Home সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি ২য় খন্ড সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি ২য় খন্ড পর্ব ৪৯

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি ২য় খন্ড পর্ব ৪৯

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি ২য় খন্ড পর্ব ৪৯
Jannatul Firdaus Mithila

অরিন ছলছল চোখজোড়া নিয়ে তাকিয়ে রইলো রৌদ্রের দিকে।কি ব্যাপার? মেয়েটার চোখের মাঝে অশ্রুগুলো এমন আঁটকে আছে কেনো? তারাও কি আজ অরিনের মতো নিজেদের শক্ত করতে চাইছে? রৌদ্র কিয়তক্ষন গভীরভাবে তাকিয়ে রইলো অরিনের পানে।তারপর হুট করেই ছেলেটার যে কি হলো কে জানে! সে মেয়েটার চোখে চোখ রেখেই বাহুদ্বয় থেকে হাত সরিয়ে ফেলে নিঃশব্দে। পরক্ষণেই অনিকের দিকে তাকিয়ে ভরাট কন্ঠে বলে,

“ ওকে নিয়ে নিচে নাম!”
অনিক নিঃশব্দে মাথা ঝাকায়। শক্ত মুখে এগিয়ে যায় অরিনের কাছে। রৌদ্র ততক্ষণে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেছে। অনিক অরিনের কাছ থেকে খানিকটা দূরে দাড়িয়ে শক্ত গলায় একপ্রকার হুকুম ছুড়ে বললো,
“ শুনিসনি ভাইয়া কি বলছে? এখনও এভাবে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তারাতাড়ি নিচে চল! আর খবরদার, এবার কিন্তু আগের মতো কোনো নাটক করবিনা বলে দিলাম!”
অরিন মাথা নুইয়ে রেখে নাক টানে সামান্য। হাতের উল্টো পিঠে চোখদুটো কোনমতে মুছে নিয়ে সামনের দিকে হাঁটা ধরলো। অনিকও আসে বোনের পিছুপিছু। করিডর ছাড়িয়ে সিঁড়ির দিকে যেতেই থেমে গেলো অরিন। অনিক পেছনে দাঁড়িয়ে ভ্রু কুঁচকায়।খেকিঁয়ে বলে ওঠে,

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

“ আবার দাঁড়িয়ে পড়লি কেনো?”
অরিন সিঁড়ির হাতলে হাত চেপে মিইয়ে আসা স্বরে বললো,
“ ভাইয়া আমি প্লিজ এখানেই দাঁড়াই?”
অগত্যা এমন কথায় মুখ শক্ত করে বোনের দিকে তাকিয়ে রইলো অনিক।ছেলেটার কেনো যেন ইচ্ছে করছে মেয়েটার দুগালে চটাশ চটাশ করে দুটো লাগিয়ে দিতে।সে-তো রৌদ্র বলে ধৈর্য্য ধরেছে, রৌদ্রের জায়গায় যদি সে হতো,তাহলে তো এতক্ষণে থাপড়িয়ে গাল লাল করে দিতো মেয়ের! অনিক ফোঁস করে নিশ্বাস ফেলে অরিনের পাশ কাটিয়ে নিচে নেমে আসে। তারপর গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে তার মায়ের পাশে।রাফিয়া বেগম শক্ত চোখে তাকিয়ে আছেন সিঁড়ির কোণে কোনঠাসা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তার মেয়ের দিকে।মানুষটা কেন যেন দাঁত কিড়মিড় করছেন সেই কখন থেকে। হয়তো কিছু বলতে চাচ্ছেন তিনি! কিন্তু সময় সুযোগ না মেলায় তা আর বলতে পারছেন কই?
রৌদ্র গম্ভীর মুখে তার বাবার মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়।কবির সাহেব তৎক্ষনাৎ রাগে-অভিমানে নিজের মুখটা ঘুরিয়ে ফেলে অন্যদিকে।রৌদ্র নিজের মুখভঙ্গি আগের মতো রেখে বেশ জোরালো কন্ঠে বলে ওঠে,

“ আমি অরিনকে বিয়ে করবো!আর সেটাও খুব শীঘ্রই!”
এহেন কথায় ড্রয়িং রুমে উপস্থিত সকলে হতভম্ব হয়ে গেলো যেন।কবির সাহেব তো সঙ্গে সঙ্গেই ছেলের দিকে বিস্ফোরিত নেত্রে তাকালেন। ওদিকে, অদূরের সোফায় গা এলিয়ে বসে থাকা সাব্বির সাহেব এবার ধীরে ধীরে বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান।মধ্য বয়স্ক শরীরটা বোধহয় দূর্বল হয়ে পড়েছে খানিকটা! তিনি উঠে দাঁড়াতেই কেমন টলতে শুরু করলেন। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা তায়েফ সাহেব তৎক্ষনাৎ ভাইয়ের একহাত চেপে ধরে ঢাল হিসেবে দাঁড়ালেন। সাব্বির সাহেব অসহায় চোখে একবার তাকালেন ছোটো ভাইয়ের দিকে। তায়েফ সাহেব ইশারায় তাকে আশ্বস্ত করে।পরক্ষণেই সাব্বির সাহেবের একহাত ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসেন।কিছুক্ষন আগের ঘটে যাওয়া ঘটনায় সাব্বির সাহেব বুঝি বেশ দূর্বল হয়ে পড়েছেন!

কবির সাহেব এবার বেশ ধমকের গলায় খেঁকিয়ে ওঠেন ছেলের সঙ্গে,
“ পাগল হয়ে গেছো তুমি? নিজের থেকে ১১ বছরের ছোটো মেয়েকে ভালোবাসো বলছো! তারওপর এখন বলছো বিয়ে করবে! তোমার কি সত্যি মাথা খারাপ হয়ে গেছে রোদ?”
রৌদ্র গর্জন তুলে এবার।চোখেমুখে একপ্রকার আগুন নিয়ে বলে,
“ হ্যা,হ্যা পাগল হয়ে গেছি! ঐ ছোট্ট মেয়েটার জন্য উম্মাদ হয়েছি আমি। এককথায় ভয়ংকর উম্মাদ! ওকে না পেলে এই এহসান বাড়ির প্রতিটি কোণায় আগুন জ্বলবে মনে রেখো!”

