শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৪৪
নূরজাহান আক্তার আলো
ইদ মানে আনন্দ। আর মুসলিম পরিবারে এই দিনটিকে নিয়ে থাকে কত
কল্পনা-জল্পনা। সালামি দেওয়া-নেওয়া, খাওয়া-দাওয়া, ঘুরাঘুরি এসব নিয়ে থাকে নানান পরিকল্পনা। প্রতিবছর চৌধুরী নিবাসে ইদের সকাল শুরু হয় চিৎকার-চেঁচামেচি দিয়ে। এরপর সারাদিন চলে নানান খুঁনসুটি দুষ্টুমি। যতই কাজ থাকুক শেষ বিকেলে ভাই-বোনরা মিলে ঘুরতে যায়। যেতে যেতে মজা করে। স্মৃতি কুড়ায়। সেসব স্মৃতিচারণ করে কোনো এক উদাস প্রহরে। ভেবেছিল রোজার শুরুটা দূঘর্টনা দিয়ে হলেও ইদটা বোধহয় ভালোই কাটবে। এজন্য প্রতিটা সদস্য নিজেরাও সচেতন থাকত
যেন কোনো বিপদ না হয়। কিন্তু কপালের ফের ইদের সকালে আচমকা ঝড়ে তছনছ হয়ে গেল সব। ভেঙে গেল টুকরো টুকরো রঙিন কিছু স্বপ্ন। নড়বড়ে হয়ে গেল সবার সঙ্গে সবার দৃঢ় বন্ধনের ভীত। কেউ জানেন না এ সমস্যার আদৌও সমাধান হবে কী না! আদৌও ভাঙা সম্পর্ক কখনো জোড়া লাগবে কী না!
এদিকে শাহাদত চৌধুরীর গাড়ি বেরিয়ে যেতেই শারাফাত চৌধুরী দরজা থেকে ফিরে এলেন। শেষ আশাটুকু নিয়ে তাকিয়ে ছিলেন ভাইদের ফিরে আসার। ভাঙা মন নিয়ে শতশত বার সৃষ্টিকর্তার কাছে চাইছিলেন অন্তিম মুহূর্তে যেন কোনো মিরাক্কেল ঘটে তাদের যাওয়া যেন আঁটকে যায়। কত বার তাকালেন শুদ্ধ,সায়নের দিকে তারা যেন আঁটকায়। নিজেদের ভুল শুধরে নিয়ে পরিবার বাঁচায় কিন্তু তারা যেন পাথর। দু’জনের কেউ কথা বলল না। সায়ন এখনো স্থির হয়ে মেঝের দিকে তাকিয়ে থাকলেও শুদ্ধ গটগট করে নিজের রুমে চলে গেল। এক মুহূর্ত দাঁড়ানোর প্রয়োজনবোধ করল না সে। অথচ যত্নে গড়া পরিবার ভাঙার কষ্ট উনি সইতে পারছেন না। পারছেন না শুদ্ধর মতো বুকে পাথর তুলে দিয়ে রুমে চলে যেতে। দুই চোখের পানিতে রাস্তা দেখা মুশকিল। চোখদুটো এত অবাধ্য কবে থেকে হলো? উনি এক কদমও এগোতে পারলেন না ধপ করে বসে পড়লেন।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
পাশের সোফার হাতলে এক হাত ঠেকিয়ে মুখ লুকালেন নিজের বাহুতে। এরপর শক্তপোক্ত মানুষটাও ভুলে গেল সময়, কাল-ক্ষণ। বুকের ভেতর আজ এতটাই পুড়ছে সবকিছু ভুলে বাহুতে মুখ লুকিয়ে শব্দ করে কেঁদে উঠলেন শারাফাত চৌধুরী। আহা, কি বেদনাময় কান্নার সুর! কত যন্ত্রণা মিশে রয়েছে সেই কান্নায়। স্বামীকে জীবনে প্রথম এভাবে কাঁদতে দেখে
সিঁতারা দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে নীরবে অশ্রু ঝরাতে লাগলেন। উনার এ কান্নায় শব্দ নেই, বর্ণ নেই, গন্ধ নেই, আছে বিষাদেভেজা কষ্ট। আর কিছু কষ্টে পোড়ানো নীরব আর্তনাদ। উনি বউ হয়ে আসার পর মানুষটা তার হাতে হাত রেখে বলেছিলেন, ‘আমি তোমাকে একটা বাগান দিলাম। সেই বাগানে কিছু সুগন্ধি ফুলের চারা দিলাম। এবার যত্ন নিয়ে ফুল ফুটানোর দায়িত্ব তোমার।
আজ থেকে বাগানের মালকিন শুধু তুমি।’ বাসরঘরে এ মানুষটাই চৌধুরী নিবাস নামে একটা বাড়ি দিয়েছিল। দিয়েছিল জীবন্ত কিছু ফুল। বৃদ্ধ শাশুড়ী মারা যাওয়ার আগে ওয়াদা আদায় করে নিলেন যেন এই সংসার বুকে আগলে রাখেন। কিন্তু হলো না, পারলেন না তিনি। সিমিন কেন একাজ করল তাও জানেন না তিনি। জাকে ছোটো বোনের মতো দেখে এসেছে সেই বোনরুপী জা উনার দিকে আঙুল তুলে সংসার ভেঙে চলে গেল। অন্তত জানিয়ে গেলেও দোষটা শুধরানো যেতো কিন্তু জানিয়ে গেল না। ছেলে-মেয়েরা তাদের পছন্দ মতো সঙ্গী পছন্দ করে নিয়েছে এখানে উনাদের তো হাত নেই। মোদ্দাকথা, ছেলে-মেয়েরা যদি একে অপরকে সাথে ভালো থাকে তাহলে আপত্তির কি আছে? সংসার করবে তারা, তারাই যদি ভালো থাকে তাহলে এত কথা আসছে কেন?
