সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি ২য় খন্ড পর্ব ৪৪
Jannatul Firdaus Mithila
“ অসুস্থ বলে বেঁচে গেছো মেয়ে! নাহলে ঘুমন্ত বাঘকে জাগিয়ে তোলায় আজকে তোমার কপালে ঠিক কি পরিমাণে শনি লাগতো সেটা তুমি স্বপ্নেও ভেবে কুল পেতে না!”
অরিন এখনো মুখ টিপে হেসে যাচ্ছে। ছেলেটাকে আজ যা জব্দ করেছে না…! হাসতে হাসতেই একপর্যায়ে পেটে খানিকটা মোচড় দিয়ে ওঠে অরিনের।মেয়েটার মুখ থেকে তৎক্ষনাৎ “ উফ” নামক ব্যাথাতুর শব্দ বেরিয়ে আসে।তলপেটে হাত দিয়ে খানিকটা চেপে ধরে অরিন।রৌদ্র তৎক্ষনাৎ ঝুঁকে আসে মেয়েটার দিকে।বিচলিত গলায় বলতে থাকে,
“ কি হয়েছে সানশাইন? ব্যাথা হচ্ছে খুব?”
অরিন মুখ কুঁচকে পড়ে রইলো বিছানায়। ব্যাথায় কথা বলাও বুঝি দায় হয়ে পড়েছে তার জন্য!মেয়েটা কোনমতে মাথা নাড়িয়ে হ্যা বললো রৌদ্রকে।রৌদ্র সাথে সাথে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। টেবিলের ওপর রাখা অলিভ অয়েলের বাটিটা হাতে নিতেই দেখে — তেলটা ঠান্ডা হয়ে একাকার অবস্থা! রৌদ্র একপলক বিছানায় পড়ে থাকা অরিনের দিকে তাকায়।তেলের বাটিটা হাতে নিয়েই মেয়েটার কাছে এগিয়ে আসে দ্রুত পায়ে।তারপর অরিনের ব্যাথায় জর্জরিত হয়ে থাকা মলিন মুখটার ওপর আলতো করে চুমু একেঁ বললো,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“ একটু ধৈর্য্য ধর সোনা! আমি এক্ষুনি যাবো আর আসবো!”
কথাটা শেষ করে রৌদ্র তড়িঘড়ি করে ঘরের দরজার কাছে যায়।ধীরে ধীরে দরজাটা খুলে, আগে একবার সর্তক চোখ বুলালো চারপাশে। রাতের আধারে তেমন কাওকে দেখতে না পেয়ে ছেলেটা খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বেরিয়ে গেলো ঘর ছেড়ে।
প্রায় মিনিট পাঁচেক পর রৌদ্র ঘরে ঢুকলো।একহাতে গরম তেলের বাটিটা ধরে, অন্যহাতে নিঃশব্দে ঘরের দোর দিয়ে দিলো।তারপর এগিয়ে গেলো অরিনের কাছে। অরিনটা এখনো সেই আগের ন্যায় বিছানায় মুখ গুঁজে খানিকটা বাঁকা হয়ে পড়ে আছে। রৌদ্র হাতের গরম বাটিটা বিছানার এক কোণে রাখলো।তারপর হাত বাড়িয়ে একটা বালিশ নিয়ে, মেয়েটাকে সোজা করে শুইয়ে দিয়ে তার মাথার নিচে বালিশটা দিয়ে দিলো। অরিন পিটপিট চোখে তাকিয়ে রইলো শুধু। রৌদ্র এবার অরিনের পেটের ওপর থেকে জামাটা সরিয়ে দেয় কিছুটা। তারপর পাশে থাকা বাটিটা থেকে খানিকটা উষ্ণ তেল মাখিয়ে নিলো নিজের দু’হাতের তালুতে।রৌদ্র প্রথমে নিজ হাতের উপর পিঠে তেল ছুঁইয়ে দেখে নিলো — এর উষ্ণতা আদৌও সহনীয় কি-না! যখন তার মনে হলো,তেলটার উষ্ণতা খুব একটা বেশি নয়, তখনি সে ধীরে ধীরে অরিনের তলপেটে ম্যাসাজ করতে লাগলো।
হঠাৎ এমন স্পর্শে খানিকটা কেঁপে কেঁপে ওঠে অরিন। মুহুর্তেই তার সমস্ত শরীর যেন জমে এলো। সে কিছুটা নড়চড় করতেই মৃদুস্বরে খেঁকিয়ে ওঠে রৌদ্র!
“ কি সমস্যা? আরাম দিচ্ছি ভালো লাগছে না তোর? নড়াচড়া বন্ধ করে চুপচাপ শুয়ে থাক!”
অগত্যা এমন কথায় মেয়েটার সকল নড়চড় যেন একেবারেই বন্ধ হয়ে আসলো। অরিন ধীরে ধীরে নিজেকে স্বাভাবিক করে চোখদুটো বন্ধ করে পড়ে রইলো। নাহ! এ মুহুর্তে আর আগের মতো খারাপ লাগছে না তার।মালিশটা বেশ স্বস্তি দিচ্ছে তাকে।প্রায় বেশ কিছুক্ষণ পর রৌদ্র মেয়েটার পেট ছেড়ে, পায়ের কাছে গিয়ে বসলো।অরিনের পায়ে স্পর্শ করা মাত্রই হকচকিয়ে ওঠে অরিন। সে তড়িৎ আধশোয়া হয়ে বসে রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো,
“ কি করছেন টা কি? আপনি আমার পায়ের কাছে কেনো বসলেন? উঠুন.. প্লিজ উঠুন! ”
মেয়েটার এহেন কথায় খানিকটা বিরক্ত হলো রৌদ্র। ছেলেটার চোখেমুখে স্পষ্ট লেপ্টে আছে একরাশ বিরক্তির ছাপ।সে বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে বলে ওঠে,
“ সমস্যা কি তোর? আমি আমার বউয়ের পায়ের কাছে বসলে তোর কি?”