কবির সাহেব নিজের বোধ হারালেন এবার।শক্ত মুখে ছেলের দিকে তাকিয়ে চোখ থেকে চশমাটা খুলে হাতে নিলেন। রাগে সম্পূর্ণ শরীরটা থরথর করে কাপছে তার।তিনি একপ্রকার তেড়ে এসে বললেন,
“ সেটা তখনি হবে যখন তুমি এখানে থাকবে! আর তাছাড়া যেখানে অরিন নিজেই বলেছে ও তোমায় ভালোবাসে না,সেখানে তোমার এতো হম্বিতম্বি কোত্থেকে আসে?”
রৌদ্র এবার তাচ্ছিল্যের হাসি টানে ঠোঁটের কোণে।চোখের কার্নিশে বোধহয় অশ্রু জমেছে খানিকটা! রৌদ্র সেদিকে পাত্তা দিলো না একেবারেই। শ্যামবরণ সুশ্রী মুখখানা ইতোমধ্যেই রাগে রক্তবর্ণ ধারণ করেছে তার। ঘাড়ের রগগুলো ফুটে উঠেছে স্পষ্ট! রৌদ্র কোমরের ওপর দু’হাত রেখে দুচোখ বন্ধ করলো। ফোঁস করে এক ক্ষুদ্র নিশ্বাস ফেলে ধরে আসা কন্ঠে বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে বললো —

“ অরিকে আমায় চেনাতে এসো না আব্বু! যেখানে ওর প্রতিটা নিশ্বাসের উঠানামার খবর আমার জানা, সেখানে ওর এমন কথা বলার পেছনে ঠিক কারা কারা আছে তা আর বুঝতে বাকি নেই আমার!”
এহেন কথায় কবির সাহেব হয়তো খানিকটা নড়েচড়ে দাঁড়ালেন। থতমত চেহারা নিয়ে কোনমতে বললেন,
“ মানে? কি বোঝাতে চাচ্ছো তুমি?”
রৌদ্র ধীরে ধীরে চোখ মেলে বাবার দিকে চাইলো।দু-কদম এগিয়ে এসে কাঁপা কাঁপা হাতে বাবার একহাত চেপে ধরে আলতো করে। তারপর মাথা নিচু করে অসহায় সুরে বলে,
“ ওকে আমি ভালোবাসি আব্বু! ভিষণ ভালোবাসি।বিশ্বাস করো,ওকে ছাড়া আমার নিশ্বাস নিতেও কষ্ট হয়ে যায়! আমি জানি,ও হয়তো তোমাদের কথানুযায়ী ওমন কথা বলেছে।আমি…আমি আমার সানশাইনের চোখের ভাষা বুঝি আব্বু!”

কবির সাহেব তৎক্ষনাৎ নিজের হাতদুটো ঝটকা মেরে ছেলের হাতের মাঝ থেকে ছাড়িয়ে নিলেন।রাগান্বিত মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলেন তিনি।রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন মানুষটা।অদূরেই দাঁড়িয়ে অসহায় চোখে এদিকেই তাকিয়ে আছেন সাব্বির সাহেব। মানুষটার বুঝি বুকটাও কেমন ভার হয়ে আসছে ক্রমাগত। তিনি মুখ হা করে নিশ্বাস ফেলতে লাগলেন।পাশ থেকে তায়েফ সাহেব আলতো করে ভাইকে বাহুডোরে আগলে নিলো।
ওদিকে জুবাইদা বেগম আঁচলে মুখ গুঁজে কেঁদে বুক ভাসিয়ে যাচ্ছেন একাধারে। ছেলের চোখে কান্না যে এই প্রথম দেখলেন তিনি! কোনো মা’ই কি পারে সন্তানের ওমন দুঃখ সহ্য করতে?
রৌদ্র হঠাৎই মাথা তুলে বাবার দিকে তাকালো।জোরালো গলায় বললো,

“ আমি ছাড়া অরিন কারো হবে না আব্বু! ওর শুরুটা যেমন আমার সাথে হয়েছে, তেমনি ওর শেষটাও আমার সাথেই হবে। তবুও যদি আমার কথা অমান্য করে তোমরা ওকে কোনোভাবে আমার কাছ থেকে দূরে সরাবার চেষ্টা করো,তাহলে শুনে রাখো — এই এহসান পরিবারে একসঙ্গে দুটো লাশ উঠবে।একটা হবে আমার, আরেকটা হবে ওর!আমি তো মরবোই সাথে ওকে নিয়ে মরবো!”

কথাটা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই রৌদ্রের গালে সশব্দে চড় বসান কবির সাহেব। হঠাৎ করেই পুরো বাড়ি যেন এহেন কান্ডে থমকে গেলো। জুবাইদা বেগম কান্না ফেলে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইলেন কবির সাহেবের দিকে।অন্যদিকে, রৌদ্রের শেষ কথাগুলো কর্নকুহরে পৌছানো মাত্র সাব্বির সাহেব আচমকাই শরীরের ভর ছেড়ে দিয়ে ধপ করে মাটিতে বসে পড়লেন। তায়েফ সাহেব তৎক্ষনাৎ হকচকিয়ে ওঠেন।অনিকও একপ্রকার তড়িঘড়ি করে দৌড়ে এলো বাবার কাছে। বাবার বুকে-পিঠে হাত মালিশ করতে করতে বলে ওঠে,

“ আব্বু? তোমার কি খুব কষ্ট হচ্ছে? আব্বু?”
সাব্বির সাহেব আচমকাই কেমন থরথর করে কাঁপতে লাগলেন। অনিক ভড়কে গেলো বাবার এহেন অবস্থা দেখে। সে তৎক্ষনাৎ বাবাকে পাশ দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলতে থাকে,
“ আব্বু কি হচ্ছে তোমার? কোথায় কষ্ট হচ্ছে বলো আমায়?”
সাব্বির সাহেব ছেলের এরূপ প্রশ্নোত্তরে কিছু না বলে কাঁপা কাঁপা গলায় কোনমতে বললেন,
“ আমার মেয়েটা বাঁচবে তো অনি?”
থমকায় অনিক! বাবার কথাটা শোনামাত্রই তার সম্পূর্ণ শরীর জুড়ে বয়ে গেলো এক মৃদু কম্পন।তার বুকটা হঠাৎ করেই কাঁপতে শুরু করলো যেন! ছেলেটা আবারও চিন্তিত হয়ে পড়লো তার ভাই এবং বোনের অনিশ্চিত ভবিষ্যত নিয়ে।

এদিকে — অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা রাফিয়া বেগম শক্ত চোখেমুখে সাব্বির সাহেবের দিকে তাকিয়ে আছেন।আশ্চর্য! যেখানে স্বামীর এহেন অবস্থা দেখে তার রীতিমতো অস্থির হয়ে ওঠার কথা,সেখানে তিনি একেবারেই ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন? ব্যাপারটা কেমন অদ্ভুত ঠেকলো মাইমুনা এবং রাইসা বেগমের কাছে। তবুও তারা আপাতত এ নিয়ে কিছু বললেন না!
তাশরিক সাহেব এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন সাব্বির সাহেবের কাছে। হঠাৎ রৌদ্রের গালে চড় পড়ায় ছুটে আসলেন তিনি।তখনি কবির সাহেব রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে কেমন হুংকার দিয়ে বলে ওঠেন,
“ বেশি বড় হয়ে গেছিস তুই? এই দিনের জন্যই কি বড় করেছিলাম তোকে? বাবার সামনে দাঁড়িয়ে বুক টানটান করে এ কথা বলছিস! এতো সাহস কোত্থেকে আসে তোর?”

