Home শুভ্ররাঙা ভালোবাসা শুভ্ররাঙা ভালোবাসা বোনাস পর্ব 

শুভ্ররাঙা ভালোবাসা বোনাস পর্ব 

শুভ্ররাঙা ভালোবাসা বোনাস পর্ব 
সুমাইয়া সুলতানা

সূর্যের প্রখর উত্তাপ ঠাই পেয়েছে ধরণীর বুকে। আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে শুভ্ররাঙা সাদা মেঘ। যা দেখতে চমৎকার লাগছে। দূর আকাশে নজরে আসছে বেশ কিছু গাঙচিল। তারা আপন মনে নিজ ছন্দে ডানা মেলে উড়ছে। আগুনের কাছেও মোমের শুভ্ররাঙা নিষ্পাপ মুখশ্রী দেখতে বেশ লাগছে। এই বাচ্চা বউ’কে দেখলে আগুনের মন, মস্তিষ্ক কন্ট্রোলে থাকে না। ইচ্ছে করে বলিষ্ঠ বুকের নিচে ছোট্ট নরম তুলতুলে শরীর’টা পিষে ফেলতে। ভালোবাসার যাঁতাকলে মুড়িয়ে রাখতে। মোমের মুখটা আগুনের মুখের কাছাকাছি। দু’জনের উষ্ণ নিঃশ্বাস আঁচড়ে পড়ছে একে অপরের মুখে। মোম কিঞ্চিৎ রাগী চেহারা নিয়ে আগুনের দিকে চেয়ে। কিন্তু আগুনের বেহায়া চোখ দু’টির নজর মোমের গোলাপি রাঙা পাতলা কোমল ওষ্ঠে। মোম ত্যাজি স্বরে বলে উঠলো,

” কেন? কি সমস্যা? আমি আপনার কাছে ঘেঁষে বসলে কি আপনার গায়ে ফোসকা পড়ে যাবে? আমি সরবো না আপনার থেকে। আমার যেভাবে ইচ্ছে আমি সেভাবেই বসে থাকবো। দরকার হলে সারাজীবন এভাবে বসে থাকবো। তাতে আপনার কি? কি করবেন আপনি?
আগুন তর্জনী দ্বারা মোমের ঠোঁট স্পর্শ করে চুপ করতে বলে। শুকনো ঢোক গিলে নেশাক্ত গলায় বলল,
” এখনো সময় আছে মোম, চলে যাও। তখন না রান্নাঘরে যেতে চাচ্ছিলে? সেখানেই যাও। তবুও এখন আমার সামনে থেকো না। চলে যাও। নয়তো পস্তাতে হবে তেমাকে। ”
মোম ভাবলেশহীন গলায় বলল,
” হুহ্! যাবো না। ”
” ঠিক আছে। তাহলে, এখন আমাকে সামলাও। ”

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

মোম কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুন তার গরম উষ্ণ ঠোঁট জোড়া মোমের শুষ্ক নরম ঠোঁট জোড়ায় ডুবিয়ে দিলো। আকস্মিক ঘটনায় মোম হকচকিয়ে যায়। চোখ দু’টো রসগোল্লার মতো বড়ো বড়ো হয়ে গেল। উন্মত্তায় সারা শরীর ঝংকার দিয়ে উঠল। মোম সরে আসতে চাইল। অমনি বাঁধা পড়ল আগুনের বলিষ্ঠ হাতের বেড়াজালে। মোম দু’ হাতে খামচে ধরল আগুনের উন্মুক্ত পিঠ। নেত্র যুগল খিঁচে বন্ধ করে নিলো। আগুনের একটি হাত মোমের মসৃণ কোমরে অপর হাত ঘাড়ে। বেসামাল আগুন মোমের ওষ্ঠে নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে ব্যস্ত। মোমের নিঃশ্বাস আঁটকে আসার উপক্রম। আগুনের লাগামহীন ওষ্ঠ চুম্বনে টালমাটাল অবস্থা তার।