অরিন মাথাটা নিচু করে নেয়। মিনমিনে স্বরে বলতে থাকে,
“ আসলে আপনি তো আমার বড়।আর বড় হয়ে ছোটো মানুষের পায়ের কাছে বসলে তো ছোটদের পাপ হবে।”
মেয়েটার এহেন অদ্ভুত যুক্তিতে না চাইতেও হেঁসে দেয় রৌদ্র।ছেলেটা হাসির একপর্যায়ে ঠোঁট কামড়ে ধরে নিজের। অরিনের আদুরে মুখখানায় সরু দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে রইলো কিয়তক্ষন। তারপর মেয়েটার মুখের সামনে এসে আলতো করে ঠোঁট দুটো নিজের ওষ্ঠপুটের মাঝে টেনে আবারও ছেড়ে দিলো সেগুলো। অরিন হতবিহ্বল হয়ে পড়লো রৌদ্রের এমন কান্ডে। মেয়েটা হতবাক চোখে তাকিয়ে আছে, হয়তো বোঝার চেষ্টা চালাচ্ছে ছেলেটার এমন হাবভাবের কারণ।রৌদ্র মুচকি হাসলো। মেয়েটার সরু নাকটা হালকা হাতে একটুখানি টেনে দিয়ে কৌতুকের গলায় বললো,
“ এইটুকু মেয়ে হয়ে সারাদিন আমায় উঠতে বসতে নাকানি-চুবানি খাওয়াচ্ছিস! এক কথায় নাকে দড়ি দিয়ে ঘোরাচ্ছিস। তারওপর আমার সাথে হ্যাংকি-প্যাংকি করে আমায় সিডিউস করিস, — আমি ছেলে বিরাট ধৈর্য্যশীল বলে তুই এখনো সুস্থ আছিস।নইলে এতোদিনে….. থাক আর বললাম না। এমনিতেই যেই পরিমাণে পেকে গেছিস,বাকিটা বললে তো কথাই নাই! তো যাইহোক, এতো কিছু যখন আমার সাথে করিস তখন কি একবারও খেয়ালে থাকে না, আমি তোর থেকে বড়? তখন যদি খেয়ালে না থেকে থাকে তাহলে এখন কেনো এতো ন্যাকামো করছিস?”
রৌদ্রের একের পর এক যুক্তিসঙ্গত কথায়, লজ্জা পেয়ে মাথাটা একেবারেই নিচু হয়ে আসে অরিনের।মেয়েটার চিবুক গিয়ে ঠেকেছে গলায়। গালদুটোয় কেমন লালিমা ছড়িয়ে পড়েছে ইতোমধ্যে। সরু নাকটার ডগায় জমেছে বিন্দু বিন্দু ঘাম।রৌদ্র একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলো মেয়েটার এহেন রুপ।তারপর কোনো কথা ছাড়াই মেয়েটার চিবুকে আঙুল ঠেকিয়ে, তার মুখটা কিছুটা উঁচিয়ে তুলে রৌদ্র। অরিনের চোখদুটো বন্ধ করে রাখা। বন্ধ চোখের পাপড়িগুলো কেমন তিরতির করে কাঁপছে! রৌদ্র ফাঁকা ঢোক গিললো।যাহ! আবারও শুরু হলো তার অন্তরের অন্তস্তলে হওয়া গভীর তান্ডব। রৌদ্র অরিনের মসৃণ গালে ধীরে ধীরে আঙুল বুলাতে থাকে।তার আঙুল গুলো একপর্যায়ে এসে ঠেকলো অরিনের তিরতির করে কাঁপতে থাকা অধরযুগলের ওপর। রৌদ্র তখন নেশালো কন্ঠে বলে ওঠে,
“ কি আছে তোর মধ্যে সানশাইন? কেনো বারবার তোর দিকেই ছুটে আসে আমার অবাধ্য মনটা? কেনো তোর দিকে তাকালে আমি ভুলে যাই পুরো দুনিয়ার খবর! আমার মনটাকে এভাবে নিজের দাস বানিয়ে ফেললি সানশাইন? এতোটা সহজে কিভাবে পারলি আমার অভ্যাসে পরিণত হতে? কিভাবে পারলি — আমায় এতোটা ভয়ংকরভাবে তোর প্রতি আসক্ত করে ফেলতে?”
অরিন ধীরে ধীরে চোখদুটো খুলে তাকায় রৌদ্রের দিকে। ছেলেটার সমস্ত মুখমণ্ডল জুড়ে একরাশ মাদকতা লেপ্টে আছে। অরিন হালকা হেসে নিজের একহাত উঠিয়ে রাখলো রৌদ্রের গালের ওপর। তারপর ধীমী স্বরে বললো,
“ এতোটা ভালোবাসতে গেলে কেনো আমায়? কে বলেছিলো আমার এই ছোট্ট মনের সম্পূর্ণটা জুড়ে নিজের আধিপত্য বিস্তার করতে?ভালোই যখন বেসেছো তাহলে বুঝো এবার!”
অরিনের কথায় চমৎকার হাসলো রৌদ্র। ছেলেটা অরিনকে টেনে বুকের সঙ্গে মিশিয়ে নিলো তৎক্ষনাৎ। অরিনও গভীরভাবে জড়িয়ে ধরলো তার ডাক্তার সাহেবকে।রৌদ্র তখন ফিসফিসিয়ে বলে,
“ ভালোবাসি সানশাইন!”
“ আমিও!”
