Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ২৭

সাঁঝের মায়া পর্ব ২৭

সাঁঝের মায়া পর্ব ২৭
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

সাহরী খেয়ে মসজিদ থেকে নামাজ পরে এসে শুতে শুতে বেশ সকালই হয়ে গিয়েছিলো ঈশানদের।তাই এ বেলাতেও ঘুম ভাঙ্গে বেশ দেরি করে।পেটের ক্ষত না সারা অবধি তার বাবার কড়া আদেষ অফিসে যেনো সে না যায়।সে অবশ্য টুকটাক বাড়িতে বসেই কাজটাজ করে দিচ্ছে আপাতত।আর তাছাড়া সামলে নেওয়ার জন্য বাবা,চাচারা আছেই।এখন তো আবার নয়নও আছে।ঈশানের যখন ঘুম ভাঙে তখন বেশ বেলা।যথারীতি পুরো রুমে কোথাও তিতিরের ছায়াও দেখতে পেলো না সে।সকাল সকাল হুট করেই মেজাজ বিগড়ে গেলো।মেজাজ বিগড়ে যাওয়ায় আবার নিজের ওপরই ক্ষিপ্ত হলো সে।ঘুম ভালো হয়েছে,কারোর ডাকাডাকি তে ভাঙেনি,আবহাওয়া ঠিকঠাক,শরীরও তাই।তাহলে আচমকা মেজাজ খারাপ হওয়ার কারণ কি থাকতে পারে হিসেবে মিললো না তার।

ওপর থেকে কমফোরটার টা সরিয়ে বেশ নিচে নেমে যাওয়া কালো রঙের ট্রাউজার টা টেনে ওপরে তুললো।উদাম শরীর যথারীতি। যেমন থাকে আরকি।হাত বাড়িয়ে এসির রিমোট নিয়ে এসি বন্ধ করে ফ্রেশ হতে ঢুকলো বাথরুমে।একেবারে শাওয়ার নিয়ে বের হলো।ধীরেসুস্থে দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের পেট এবং হাতের নতুন করে ব্যান্ডেজ টা করে নিলো।কোমড়ে জড়ানো আধভেজা তোয়ালে খুলে প্যান্ট পরে নিলো,গায়ে জড়ালো একটা ব্ল্যাক টি শার্ট।ছাদে যাবে হালকা ওয়ার্ক আউট করতে।
বের হতেই আড়চোখে তাকালো তিতিরের ঘরের দিকে।দরজা বন্ধ। ঘুমুচ্ছে হয়তো।শাওয়ার নেওয়ার ফলে যতটুকু মেজাজ ঠিক হয়েছিলো আবার আচমকা সেটা তিড়তিড় করে বিগড়ে গেলো।নাহ্ মহা সমস্যায় পরা গেলো তো।ইচ্ছে করে। সজোরে লাত্থি মারলো তিতিরের দরজার।শব্দ করে খুলে গেলো দরজা।ঈশান কিন্তু মোটেই আর দাড়ালো না।ছোট বাচ্চাদের মতো এহেন একটা কাজ করে সে নিজেই লজ্জিত। ছোটবেলায় পাড়ার অনেক বেয়ারা নাদুশনুদুশ বাচ্চাদের দেখতো।যারা জিততে না পেরে
থুথু দিয়ে দৌড়াতো।ঈশানের বিষয়টা অনেকটা সেরকম হয়ে গেলো না!ভাবতেই হতাশায় মাথা নাড়লো ঈশান।এই বয়সে এসে বাচ্চা বিয়ে করে দু দিন যেতে না যেতেই নিজেও বাচ্চামো শুরু করেছে।
ছাদে এসে দাড়াতেই চোখ পরলো এককোনা ঘেষে দন্ডায়মান নূরির দিকে।কারোর সাথে কথা বলছিলো হয়তো।কপালে ভাজ পরলো।এসময়ে ছাদে কাজ কি এ মেয়ের।নূরি ততক্ষণে দরজায় শব্দ পেয়ে ঘুরে দাড়িয়েছে।ঈশানকে দেখে মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে এলো।ঝটপট ফোন কেটে ওড়নার আড়াল করলো।ঈশান এসে দাড়িয়েছে নূরির পাশে।গম্ভীর গলায় বললো,