চুম্বকের মতো টেনে ধরে রেখেছে তার ঠোঁট জোড়া। আগুনের কোনো হুঁশ নেই। দিনদুনিয়া ভুলে বসে আছে সে। ভুলে গিয়েছে তার মতো তাগড়া যুবকের পুরুষালী প্রথম চুম্বন আজও তার পিচ্চি বউ সহ্য করতে পারবে কি না? তার তো এখন এই পিচ্চি বউয়ের কোমল ঠোঁটের নেশা জেগেছে। সময় যতো বাড়ছে, আগুনের চুম্বন ক্রিয়াও ততই গাঢ়ত্বতে পরিণত হচ্ছে। মোম নিঃশ্বাস নিতে না পেরে ছটফট করতে শুরু করল। আগুনের উন্মুক্ত পিঠে খামচে ধরা পেলব হাত দু’টিও দৃঢ় হলো। মোমের ছটফটানি আর উন্মুক্ত পিঠের উপর খামচে ধরা হাতের চাপ প্রগাঢ় হতেই আগুনের হুঁশ ফিরল। তুরন্ত মোমের ঠোঁট জোড়া মুক্তি দিলো। আগুন লম্বা শ্বাস টেনে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। ছাড়া পেতেই মোম, আগুনের বুকে কপাল ঠেকিয়ে জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছে। পেলব এক হাত বাড়িয়ে আগুনের বুকে আলতো চাপড় মারল। আগুন ঠোঁট কামড়ে হাসে। মোম ক্ষীণ স্বরে বলে উঠলো,

” অসভ্য লোক৷ কথা বলবো না আপনার সাথে। ”
” দেখি আমার দিকে তাকাও। ”
আগুন, মোমের মাথাটা ধরে উঁচু করতে চাইল। কিন্তু পারলো না। মোম মাথাটা আরো নিগ্রো ভাবে আগুনের বুকের ভেতর ঢুকিয়ে রাখলো। লজ্জা লাগছে তার। এখন আগুনের চোখে চোখ রাখা মোমের পক্ষে সম্ভব না। লজ্জায় ছোট্ট শরীর’টা কেমন নেতিয়ে পড়েছে। আগুন মিটিমিটি হেসে দু’হাতে মোমকে বুকে আগলে নিলো। মিশিয়ে নিলো বক্ষপিঞ্জরে বউয়ের ক্ষুদ্র শরীর। মোমের কানের পিঠে আলতো চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল,

” তোমার লজ্জ রাঙা মুখ’টা দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। কিন্তু তুমি সেটা হতে দিচ্ছ না। বুকের মধ্যে ঘাপটি মেরে মুখ লুকিয়ে বসে আছো। এটা কি ঠিক, বলো? এখন না হোক, একটু পর তো মুখ উঠাতেই হবে। তখন কি করবে শুনি? ”
মোমের লজ্জায় হাসঁফাঁস লাগছে। কিছু বলছে না। আগুন পুনরায় বলল,
” যখন তোমার কষ্ট হবে, খুব বেশি লজ্জা লাগবে তখন আশ্রয় হিসেবে আমার বুক’টা বেছে নিয়ো। এই বুক’টা তোমার জন্য পারমানেন্ট সাথে আমি’টাও। নিরদ্বিধায় এই বুকে তোমার সকল দুঃখ, কষ্ট, যন্ত্রণা, লজ্জা, খুশি জমা রাখতে পারো। তুমি সবচেয়ে চমৎকার, সুন্দর, সংবেদনশীল এবং অশ্চর্য এক নারী। সেই নারী, যেই নারী এই রাগী, বদমেজাজি আগুন শিকদার’কে ঘায়েল করেছে। ভালোবাসা নামক বিষের বাণ মেরে’ছে। তুমিই আমার সব। বুঝতে পারছো কি আমার বুকের ধকধক? ”
মোম কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। আগের মতোই নিশ্চুপ থাকল। ঠোঁট চেপে, ঘন পাপড়ি যুক্ত নয়ন জোড়া খিঁচে বন্ধ করে আগুনের উন্মুক্ত বুকের সঙ্গে মিশে রইল।

