Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ১৪

সাঁঝের মায়া পর্ব ১৪

সাঁঝের মায়া পর্ব ১৪
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

মাগরিব এর ওয়াক্ত শেষ হয়েছে।আশপাশ ঘোর অন্ধকার। মফস্বলে এ সময় থেকেই পথঘাটে মানুষ এর চলাচল ধীরে ধীরে কমতে থাকে।এখানেও তার ব্যাতিক্রম নেই।দু একটা সাইকেল এর শব্দ পাওয়া যাচ্ছে,বা কখনো দু চারজন মানুষ বাজার ঘাট করে গল্প করতে করতে ফিরছে।তবে সবথেকে বেশি যেটা শোনা যাচ্ছে সেটা আপাতত ঝি ঝি পোকার ডাক।বাইরে পূর্নিমার চাঁদ দেখা যাচ্ছে।সামনে রমজান। দেওয়ান বাড়িতেও একই রকম পিনপতন নিরবতা বিরাজ করছে এই মূহুর্তে।

সবাই এখন চন্দ্রা দেওয়ান এর ঘরে জড়ো হয়েছে।বাড়ির কেউ বাদ নেই শুধু ইশান আর নয়ন ছাড়া।ওদের আসার অপেক্ষাই করছেন বোধহয় বৃদ্ধা।কেনো ডাকা হয়েছে সে কারণ অজানা সবার কাছে।জরুরি তলব করা হয়েছে।সবাই জিজ্ঞাসু সূচক দৃষ্টি তে তাকচ্ছে একে অপরের দিকে।তবে এর মধ্যে দুজন মানুষ নির্বিকার বসে আছে।তারা বোধহয় আন্দাজ করতে পরেছেন।বোধহয় নয়, সত্যিই জানেন ওনারা।বাকি সবাইকে ডাকার আগে ওনাদের দুজনকে বেশ কয়েকবারই ডাকা হয়েছে এ ঘরে।তারা হলো রাইসুল দেওয়ান এবং সুমি দেওয়ান।তবে তাদের মা এতো তাড়াহুড়ো করে কেনো সবটা করতে চাইছেন সেটা তারা এখনো জানেন না।
গতকাল অবধিও কথা হয়েছিলো তিতির, ইশানকে আরও কয়দিন সময় দেওয়া হবে।কিন্তু আজ হঠাৎ বিকেলে ডেকে তিনি জানালেন যা হওয়ার এ সপ্তাহেই হবে।দ্বিমত তারা মোটেও করেননি।শুভ কাজ পরে করে ক্ষতি বই লাভ নেই।কিন্তু তবুও মনের ভিতর প্রশ্ন থেকেই যায়।

নিশি,নূরি, তিতির বরাবরের মতো একসাথে বসে আছে।নিচু গলায় আলোচনা করছে দিদা কেনো ডাকতে পারে।ঘরের এক কোনায় সোফায় বসে রিশা,রোশনি,রাফি খেলছে।চন্দ্রা দেওয়ানের বাকি তিন পুত্র, পুত্র বধূ তারাও বসে আছে শাশুড়ীর পাশে।চন্দ্রা দেওয়ান পরখ করলেন একবার সকলকে।তিতির কে দেখলেন।কি সুন্দর হেসেখেলে কথা বলছে বোনদের সাথে। কি মায়া মুখটা জুড়ে।তার দাদুভাইটা এ পুত্তুল কে ভালো রাখবে তো!চোখ ছলছল করে উঠলো তার।ইশান এখনো আসেনি।নয়ন ও আসেনি।চন্দ্রা দেওয়ান হেলান দিয়ো চোখ বুঝে রইলেন। এতো তাড়াহুড়ো সে করতে চায়নি।একে তো দুজনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে,জানানোর পর না জানি কিভাবে নেবে দুজনেই।তার ওপর এতো চটজলদি।কিন্তু উপায় নেই তার কোনো।ডায়নির নজর পরেছে যে তার নাতি টার ওপর।