বাকি রইল সমাজের কথা। সমাজের লোকরা কোন ব্যাপারে কথা বলে না? কোনো ফর্সা মায়ের কালো বাচ্চা হলেও গপিস করে আবার কালো মায়ের বাচ্চা ফর্সা হলেও গপিসের শেষ থাকে না। আকার ইঙ্গিতে কিন্তু মেয়েটার দিকে অদৃশ্য কলঙ্কও ছুঁড়ে মারে। বাচ্চাটাকে নিয়েও হাজারটা কথা সৃষ্টি করে৷ যেখানে নিষ্পাপ নাদান বাচ্চাকেও ছাড় দেয় না সেখানে তাদের নিয়ে পড়ে থাকলে হবে? বরং সমাজ সমাজ করে নাচলেই বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে যাবে। এসব ভেবে উনি কাতর চোখে তাকালেন এখনো কান্নারত স্বামীর দিকে।বুক ভরা কষ্ট নিয়ে আল্লাহর কাছে বারবার দোয়া করলেন যেন এই মানুষটাকে ধৈর্য্য দেন। এ বিপদ যেন দ্রুত কেটে যায়।
ওদিকে শারাফাত চৌধুরী তখনো অস্পষ্ট স্বরে বলেই চলেছেন,
-‘মা, মগো, আমি পারি নি তোমার যত্নে গড়া সংসার ধরে রাখতে। আমি ব্যর্থ মা..গো। আমার কলিজার ভাই..আমার বাচ্চাগুলো..আজ আমাকে ছেড়ে দূরে চলে গেছে, মাগো। আমার শীতল….আমার আ..ম্মাজান…! ‘
শীতলকে উনি বরাবরই খুব বেশি ভালোবাসে সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। এর ঝাপসা কারণও হতে পারে শীতলের মুখটা উনার মায়ের মুখের মতো। সাফওয়ান চৌধুরী চোখ মুছতে মুছতে বাইরে থেকে এসে ভাইকে
এভাবে কাঁদতে দেখে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে নিজেও কেঁদে ফেললেন।
খুব ছোটোবেলায় উনারা তিনভাই মারামারি করলেও বুঝতে শেখার পর আর মারামারি করেন নি। তিনভাই তিনভাইয়ের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এত বড় সংসার সামলে রেখেছেন। আজকের মতো এই ঘটনা এর আগে হয় নি। ছোটো ভাই টা যে বুকভরা কষ্ট নিয়ে বাড়ি ছেড়েছে একথা ভাবলেও উনাদের দম আঁটকে আসছে।
বাবা-চাচার কান্নার শব্দেও সায়নের নড়চড় নেই। সে চোয়াল শক্ত করে এখনো স্থির হয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে। তার কাছে অবিশ্বাস্য লাগছে স্বর্ণ তাকে রেখে চলে গেছে তাও ভালোবাসা প্রকাশের অভিযোগ ছুঁড়ে। এ কী মানা যায়! এই বেইমানকে জান দিয়ে এতদিন ভালোবেসেছিল?