দুপুরে খাওয়ার সময় আয়মান আসলো আগুনের ফ্ল্যাটে। ঘুম থেকে ওঠে সেলিনার থেকে ভাইয়ের অসুস্থতার খবর শুনে আসতে চেয়েছিল। তবে ইম্পরট্যান্ট ক্লাস থাকায় আসতে পারে নি। তাছাড়া, ময়ূরী’কে ফোন করে আগুনের বডি কন্ডিশনের কথা জিজ্ঞেস করলে সে বলেছে এখন আগুনের গায়ে জ্বর নেই। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ভার্সিটিতে চলে যায় সে। আগুনের পিছে যতই লাগুক, সত্যি এটাই যে আয়মান তার বড়ো ভাইকে ভীষণ ভালোবাসে এবং সম্মান করে। ভার্সিটি শেষে আর বাড়ি যায়নি। সেখান থেকে সোজা আগুনের ফ্ল্যাটে চলে এসেছে।

গোসল করে আজকে মোম শাড়ি পড়েছে। মূলত মিনা তাকে বলেছেন শাড়ি পড়তে। যেহেতু এতদিন পর শাশুড়ির এখানে এসেছেন, শাড়ি পড়তে বায়না করলেন, না পড়লে ব্যাপার’টা খারাপ দেখায়। তাছাড়া, মোমের এখন শাড়ি পড়তে কোনো অসুবিধা হয় না। নিজে নিজেই পড়তে পারে। সেজন্য থ্রি-পিস না পড়ে শাড়ি পড়ল। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে হাঁটু সমান লম্বা সিল্কি চুল গুলো তোয়ালে দিয়ে আলতো করে মুছে নিচ্ছে। শাড়ির ফাঁক গলিয়ে মোমের ফর্সা পেট দেখা যাচ্ছে। যা দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আগুনের চোখ ধ্বাদিয়ে দিচ্ছে। কয়েক কদম এগিয়ে এসে পেছন থেকে মোম’কে জড়িয়ে ধরল। মুখ ডুবিয়ে দিলো মোমের ভেজা খোলা ঘনকালো লম্বা চুলে। নিঃশ্বাসের সাথে টেনে নিলো মোমের চুলে থাকা সুঘ্রাণ। আগুনের হুট করে জড়িয়ে ধরায় মোমের শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। কেঁপে ওঠে মোমের ছোট্ট সত্তা। আগুনের বলিষ্ঠ দুটি হাত মোমের পেটের উপর রাখা। মোম, আগুনের হাতের উপর নিজের এক হাত রেখে সম্মুখের আয়নায় আগুনের মুখশ্রী দেখে মৃদু চেঁচিয়ে বলে উঠলো,

” কি করছেন কি,হুম? আপনার কি লজ্জা বলতে কিছু নেই? দরজা খোলা। কেউ চলে আসবে। ছাড়ুন! ”
আগুন, মোমের ঘাড়ে থুতনি রেখে আয়নায় মোমের দিকে চেয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
” কেউ আসবে না। তুমি অযথা টেনশন করছো। এই ছোট মাথায় এত টেনশনে নেওয়া ঠিক না। ”
” বলেছে আপনাকে? এক্ষুনি ময়ূরী আপু অথবা মা এসে বলবেন খেতে যেতে। ”
আগুন পুনরায় কিছু বলতে উদ্যত হতেই পেছন থেকে কারো ভরাট স্বর ভেসে আসে,
” রোমান্স করবে ভালো কথা। কিন্তু দরজাটা বন্ধ করে রোমাঞ্চ করতে কি সমস্যা? তোমাদের বোঝা উচিত বাড়িতে আমার মতো নিষ্পাপ একটা বাচ্চা আছে। এভাবে নিষ্পাপ একটা বাচ্চা’কে কষ্ট দিতে তোমাদের বিবেকে বাঁধলো না? এমন স্বাধীনতা কি আমরা চেয়েছিলাম? এখন এই নিষ্পাপ বাচ্চা’টা যে তার হবু বউ’কে খুব মিস করছে, তার কি হবে? ”