___”আমাকে দেখে কল কাটার কি হলো!তোরা কি বাচ্চা এখন?. যে লুকিয়ে লুকিয়ে কথা বলতে হবে এখনো!”
নূরি কাচুমাচু করলো খানিকটা।ধীর গলায় বললো,
___”কথা শেষ ভাইয়া।”
ঈশান আড়চোখে পরখ করলো বোনকে।চোখটা রক্তিম দেখাচ্ছে।কাঁদছিলো কি!
___”ভার্সিটি যাসনি?”
___”শরীরটা ভালো লাগলো না।”
___”নিশি একা গেছে?”
___”গাড়ি নিয়েই গেছে।”
ঈশান কথা বলে না চুপ করে দেখে শ্যামলাবরন মুখটা।কাঁপছে মেয়েটা।আশ্চর্য! তাকে দেখে এরা এতো ভয় পায় কেনো! পায়না একমাত্র তিতির টা।বোন থাকতেই পায়নি,মুখে মুখে তর্কে পিএইচডি। এখন তো আবার বউ হয়েছে।ভুল বুঝে আরও শক্তপোক্ত মানসিকতার বউ যাকে বলে।অবশ্য ভুল বোঝেনি। বোঝানো হয়েছে।সে কাজটা সয়ং নিজে নিজ হাতে করেছে।নূরি তখনো মাথা নিচু করে মেঝেতে পায়ের আঙুল খোটাচ্ছে।

___”তুই কি কিছু বলতে চাস।?”
ঈশানের প্রশ্নে চকিত হয় নূরি।তাকায় ভাইয়ের দিকে।দুদিকে মাথা নাড়ে সজোরে।বোঝায় চায়না বলতে।
ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে। হতাশ হয় যেনো।গম্ভীর গলায় বলে,
___”নাইমকে তোর কেমন লাগে?”
নূরি আরেক দফা চমকায়।কেমন লাগে মানে কি!কোন নাইম!বড় ভাইয়ার ওই বন্ধু টা!
___”চিনেছিস তো আবার নাকি?”
ওপর নীচ করে মাথাটা।চিনেছে সে।
___”কেমন লাগে? “
___”তোমার বন্ধু। নিশ্চয় ভালো।”
ঈশান তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে তখনো।
___”উহু এটা জবাব নয়।আমার বন্ধু বলে নয়।তোর দৃষ্টিতে। “
নূরি ভেবে পায়না তাকে এসব বলার কারন!ধীর গলায় বলে,
___”আমি ব্যাক্তিগত ভাবে চিনিনা বড় ভাইয়া।ওই দু একবার তোমার সাথে দেখেছি।তোমাদের বিয়েতে এসেছিলো।আর সেদিন ড্রপ করে দিলো ভার্সিটি তে।”
ঈশান হাতে ভর দিয়ে ছাদের প্রস্যস্ত রেলিঙএ বসে।মোটেই দৃষ্টি সরায় না।গম্ভীর গলাা বলে,

___”আর ইউ সিওর যেখানে নেমেছিলি সেটা ভার্সিটি ছিলো।”
মুখের ওপর থেকে রক্ত সরে যায় নূরির।সেদিন সে ভার্সিটির সামনে নামেনি।আদোতে সেদিন তো ভার্সিটি ছিলোই না।নাইম ভাই তার মানে দিয়েছে ঈশানকে!মনে মনে মেজাজ হারায় নাইম এর ওপর সে।
___”কি হলো চুপ করে আছিস যে।ওটা ভার্সিটি ছিলো?”
পরপর মনে মনে সব কথা সাজিয়ে নিলো নূরি।বেশ দৃঢ় গলায় বলতে চাইলো,
___”ভার্সিটির সামনে কোনো ছেলের গাড়ি থেকে নামছি দেখলে সিনিয়র টা র‍্যাগ দেয় ভাইয়া।”
ঈশানের কুঞ্চিত ভ্রুজোড়া প্রশ্নসূচক ভাবে ওপরে তোলে।
___”আমার বোনদের র‍্যাগ দেয়! কারা!”
___”সিনিয়র রা আছে কিছু।আমাকে বা বড় আপুকে কখনো কিছু বলেনি।যদি বলে আরকি…”
নূরি মাথা নিচু করে ফেলে।কন্ঠও খাদে ততক্ষণে।
ঈশান ক্রুর হাসে নিঃশব্দে।

