শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৭০
নূরজাহান আক্তার আলো
আজ ১৩ ই নভেম্বর। সকাল থেকে বিয়ে বাড়ি আরো জমে উঠেছে৷ আত্মীয়দের ভিড়ে গমগম করছে পুরো বাড়ি। নানান কথা, নানান উক্তি-যুক্তিসহ নতুন বর-বউদের নিয়ে রীতিনীতি চলছে একের পর এক। একেকটা নিয়ম পালন করতে কখনো হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে
বাড়ির ছেলে-মেয়েরা।কখনো বিরক্তিতে চোখ মুখ কুঁচকে ফেলছে। অযৌক্তিক রীতির বাহার দেখে বাড়ির ছেলেগুলো আগেই জানিয়ে দিয়েছে তারা এসবের ধাঁরে কাছেও নেই। এসবে যেন টানাটানি না করে তাদের কিন্তু বয়োজ্যেষ্ঠরা মানলে তো? সরাসরি জানিয়েছেন নিয়ম না মানলে বাসর রাতে বউ পাবে না৷ পেলেও সকালে৷ একথা শুনে অবশ্য সায়ন আর রুবাব তর্কা করেছে কিন্ত শুদ্ধ শুধু তাদের কথা শুনে গেছে। এ ব্যাপারে নাকি তার কিছু বলারও নেই।
কারণ তার ভাষ্যমতে, তার ভাইরা আস্ত পাগল নতুবা কেউ এসব নিয়েও তর্ক করে? বোকারা তর্কে জড়ায়। সেধে সেধে বোকা হওয়ার মানে হয়? অন্যের কথা বাদই থাকুক তার কথায় নাহয ধরা যাক, এইতো সে যেমন, গত রাতেও দ্বিতীয় দফা বাসর সেরেছে। কেউ তা ধরতে পেরেছে? পারে নি। গতরাতে বাসর সেরে আজকের দিন পেরিয়ে
আরেক রাতের অপেক্ষায় আছে। শুধু পারছে না, দিনটাকে হাতে ঠেলে পার করতে৷ মানে বিয়ের আগে বাসর করে আবার বাসরের অপেক্ষা, ভাবা যায়? না ভাবারই কথা! এসব ভাবতে গেলে মাথায়
ক্রিমিনালি বুদ্ধি থাকা লাগে। রোমান্টিক হওয়া লাগে। ইচ্ছে থাকা লাগে। যদিও গতরাতে তেমন প্ল্যান না থাকলেও হয়ে গেছে৷ এজন্য অবশ্য শীতল দায়ি। সে কেন গেল তার কাছে? সে কি ডেকেছিল?
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
মোটেও না! গেল তো গেল; কাছে টানলে সে অনুষ্ঠানের অজুহাত
দেখাচ্ছিল কেন? অজুহাত শুনেই তার মনের কৌতুহল বেড়েছিল। মন মরিয়া হয়ে জানার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিল যে অনুষ্ঠানের আগে কিছু মিছু হলে কি হয়? কি হবে? মূলত কি হয় জানার জন্য রাতটাকে পরীক্ষাস্বরুপ ব্যবহার করছে। আর এর ফলাফল কিন্তু এসেছে লেটারমার্কস্! ফিলিংস অসাম। বিয়ে হয়েছে। বউ তার, আদরের ইচ্ছে তার বাকিসব বানের জলে ভেসে যাক।
সকালের নাস্তা সেরে গায়ে হলুদের ডালা সাজাতে বসেছে একদল যুবক-যুবতী। সাজানো হচ্ছে নানান রকম ফল, মিষ্টি, জামা-কাপড় থেকে শুরু করে আরো নানান প্রসাধনী নিয়ে। এগুলো নাকি যাবে অর্কের বাসায়। বোনের শশুরবাড়ি বলে কথা কোনোকিছুর কমতি রাখে নি সায়ন, শুদ্ধ। বরং এসব জিনিস তারা নিজেরা গিয়ে ঘুরে বেছে বেস্ট জিনিসগুলোই কিনেছে। গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান নিয়ে শারাফাত চৌধুরী অর্কের বাবা-মা পুনরায় আলোচনাও করেছেন। আজ মূলত সায়ন-স্বর্ণ, শুদ্ধ-শীতল, রুবাব-ঐশ্বর্য গায়ের হলুদের কথা থাকলেও হঠাৎ অর্ক-শখের বিয়ে ঠিক হলো। সেই হিসেবে,
