Home শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯০

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯০

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯০
নূরজাহান আক্তার আলো

ঘড়ির কাঁটায় এখন রাত আটটা ছুঁইছুঁই। হঠাৎ কালো মেঘে ঢেকে গেছে আকাশ। বইছে ঝড়ো বাতাস। শুরু হয়েছে শুকনো পাতার ঘূর্ণি। শোনা যাচ্ছে মেঘের হাড়কাঁপানো গুরুগম্ভীর ডাক। ​হঠাৎ বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি নামল। মুহূর্তে মধ্যেই তা রূপ নিলো অবিরাম ধারায়। সিতারা, সিমিন দুই জা চুপ করে ড্রয়িংরুমের জানালার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। থাইগ্লাসটা আঁটকে দিয়ে মূল ফটকের দিকেই তাকিয়ে আছেন। চোখে-মুখে চিন্তার ছাপ। বাইরে এত ঝড় বৃষ্টি অথচ শুদ্ধ এখনো বাড়িতে ফিরে নি। তার কী জরুরি কাজ শেষ হয় নি? এখনো বাড়ি ফেরার সময় হয় নি? ফোনেও কল ঢুকছে না। অসময়ে ভিজেপুরে এই ছেলে নির্ঘাত জ্বর বাধাবে। কিন্তু শুনলে তো? কিছু বললে গুরুত্ব তো দেবেই না বরং স্বভাবস্বরুপ এড়িয়ে যাবে। এদিকে এত জোরে মেঘ ডাকছে ভয়ে অন্তর আত্মা কেঁপে উঠছে।

মেঘের গর্জনে উনারা জানালার কাছ থেকে সরে সোফায় বসলেন। কিন্তু কারোর অস্থিরতা থামল না। দুজনই শুদ্ধর নাম্বারে কল দিতে থাকলেন। এবারও কল ঢুকল না। রুবাব বাড়িতেই আছে সে খোঁজ দিতে পারবে? তার সাথে শুদ্ধর কথা হয়েছি কি? হতেও তো পারে৷ একথা ভেবে সিমিন
দোতলায় রুবাবের রুমে গেল। স্বর্ণের আগের রুমটাতেই রুবাব থাকে।
উনি দরজায় নক করে সাড়া না পেয়ে রুমে প্রবেশ করলেন। কিন্তু কেউ নেই, ওয়াশরুমের দরজাও বাইরে থেকে আঁটকানো। এ ছেলেও কোথায় গেছে? কখন বের হলো? এ ঝড় বৃষ্টির মধ্যে কেউ বের হয়? এদের নিয়ে আর পারা গেল না। উনি রুবাবকে কল দিলে ফোনটা রুমে বেজে উঠল।
একজনের ফোনে কল ঢুকছে না তো আরেকজন ফোনটাই রেখে গেছে।

উনি বকতে বকতে ড্রয়িংরুমে এসে সিতারাকে জানালেন। সিমিন বাড়ি ফিরে এতক্ষণ স্বর্ণের কাছে থাকায় রুবাবকে বের হতে দেখেন নি। শুদ্ধ নেই, রুবাবও নেই, ছেলে দুটোর খোঁজ করার কথা বলার জন্য সিতারা
ছুটলেন শারাফাত চৌধুরী কাছে। কিন্তু নিজের রুমে ঢুকে অবাক হলেন। খুঁজে দেখলেন শারাফাত চৌধুরীও নেই। কি আশ্চর্য, এরা সবাই কোথায় গেছে? কি এমন কাজ পড়েছে যে বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে গেছে? মাগরিবের নামাজ পড়ে অন্যরুমে কোরআন পড়ছিলেন। বুকের ভেতর অশান্ত হয়ে আছে দেখে অনেকক্ষণ পড়েছেন। আর পড়তে পড়তে কখন যে আটটা বেজে গেছে খেয়ালই করেন নি। সেই মুহূর্তে ড্রয়িংরুমে কেউ না থাকায়
কেউ যেতে দেখেন নি। কিন্তু কিছু না বলে কোথায় গেছে? আবার কারো কিছু হলো না তো? বিপদ যেভাবে ঝেঁকে ধরেছে ভয়ে ভয়ে থাকতে হয়।
ওদিকে মেঘের তীব্র গর্জনে সাম্য-সৃজন সিরাতকে জাপটে ধরে আছে।
মায়ের কোলে মুখ লুকিয়ে আছে বাচ্চা দুটো। না কোথাও যেতে দিচ্ছে আর না সঙ্গে যাচ্ছে। এদিকে ড্রয়িংরুমের জানালাটা কেউ লাগাল নাকি কে জানে? বাইরের অবস্থা দেখে উনি সাফওয়ান চৌধুরীকে বললেন