___”নাইম খুব ভালো ছেলে।আমার বন্ধু আমি চিনি জানি।এতদিন ওকে নিয়ে আমার আলাদা পরিকল্পনা ছিলো।এখন নেই।পরিকল্পনা টা সাজিয়ে ওকে হার্ট করতে চাচ্ছি না, ঠকাতেও চাচ্ছিনা।বেস্ট ফ্রেন্ড ও আমার।ভরসাও করে।ওকে ঠকানো উচিত না।কি বলিস?”
নূরি ঈশানের কথার আগাগোড়া কিচ্ছু বুঝতে পারছে না।কিছু বলতে যাবে তার আগেই শব্দ করে বেজে উঠলো সেলফেোনটা।ঈশানের দিকে ভয়ার্ত তাকিয়ে দ্রুত সাইলেন্ট করলো ফোনটা।ঈশান বুকে আড়াআড়ি হাত গোঁজা।
___”রিসিভ কর।ইট’স ওকে।”
অপ্রস্তুত হাসে মেয়েটা।সেভাবেই বলে ওঠে,
___”রঙ নাম্বার। “
তবে বারবার বেজে যাচ্ছে কল।ঈশান আবার একই স্বরে বলে,

___”ধর।রঙ নাম্বার হোক।বেচারা তো জানেনা কল টা রঙ মানুষ এর কাছে এসেছে।”
নূরি কাঁপা কাঁপা হাতে চতুর্থ বারের রিং এ ধরলো কলটা। ওপাশ থেকে শোনা গেলো কারোর উদ্বেগ মাখা কন্ঠ,
___”নূরি?অ্যাই।রাগ করেছো সোনা?অ্যাম সরি।আর চেঁচাবো না।”
ইয়াজ এর কন্ঠ।নূরির গলা শুকিয়ে আসে।তাকায় একবার ঈশানের দিকে।ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করে।ঈশানের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার আত্মা অবধি চলে গিয়েছে। মিনমিন করে বললো,
___”রঙ নাম্বার বললাম তো।আর একবার কল করলে আমার ভাইকে বলে দেবো বললাম।”
ওপাশের মানুষটা কি বুঝলো কে জানে!হয়তো টের পেলো নূরির সমানে কারোর অস্তিত্ব। ব্যাস্ত ভঙ্গিতে বারবার সরি বলতে তে কল কাটলো।নূরি কল কেটে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে সন্তুষ্টির হাসি হাসলো একপ্রকার,
___”দেখলে রং নাম্বার। “
___”ওহ্”।”
___”ঘরে যা।”
নূরি মাথা নাড়িয়ে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই কানে আসে ঈশানের অস্বাভাবিক ভারি কন্ঠ।