রাত গভীর! দূর থেকে ভেসে আসছে নিশুতিরাতের ডাক! মধ্য রাত হলেও ঘুম নেই রৌদ্রের চোখে। সে অরিনকে নিজের বুকের ওপর নিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিচ্ছে সযত্নে।মেয়েটার চুলে বিলি কাটতে কাটতে একপর্যায়ে খেয়াল করলো — অরিনের নিশ্বাস কেমন ঘন হয়ে আসছে। রৌদ্রের বুঝতে আর বাকি রইলো না, মেয়েটা ঘুমিয়ে পড়েছে। রৌদ্র ধীরে ধীরে অরিনকে নিজের বুক হতে নামিয়ে বালিশে শুইয়ে দেয়। মেয়েটাকে ছেড়ে উঠতে নিলেই তার ট্রাউজারে খানিকটা টান পড়ে।রৌদ্র ভ্রু কুঁচকে তাকায় সেদিকে। দেখতে পায় — অরিনটা ঘুমের ঘোরেই তার ট্রাউজারের কিছু অংশ নিজের হাতের মুঠোয় পুরে রেখেছে। এহেন দৃশ্য দেখে আপনা-আপনি সকল বিরক্তি ছুটে গেলো রৌদ্রের।তৎক্ষনাৎ ভ্রূদ্বয় শিথিল হয়ে আসে তার। ছেলেটা মুচকি হেসে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ায় অরিনের ললাটে। তারপর মেয়েটার হাত থেকে নিজের ট্রাউজারের অংশ ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ায় রৌদ্র।
কিয়তক্ষন অনিমেষ চোখে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থেকে আবারও তার পায়ের কাছে এসে বসলো রৌদ্র। আলগোছে অরিনের মসৃণ পাদু’টো নিজের উরুর ওপর নিয়ে নেয় সে। তারপর দু’হাতে সামান্য অলিভ অয়েল মাখিয়ে, সযত্নে মেয়েটার পাদু’টো মালিশ করতে থাকে। এতে অবশ্য বেশ মেয়েটা বেশ খানিকটা আরাম পাবে।
রৌদ্র বেশ কিছুক্ষণ ধরে মালিশ করলো অরিনের পাদু’টো। তারপর হাতের কাজ শেষে আবারও উঠে যায় মেয়েটার মাথার কাছে।অরিনের মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিয়ে, কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে,
“ হেভ সুইট ড্রিমস জান!”
এহসান বাড়ির সকালটা বরাবরের ন্যায় আজও বেশ রমরমা। গৃহিণীরা ব্যস্ত হাতে রান্নার তোড়জোড় সামলাচ্ছেন।রাফিয়া বেগম রান্নার কড়াইয়ে খুন্তি নাড়ানোর একপর্যায়ে, খানিকটা ঝোল উঠিয়ে হাতের তালুতে নিয়ে চেখে দেখছেন — নুন,মশলা সব ঠিকঠাক আছে কি-না! জুবাইদা বেগম রুটি সেকছেন আর ক্ষনে ক্ষনে শাড়ির আঁচলে ঘর্মাক্ত মুখখানা কোনমতে মুছে যাচ্ছেন।তার পাশেই ফুলি একটার পর একটা রুটি বেলে দিচ্ছে তাকে। মাইমুনা বেগম ছেলেমেয়ে গুলোকে ডাকতে গিয়েছেন।সবারই তো স্কুল-কলেজ খুলেছে তাই-না? এখন কি আর ওতো বেলা করে শুয়ে থাকলে হবে?
জুবাইদা বেগম রুটি সেকার একপর্যায়ে রাফিয়া বেগমের দিকে খানিকটা ঝুঁকে এলেন। চুলার ওপর বসানো তরকারির কড়াইয়ের ওপর থেকে ঘ্রাণ নিয়ে বলে ওঠেন,
“ বাহ! বেশ ঘ্রাণ বেরোচ্ছে তো! রোদের আব্বু তো আজ চেটেপুটে খাবে দেখিস!”
রাফিয়া বেগম আলতো হাসলেন। জুবাইদা বেগমের হাত থেকে বেলুনটা নিজ হাতে নিয়ে, নিজেই রুটি বেলতে শুরু করে দিলেন।জুবাইদা বেগমকে একপ্রকার তাড়া দিয়ে বললেন,
“ জবা! রান্না তো প্রায় হয়ে এলো বলে, তুই গিয়ে সবাইকে টেবিলে বসতে বল! আমি বাকিটা সামলে নিচ্ছি।”
জুবাইদা বেগম খানিকটা ইতস্তত করলেন। সন্দিহান গলায় প্রশ্ন ছুড়লেন,
“ তুই একা একা পারবি বাকিটা সামলাতে?”
রাফিয়া বেগম জা’য়ের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন।বেলুনটা কাঁধের সামনে উঠিয়ে বেশ একটা ভাব নিয়ে বললেন,
“ পারবো মানে? বেশ পারবো!”
পুরো টেবিল জুড়ে বসে আছেন এহসান বাড়ির সকাল সদস্য। অনিক একেবারে রেডি হয়ে নিচে নেমেছে। খেয়েদেয়েই বেরিয়ে পড়বে ছেলেটা।বেশ তো ছুটি কাটালো,আর কতো! তায়েফ সাহেব বসেছেন তার পাশে। অনিকের সঙ্গে কি একটা কেস নিয়ে শলাপরামর্শ করে যাচ্ছেন তিনি। অন্যপাশের চেয়ারগুলোতে বসেছেন সাব্বির সাহেব, তার পাশে তাশরিক সাহেব। তারা দুজনে কবির সাহেবের সঙ্গে অফিসের একটা বিষয় নিয়ে আলাপচারিতা চালাচ্ছেন।
রান্নাঘর থেকে চায়ের কেটলি’টা হাতে নিয়ে এগিয়ে আসেন জুবাইদা বেগম। সবাইকে খাওয়া রেখে নিজেদের মধ্যে কথোপকথন চালাতে দেখে খানিকটা চটলেন তিনি।চটে আসা গলায় বলতে লাগলেন,
“ কি ব্যাপার? খাওয়া রেখে যদি কথাই বলতে হয়, তাহলে টেবিলে বসে কথা বলছো কেন তোমরা? যাও না…ড্রয়িং রুমে বসে আরামসে গপ্প করো।শুধু শুধু খানা-পিনা সামনে নিয়ে খাবারগুলো ঠান্ডা করছো!”
