ত। পূর্ণ জানে এই নারী তার সর্বনাশ ডেকে আনবে তার প্রেমে ডুবিয়ে অথচ সে বারবার পান করতে চায় তার প্রেম সুধা। এখনও কিছুটা তেমনই৷ শরীর তার উত্তাপে পুড়ে যাচ্ছে অথচ দেহ চাইছে এই সম্মুখে থাকা নারীকে। করলোও পূর্ণ তাই। হাত রাখলো মৃত্তিকা’র পিঠে। গরম হাতের স্পর্শ দেয়ে চোখ মেললো মৃত্তিকা। ঘুম তার চোখে ধরা দেয় নি। সব কিছুতেই কেন জানি ধোঁয়াসা মনে হয় সাথে শোক বাবাহীনা। ফোনে বারবার কথা বলছে, লাভ হচ্ছে না।

গভীর হচ্ছে পূর্ণ’র ছোঁয়া। মৃত্তিকা সরে গেলো না। পারলো না। ঠোঁট কামড়ে নিলো দাঁত দ্বারা। কেন জানি কোনকিছুই তার বোধগম্য নয়। ঘটনাগুলো এতই দ্রুত হচ্ছে যে মৃত্তিকা এখনও খাপ খাওয়াতে পারছে না। বাকিদের ব্যাবহার এতটাই সহজ যেন এমনটাই হওয়ার ছিলো। কই মৃত্তিকা’র তো কখনো মনে হয় নি যে পূর্ণ’র সাথে তার এহেন বিবাহ লিখা ছিলো? একটা বারও মনে হয় নি যে একরাতের ব্যবধানহীন বিয়ে সহ বাসর লিখা ছিলো?
ওর ভাবনার মাঝেই কোমড় টেনে কাছে নিলো পূর্ণ। সেই ধমকের পর থেকে পূর্ণময়ী’টা তার অভিমানে ভরপুর হয়ে আছে। কোথায় যাবে পূর্ণ তার অভিমানী’কে নিয়ে? একদম নিজের সাথে মিশিয়ে নিতেই মৃত্তিকা ঘ্রাণ পেলো। কেমন একটা মাতাল মাতাল ঘ্রাণ আসে পূর্ণ থেকে। ইশ যদি পরিস্থিতিটা ভিন্ন হতো নিশ্চিত তাহলে এই সিনিয়র ভাই পূর্ণ’র ঘ্রাণে মাতাল হয়ে স্বর্গে বিচরণ করতো মৃত্তিকা। গরম শরীরে যখন পূর্ণ মিশালো তখনই কানে উষ্ণ ঠোঁটের ছেঁয়াও পেলো মৃত্তিকা। ধীরে ধীরে তা বাড়লো বৈ কমলো না। মৃত্তিকা খিঁচে আছে। চোখ বুকে খাঁমচে ধরলো পূর্ণ’র বুকের দিক। টুপটাপ বৃষ্টি’র ন্যায় কিছুক্ষণ চুমু’র বর্ষণ ঘটালো পূর্ণ। বুঝার চেষ্টা করলো তার মৃত্ত’র অভিমান ভেঙেছে কি না। হাত দিয়ে গালে ছুঁয়ে দিলেও চোখ খুললো না মৃত্তিকা।

পূর্ণ’র জানা নেই অভিমান কিভাবে ভাঙায়। কখনো কোন মেয়ের পেছনে ঘুরে এসব করা হয় নি। করা হয়েছে ডিপার্টমেন্ট সহ জুনিয়রদের শাসানো। যদিও সেটার যথেষ্ট কারণ থাকতো। এখন আফসোস হচ্ছে। আগে পড়ে ও মৃত্তিকা রাগ বা অভিমান করলে পূর্ণ ধমকাতো। সেই ধমকেই অবশ্য কাজ হতো। মৃত্তিকা অভিমান ভুলে যেতো তবে এখন উপায়?
এখন যে ধমাকনো যাবে না সেটা পূর্ণ জানে। বউ একটা মাত্র ওর। বুকের ভিতর ঢুকিয়ে রাখবে পূর্ণ তবুও ধমকাবে না এখন।
বিভিন্ন কলাকৌশল অবলম্বন করেও লাভ হলো না। ওর কলাকৌশল বলতে সেই চুমুটুমু খাওয়া।
অবশেষে ব্যার্থ সৈনিকের ন্যায় অ*স্ত্র ফেললো পূর্ণ। মৃত্তিকা’কে বুকে চেপে নিলো একদম। সেভাবেই উঠে আধশোয়া হয়ে কপালে ওষ্ঠ ঠেকিয়ে মিনতির সুরে বলতে লাগলো,