___”দেওয়ান বাড়ির মেয়ে তোরা।নিজের সম্মান থেকে শুরু করে চরিত্র সব হেফাজতে রাখতে শিখতে হবে।পোষাকে ঔদ্ধত্য থাকা যাবেনা।আর নাতো চরিত্রে দাগ।নজর হবে ওপরের দিকে।যা করবি হাজারবার ভেবে।মিথ্যা বর্জন করবি।বিপদে পরলে আমরা মনে করি মিথ্যা আমাদের বাচাবে!সত্যিই কি তাই!মিথ্যা দিয়ে মিথ্যা ঢাকতে ঢাকতে একটা সময় চাইলেও আর সত্য বলতে পারবি না।”
নূরি ঘুরে তাকায় ভাইয়ের দিকে।মিনমিন গলায় বলে,
___”আমি কি করলাম ভাইয়া?”
ঈশান হাসে সামান্য।এবার গলা নরম করে।
___”ভাই হিসেবে বলা টা কি দোষের?”
___”না না তা কখন বললাম।”
___”মাথায় রাখবি তাহলে।যাহ ঘরে যা।”
নূরি আর দাড়ায় না। কম্পিত পায়ে নেমে আসে ছাদ থেকে।ঈশান দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোন করে কাউকে।
___”কাজ হয়েছে? “
___”না স্যার।লোকেশন এই দেশে নয় তো।”
___”কোথায় দেখায়।”
___”কোথায় বলতে পরশু সিঙ্গাপুর সো করেছিলো।তারপর আবার অফ।”
___”ট্রাই হার্ড”

ফোন রাখে ঈশান।সত্য মিথ্যা,দ্বিধা দন্বের বেড়াজালে জড়িয়ে আছে সে।সাথে তার আর তিতিরের এই অনাকাঙ্ক্ষিত দাম্পত্য। রুষা কলের ওপর কল করে যাচ্ছে।কল।তুলছে না সে।এ পর্যন্ত আটটা নাম্বা ল্যাকলিস্টে রাখলো সে।তিক্ত বিরক্ত সে এই মেয়েটার ওপর।মেয়েটা অত্যন্ত ধূর্ত।তাকে অবধি প্রায় মাত দিয়ে দিচ্ছিলো।ঠিক ঈশানের পরিকল্পনা ধরে ফেলে বিয়েটা ভেঙে দিলো। ঈশান ক্রুর হাসে।তার ফোনে আসা তিতিরের ফেক ছবিগুলো বেশ নিখুত ভাবতে তৈরি।সেটা করতে পারার কারণটাও স্পষ্ট। দেশে এহেন কাজ করা হয়নি।যা হয়েছে বিদেশের মাটিতে।তবে সেও কম যায়না।ঈশান আরশাদ দেওয়ান কে চার বছর ধরে ঠকাবে কেউ!তাও রুষার মতো মেয়ে!এ হয়!শব্দ করে হেসে ফেললো ঈশান।তবে কেনো দাবার শেষ চালটা দিতে পারছে না সে!তার কারণও অবশ্য বেশ দীর্ঘ।
জোরে জোরে আকাশের দিকে চোখ বুজে শ্বাস নেয় ঈশান।সবার আগে সাজিদ কে জানাতে হবে বিষয়টা।এখন এদিকটা একা সামলানো অনেকটা রিস্কি। তিতির টাকে সেদিন আচমকা কথাটা বলে করেছে এক বিশাল ভুল।আহাম্মক বনে যায় কথাটা ভাবলেই!রুষাকে সে ভালোবাসে!তার সাথে কোয়ালিটি টাইম স্পেন্ড তাও হোটেল রুমে।হেসে ফেলে ঈশান।বিরবিরিয়ে উচ্চারণ করে,
___”ফা***ক ম্যান।আমি এতো ইডিয়ট হলাম কবে থেকে তাও ওইটুকু বাচ্চা মেয়ের কিছু হবে এই ভয়ে!অ্যাম আই ইন লাভ!ড্যাম ইউ…