রৌদ্র গাল বাকিয়ে এখনো আগের ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। বাবার কথা শেষ হতেই ছেলেটা ভেঙে পড়লো একপ্রকার। হু হ করে কেঁদে উঠে দাঁড়ানো অবস্থাতেই। তায়েফ সাহেবের বুকটা কেমন হু হু করে উঠলো ছেলেটার এহেন কান্না দেখে। তিনি এগিয়ে আসেন কিছুটা।রৌদ্রকে ধরতে যাবেন তার আগেই রৌদ্র ফ্লোরে দু-হাঁটু গেড়ে ধপ করে আধ-বসা হয়ে বসলো।হাতদুটো দিয়ে বাবার পা আঁকড়ে অসহায়ের মতো বলতে লাগলো,

“ একটা না,হাজারটা মারো আব্বু! তবুও আমি বলবো,তুমি প্লিজ অরিকে আমায় ভিক্ষা দাও! আমি…আমি হয়তো তোমাদের মতো ওকে রাজকন্যা বানিয়ে রাখতে পারবোনা, কিন্তু বিশ্বাস করো আব্বু! আমি ওকে আমার রানী করে রাখবো। আব্বু… আমার খুব কষ্ট হচ্ছে আব্বু! বুকটায় কেমন অসহ্য রকমের ব্যাথা হচ্ছে। আমি…আমি সত্যি ওকে ছাড়া বাঁচবো না আব্বু! তুমি আমার ওপর এটুকু দয়া করো! আমিতো তোমার কাছে কোনোদিন কিছু চাইনি আব্বু! এই প্রথম আমি আমার প্রাণ সঞ্জিবনী চাচ্ছি তোমার কাছে! দয়া করো আব্বু, একটু দয়া করো আমার ওপর!”
কথাগুলো বলতে গিয়ে বেশ কয়েকবার থেমেছে রৌদ্র। হয়তো কথাগুলো বলতে গিয়ে বারবার গলাতেই আঁটকে আসছিলো তার! ছেলেটার এমন আহাজারি দেখে দৌড়ে আসেন জুবাইদা বেগম। ছেলের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে ছেলের মাথাটা বুকে চেপে ধরলেন তিনি। রৌদ্রও মা’কে পেয়ে জড়িয়ে ধরলো শক্ত করে। তারপর বাচ্চাদের মতো বায়নার সুরে বলতে থাকে,

“ ও মা! মা’গো! দয়া করে আব্বুকে একটু বোঝাও না মা। আমি যে পারবোনা আমার জানবাচ্চাকে ছাড়া বাঁচতে।ওকে…ওকে ভুলে যাবার মতো ক্ষমতা যে নেই আমার মধ্যে। আমি..আমি ওকে ভিষণ ভালোবাসি আম্মু।ওকে না পেলে আমি সত্যিই মরে যাবো!”
রৌদ্রের বলা প্রতিটি কথা উপস্থিত সকলের বুকটাই বুঝি খানখান করে দিচ্ছে। তাশরিক সাহেব এবার আর ধরে রাখতে পারলেন না নিজেকে। তিনি তৎক্ষনাৎ রৌদ্রের সামনে এসে একহাঁটুতে ভর দিয়ে বসলেন। ছেলেটার ক্রন্দনরত মুখটা নিজের দু’হাতের আঁজলায় তুলে বললেন,

“ চুপ! আর কাঁদবিনা তুই… তোর অরিনকে চাই তাই-না? অরিকে বিয়ে করবি তাইতো? তাহলে ওঠ!চল আমার সাথে। আজকে,এক্ষুনি আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তোদের বিয়ে দিবো। তারপর দেখি কে কি করতে পারে…!”
তাশরিক সাহেবের এমন কথায় চোখ গরম করে তাকালেন কবির সাহেব। তিনি ধমক দিয়ে বলে ওঠেন,
“ কি যা-তা বলছিস তুই? তুইও ওর মতো পাগলামি শুরু করলি না-কি?”
এহেন কথার পিঠে তাশরিক সাহেব বসা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান।বড় ভাইয়ের দিকে শক্ত মুখে তাকাতেই পেছন থেকে তায়েফ সাহেব বলে ওঠেন,

“ আজ তুমি ধমকালেও কাজ হবে না ভাইজান! তাশরিক যদি এমনটা না বলতো তাহলে আমি নিজেই এমনটা বলতাম। কেননা নিজ চোখের সামনে এমন অন্যায় হতে দেওয়া তো যায় না!”
কথাটা বলেই তিনি এগিয়ে এসে তাশরিক সাহেবের পাশে দাঁড়ালেন। কবির সাহেব মুহুর্তেই নড়ে ওঠেন খানিকটা। তিনি এক-কদম পিছিয়ে গেলেন। ভাইদের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলতে লাগলেন,
“ আমার সঙ্গে এভাবে কথা বলছিস তোরা? আমি অন্যায় করছি? ”

“ হ্যা ভাইজান! তুমি সত্যি অন্যায় করছো আমাদের ছেলেমেয়ে দুটোর সাথে! তুমি কেনো বুঝতে পারছো না ভাইজান? ওদের তো এখানে কোনো দোষ নেই। তাছাড়া বড় আপার করা দোষের মাশুল ওরা কেনো পোহাতে যাবে? ওরা যদি সত্যি একে-অপরকে ভালোবেসে থাকে তাহলে আমাদের উচিত ওদের এক করে দেওয়া। কেননা ভালোবাসা তো কোনো পাপ না! বড় আপা যেটা করেছে তার জন্য সে যথেষ্ট শাস্তি পেয়েছে এবং এখনো পাচ্ছে! হয়তো ভবিষ্যতেও পেয়ে যাবে! থাক সে বিষয়ে আর না বলি, তোমার দেওয়া জবানকে আমরা শ্রদ্ধা করি,তাই বলে এটা ভেবোনা আমরা আমাদের সন্তানদের কম ভালোবাসি! ওদের সুখের জন্য হলেও এমন হাজারটা নিষেধাজ্ঞা ভেঙে ফেলতেও দুবার ভাববো না আমি! ”
তাশরিক সাহেবের কথাটা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই তায়েফ সাহেব বলে ওঠেন,

“ আমরা মানছি ভাইজান, আমাদের পরিবার এ নিয়ে একটা ভয়াবহ সময় পার করেছে! কিন্তু তাই বলে কোনো একসময়ের করা অপরাধের দায়ভার ওদের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া তো ঠিক না! ওরা আমাদের সন্তান! ছোটো থেকে এই কোলেপিঠে করে ওদের মানুষ করেছি। এখন এই সন্তানদের এতোটা আহাজারি কি আর সহ্য করা যায় ভাইজান?”