সে তো ভাবত শীতল মারের ভয়ে শুদ্ধকে অস্বীকার করলেও আর তার স্বর্ণ উঁচু গলায় তাদের কথা সবাইকে জানাবে। কিন্তু ঘটল কি? শীতলটা ওর ভালোবাসার কথা জানিয়ে দিলো ঠিকই কিন্তু স্বর্ণ তাকে ছেড়ে চলে গেল। এই কাজটা করতে তার বুক কাঁপল না? আচ্ছা স্বর্ণ কি সিমিনকে বোঝাতে পারত না? নাকি স্বর্ণ তাকে ভালোইবাসেনি? বাসলে এভাবে ছেড়ে যেতে পারত? নাকি ছেড়ে যাওয়া যায়? সে কী জানে না বাড়িতে ফিরে না তার কাছে না গেলে একদন্ড স্থির হতে পারে না। তার শরীরের ঘ্রাণ নেশাগ্রস্তের মতো না টানলে উন্মাদ হয়ে যায়? তাহলে…..তাহলে কীভাবে গেল? শীতলটাও চলে গেল? একবারও ভাবল না শুদ্ধর কথা? এই ভাইটার কথা? বেইমানের সাথে সাথে শীতলটাও বেইমানির খাতাতে নাম লেখাল? পারল লেখাতে? আপন ভাবনায় মশগুল থাকা সায়নের ভাবনার ছেদ ছটল গালে তীব্র ব্যথা অনুভব করে। সে লালবর্ণ আগুন চোখে তাকিয়ে গালি দেওয়ার আগে শারাফাত চৌধুরীকে দেখে সামলে নিলো। তখন শারাফাত চৌধুরী চিৎকার করে বললেন,
-‘তোর মতো জানোয়ার ছেলের দরকার নেই আমার। যদি চাস আমি এ বাড়িতে থাকি তাহলে বাড়ির চৌকাঠে পা রাখবি না তুই। বেহায়ার মতো যদি ফিরেও আসিস তাহলে আমার খাঁটিয়া কাঁধে তোলার জন্য প্রস্তুত থাকিস।’
বাবার কথা শুনে সায়ন ঢোক গিলল। বাপটাও তার কষ্ট বুঝল না? বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা সোজাসাপ্টা বললেই হতো এত কঠিন কথার দরকার ছিল? আহারে বুকে জায়গা দেওয়া আপনজন! সবগুলো আজ যেন বুকটাই জখম করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। সায়ন কথা বাড়াল না কিছু বলতে গিয়ে বুঝল কন্ঠস্বর বাক্য সাজাতে ব্যর্থ।তাই সম্মতিসূচক মাথা নাড়িয়ে পা বাড়াতেই সিঁতারা, সিরাত তাকে জাপটে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। শখও হাউমাউ করে কাঁদতে লাগল। ভাঙ্গা আয়নায় পাথরের টুকরোর আঘাতে সংসারটাও যেন আরেকবার দ্বিখন্ডিত হলো।
তখন সাফওয়ান এগিয়ে এসে চৌধুরী বলতে লাগলেন,
-‘যাস না বাপ? তোরা সবাই চলে গেলে আমরা কি নিয়ে থাকব? বাবার কথায় কষ্ট নিস না আব্বা, মন থেকে বলছে না ভাই।’
সায়ন মেজো চাচার দিকে তাকিয়ে কেবল হাসল। জোরপূর্বক হাসি যাকে বলে। তখন শারাফাত চৌধুরী পুনরায় বললেন,
-‘আমি রেগে বলছি না ভেবেই বলছি। চলে যাক, ও। আমার চোখের সামনে দেখতে চাই না, ওকে।’
একথা বলে উনি চোখ মুছতে মুছতে দুকদম এগোতেই সায়ন ঢোক গিলে চেঁচিয়ে বলল,
-‘আমার সবটুকু আয়ু তোমার হয়ে হলেও তুমি দীর্ঘজীবি হও। হাজার হাজার বছর ছায়া হয়ে থাকো এই বাড়ির প্রধান অভিভাবক হয়ে। আমি আর আসব না তোমার বাড়িতে। পা মাড়াব না বাড়ির দামি চৌ-কাঠে। শুধু রিকুয়েষ্ট মরা টরার কথা বোলো না। খারাপ ছেলে হলেও তোমার মরার কথা সহ্য করতে পারি না, এই বুকটাতে কষ্টের জ্যাম বাঁধে কী না!
একথা বলে মাকে বুক থেকে সরিয়ে দুই মায়ের কপালের মাঝখানে চুমু এঁকে বাহুতে চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে গেল। মা,ভাই-বোনদের কান্নার শব্দ কানে পৌঁছালেও পেছন ফিরে তাকাল না। তাকিয়ে আর কি হবে এ বাড়িতে থাকার মেয়াদ যে ফুরিয়ে গেছে।
শুদ্ধ নিজের রুমে বিছানায় চোখের উপর হাত রেখে আড়াআড়িভাবে শুয়ে আছে। পরনে এখনো সকালের সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি। বুকটাতে লেগে আছে শীতলকে জড়িয়ে ধরার নরম অনুভূতি। এইমাত্রই সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সায়নকে চলে যেতে দেখেও আঁটকাল না সে। কেন আঁটকাবে?