চুড়ির দোকান ঘুরে বেশ কয়েকজোড়া চুড়ি পছন্দ হলো নিশির।বাড়িয়ে ধরলো নিয়াজ এর দিকে।নিয়াজ একগাল হাসলো।একডজন নিজের হাতে নিয়ে বাকিগুলো দোকানি কে দিলো সুন্দর মতো প্যাক করে দিতে।নিজের হাতের টা সযত্নে পড়িয়ে দিলো নিশির ফর্শা হাতে।খানিকটা ঘেষে এসে গলায় নামালে,
___”আমার তো ওই হাত দুটোয় কষিয়ে চুমু খেতে ইচ্ছে হচ্ছে ময়নার মা।খাবো?”
নিশি চোখ রাঙায়।কতবার বলেছে তাকে এসব নামে না ডাকতে।অথচ অসভ্য লোকটা শুনলে হয় তার কথা।নিশি তাকে সময় দিতে বলে বিধায় নিয়াজ এর এই যুক্তি।
___”তুমি বলো তো তাহলে চাকরিবাকরি ছেড়ে দিয়ে এখানে চলে আসি।তোমার বাপের থেকে জমি যৌতুক নেবো।সেখানে হালচাষ করবো।বছর ঘুরতেই ল্যাটকা ফ্যাটকা বাচ্চাকাচ্চা হবে।তুমি সেগুলো মানুষ করবে আর তিনবেলা কোমড়ে কাপড়ের আচল গুজে আমার জন্য ক্ষেতে ভাত নিয়ে যাবে গামছায় বেধে।আমি লুঙ্গি ভাজ করে।গামছা দিয়ে টপটপ করে গড়িয়ে পরা ঘাম টুকু মুছে ভাত খাবো।সন্ধ্যা হলে ঘরে ফিরবো।হালি হালি বাচ্চাকাচ্চা গুলো ঝেকে ধরবে মৌমাছির মতো।ঠিক আছে না?”
নিশি আগে রাগ করতো।এখন রাগ হয়না।হতাশ হয়।লোকটা এতো বেশি কথা বলে।এই যেমন এখানে এতো মানুষ এর সামনে ময়নার মা ডাকছে।একটা মানসম্মান আছে তো নাকি!

___”কি হলো ময়না….”
___”আরেকবার এটা বলে ডাকলে ব্রেকআপ…”
নিয়াজের মুখটা চুপসে যায়।দোকানি কে হতাশ চোখে ইশারা করে চুড়িগুলোর দাম বলতে।
___”বুঝলেন ভাই।মেয়ে মানুষ ক্ষনে ক্ষনে ভোল পাল্টায়।এইযে দেখছেন।ছিলো বন্ধুর বোন।ছোট থেকে পাগল আমার জন্য। ওদের বাড়ি গেলে শার্টের কিনারা ধরে ঘুরঘুর করতো।বছর পাঁচেক ধৈর্য ধরে পটিয়েছে।তখন ধমক দিলে কেঁদে কেটে একাকার।এখন দেখুন।যেই পটে গেছি।অমনি!ছিলো ক্যাপসিকাম মরিচ, হয়ে গেছে বিন্দি মরিচ।তফাত বুঝলেন!”
দোকানি মিটিমিটি হাসছে।নিশি অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে নিয়াজের দিকে।নিয়াজ সেদিকে তাকিয়ে দাতে জিব কাটলো।সুন্দর মতো হাত টা ধরলো নিশির।
___”রাগ করে না জান।মজা করলাম তো।”
অন্যসময় হলে হাত মোটেই ধরতে দিতো না সে।এখন অবশ্য সেটা করলো না।রাগ চাপা দিয়ে নিয়াজের দু হাতের মাঝে বেরোচ্ছে ভিড় ভাট্টা থেকে।রমজান শুরু হতে না হতেই মার্কেটে মানুষের আনাগোনা।পা ফেলা দুষ্কর।নিয়াজ একটা মানুষের ও স্পর্শ লাগতে দিলো না নিশির গায়ে।বেরিয়ে এলো মার্কেট থেকে।
___”আর কিছু লাগবে? হু?”
নিশি ভেবেছিলো রাগ করবে এখন।কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে তার রাগ হচ্ছে না।এই মানুষ টার যত্নে বরাবরের মতেই কাবু সে।
___”তিতিরের জন্য কানের দুল নেবো।চলো।”