জুবাইদা বেগমের এহেন কথায় খানিকটা বিষম খেলেন কবির সাহেব। যতই তিনি ঘরের কর্তা হোক না কেন, ঘরের আসল কর্তী তো বউই হয় তাই-না? কবির সাহেব নিজেকে সামলালেন।ভাইদের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“ আগে খেয়ে নে,তারপর এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো।”
সাব্বির সাহেবসহ তার বাকি দুই ভাই মুখ টিপে হাসলেন। তারপর আবারও মনোযোগ টানলেন যার যার খাবারের দিকে।তখনি ডাইনিং রুমে উপস্থিত হয় অরিন। এলোমেলো চুলে, ঘুমে নিভু নিভু চোখদুটো নিয়ে কোনমতে ঘুম ছেড়ে উঠেছে মেয়েটা। মুখের ওপর পানির ঝাপটা গুলো এখনো দৃশ্যমান পুরো মুখজুড়ে।হয়তো কোনরকমে মুখটা ধুয়েই চলে এসেছে এখানে। অরিন মৃদু হামি টেনে ভাইয়ের পাশের চেয়ারটা টেনে বসে পড়ে। রাফিয়া বেগম মেয়ের এমন অবস্থা দেখে খানিকটা ফুঁসে ওঠেন।বলেন,
“ এই অবস্থা কেনো তোর? ঠিকঠাক মতো ফ্রেশ নাহয়েই চলে এসেছিস না-কি? তাছাড়া এতো সকাল সকাল উঠতে যখন এতোই সমস্যা তাহলে উঠতে গেলি কেনো? তোর ভার্সিটির ক্লাস তো ১১ টায়।”
মায়ের এমন ঝাঁঝালো কণ্ঠ কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই সকল ঘুম যেন ছুটে পালালো অরিনের।সে মাথাটা নিচু করে কোনমতে মিনমিনে স্বরে বললো,
“ আসলে… সবার সাথে নাস্তা করবো বলে উঠেছিলাম।”
সবার সাথে নাস্তা করবে না ছাই! এ মেয়ে তো উঠেছে তার ডাক্তার সাহেবকে একপলক দেখার জন্য। ছেলেটাকে সকাল সকাল না দেখলে পুরো দিনটা কি আর ভালো কাটবে তার? — মনে মনে কথাগুলো ভেবে আলগোছে মুচকি হাসলো অরিন।এদিকে অরিনের বলা কথায় সাব্বির সাহেবতো বেজায় খুশি। তিনি মুচকি হেসে সস্নেহে মেয়ের পাতে দুটো রুটি তুলে দিলেন।পাশ থেকে অনিক বোনের পাতে তুলে দিলো কিছুটা তরকারি।অরিন খাবারের প্লেটে হাত দিয়ে নেড়ে যাচ্ছে শুধু।খাওয়ার কোনো উদ্বেগ নেই তার মধ্যে!এমন সময় সেথায় আগমন ঘটে রৌদ্রের।ছেলেটাও ফুল গেটআপে নেমেছে। পড়নের সাদা শার্টটা কনুই অবধি গুটিয়ে রাখা। তার সঙ্গে কালো ফর্মাল প্যান্ট। চোখে আটাঁ সেই পরিচিত খয়েরী রঙের চিকন ফ্রেমের চশমাটি। যার দ্বারা লুকায়িত আছে শ্যামবরণ সুদর্শন যুবকের বিড়াল চোখদুটো। অরিন খাওয়া ছেড়ে একপলক আড়চোখে তাকায় রৌদ্রের দিকে।তখনি রৌদ্রও তাকায় তার দিকে।দু’জনার চোখাচোখি হতেই ছেলেটা একবার আড়চোখে আশেপাশে পরোখ করে, তারপর হুট করেই অরিনকে চোখ মেরে বসে। অরিন থ হয়ে গেলো এহেন কান্ডে।তার চোয়াল ঝুলে পড়লো খানিকটা। রৌদ্র দেখলো সবটা। কপালে এক আঙুল স্লাইড করতে করতে মুচকি হেসে চেয়ার টেনে বসে পড়লো নিজ আসনে।
আধঘন্টা পর খাবার খাওয়া শেষ হলো রৌদ্রের।সে চেয়ার ছেড়ে উঠতে যাবে তার আগেই কবির সাহেব তাকে হাতের ইশারায় থামিয়ে, বসতে বললেন। রৌদ্রও চুপচাপ বসে রইলো। কিয়তক্ষন বাদেই কবির সাহেব গম্ভীর মুখে মৃদু গলা খাঁকারি দিয়ে বলতে লাগলেন,
“ তুমি রাশেদ মৃধাকে চিনো?”
রৌদ্র ভ্রু কুঁচকে মনে করার চেষ্টা করে। কিছুক্ষণ পরেই নামটা মনে পড়ায় সে মাথা নাড়িয়ে বলে ওঠে,
“ ইন্জিনিয়ার রাশেদ মৃধার কথা বলছো?”
“ হ্যা!”
“ ওহ,তাহলে তো চিনি! কিন্তু তুমি হঠাৎ করে তার কথা কেনো বলছো?”
কবির সাহেব এবার বুঝি খানিকটা নড়েচড়ে বসলেন। গম্ভীর মুখে একবার সাব্বির সাহেবের মুখের দিকে তাকালেন। সাব্বির সাহেব ইতোমধ্যেই তাকে ইশারায় কি যেন একটা বলতে বলছেন। কবির সাহেব ভাইয়ের ওপর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে এনে ছেলের দিকে তাকালেন। রৌদ্র এখনও কেমন গভীর কৌতূহলে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। কবির সাহেব বললেন,
“ রাশেদ মৃধার বড় মেয়ে রিয়া, এবার ঢামেকে ইন্টার্নি করছে।দেখতে শুনতেও বেশ ভালো।তাছাড়া তাদের পরিবারের সঙ্গে আমাদের চেনাপরিচয়ও বহু আগে থেকেই। এখন…!”