_’শুদ্ধ ফিরেছে? ‘
_’না। কল ঢুকছে না।’
_’কোথায় গেল ছেলেটা? ওর মানসিক অবস্থা ভালো না ওকে একা ছাড়া উচিত হয় নি সাম্যের বাবা।’
_’ও কি বারণ শোনার ছেলে? তাছাড়া ওর মনের অবস্থা ভালো না দেখে একা ছেড়েছিলাম। চিন্তা কোরো না, হয়তো বৃষ্টির কারণে আঁটকে গেছে।’
_’তাই হবে। তুমি এদের ধরো তো আমি গিয়ে দেখি বড় ভাবি কি করছে।
ভাবির শরীরও খুব একটা ভালো নেই। এদিকে স্বর্ণ বাড়িতে ফিরেই বমি টমি করে কাহিল হয়ে পড়েছে মেয়েটা। আল্লাহ কবে যে আমাদের দিকে মুখ তুলে তাকাবেন। কবে যে সব ঠিকঠাক হবে? জানো, আমার না আর ভালো লাগে না আর সহ্য করতে পারি এসব। ইচ্ছে করে হাউমাউ করে কাঁদি। ছেলে-মেয়েগুলোকে দেখলে বুকটা ফেঁটে যায়। ড্রয়িংরুমে গিয়ে দাঁড়ালে চোখে ভাসে আগের কতশত কথা, কথা স্মৃতি। ঝাপসা চোখের ভাসে শখ এককোণে বসে বই পড়ছে, সায়ন-রুবাব কিছু নিয়ে হাসছে, শুদ্ধ চ্যালাকাঠ নিয়ে শীতলকে মারতে তেড়েছে, সাম্য- সৃজন শাহাদাত ভাইয়ের সঙ্গে কোথাও যাওয়ার বায়না ধরেছে। কই সেসব দিন? কই সেসব মুহূর্ত? যখন একা একা বসে ভাবি আমার না মাথা কাজ করে না,

আমাদের বাড়ির এমন দশা হবে কল্পনাতেও আনতে পারি নি কখনো। অথচ..।’
একথা বলতে বলতে কেঁদেই ফেললেন সিরাত। পুনরায় মেঘের গর্জনে কেঁপে উঠল চারিপাশ। সাম্য-সৃজনকে সাফওয়ান চৌধুরীর কাছে রেখে দ্রুতপায়ে বের হলেন তিনি। ড্রয়িংরুমে সিতারা, সিমিন, স্বর্ণকে দেখে বুঝতে বাকি রইল না শুদ্ধ ফিরে নি৷ এদিকে বৃষ্টি বেড়েই চলেছে। উনি আরেকবার কল করলে কল ঢুকল না। ছেলের চিন্তায় সিতারা কাঁদছেন।
শুদ্ধ এখনো ফিরছে না, রুবাব নেই, শারাফাত চৌধুরীও নেই দেখে মনে হচ্ছে আবারও বিপদে হয়েছে। নয়তো শারাফাত চৌধুরী উনাকে না বলে কোথায় যাবে? যেখানেই যাক বৃষ্টি বাদলার দিনে না বলে যাওয়ার মানুষ তো উনি না। নাকি বৃষ্টি হচ্ছে দেখে ভাইয়ের কবরের কাছে ছুটে গেছেন?

