শান্তি সমাবেশ পর্ব ৯+১০
সাইয়্যারা খান
রৌদ্রস্নাত একটা দিন। আজকের তাজা খবর,” ছাত্র সমাবেশে বো*মা হামলা করেছে বিপরীত পক্ষের দল”।
সকাল সকাল একটা হ্যাংলা বালক দৌড়ে দৌড়ে এটাই বলছে আর পেপার বিক্রি করছে। খবরের কাগজের খবর খুবই চাঙ্গা। গত রাত থেকেই নিউজ এজেন্সি সহ টিভি চ্যানেলগুলোতে ধুম লেগেছে খবরের। বড় বড় নেতারাও কিছুটা ক্ষেপে আছে। তাদের দলের অনেকেই ছিলো সেখানে। এতটা সিকিউরিটির মধ্যে দিয়ে কিভাবে এমনটা হয়? পুলিশের এসআই কে ডাকা হলো। লাভ কিছুই হচ্ছে না। গত বিকেলের সমাবেশের বো*মা হামলাটার আসল হোতা কে তাকে পাওয়া যাচ্ছে না।
সন্দেহের তালিকায় প্রথম ই আছে সাফারাত মির্জা। সোয়েব মির্জা’র বড় ছেলে। বাবা রাজনৈতিক কাজে সারাজীবন অতিবাহিত করেছে। ছেলেও ব্যাতিক্রম হয় নি। রাজনীতি তাদের র*ক্তে দৌড়ায়। গত সমাবেশের কর্মসূচির আয়োজন সহ পুরোটাই ছিলো পূর্ণ’র পক্ষে আর সাফারাত মির্জা হলো তার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। তাহলে তো অবকাশ রইলো না। এই বো*মা হামলা তার দলের কাজ। যেহেতু সাফারাত এর নাম আসছে সেহেতু তাকে গ্রেফতার করাটা এতটাও সহজ হবে না কারণ একটাই সোয়েব মির্জা। এতকাল রাজনৈতিক নেতা থাকায় দাপট তার কম না। ছেলেকে এত সহজে হাজতে যেতে দিবেন না। তবু্ও যেহেতু ঘটনা স্থলে অনেক নেতারা ছিলো প্রশ্নটা সেখানে এত এত নেতার জীবনহানীর। পুলিশে যতদ্রুত সম্ভব গ্রেফতার এর হুকুম এলো। সাফারাত এর অফিসে ওর কিছু চ্যালাপেলা পেলেও পাওয়া যায় নি সাফারাত’কে। আপাতত তাদের ই গ্রেফতার করা হলো। এটা দেখে অন্তত দলের লোকজন কিছুটা শান্ত হবে। নাহলে পুলিশের রাতের ঘুম হারাম করে দিবে এই মন্ত্রী’রা। টিভি চ্যানেলগুলোতে এখন গরম গরম নতুন খবর ছড়িয়ে গেলো।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
” গত কালে সমাবেশে বো*মা হামলার ঘটনায় পলাতক সাফারাত মির্জা। গ্রেফতার করা হয়েছে তার দলের লোকজনদের। রাজনৈতিক নেতা সোয়েব মির্জা কি পারবে ছেলেকে লুকিয়ে রাখতে নাকি এবার জেল খাটবে তার সুযোগ্য পুত্র?”