আগুন তুরন্ত মোম’কে ছেড়ে দূরে সরে দাঁড়ায়। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকায় দরজার দিকে। আয়মান দরজার সাথে ঠেস দিয়ে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে আছে। আগুন গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” কি চাই? ”
আয়মান ঠোঁট উল্টে বলল,
” তোমাদের থেকে কিছু চাই না। আর যেটা চাই সেটা বললেও এখন তুমি দিবে না। তাই না বলাই ভালো। মা তোমাদেরকে খেতে ডাকছে। খাওয়ার ইচ্ছে হলে আসো, ইচ্ছে না হলে রোমান্স কন্টিনিউ করো। অবশ্য রোমান্স করলে আর খিদে পায় না। যাইহোক, আমি কিন্তু কিছু দেখিনি। ”
আগুন চোখ রাঙিয়ে তাকায়। আয়মান পাত্তা দিলো না। শিষ বাজাতে বাজাতে রুম ত্যাগ করল। আয়মান যেতেই মোম, আগুনের নিকট তেড়ে আসে। ঝাঁঝাল গলায় কাঁদো কাঁদো মুখ করে বলল,

” বলেছিলাম না কেউ চলে আসবে। আমার কথা শুনলেন না। এখন হলো তো? ”
আগুম ভ্রু কুঁচকে চওড়া গলায় বলল,
” কি হলো? ”
মোমের মুখ হা হয়ে যায়। অবাক হয়ে জানতে চাইল,
” কি হলো মানে? আয়মান ভাইয়া তখন আমাদের এক সাথে দেখে ফেলেছিল। আমি জানি, তিনি মিথ্যা বলেছেন যে কিছু দেখে নি। এখন ওনার সামনে কিভাবে যাবো? ”
মোমের কথায় আগুনের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ভাবলেশহীন গলায় বলল,

” সো, হোয়াট? দেখলে দেখেছে, তাতে কি? বকবক না করে খেতে চলো। ”
বলেই আগুন ডাইনিং রুমের দিকে প্রস্থান করল। এদিকে মোমের ভীষণ কান্না পাচ্ছে। ছিঃ! আয়মান ভাইয়া কি ভাবছেন? নিশ্চয়ই মোম’কে নির্লজ্জ ভাবছে? কিন্তু মোমের তো লজ্জা আছে। লজ্জা তো নেই এই কুমড়ো মার্কা লোক’টার। মোম এখন কি করবে? কিভাবে যাবে সবার সামনে? আয়মান ভাইয়া কাউকে বলে দিবে না তো? কাউকে না বললেও তার সামনে মোম যাবে কিভাবে? লজ্জা লাগছে তার। ঠোঁট উল্টে কাঁদো কাঁদো মুখ করে মোমও চললো আগুনের পিছু পিছু।

লাঞ্চ করে রাশেদ, আয়মান কিছুক্ষণ রেস্ট নিয়ে তারা বাড়ি চলে গেল। আগুনের ফ্ল্যাটে থেকে গেল মিনা, ময়ূরী। তার আদরের বড়ো ছেলে অসুস্থ আর মিনা চলে যাবেন, এমনটা কি হয়? ছেলে পুরোপুরি সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তিনি বাড়ি ফিরবেন না। মিনা থেকে গেলেও ময়ূরী চলে যেতে চেয়েছিল। আগুন, ময়ূরী’কে যেতে নিষেধ করেছে। কালকে একটা বিশেষ দিন। আগুন একা হাতে সবকিছু সামলাতে পারবে না। সেজন্য ময়ূরী’কে বলেছে সে যেন থেকে যায়। ময়ূরী ভাইয়ের কথা মেনে নিয়েছে। তাছাড়া, আগামী দুইদিন তার কলেজ বন্ধ তবে প্রাইভেট আছে। এতেও কোনো সমস্যা নেই। প্রাইভেট এর পড়াটা না হয় ক্লাসমেটের থেকে যেনে নিবে। অগত্যা ময়ূরী নিজের ক্লাসমেট’কে ফোন করে বলে রেখেছে স্যার যা পড়া দিবেন ওকে যেন হোয়াটস-অ্যাপ এ সেটা জানিয়ে দেয়।