দু’ভাইয়ের দেওয়া এহেন যুক্তিতে মনে হয়না কবির সাহেব নিজের ফয়সালা থেকে একটুও টললেন! কেননা তার মুখের অভিব্যাক্তি এখনো আগের ন্যায় শক্ত হয়ে আছে। তাশরিক সাহেব এবার ফোঁস করে নিশ্বাস ফেললেন। মাথা নাড়িয়ে রৌদ্রের কনুই চেপে তাকে বসা ছেড়ে ওঠালেন। পরক্ষণেই ছেলেটার হাতের কব্জি চেপে বলতে লাগলেন,
“ চল বাপ! আজকেই তোদের বিয়ে দিবো আমি! মনে রাখিস, তোর বাবার রাজি না তো কি হইছে? আমি, এই তাশরিক এহসান এখনো জীবিত আছি! আমি তোর বাবার জায়গায় দাঁড়িয়ে থেকে তোকে বিয়ে দিবো! চল!”
কথাটা বলেই তিনি একপা এগোতেই পেছন থেকে তার হাতটা ছাড়িয়ে নিলো রৌদ্র। তাশরিক সাহেব থমকালেন। অবাক নেত্রে ছেলেটার দিকে ঘুরে তাকালেন।রৌদ্র তখন হালকা নাক টেনে ধরে আসা গলায় বললো,

“ এভাবে হয়না চাচ্চু!”
এহেন কথায় মুহুর্তেই চটে যান তাশরিক সাহেব। তিনি খেঁকিয়ে বলতে লাগলেন,
“ হয় না মানে? এই তুই পাগল হয়ে গেছিস? কি বোঝাতে চাচ্ছিস আমায়? ”
রৌদ্র ধীরে ধীরে নিজের ফোলা চোখদুটো তাক করে তাশরিক সাহেবের দিকে।তাশরিকের বুকটাও বুঝি তৎক্ষনাৎ হু হু করে উঠলো ছেলেটার চোখেমুখের অবস্থা দেখে। রৌদ্র হালকা গলা খাঁকারি দিয়ে বললো,
“ এভাবে কিছু করার হলে আমি আরও আগেই সবটা করে ফেলতাম চাচ্চু! আমি চাই, আব্বু মন থেকে সবটা মেনে নিক!”

তাশরিক সাহেব ঠোঁট কামড়ে মাথা নাড়ালেন খানিকটা। কোমরে দু’হাত ঠেকিয়ে মুখটা ছাদের দিকে তাক করে নিশ্বাস ফেললেন বড় বড় করে। কিয়তক্ষন বাদেই বড় ভাইয়ের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ফেলে বললেন,
“ শুনলে বড় ভাইজান? এই হচ্ছে এহসান বাড়ির সন্তান! যার রক্তে বইছে প্রবল ব্যাক্তিত্বের নিদর্শন! এতোকিছু হয়ে যাবার পরও ছেলেটা তোমার অনুমতি চাইছে! তুমি কি এখনো এমন কঠিন হয়ে থাকবে?”
এহেন কথাতেও কবির সাহেবের মাঝে কোনো হেলদোল দেখা দিলো না।তিনি আগের ন্যায় অটল হয়ে আছেন নিজের সিদ্ধান্তে। কয়েক মুহূর্ত পেরিয়ে যাবার পর হঠাৎই তিনি গম্ভীর মুখে বললেন,
“ বিয়ে করাবে? ঠিক আছে যাও তবে! কিন্তু কান খুলে শুনে রাখো সবাই! এই বিয়ের পর আমি আর কোনোদিন এই ছেলের সাথে কোনরূপ সম্পর্ক রাখবোনা!”

এমন কথায় অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো সবাই।একদিকে, সাব্বির সাহেব মাটিতে বসেই নিঃশব্দে কেঁদে যাচ্ছেন! অনিক চোয়াল শক্ত করে ফুটিয়ে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রেখেছে কেননা ছেলেটা আবার কখন না জানি কি বলে বসে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই! তায়েফ সাহেব শক্ত মুখে মারমার করে জায়গা ত্যাগ করলেন তৎক্ষনাৎ। হয়তো তিনি বুঝে গিয়েছেন — তার বড় ভাইকে বোঝানো আর পাথরের সামনে মাথ ঠুকা প্রায় একই বিষয়বস্তু!
অন্যদিকে তাশরিক সাহেব এখনো হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন। কিয়তক্ষন বাদে তিনি বলেই বসলেন,
“ এতোটা ইগো তোমার ভাইজান? এই সামান্য ইগোর জন্য আমার বাচ্চাগুলোকে এতোটা কষ্ট দিচ্ছো তুমি? এ অন্যায় আল্লাহ সইবে তো?”

কবির সাহেব তৎক্ষনাৎ শক্ত চোখে তাকালেন ছোটো ভাইয়ের দিকে। তার ওমন দৃষ্টি দেখে শ্লেষাত্মক হাসলো তাশরিক।মাথা নাড়িয়ে নিচু কন্ঠে বলতে লাগলো,
“ ভুল করছো ভাইজান! এমনও হতে পারে তোমার এই সিদ্ধান্তে পুরো এহসান বাড়ির ভিত্তিতে ফাটল ধরবে!”
কথাটা বলেই তিনি গটগট পায়ে বেরিয়ে গেলেন বাসা থেকে। রৌদ্র এতক্ষণ অসহায় চোখে বাবার দিকেই তাকিয়ে ছিলো। বাবার শেষ কথাটা যেন একেবারে বুকে গিয়ে বিঁধেছে ছেলেটার।সে কেমন আহত গলায় বলতে লাগলো,
“ আমি অরিকে বিয়ে করলে আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখবেনা তাই -তো? কিন্তু আমি যদি অরিকে না পাই তাহলে হয়তো মরেই যাবো! সেটা তোমার সহ্য হবে নিশ্চয়ই?”

