Home শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ১
রুহানিয়া ইমরোজ

–” তুমি কী ভার্জিন ?
পাত্রের মুখে এমন অশালীন প্রশ্ন শুনে হতভম্ব হয়ে গেলো প্রিমা। অস্ফুটস্বরে বলল,
–” হোয়াট? ”
সামনে বসে থাকা মধ্য বয়স্ক মানুষটা নির্লিপ্ত স্বরে পুনরায় শুধাল,
–” জিজ্ঞেস করলাম, কারও নিকট নিজের ইজ্জত বিকিয়েছ কি-না।
পুনরায় বলা অসংলগ্ন কথাটা শুনে কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থাকে প্রিমা। পুরো ব্যপারটা মস্তিষ্কে ধরা দিতেই ঘৃণায় গা গুলিয়ে উঠে তার। রাগে হতবিহ্বল হয়ে শুধায়,

–” পাত্রী দেখতে এসে এমন প্রশ্ন করা কতটুকু সমীচীন মিস্টার জাহিদ?
প্রিমাকে রেগে যেতে দেখে বাঁকা হাসে জাহিদ নামের পুরুষটি। অতঃপর অলস ভঙ্গিতে বলে,
–” আমি অতো ভনিতা জানি না। বিয়ের আগে অন্য পুরুষের বিছানায় যাওয়া মেয়েলোক কে স্ত্রীর মর্যাদা দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্যই আগে জিজ্ঞেসা করে নিলাম।
প্রিমার বড় বড় শ্বাস ফেলে নিজেকে সামলালো। সামনে বসা ভদ্র লোকের বাচনভঙ্গি সুবিধার না হলেও কথাটা ফেলে দেওয়ার মতো নয়। সবটা বুঝলেও প্রিমা কেনো যেনো রাগ সামলাতে পারলো না। দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
–” সিভিতে স্পষ্ট লেখা আছে পূর্বে আমার কোনো রিলেশন ছিলো না। তাহলে আপনার মনে এই প্রশ্ন উদয় হলো কেনো?
জাহিদ নামের পুরুষটি চোখমুখ কুঁচকে বলল,

–” তুমি এতিম। পারিবারিক শিক্ষা কিংবা শাসন কোনোটাই পাওনাই। অন্যের ছায়াতলে বেড়ে ওঠা মেয়েদের চরিত্র কতটুকুই বা পবিত্র হয়?
প্রিমা স্তব্ধ হয়ে গেলো। বুকের কোথাও একটা তীব্র যন্ত্রণা অনুভূত হলো তার। এতিম হওয়াটা অন্যায়? পরিবার না থাকাটা তার দোষ? মানুষ কীভাবে পারে এসব বলতে? প্রিমাকে ওমন থম মেরে বসে থাকতে দেখে জাহিদ নামক যুবকটি গলা খাঁকারি দিয়ে মুখে মিথ্যে অনুতাপ ফুটিয়ে বলল,
–” তুমি বোধহয় মাইন্ড করেছো.. আসলে..
কথাটা সম্পূর্ণ হওয়ার আগে টেবিলে থাবা মেরে উঠে দাঁড়ায় প্রিমা। রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলে,
–” জাস্ট শাট আপ ব্লাডি বাস্টার্ড। আর একটা শব্দ উচ্চারণ করলে তোকে জীবন্ত কবর দেওয়ার ব্যবস্থা করবো আমি। সাহস কী করে হয় এসব বলার?
জাহিদ হতভম্ব হয়ে যায়। আশেপাশে তাকাতেই দেখে রেস্টুরেন্টের সকল মানুষ তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। বাধ্য হয়ে মিনমিনে স্বরে বলে,

–” শান্ত হও প্রিমা। আমি…
প্রিমা সজোরে আরেকটা থাবা বসায় টেবিলে। রাগ সামলাতে না পেরে সামান্য ঝুঁকে গিয়ে এক দলা থুতু ফেলে জাহিদের গালে। অতঃপর ঘৃণ্য চোখে চেয়ে বলে,
–” আমি এতিম। পারিবারিক শিক্ষা কিংবা শাসনের মাঝে বড় হইনি ঠিকই তবে আমার মাঝে মনুষ্যত্ব আছে। যা তোর মধ্যে নেই। তুই আস্ত একটা অমানুষ। তোর পরিবার তোকে আচারবিধি শেখাতে পারেনি। তাদের শাসন তোর নোংরা মন মানসিকতা পাল্টাতে ব্যর্থ।
এতটুকু বলে থামালো প্রিমা। সামান্য ব্রেক নিয়ে আবার বলল,