তাদেরও গায়ের হলুদের অনুষ্ঠান। স্বর্ণ ও শখ বাড়ি মেয়ে বিধায় অনুষ্ঠানটা বাড়িতেই হবে এবং আলাদা আলাদা জোড়া মিলিয়ে একসাথে বসে তাদের গায়ে হলুদ ছোঁয়ানো হবে। তিনটে কাপল জোড়া থাকলেও শখ একা হয়ে যাচ্ছে এবং ব্যাপারটা পছন্দ হচ্ছে না কারো। তাই আলোচনায় বসে ঠিক করা হয়েছে অর্কের গায়ের হলুদ চৌধুরী নিবাসেই হবে। শখের সাথে। শখের পাশে বসে। এই কথায় অর্কের বাবা-মা সম্মতি দিলে বাগানে ঠিক চারটে পদ্মফুল আকৃতির হলুদের স্টেজ করা হয়েছে। পদ্মফুলের মাঝে বসবে বর বউ। ভীষণ সুন্দর করে সাজানো। যার যার স্টেজে জুটির নামও লেখা রয়েছে। পরপর স্টেজ বিধায় সিরিয়াল অনুযায়ী একে একে গিয়ে হলুদ ছোঁয়াতে পারবে। একে তো চারটে বিয়ে একসাথে এবং এক একটা জিনিস ইউনিক ভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এটাই সকলের নজরে পড়ছে। মুগ্ধ হচ্ছে। কেউ বা হিংসায় জ্বলে যাচ্ছে।
সকাল থেকে ডালা সাজিয়ে দুপুরের পর কাজ শেষ হলো। বাকিরা দুপুরে খেয়ে অন্য কাজ করতে করতে বিকেল হলো। এদিকে নতুন
চার বধূকে সাজানোর হুলস্থুল পড়ে গেছে। কারণ আত্মীয়রা যখন থেকে শুনেছে নতুন বউরা পার্লারে সাজবে না তখন থেকেই সকলে অবাক। গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর চলছে। এত সুন্দর করে বাড়ি টা সাজানো হয়েছে। এত রাজকীয় ভাবে অনুষ্ঠান। অথচ নতুন বউরা নাকি সাজবে না। ব্যাপারটা কেমন হয়ে গেল না? নতুন বর-বউরা সাজবে না অথচ বাকিরা সেজে ঘুরে বেড়াবে। মানে যার বিয়ে তার কথা নেই পাড়া-পড়শীর ঘুম নেই। সম্পর্কে ভাবি-বোন, খালা যখন
এসব নিয়ে যুক্তিতর্ক করছিল তখন হঠাৎ একজন বলল,
-‘এই তোরা চুপ শুদ্ধ ভাই আসছে। ‘
একথা শুনে সকলে নিশ্চুপ। শুদ্ধ তখন ফোনে কথা বলতে বলতে কোনোদিকে না তাকিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলে গেল। তার কথা বলার ভঙ্গি, হাঁটা, এটিটিউড লেভেল দেখে কারো মনে কিছু ঘটে গেলেও সকলে চুপ। কারণ ছেলেটা বিবাহিত। এবং তার বউ যদি জানে তাহলে হুলস্থুল বাঁধিয়ে ফেলবে। শুদ্ধ যাওয়ামাত্রই একদল
গিয়ে ধরল সিঁতারাকে। অনুমতি চাইল বউ সাজানোর। কিন্তু শুধু
সিঁতারা না তিন জা কড়াভাবে বারণ করলেন। বাড়ির ছেলে যখন চাচ্ছে না তখন এসব হবে না। সাজ মানে ভারি মেকাব না। সাজের ধরণ থাকে। মুখভর্তি মেকাব করাকেই সাজ বলে না। কড়া জবাব পেয়ে কেউ আর কিছু বলার সাহস করল না। তবে সেখানে থাকল না কেউ আর না কোনোকিছুতে হাত দিলো। এতে অবশ্য কাজকর্ম পড়ে রইল না। কারণ প্রতিটা কাজের জন্যই লোক নিয়োগ রয়েছে তাই কেউ পিড়াপীড়িও করল না। তবে এসব নিয়ে ড্রয়িংরুমে যখন নানান কথা হচ্ছিল তখন ঐশ্বর্য ওখান থেকে সরে গেছে। অশ্রুসিদ্ধ