কবির সাহেব একপলক আড়চোখে তাকালেন ছেলের দিকে। পরক্ষণেই নিজের দৃষ্টি সরিয়ে এনে জোরালো কদমে চলে গেলেন নিজের রুমের দিকে। রৌদ্র হাসলো খানিকটা। সেই হাসিতে স্পষ্ট ফুটে ওঠলো তাচ্ছিল্যের ছাপ! সে ঘাড় বাকিয়ে সিঁড়ির দিকে তাকালো একবার। যেখানে অরিন দাঁড়িয়ে আছে নির্বিকার ভাবে। রৌদ্র গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মেয়েটার দিকে। তারপর ধীরে ধীরে পা বাড়িয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে থেকে এগিয়ে আসলো রৌদ্র।অরিনের থেকে মাত্র দু-তিন সিঁড়ি পেছনে দাঁড়ালো।তারপর মেয়েটার দিকে কেমন অসহায় চোখে তাকিয়ে থেকে নিচু গলায় বলতে লাগলো,

“ তুই শুধু একটাবার সাহস করে আমার পাশে দাঁড়াতিস জানবাচ্চা,বাকিটা নাহয় আমিই দেখে নিতাম। কিন্তু তুই এটা কি করলি সানশাইন?তুই যে আমায় মাঝ নদীতেই ডুবিয়ে দিয়ে চলে গেলি! আমাকে ব্যাপক আদুরে ভাবে সাজিয়ে পরক্ষণেই ভিষণ ভয়ংকরভাবে দুমড়ে মুচড়ে ভেঙে দিলি! এতোটা যত্ন করে কেনো ধ্বংস করলি আমায় সানশাইন? এরচেয়ে ভালো তুই আমায় নিজ হাতে খুন করতি! বিশ্বাস কর…তোর হাতে মরতে পারায় আমি রৌদ্র নিজের এই তুচ্ছ জীবনটাকে সার্থক মনে করতাম!”

অরিন নির্বিকার মুখে তাকিয়ে রইলো রৌদ্রের পানে।রৌদ্র ফের তাচ্ছিল্যের হাসি টানে ঠোঁটের কোণে। ঠোঁট গোল করে ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলে নেমে যায় সিঁড়ি বেয়ে। তারপর আরও কোনদিক না তাকিয়ে গটগট পায়ে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে। পেছন থেকে জুবাইদা বেগম দুয়েকবার ডাক লাগিয়েছেন ছেলেকে, কিন্তু ছেলেটার মনের অবস্থা খুব একটা সুবিধাজনক না হওয়ায় থামলো না সে। চলে গেলো নিজ আঙ্গিকে। এদিকে ছেলের যাওয়ার পথে তাকিয়ে বিচলিত হয়ে পড়লেন জুবাইদা বেগম। ছেলেটা যদি রাগে-দুঃখে ভুল কিছু করে বসে, তাহলে নিজেকে কিভাবে সামলাবেন তিনি? এহেন ভাবনা মাথায় নিয়ে তিনি দৌড়ে আসেন অনিকের কাছে। অনিকের কাঁধে হাত রেখে বললেন,

“ বাবা,একটু দেখ না কই গেলো ছেলেটা! ও যদি আবার ভুল কিছু…! ”
জুবাইদা বেগমের কথা শেষ হবার আগেই অনিক হাত বাড়িয়ে তার বড় মা’কে আগলে নিলো নিজের বাহুডোরে।চিন্তিত মানুষটার মাথায় হাত বুলিয়ে নরম কন্ঠে বলে,
“ চিন্তা করো না বড় মা! রোদ ভাই আর যা-ই করুক না কেন,তিনি ভুল কিছু করবেন না। তুমি শুধু ভরসা রেখো ভাইয়ার ওপর!”
জুবাইদা বেগম হয়তো খানিকটা চিন্তামুক্ত হলেন এমন কথায়।তিনি চুপচাপ আঁচলে মুখ গুঁজে সরে গেলেন সেখান থেকে।
অনিক এবার সাব্বির সাহেবকে ধীরে ধীরে দাঁড় করায়। তারপর মানুষটাকে নিজের সঙ্গে আগলে নিয়ে রুমে পৌঁছে দিয়ে আসে। বাবার রুম থেকে বেরোতেই অনিকের চোখ পড়ে সিঁড়ির কোণে।যেখানে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কেঁদে যাচ্ছে অরিন। তার দিকে একরাশ অভিমান ভরা দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইলো অনিক। ছেলেটা বোধহয় আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলোনা। সে ছুটে চলে যেতে লাগলো সিঁড়ির দিকে।যাওয়ার পথে অরিনের দিকে তাকিয়ে আঙুল উঁচিয়ে বেশ শক্ত গলায় বলে ওঠে,

“ তোর জন্য যদি আমার ভাইয়ের কিছু হয়,তাহলে খোদার কসম — আমি ভুলে যাবো তুই আমার মায়ের পেটের বোন!”
বলেই সে ছুট লাগায় নিজের রুমের দিকে। আর অরিন? সে কেমন দূর্বল হয়ে বসে পড়লো সিঁড়ির কোণে। বুকের বাঁ-পাশে এতো কষ্ট হচ্ছে কেনো তার? সবার চোখে এতোটা খারাপ হতে পারলেও সেই মানুষটার কাছে কেনো খারাপ হতে পারলো না সে?

জুবাইদা বেগম নিঃশব্দে ঘরে ঢুকলেন। চোখেমুখে তার একপ্রকার আগুন জ্বলছে। তিনি ধুপধাপ পা ফেলে আলমারির কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। বিছানায় গম্ভীরমুখো হয়ে বসে থাকা কবির সাহেব আড়চোখে তাকালেন একবার।কপাল কুঁচকে হয়তো বোঝার চেষ্টা চালাচ্ছেন স্ত্রীর কর্মকাণ্ডের মানে? জুবাইদা বেগম একে একে আলমারি থেকে নিজের সকল কাপড় বের করে আনলেন। তারপর সেগুলো একটা বড় লাগেজে ভর্তি করতে লাগলেন ব্যস্ত হাতে। কবির সাহেব তখন মুখ খুললেন,
“ কি করছো এগুলো?”
জুবাইদা বেগমের কর্মরত হাতদুটো থেমে গেলো তৎক্ষনাৎ। তিনি আগুন চোখে স্বামীর পানে তাকিয়ে কর্কশ গলায় বললো,