–” এরপর যদি তোর এই থোবড়া আমার সামনে পড়ে তাহলে থাবড় মেরে চ্যাপ্টা করে দিবো। মার্ক মাই ওয়ার্ডস।
বাক্যটা শেষ করে হনহনিয়ে রেস্টুরেন্টে থেকে বেরিয়ে যায় প্রিমা। জাহিদ নামক যুবকটি টিস্যু দিয়ে গাল পরিষ্কার করে আঞ্চলিক ভাষায় চিবিয়ে চিবিয়ে বলে,
–” মাইয়্যা মাইনসের ত্যাজ কেমনে কমাইতে অয় তা এই জাহিদের খুব ভালা মতো জানা আছে। এতিম দেইখা দয়া করসিলাম কিন্তু তুই তো মাগী। তোরে সোজা করতে অইলে আমারে মরদ অইতে অইবো। চিন্তা করিস না.. খুউব জলদিই তোরে খাঁচায় আনমু ময়না।

রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে রিকশায় চেপে বসলো প্রিমা। তখনও রাগে তিরতির করে কাঁপছে তার সমগ্র শরীর। সবচেয়ে বেশি রাগ হচ্ছে তার কলিগের উপর। উনি জোর করেছিলেন বলেই প্রিমা আজ দেখা করতে এসেছিলো এই নমুনার সাথে।
তার পুরো নাম অধরা ইসলাম প্রিমা। বয়স মাত্র তেইশ বছর। অনার্স তৃতীয় বর্ষের স্টুডেন্ট প্রিমা। লম্বায় প্রায় পাঁচ ফুট পাঁচ ইঞ্চি। পাতলা ছিমছাম হাড্ডিসার গড়ন তার। মুখের আদল মায়াবী। গায়ের রঙটা উজ্জ্বল ফর্সা। এক দেখায় যে কারও পছন্দ হওয়ার মতো সৌন্দর্য তার মাঝে বিদ্যমান।
তবে ছোট বেলা থেকে বাস্তবতা দেখে বড় হওয়া প্রিমা কখনো কোনোপ্রকার সম্পর্কে জড়ায়নি। এতিম মেয়েটার দিন কেটেছে অভাবের বিরুদ্ধে লড়াই করে। প্রিমা এতিম হলেও একা নয়। নিয়তি তাকে নিঃস্ব রাখেনি। প্রিমারা তিন বোন। বড় জনের নাম ফারজানা ইয়াসমিন তুলি এবং ছোটো জনের নাম মারজান আইরিন মেহরিমা। তাদের মধ্যে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও আত্মিক টান আছে। একে অপরের জন্য জান দিতেও দু’বার ভাববে না তারা।
খানিকটা সময় পেরোতেই প্রিমার মেজাজ ঠান্ডা হয়। তীক্ষ্ণ চোখজোড়া নমনীয় হয়ে আসে। মনের কোঠায় জমে এক রাশ আক্ষেপ। আকাশের দিকে মুখ করে অস্ফুটস্বরে বলে,

–” এর শেষ কোথায় বাবা? আর কত অপদস্ত হতে হবে আমায়? আর কত শুনতে হবে এসব নোংরা বাণী? পবিত্রতার প্রমাণ দিতে দিতে আমি ক্লান্ত বাবা। সমাজের বিরুদ্ধে লড়াই করে টিকে থাকাটা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ধৈর্য ফুরিয়ে এসেছে আমার। এবার একটু বিশ্রাম চাই ….
কথাগুলো বলতে বলতেই দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসলো তার। তার এই অবস্থা দেখলে কেউ বিশ্বাসই করবে না যে এটা খানিকক্ষণ আগেই সেই রায়বাঘিনী। ভাবনার মাঝে ডুবে থাকা প্রিমার ধ্যান ভাঙলো রিকশাওয়ালার প্রশ্নে,
–” কই যাইবেন আম্মা?
প্রিমা একটু সময় নিয়ে বলল,
–” উত্তরা বারো নম্বর সেক্টর ছয় নম্বর রোড। চৌধুরী গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজে।
রিকশাওয়ালা মাথা ঝাঁকিয়ে বললেন,