কেননা ভাইকে যখনই মনে পড়ে তখনই শাহাদত চৌধুরী কবরের পাশে গিয়ে বসে থাকেন। একা একা কত কথা বলেন। মনটা বেশি খারাপ হলে একদৃষ্টিতে শুকনো মাটির দিকে তাকিয়ে থাকেন। আশেপাশে কোথাও আবারও বজ্রপাত হওয়ামাত্রই বিদ্যুৎ চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে জেনারেটর চালু হয়ে চারদিক আলোয় জ্বলমল করে উঠল। কিন্তু কারোর দুশ্চিন্তা কমল না। এভাবেই আরো কিছুক্ষণ কেটে গেল। ঘড়ির কাঁটাও টিকটক করে এগোতে থাকল। ওদিকে এত এত ঝড়-বৃষ্টি, মেঘের ডাক উপেক্ষা করে সাম্য-সৃজন বাবাকে আকড়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়েছে। বাবার হাতের দুটো আঙুল তাদের ছোটো ছোটো দুই হাতের মুঠোয়। পৃথিবী লন্ডভন্ড হয়ে গেলেও বাবা তাদের ফেলে যাবে না। কোনো ক্ষতি হতে দেবে না।
এ ভরসায় তারা এই পরিস্থিতিতেও নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড়েছে। এর ঘন্টা খানিক পর, ধীরে ধীরে মেঘের গর্জন কমে এসেছে। ঘড়ির ঘন্টার কাঁটা তখন এগারো এর ঘরে স্থির। বৃষ্টির মাত্রা একটু কমেছে। তবে তিন জা এখনো ড্রয়িংরুমে বসে আছে। ঘুরে ফিরে ওই তিনজনকে কল করছে।
তখন পরপর দুটো গাড়ি চৌধুরী নিবাসের মূল ফটক পেরিয়ে ভেতরে এসে থামল। গাড়ির হর্ণ শুনে তিন জায়ের কলিজায় যেন পানি এলো।
তারা ফিরেছে ভেবে সিমিন তখন রাগে গজগজ করতে করতে বললেন,

_’আসুক বেয়াদব দুটো, কান টেনে যদি লম্বা না করেছি। মেয়ে জামাই হয়েছে বলে কি সাপের পাঁচ পা দেখে়ছে? যা মন চাইবে তাইই করবে?
রাস্তায় আঁটকে গেছে কল করে একটু জানালে কি এমন ক্ষতি হতো? তা করবে কেন? দুশ্চিন্তায় রাখতে হবে না বাড়ির লোককে?
উনি গজগজ করে দরজা খুলে রাখলেন আর সিরাত জানালার কাছে দাঁড়ালেন। জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখলেন পাকিং লটের আগে দুটো গাড়ি থেমেছে। ধীরে ধীরে গাড়ির দরজা খুলে রুবাব নেমে শারাফাত চৌধুরীকে ধরে নামাল। তা দেখে এবার সিরাতের ভ্রুজোড়া কুঁচকে গেল, শারাফাত চৌধুরীর কি হলো? উনাকে এমন লাগছে কেন? অসুস্থ হয়ে পড়েছে নাকি? তারা নামতে নামতে ভেজা শরীরে দুজনই আরেকদফা ভিজল। সিরাত শুধু বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে রইল। কি হচ্ছে, কিছুই উনার
বোধগম্য হলো না। তখন তারা দরজা পেরিযে ড্রয়িংরুমে এসে দাঁড়াতেই
শারাফাত চৌধুরীর পাজোড়া যেন অবশ হয়ে এলো। নিজের ভারসাম্য হারিয়ে উনি ধপ করে মেঝেতে বসে পড়লেন। চারিদিকে কেমন ঝাপসা হয়ে এলো। সিমিন, সিরাত, সিতারা বাকহারা হয়ে তাকিয়েই রইলেন।
কিছু বলার আগে কয়েকজোড়া পায়ের শব্দে ঘুরে সেদিকে তাকালেন।