খাবার খেয়ে আগুন, মোম’কে নিয়ে রুমে চলে আসে। মোম কিছু কাপড় ভাঁজ করে ওয়ারড্রবে রাখছে। আগুন বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফোনে কারো সাথে কথা বলছে। কথা বলা শেষ করে রুমে এসে দেখলো মোম বাচ্চাদের মতো গাল ফুলিয়ে, গালে এক হাত দিয়ে বসে আছে। ভ্রু কুঁচকে মোমের সম্মুখে এসে দাঁড়ায়। গমগমে গলায় আগুন বলল,
” তোমার মুখ’টা কি সবসময় বাংলার প্যাঁচা হয়ে’ই থাকে? আশ্চর্য! এখন আবার কি হলো? গতরাতে তো ঠিক মতো ঘুমাতে পারো নি। এখন একটু ঘুমাতে পারো না? ”
মোম ঠোঁট উল্টে বলল,
” আমি আপনার সাথে এই রুমে থাকবো না। চলে যাবো। ”

আগুন হাতে থাকা মোবাইল’টা ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে বিছানায় এসে নিজের জায়গায় সটান হয়ে শুয়ে পড়ল। শরীর’টা কেমন হালকা গরম গরম লাগছে। আবার জ্বর চলে আসবে নাকি কে জানে? মাথার দু পাশের ধমনীর শিরা গুলো কেমন লাফাচ্ছে। ভাবলেশহীন কন্ঠে বলে উঠলো,
” যেখানে খুশি যেতে পারো। শুধু বাসার বাইরে যাওয়া যাবে না। ”
ক্ষেপে উঠল মোম। বসা হতে উঠে আগুনের কাছে এসে বসলো। চঞ্চল ভঙ্গিতে আচমকা তীব্র সাহস নিয়ে বলল,
” আমি চলে যেতে চাচ্ছি আর আপনি আমায় আটকাবেন না? ভদ্রতা দেখিয়েও তো একবার বলতে পারতেন, না মোম তুমি কোথাও যেতে পারবে না। এই রুমেই থাকো। আমাকে একা ফেলে যেও না। নাকি আমাকে এখন আপনার ভালো লাগে না? একটু আগে ফোনে কার সঙ্গে কথা বলছিলেন শুনি? ”

আগুন হতভম্ব হয়ে গেল। যতটুকু মনে পড়ছে, জ্বর তো আগুনের এসেছে। জ্বর আসলে মানুষ জ্বরের ঘোরে কত আবোল তাবোল কথা বলে। তাহলে, এসব আজগুবি কথা মোম কেন বলছে? এসব তো আগুনের বলা উচিত। আগুন চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে রাশভারী গলায় বলল,
” দেখি, আরেকটু কাছে আসো তো। ”
মোম আসলো। আগুন মোমের কপালে হাত দিয়ে চেক করল। অতঃপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
” জ্বর তো নেই। শরীর তো ঠিকই আছে। তাহলে এসব অবান্তর কথা কেন বলছো? ”

খাবার খাওয়ার আগে রাশেদ যখন টিভিতে নিউজ দেখছিলেন, তখন মোমও সেখানে উপস্থিত ছিল। নিউজে দেখাচ্ছিল, বউকে রেখে স্বামী পরকীয়া করে। বউকে ভালোবাসে না অথচ অন্য মেয়েদের প্রতি স্বামীর তীব্র আকর্ষণ। ব্যস! তারপর থেকেই মোমের মনের মধ্যে হাসঁফাঁস লাগতে শুরু করল। চঞ্চল কিশোরীর বুকের ভেতর অজানা ভয় বাসা বাঁধল। মোম গাল ফুলিয়ে বলল,
” আমি যখন চলে যেতে চাচ্ছিলাম আপনি আমাকে থেকে যেতে কেন বলেন নি? যেতে নিষেধ কেন করলেন না? ”
আগুন ঠোঁট কামড়ে হাসে। গলা খাঁকারি দিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল,
” তুমি কি চাও আমি তোমাকে আটকাই? ”
মোম সরল গলায় জবাব দিল,
” চাইতো। ”

আগুনের হাসি চওড়া হলো। মোম’কে হ্যাঁচকা টান দিয়ে বুকে জড়িয়ে বিছানায় শুয়ে দিলো। মোম ভয়ে চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো। মৃদু রাগী গলায় বলল,
” এমন কেউ করে? ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ”
আগুন অধরের হাসি বজায় রেখে শীতল গলায় বলল,
” আমি আছি তো, তাহলে ভয় কিসের? ”
মোম এসব কথা কানে নিলো না। মনের মধ্যে থাকা প্রশ্ন গুলো ছটফট কন্ঠে বলে উঠলো,