বাবার কথার মাঝেই রৌদ্র বাঁধ সাধে। ভ্রু কুঁচকে বিরক্তি নিয়ে বলে ওঠে,
“ ওয়েট আ মিনিট! সেই মেয়ের বায়োডাটা আমায় বলছো কেন? তুমি ঠিক কি বলতে চাইছো সেটাই বলো।”
কবির সাহেব এবার সকল ভনিতা ছাড়লেন। ছেলের দিকে গভীর চাহনি দিয়ে বলতে লাগলেন,
“ আমি চাচ্ছি রিয়ার সাথে তোমার বিয়ের কথা আগাতে। যেহেতু মেয়েও ডাক্তার, তুমিও ডাক্তার সেই থেকে ভাবছি…”
কবির সাহেবের কথা শেষ হবার আগেই বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় রৌদ্র। ছেলেটার চোখেমুখ হুট করেই কেমন যেন শক্ত হয়ে উঠেছে। নাকের পাটা ফুলে ফেঁপে উঠেছে খানিকটা। এতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে — রৌদ্র বুঝি বেশ রেগে গেছে। বাড়ির সকলেই কবির সাহেবের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। সবাই মনে মনে খুশি হলেও দুজন মানুষের মনে এবং চোখেমুখে নেমেছে রাজ্যের আধার! অরিনটা তো পারছেনা একদৌড়ে ছুটে চলে যেতে এখান থেকে। নিজের স্বামীর অন্যকোথাও বিয়ে ঠিক হবে, — মানুষ ঠিক কতটা হতভাগ্য হলে বউ হবার পরও নিজ কানে এমন কথা শুনতে হয়! ওদিকে অনিকটাও বুঝি ব্যাপক আকারে হতভম্ব হলো এমন কথায়। সে তো বারেবারে বোনের নতমুখটার পানে তাকাচ্ছে। আর ভাবছে — এসব শুনতে না জানি কতটা কষ্ট হচ্ছে তার বনুর!
রৌদ্রের এমন কথার মাঝে হুট করে উঠে যাওয়ায় ভ্রু কুঁচকালেন কবির সাহেব। গম্ভীর মুখে শক্ত কন্ঠে ফের বললেন,
“ এগুলো কেমন ধরনের বেয়াদবি? কথা বলার মাঝে হুট করে দাঁড়িয়ে পড়লে কেনো?”
রৌদ্র এবার শক্ত চোয়ালখানা আরেকটু ফুটিয়ে তোলে।হাতের ভাজে ধরে রাখা এপ্রনটা মুষ্টিবদ্ধ করে, শক্ত গলায় জবাব দেয়,
“ দুঃখীত আব্বু! আমি অন্য কাওকে বিয়ে করবোনা!”
রৌদ্রের এমন বাক্যে সবাই যেন আকাশ থেকে পড়লেন।ওদিকে অনিকের বুকটা কেমন ধুকপুক করে যাচ্ছে একাধারে।ক্ষনে ক্ষনে মনে হচ্ছে এই বুঝি একটা তান্ডব লাগলো এহসান পরিবারে!কবির সাহেব গম্ভীর মুখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।ছেলের মুখের দিকে সরু চোখে তাকিয়ে বলে ওঠেন,
“ অন্য কাওকে বলতে? তুমি কি কাওকে পছন্দ করো রোদ?”
রৌদ্র খানিকটা ফাঁকা ঢোক গিললো। জোরালো কন্ঠে জবাব দিলো,
“ শুধু পছন্দ করিনা..ভালোবাসি তাকে।”
বাড়ির সবাই চমকে তাকালো রৌদ্রের দিকে। জুবাইদা বেগম তো খাওয়া ছেড়ে পলকহীন চোখে তাকিয়ে আছেন ছেলের পানে।অরিন সেই আগের মতো মাথা নিচু করে বসে আছে। মেয়েটার গলা ইতোমধ্যেই ভয়ে শুকিয়ে কাঠ! অথচ এতসব প্রতিক্রিয়ার মাঝে কবির সাহেব রইলেন একেবারে নির্বিকার।তিনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিয়তক্ষন। পরক্ষণেই গম্ভীর কন্ঠে বললেন,
“ কে সে?”
রৌদ্র এবার বাবার দিকে ফিরে। বাবার চোখের দিকে গভীর চাহনি দিয়ে বলে ওঠে,
“ আছে কোনো বিশেষ একজন আব্বু! এখনো তাকে পরিচয় করিয়ে দেবার সময় আসেনি।সঠিক সময় আসলে আমি নিজেই তাকে তোমাদের সামনে এনে হাজির করবো।”
এই বলে আর একমুহূর্ত দাঁড়ালো না রৌদ্র। গটগট পায়ে বেরিয়ে গেলো বাড়ির সদর দরজা দিয়ে।কবির সাহেব একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখলেন ছেলের চলে যাওয়া।পরক্ষণেই এক দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে হাতদুটো পেছনের দিকে মুষ্টিবদ্ধ করে নিলেন।কপালে তার ইতোমধ্যেই দু-তিনেক ভাজ স্পষ্ট দেখা দিয়েছে।
আহিরাদের ক্যাম্পাসে আজ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি চলছে। আহি,মাহি সেই কখন থেকে খোলা মাঠে উবু হয়ে বসে গাছ লাগিয়ে যাচ্ছে! গাছ লাগানোর একপর্যায়ে আহিরা বেশ খানিকটা বিরক্ত হলো। হাতের ছোট ছোট চারাগুলো মাটিতে রেখেই সটান হয়ে দাঁড়ালো। ইশশ্ এতক্ষণ উবু হয়ে বসে থাকায় কোমরটা যে কি পরিমাণে ধরেছে তার! মাহিরা হাতের কাজ ফেলে আহিরার দিকে তাকায়। কৌতুকভরা কন্ঠে বলে ওঠে,
“ কি? এইটুকুতেই শক্তি সব ফুস হয়ে উড়ে গেলো?”