— আমি তো অভিমান ভাঙাতে পারি না মৃত্ত। আগে তো ধমকে দিতাম,এখন কি করব বলুন তো। আদর ছাড়া আর কিছুই তো পারি না আমি। কিভাবে ভাঙাবো আমার পূর্ণ্যময়ীর অভিমান?
কথাগুলো বলে তাকালো মৃত্তিকা’র দিকে। গোল গোল চোখে ওর দিকেই অন্ধকারে তাকিয়ে আছে মৃত্তিকা। অল্প হাসলো পূর্ণ। এমনিতে দিনের আলোয় কিছুতেই পূর্ণ’র চোখে তাকাতে পারে না এই নারী অথচ এখন কেমন অবলীলায় তাকিয়ে সে। পূর্ণ চটপট করে সেই চোখ দু’টোতে চুমু খেয়ে নিতেই বিরক্ত হওয়া কন্ঠে শুনা গেলো,
— আর কিছু পারেন না এটা ছাড়া?

কথাটা যে মুখ ফস্কে বেরিয়েছে মৃত্তিকা’র তা পূর্ণ বুঝে গেলো কারণ এটা বলেই জিভে কামড় দিয়ে মুখ নত করেছে ও। পরক্ষণেই ভাবলো ভুল বলে নি মৃত্তিকা। সেই বিয়ে হলো গত রাতে। একটা গোটা দিন পার হলো৷ বউ’কে দেয়া বলতে এই চুমু আর আদরই দেয়া হয়েছে। এর অবশ্য কারণ ও আছে। প্রেমের কথা তেমন একটা পারে না পূর্ণ। আবেগ খুব কম কাজ করে তার মধ্যে। বাবা-মা ব্যাতিত সবার সাথেই তার ব্যাবহার গম্ভীর। এমনকি হাসি ঠাট্টা ও করা হয় না তার। বাবা’কেও সমীহ করে কথা বলা হয় না। যা মুখে আসে সোজা সাপ্টা বলে দেয়। এই গুণটা থাকার দরুন ই হয়তো আজ মৃত্তিকা তার বুকে। এতটা কাছে। মৃন্ময় হাওলাদার তার এই গুণটা বেশ পছন্দ করেছিলেন।
হঠাৎ কিছু ভাবলো পূর্ণ। মৃত্তিকা’র অভিমান, হুট করে এমন চুপ করে যাওয়া, কেমন শক্ড হওয়া সবটাই কি স্বাভাবিক নয়? গত রাতে কিভাবে বিয়ে হয়েছে সাথে পূর্ণ সময়হীন নিজের অধিকারের বিস্তার ঘটিয়েছে, এতেই তার মৃত্ত যতটা না অসুস্থ হয়েছে তার থেকে বেশি নিশ্চুপ হয়েছে তখন পূর্ণ ওভাবে দেখে। অথচ যখনই মৃত্তিকা ওকে আঁকড়ে কেঁদে ফেললো তখনই সেই কান্না সহ্য করতে পারে নি পূর্ণ তাই তো ধমকে দিয়েছে।

বিয়ের আগে হয়তো ধমকগুলো মৃত্তিকা ওতটা কষ্ট পায় নি যতটা পেয়েছে আজকের ধমকে। চালাক চতুর পূর্ণ’র মস্তিষ্কে সবটা পরিষ্কার হতেই বিচলিত হলো ওর মন। বাবা’র আদুরী মৃত্তিকা নিশ্চিত সদ্য ফুটা ভালোবাসার থেকে এমন ব্যাবহার আশা করে নি।
অস্থির হলো পূর্ণ। মৃত্তিকা’কে বুকে নিয়ে উঠে বসলো। মৃত্তিকা হঠাৎ এহেন আচরণে নিজেও ভয় পেয়ে গেলো। কি মনে করে পূর্ণ’র কপালে হাত রাখতেই চমকে উঠলো। আজও অসম্ভব গরম। নিশ্চিত মাথায় পাওয়া আঘাত থেকে এমনটা হয়েছে।
মৃত্তিকা কিছু বলতে নেয়ার আগেই পূর্ণ নিজের খসখসে হাতের তালু দিয়ে আঁকড়ে ধরে মৃত্তিকা’র নরম কোমল গাল। সাথেই অনুভব হয় ভেজা ভাব। বিচলিত পূর্ণ’র ধকধক করে উঠে। দারুন শুনায় এই প্রথম তার ভীতু কন্ঠ,