অর্ক, হাসান, কামরান, স্যান্ডি আর আজম মিলে স্ট্রেচারে কাউকে এনে রাখল ড্রয়িংরুমের মাঝখানে। সাদা কাপড়ে ঢাকা কারো মুখ। বাকিরাও তখন ড্রয়িংরুমে উপস্থিত। হতভম্ব চোখে তাকিয়ে আছে মৃত মানুষটার দিকে। এ কে? কি হয়েছে? এখানে কেন? এই তিনটে প্রশ্নের উত্তর পেতে
উৎসুক হয়ে রইলেন। শারাফাত চৌধুরী অঝরে কেঁদেই যাচ্ছেন। কন্ঠস্বর ভেঙে গেছে। ভাঙা গলা দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। তবুও নিজের মতো করে ভাঙা সুরে আওড়ালেন,
_’ এত রাগ ছিল আমার ওপর? এত অভিমান নিয়ে কেউ চলে যায়? আর কোনোদিন বাবা বলে ডাকবি না আমায়? আর রাগ দেখাবি না? একবার মাফ চাওয়ার সুযোগটকুও দিলি না রে, আব্বা? এই আফসোস কিভাবে ভুলব আমি? কিভাবে নিজেকে সামাল দেব?’
এইটুকু বলে থামলেন তারপর শুকনো ঢোক গিলে পুনরায় বললেন,

_’রেগে একটা মেরেছি নাহয়। বাবা হয়ে একটা মারতে পারি নি। শাসণ করতে পারি না? তাই বলে..এভাবে মুখ ফিরিয়ে নিবি? এভাবে চলে যাবি?’
উনার কথা শুনে সিতারা চৌধুরী বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।
তবে কি এটা শুদ্ধ? শুদ্ধর সঙ্গেই তো উনার মনমানিল্য চলছে। হচ্ছেটা কি? আচ্ছা, এটা কী দুঃস্বপ্ন? উনি কি কোনো ঘোরের মধ্যে আছেন?
শরীরে আঘাত করে বুঝলেন না এটা দুঃস্বপ্নও নয়। তবে কি সত্য? সত্যি
সত্যিই উনার বুকশূন্য হয়ে গেল? কোল শূন্য হয়ে গেল? অভিমান করেই ছেলেটা চলে গেল? সকালে যে বলল জরুরি কাজ আছে ফিরতে দেরি হবে, কিন্তু একেবারেই যে হারিয়ে যাবে তা তো বলে নি? শুদ্ধ তো একটা ফাঁকিবাজ নয়! মিথ্যােবাদী নয়! সে তো কথা দিয়ে কথা রাখে। তাহলে?
ধীরে ধীরে লাশের শরীর ঢাকা সাদা কাপড়ের উপর রক্ত ভেসে উঠেছে।