“দিদা আসবো?”
“আয় বুনু আয়।”
অণিমা আর রিতু ভিতরে ঢুকলো।চন্দ্রা দেওয়ান হাত দিয়ে ইশারা করে কাছে গিয়ে আসতে বসলেন।অণি আর রিতু বসলো পাশে গিয়ে।
“কেমন আছো দিদা।”
“ভালো।তোরা?”
দুজনেই মাথা নাড়লো,”ভালো আছি।”
“তা সোয়ামি কই তোদের?”
অনিমা বাইরে ইশারা করে দেখালো।”বড় আংকেল এর সাথে কথা বলছে। “
রিতু প্রতিবাদ করে উঠলো।”তোদের বললে কেনো?আমার কি সোয়ামি আছে নাকি।একটা দেখেশুনে সোয়ামি এনে দিলেও তো পারো।”
চন্দরা দেওয়ান হাসলেন।এক হাতে জড়িয়ে নিলেন।

“ইশান আর তিতির এর বিয়ে টা হতে দে।তোকেও একটা লাল টুকটুকে বর এনে দেবো।”
হাসলো রিতু।অণিমা এবার মুখ গম্ভীর করে এগিয়ে বসলো খানিকটা।
“দিদা,কিছু কথা বলার ছিলো তোমাকে।”
“,বল না কি বলবি।বল।”
“দিদা ইশান আর তিতির এর বিয়ে টা আমার মনে হয় দ্রুত দেওয়া ভালো।”
চন্দ্রা দেওয়ান কপাল কুচকে তাকালো অনিমার দিকে।
“কেনো রে বুনু।কি হয়েছে।”
“দিদা রুষা…

“মা ইশান এসে গেছে।”ছোট ছেলের গলার আওয়াজে বর্তমান এ ফিরে এলেন চন্দ্রা দেওয়া।। নাতিকে বসতে বললেন হাতের ইশারায়।চোখ বুঝে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন একবার।অনিমা দের বলা কথা মনে পরতেই গা ঘিনঘিন করে উঠলো তার।তিনি সবটা জানিয়েছেন ইশান এর মা বাবা কে।এরপর আর দেরি করার মানেই হয়না বিয়েটাতে।যত দেরি তত সর্বনাশ। ইশান বসলো।জানালো অফিসের একটা গুরত্বপূর্ণ মিটিং এ বাড়ির কেউ না থাকলেই নয়,নয়ন আসতে পারেনি তাই।
চন্দ্রা দেওয়ান সোজা হয়ে বসতে চাইলেন।রাহেলা তাকে বসিয়ে দিলেন ভালো করে।এক নজর তাকালেন সবার দিকে।সবাই আগ্রহ নিয়ে তাকয়ে আছেন তার দিকে।চন্দ্রা দেওয়ান ইশানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,”ছুটি কতদিন তোমার?”
ইশান একবার বাবার মুখের দিকে তাকালো। স্বাভাবিক গলায় বললো,”দিদা আমি ঠিক করেছি আমি বাড়ির বিজনেস এ জয়েন করবো।”
ঘরের মধ্যে সবাই চমকে উঠলো।চন্দ্রা দেওয়ান দারুণ খুশি হলেন।প্রকাশ করলেন না যদিও।

“চাকরিটার জন্য এতো হাঙ্গামা করলে বাপ চাচাদের সাথে। সাপোর্ট করলাম আমি তখন।আজ কেনো আবার… “
ইশান কথা শেষ করতে দিলো না।,”করেছি চাকরি যা করার।আমার মনে হলো নিজেদের এতো বড় বিজনেস সেটা সামলানোর জন্য আমার থাকা উচিত। তাছাড়া বাবা,চাচ্চুদের বয়স হচ্ছে। পরবর্তী বলতে আমি আর নয়ন।দুজনে যদি এখন হাল না ধরি তাহলে কেমন হবে।আর রাফি ছোট।ওর দায়িত্ব নিতে আরও বহু বছর।পরিবার আগে আমার কাছে।”
রাইসুল দেওয়ান সহ সবার চোখ ছলছল করে উঠলো।বৃদ্ধা গলা পরিষ্কার করলো,
“বেশ।যা ভালো মনে করো তোমরা।আমরা পাশে আছি সবসময়। “
“থ্যাংক ইউ দিদা।”