— মৃত্ত? মৃত্ত আমার, আমার ভুল। আমারই ভুল। আপনাকে সময় দেই নি আমি। আমার উচিত ছিলো আপনাকে স্বাভাবিক হতে দেয়া। কি করব বলুন। আমি নিজেকে অনেক কষ্টে আটকে আটকে রেখিছিলাম মৃত্ত। আপনাকে বুঝাতে পারব না কতটা ব্যাকুল ছিলাম আমি।
একটু থামলো পূর্ণ। পুণরায় বলা শুধু করলো,
— আপনি একজন মেয়ে হয়ে আমার প্রেমে যতটা ছটফট করেছেন,আমার প্রতি যতটা আকর্ষণ আপনার ছিলো, যতটা সন্নিকটে আপনি আমায় চাইতেন তার থেকে বহু গুন হাজার গুন আমি চাইতাম মৃত্ত। আমার পুরুষ সত্তা বারবার আপনায় চাইতো। আপনার ছোঁয়া চাইত। দাপিয়ে বেড়াতে আমার সর্বাঙ্গে যখনই আপনার সন্নিকটে থাকতাম। তাই সবসময় নিজেকে দূরে দূরে রাখতাম।

আর যখন পেয়ে গেলাম তখন একদমই আটকাতে পারলাম না মৃত্ত। একদমই না। আমার দেহ, আমার মন কেউ বাঁধ মানলো না। এর মানে কি আপনি কি ভাবছেন আমি আপনার দেহে’র প্রেমে পড়েছি?
ভুল ভাবনা আপনার মৃত্ত। পূর্ণ আকাঙ্খা , তার ভালেবাসা, তার প্রেম এই দেহের সানিধ্য থেকে অনেক উপরে। সুউচ্চে আপনি আমার জন্য মৃত্ত। আমি বুঝাতে পারছি না।
এত কথা একসাথে বলাতে হাঁপাতে লাগলো পূর্ণ। মৃত্তিকা হা হয়ে শুনেই গেলো। বুক থেকে নড়লো না। একটুও না। কানে বারংবার বেজে যাচ্ছে পূর্ণ’র সকল কথা। ও নিজে জানে কতটা পুড়েছে পূর্ণ’র সানিধ্য পেতে,কতরাত বাবা’র বুক ভিজিয়েছে। এই পূর্ণ’র জন্যই তো সেখানে পুরুষ হিসেবে পূর্ণ’র চাওয়াটা আরো অধিক হওয়াটাই স্বাভাবিক।
মৃত্তিকা’র চোখ টলমল করছে। পূর্ণ শুধু শেষ বার বললো,

— আপনি না চাইলে আর কখনো আমি ছুঁয়ে দিব না।
কথাটা বলেই গাল থেকে হাত দুটো সরিয়ে নিলো পূর্ণ ওমনিই কেউ ঝাপিয়ে পড়ে তার ওষ্ঠে। মৃত্তিকা যতটা পারছে আঁকড়ে ধরছে ওকে৷ পূর্ণ হতবাক এহেন আচরণে। ও জানে নিজে ও যতটা আবেগহীন ঠিক ততটাই আবেগী ওর মৃত্ত। এ জন্যই হয়তো ওর কথায় দিক হারিয়ে নিজের ভালোবাসা প্রকাশ করতে চাইছে।
নিয়ন্ত্রণে থাকতে পারলো না পূর্ণ নিজেও। চাইলেও মৃত্তিকা ঠিকঠাক ভাবে কিছুই করতে পারছে না তাই সবটা পূর্ণ করে নিলো। ছাড়া পেতেই হাঁপিয়ে উঠা মৃত্তিকা পূর্ণ’র কাঁধে মুখ গুজে ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো,

— আ…আমি সরি। অনেক সরি। আপনাকে এমন সব ফিল করানোর জন্য। আমি কিছুতেই কা..ল থেকে সব গুছিয়ে উঠ..উঠতে পারছি না। সব কেমন। এভাবে ক..কেন? বাবা’কে ছাড়া থাকতে কষ্ট হচ্ছে আমার। আম..আমি ভালোবাসি আপনাকে। সত্যি বাসি। অনেক বাসি। বাবা’কেও বেশি ভালেবাসি। আমি কষ্ট দিতে চাই নি কাউকে। কিন্তু কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না এইসব….
আর বলতে পারলো না। পূর্ণ’র গলা জড়িয়ে ধরেছে কোন এক সময়ে অথচ খেয়াল করে নি কেউ। পূর্ণ শান্তির শ্বাস নিলো। মৃত্তিকা’র মনের লুকায়িত কথাগুলো আর পূর্ণ’র অপ্রকাশিত অনুভূতি দুটোই আজ প্রকাশিত হলো। দাবিয়ে থাকা সকল ভাবনা ফুটে উঠলো দু’জনের মুখে৷
ঘাড়ে ভেজা অনুভব করতেই পূর্ণ ভাবনার জগত থেকে বেরিয়ে এলো। মৃত্তিকা’র মুখটা ওর গলা থেকে ছাড়িয়ে বেশ গম্ভীর স্বরে জানালো,