“ ঐ মুখে আমার সাথে কথা বলতে আসবে না তুমি! আমি কোনো পাথুরে মানবের সঙ্গে সংসার করবো না আর! তোমার এই রাজত্ব, তোমার তথাকথিত অহংকার, এসব নিয়ে পড়ে থাকো তুমি! যে বাড়িতে আমার ছেলের সুখের কোনো দাম নেই, আমার সন্তানের চোখের পানির কোনো মূল্য নেই সেই বাড়িতে আমি জুবাইদা আর এক মুহূর্তও থাকবোনা!”
কবির সাহেব থমকালেন। অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন স্ত্রীর পানে! এতগুলো বছরে এই প্রথমবারের মতো স্ত্রীর মুখে ওমন উচ্চবাচ্য শুনলেন তিনি! তিনি থমকে গিয়ে বললেন —
“ তুমি যা বলছো বুঝেশুনে বলছো তো?”
জুবাইদা বেগম আরেকধাপ চটলেন। হাতের লাগেজটা একপ্রকার দূরে ছুড়ে, স্বামীর দিকে এগিয়ে আসলেন।তারপর জোর গলায় বলতে লাগলেন,

“ তুমি কি রোদের আব্বু? এই তোমার কি একটুও কষ্ট হচ্ছে না আমাদের ছেলেমেয়ে দুটোর জন্য? তোমার অন্তরটা এতো শক্ত হলে কবে থেকে?”
কবির সাহেব নির্বাক হয়ে বসে আছেন মাথা নুইয়ে রেখে। হাতদুটো তার বিছানার ওপর চেপে রাখা। তার ওমন ভাবলেশহীন ভঙ্গিমা দেখে তাচ্ছিল্যের হাসি দিলো জুবাইদা বেগম। চোখভর্তি অশ্রু নিয়ে বেশ শক্ত গলায় বলতে লাগলেন,
“ তুমি ভুলে যেও না রোদের আব্বু, আমি একজন মা! আর একজন মায়ের কাছে তার সন্তানদের চাইতে আর কিছুই বড় নয়।আমি যেমন ভালোবাসা দিয়ে পুরো পরিবারকে আগলে রাখতে জানি, তেমনি সন্তানের ওপর বিন্দু পরিমাণ আচঁ আসলে সেই একই পরিবারকে একেবারে ভেঙে গুড়িয়ে দিতেও জানি! আমার ছেলের খুশির জন্য এমন হাজারটা সোনার সংসার ধ্বংস করার ক্ষমতা আমি রাখি! শুধু আমার ছেলেটার কোনো ক্ষতি হোক একবার, তখন আমার অন্যরুপ দেখবে তুমি !”
থামলেন জুবাইদা বেগম। লম্বা একটা নিশ্বাস নিয়ে ফের বলা শুরু করলেন,

“ তুমি বলেছিলে না? আমার ছেলের সঙ্গে তুমি সকল সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলবে? ঠিক আছে! তবে তাই হোক। কান খুলে শুনে রাখুন জনাব কবির এহসান — আমি জুবাইদা আমার ছেলেকে নিয়ে এই বাড়ি ত্যাগ করবো।এবং আজীবনের জন্য আপনার সঙ্গে যতপ্রকারের সম্পর্ক আছে সবটা নিজ থেকে ছিন্ন করবো! আপনি আর আপনার অহংকার দুটোই অটুট থাকুক।”

বলেই তিনি ছলছল চোখজোড়া নিয়ে বেরিয়ে গেলেন ঘর ছেড়ে। কবির সাহেব স্ত্রীর চলে যাওয়ার পথে তাকিয়ে রইলেন ঘোলাটে চোখে। হঠাৎ করেই তিনি খেয়াল খেয়াল করলেন — তার সম্পূর্ণ শরীরটা কেমন যেন কাপছে! কপালে হাত দিয়ে দেখলেন সেখানে অগণিত ঘামের উপস্থিতি। কবির সাহেব ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলতে লাগলেন। হুট করেই বুকের বাঁ-পাশে কেমন চিনচিনে একটা ব্যাথা উঠছে মনে হয়। মাথার দুপাশের রগটাও কেমন ফুলে ফেঁপে উঠছে। কবির সাহেব এক-দুবার চোখ বন্ধ করে আবারও মেলে তাকালেন। নাহ! এখনো সবটা কেমন ঘোলাটেই দেখাচ্ছে! কবির সাহেব মুখ হা করে নিশ্বাস ফেলতে লাগলেন। গলা দিয়ে কোনরুপ শব্দও বেরুচ্ছে না তার! হাঁক ছেড়ে কাওকে যে ডাকবেন তারও কোনো ইয়ত্তা নেই!
গম্ভীর মানুষটা বহুকষ্টে টলমল শরীরটা এলিয়ে দিলেন বিছানায়। তিনি চোখদুটো বন্ধ করে পড়ে রইলেন অসহায়ের মতো।

“ বাবা হয়ে সন্তানের এতোবড় একটা ক্ষতি কি করে হতে দিতে পারছো তুমি? এই তুমি না বলতে — তোমার মেয়ে তোমার কলিজার টুকরো! তাহলে আজ কেনো ঐ মেয়ের নিঃশব্দ আর্তনাদ চোখে পড়ছে না তোমার? কেনো তুমি তোমার বড় ভাইকে বোঝাচ্ছো না? এভাবে হাতে হাত রেখে বসে থেকে কি লাভ?”
স্ত্রীর কথায় অসহায়ের মতো তাকালেন সাব্বির সাহেব। রাগান্বিত রাফিয়া বেগমের হাতটা টেনে নিজের সঙ্গে বসিয়ে দিলেন তিনি। তারপর হুট করেই কেমন বাচ্চাদের মতো কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

“ আমি আমার মেয়েকে ভালোবাসি রাফু! কিন্তু তার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি ভালোবাসি আমার ভাইজানকে।জানো রাফু, আমি যখন সবে ক্লাস ৮ এ পড়ি তখন আমার বাবা মারা যান।সেই থেকে আমার বড় ভাই নিজের সকল শখ-আহ্লাদ মাটি দিয়ে আমাদের ভাইদের মানুষ করেছেন! এতোটা যত্ন, এতোটা ভালোবাসা হয়তো কেও নিজের সন্তানকেও দেয়না রাফু! আমার ভাইজান সর্বদা নিঃস্বার্থ ভাবে ভেবে গেছেন আমাদের জন্য। এখন তুমিই বলো, আমি কিভাবে এই ভাইয়ের বিরুদ্ধে যাই? কেও যদি আমায় বলে তুমি তোমার কলিজার টুকরো মেয়ের খুশি চাইবে,না-কি নিজের ভাইয়ের খুশি তাহলে আমি চোখ বন্ধ করে আমার ভাইয়ের কথাই বলবো! সে আমার কাছে শুধু আমার ভাই না রাফু! সে আমার বাবার মতো বড় ভাই!”
স্বামীর এহেন কথায় বাকহারা হয়ে গেলেন রাফিয়া বেগম। হয়তো মনে মনে ভাবছেন — একটা মানুষ তার ভাইকে এতোটাও ভালোবাসতে পারে? রাফিয়া বেগম ক্রন্দনরত স্বামীর কাঁধে আলতো করে হাত রাখলেন। খানিকটা আশ্বাসের বুলি আউড়িয়ে বললেন,
“ কেঁদো না! শরীর খারাপ করবে!”