“এখন শোনো আমি যেটা বলার জন্য ডেকেছি সকলে নিশ্চয়ই মনের ভেতর নানা প্রশ্ন জাগছে তোমাদের। আমি সবই পরিষ্কার করবো।তার আগে ইশান।তোমাকে বলছি।আজকের কথাটা তোমাকে নিয়েই।আদেশ,অনুরোধ, জোরজবরদস্তি যা ইচ্ছা নাম দিতে পারো এটার।তবে আমি আশা রাখবো আমার কথা রাখে তুমি।”
সকলে অবাক চোখে তাকিয়ে আছে।ওনাকে কখনো এভাবে কটিন গলায় কথা বলতে দেখেছে কি কেউ?না হয়তো।আজকাল কি একটা হয়েছে।বেশকিছু দিন হলোই সবারই নজরে এসেছে সবটা।ইশান মাথা নাড়লো,”বলো,রাখার চেষ্টা করবো ।”
বৃদ্ধা দম নিলেন খানিকক্ষন।হাত বাড়িয়ে পাশের টেবিল থেকে হাতে নিলেন স্বামী আর ছেলেমেয়ে সহ তাদের বহু পুরানো একটা ছবি।হাত বুলালেন সেখানটায়।চোখ থেকে টপটপ করে পানি পরলো দু ফোটা।মুখ তুললেন না তিনি।ছবিটার দিকেই অনিমেষ তাকিয়ে রইলো।

কান্নাভেজা নরম গলায় বললেন,”তোমাদের দাদুর সাথে আমার প্রেমের বিয়ে ছিলো।সেযুগের প্রেমের বিয়ে বোঝো?তোমার দাদুর জন্ম ভারতে।দেশ ভাগ হলে তাদের ঠিকানা হয় পশ্চিম পাকিস্তান এ।আমি পূর্ব পাকিস্তান এর মেয়ে। বাবার সাথে তার পরিচয় ছিলো।আসা যওয়া ছিলো আমাদের বাড়িতে।এক সময় ভালোবাসা হয়।বাবা রাজি হয় না।ততদিনে আমার টানে উনি সব ছেড়ে চলে আসেন।নিজের সব ভাসিয়ে দিয়ে আমাকে নিয়ে সংসার সাজায়।এ জীবনে আমার জন্য উনি সব করেছেন,সব দিয়েছেন।বিনিময়ে আমার থেকে কিচ্ছু নেননি।আমারও দেওয়ার কিছু ছিলো না হয়তো।একে একে তোমার বাপ চাচারা পৃথিবীতে আসলেন।পরপর আমার আট ছেলে সন্তান হলো।যদিও ওরা তিনজন ছাড়া বাকি সবাই সেসময় কলেরায় মারা যায়।তোমার দাদু আমার কাছে জীবনের প্রথম একটা বায়না করে বসলেন।তার কন্যা সন্তান চাই।আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতে লাগলাম।বহু বছর পর আল্লাহ আমার ডাকে সাড়া দিলেন।তোমাদের ফুপু কে দিলেন তিনি।তোমার বাপ চাচা,তোমাদের দাদু সবার নয়নের মনি ছিলো তনয়া।পারতো না শুধু মাথায় করে নাচতে।তোমাদের মায়েরা এলো।তারাও ননদ মনে করতো না কখনো।বোনের চোখে দেখতো।আর বড় বউমার তো সই ছিলো।ভাবিরা তাকে আদরে আহ্লাদে মাথায় করে রাখতো।আল্লাহ সে প্রিয় জিনিস কেড়ে নিয়ে তোমার দাদু আর আমাকে বোধহয় সবথেকে বড় শাস্তি দিলেন।কিসের শাস্তি জানিনা।তোমার দাদু শয্যাশায়ী হলেন মেয়ের শোকে।বছর না ঘুরতেই আমাকে ছেড়ে পারি জামালেন মেয়ের কাছে।আমাকে একা রেখে গেলেন।নাহ্ একা নই,তোমরা আছো।তবুও।মানুষ এর শূন্যতা পূরন হয় না কখনো।আমি চলে যেতে চাইনি এতো কষ্টের পরেও।কারণ আমার মেয়ে একটা আমানত দিয়ে গেছিলো আমাদের। সবাই যদি ওকে ছেড়েই যাই,কেমন হবে।আমার বউমা রা মায়ের দায়িত্ব পালন করেছে।কখনো পরিচয় দিতো না তার তার মামি।মায়ের আদরে রাখতো।আমি কৃতজ্ঞ সবার কাছে। “