কার বাড়িতে ঝামেলা হয় না? বসে সমাধান করা যায় না? বাড়ি ছেড়ে গেলেই কি সমস্যা সমাধান হয়ে যায়? যাবে যখন যাক। তাছাড়া ভালোই
হয়েছে গিয়ে নয়তো স্বর্ণকে ছাড়া সায়ন বাড়িতে থাকতে পারত না। সে একপ্রকার পানি ছাড়া মাছের মতো ছটফটিয়ে মরত। ভাইকে খুব ভালো করে চিনে সে। মোদ্দাকথা, যে যে স্বেচ্ছায় বাড়ি ছেড়েছে সব কটাকে সে
বাড়ির অভাব বুঝিয়েই ছাড়বে। যাতে পরবর্তীতে সামান্য ব্যাপারে বাড়ি ছাড়ার কথা স্মরনেও না আনে। বিরক্ত হয়ে এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তার চোখের পাতায় ভেসে উঠল শীতলের কান্নারত নিষ্পাপ মুখ। করুণ সেই দৃষ্টি। বে’য়া’দ’বটা গেল তো গেল কাঁদতে কাঁদতে বুকে জ্বালা ধরিয়ে গেল। এত কান্নার কি আছে? সে কি মরে গেছে? কোথায় ভরসা রাখবে তা না ভ্যাঁ ভ্যাঁ করতে করতে গেল। আর সিমিনকে আপাতত কিছু বলবে না সে। বাংলা সিনেমা দেখে দেখে নিজেকেও রিনা খানের চরিত্রে নিয়ে তাকে বোধহয় দিতে চাচ্ছে ঘাড়ত্যাড়া জামাইয়ের চরিত্র। যদিও তাতেও সমস্যা নেই। মানব না, মেয়ে দেবো না, এই বাড়িতে থাকব না, বললেই হবে? এতই সোজা! প্রথমে ব্যাঙাচি ভালোবাসা বুঝত না। কত কী করে যাও একটু বুঝল এখন নাকি মেয়ের মায়ের সমস্যা..এত জ্বালা সহ্য হয়!
সিমিনকে যে আঁটকাতে পারত না তা কিন্তু নয় বরং ইচ্ছে করে আঁটকায় নি। কারণ রাগের মাথায় বেশি কিছু বললে ঘটনা অন্যদিকে মোড় নিত।
এসব ভাবনার মাঝে তার মস্তিষ্ক আচানক আরেকটা কথা টোঁকা দিতেই
সে ‘ওহ শিট’ বলে উঠে বসল। তাড়াহুড়ো করে নামতে গেলে তার ফোনে রিংটোন বেজে উঠল। পকেট থেকে ফোন বের করে রিসিভ করে শুনল অপর পাশের মানুষটার কথা। অতঃপর তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল। ভাই-বোনকে কথা দিয়েছিল দ্রুত’ই BMW গাড়ি কিনে ঘুরতে নিয়ে যাবে। সেই হিসেবে ভেবেছিল নতুন গাড়ি নিয়ে আজ বিকেলে বের হবে। বের হওয়ার আগ মুহূর্তে গাড়ি দেখিয়ে সবাইকে খুব করে চমকে দেবে। কিন্তু গাড়ি তো ঠিকই পার্কিংলটে চলে এসেছে কিন্তু তারা কই!
শাহাদত চৌধুরীর চলন্ত গাড়িতে চলছে নিশ্চুপ নীরাবতা। কারো মুখে কোনো কথা নেই। শীতলের কান্না থামলেও নীরবে অশ্রু ঝরা থামে নি। সে চুপ করে একদৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আছে। বোনকে কিছুক্ষণ লক্ষ্য করে স্বর্ণ শীতলের কাঁধে হাত রাখলে শীতল হাতটা ঝাড়া মেরে সরিয়ে দিলো। আরেকটু সরে গেল জানালার দিকে। বোনের এই কান্ডে কেবল হাসল স্বর্ণ। তারপর পুনরায় বোনকে নিজের দিকে টানতে টানতে বলল,
-‘আয় আমার কোলে মাথা রেখে ঘুমা নয়তো শরীর খারাপ করবে।’
-‘করুক। মরে যাই আমি। তোরা তো তাই চাস!’
-‘কেউ কারো জন্য মরে না। কথা না বাড়িয়ে এবার আয়।’
-‘তোরা পাষাণ হয়ে গেছিস আপু। তোদের বিবেক মরে গেছে। আজকে তোদের জন্য বড় আব্বুর বুকে পাড়া দিয়ে আসতে হয়েছে। বড় আ..ব্বু.. কে কতটা যন্তণা দিয়ে এলি ভেবেছিস একবার? আমরা আসায় কতটা কষ্ট পেল মানুষটা? এতদিন আগলে রাখার এই প্রতিদান দিলি তোরা?’
শীতলের কথা শুনে ড্রাইভ করা শাহাদতের বুকে বিঁধলেও একবাক্যেও উচ্চারণ করল না। তবে সিমিন সিটে হেলান দিয়ে বললেন,
-‘আসতে বলেছে কে? দরদ উতলে পড়লে চলে গেলেই হয়।’
মায়ের কথা শুনে শীতল মায়ের দিকে তাকাতেই অঝরে কয়েকফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। অতিরিক্ত কান্না করায় মাথা টনটন করছে। দুচোখ যেন মরিচ ডলে দেওয়ার মতো জ্বলছে। এমনিতে পিরিয়ডের প্রথম দিন অবস্থা খুব খারাপ থাকে। তার উপরে এক কাপড়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসেছে। তবে আজকে শারীরিক যত্নটা চেয়েও মানসিক যত্নটা অনেক বেশি। এতটাই বেশি অসহ্য ব্যথাও ফিকে লাগছে৷ তবে সে থামল না এক
পেট চেপে ধরে অঝরে কাঁদতে কাঁদতে মাকে বলল,
-‘এত পাষাণ হইয়ো না আম্মু? বিবেককে নিচু স্তরে নামিও না। তোমার এই রুপ আমি সহ্য করতে পারছি না।’
-‘সহ্য করতে বলছে কে? যা, চলে যা। সঙ্গী জুটিয়েছিস মাকে নাহলেও এখন চলবে।’
-‘তুমি আসলেই স্বার্থপর মহিলা। খুব, খুব, খুব বেশিই স্বার্থপর তুমি!’