খবরের এই হেডলাইন দেখেই র*ক্ত টগবগিয়ে উঠলো সোয়েব মির্জা’র। বয়স হয়েছে তার তবুও শরীরে গরম এখনও সেই যুবক দশারই। যেই রাজনৈতি করতে করতে সে চুলে সাদা পাক ধরিয়েছে,যেই রাজনীতি তার থেকে কত প্রিয়জন ছিনিয়ে নিয়েছে, যেই রাজনীতি তার বংশে’র গৌরব সেই রাজনীতি’তে তারই ছেলে কি না কাঁচা খেলোয়াড়। অপমানের বিষয়। ভীষণ অপমানের বিষয়। তার ছেলে সাফারাত ব্যাতীত কে ই বা এই কাজ। এতটা বোকামি? তার দলের জন্য কতটা হানীকারক এই খবর সেটা কি সাফারাত জানে না? কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই হাতে থাকা চারকোণাকার গ্লাসটা ছুড়ে মারলেন। গর্জে উঠে বললেন,
— খবর পাঠা সাফারাত’কে। বল ওর বাপ ডাকে ওকে।
পাশে থাকা চল্লিশ ঊর্ধ্বে মাহিন মিয়া মাথা নেড়ে চলে গেলেন।
এদিকে বাবা’র কোলে মাথা দিয়ে সোফায় লম্বা হয়ে শুয়ে ছিলো মৃত্তিকা। শরীরে একটা বেবি কম্বল। মাথার চুলের ভাজে ভাজে একটা পুরুষ হাত বিলি কাটছে অতিযত্নে। নজর তার টিভির দিকে। মাত্রই নিউজে এসেছে গত কালের ঘটনায় জড়িত কয়েকজনকে পুলিশি হেফাজতে নেয়া হয়েছে। যদিও আসল ঘটনা সামনে আসে নি। কে বা কারা এর পেছনে দায়ী তা এখনও স্পষ্ট না। মৃত্তিকা’র মনে পরলো গত কালের ঘটনা।
গতকাল যখন তীব্র শব্দে দুটো বো*মা হামলা হলো তখন মানুষজন ভয়ে এদিক ওদিক ছুটছিলো৷ মৃত্তিকা সহ উজ্জ্বল আর হিমু ও চমকে গিয়েছিলো। কি হয়েছিলো সেটাই বুঝে উঠতে পারে নি কেউ। যদিও উজ্জ্বল আর হিমু মৃত্তিকা’র হাত ধরে ছিল কিন্তু ঘুটঘুটে অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছিলো না। কালো ধুঁয়ায় ছেঁয়ে গিয়েছিলো পুরো মাঠ। মৃত্তিকার যখন কাশি উঠে গেলো তখনই খেয়াল করলো কালো চাদরে ঢাকা কেউ ওকে প্রায় নিজের সাথে মিশিয়ে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মৃত্তিকা প্রথমে ছুটার চেষ্টা করলেও পরে আর করে নি কারণ ওটা পূর্ণ ছিলো আর ওদের পিছনে উজ্জ্বল আর হিমু ও ছিলো। মৃত্তিকা যদিও প্রথমে ভয় পেয়ে ছিলো কারণ পূর্ণ ওকে বকতে পারে এত ভীরে যাওয়ায় কিন্তু ওকে অবাক করে দিয়ে পূর্ণ কিছুই বলে নি। কাশি উঠাতে পূর্ণ ঝটপট পানি খাওয়ায় ওকে। মৃত্তিকা কিছু বলার আগেই পূর্ণ নিজের পাঞ্জাবি’র হাতা দিয়ে মৃত্তিকার নাকের কালি মুছে দেয়। মৃত্তিকা যেন ঘোরে ডুবেছিলো তখন। মাতাল হাওয়া লেগেছিলো বদনে। পূর্ণ’র ছোঁয়াটাই ছিলো এমন। এই প্রথম প্রথম মৃত্তিকার প্রেম জেগেছিলো। বুকের ভেতরের ছোট্ট হৃদপিন্ডটা চিৎকার করে বলছিলো,”মৃত্তিকা ইউ আর ইন লাভ উইথ দ্যা সিনিয়র পূর্ণ ভাই।”
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই লজ্জায় শ্যামলা মুখটা রাঙা হয়ে উঠলো। এত এত লজ্জা লুকাতে বাবা’র কোলে মুখ গুজে দিলো মৃত্তিকা। ওর বাবা এবার টিভি থেকে নজর নামালেন৷ মেয়ের পিঠে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
— আম্মা মাথা ব্যাথাটা কি আছে?
— না আব্বু।
— সত্যি বলছেন?