চন্দ্রা দেওয়ান থামলো।সবার চোখ টলমল করছে।বউমারা কাদছেন।তিতির নিজেও কাঁদছে। নাথা নিচু করে আছে।নূরি জড়িয়ে ধরে আছে তাকে।
“এত কথা বলার কারণ খুজছো তাইনা? কারণ আছে।অবশ্যই আছে।তিতির কে আমরা সবাই ভালোবাসি।হয়তো অন্য ভাইবোন দের থেকে ওকে সবাই একটু বেশি আদরে রাখতে চায়।এটা অস্বাভাবিক নয়।তোমরাও ওকে আগলে দেখেছো বোন হিসেবে সবসময়। আমি বাচবো কতদিন জানিনা।তবে ওকে আমি আমার চোখের আড়াল আর করতে চাইনা,কিন্তু মেয়ে হয়ে জন্মেছে আড়াল হতেই হয়,দূরে যেতেই হয়।এসব নিয়ে অনেক ভেবেছি।হতাশ লাগতো। মনে মনে একদিন হুট করেই অন্য একটা ভাবনা আসতে লাগলো।একা একাই রাখতাম ভাবনাটা।ভাবনা টা ভাবা উচিত কি না এটা নিশ্চিত ছিলাম না।আল্লাহ জানিনা কি চায়।তবে আমি অন্য কিছু পেলাম একদিন। তোমাদের দাদু আমাকে তার মনের একটা কথা বললেন।আমি অবাক হয়ে গেলাম।কারণ একই চিন্তা আমার মাথায়।আরও অবাক হলাম কবে জানো?এতবছর পর যেদিন তোমাদের ফুপুর একটা ডায়েরি পেলাম আমি।আশ্চর্য জনক ভাবে তারও এটাই ইচ্ছা ছিলো।শুধু ইচ্ছা না,তার জীবনদষায় করা শেষ ইচ্ছা বলতে পারো।তারপর আমি আর কিচ্ছু ভাবতে পারিনি।আমার কারোর মতামত নিতে ইচ্ছে হয়নি।”

আবার থামলেন তিনি।এবার দৃষ্টি ফেরালেন সোজা ইশানের দিকে।ইশান স্বাভাবিক ভাবে বসে শুনছিলো সবটা।
“আমার কথাটা তোমার পছন্দ না ও হতে পারে।কিন্তু এটা আমারও শেষ ইচ্ছা।আমি চাই ইশান দাদুভাই তুমি…তুমি তিতির কে বিয়ে করো।”
ঘরের মধ্যে বজ্রপাত হলো যেনো।হতবাক হয়ে গেলো সকলে।হা হয়ে গেছেন সবাই।সবার আগে লাফিয়ে উঠলো রাফি।আনন্দে চিৎকার করে উঠলো।হাততালি দিয়ে দাড়িয়ে গেলো সফার ওপর।
,”ইয়েএএ তিতির আপু বউ হবে,বড় ভাইয়ার বউ হবে।”
রিশা,রোশনিও জোগ দিলো তাতে।তারাও একস্বরে হাততালি দিতে লাগলো।ছোট গিন্নি রীনা দেওয়ান এগিয়ে গিয়ে মুখ চেপে, তপ্ত চোখে থামতে বললেন তাদের।থামলো তিনজনই।তবে ইশান ছিটকে উঠে গেলো।
“অসম্ভব।অসম্ভব দিদা।আই কান্ট।জাস্ট কান্ট”
চন্দ্রা দেওয়ান স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো কিছু বললো না।সে হয়তো জানতো ইশান এমন রিঅ্যাকশনই দেবে।
“বোসো ইশান।শান্ত হও।”