–” আইচ্ছা আম্মা।
প্রিমা কথা বাড়ালো না। মন ভালো নেই তার। মাথার মধ্যে ঘুরছে একশোটা চিন্তা। এই মাসের বাজার প্রায় শেষের পথে। অথচ সেলারি পেতে এখনো ঢের সময় বাকি।দুটো টিউশনির টাকা আঁটকে আছে যা সামনে মাসে পাবে। বাজার-সদাই না-হয় চালিয়ে নিবে কিন্তু মেহরিমার ভার্সিটির টিউশন ফী কিভাবে পে করবে ? চিন্তায় মনটা অশান্ত হয়ে গেলো তার। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবলো,
–” আল্লাহ ভরাসা। দেখা যাক নিয়তি কোথায় নিয়ে যায়…

ঢাকা দুই আসনের এমপি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন বিখ্যাত বিজনেসম্যান আরশিয়ান ইসফার চৌধুরী। সেই খুশিতে তার গ্যাংস্টার ভাই তাজরিয়ান জাওয়াদ চৌধুরী গণহারে মিষ্টি বিতরণ করছে। নেতৃত্ব অসাধারণ একজন নেতাকে পেয়ে অনেকে আনন্দিত অনেকে আবার বেজার। এসবই সকলের আলোচনার মূখ্য বস্তু হয়ে উঠেছে আজ।
সবাই যখন এসব আলোচনায় ব্যস্ত তখন বেঞ্চের এক কর্ণারে বসে থাকা মেহরিমা নিজের খাতায় ড্রয়িং করতে মশগুল। তা দেখে তার পাশে থাকা তাসফি বিরক্ত হয়ে বলল,
–” মেহুউউউউ! আর কত ডুবে থাকবি নিজের জগতে? কাম অন ইয়ার। আমাদের একটু জয়েন কর…
মেহরিমা চোখমুখ কুঁচকে মুখ তুলে তাকাল। দেখলো তার দিকে চেয়ে আছে তিনটা মানুষ। ইফতি, আদিল, এবং তাসফি। সে বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলল,

–” যতটুকু মন চায় ততটুকু ডুবে থাকবো। তোর এত সমস্যা হচ্ছে কেনো?
তাসফি কিছু বলার আগে আদিল বলল,
–” দিস্ ইজ নট ফেয়ার মেহু। তুই আমাদের ছেড়ে ওসব ছাইপাঁশ নিয়ে পড়ে থাকলে চলবে না। কিছু তো বল এটলিস্ট..
মেহরিমা খাতার দিকে দৃষ্টি রেখেই শান্ত গলায় বলল,
–” রাজনীতি টপিকটা বড্ড অপছন্দের…
মেহু কথাটা শেষ করতেই ইফতি ভরাট গলায় বলল,
–” টপিক চেঞ্জ। তুই প্রশ্ন কর আমরা না-হয় উত্তর দিবো।
ইফতির কথায় মেহরিমার মাথায় শয়তানী বুদ্ধি চাপলো। হুট করে বলল,
–” পাখির লুজ মোশান থাকা সত্ত্বেও সে ডায়াপার কেনো পরে না?
প্রশ্নটা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলো সবাই। কিছু সময় পেরোতেই বিকট শব্দে হেসে ফেললো সকলে। তাসফি হাসতে হাসতে জাবাব দিলো,

–” ইফতিরে এক বক্স ডায়পার সমান সমবেদনা জানাই। আহারে সরল সোজা বেচারাটা..
মেহরিমার হাসি পেয়ে গেলো কথাটা শুনে। খিলখিলিয়ে হেসে উঠল সে। বাকিরাও হেসে ফেললো তবে ইফতি অপলকভাবে তাকিয়ে রইল মেহরিমার দিকে। উনিশ বছর বয়সী চটপটে মেয়েটা বহু আগেই তার হৃদয় কেড়েছে। তার পুতুলের মতো সৌন্দর্যের অতলে ডুবে গেছে ইফতি।তবে প্রকাশ করা হয়নি। সময়টা অনূকূলে হলে কবেই পরীটাকে নিজের করে নিতো। শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছে সে।

তাদের হাসি আড্ডা চলতে থাকলো। এর মাঝে হুট করে মেহরিমা কল আসলো। নেটওয়ার্ক ইস্যু থাকায় সে বাহিরে গেলো৷ তবে কলটা রিসিভ করতেই কেউ একজন অস্থির চিত্তে ওপাশ থেকে বলল,
–” ফারজানা সুইসাইড করেছে। তোমরা যেখানেই থাকো দ্রুত ইউনাইটেড হসপিটালে আসো৷ বোধহয় আর বাঁচবে না তোমাদের বোন….

শিরোনামহীন অনুভূতি সিজন ২ পর্ব ২