— একদম।
— ছেলেটা গতকাল ও আসলো কিন্তু ভিতর এলো না। তাকে বলবেন দাওয়াত আমার তরফ থেকে। এত উপকার করছে। আমার কলিজা’র হেফাজত করছে তাকে একটু আপ্যায়ন তো করতেই হয়।
— আচ্ছা বলব।
গতরাতে পূর্ণ নিজে এসে মৃত্তিকা’কে বাড়ী পৌঁছে দিয়েছিলো। শুধু কি পৌঁছে দেয়া পর্যন্ত সীমাবদ্ধ ছিলো? মোটেও না। একেবারে মৃত্তিকা’র বাবা’র হাতে তুলে দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে সালাম জানিয়ে বিচার দিয়েছিলো মৃত্তিকা’র নামে যে মৃত্তিকা’কে না করার পরও ও সমাবেশে গিয়েছিলো। ওকে যেন এ ব্যাপারে শাসন করা হয়৷ ভদ্রলোক ও জানান তিনি শাসন করবেন। পূর্ণ যাওয়ার পরই মৃত্তিকা যখন নিজের ময়লা শরীরটা নিয়ে বাবা’কে জড়িয়ে ধরলো তিনি আর শাসন করতে পারলেন না। মেয়েকে আদর করে ফ্রেশ হতে বলেছিলেন। শাসনের বদলে বুকে নিয়ে ঘুম পারিয়েছিলেন। কপালে চুমু খেয়ে বলেছিলেন, “আমার রাজকুমারী আপনি। এখন বলুন তো আম্মা রাজকুমারী’কে শাসন করার ক্ষমতা কি আমার মতো সামান্য প্রজার আছে?”
মৃত্তিকা তখন বাবা’কে জড়িয়ে ধরে বলেছিলো,
“তুমি তো এই রাজকুমারীর বাবা। তোমার পুরো অধিকার আছে আব্বু।”
এটাই ছিলো শাসন। তিনি জানেন তার মৃত্তিকা’কে কিভাবে শাসন করতে হয়।
বাবা’র কথায় ধ্যান ভাঙলো মৃত্তিকা’র। বাবা ওর কপালে হাত বুলিয়ে বললেন,
— উঠুন এখন। বাইরে যেই বৃষ্টি আব্বু গরম গরম চা আর পাকোড়া ভেজে নিয়ে আসি। বারান্দায় একসাথে খাব।
— আমিও যাব।
বলে দুই লাফে উঠলো মৃত্তিকা। বাবা মেয়ে’র এই কিচেনের দৃশ্যটা বড়ই আদুরে। বড্ড ভিন্ন একটা চিত্র। হোক না কৃত্রিম তবুও তো চিত্রটা সুন্দর। চোখ ধাঁধানো সুন্দর। মিঠি’র মা গোপনে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এত বড় মেয়েকে যেভাবে পালেন মনে হয় ছোট সাত আট বছরের মেয়ে। এই মেয়ে বিয়ে হলে কিভাবে বাঁচবেন তিনি?
হিমু আজকে রুপা’র সাথে ক্যাফেতে এসেছে। নিজেকে যথাসম্ভব গুছিয়ে প্রদর্শন করার চেষ্টা করছে হিমু। কতটুকু হচ্ছে কে জানে? এই যে তার রোগাপাতলা শরীর তার মধ্যে এমন বেগুনী রঙের শার্ট। কতটুকু মানিয়েছে তাকে? চুলগুলো আজকে সকালে শ্যাম্পু করে আঁচড়ে এসেছে। এমনি সময় অল্প তেল দিয়ে নামিয়ে রাখে। ছোট থেকেই মা ওর চুলে তেল লাগিয়ে স্কুলে পাঠাত। লজিকটা দারুণ। তেল লাগিয়ে স্কুলে গেলে নাকি মাথা ঠান্ডা থাকে। তাতে পড়াশোনা ভালো হবে। হিমু সেটাই বিশ্বাস করত। পরিক্ষা’র দিন বেশি তেল লাগিয়ে যেত। কদুর তেল। মাথা ঠান্ডা রাখে। মা’য়ের প্রতি বিশ্বাসটা এতই গভীর ছিলো যে যেকোনো ভালোকাজেই যেত তখনই তেল লাগিয়ে যেত। এতে অবশ্য স্কুল সহ কলেজ আর এখন ভার্সিটিতেও কম কথা, কম লাঞ্ছনা সহ্য করে নি সে। তখন হাসত শুধু। ঐ যে মা’য়ের প্রতি বিশ্বাস সেটা ছিলো অগাধ। তাই কখনো কারো কথা গায়ে লাগে নি।