একথা বলে শীতল দুই হাতে মুখ ঢেকে পুনরায় কাঁদতে লাগল। মানতেই পারছে না এসব। যে বাড়ি ছেড়ে একরাত বাইরে থাকার পারমিশন পায় নি সেই বাড়িতেই নাকি ফিরবে না। প্রতি বছর ইদে সকালে উঠে মেহেদী রাঙা হাত দেখায় শারাফাত চৌধুরীকে। শারাফাত চৌধুরী তার দুই হাত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে মেহেদীর রং পরীক্ষা করেন। তারপর পকেট থেকে টাকা বের করে শীতলের হাতে গুঁজে দেয়। একথা কেউ জানে না এটা তাদের মধ্যে গোপন সিক্রেট! এরপর একটুপর সবার সাথে আরেকবার সালামি দেন। ডাবল সালামির একভাগ রেখে বাকিটার থেকে এ বাড়ির ছোটো সদস্যদের সালামি দেয় যতই হোক বড় বোন সে। আজ সকালে বড় আব্বু কাছে যেতে পারে নি গালে ‘আমার বউ’ লেখাটার জন্য। পরে যাবে ভেবেছিল তখন নামাজের সময় হয়ে গিয়েছিল। এরপর ভেবেছিল নামাজের পর যাবে ততক্ষণে পিরিয়ডের ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে শুয়ে পড়েছিল। এরপর আর যাওয়ায় হলো না বড় আব্বুকে ছেড়ে চলে আসতে হলো।
বড় আম্মুর হাতে মজার মজার রান্নাও কপালে জুটল না। এসব ভাবতে ভাবতে তার কান্নার গতি বাড়ল। কাঁদতে কাঁদতে জানালায় মাথা রেখে ঘুমিয়ে গেল। বোনকে ঘুমাতে দেখে স্বর্ণ শীতলের মাথাটা তার কোলের উপর টেনে নিলো। হাত বাড়িয়ে পানি নিয়ে রুমাল ভিজিয়ে মুখ মুছিয়ে দিলো। ঘুমন্ত শীতল বিরক্ত হয়ে রুমাল সরিয়ে দিয়ে পুনরায় ঘুমে ডুবে গেল। বোন বিরক্ত হচ্ছে দেখে স্বর্ণও সিটের মাথা হেলিয়ে শীতলের চুলে হাত ডুবিয়ে বাইরে দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। জোর করে আনায় খুব কেঁদেছে পাগলিটা এবার নাহয় একটু ঘুমাক
বেলা গড়াতে গড়াতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। বিকেলের পর এখন সন্ধ্যা অথচ সকালের পর কেউ কিচ্ছু টি মুখে তোলে নি। যা ঘটে গেছে এতে খাওয়ার কথা স্মরনে নেই কারো, থাকার কথাও না। চিন্তায় ডুবে থাকা শাহাদত চৌধুরীর কথাটা স্মরণ হতেই দেখে নিলেন তিনজনকে।
তারপর আর একটু এগিয়ে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে গাড়ি থামালেন। মেয়েদেরকে বললেন চোখ, মুখে পানি দিয়ে আসতে। বাবার ডাক শুনে শীতলের ঘুম ভাঙল। বোনের কোলে শুয়ে আছে দেখে মুখ গোমড়া করে উঠে বসল। সেই সঙ্গে অনুভব করল তার ন্যাপকিন ড্যামেজ হয়ে গেছে।
ইমিডিয়েট চেঞ্জ করা দরকার। পরনের জামাতে দাগ লেগে গেছে নাকি কে জানে। একথা ভেবে তার মুখটা চুপসে গেল। সাহায্যের জন্য করুণ চোখে তাকাল বোনের দিকে। স্বর্ণ প্রথমে না বুঝলেও পরে তার ইশারায় বুঝল। তবে বিচলিত না হয়ে শাহাদত চৌধুরীকে বলল,
-‘বাবা তুমি খাবার পার্সেল করে আনো গাড়িতে বসে খাব। আর আমাকে কিছু টাকা দাও ফার্মেসি থেকে মাথা ব্যথার মেডিসিন কিনে আনি।প্রচন্ড মাথা ব্যথা করছে আমার।’
-‘ আমি নাহয় এনে দিচ্ছি? ব্যথা কি খুব বেশি?’
-‘হুম, সমস্যা নেই পারব আমি, তুমি যাও খাবার নিয়ে এসো।’
একথা শুনে শাহাদত চৌধুরী গাড়ি থেকে নেমে দেখলেন রাস্তার ওপাশে ফার্মেসির দোকান। তাই স্বর্ণকে টাকা দিয়ে গেলেন খাবার আনতে। এই
রেস্টুরেন্টে কয়েকবার এসেছিলেন খাবারের মানও বেশ ভালো। তবে যা কিনবেন সেই খাবার গলা দিয়ে নামবে তো?