— আপনার চুমু হয় নি মৃত্ত। কিছুই তো পারলেন না। সবটা আমিই করলাম।
মৃত্তিকা থমকালো। এমন সব কথা পূর্ণ থেকে প্রত্যাশিত নয়। ওকে অবাক করে পূর্ণ আবারও বললো,
— ইউ কান্ট কিস ইন এ গুড ওয়ে মৃত্ত। আমি শিখিয়ে দিচ্ছি। ঠিক আছে?
কথাটা ব’লেই যেই না ওষ্ঠ মিলিত হবে আচমকা মৃত্তিকা লাফিয়ে উঠে বললো,
— আপনার আবারও জ্বর আসছে। মেডিসিন দিতে হবে।
বেশ বিরক্ত হলো পূর্ণ তা তার চেহারাতেই ফুটে আছে। মৃত্তিকা উঠে ড্রয়ার থেকে মেডিসিন নিয়ে তা পূর্ণ’কে দিলো। চুপচাপ তা খেতেই পূর্ণ আবদারের স্বরে বললো,

— এখন আপনি আপনাকে দিবেন আমায় মৃত্ত?
কি সুন্দর আবদার। মৃত্তিকা কিছু বলার ও সুযোগ পেলো না। হাজার হলেও বিয়ে নামক পবিত্র সম্পর্কে জড়ানোর পর থেকে কোন এক অদৃশ্য শক্তি ওকে পূর্ণ থেকে দূরে থাকতে দেয় না। পূর্ণ’র আহবানে সাড়া না দিয়ে থাকতে দেয় না।
দীর্ঘ সময় সময় মৃত্তিকা যখন পূর্ণ’র ঘ্রাণে লেপ্টে গেলো তখন গভীর নিঃস্বাস ফেলে ওর এলোমেলো কেশে হাত বুলালো পূর্ণ। কপালে চুমু খেয়ে আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করলো,
— আমার সবটুকু দিয়ে আপনাকে আগলে রাখব মৃত্ত।
— বাবা’র কাছে যাব।
পূর্ণ চোখ বুজলো। গভীর ভাবে কিছু ভাবতে লাগলো। মৃত্তিকা’র উপর ঝুঁকে গলায় চুমু খেয়ে শুধু বললো,
— আমার আপনি ছাড়া একান্ত কেউ নেই মৃত্ত। আপনি আমার নিজের থাকুন। বলুন থাকবেন? আমাদের সংসার হবে মৃত্ত। আপনি,আমি, আমাদের অনেকগুলো বাচ্চা। বলুন? থাকবেন না?
মৃত্তিকা কান্নারত গলা অনুভব করলো। অবাক হয়ে বললো,

— থাকব।
— ছুঁয়ে বলুন আমাকে।
পুণরায় অবাক হলেও তা প্রকাশ না করে মৃত্তিকা পূর্ণ’র গালে হাত ছুঁয়াতেই পূর্ণ ওর ওষ্ঠ এগিয়ে এনে বললো,
— এখানে ছুঁয়ে কথা দিন মৃত্ত।
মৃত্তিকা না পেরে তাই করলো। পূর্ণ যেন বিশ্বাস করে নিলো তার মৃত্ত তাকে ছাড়বে না তাই তো শক্ত বন্ধনীতে আবদ্ধ করে নিলো। যতটা পারলো নিজের মাঝে নিলো। মৃত্তিকা শুধু আজকের পূর্ণ’র এহেন নতুন রুপ দেখে অবাক হলো।

ঘুটঘুটে অন্ধকার। সুউচ্চ বৃক্ষটাতে কানাকুয়া’র ডাকটা বিভৎসভাবে কানে বাড়ি খাচ্ছে। বুকটা যেন হাহাকারে কাঁদে সুঠাম পুরুষটার। ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ। তবুও পা থেমে নেই। বড় বড় গাছ গুলো পেরিয়ে সে দৌড়ে যাচ্ছে। হাতে থাকা ক্ষীন আলোটাতে সামনের পথ দেখে যাচ্ছে। কেউ নেই আশেপাশে। শুকনো পাতায় পা পড়াতে কেমন ভয়ংকর মচমচে শব্দ হচ্ছে। পাশ থেকেই বেঁজি’র আওয়াজ ও আসছে। এতে যেন মনের সান্ত্বনা পেলো সেই পুরুষ। বেঁজি আছে এরমানে অন্ধকারে সাপের ভয় নেই। কন্ঠনালীর কাঁপনটা অনেক বেশি আজ৷ শীতের প্রকোপ যেখানে কুয়াশায় ঢাকা রজণী সেখানে পুরুষটা ঘামছে। অদ্ভুত ভাবে নাকে একটা গন্ধ ধাক্কা খেলো। হাতে থাকা যন্ত্রটা ও লাগাতার টুটটুট শব্দ করে যাচ্ছে। ভয়ে এবার বুক কাঁপে তার। বারবার দোয়া তার একটাই এ রজণী কেটে যাক। ভুল হোক সব কিছু। মিথ্যা হয়ে যাক সব। হাঁটু গেড়ে মাটির উপর বসতেই ভেজা ভাব অনুভূব হলো। মৃদু আলোতে তরলটা আঠালো অনুভব করতেই চোখের সামনে মেলে ধরলো। লাল রঙের তরলটা আর কিছুই না বরং র*ক্ত। ভয়ানক ভাবে তখনই কারো মানুষ রুপি গর্জন কানে এলো৷