অথচ আজ পরিস্থিতি ভিন্ন। হোক না ক্ষুদ্র একটা পরিবর্তন তবুও হিমু করলো। নিজেকে রুপা’র নিকট তুলে ধরতে গ্রামের সাদাসিধা ছেলেটা নিজের বেশভুষা ত্যাগ করা শুরু করলো ধীরে ধীরে। এই পরিবর্তন কোথায় থামবে? কতটুকু ফলপ্রসূ হবে সেটাই দেখার বিষয়। উজ্জ্বল তাচ্ছিল্য হেসে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে খোলা মাঠে তাকালো। হিমু গিয়েছে পাশের ক্যাফেতে। উজ্জ্বল এত না করলো শুনলো না। না পেরে উজ্জ্বল একটা গালিও দিলো শেষে। লাভ হলো? একটুও না। চিরপরিচিত সেই নিষ্পাপ হাসি দিয়ে হিমু গেলো।
ঘন্টা খানিক গড়ানোর আগেই একটা কল এলো। উজ্জ্বল বিরক্তিতে মুখ কুচকালেও রিসিভ করে ঝাঁড়া মেরে বললো,
— কি কল দ্যাস ক্যান?
শুনা গেলো মিনমিন গলা,
— উজ্জ্বল দোস্ত সাতশ টাকা হবে?
— হিমুর বাচ্চা! শ্যালা ঐ দামড়ী তোর টাকায় মজ করে খেয়ে ভাগসে তাই না?
— আরে না না। শুন আমি এই মাসে বেতন পেয়েই দিয়ে দিব। দোস্ত প্লিজ।
উজ্জ্বল কল কেটে দিলো। মনে মনে শখানেক গালি দিলো রুপা’কে। তখনই দেখলো রুপা কয়েকজন বান্ধবী’র সাথে হেসে হেসে ভার্সিটির গেট পেরিয়ে আসলে। ওর মুখটা দেখেই একদলা থুতু ফেলে সামনে গেলো উজ্জ্বল।
হিমু মুখটা কাচুমাচু করে বসে আছে। উজ্জ্বল কফির কাপটা এগিয়ে দিয়ে আদেশের স্বরে বললো,
— শ্যালা পুরোটা কফি গিলবি। টাকা দিয়ে কিনসি।
হিমু হাসলো। উজ্জ্বল ও ওর হাসি দেখে মুখটা গম্ভীর রাখতে পারলো না। নিজেও হেসে কফিতে চুমুক দিলো। মৃত্তিকাও যোগ দিলো ওদের সাথে। ভার্সিটির গেট দিয়ে ঢুকার সময়ই কাচের দেয়াল দিয়ে দেখেছে ওদের এখানে। তখনই জানতে পারলো রুপা’কে হিমু শুধু একবার জিজ্ঞেস করেছিলো কি খাবে। তখনই এত এত ব্রেকফাস্ট অর্ডার করে রুপা। হিমু নিজে ছুঁয়ে ও দেখে নি। রুপা খেতে খেতে ওর দুইজন বান্ধবী ও আসে। তিনজন নিজেরাই খেয়ে দেয়ে হাত মুখে বিদায় জানিয়ে চলে যায়। মাস যেহেতু শেষের দিকে তাই হিমুর পকেট ছিলো হালকা। ভেবেছিলো কফি খাবে শুধু কিন্তু এতটা খরচ হবে ভাবে নি। দুইশত ত্রিশ টাকা ছিলো। যা দিয়ে বিল হবে না। তাতেই ঘাম ছুটে গিয়েছিলো। কি একটা অপমানের বিষয়। বিপদে বন্ধু কাজে দিয়েছে।
এতকিছুতেও হিমু রুপা’র বিরুদ্ধে কিছু শুনতে নারাজ। তার কথা রুপা কি আর জানত ওর পকেট হালকা। জানলে নিশ্চিত এক কাপ চা খেত?
ওর এতটা বিশ্বাস দেখে উজ্জ্বল আর মৃত্তিকাই ভয় পায়। এতটা বিশ্বাস কোনদিন ভাঙলে ছেলেটা ঘুরে দাঁড়াতে পারবে তো?