বিশেষ করে মুখের অংশটুকু। উনার কলিজার টুকরোর এ অবস্থা কেন? কি হয়েছে তার? পড়ে টড়ে গিয়েছিল, কোথায় কোথায় ব্যথা পেয়েছে? মুখে এত রক্ত কেন? একের পর এক বিপদ আঘাত হানছে হানুক, তাই বলে ছেড়ে চলে যেতে হবে? এই কেমন নিয়ম? আর আজকাল সবারই যাওয়ার এত তাড়া কেন? এভাবে যেতে থাকলে উনারা বাঁচবে কাদের নিয়ে? কে বুকপ্রাণ জুড়িয়ে ডাকবে উনাদের? উনি আর কিছু ভাবতেও পারলেন না, মস্তিষ্ক এই আঘাত সইতে পারল না জ্ঞান হারিয়ে মেঝেতে লুটিয়ে পড়লেন। উনাকে পড়তে দেখে সিরাত বড় জাকে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। সিমিন নিজেও পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। নিজে নাহয় বিধবা হলেন মেয়েকেও এবার বিধবার বেশে দেখতে হবে? এটাও ভাগ্যে ছিল? শীতল সহ্য করতে পারবে? মেয়েটার জীবনে কি কষ্ট কম ছিল? উনার মেয়েটা যে এবার মরে যাবে, সত্যি মরে যাবে, যখনই দেখা করতে যান কতবার করে যে বলে, ‘আম্মু, ওর দিকে খেয়াল রেখো তো। জোর করে খাওয়াবে, রাত করে ফিরলে বকবে, বুঝলে আম্মু আমি এখানে খারাপ নেই বরং ভালোই আছি, তোমরা শুধু ওকে একটু দেখো।’

মেয়ে তো দায়িত্ব দিয়েছিল কিন্তু সেই দায়িত্ব পালন করতে পারলেন না। এবার কোন মুখে মেয়ের সামনে দাঁড়াবেন? কি বলবেন? উনি আর কিছু ভেবে পেলেন না। সাহসও হলো না সাদা কাপড় তুলে মুখটা দেখার। শুধু ফ্যালফ্যাল করে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এদিকে সিতারার মুখে পানি ছিঁটা দিয়ে কোনোমতে জ্ঞান ফিরল। পাশে বসে কাঁদছে শখ। হাত পা ডলে দিচ্ছে ঐশ্বর্য। হঠাৎ উনার দৃষ্টি আঁটকাল অর্ক, স্যান্ডি, হাসান আর কামরানের দিকে। এরা এখানে কেন? এরা সায়নকে নিয়ে দেশের বাইরে ছিল এতদিন। উনার এবার টনক নড়ল। সেদিনের সেই ঘটনার পর সায়নের উপর আবারও হামলা হয়েছিল। ভুল ঔষুধ দেওয়া হচ্ছিল, ফলে তার সায়নের শরীর কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। এর পরদিনই গোপনীয়তার সাথে সায়নকে দেশের বাইরেও পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সায়নের কেবিনে রাখা হয়েছে অন্য কাউকে। এমনকি একজন ডাক্তার ছাড়া অন্য কেউ এলাও ছিল না। তবে সমস্যা বেঁধেছিল তার সাথে কে যাবে, কে থাকবে? এদিকে শুদ্ধ যদি ভাইয়ের সাথে যায় একদিকটা কে সামাল দেবে? শুদ্ধ চলে গেলে শীতল মানসিকভাবে আরো ভেঙে পড়ত
, মেয়েটার কথা বিবেচনা করে বিপদের দিনে শুদ্ধর বন্ধুরা আগে এগিয়ে এসেছিল। সায়নকে পাঠিয়ে তারাও একে একে দেশ ছেড়েছিল, তাদের সঙ্গে শখ আর ঐশ্বর্যও ছিল। যার কারণে বাড়িতে এদের উপস্থিতি ছিল না। কিন্তু এরা ফিরে এসেছে কেন? এখন তো ফেরার কথা নয়, তবে?

অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতিতে মানুষের মস্তিষ্ক পরিচিত গণ্ডির বাইরে চিন্তা করতেও অলসতা করে। ফলে নির্দিষ্ট কারো ওপর সবটুকু মনোযোগ বা দুঃশ্চিন্তা স্থির করে ফেলে। এখন যেমন শুদ্ধ বাড়ি নেই, বাইরে এত ঝড় বৃষ্টি, ছেলেকে নিয়ে দুচিন্তায় করায় এতক্ষণ লাশটাকে শুদ্ধই ভেবেছিল। কিন্তু অর্কদের দেখে উনার টনক নড়ল। সায়নকে ফেলে ফিরে আসারও মানুষ না এরা। উনি সমীকরণে মিলাতে পারলেন না। ​মায়েদের মন বড়ই বিচিত্র; বিপদ আসলে আগে নিজেদের সন্তানদের কথায় মাথায় আসে।
মোনাজাতে সবার আগে সন্তানদের জন্য করার দোয়ায় মুখ থেকে বের হয়। সিতারার এবার বুক পাজর যেন ভেঙে এলো। বুকে কিছু চাপ দিয়ে ধরল। উনি নিজেকে ছাড়িয়ে হামাগুড়ি দিয়ে লাশের কাছে গেলেন। দুই চোখের পানিতে কিছুই দেখতে পাচ্ছেন না। সন্তানকে কি মা ভয় পায়?
পায় না তো, যতই ভয়ংকর লাশই হোক মায়ের কাছে সন্তান সবসময়ই
বড্ড আদরের। কম্পিত হাতে মুখের উপর থেকে সাদা কাপড়টা সরাতে
দেখা গেল রক্ত মাখা একখানা মুখ, উনি শাড়ির আঁচল দিয়ে যত্ন করে মুখখানা মুছে দিতে দিতে মমতাভরা কন্ঠে ডাকল,

_’সায়ন? কলিজা আমার, কি হয়েছে বাবা? গলা ফাটিয়ে আম্মু! আম্মু করে ডাকতে ডাকতে বাড়িতে ঢুকার কথা না তোর? উঠ তো বাবা? মা! মা! বলে একবার ডাক দেখি। কতদিন ধরে ডাকিস না আমায়, ডাক না একবার!’
বিরবির করে এসব আওড়াতে আওড়াতে রক্ত মুছে দিতেই একটা মুখ স্পষ্ট হলো। চোখের পানি মুছে একটু ঝুঁকে ভালো করে তাকালেন ফর্সা মুখখানার দিকে। চিনতে পেরে এবার হতভম্ব হয়ে তাকালেন শারাফাত চৌধুরীর দিকে, শারাফাত চৌধুরী উনার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সিতারা চৌধুরীর হাত থেমে গেলেও চোখের পানি বাঁধ মানে নি। মৃত মানুষটার মুখে উপরেই এখনো টপটপ করে পড়ছে উনার চোখের পানি। উনাকে
থমকে যেতে দেখে শারাফাত চৌধুরী এবার বললেন,

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৮৯

_’থামলে যে? কাঁদো সিতারা। আরেকটু কাঁদো। আমার ছেলের মুখটা আরেকটু ছুঁয়ে দাও। তোমার আঁচল দিয়ে ওর রক্তটুকু মুছে দাও। রক্তে পাপ থাকে না সিতারা, হাত সরিও না, ওর কপালে আর একবার হাত রাখো। ভয় নেই, এবার কারো ক্ষতি করতে আসে নি; এসেছে চিরতরে মুক্তি দিতে।’
একথা বলে উনি শব্দ করে কেঁদে ফেললেন। উনার কান্নার শব্দে ভারী হয়ে উঠল ড্রয়িংরুম। সিরাত, সিমিন, সাফওয়ান চৌধুরী তখনো মুখটা দেখেননি দেখে ছুটে আসতেই উনারাও এবার থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন।
বিস্ময় নিয়ে চেনা তবে ভীষণ অপ্রিয় মুখটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কারণ এখানে শুদ্ধ, সায়ন নয় শুয়ে আছে শারাফাত চৌধুরী আরেকটা অবাধ্য ছেলে_ইয়াসির খান।

শেষ চৈত্রের ঘ্রাণ পর্ব ৯১

10 COMMENTS

  1. আপু পরের পর্ব একটু তাড়াতাড়ি দিও প্লিজ 😁🙃

Comments are closed.