ইশান বসলো না।উল্টো চোখমুখ আরও কঠিন করো ফেললো।
“নো ওয়ে দিদা।আমি বললাম তো এ বিয়ে করা সম্ভব নয় আমার।এটা পসিবল নয়।”
“বসতে বলেছি তোমাকে।”
রাইসুল দেওয়ান উঠে দাড়ালো।ছেলের দিকে তাকালো।কঠিন গলায় আদেশ দিলো।,”তোমাদের দিদার শরীর ভালো না।মনে নেই ডাক্তার কি বলেছেন।ওনাকে টেনশন না দিয়ে বোসো।শান্ত হও,শোনো বাকি কথাটা।”
ইশান বসলো।কথা বললো না কোনো।ঘরের মধ্যে পিনপতন নিরবতা। সবাই হতবুদ্ধি হয়ে বসে আছে।
“কেনো করবে না জানতে পারি?”
ইশান তাকালো একবার তিতির এর এর দিকে।মনে পরে গেলো আজকে জানা অনেক কিছু।ঘৃনার ছাপ ফুটে উঠলো চোখেমুখে। তিতির নিজেও বুঝতে পারছে না কিছু।হাত পা অবশ হয়ে গেছে তার।বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে।
ইশান কঠিন গলায় বললো,

“এটা সম্ভব নয় দিদা।”
“সেটাই তো জানতে চাচ্ছি।কেনো সম্ভব নয়?”
“শুনতে ভালো নাও লাগতে পারে।আমি সেসব তুলবো না।আর তাছাড়া আমি ওকে ওই নজরে দেখিনি কখনো।বোন হয় আমার।তাছাড়া বয়সের ডিফারেন্ট। আরও অনেক কারণ দিদা।”
“এগুলো কোনো অযুহাত হতে পারেনা।কখনো দেখোনি,এখন দেখবে।ভাইবোন এর মতো কখনো মিশেছো বলে তো আমার চোখে পরেনি।আর রইলো বাকি বয়স আট বছর বেশি পার্থক্য মনে হয় না আমার। আরও অন্য কোনো কারণ থাকলে বলতে পারো।”

“আমি বলতে বাধ্য নই।তোমার এই সিদ্ধান্ত আমি মানতে পারবো না।সরি দিদা।”
“বাধ্য নও মানে।কতো বড় লায়েক হয়ে গেছো তুমি?কথা মানবে না,কারন জানাবে না।আজীবন নিজের মর্জি মতো চললে।উল্টোপাল্টা মেয়ে পছন্দ করে ঘরে আনার ধান্দায় থাকবে।”
রাইসুল দেওয়ান তেড়ে আসলেন ছেলের দিকে।ইশান নিজেও একই দৃষ্টিতে চোখে চোখ মেলালো বাবার সাথে
“নিজের মর্জি?কোনটা মানিনি তোমাদের কথা।এখন কাকে বিয়ে করবো সেটাও তোমাদের কথায় করতে হবে।দিদা রীতিমতো চাপিয়ে দিচ্ছে তার মতামত। পাগলের মতো কথাবার্তা সব।এসব বোঝা নিজেরা বয়ে বেরিয়েছো, বলে আমাকেও বইতে হবে।আমার ঘাড়ে চাপিয়ে দেবে এখন।”
রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে ইশান।চন্দ্রা দেওয়ান আহত দৃষ্টিতে তাকালো।তিতির অপমানে লাল হয়ে গেছে মুখ।
রাইসুল সাহেব মেজাজ হারালেন।থাপ্পড় মারতে হাত তুললেন ছেলের দিকে,রাহিয়ান দেওয়ান থামিয়ে দিলপন ভাইকে।

“দুনিয়া কতটুকু দেখেছো তুমি।তিতির এর মতো মেয়ে দুনিয়ায় কয়টা পাবে তুমি। কার জন্য ওকে মানতে তোমার সমস্যা। “
“হোক ও লাখে একটা।আমার দ্বারা ওকে বিয়ে সম্ভব নয় বাবা আই রিপিট।”
“ওকে তোমার মানতে কষ্ট তো হবেই।ওর মতো মেয়ে তুমি পছন্ন্দ করবে না তো।তোমার রুচি তো…”
“বড় খোকা। থাম। “
মায়ের ধমকে ছেলের দিকে তোলা হাত নিয়ে থেমে গেলেন রাইসুল সাহেব।রাগে বাপ ছেলের মুখ লাল হয়ে গেছে।দু ভাই থামালো বড় ভাইকে।সরিয়ে নিয়ে গেলে।সুমি দেওয়ান স্বামী আর ছেলের এ রণমুর্তি দেখে ফুপিয়ে কাদছেন।
তিতির থ মেরে তাকিয়ে আছে সেদিকে। টপটপ করে দু ফোটা পানি পরলো চোখ থেকে।তাকে কেন্দ্র করে যে এতো অশান্তি হচ্ছে বুঝতে পারলো স্পষ্ট। একবার তাকালো চন্দ্রা দেওয়ান এর দিকে আবার ইশানের দিকে।নিজের ওপর রাগ হলো তার খুব।রোবটের মতো বসে রইলে।চন্দ্রা দেওয়ান ডাকলো ইশানকে।
“বোসো ইশান।উগ্রতা আমার পছন্দ নয়।”