আজ এখনও পূর্ণ’র সাথে দেখা হয় নি। ক্লাস শেষে মৃত্তিকা দাঁড়িয়ে আছে। দেখা নেই পূর্ণ’র। কোথায় গেলো? প্রায় ঘন্টা খানিক পর আসলো পূর্ণ। ও জানতো ওর মৃত্ত অপেক্ষা করবে। হলো ও তাই। পূর্ণ’কে দেখেই সালাম দিলো মৃত্তিকা। পূর্ণ উত্তর দিয়ে বললো,
— অনেক লেট হলো?
— বেশি না এক ঘন্টা।
— শুনেছি অপেক্ষার এক মিনিট এক ঘন্টার সমান। সেখানে বললেন বেশি না এক ঘন্টা?
মৃত্তিকা মাথা নামালো। লজ্জা লাগছে আজ। নতুন নতুন নামহীন অজ্ঞাতনামা অনুভূতিগুলো জেঁকে বসেছে তাকে। ইশ! পূর্ণ ভাই বুঝে গেলো না তো? ফর্সা হলে আজ নিশ্চিত গাল দুটো লাল হতো? হায় আফসোস। এতটা লজ্জা কোথা থেকে আসলো? ওর অস্বাভাবিক আচরণে পূর্ণ কিছুটা সন্দিহান গলায় বললো,
— ঠিক আছেন?
— জ..জ্বি।
একটু স্বাভাবিক হয়ে মৃত্তিকাই বললো,
— আপনাদের সমাবেশের যারা ঝামেলা করেছিলো তাদের তো পুলিশ ধরেছে।
–হু।
বলে বাঁকা হাসলো পূর্ণ। এই রাজনীতি’তে সে অনেককিছু শিখেছে। নিজেকে ক্ষতির মুখে নিয়ে কিভাবে গল্পের মোড় ঘুরানো যায় তা জানা আছে ওর। ওর এই রহস্য ঘেরা হাসিটুকু রয়ে গেল মৃত্তিকা’র দৃষ্টির বাইরে।
শান্ত স্বরে শুধু শুনা গেলো, “আমি ভীষণ ক্লান্ত মৃত্ত।”
–তোমার মাথা ঠিক আছে আব্বু? সমাবেশে ঐ বো*মা হামলা আমি করাই নি।
সাফারাত নিজেকে নির্দোষ দাবি করলো বাবা সোয়েব মির্জা’র কাছে। ভ্রুতে কিঞ্চিৎ ভাজ করলো সোয়েব মির্জা’র। গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন,
— পরিকল্পনা ছিলো তোমার যে বো*মা হামলা করাবে তুমি। আমি না করার পরও জেদ চেপেছিলো তোমার। জানি তুমি মিথ্যা বলছো না। তাহলে কে করবে এই কাজ?
সাফারাত বাবা’র বিশ্বাস অর্জন করতে পেয়ে দম নিলো। মাথা ঝিমিয়ে উঠেছিলো তার গত কাল থেকে। তার দলের লোক কয়েকজন হাজতে। তার মধ্যে বাবা’র ডাক। সব মিলিয়ে তুঙ্গে ছিলো সে। ছিলো বলতে আছে এখনও। মাথাটা ডিভানে হেলিয়ে দিয়ে চিন্তায় মগ্ন হলো সে। অতঃপর মাথা ঘুরিয়ে বাবা’র দিকে তাকিয়ে রইলো। সন্দিহান গলায় বাবা’কে জানালো,
— আমি ভেবেছিলাম হামলাটা করব। লোকজন সব সেট ছিলো। পূর্ণ’র ভাষণ শেষ হওয়ার পর যখন মন্ত্রী’রা চলে যেত তখন করাতাম হামলা। কিন্তু তার আগেই সব লন্ডভন্ড হয়ে গেল। জানি না কে বা কারা বো*ম মারলো। মুহূর্তে ধোঁয়া আর অন্ধকারে ছেঁয়ে গেলো। আমার চাল উল্টে দিলো একদম।