আহিরা মুখ ভেংচায়।হাতের গ্লাভসগুলো খুলে মাহিরার পাশে রেখে বিরক্ত হয়ে বলে,
“ হু! শেষ.. তো? আমিতো নিজের ভাগের টুকু করেই দিয়েছি, এবার নাহয় তুই তোরটা কর!”
মাহিরা সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ায়। আহিরার পানে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে,খেঁক খেঁক করে বলতে থাকে,
“ এটা কেমন কথা আহি? আমরা দু’জনে প্রমিস করেছিলাম একসঙ্গে পুরোটা কাজ কমপ্লিট করবো।সেখানে তুই এখন কি-না বলছিস — আর করতে পারবি না?”
“ হু পারবোনা। এন্ড এটাই আমার লাস্ট ওয়ার্ড ওকে?”
বলেই সে মাহিরাকে একা রেখে গটগট পায়ে মাঠ ছাড়িয়ে ক্যাম্পাসের করিডরে গিয়ে দাঁড়ায়। মাহিরার দিকে একপলক আড়চোখে তাকিয়ে মুচকি হাসলো আহিরা। মাহিরার আবার এই এক দোষ! কোনো কাজে হাত দিলে মেডিসিন নেওয়ার কথা প্রায়ই ভুলে যায় মেয়েটা! এই যেমন এখন ভুললো। বলাবাহুল্য, মাহিরার আবার লো-প্রেসারের সমস্যা আছে।তাই রোজ কায়দা করে নিয়মমাফিক ঔষধ খেতে হয় তার।ঔষধ খেতে একটু এদিক সেদিক হলেই মেয়েটা আবার অসুস্থ হয়ে পড়ে।আহিরা দ্রুত কদমে ক্লাসরুমে যায়।উদ্দেশ্য, ব্যাগ থেকে মাহিরার ঔষধগুলো নিয়ে এসে তাকে খাওয়ানো।
এদিকে, মাহিরা মুখ কুঁচকে একা একা বিরবির করতে করতে কাজ করে যাচ্ছে। মেয়েটা হয়তো আহিরাকে ইচ্ছেমত গালমন্দ করছে। ঠিক সেই সময় একজোড়া পুরুষালী হাত এসে তার লাগানো চারাটার একপাশে ধরলো।মাহিরা হকচকিয়ে ওঠে। তৎক্ষনাৎ চকিত দৃষ্টি ফেলে পাশে থাকা পুরুষটার দিকে। এই মুহুর্তে চোখের সামনে পরিচিত মুখটা দেখে মাহিরা বেশ অবাক হয়। অবাক কন্ঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে,
“ আপনি? হঠাৎ এখানে?”
ইফতি মৃদু হাসলো। হাতের কাজটা পুরোপুরি সেরে তারপরই মেয়েটার দিকে তাকালো।মাহিরার চোখেমুখে স্পষ্ট জিজ্ঞাসা। ইফতি খানিকটা সময় নিয়ে শুধালো,
“ আমার এক স্টুডেন্ট এর কিছু এসাইনমেন্টে সমস্যা ছিলো,তাই এখানে আসলাম আরকি! দূর থেকে মাঠের মধ্যে আপনাকে একা দেখতে পেয়ে ইচ্ছে হলো একটুখানি কথা বলে গেলে হয়তো খুব একটা খারাপ হয়না বিষয়টা!”
মাহিরা আলতো হাসলো।ছেলেটার প্রতিটা কথাই কেমন যেন চমৎকার লাগে তার। ইফতি একবার আড়চোখে তাকালো সেই হাসির পানে তারপর পরক্ষণেই নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে বললো,
“ তোমার বোন কোথায়?”
মাহিরা এপর্যায়ে হাতের কাজ শেষ করে উঠে দাঁড়ায়। গ্লাভসগুলো খুলে একহাতে নিয়ে ইফতির দিকে তাকায়। বলে,
“ ও হয়তো ক্লাসরুমে আছে।হঠাৎ ওর কথা জিজ্ঞেস করছেন কেনো বলুনতো? ”
ইফতি হাসলো ঠোঁট পিষে। প্রসঙ্গ অন্যদিকে ঘুরানোর ভঙ্গিতে বলে ওঠে,
“ নাহ! এমনিতেই জিজ্ঞেস করলাম আরকি!”
“ ওহ তাই বলুন!”
আহিরা ব্যস্ত পায়ে বেরিয়ে আসে ক্লাসরুম থেকে।একহাতে তার পানির বোতল, অন্যহাতে মাহিরার প্রয়োজনীয় ঔষধ! মেয়েটা তড়িঘরি করে হাটতেই একপর্যায়ে সামনের দিকে চোখ পড়লো তার।অদূরের মাঠে দেখা যাচ্ছে ইফতি আর মাহিরাকে। দু’জনে কি সুন্দর একে অপরের সাথে হেঁসে হেসে কথা বলছে।আহিরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সেদিকে। পরক্ষণেই একটা ছোট্ট নিশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলো তাদের দিকে।
“ এই নে ধর! ঔষধ গুলো খেয়ে আমায় উদ্ধার কর!”
হুট করে পেছন থেকে ধেয়ে আসা আহিরার কন্ঠে সেদিকে ফিরলো মাহিরা।ইফতিও ফিরলো সেদিকে। আশ্চর্য! মেয়েটাকে একটু দেখতে পেয়ে তার সকল ক্লান্তিগুলো কোথাও একটা হারিয়ে গেলো বুঝি! ইফতি সরু চোখে তাকিয়ে রইলো আহিরার স্নিগ্ধ মুখটার পানে।
এদিকে ইফতিকে নিজের দিকে ওমন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে চটে গেলো আহিরা।ঝাঁঝালো গলায় বলে ওঠে,
“ কি সমস্যা? এভাবে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছেন কেনো? আমার কি রুপ বেড়েছে না-কি?”