ইশানকে টেনে এনে বসালেন রাহিয়ান দেওয়ান।রাগ তার কমেনি।দৃষ্টি তুলছে না।
“আমি বুঝিনি তোমরা বাপ ছেলে আমার কথাটায় এভাবে…যাকগে।আমি জোরজবরদস্তি করবো না ইশান।আদেশ করতেই চেয়েছিলাম তোমাকে।তবে কেনো যেনো এখন মনে হচ্ছে সবাইকে আদেশ করা যায়না।সেটার জন্য সে জোর টুকু থাকা দরকার। আমার তা আর নেই।তোমরা বড় হয়েছো।আমি বুড়ো হয়েছি।প্রাণ টা যায় যায় করে।আজ আছি কাল নেই।জীবনটা তোমাদের। সত্যিই তাই।বুড়ো মানুষের পাগলের প্রলাপে তোমাদের জীবন চলবে কেনো।আর রইলো বাকি মৃত মানুষ এর আবদার।জ্যান্ত থাকতেই… বাদ দাও।ক্ষমা করো ইশান।বড় খোকা তুইও।আমার এভাবে তোদের ওপর আমার সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া উচিত হয়নি।”
চন্দ্রা দেওয়ান এর কথায় চোখ ছলছল করে উঠলো সবার।কথায় অভিমান এর তীব্রতা স্পষ্ট। ইশান এর থেকে এমন ব্যবহার আশা করেননি বৃদ্ধা।দুঃখ পেয়েছেন খুব।ইশান এর রাগ হচ্ছে খুব।নিজের ওপর।দিদার সাথে এভাবে কথা সে কি করে বলতে পারলো।

“মা,আপনি…”
“নাহ বড় বউমা।কিছু বলার দরকার নেই।আমি বুঝতে পেরেছি।তোমার ছেলেকে বলো এসব নিয়ে না ভাবতে।আমি আর এসব তুলবো না।”
মুখ তুলে তাকালো তিতির এর দিকে।তিতির মাথা নিচু করে কেঁদে যাচ্ছে।
“পুত্তুল।এদিকে আয়।”
তিতিরকে নূরি ধরে নিয়ে এগিয়ে গেলো তার কাছে।
“তুই কাঁদছিস কেনো।কাঁদিস না।আমি আছি সবসময় বুঝলি।”
ইশান উঠে দাড়ালো। ঝড়ের গতিতে বেড়িয়ে গেলো ঘর থেকে।সবাই তাকিয়ে রইলো সেদিকে।
“তোমরাও যাও।আমাকে বিশ্রাম নিতে দাও.”
“মা..”
হাত তুলে ছেলেকে থামিয়ে দিলেন তিনি।”কিছু হয়নি।যা ঘরে যা।এ নিয়ে ওর সমানে আর কথা বলার দরকার নেই।”
তিতির এর থুতনি ধরে মুখ উচোলেন তিনি।
“আমি বেঁচে থাকা কালিন তোর একটা ব্যবস্থা করে দিয়ে যাবো আমি।তুই বোঝা নোস।আর হবিও না।বুঝলি।যাহ ঘরে যা।”

তিতির সাথে সাথে চলে গেলো ঘর থেকে।থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে না তার।কখনো এভাবে অপমানিত হতে হয়নি তাকে।এ এযাবৎকাল নিজেকে এ বাড়ির মেয়েই মেনে এসেছে।হুট করে বোঝা শব্দ টা কানে লাগলো খুব।ভেবে দেখতে গেলে সত্যিই তো তাই।বাবা মার মতো আর বাবা মা এক হলো নাকি।আদরে কমতি রাখেনি।কিন্তু দিনশেষে এ বাড়ির আসল মালিক ঠিকই শুনিয়ে দিলো বোঝা।বাপ মা না থাকলে তারা বোঝাই হয়।নিশি, নূরি পিছন পিছন আসলো তিতিরের।তিতির স্বাভাবিক ভাবে ঢুকলো নিজের ঘরে।