— পূর্ণ’র দলের নেতৃত্ব ছিলো গত কাল। যে এই কাজ করেছে সে নিশ্চিত পূর্ণ’র শত্রু।
— শত্রুর শত্রু পরস্পর বন্ধু আব্বু।
— পরম বন্ধু।
কথাটা বলেই উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন সোয়েব মির্জা। পরপর হাসি থামিয়ে গম্ভীর স্বরে আদেশ করলেন মাহিন মিয়া’কে,
— খবর লাগাও মাহিন। কে জন্মালো ধরণীর বুকে যে আমার শিকার’কে থাবা মারলো।
মাহিন মিয়া একদম বাধ্য গোলামের ন্যায় জ্বি বলে সরলো সেখান থেকে। সাফারাত দুই হাতে চোখ মুদিত করলো। পরপর উঠে দাঁড়িয়ে গেল সটান হয়ে। একটু বিশ্রাম দরকার এখন। তার ছেলে-পুলেদের জেল থেকে ছুটানোর ব্যাবস্থা করা হয়েছে। এখন লম্বা গোসল নিয়ে ঘুম দরকার। নিজের বলিষ্ঠ দেহ নিয়ে সিড়ি বেয়ে রুমে ঢুকলো সে। গা থেকে সাদা রঙের পাঞ্জাবিটা খুলে কাউচে রেখে পা বাড়ালো সাওয়ার নিতে। ঝর্ণার ঠান্ডা পানিতে কিছুটা শান্ত হলো তার শরীর। ফর্সা চওড়া কাঁধ বেয়ে গড়িয়ে পরলো পানির অবাধ্য বিন্দু কণা। চাপ দাঁড়িতে আটকা পরলো কিছু পানি। সাফারাত একহাতে দাঁড়িতে থাকা পানিগুলো ঝেড়ে নিয়ে টাওয়াল পেচিয়ে বের হলো। ঠান্ডা শরীরে এসির বাতাসটা যেন রিমিঝিমিয়ে উঠালো তার পুরুষ দেহ। ভেজা চুল গুলো ঝেড়ে টিশার্ট জড়ালো গায়ে। আলস্য তাকে জেঁকে ধরলেও নামাজটা বাদ দেয়া পছন্দ নয় তার তাই তো তীব্র মাথা ব্যাথা নিয়েও সুন্দর ফরজ টুকু আদায় করে নিলো। এখন একটা ঘুম দিলেই সে চাঙ্গা হবে তা সে জানে। তাই টিশার্ট খুলে উবুড় হয়ে শুয়ে পরলো। ফর্সা পিঠের মাঝ বরাবর তার জন্মদাগটা যেন যে কাউকেই আকর্ষিত করে তুলবে।
ধৈর্য পূর্ণ’র অনেক। সহজে রাগ উঠে না। ঝামেলা হলো রাগ উঠলে আবার দমন ও করতে পারে না সহজে। যেমনটা হচ্ছে এখন। রাগ উঠছে তার। অধৈর্য হয়ে পরেছে সে। এই মেয়ে পেয়ে বসেছে একদম পূর্ণ’কে। তার মধ্যে কাঁদছে। সহ্য শক্তি ক্রমে ক্রমে কমে যাচ্ছে পূর্ণ’র। কেন কাঁদছে এতটা পূর্ণময়ী? কারণটা হাজার বার জিজ্ঞেস করেও উত্তর মেলে নি। এবার বাঁধ ভাঙলো পূর্ণ’র। ধৈর্যের বাঁধ। তবুও তার মৃত্ত’কে বরাবরের মতো ধীর কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
— মৃত্ত আমার বলুন কি হয়েছে? কেউ কিছু বলেছে আমার মৃত্ত’কে?