রাত সাড়ে ১০ টা🌸
অন্ধকার রুমে একা বিছানায় পড়ে আছেন কবির সাহেব! পাশে স্ত্রী নেই! হয়তো রাগ করে অন্য কোথাও শুয়ে পড়েছেন তিনি।কবির সাহেবের শরীর খারাপ লাগছে ভিষণ। তবুও মানুষটা পড়ে আছেন নিজের মতো করে। মুখ ফুটে কাওকে যে ডাকবেন সেই ক্ষমতা হচ্ছে না তার! ইশশ্ কেও যদি একটু এসে মাথায় পানি ঢেলে দিতো খানিকটা তাহলে হয়তো স্বস্তি মিলতো তার। মাথাটা যে কি পরিমাণ টগবগ করছে!! হয়তো প্রেশার বেড়ে গিয়েছে কয়েকগুণ!
অন্ধকার রুমটায় আচমকাই এক ফালি আলোর দেখা মিললো।

কবির সাহেব ভারি হয়ে আসা চোখদুটো কোনমতে মেলে তাকালো সেদিকে। কেও একজন সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন দরজার হাতল ধরে। কবির সাহেব পারছেন না তাকে ডাকতে।তিনি শুধু কাতর দৃষ্টি ফেলে রেখেছেন অন্ধকারে নিমজ্জিত ব্যাক্তিটির পানে! কিয়তক্ষন বাদে পা টিপে টিপে দরজায় দাড়িয়ে থাকা ব্যাক্তিটি ঘরে ঢুকলেন। নিঃশব্দে এসে বসলেন কবির সাহেবের পায়ের কাছে। পরক্ষণেই কবির সাহেবের পাদু’টো নিজের কোলে নিয়ে ধীরে ধীরে টিপে দিতে লাগলেন। তারপর কোনরকম নিরবতায় কাটলো বেশ কিছুটা মুহুর্ত। ধীরে ধীরে কবির সাহেব যেন নড়ার ক্ষমতাটাও হারিয়ে ফেলছেন। তিনি হুট করেই টের পেলেন তার পায়ের ওপর পানির স্পর্শ! কবির সাহেবের আর বুঝতে বাকি নেই — তার পায়ের ধারে বসে থাকা ব্যাক্তিটি হয়তো নিঃশব্দে কাঁদছেন। তিনি নিজের সর্ব শক্তি দিয়ে খানিকটা নড়লেন। তখনি তার পায়ের কাছে বসে থাকা সাব্বির সাহেব মোটা হয়ে আসা গলায় বলতে লাগলেন,

“ ভাইজান! এটা আমি!”
কবির সাহেব শুনলেন। কিন্তু কিছু বললেন না।ক্লান্ত চোখদুটো কোনমতে মেলে রাখলেন। কিয়তক্ষন বাদে তার কানে ভেসে আসে সাব্বির সাহেবের ধরে আসা কন্ঠ!
“ ভাইজান! তুমি একদম চিন্তা করো না। তোমার যেভাবেই ভালো মনে হয় সেভাবেই করো নাহয়! আমি জানি তুমি সঠিকটাই ভাববে। কিন্তু ভাইজান…. ”
এপর্যায়ে গলাটা ধরে এসেছে সাব্বির সাহেবের। তিনি বারেবারে ঢোক গিলে নিজেকে সামলানোর প্রয়াস চালান। তারপর আবারও বলেন,

“ ভাইজান! বাবা হয়ে সন্তানের কষ্ট সহ্য করতে পারছিনা আমি! আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে ভাইজান! ও ভাইজান! আমি তোমার পায়ে পড়লে তুমি কি আমার রোদের খুশি গুলো ভিক্ষা দিবে? দিবে অনুমতি আমার মেয়েটাকে বিয়ে করার? ভাইজান, তোমার যেটা ভালো মনে হয় তুমি করো।আমার কোনো আফসোস নাই।কিন্তু দেইখো আবার, বাবা হিসেবে ওদের কাছে যেন সারাজীবনের জন্য ছোটো না হয়ে যাই। জানো ভাইজান! আমার মেয়েটা না এতোটা মুখচোরা ছিলোনা কখনোই। তার যখন যেটা লাগতো সে আমায় ফটাফট বলে দিতো।কিন্তু আফসোস আমার, সে আমার রোদকে পছন্দ করলো অথচ আমি একটিবারের জন্য টেরও পেলাম না!

ভাইজান,আমি জানিনা আমার মেয়েটা সত্যি রোদকে ভালোবাসে কি-না, কিন্তু রোদের আহাজারি দেখে আমি শতভাগ নিশ্চিত আমার মেয়েটাও তাকে ভালোবাসে। ভাইজান! বাবা হয়ে মেয়ের ভালোবাসার জন্য পায়ে পড়ছি তোমার। আমায়…দয়া করে ফিরিয়ে দিও না। আমি কথা দিচ্ছি, আমি সারাজীবন তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকবো। তুমি শুধু একটিবার ওদের কথা ভাবো!”
ওপাশে কবির সাহেবের চোখ হতে নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়লো দুফোঁটা নোনাধরা। সাব্বির সাহেব ভাইয়ের নিরবতা দেখে দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন। তারপর আর কিছুক্ষন ভাইয়ের পায়ের কাছে বসে থেকে চলে গেলেন ঘর ছেড়ে।
এদিকে কবির সাহেব কেমন নিস্তেজ হয়ে পড়ে রইলেন বিছানায়। কিয়তক্ষন বাদে তার শরীরটা কেমন ঝাঁকুনি দিয়ে ওঠে। তারপর.. তারপর মানুষটার চোখদুটো বন্ধ হয়ে আসে আপনা-আপনি।

রাত সাড়ে ১১ টা!
রৌদ্র বাসায় ফিরেছে মাত্র! ছেলেটার শার্টের একহাতা গুটিয়ে রাখা,অন্যহাতা মেলে রাখা।চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপাল ঢেকে রেখেছে তার! তারওপর কেঁদেকেটে মুখটার যাচ্ছে তা-ই অবস্থা! রৌদ্র সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করতেই তার চোখ আটকে গেলো সোফায় মলিন মুখে বসে থাকা তার মায়ের দিকে। রৌদ্র ধীর পায়ে এগিয়ে আসে মায়ের নিকট। মায়ের মাথায় আলতো করে হাত রাখতেই চমকে তাকান জুবাইদা বেগম। রৌদ্র হালকা হাসলো। মায়ের পাশে বসে ধীমী স্বরে বললো,