“আমাকে একা থাকতে দাও আপু।আমিই আসছি একটু পর।”
বলেই দরজা বন্ধ করে দিলো সে।নিশি,নূরি নিজদের ভেজা চোখ মুছলো।ভাইয়ের এমন রাগার কারণ বুঝলো না তারা।একেএকে সবাইকে বের হয়ে যেতে বললেন নিজের ঘর থেকে।ব্যাথা পায়েই উঠে দরজা লাগিয়ে এসে বসলেন বিছানায়।তারই ভুল,তিতির টাকে আজ কতগুলো কথা শুনতে হলো আজকে।কত বড় মুখ করে মেয়েকে কথা দিয়েছিলো সে।কখনো কাঁদতে দেবে না।অথচ তার করা ভুল সিদ্ধান্তে পরিবার এর সবার মন মেজাজ নষ্ট হয়ে গেলো।বাপ ছেলের পুরানো মান অভিমান আবার জেগে উঠবে।গা এলিয়ে শুলো বিছানায়।বুকের ব্যাথাটা বাড়ছে হঠাৎই।

ইশান বেড়িয়ে এসেছে বাড়ি থেকে বাইক নিয়ে। নিয়াজ এর বাড়ি যাবে।মেজাজ তুঙ্গে।তিতির এর ওপর রাগ খাটালো দিদার ওপর।তার ওপর কি সব উল্টাপাল্টা বললো।এ জীবনে কখনো দিদার কথার অবাধ্য হয়নি সে।আর না তো বেয়াদবি করেছে।তাকে যদি কেউ ভালোবাসে সবথেকে বেশি সেটিও তার মা আর দিদাই।বাবার সাথে ছেলেদের একটা নিরব যুদ্ধ আজীবন চলে,প্রতি ঘরে ঘরে চলে।তবে মা আর দাদি হলো তাদের সবসময় ঢাল হয়ে দারানো মানুষ।
ইশানকে বাইক থেকে নামতে দেখে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো নিয়াজ।গাড়ি ধুচ্ছিলো সে।হাত মুছে এগিয়ে এলো।
“কি ব্যাপার দেওয়ান সাহেব।গরিবের ঘরে আপনার পা পরলো।কাহিনি কি।”
চোখ রাঙালো ইশান।নিয়াজ চুপ হয়ে গেলো।ইশানের এ দৃষ্টি অচেনা।রেগে আছে বোঝা যাচ্ছে।
“আয় আয় ভিতরে আয়।মজা করছি।”
ইশান ভিতরে গেলো।সোজা নিয়াজ এর রুমে গিয়ে গা এলিয়ে দিলো চেয়ার এ।
“,মা বাবা নেই।বড় মামা হাসপাতালে ভর্তি। ঢাকা গেছে।”
ইশান বললো না কিছু চোখ বুঝে হেলান দিয়ে রইলো।নিয়াজ বুঝলো কিছু একটা গন্ডগোল আছে।ঝটপট মেসেজ দিলো গ্রুপে।আসতে বললো বাকিদের।

অনিমারা সকলে আধঘন্টার মধ্যে এসে পৌছুলো নিয়াজের বাড়িতে।এই আধঘন্টায় ইশান একইরকম ভাবে চোখ বন্ধ করে আছে।একটা কথাও বলেনি।নিয়াজও খোচায়নি তাকে।
অণিমা, সাজিদ, নাইম ঢুকলো ঘরে।ভ্রু তুলে জিজ্ঞাসা করলো নিয়াজ কে।নিয়াজ ইশারায় জানালো বুঝতে পারছে না কিছু, জানেনা কি হয়েছে।
অণিমা রা অবশ্য জানে সব।নিয়াজ এর মেসেজেই আন্দাজ করেছিলো। নিশিকে কল দিয়ে জেনে নিয়েছে বাকিটা।
সাজিদ এগিয়ে এসে বসলো ইশান এর পাশের চেয়ারে।কাঁধে হাত রাখলো।চোখ মেললো ইশান।সবকটাকে দেখে কপালে ভাজ পরলো তার।তপ্ত চোখে তাকালো নিয়াজ এর দিকে।দু হাত ওপরে আসামির মতো তুলে সাফাই দিলো নিয়াজ,”আমি আসতে বলিনি বিশ্বাস কর।ওরা একাই এসেছে।”