মাথা দুলালো মৃত্তিকা। রাগে ফেটে পরে সোজারে ঘুষি মারলো পূর্ণ কাঁচে’র অংশে। দরজার মাঝ বরাবর থাকা কাঁচটা মুহূর্তেই ঝনঝন শব্দে ভেঙে পরলো। মৃত্তিকা ভয়ে সিটিয়ে দূরে সরলো। পরক্ষণেই নজর গেলো পূর্ণ’র হাতে। টপটপ করে র*ক্ত পরছে সেখান থেকে। সকল ভাবনা বাদ দিয়ে মৃত্তিকা ঝট করে পূর্ণ’র কাটা হাতটা ধরলো। আতঙ্কিত গলায় চিন্তা শুধালো,
— ক…কি করলেন? হাত কেটে…
কথাগুলো যেন আটকে আটকে আসছে। জড়িয়ে যাচ্ছে বারংবার। নিজের কান্না ভুলে ব্যাগ থেকে রুমালটা বের করে চেপে ধরার আগেই হাত সরিয়ে নিলো পূর্ণ। মৃত্তিকা ছলছল চোখে তাকাতেই গম্ভীর কণ্ঠে পূর্ণ বলে উঠলো,
— আমি এই কাচের ভাঙা টুকরো গুলোর ন্যায়ই মৃত্ত। আমাতে হাত দিলে র*ক্তাক্ত হবেই।
–হোক।
দৃঢ় জবাব দিয়েই পূর্ণ’র হাতে রুমাল চেপে বললো,
–চলুন এখান থেকে।
— আগে বলুন তখন করিডরে কেন কাঁদছিলেন?
— আআ…
— তোতলানো বন্ধ করুন মৃত্ত। সোজা কথা জিজ্ঞেস করেছি সোজা উত্তর দিন।
মৃত্তিকা দ্বিধায় পরলো। কেন কাঁদতে গেলো? এখন যে ফাঁসলো? পূর্ণ’র হাতে রুমাল চেপে সেই হাতটা তখনও মৃত্তিকা’র দুই হাতের মুঠোয়। নত মস্তিষ্কে মৃত্তিকা গড়গড় করে বলে দিলো,
— সিনিয়র আপুরা আমাকে দেখে মজা নিচ্ছিলো। আমি কালো আর আপনি সুন্দর। এটাই বলছিলো৷ আপনি আমাকে নিয়ে মজা নিচ্ছেন পরে….
–পরে? পরে কি?
খুবই শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো পূর্ণ। মৃত্তিকা ঢোক গিললো। ঘুরিয়ে নিলো কথা। সজালো নিজের মতো। বলে উঠলো,
— বলেছে আপনি রাজনীতি করেন তাই যাতে আপনার থেকে দূরে থাকি।
কথাটা বলেই দম নিলো। পূর্ণ সন্দেহের অবকাশ রইলো না। এই মৃত্ত’কে ওর চেনা। এই কথার কারণে সে কাঁদে নি। পুণরায় কিছু জিজ্ঞেসাবাদ করার আগেই মৃত্তিকা অনুরোধের সুরে বললো,
— দয়া করে চলুন।
পূর্ণ নিজের জন্য না হলেও মৃত্তিকা’র জন্য গেলো। এমন ছোট খাট কত ব্যাথা পেয়েছে আগে অথচ এই ব্যাথার মেডিসিন লাগাতে হবে নাহলে তার মৃত্ত যে শান্তি পাবে না।
মৃত্তিকা মুখে না বললেও তার চোখ বলেছে অনেককিছু। খবর পূর্ণ’র কানে সময় নিবে না৷ তাই আপাতত প্রিয়তমার ভয় কমাতে হাতে একটা পট্টি বাঁধতেই হবে।
–দেখ হিমু সব কিছুর একটা লিমিট থাকে।
— এভাবে বলছিস কেন?