ঝাপসা চোখে নিজের বরাদ্দকৃত রুমে গিয়ে শুয়ে পড়েছে। নীরবে কাঁদছে। কান্নার শব্দ যেন বাইরে না যায় তাই মুখটা চেপে ধরেছে।
সে সবার কথা শুনে বুঝে ফেলেছে শীতলরা তার জন্য সাজছে না। তবে তারা এই কথাটা তাকে কেউ জানায় নি। তারা শুধু ওর জন্য বিশেষ দিনেও সাজবে না এটা মানতে পারছে না সে। খুব খারাপ লাগছে নিজের কাছে। অপরাধী মনে হচ্ছে।
এই অনুষ্ঠানে যদি তারা যুক্ত না হতো তাহলে সবাই সাজত। মজা করত। তাছাড়া বিয়ের সাজ নিয়ে প্রতিটা মেয়েরই আলাদা স্বপ্ন থাকে। কিছু ইচ্ছে থাকে। শীতল খুব চঞ্চল। ভারি সাজ সাজে না। তবে সে সাজতে পছন্দ করে। সেই পিচ্চি মেয়েটা তার জন্য নাকি সাজবে না। এটা কোনো কথা? অবশ্য সাজগোছ নিয়ে তার মধ্যে
হেলদোল দেখা যার নি। সবাই যখন সাজানো নিয়ে কথা বলছিল শীতল তখন খেতে ব্যস্ত। হয়তো সে কষ্ট পাবে বিধায় তাকে বুঝতে দিচ্ছে না কেউই।
এসব নানান কথা ভাবতে ভাবতে কান্নার জোর বাড়ল। তার জীবনেও আজ বিশেষ দিন। বিশেষ ক্ষণ, অথচ পাশে কেউ নেই। সায়ন, শুদ্ধকে জামাই আদর করার জন্য তো শাহাদত চৌধুরী আছেন। অর্কের জন্য আছেন শারাফাত চৌধুরী। কিন্তু তার সঙ্গে জুড়ে রুবাব এসবের কিচ্ছুই পাবে না। তার ভাগ্যটাই খারাপ। নিজেরও বাবা নেই সহধর্মিণীও এতিম। শুধু যে এতিম তাও না মুখ পোড়া ঝলসানো চেহারার এক মেয়ে। ঐশ্বর্য কাঁদতে কাঁদতে হঠাৎ মনে হলো রুমে অন্য কেউ উপস্থিত। কৌশলে চোখ মুখ সে পেছনে ঘুরতেই দেখে শখ, স্বর্ণ আর শীতল দাঁড়িয়ে আছে। তাকিয়ে আছে
তার দিকেম পরনের হলুদ সুতি শাড়ি। সকাল থেকেই তাদের শাড়ি পরিয়ে রেখেছে সিরাত। নতুন বউ বলে কথা, বউরা নতুন শাড়ি না পরলে নাকি বিয়ে বাড়ি জমে না। মা-চাচী আর পন্ডিত আত্মীয়ের মুখের উপর কিছু বলতে না পেরে চারজন হলুদ শাড়ি পরে ঘুরছে।
তারা কেউ ই শাড়িতে অভ্যস্ত না দেখে সামলে হাঁটছে ধীরে-সুস্থে। এ নিয়ে সায়ন আর রুবাব একচোট খেঁপিয়েছে তারা নাকি কচ্ছপ।বিয়ের ড্রেসকোড কচ্ছপের মতো হলে নাকি ভালো হবে। আজ কে সকাল থেকেই তিনবোন ঐশ্বর্যের সঙ্গে সঙ্গে থাকছে। একমুহূর্তের জন্যও একা ছাড়ছে না। কেননা তারা বুঝতে পারছে ঐশ্বর্য ভেতর ভেতর কষ্ট পাচ্ছে। সে এডুকেটেড স্ট্যাইলিশ একটা মেয়ে। অথচ তার বিযের আয়োজনে তাকে মুখ লুকিয়ে চলতে হচ্ছে। কেউ যদি তার দিকে কিছুক্ষণ তাকায় সে পালাতে চায়। কথার ধারালো তীর ঘায়েল করার আগে ওড়না দিয়ে টানে মুখে। রুমের মধ্যে তাদেরকে দেখে ঐশ্বর্য উঠে বসল। জোরপূর্বক হেসে বলল,
-‘এসো, বসো।’
শখ তার পাশে বসল। স্বভাবসুলভ মিষ্টি হেসে বলল,
-‘কাঁদছো কেন ভাবি? খারাপ লাগছে? ভাইয়াকে ডাকব?’