বাবাকে যেতে দেখে স্বর্ণ গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত গেল প্রয়োজনীয় সেই জিনিসটি আনতে। তারপর মায়ের হ্যান্ডব্যাগ চেয়ে নিয়ে ব্যাগের ভেতর সেটা ঢুকিয়ে বোনকে নামতে বলে পেছনে দাঁড়িয়ে দেখল চিন্তার কোনো কারণ নেই, তাই হাত ধরে এগোলো ওয়াশরুমের দিকে। শাহাদত চৌধুরী
খাবার নিয়ে ঘুরতেই মেয়েদের সঙ্গে দেখা হলো। ওদের চোখে মুখে পানি দিয়ে আসতে বলে তিনি এগোলেন গাড়ির কাছে। স্বর্ণ শীতলকে ব্যাগটা
ধরিয়ে দিয়ে যেতে ইশারা করে নিজে পাশের ওয়াশরুম গিয়ে চোখ বন্ধ করে কয়েক পর এক পানির ঝাপ্টা দিতে থাকল চোখে, মুখে। তবে ভুল করেও ওয়াশরুমের আয়নার দিকে তাকাল না। বেইমানের তকমা লাগা মুখ নিজেরও দেখতে ইচ্ছে করছে না, অবশ্য সত্য মানতেও সমস্যা নেই।
তারপর সে বের হয়ে সামনেই দাঁড়িয়ে রইল। শীতল বের হলে তার হাতে অন্য একটা প্যাকেট দেখে সেটা নিতে গেলে শীতল পিছিয়ে গেল। মুখ গোমরা অন্যদিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বলল,
-‘ডাস্টবিনে ফেলে আসছি তুমি দাঁড়াও।’
-‘আমাকে দে।’
-‘না। আমি পারব।’
-‘ছোটো বেলায় বহুবার তোর ন্যাপি চেঞ্জ করেছি এখনো আমার কাছে ছোটোই আছিস।’
স্বর্ণ কথা শুনল না প্যাকেটটা হাতে নিয়ে শীতলকে ব্যাক সাইডে দাঁড়াতে বলে নিজে চলে গেল বাইরের দিকে। শীতল বোনের কথা শুনে ওইদিকে
তাকিয়ে দেখে ওদিকে নিরিবিলি কেউ যাচ্ছে না তেমন, তাই ধীর পায়ে
এগিয়ে গেল। চারপাশটা দেখল নজর বুলিয়ে। জায়গায়টা ভীষণ সুন্দর, ছবি তোলার জন্য দারুণ স্পেস আছে। এদিক ওদিকে তাকাতে তাকাতে
আর একটু সামনে এতোতে একটা বড় দেওয়াল নজরে এলো। সেদিকে একবার তাকিয়ে চোখ সরিয়ে পরক্ষণে পুনরায় দৃষ্টি ছুঁড়ে চমকে উঠল।
বিষ্ময় নিয়ে তাকিয়ে যখন বুঝল সত্যি তখন দৌড়ে গেল প্রিয় মানুষটার কাছে। সমুদ্রের ঢেউ যেমন পাথরের বুকে আছড়ে পড়ে ঠিক সেভাবে সে আছড়ে পড়ল শুদ্ধর বুকে। শুদ্ধ একপা পিছিয়ে শীতলসহ সামলে নিলো নিজেকে আর একটু হলে দু’জনে বারি খেতো দেওয়ালে। অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে প্রিয় মানুষটাকে পেয়ে শীতল শুদ্ধর বুকে মুখ লুকিয়ে বুকের শার্ট খামছে ধরে শব্দ করে কাঁদতে লাগল। কান্নার চোটে যা বলল কিছু স্পষ্ট হলো না। তবে শুদ্ধকে আঁকড়ে ধরে চোখের পানি বুক ভেজাতে লাগল। আর শুদ্ধ বুক তোলপাড় করা ঝড় নিয়ে নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মুখে কথা নেই তার। তবে তার মন বলছে, সময়টা যদি এখনে এভাবে থমকে যেতো? কিংবা এই অবস্থায় যদি মারা কেমন হতো? ভালো হতো, ভীষণ ভালো। বুকের মালকিনকে বুকে নিয়ে মরার মতো সুখী মানুষ পৃথিবীতে আছে নাকি? থাকলেও সংখ্যায় হাতে গোনা। ইশ! এমন সুখী যদি সেও হতো! কি অদ্ভুত, বুকের ভেতর হৃদপিন্ডটা যে হারে লাফাচ্ছে আজকে ধরা টরা খাইয়ে দেবে নাকি, হুম? যেটা সে চায় না, কখনোই চায় না।
চোখ দু’টোও অযথা এত জ্বলছে। কি সব ছলনাময়ী কারবার, চোখ তার অথচ জ্বলছে অন্য কারো কথা ভেবে। মনে মনে এসব ভেবে সে থমকে দাঁড়িয়ে রইল। বেশ কিছুক্ষণ পর শীতল কাঁদতে কাঁদতে বলল,
-‘সবকিছু আবার আগের মতো করে দেন না শুদ্ধ ভাই, প্লিজ! আমি আমাদের সুখী পরিবারটাকে চাই। সবাইকে নিয়ে ভালো থাকতে চাই।’
শুদ্ধ নিশ্চুপ। তাকে চুপ দেখে শীতল মাথা তুলে তাকিয়ে দেখল শুদ্ধর চোখজোড়া লাল হয়ে আছে। সে পায়ের আঙুলে ভর দিয়ে একটু উঁচু হয়ে দুই হাতে শুদ্ধর গাল ধরে বিচলিত কন্ঠে বলল,
-‘কি হয়েছে? চোখ লাল কেন? কোথায় কষ্ট হচ্ছে দেখি?’