“ এতোরাতে এখানে বসে আছো কেনো আম্মু? ”
জুবাইদা বেগম ছেলের দিকে তাকায়। ছেলেটার এলোমেলো চুলগুলো হাত দিয়ে খানিকটা ঠিক করে দিয়ে বললো,
“ কোথায় ছিলি বাবা?”
“ তেমন কোথাও না! আচ্ছা… আব্বু ঠিক আছে তো?”
এহেন কথায় জুবাইদা বেগমের মুখটা কেমন শক্ত হয়ে আসলো যেন।তিনি কঠিন গলায় বললেন,
“ ঠিক থাকবে নাই বা কেন? সে-তো এখন নিজের চিন্তায় ব্যস্ত!”
রৌদ্র সরু চোখে চাইলো মায়ের দিকে। তারপর চিন্তিত সুরে বললো,
“ এভাবে বলোনা আম্মু! আজ সারাদিন ভিষণ চাপ গিয়েছে আব্বুর ওপরে। এমনিতেই তার হার্টে সমস্যা আছে। তোমার এখন উচিৎ আব্বুর প্রতি একটু বেশি কেয়ারফুল থাকা!”

জুবাইদা বেগম একদৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন ছেলের দিকে। চোখদুটো তার আবারও ভরে আসলো যেন।তিনি তৎক্ষনাৎ ছেলের দুগালে হাত রেখে কপাল বরাবর ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো। ভিষণ গর্বের সঙ্গে বললো,
“ আমার একজীবনের সকল পূন্যের ফলস্বরূপ তোকে পেয়েছি বাবা! আল্লাহ তোকে এতোটা ধৈর্য্য কিভাবে দিলো? আমি..আমি যে পারলাম না বাপ,তোকে তোর খুশিটা পাইয়ে দিতে!”
রৌদ্র মুচকি হাসলো। মায়ের দিকে তাকিয়ে আশ্বাস দিয়ে বললো,
“ চিন্তা করো না আম্মু! দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে!”
জুবাইদা বেগম ভেজা চোখে হাসলেন একটুখানি। তারপর ছেলের দিকে তাকিয়ে চলে গেলেন নিজের রুমের দিকে। রৌদ্রও কিছুক্ষণ বসে থেকে চলে আসে নিজের রুমে।

জুবাইদা বেগম নিঃশব্দে ঘর ঢুকলেন। আলমারি থেকে নিজের তোয়ালেটা নিয়ে চলে গেলেন ফ্রেশ হতে। প্রায় মিনিট দশেক পর বেরিয়ে আসেন তিনি।ভেজা হাত-পা মুছে নিয়ে বসলেন বিছানায়। তারপর স্বামীর পাশে শুয়ে পড়লেন আলগোছে। মিনিট খানেক পেরুতেও চোখে ঘুম ধরা দিলো না তার! তিনি খানিকটা নড়েচড়ে ওপাশ ফিরতে গেলেন আর ওমনি স্বামীর শরীরে হাতের স্পর্শ লাগতেই থমকে গেলেন! জুবাইদা বেগম তৎক্ষনাৎ অন্ধকারের মধ্যেই স্বামীর কপাল বরাবর হাত ছোঁয়ালেন। আর সঙ্গে সঙ্গে আঁতকে ওঠেন তিনি। কবির সাহেবের সম্পূর্ণ শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে অস্বাভাবিকের মতো। জুবাইদা বেগম আর একমুহূর্তও দেরি করলোনা। তিনি তড়িৎ গতিতে বেডসাইড টেবিলের ওপর রাখা ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে দিলেন।তারপর ফিরলেন স্বামীর পানে।আর মুহুর্তেই বাকহারা হয়ে গেলেন তিনি! কবির সাহেবের মুখটা কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে, আর ঠোঁট দুটো হয়ে গেছে কালচে নিল! জুবাইদা বেগম তৎক্ষনাৎ ঘর কাপিয়ে চিৎকার দিয়ে ওঠেন।অস্থির হয়ে ডাকতে লাগলেন স্বামীকে,

“ রোদের আব্বু! রোদের আব্বু! এই শুনছো তুমি?”
ওদিকে জুবাইদা বেগমের হঠাৎ চিৎকারে একপ্রকার ছুটে এসেছে সবাই। সাব্বির সাহেব দৌড়ে এসেই থমকে গেলেন ভাইকে দেখে।ভাইয়ের অবস্থা দেখে মুহুর্তেই শরীর বুঝি আসাড় হয়ে গেলো তার।তিনি পেছনের দরজার দিকে হেলে পড়লেন অবহেলায়।তাশরিক সাহেব তৎক্ষনাৎ বড় ভাইয়ের পালস রেট চেক করতে লাগলেন। আর চিৎকার দিয়ে ডাকতে লাগলেন রৌদ্রকে,
“ রোদ? ও রোদ! তারাতাড়ি আয় বাপ!”
ডাকতে দেরি একপ্রকার ঝড়ের বেগে ছুটে আসতে দেরি হলোনা ছেলেটার। রৌদ্র ঘরে এসে ঢুকলো। ছেলেটার মাথার চুলগুলো থেকে চুইয়ে পড়ছে পানি।গায়ের টি-শার্টটাও কেমন জায়গায় জায়গায় ভেজা! বোধহয় মাত্রই গোসলটা সেরেছে সে।রৌদ্র ছুটে আসে বাবার কাছে। বাবার হাতটা নিজের হাতে নিয়ে পালস রেট চেক করতে থাকে।মিনিট পেরুতেই সে বলে ওঠে,

“ ৬০ এর নিচে, নিশ্বাস ফেলাটাও কমে আসছে!”
তারপর মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
“ আব্বুর কি হার্টে ব্যাথা উঠেছিলো?”
জুবাইদা বেগম কান্নার তোড়ে কিছুই বলতে পারছেননা।রৌদ্র তৎক্ষনাৎ তার বাবাকে কোলে তুলে নিলো।তাশরিক সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললো,

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি ২য় খন্ড পর্ব ৪৮

“ চাচ্চু গাড়ি বের করো!”
তাশরিক সাহেব দৌড়ে গেলেন। রৌদ্র তার বাবাকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে যেতে যেতে অনিকের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,
“ তারাতাড়ি রুম থেকে আমার ইমারজেন্সি ব্যাগ নিয়ে আয়!”
অনিক তৎনগদ দৌড়ে গেলো রৌদ্রের রুমে।আর রৌদ্র? সে ছুটে চললো তার বাবাকে কোলে নিয়ে!

সঙ্গীন হৃদয়ানুভুতি ২য় খন্ড পর্ব ৫০