আহিরার এমন কর্কশ কথায় থতমত খেয়ে যায় ইফতি।প্রতিত্তোরে ঠিক কি বলা যায় হয়তো সেটাই ভাবছে ছেলেটা।এদিকে মাহিরাও খানিকটা লজ্জা পেলো আহিরার ব্যাবহারে।সে কপট রাগ দেখিয়ে বলে,
“ ছিঃ আহি! একটা মানুষের সাথে এভাবে কেও কথা বলে? ইজ ইট গুড ম্যানার্স?”
আহিরা এবার তিতিবিরক্ত হলো।সে মুখ কুঁচকে বলে বসে,
“ ইয়াহ আই নো দেট! বাট কেও আমার দিকে ওমন ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে থাকলে,আমি নিশ্চয়ই তার সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলবো না!”
ইফতি এবার নিজেই লজ্জা পেলো। মেয়েটা তো ঠিকই বলছে।সে কেনো ওমন হা করে তাকিয়ে ছিলো তার দিকে? ইফতি মৃদু গলা খাঁকারি দিয়ে ু।অপরাধী স্বরে বলে,
“ একচুয়েলি.. আ’ম সরি মিস!”
আহিরা সরু চোখে তাকায় ইফতির দিকে। ছেলেটার মুখের দিকে আঙুল উঁচিয়ে শাসানির সুরে বলতে থাকে,
“ কিপ ইউর সো কলড সরি ইন ইউর পকেট মিস্টার!”
কথাটা বলেই সে সঙ্গে সঙ্গে মুখ ঝামটি দিয়ে সেখান থেকে চলে গেলো। মাহিরা লজ্জিত ভাবে নতমুখে দাঁড়িয়ে রইলো ইফতির সামনে। মেয়েটা বোনের করা এমন সব ব্যাবহারে এতোটাই লজ্জিত হয়েছে যে — ঠিকঠাক মাথাটাও তুলতে পারছে না যেন!
আর এদিকে ইফতি কি করছে? ছেলেটা হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আহিরার যাওয়ার পথে। কিয়তক্ষন বাদে তার মুখ থেকে অস্ফুটে বেরিয়ে আসে,
“ এটা মেয়ে না-কি নাগা মরিচ?”
বিকেল সাড়ে তিনটে!
অরিনের ক্লাস শেষ হয়েছে এইতো মিনিট দশেক হবে হয়তো! ক্যাম্পাসের ভেতর হাঁটছে একা একাই হাঁটছে সে।মনটা সেই সকাল থেকেই বিষিয়ে আছে মেয়েটার। কিছুতেই মাথা থেকে সকালের ঘটনাগুলো সরছেই না! অরিন ক্ষুদ্র এক নিশ্বাস ফেলে একটা লোহার বেঞ্চিতে বসে।কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটা থেকে ফোন বের করে দেখে নেয় সময়টা! তার ক্লাস শেষ হবার কথা ছিলো চারটায়।কিন্তু সে-তো আর ক্লাস করেনি আজ! কিভাবেই বা করবে? ক্লাস করবার জন্য শরীর এবং মন দুটোই তো ভালো থাকা উচিত তাই-না? কিন্তু আজকে তো অরিনের শরীর কিংবা মন কোনোটাই ভালো নেই!
অরিন গা এলিয়ে দিলো বেঞ্চটায়।ঠিক সে সময় কোত্থেকে যেন দুজন ছেলে এসে তার পাশে গা ঘেঁষে বসে পড়ে। অরিন তৎক্ষনাৎ হকচকিয়ে ওঠে। দ্রুত উঠে দাঁড়ায় বসা ছেড়ে। ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বলে ওঠে,
“ আর ইউ গায়েস মেড? কোন সাহসে এমন অসভ্যতা করলেন আপনারা?”
ছেলেদুটো অরিনকে আপাদমস্তক দেখে নিয়ে বিকৃত হাসি টানলো ঠোঁটের কোণে। একজন তো আগ বাড়িয়ে এসে অরিনের একহাত চেপে ধরে গায়ের সর্বশক্তিতে। অরিন তৎক্ষনাৎ নিজেকে ছাড়ানোর প্রয়াস চালায়।ছেলেটার হাত থেকে নিজের হাতটা ভিষণ মোচড়ামুচড়ি করেও ছাড়াতে পারছেনা সে। এবার অরিনের চোখের কোটর ছাড়িয়ে বেরিয়ে আসে দুফোঁটা নোনাধরা। ছেলেদুটো অরিনের কান্না মাখা মুখ দেখে হো হো করে হেসে ওঠে। একজন তো বলেই বসে,
“ ওরে বাবুলে! এতোবড় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী হয়েও কেঁদে দিলে? তা বাবু! ভার্সিটিতে পড়তে হলে সিনিয়র ভাইদের থেকে যে ট্যাগ নিতে হয়, তা জানোনা?”
অরিন ধীরে ধীরে ফাঁকা ঢোক গিললো। এবার তার বোধগম্য হলো সবটা! এই ছেলেদুটো তাহলে তার সিনিয়র! আর তারা আজকে সুযোগ পেয়ে অরিনকে র্্যাগ দিচ্ছে! অরিন মাথা নিচু করে নিজের হাতটা মোচড়াতে থাকে। ছেলেটা অরিনের দিকে তাকিয়ে লোভাতুর কন্ঠে বলে ওঠে,
“ ময়না! আজকে নাহয় ছেড়ে দিচ্ছি! কিন্তু কাল থেকে প্রিপারেশন নিয়ে এসো কেমন? কেননা নতুন পাখি খাচাঁয় এলে আমরা বড়রাই তো সেগুলোকে আদর সোহাগ দিয়ে পুষে রাখবো! আশা করি বুঝছো সবটা?”
অরিনের চোখ বেয়ে ঘৃণায় দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো।ছেলেটা তার হাতটা ছেড়ে দিতেই সে সঙ্গে সঙ্গে ছুটে পালালো সেখান থেকে। কাঁধের ব্যাগটা একহাতে নিয়ে, অন্যহাতে নিজের চোখদুটো মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসে ভার্সিটি থেকে। রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে হাত বাড়িয়ে একটা খালি রিকশা থামিয়ে সেখানে উঠে পড়ে।
“ কই তুমি? আমি কিন্তু হসপিটালের বাইরে এসে দাঁড়িয়ে আছি! তুমি বের হবে কখন?”