উজ্জ্বল এবার মহা বিরক্ত হলো। একটা মানুষ কতটা ঠিক কতটা হ্যাংলা হলে ঐ ঘটনার পরও একটা ঠকবাজ মেয়ের পিছনে ঘুরে? তাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখানো হচ্ছে তবুও বান্দা নাছর। কারো কথা তার কানে ঢুকছে না। আজকে যাচ্ছে পার্কে। রুপা নাকি দেখা করবে। উজ্জ্বল এবার একটা গালি দিয়ে বললো,
— ম’র তুই শ্যালা ঝুঁনা কাঠ।
বরাবরের মতোই কোন গালি বা কটু কথা গায়ে মাখলো না হিমু৷ পাঞ্জাবীটা পড়ে বেহায়ার মতো উজ্জ্বলের কাছে গিয়ে বললো,
— দোস্ত তোর ওই চকলেট ফ্লেভারের পারফিউম টা দে না।
— শ্যালা ছেঁচড়া। যা সর।
দাঁত কেলিয়ে একটু ফুসফুস করে পারফিউম লাগালো হিমু। আয়নায় নিজেকে সপ্তমবারের মতো দেখে বললো,
— টেনশন নিস না। পার্কে আর কি ই খাবে? বাদাম, মুড়ি আর ফুচকাই থাকে।
উজ্জ্বল ফোন থেকে নজর সড়ালো না। এমন ফালতু ছেলে আগে দেখে নি ও৷ মরুক ও। মনে মনে বলে ফোন ঘাটা শুরু করলো।
হিমু বেরিয়ে গেলো। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে উজ্জ্বল আবার ক্যাম্পাসে গেলো। এসেছিলো মাথামোটা হিমু’কে বুঝাতে যার পুরোটাই বৃথা।
পূর্ণ’র হাতে ব্যান্ডেজ হয়ে গিয়েছে। আপাতত দুইজন তাদের বিখ্যাত বট গাছের গোড়ায় বসে আছে। তখনই একটা ছেলে দৌড়ে এসে কিছুটা হাঁপাতে হাঁপাতে ডাকলো,
— ভাই।
পূর্ণ মৃত্তিকা’র দিকে একপলক তাকিয়ে বললো,
— পুরোটা শেষ করুন। আসছি দুই মিনিট।
মাথা নাড়ালো মৃত্তিকা। তার হাতে একটা স্যান্ডউইচ। টিফিন বাবা দিলেও সে সেটা জোর করে পূর্ণ’কে খেতে দিয়েছিলো যাতে পেইন কিলার নিতে পারে। পূর্ণ’র ক্ষুধা থাকায় সে পুরোটাই খেয়েছে কিন্তু পেট ভরে নি। চড়ুই সমান তার মৃত্ত। খাবার ও খায় ততটুকু। পূর্ণ’র মনে হয় খাবার যতটুকু খেয়েছে তা পেটের কোন এক কোণায় গিয়ে পরে আছে। তাই আবার চারটা স্যান্ডউইচ ক্যান্টিন থেকে নিয়ে এখানে এসেছে। পূর্ণ দুটো খেয়ে ফেললেও মৃত্তিকা একটা শেষ করতে পারে নি। বাধ্য হয়ে তৃতীয়টাতেও পূর্ণ ই কামড় বসিয়েছে।
ছেলেটা আড় চোখে একবার মৃত্তিকা’র দিকে তাকিয়ে বললো,
— ভাই আপনার ক্লাস মেট ইশিতাই বাজে কথা বলেছে ভাবী’কে। পুরো গ্যাং নিয়ে অপমান করেছে।
— কি বলেছে?
— ভাবীর গায়ের রং নিয়ে অনেক কথা বলসে। আপনি নাকি দুই দিন খেয়ে ছেড়ে দিবেন তাকে আর হুমকি ধামকি ও দিয়েছে যাতে আপনার থেকে দূরে থাকে। এছাড়াও বাপ-মা তুলে কথা শুনিয়েছে। ডিপার্টমেন্টের সবার সামনে অপমান করেছে।
শান্তি সমাবেশ পর্ব ৭+৮
হাত দুটো মুঠ করে নিলো পূর্ণ। তার সাদাসিধা মৃত্ত’কেএত জঘন্য কথা শুনানোর মশুস তো দিতেই হবে ইশিতা’কে। মেয়েটা বার বেরেছে অনেক।এতদিন কিছু না বললেও আজ ঐ মেয়ের ঠিকানা ঠিক করে ছাড়বে।
হেটে মৃত্তিকা’র সামনে পুনরায় এসে মৃত্তিকা’র ব্যাগ থেকে পানি নিয়ে ঢোক ঢোক করে অর্ধেক খেয়ে বললো,
— এতটা কান্না কিসের জন্য ছিলো মৃত্ত? বাপ-মা তুলে কথা বলায় নাকি আমাকে তুলে বলায়?
মুখে থাকা খাবার টুকু আর চিবোনো হলো না মৃত্তিকা’র। পূর্ণ কেন রেগে এমন প্রশ্ন করলো তা বোধগম্য নয়।