-‘না। ওই..আসলে মাথা ব্যথা করছে।’
-‘মাথা টিপে দেই শুয়ে পড়ো তো দেখি।’
-‘না ঠিক আছে সেরে যাবে।’
মলিন হেসে কথাটা বলল ঐশ্বর্য। স্বর্ণ বরাবরই স্পষ্টভাষী। মনে যা আসে মুখের উপরে সেটা চটাস করে বলে দেয়। কেন জানি কথা চাপিয়ে রাখতে পারে না। এই এখন যেমন ঐশ্বর্যের কান্নাও পছন্দ হলো না। কেন কাঁদবে? যার রুবাবের মতো ভালোবাসার একজন
মানুষ আছে। যে মানুষটা তার জন্য প্রতি নিয়ত লড়ে যাচ্ছে।
কেঁদে তাকে হার্ট করা বোকামি নয় কি? মেয়ে হয়েছে বলে যখন তখন কাঁদতে হবে? চোখের পানি এত সস্তা? সে যদি শক্ত নাহয় তাহলে সমাজের মানুষ তাকে আরো ভেঙে দেবে। মোদ্দাকথা, লড়াই করে
শেষ অবধি গিয়ে ঠুকরো কারনে ভেঙে পড়া মেয়েদেরকে একদমই পছন্দ না। সে যদি এমন করতে থাকে রুবাব তো কষ্ট পাচ্ছেই সেই সঙ্গে শুদ্ধরও খারাপ লাগবে। এক্সিডেন্ট তো বলে কয়ে আসে না।
হয়েই যখন গেছে তখন মানিয়ে নিতে হবে। আর জীবনের চড়াই উৎরাই পার করার নামই তো জীবন। মনে মনে এসব কথা গুছিয়ে নিলেও রুড কিছু বলল না। তবে একেবারে চুপ থাকতেও পারল না। সে কিছুক্ষণ ঐশ্বর্যের দিকে তাকিয়ে রইল। মুখটা আগের মত নেই,,তবে মুখে দাগ নেই চোয়াল থেকে শুরু করে গলার নিচ থেকে খসখসে চমড়া। পোড়া ঝলসানোর ছাপ। তাকে এভাবে তাকাতে দেখে ঐশ্বর্য কথার মাঝখানে থেমে গেল। বুঝল স্বর্নের তাকানোর মানে। মাথা নিচু করতেই ঝরঝর করে অশ্রু ঝরিয়ে গেল ঝরঝর করে। শখ, শীতল তাকে কাঁদতে দেখে অসহায় দৃষ্টি ছুঁড়ে দিলো
স্বর্ণের দিকে। স্বর্ণ গলল না। তবে শান্ত শীতল স্বরে বলল,
-‘তুমি একদম ঠিক ধরেছো আমরা তোমার জন্য সাজছি না। এই যে সাজছি না, এতে আমাদের মনে খারাপ লাগা কাজ করছে না। কেন করছে না, জানো? কারণ রুবাব ভাইকে ফুপাতো ভাই ভেবে আমরা কখনো আলাদা করতে পারি নি আর তুমি হলে আমাদের ভাইয়ের জান। ভাই আর ভাইয়ের জানের জন্য এইটুকু করা যায়।’
ঐশ্বর্য মাথা নিচু করে নিলো। স্বর্ণ পুনরায় বলল,
-‘বিয়ের সাজ শখের অংশ। সাজতেই হবে এমন কোনো কথা নেই।
এমন না যে, না সাজলে চরম ক্ষতি হবে। সাজ ছাড়াও বিয়ে হয়। আর ‘সাজব না’ একথাটা কেন নেগেটিভ ভাবে ধরছো? বিয়েটা পবিত্র বন্ধন। পবিত্র কাজ অযু করে আরম্ভ করতে হয়। আমার মা- চাচীদের আমি এটাই করতে দেখি। ভারি মেকাব আর চাকচিক্যের ভিড়ে শো অফ করানোর মধ্যে কি পবিত্রতা থাকে? যাও মুখ ধুঁয়ে এসো আমরা-আমরাই রেডি হবো। শীতল এদিকে আয়, শখ আপু তোমাকে আগে শাড়ি পরাব। আমিও দেখি মেকাব ছাড়া সাজ হয় কী না। আমাদের বউ বউ লাগে কী না!’