“কি সমস্যা তোর ইশান।আমরা জানি সবটা।”
সাজিদ এর দিকে তাকালো না ইশান।নির্বিকার শূন্যে তাকিয়ে রইলো।”,কি জানিস!কিচ্ছু হয়নি।”
“মানছি রাগ বেশি তোর।তাই বলে একটু কনট্রোল করবি না?”
“হোয়াট ননসেন্স।তোরা কোথা থেকে শুনলি।আমার পেছনে লেগেছিড কেনো তোরা সব।”
“তিতির এর কি সমস্যা। এতো মিষ্টি একটা মেয়ে। ওকে বিয়েতে প্রবলেম কি তোর।”
উঠে দাড়ালো ইশান।পকেটে হাত গুজলো।বাকা গলায় বললো,”বাড়ির মেয়ে।ঘরের কথা বাইরে বললে বদনাম হয়।নাই বা শুনলি।আর বললি না মিষ্টি মেয়ে। ওটাই সমস্যা। মিষ্টি জিনিসে পিপড়া,মাছি বেশি থাকে।”
অবাক চোখে তাকালো সবাই একে অপরের দিকে।এ ছেলে বলে কি।
“সুন্দর মেয়ে সবাই চায়।”

“সুন্দর চায়,তার থেকেও বেশি যেটা চায়।সেটা নারীর ভালো চরিত্র। “
“কি যা তা বলছিস ইশান।তিতির ভালো একটা মেয়ে।তোর কোনো ভুল ধারনা হয়েছে। ক্লিয়ার কর সেটা”
“এসব নিয়ে আমি কথা বলতে চাচ্ছি না।”
“না চাইলেও বলতে হবে ইশান।আমি নিজে ক্রাইম ব্রাঞ্চে আছি।মানুষ চিনি আমি।তিতির এর খোঁজ আমার কাছে আছে।নিয়েছি আমি।তাছাড়া ও তোর বাড়ির মেয়ে, ওর সম্পর্কে তোর এমন নেগেটিভ ধারনা হওয়ার কারণ কি!”
ইশান ঘুরে তাকালো সাজিদ এর দিকে।”ওর খবর তুই নিয়েছিস কেনো?”

সাজিদ তাকালো একবার অনিমার দিকে।অনিমা মুখ খুললো এবার।” তোর সাথে বিয়ের কথা হওয়ার আগে প্রথম দিন ট্রেনে দেখেই আমার ভাইয়ের জন্য ওকে পছন্দ হয়েছিলো আমার।খোঁজ নিয়ে জানতে পারি আমার খালা যে খানে থাকে তিতিরও সে এলাকা তেই থাকে।বিয়ের বিষয়ে আগে খোঁজ খবর নিতে হয়।বয়স অল্প। ওর কাউকে পছন্দ আছে কিনা জানা জরুরি। তোকে বললে তুই তো পাত্তা দিতি না।তাই আমরাই…পরে অবশ্য যখন দিদার থেকে তোর সাথে… আই মিন দিদা যখন বললো।তাই আমি আর আমার খালাকে জানাইনি।”

সাঁঝের মায়া পর্ব ১৩

ইশান তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো।বললো না কিছু।বসলো আবার চেয়ার এ।”তোরা কিচ্ছু জানিস না।কিচ্ছু না।জাস্ট স্টপ ইট ফর নাও।”
বাকিরা চুপ করলো ঠিকই।কিন্তু চিন্তার ভাজ গেলো না কারোর চোখ মুখ থেকে।একে অপরের দিকে তাকাতেই নিজেদের মনের কথা টের পেলো বোধহয় তারা।আপাতত ইশান কে শান্ত হওয়ার জন্য ছেড়ে দিলো তারা।

সাঁঝের মায়া পর্ব ১৫