” মাস্টার মশাই, আপনি আমাকে ভালোবাসেন বা না বাসেন সমস্যা নেই। শুধু সারাজীবন আমার পাশে ভরসা যোগ্য একজন মানুষ হয়ে থাকলেই চলবে। এখন যেমন আছেন সারাজীবন এমন থাকলেই হবে। এতেই আমি খুশি। আমি যদি কখনো কোনো ভুল করি, অন্যায় করে ফেলি, আপনাকে কষ্ট দিয়ে ফেলি আপনি আমাকে বকুনি দিয়েন। দরকার হলে শাস্তি হিসেবে মা’রতেও পারেন। তবুও আমি ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের প্রতি আকৃষ্ট হবেন না। তাহলে কিন্তু মোম অনেক কষ্ট পাবে। মোমের মন ভেঙে যাবে। সহ্য করতে না পেরে হয়তো মোম মরে’ই যাবে। ”

বলতে বলতে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, মোম। আগুন অবাক হয়ে গেল। এই মুহূর্তে মোমের থেকে এসব কথা সে আশা করেনি। মোম’কে বুক থেকে সরিয়ে মাথা’টা বালিশে রাখলো। কিঞ্চিৎ ঝুঁকে মোমের উপর আধশোয়া হলো। বলিষ্ঠ হাতে চোখের জল মুছে দিয়ে নরম গলায় বলল,
” কি হয়েছে মোম? আমার নামে কেউ কিছু বলেছে? তুমি কিছু শুনেছ? ”
মোম মাথা নেড়ে না করল।
” তাহলে হঠাৎ এসব কথা কেন বলছো? ”
মোম নাক টেনে টলমল চোখে চেয়ে মায়াভরা কন্ঠে বলল,
” টিভিতে দেখেছি স্বামীরা নাকি পরকীয়া করে। বউকে রেখে অন্য মেয়েদের সাথে চলে যায়। ”
আগুম দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। শান্ত কন্ঠে বলল,

” সেজন্য কাঁদছ? তোমার কি আমাকে তাদের মতোই মনে হয়? সব মানুষ এক হয় না মোম। সেভাবে সব স্বামীও এক হয় না। তুমি না একদিন বলেছিলে, তোমার কোন বান্ধবী ‘কে নাকি তার স্বামী অনেক মা’রে। আমাদের বিয়ের পর তোমার গায়ে আমি কখনো হাত তুলেছি? মা’রা তো দূরে থাক আজ পর্যন্ত একটা ফুলের টোকাও দেইনি। তোমার উপর রাগ হলে আমি দূরে সরে থাকতাম যাতে আমার রাগ তোমাকে দেখতে না হয়। তবুও এতো সন্দেহ? ”
মোমের চোখ দুটো আবার ভিজে উঠেছে। সেই নোনাপানি গড়িয়ে পড়ল মোমের মসৃণ গাল বেয়ে। কাঁদো কাঁদো গলায় মোম জবাব দিল,

শুভ্ররাঙা ভালোবাসা পর্ব ১৮

” সন্দেহ করিনি। শুধু বলেছি মাস্টার মশাই সবসময় তার মোমের হয়েই থাকবে। ”
আগুন মুচকি হেসে মোমের গালে গড়িয়ে পড়া চোখের পানি মুছে দিলো। ঝুঁকে কপালে আলতো করে চুমু খেলো। কপালে কপাল ঠেকিয়ে শীতল গলায় বলল,
” জ্বি, আমার কাঁদুনে বউ। আগুন শুধু তার মোমের। একটা কথা জেনে রাখো, মোম ছাড়া এই আগুনের বুকে আর কেউ থাকবে না। কথা দিলাম। ”
❝ যতদূরে যাইনা কেন, তুমি থাকবে কাছে।
তুমি ছাড়া এই জীবনে, কে থাকবে আর পাশে? ❞

শুভ্ররাঙা ভালোবাসা পর্ব ১৯