একথা বলে স্বর্ণ উঠে দাঁড়াল। আধভেজা চুল খোঁপা করে নিজেই দায়িত্ব নিলো বাকিদের তৈরি করার। শীতল তখন শখকে পঁচাতে লাগল। ছোট বোনের পঁচানি শুনে শখ বকা তো দূর লজ্জায় লাল হয়ে উঠল। অতঃপর চারজন মিলেমিশে নিজেরা তৈরি হলো। মুখে বাড়তি প্রসাধনী বলতে ফেস পাউডার, চোখে গাঢ় করে কাজল আর ঠোঁটে হালকা লিপষ্টিক। হলুদ জামদানী শাড়ির সঙ্গে মিলিয়ে হিজাব। সঙ্গে ফুলের গয়না। গয়নাটা যদিও অর্ডার করে বানানো। পরনের পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে সাদামাটাও না, তবে মানানসই। আর এটুকুতেই নজর বিঁধে যাচ্ছে তাদের উপর। আর সত্যি বলতে, একজন মানুষের পছন্দ দেখে বোঝা যায় সে কতটা স্মার্ট। কতটা রুচি সম্পূর্ণ মানুষ। বাইরে তখন ধুমধড়ক্কা গান বাজছে। সিঁতারা সিমিন, সিরাত এসে তাদের তাড়া দিয়ে গেলেন। অন্যরাও এ রুমে আসতে চাইলে কোনো মতে বুঝিয়ে নিয়ে গেলেন। এদিকে সন্ধ্যা পেরিয়ে মাগরিবের আজানও হয়ে গেছে। ধুমধাড়াক্কা গান বাজছে।
চার পদ্মফুলের স্টেজটা জ্বলজ্বল করছে। বসার আসনের সামনে
সাজিয়ে রাখা নানান রকমের মিষ্টি, পানীয়, ফলসহ আরো কত কী
। ফল টল দিয়ে বানানো কত কী বানানো। এসব মিলিয়ে আটটায়
শুরু হলো হলুদের অনুষ্ঠান। শুদ্ধের বাকি ফ্রেন্ড হইহই করে নাচতে নাচতে মাথার উপর বড় লাল ওড়না ধরে চারবধূকে স্টেজে নেওয়া হলো। শখ, স্বর্ণ, শীতল ও ঐশ্বর্য একে একে যার যার আসনে গিয়ে বসার পর সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি পরা সায়ন, রুবাব, শুদ্ধ, অর্ক ‘ও সেখানে উপস্থিত হলো।সুঠাম দেহের চার পুরুষকে যে কী চমৎকার লাগছে। তারা ধীর পায়ে যে যার স্টেজের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। মুগ্ধ হয়ে দেখল ব্যক্তিগত ফুলকে। গান থেমে গেছে। থেমে গেছে হইচই।
তারা বউয়ের পাশে গিয়ে না বসে দাঁড়িয়ে আছে দেখে সাফওয়ান
চৌধুরী তখন তাদের উদ্দেশ্যে বললেন,
-‘ঐ কি রে, কিরে?’