সাফারাত ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো। নভেম্বর মাসের এই ঠান্ডা ভোরে সে ঘেমে উঠেছে। দুই হাতে চেহারাটা চেপে কেঁদে উঠলো একসময়ের শক্ত সেই পুরুষ। হু হু বাড়লো সেই কান্নার বেগ। চিৎকার জুড়ে দিলো একসময়। না পাওয়ার বেদনা, আক্ষেপ তার আক্রোশে ভরপুর এখন। বেশ সময় নিলো কেঁদে নিজেকে শান্ত করলো। এমন স্বপ্ন বিগত কত বছর ধরেই দেখে আসছে সে। আজও ব্যাতিক্রম ঘটে নি।
ঘড়িতে বাজে তিনটা। উঠে সোজা ওযু করে তাহাজ্জুদে দাঁড়ালো সাফারাত। প্রতিটা সেজদায় তার পুরুষদেহ কাঁপলো অনবরত। চোখের পানিতে ভাসলো চোয়ালের চাপ দাঁড়ি। মোনাজাত শুধু শান্তি চাইলো। শুধু শান্তি।

পূর্ণ টানা দিয়ে উঠে বসলো। শরীর বেশ হালকা তার এখন। আশেপাশে মৃত্তিকা’কে না দেখেই ডেকে উঠলো,
— মৃত্ত? মৃত্ত!
উত্তর এলো না। উঠে সুন্দর মতো বেড গুছালো পূর্ণ। এটা তার অভ্যাস। ওয়াসরুমে টোকা দেয়াতেই সেটা খুলে গেলো। ভ্রু কুচকে ফ্রেশ হতে গেলেই নাসারন্ধ্রে বারি খেলো তীব্র মেয়েলি সুঘ্রাণ। এমন ঘ্রাণ তার ওয়াসরুমে এই প্রথম। নিশ্চিত মৃত্তিকা সাওয়ার নিয়েছে। পূর্ণ ঝুড়িতে থাকা মৃত্তিকা’র শাড়ীটাও ধুয়ে নিয়ে একেবারে বের হলো। বারান্দায় মেলে পুণরায় রুমে এসেও দেখা মিললো না মৃত্তিকা’র। গায়ে একটা পাতলটা টিশার্ট জড়িয়ে বের হলো রুম থেকে। বাবা’কে দেখেই বুঝলো মাত্র হেটে এসেছে। বেফাঁস ওর বাবা’কে দেখলেই মুখ থেকে বের হয় এমনটা না। আগে বাবা কিছু বলে এরপরই না পূর্ণ উত্তর দেয়। বাবা ওকে দেখেই বলে উঠলেন,

— শরীরে নজর দাও একটু। কি অবস্থা করেছো নিজের?
— দুই দিন হলো বিয়ে করলাম আব্বু। পরিশ্রম বেশি যাচ্ছে। বুঝোই তো।
একেবারে অক্কার মা চক্কা হয়ে গেলেন ওর বাবা। উনি তো শুধু মাত্র ছেলের শরীরের কথা বলতে চেয়েছিলেন আর এই ঠোঁট কাটা ছেলে বলে কি। মিনমিন করতে করতে রুমে হাঁটা দিলেন তিনি।
পূর্ণ বাবা’কে পাত্তা দিলো না। কিচেনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মা’কে ডেকে বললো,
— আম্মু, আমার বউ কোথায়?
পূর্ণ’র মা বের হতে হতে গাঢ় হেসে বললেন,
— তোর বউ একার নাকি? আমার মেয়ে আমার সাথে কিচেনে।
পূর্ণ যেন সময় নিলো না। মা’কে ঠেলে কিচেনে ঢুকতেই দেখা মিললো মৃত্তিকা’র। পূর্ণ যেহেতু শাড়ী বাদে তেমন কিছু আনে নি তাই শাড়ী পড়েই মৃত্তিকা কোমড়ে আঁচল গুঁজে রান্না করছে। খালি কিচেনে একা বউ পেয়ে মন পুলকিত হলো ওর। পেছন থেকে আলত করে হাত রাখলো মৃত্তিকা’র কোমড়ে। চমকে উঠে যেই না মৃত্তিকা’র হাত থেকে চামচটা পড়লো ওমনি পূর্ণ’র মা চলে এলো ভিতরে। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্তিকা। পূর্ণ’র মা না বুঝতে পেরে জিজ্ঞেস করলো,