-(…)’
-‘কথা বলছেন না কেন? কি করেছি আমি? সবার সামনে তো বলেছিই আমি আপনার বউ হবো। আমি আপনাকে ভালোবাসি। আর কীভাবে বলব? কিভাবে বোঝাব? আজকে আমাদের কথা জানালাম আজই কী না বাড়ি ছাড়তে হলো! তবে কি আমরা এক হবো না?’
এইটুকু বলে শীতল শুদ্ধর বুকে কপাল ঠেঁকাল। তারপর অঝরে কাঁদতে কাঁদতে অসহায় কন্ঠে বলল,
-‘আপনাকে ছাড়া আমি কিভাবে থাকব, শুদ্ধ ভাই? কারণে অকারণে আপনাকে না জ্বালালে আমার ভালো লাগে না, সময়ই কাটে না। এই যে এত এত সমস্যার সমাধান কোথায় পাব আমি হুম, কোথায়? কেন সবাই মিলে আমাকে মারতে উঠে পড়ে লেগেছেন? আমার ভালো থাকার আয়ু কি শেষ? এজন্যই কি সবাই মিলে এত কষ্ট দিচ্ছেন? সব কষ্ট আমি হাসি মুখে নেবে। কিন্তু আপনাকে ছাড়া থাকতে পারব না, কিছুতেই পারব না, মরে যাব আমি, সত্যিই মরে যাব।’
একথা শুনে শীতল ব্যাকুল হয়ে কাঁদল। আজ সারাদিন কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতে চোখ-মুখের বেহাল দশা। আর কাঁদতে পারছে না শরীর থরথর করে কাঁপছে। তবে তার এই কথাগুলোই যথেষ্ট ছিল শুদ্ধকে ভেঙে চুরে খান খান করার জন্য। নিজের অজান্তে বোকা শীতল তার বুকেই তীরটা মেরেছে। লেগেছেও যেন পার্ফেক্ট নিশানায়। এতক্ষণ শুধু শীতল জড়িয়ে ধরলেও শুদ্ধ ছেড়ে দিয়েছিল। শুধু দেখছিল তার ব্যাঙাচির পাগলামি। তাকে নিয়ে করা ভালোবাসার পাগলামি। তবে ওর করুণ সুরে বলা এই
কথাগুলো আর অসহায় কান্নায় শুদ্ধকে আরো একবার ভাঙল। নিজের তৈরী করা খোলস ছেড়ে শুদ্ধর অজান্তেই চোখ থেকে একফোঁটা অশ্রু ঝরে গেল।
আর গিয়ে পড়ল কান্নারত শীতলের কপালে। শীতল কান্না ভুলে তড়িৎ মাথা তুলতে গেলে শুদ্ধ তার মাথাটা প্রশ্বস্ত বুকে চেপে ধরল। কোনোভাবেই শীতলকে সে মাথা তুলে তাকাতেই দিলো না। থাকুক না নিজের একান্ত কষ্টগুলো নিজের বুকে। শক্ত আবরণে ঠিকই নিজেকে সামলেছিল শেষ মুহূর্তে অনর্থ ঘটাল একফোঁটা অশ্রু। তবে যেটাই হোক, স্বীকার করা যাবে না নয়তো শীতলের ভাষায় বলতে গেলে তার বিশুদ্ধ পুরুষের জাত যাবে। পৃথিবী সমান কষ্টে বুক ভাঙলেও শুদ্ধরা কখনোই কাঁদতে পারে না। কারণ বিশুদ্ধ পুরুষরা ঢাল হতে জন্মায়..বাবা-মা ঢাল, ভাইয়ে ঢাল, প্রিয় মানুষকে নিরাপত্তার দেওয়া ঢাল। তাদের এত সহজে ভেঙে পড়তে নেই। বুকভরা কষ্টে জর্জরিত হতে নেই তাই শুদ্ধ দ্রুত চোখ মুছে নিজেকে সামলে নেওয়ার অপ্রাণ চেষ্টা চালাল আর সফলও হলো।
কিন্তু আজ বোকা শীতলটা ঠিকই বুঝে নিলো তার চালাকি। তাকে ছেড়ে থাকার কষ্টে শুদ্ধও বুক ভেঙে চুরে খানখান হয়ে যাচ্ছে। এতে তার কান্না দ্বিগুন বাড়ল। কষ্টে চৌচির হতে থাকল বুক। কাঁটা মুরগির মতো ছটফট করতে লাগল সে। বার বার দেখল চাইল তার একান্ত পুরুষের চোখের ভাষা, কিন্তু ঘাড়ত্যাড়া শুদ্ধ দেখতে দিলো না। বরং খুব শক্ত করে তাকে বাহুডোর আগলে রাখল। কয়েক মিনিট সেভাবে থেকেই এবার শুদ্ধ মুখ খুলল,
-‘খেয়েছিস কিছু? ‘
-‘ না।’
-‘পেইন কিলার খেলে পেট ব্যথা কমে যাবে। কিছু খাবি, চল।’
এবার হাতের বাঁধন ঢিলে হলে শীতল মুখ তুলে তাকাল। তাকিয়ে রইল
সামনে দাঁড়ানো পুরুষটার দিকে। এই অবস্থাতেও সাদা শার্ট আর কালো জিন্সে কি যে চমৎকার দেখাচ্ছে। সে এবার ওড়নায় নাক মুছে ফোঁপাতে ফোপাঁতে জিজ্ঞাসা করল,
-‘আপনি কিভাবে জানলেন আমার পেট ব্যথা করছে?’