চারজনই তখন যার যার বউয়ের দিকে তাকিয়ে ঠোঁটে হাসি এঁটে একযোগে বলল,
-‘মধু! মধু!’
তাদের কান্ডে হাসতে লাগল উপস্থিত সকলে। অতঃপর নতুন বররা বসার আগে সবার প্রথমে নিজেরাই বউয়ের হলুদ ছোঁয়াল।বউয়ের
উপর সবার আগে অধিকার থাকে তার বরেরই। সেই হিসেবে দেখা যায় দুনিয়ার এত মানুষ এসে হলুদ ছুঁয়ে দিলেও আসল মানুষটারই দেওয়া হয় না। তাদের হলুদ ছুঁয়ে বসল যে যার বউয়ের পাশে। শখ মাথা নিচু করে আছে দেখে অর্ক আস্তে করে ডাকল,
-‘শখ?’
শখ তাকাল। অর্ক পাঞ্জাবির পকেট থেকে একজোড়া নুপুর বের করে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
-‘হলুদ ছুঁইয়ে দোয়া হিসেবে কিছু একটা দিতে হয়। আমার পক্ষ থেকে এটা।’
শখ নিলো। মিনমিন করে বলল,
-‘আমি কিছু আনি নি।’
-‘ব্যাপার না। তবে চাইলে একটু মিষ্টি খাইয়ে দিতেই পারো আমি কিছু মনে করব না।’
শখ লজ্জায় জমে গেল। আশেপাশে কত মানুষ। সবাই তাকিয়ে আছে। মানুষটাও চাচ্ছে, না করাটা কি ঠিক হবে? শখের অবস্থা অর্ক বুঝল, বলল,
-‘ আচ্ছা সমস্যা নেই।’
শখ লজ্জায় লাল হয়ে গেল। সিরিয়াল অনুযায়ী সবার প্রথমে স্বর্ণ আর সায়নের স্টেজ। তারপর শুদ্ধ আর শীতলেন। তারপর রুবাব আর ঐশ্বর্যের এরপর শখ আর অর্কের। সবার স্টেজের মাঝে তিন কি চার হাত দূরত্ব। সায়ন একটু পর তাকাচ্ছে স্বর্ণের দিকে। চোখে মুগ্ধতা। কিছু বলার আগে স্বর্ণ বলল,
-‘আশেপাশে গেস্ট আছে বেফাঁস কথা বললে খুব খারাপ হবে কিন্তু। ‘
সায়ন থেমে গেল। শারাফাত চৌধুরী ও সিঁতারা একসাথে এদিকে
আসছে দেখে কিছু বলা হলো না আর। তবে পেটের কথা উগলাবে
সময় বুঝে। এদিকে শুদ্ধ শীতলের দিকে বিরক্তির নজরে তাকিয়ে আছে। বিশেষ কায়দা ভ্রুঁ কুঁচকে ধীর স্বরে বলল,
-‘গোসল করিস নি? গায়ে থেকে তেলাপোকা তোলাপোকা গন্ধ আসছে কেন?’
এ মুহূর্তে কোনো বর তার বউকে একথা বলতে পারে? পারে? পাশে বসা বিশুদ্ধ পুরুষ পারে। শুনে শুনে শীতলের অভ্যাস আছে দেখে সে কিছু বলল না। তবে চুপ থাকলে কথারা পেটের মধ্যে খোঁচাচ্ছে দেখে জবাব দিলো,
-‘তেলাপোকার সঙ্গে ঘুমালে এমনই হয়।’
শুদ্ধর ভ্রুঁজোড়া এবার আরো কুঁচকে গেল। আচ্ছা ব্যাঙাচি তাকে তেলাপোকা বলল? কত্তবড় সাহস! সে কিছু বলার আগে শীতল বলল,
-‘ কেমন লাগছে আমায়?’
-‘কাজের মেয়ে রহিমার মতো।’
-‘এজন্য ঘুরে ঘুরে তাকাচ্ছেন বুঝি?’