— কি হয়েছে? মৃত্তিকা, মা আমার, ব্যাথা পেয়েছো?
— না। হাত থেকে চামচ পড়ে গেলো।
তীক্ষ্ণ চোখে ছেলেকে একবার দেখে নিলেন তিনি। পরপর হাতে করে পরটার প্লেট টা নিয়ে চলে গেলেন। পূর্ণ চামচটা তুলে সিঙ্কে রাখতে রাখতে একটু বিরক্ত গলায় বললো,
— এত এত গভীর স্পর্শ দেই তাও আমার এই অল্প স্পর্শ চেনেন না আপনি?
মৃত্তিকা ঘুরে দাঁড়িয়ে ধীর গলায় শুধু বললো,
— আমি চিনেছি কিন্তু হঠাৎ হওয়াতে চমকে গিয়েছিলাম শুধু।
পূর্ণ একটানে নিজের কাছে নিলো ওকে। চোখ ঘুরালো সারামুখে। আদুরে একটা মুখ এই মৃত্ত’র। দেখলেই আদর আদর লাগে। নাকের ডগায় একটা চুমু খেয়ে বললো,

— এত অভিমানি কি আমি অভিমান ভাঙাতে পারি না বলেই?
— রাগ করি নি। ছাড়ুন না।
পূর্ণ আরেকটু কোমড় আঁকড়ে নিজের কাছে এনে ফিসফিস করে বললো,
— আমি কি বলেছি রাগ করেছেন? বলেছি অভিমানি আমার অভিমান করেছে।
— আচ্ছা আমি কোনটাই করি নি। ছাড়ুন। আন্টি আসবে।
— আসুক।
— আপনি একটা বেলাজ মানুষ।
কথাটা বলেই জিভ কাটলো মৃত্তিকা। কি বলতে কি বলেছে ও। আস্তে ধীরে চোখ তুলতেই দেখলো দুষ্ট চোখে পূর্ণ তাকিয়ে ওর দিকে। মৃত্তিকা’কে কিছু বলার সুযোগ না দিতেই কার্যসিদ্ধি সম্পূর্ণ করে চলে গেল। এদিকে হতভম্ব মৃত্তিকা ঠাই দাঁড়িয়েই রইলো। মাত্র এটা কি করে গেলো পূর্ণ? কথাটা ভাবতে অজান্তেই হাতটা গেলো নিজের ঠোঁটে।

নাস্তার টেবিলে বসা সবাই। পূর্ণ’কে এই প্রথম ওর মা পেট পুড়ে খেতে দেখলেন। সকালে সবজি সিদ্ধ সহ ডিম, দুধ ছাড়া তেমন কিছু খাওয়া ওর পছন্দ না সেই ছেলে কি না আর পরটা খাচ্ছে। তাও একটা দুটো না এই পর্যন্ত তিন চারটা শেষ তার। পূর্ণ একপলক মা’য়ের দিকে তাকিয়ে খেতে খেতে বললো,
— নজর দিচ্ছো কেন আম্মু? পেট ব্যাথা করবে না আমার?
ভ্রু কুচকে ওর মা মৃত্তিকা’র দিকে তাকিয়ে বললো,
— তোমার এই জামাই কোনদিন ই এসব খায় না অথচ আজ বউ রান্না করায় সব ঠুসছে।
খেতে খেতে অল্প লজ্জা পেলো মৃত্তিকা সেই লজ্জা বাড়াতে পূর্ণ পালন করলো মূখ্য ভূমিকা,
— ঠিক মতো খান মৃত্ত।