-‘শশ্মানের আত্মারা কানে কানে বলে গেছে।’
এই মুহূর্তে শুদ্ধর বাঁকা কথা শুনে সে ভ্রুঁ কুটি করে তাকাল। আশেপাশে স্বর্ণকে না দেখে খুঁজছে দেখে শুদ্ধ বলল,
-‘ও সামলে নেবে ভয় নেই। ‘
-‘আপু জানে আপনি এসেছেন? সায়ন ভাইয়া কই, আসে নি?’
-‘তুই আর তোর ভাইয়া জন্মেছিস বার বার আমাদের ভালোবাসার দিকে আঙুল তুলতে। আর আমরা জন্মেছি তোদের গোরবমার্কা বুদ্ধি ট্যাকেল দিতে। ‘
-‘মন ভালো নেই বকবেন না তো।’
-‘ কেন, মনের আবার কি হলো?’
-‘আপনাকে নিয়ে ভয় হচ্ছে খুব।’
-‘কিসের ভয়?’
-‘হারানো ভয়। শুনেছি চোখের আড়াল হলে নাকি মনের আড়াল হতে দেরি লাগে না।’
-‘ তুলে আছাড় দেবো আজাইরা কথাবার্তা বলার সাধ মিটিয়ে দেবো। আসছে সিনেমার হিরোইন হতে। চল হাঁট কিছু খেয়ে ওষুধ খেতে হবে।’
-‘বা’ল খাবে। খাব না ওষুধ। এতকিছু ঘটে গেল এখনো নাকি ধমকাতে হবে। এজন্যই প্রেম করতো চাইনি আপনার সাথে।’
-‘এই বেয়াদব এই প্রেম করলি কখন? প্রেম করার আগেই তো তোর হিটলার মা সব ঘেঁটে ঘ করে দিলো।’
-‘বেশ করেছে। আপনাকে দিয়ে প্রেমের প ও হবে না।’
-‘হবে কি না, সেটা সময় আসুক, দেখে নিস। ‘
একথা বলে সে একটা ফোন এগিয়ে দিলো শীতলের দিকে। বারবার সাবধানও করল কিছুদিন লুকিয়ে রাখার জন্য। এটা দিয়েই আপাতত যোগাযোগ করবে। এই ফোন হারালে আর কথা বলাও হবে না শুদ্ধর সাথে। একথা শুনে শীতল যক্ষের ধনের মতো ফোনটা আঁকড়ে ধরল।
এদিকে দেরি হয়ে যাচ্ছে যেতে হবে কিন্তু বিদায়ের ঘন্টা বড়ই যন্ত্রনার।
শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৪৩
কিন্তু কেউ মুখে বলতে পারছিল না। নিজেকে স্বাভাবিক রাখতে শুদ্ধ টুকটাক কথা বললেও শীতল ফোন হাতে নিয়ে অশ্রুসিদ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল। তখন শুদ্ধ বাঁ পকেটে হাত ঢুকিয়ে কিছু বকুল ফুল এগিয়ে দিলো।
তাজা বকুল ফুল। মিষ্টি সুগন্ধও আছে। পৃথিবীতে এত এত ফুলের মাঝে শুদ্ধর পছন্দ বকুল ফুল। শীতল হাত বাড়িয়ে নিলে স্বর্ণ সেখানে হাজির হলো। আপাতত আর কথা বাড়াল না দু’জন। তবে শীতল যখন জানল শুদ্ধও পেছনের গাড়িতে তাদের সাথে চট্টগ্রাম যাচ্ছে তখন অশ্রুসিদ্ধ চোখে তাকিয়েও মুচকি হাসল। নয়তো বিদায় দিতে কলিজা এফোড় ওফোড় হয়ে যাচ্ছিল।