শেষকথাটা চাইলেও মুখে বলা হলো না বললে আর তাকাবেই না।
তবে মনে মনে হেসে নিলো শীতল। এর আগেও খেয়াল করেছে
চোখে কাজল পরলে শুদ্ধ বার বার তাকায়। দেখে। চোখের কাজল পছন্দ করে বিশুদ্ধ পুরুষ মুখ ফুটে বলবে না। সায়ন আর স্বর্ণকে হলুদ দিয়ে শারাফাত চৌধুরীরা এগোলেন শুদ্ধদের দিকে। সায়নের গায়ে হলুদ দিচ্ছেন সাওয়ান ও সিরাত চৌধুরী। বাবা- মাকে দেখে শুদ্ধ থেমে গেল। শারাফাত চৌধুরী স্নেহের হাসি ছুঁড়লেন বিনিময়ে তারাও হাসল। সায়ন-স্বর্ণকেও চোখ ভরে দেখে মন ভরে দোয়া করেছেন। এদেরও তাই করলেন। রুবাব-ঐশ্বর্যকেও তাই,,, এরপর শখ আর অর্ককেও। এভাবে একে একে হলুদের অনুষ্ঠান চলতেই থাকল। চারপাশে কত হাসি, কত মজা, কত আনন্দ। এক স্টেজে বসে আরেক স্টেজে বসা ভাই-বন্ধুকেও পঁচালো। কামরানরা এলে তাদের কান্ডে সকলে হাসতে হাসতে কাহিল।
অথচ কেউ জানলোই না সবার ভিড়ে বিনা নিমন্ত্রণে কেউ এখানে এসেছে। যে একবুক কষ্ট নিয়ে ছলছল চোখ আর ঠোঁটে হাসি এঁটে তাকিয়ে আছে শীতলের দিকে। দূর থেকে দেখছে এক সমুদ্র সমান তৃষ্ণা নিয়ে। বিরবির করে আপনমনে বলছে,
-‘আমার ভাগের নিমন্ত্রণ পত্রটা বুঝি কম পড়েছিল তাই পাঠাও নি,
তাই না? তাতে কি! এই জীবনে আমাকে কেউই ঘটা করে নিমন্ত্রণ করে নি। তাই বলে কি আমি আসব না? তবুও এসেছি, বেহায়ার মতো তোমাকে দেখতে আবারও ছুঁটে এসেছি বাবুই পাখি। জানো,
আজকের আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তোমাকে পাওয়ার আশা রেখেছিলাম।
প্রতি সেকেন্ডে চাচ্ছিলাম শুদ্ধ ম’রে যাক। যেকোনো ভাবে সে ম’রে যাক। সেটা আর চাচ্ছি না৷ এখন চাচ্ছি, তুমি বেঁচে থাকো। সুখে থাকো। জানো বুরাক চেয়েছিল কিযারাকে আঁটকে রাখতে,, পারে নি। এতদিনে খুব করে চেষ্টাও করেছিল। মিষ্টি কথায় না শুনলে সে
ভেবেছিল ভয় দেখিয়ে হলেও নিজের কাছে রেখে দিবে। হলো না।
কিয়ারা আজ সকালে সুইসাইড করেছে। সে এখন কববের স্থায়ী বাসিন্দা। বুরাকটাও বোধহয় বাঁচবে না তার অবস্থাও ভালো না।
শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৬৯
ডাক্তাররা আশা দিতে পারছে না৷ ওদের দেখে আমি এখন খুব করে চাই, তোমাকে আমার হতে হবে না পাখি। আমি এটাও জানি কিয়ারা এত দিন বেঁচে ছিল তুমি তাও থাকবে না। আর তোমাকে সাদা কাফনে মোড়া অবস্থায় দেখার সাহস আমার নেই। তারচেয়ে তোমার ভালো নিয়ে তুমি খুব ভালো থাকো। বৃষ্টির মতো সুখ বর্ষণ হোক তোমাদের উপর। ওসব সুখ টুখ আমাদের জন্য মরিচিকা, বিভীষিকার মতো অভিশপ্ত।’

পর্ব একটা দুইবার দিয়ে একটা মিস হয়ে গেছে পর্ব
thik kore dewa hoyese part 69
প্রিয় প্রনয়নী ১ এর সারপ্রাইজ পর্ব গুলো দেন
72 porbo kobe asbe?