ফোনের ওপাশে অনিকের কথায় রৌদ্র হাতের ফাইলগুলো গোছাতে গোছাতে বললো,
“ ওয়েট আ সেকেন্ড! আমি আসছি!”
অনিক শুনলো এবারও।এসেছে পর থেকেই এই এক সেকেন্ড শুনতে শুনতে পাঁচ মিনিট পেরুলো কিন্তু রৌদ্রের তো আর আসার নামগন্ধও নেই।অনিক হাতের আঙুলে গাড়ির চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে রাস্তার দিকে দৃষ্টি ফেললো।ওমনি তার দৃষ্টি আঁটকে গেলো অরিনের ওপর! মেয়েটা একটা রিকশায় চড়ে এদিকেই আসছে। অনিক তৎক্ষনাৎ সোজা হয়ে দাঁড়ালো। দ্রুত কদমে এগিয়ে আসলো রাস্তার দিকে। অরিন দূর থেকে ভাইকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। রিকশাটা থামতেই সে একপ্রকার তাড়াহুড়ো করে নেমে পড়লো। অনিক এসে আগে ভাড়াটা মিটিয়ে দিলো। তারপর অরিনের দিকে তাকাতেই খানিকটা বিচলিত হয়ে পড়লো ছেলেটা! মেয়েটার মুখটা কেমন লাল হয়ে গেছে! চোখের কোণে এখনও মৃদু জল জমে আছে।
অনিক দ্রুত বোনকে নিয়ে আসে নিজের গাড়ির কাছে। বোনের ছোট্ট আদুরে মুখটা নিজের দু’হাতের তালুতে নিয়ে চিন্তিত গলায় বলে ওঠে,
“ কি হয়েছে বনু? তুই কাঁদছিস কেন? কে কি বলেছে তোকে?”
অরিন তৎক্ষনাৎ ফুপিয়ে ওঠে।মুখ খুলে যেই না কিছু বলতে যাবে ওমনি পেছন থেকে ভেসে আসে রৌদ্রের গুরুগম্ভীর কন্ঠ!
“ তুই এখানে?”
অনিক আর অরিন দুজনেই তাকালো পেছনে।রৌদ্র অরিনের নতমুখটার দিকে সরু চোখে তাকিয়ে এগিয়ে আসে জোরালো কদমে।মেয়েটার চোয়াল আলতো হাতে চেপে ধরে খানিকটা উঁচিয়ে তুলে বলে,
“ কি হয়েছে তোর? কে কাঁদিয়েছে তোকে?”
অরিন নাক টানে কিছুটা। চোখদুটো তার এখনো নামিয়ে রাখা।রৌদ্র অস্থির হলো।সে আবারও মেয়েটাকে ঝাকিয়ে বললো,
“ কথা বলছিস না কেন জানবাচ্চা? কে কাঁদিয়েছে তোকে? আমায় শুধু একবার মুখ ফুটে বল সানশাইন! খোদার কসম,ওর কলিজা খুলে হাতে নিয়ে আসবো আমি!”
রৌদ্রের এহেন কথায় আঁতকে ওঠে অরিন এবং অনিক।অরিন শুষ্ক ঢোক গিলে আমতাআমতা করতে লাগলো,
“ না মানে…কিছুনা!”
রৌদ্র এবার বাঁকা চোখে তাকায় অরিনের দিকে। মেয়েটার পুরো মুখমণ্ডলে একবার চোখ বুলিয়ে বাজখাঁই কন্ঠে বলে ওঠে,
“ আমার সঙ্গে মিথ্যা বলবি না সানশাইন! আই জাস্ট হেট দিস বুলশিটস!”
অরিন মৃদু কেঁপে ওঠে রৌদ্রের বাজখাঁই কন্ঠে। সে কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলে,
“ কলেজে র্্যাগ দিয়েছে… ”
ব্যস এটুকুই বুঝি যথেষ্ট ছিলো রৌদ্রের শরীরে আগুন ধরিয়ে দেবার জন্য। ছেলেটা অরিনের মুখটা ছেড়ে দিয়ে দাঁত কটমট করতে লাগলো। নিজের ঘাড়ে হাত ম্যাসাজ করে শক্ত গলায় বলতে লাগলো,
“ কোন মা’ইকা লালের এতো বড় কলিজা আমার বউরে র্্যাগ দেয়? চল আমার সাথে!”
এই বলে সে মেয়েটার হাতের কব্জি ধরতেই মৃদু ব্যাথায় ককিয়ে উঠে অরিন।রৌদ্র তৎক্ষনাৎ মেয়েটার হাতটা সামনে নিয়ে আসে নিজের। অরিনের হাতের কব্জি থেকে বোরখা উঠাতেই দেখতে পায় — ফর্সা হাতটায় কেমন কালসিটে দাগ পড়ে গেছে। রৌদ্র শক্ত চোখে তাকায় অরিনের হাতের দিকে। দাঁত কিড়মিড় করে বলে ওঠে,
“ তোকে স্পর্শ করেছে ওরা?”
অরিন চুপ করে মাথা নিচু করে দাড়িয়ে রইলো। রৌদ্র এবার মেজাজ হারালো। সে ধমকে উঠলো,
সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি ২য় খন্ড পর্ব ৪৩
“ কথার উত্তর দে!”
অরিন তৎক্ষনাৎ উপর নিচ মাথা নাড়ায়। রৌদ্র সঙ্গে সঙ্গে নিজের চোখদুটো বন্ধ করে নেয়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“ অনিক! গাড়ি বের কর!”
অনিক খানিকটা দুশ্চিন্তায় পড়লো। সে আমতা আমতা করে বলতে লাগলো,
“ ভাইয়া তুমি নাহয়…”
“ তোরে গাড়ি বাইর করতে বলছিনা?”