কথাটা বলেই নিজে মৃত্তিকা’র মুখের সামনে খাবার ধরলো। না চাইতেই পূর্ণ’র চাহনি দেখে দমে গেলো মৃত্তিকা। মুখ খুলে খেয়ে নিলো চুপচাপ। পূর্ণ মৃত্তিকা’র লজ্জা বুঝলো। পুণরায় মৃত্তিকা’র মুখে খাবার তুলে দিয়ে বললো,
— সামনের এই কাপলদের দেখে লজ্জার কিছু নেই মৃত্ত। এরা নিজেরা রোম্যন্স করে কুল পায় না আপনার আর আমার রোম্যান্স দেখার সময় নেই তাদের। তাই লজ্জা না পেয়ে চুপচাপ হা করুন।
মৃত্তিকা’র যেন খাবার তালুতে উঠে গেলো। ওর মা তারাতাড়ি পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন। পূর্ণ ধরে পানি খাওয়াতেই ওর বাবা ধমকে উঠলো,
— খাবার সময় মেয়েটাকে শান্তি দাও পূর্ণ।
— কি বলো আব্বু। বউ আমার শান্তি তো আমিই দিব তাই না? তুমি নিজের চরকায় তেল দাও। তোমার বউ’কে শান্তি দাও।
লজ্জায় কান লাল হয়ে উঠলো মৃত্তিকা’র। আস্তে করে উঠে দাঁড়িয়ে বললো,
— আন্টি আমি চা নিয়ে আসি।
কথাটা বলেই ছুটন্ত পায়ে কিচেনে চলে গেল। পূর্ণ’র হেলদুল নেই অথচ মৃত্তিকা’র যেন লজ্জায় কান্না এসে যাবে। বাবা-মায়ের সামনে পূর্ণ কিসব কথা বলে?

রুমে ঢুকতেই পূর্ণ’কে উদাম গায়ে দেখে মৃত্তিকা কেটে পড়তে চাইলো। যা ছেলে এই সিনিয়র ভাই তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে মৃত্তিকা। এখন না কান্ড ঘটায় অথচ কান্ড ঘটেই গেলো। পা ঘুরাতেই পূর্ণ ডেকে উঠলো,
— মৃত্ত?
মনে মনে “সিট” বলে রুমে ঢুকলো মৃত্তিকা। একপলক পূর্ণ’র দিকে তাকিয়ে বললো,
— আজকে বাবা’র কাছে যাব না?
পূর্ণ টেনে নিলো নিজের কাছে। বাহুতে আটকে নিয়ে সোজা উঁচু করে নিতেই মৃত্তিকা চমকে উঠলো। আঁকড়ে ধরলো পূর্ণ’র কাঁধ। পূর্ণ ওকে কোলে নিয়ে বিছানায় বসতেই মৃত্তিকা সরতে চাইলো। চোখ ছোট ছোট করে পূর্ণ সোজা মৃত্তিকা’র হাত চেপে ধরে আঙুলের দিকে তাকিয়ে বললো,
— আপনার নখ কাটতে হবে মৃত্ত।
নিজের আঙুল ছাড়াতে চাইলো মৃত্তিকা। খুব সুন্দর একটা সাউজ করা তার নখগুলোতে। পূর্ণ’র হাতে আগেই নেইলকাটার ছিলো৷ একহাতে মৃত্তিকা’র ডানহাতের আঙুলগুলো চেপে ধরে যেই না কাটতে যাবে ওমনি লাফিয়ে সরে গেলো মৃত্তিকা। হাত পেছনে লুকিয়ে বললো,

— কাটব না নখ। আমার তো বেশি বড় না।
পূর্ণ বুঝি শুনার লোক? একদম চেপে ধরে কোলে বসিয়ে দশ আঙুলের সব নখ জিরো সাইজ করে দিলো। এদিকে টলমলে অসহায় চোখগুলো লাল হয়ে উঠলো। এমনিতেই চাপা স্বাভাবের মৃত্তিকা। বাবা বাদে ততটা ফ্রী না কারো সাথে। হাজার হলেও পূর্ণ’র সাথে অতটাও ফ্রী হতো পারে নি ও। তার মধ্যে বাবা কখনো জোর করে নি ওকে কিছুর জন্য। কখনোই না। সেখানে পূর্ণ জোর আর ধমক ব্যাতিত গত দুই রাত একদিন ধরে ভিন্ন রুপে মৃত্তিকা গলেছিলো।
পূর্ণ নখগুলো টিস্যুতে পেঁচিয়ে সাইডে রাখলো। মৃত্তিকা তখনও ওর কোলে। মাথাটা টেনে বুকে নিলেও মৃত্তিকা শক্ত হয়ে বসে রইলো। পূর্ণ বুঝলো। মাথা তুলে চুমু খেলো ওর পূর্ণ্যময়ীর চোখে। বদ্ধ চোখ দিয়ে গড়িয়ে পরলো পানির বিন্দু গুলো। পূর্ণ ডাকলো,

— মৃত্ত?
……..
— কথা বলবেন না?
— আমার অনেক প্রিয় ছিলো নখগুলো।
— আমার থেকেও বেশি?
মৃত্তিকা উত্তর দিলো না। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো।
পূর্ণ নিজের খোলা বুকে মৃত্তিকা’কে আঁচড় সহ পিঠে’র ক্ষতগুলো দেখালো। সাদা চামড়ায় বেশ গভীর দেখালো সেগুলো। পূর্ণ আবারও বুকে নিলো মৃত্তিকা’কে। মাথায় চুমু খেয়ে চুলে হাত বুলাতে বুলাতে বললো,
— আপনাকে আমি রোজ আদর করব মৃত্ত। কিন্তু এই নখগুলো প্রচন্ড ব্যাথা দেয়। পানি লাগলে মনে হয় কেউ মরিচের গুড়ো ঢেলে দিচ্ছে। এখন আপনিই বলুন আমার রোম্যান্সের শত্রু’কে কিভাবে বাঁচিয়ে রাখি?

গাড়িটা এসে থামলো মৃত্তিকা’র বাসার সামনে। ফুড়ফুড়ে মেজাজে নেমে এলো মৃত্তিকা। সামনে যেতেই পেছন থেকে আওয়াজ এলো,
— থামুন মৃত্ত।
মৃত্তিকা পেছনে ঘুরতেই পূর্ণ গাড়িটা লক করে এসে ওর হাত ধরে বললো,
— চলুন।
দরজা নক করতেই মিঠি’র মা খুলে দিলো। মৃত্তিকা’কে দেখেই কিছু বলবে তার আগেই মৃত্তিকা পূর্ণ’র হাত ছাড়িয়ে দৌড়ে ভেতরে চলে গেল। ওর বাবা উঠে আসতে নিবে তখনই ঝড়ের মতো ঝাপটে পড়লো কেউ তার বুকে। দুই হাতে গলা পেচিয়ে নিজের ঠাই করে নিয়েছে মৃত্তিকা। মৃন্ময় হাওলাদার স্তব্ধ। বিমূঢ়। আজ তার যাওয়ার কথা ছিলো কিন্তু তার মেয়ে যে আসবে তা জানা ছিলো না। নিজেকে ধাতস্থ করে দুই হাতে শক্ত করে জড়িয়ে নিলেন। বাবা’র উচ্চতা বেশি হওয়ার দরুন মৃত্তিকা কিছুটা ঝুলে পরলো বাবা’র গলা জড়িয়ে। কাঁধে ভেজা অনুভব করলেন মৃন্ময় হাওলাদার। তার কলিজা কাঁদছে। খুশিতে নাকি কষ্টে? মনটা যেন নিমিষেই উত্তর দেয়, তাকে দেখার খুশিতে আর দূরে থাকার কষ্টের দরুন এই কান্না। মাথাটায় অনবরত চুমু খেলেন তিনি। মন ভরলো না। একটুও না। আজ দুই রাত ঘুম হয় না তার। ঝটপট করে রাত কাটিয়ে দিয়েছেন তিনি। আজ কিছুটা যেন লাঘব হলো।
দরজায় তাকাতেই নজরে এলো দাঁড়িয়ে থাকা পূর্ণ। যদিও আগে এসেছিলো তবুও জামাই হিসেবে আজ প্রথম। মৃন্ময় হাওলাদার মৃত্তিকা’কে নামাতে নিলো। নামলো না মৃত্তিকা। ধরা গলায় বললো,

— বাবা আই মিস ইউ।
ঢোক গিলে নিলেন বড় বড় মৃন্ময় হাওলাদার। তার যে বুক ফেটে যাচ্ছে এটা কোনভাবেই বুঝানো যাবে না। মৃদু শব্দ করে হেসে মৃত্তিকা থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে কপালে দীর্ঘ চুমু খেয়ে একবাহুতে পুরে নিলেন। ওভাবেই হেটে দরজা পর্যন্ত যেতেই হাত ধরে পূর্ণ’কে ভেতরে আনলেন। পূর্ণ মুচকি হেসে বললো,
— আসসালামু আলাইকুম আব্বু।
সালামের জবাব দিয়ে একপাশে বুকে জড়িয়ে নিলেন পূর্ণ’কেও। মৃদু শব্দে জিজ্ঞেস করলেন,

শান্তি সমাবেশ পর্ব ২১+২২

— আমার আম্মা’র খেয়াল রেখেছো?
— দেখে নিন।
বুক থেকে পূর্ণ সরলেও সরলো না মৃত্তিকা। মৃন্ময় হাওলাদার আজ দেখে গেলেন তার মা’কে। শাড়ীতে তার বিবাহিত আম্মা। দুই রাতে যেন রুপ বদলে গিয়েছে। একেই বোধহয় বিয়ের সিরি বলে। চেহারায় বিবাহিতের ছাপ ফুটে উঠেছে, এতেই যেন শ্যামা রাজকন্যাকে আজ প্রথম রাণী লাগছে? পূর্ণ’র রাজ্যের রাণী।

শান্তি সমাবেশ পর্ব ২৫+২৬