তিতির প্রায় ঘন্টাখানেক হলো অপেক্ষা করছে একটা কফি শপে।দোকানটা নিয়াজের পরিচিত। সেখানেই অপেক্ষা করছে সে।এসেছিলো নিশির সাথেই।নিয়াজ তাকেও নিয়ে যেতো যাচ্ছিলোও।আচমকা মাথা ঘোরায় নিয়ে এসে বসায় এখানে।নিশির মজাটা নষ্ট করতে চায়নি সে।বিধায় খানিকটা সুস্থ লাগার পরেই নিয়াজ আর নিশিকে পাঠিয়ে দেয় মার্কেটে।সে অপেক্ষা করছে।রোজার দিন সুতরাং রেস্তোরাঁয় দু একজন সনাতন ধর্মের কাস্টমার ছাড়া মুসলমানদের আনাগোনা কম।যারা আছে তারা অবশ্য ছোট বাচ্চাদের নিয়ে বসা।তাদের খাওয়াচ্ছে মূলত।তিতির মোটেই বিরক্ত হচ্ছে না।রেস্তোরাঁর পরিবেশ টা বেশ সুন্দর।দোতলায় সে যেখানে বসা সেখান থেকে চমৎকার আশেপাশের ভিউ দেখা যাচ্ছে।রোজা না থাকায় একটা ক্যাপাচিনো নেওয়া তার সামনে।ধীরেসুস্থে চুমুক দিচ্ছে সেটায়।
___”তিতির?”
হঠাৎ একটি অচেনা মিষ্টি মেয়েলি কন্ঠে ফিরে তাকালো তিতির।একজন অতী সুন্দরী রমনী দাড়িয়ে।বয়স ঠাহর করতে পারলো না ঠিকঠাক।পঁচিশ এর নিচে কোনো ভাবেই হবে না।অবশ্য বয়সের ভাজ নেই শরীরে,মুখে কোথায়।সে একদম চিনতে পারলো না।তবে তার নাম নেওয়ায় সৌজন্যমূলক হাসলো।মেয়েটা হয়তো তাকে চেনে।
মেয়েটা এগিয়ে এসেছে ততক্ষণে। কড়া পারফিউম এর গন্ধ এসে লাগছে নাকে।পরনে আঁটসাঁট পারপেল কালার থ্রিপিস।চোখের বড়সড় সানগ্লাস টা মাথার ওপরে তোলা।জামার সাথে মিলিয়ে গাড় লিপস্টিক পাতলা ঠোঁট জুড়ে।পিঠ অবধি পাতলা স্ট্রেট করা চুলগুলো বড্ড ঢিলে করে ক্লেচার লাগানো।মেয়েটির পোশাকে আভিজাত্যের ছোয়া স্পষ্ট

___”বসতে পারি? “
মেয়েটার মিহি কন্ঠ কানে আসতেই তিতির মৃদু হেসে মাথা নাড়লো।প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই চেয়ার টেনে বসলো সে।হাতের ডিওর এর ব্যাগটা টেবিলে রাখতে রাখতে কফির দিকে তাকিয়ে বললো,
___”মান্থলি সাইকেল?”
অপ্রস্তুত হাসলো তিতির।অচেনা মানুষ আচমকা এসে এহেন প্রশ্ন করলে কতটুকু সতোস্ফু্র্ত থাকা যায়।অবশ্য দোষ তারও আছে।ক্যাপাচিনো টা নেওয়া উচিত হয়নি।
হালকা ঘাড় নাড়লো।
___”জ্বী।”
___”আমাকে চিনতে পারলে না তাইনা?”
___”সরি কিন্তু চিনতে পারিনি।”
মেয়েটা অমায়িক হাসে।হেলান দিয়ে বসতে বসতে।বলে,
___”প্রথমে আমিও চিনতে পারিনি।পরে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর পারলাম।সম্ভবত সেদিন তোমার সাথেই আমার কথা হয়েছিলেো।মনে নেই।ঈশানের ফোনে।”
থমকায় তিতির।মেয়েটার হাস্যজ্জল মুখটা পরখ করে।অস্ফুটস্বরে বেড়িয়ে আসে মুখ থেকে একটা নাম,

___”রুষা!”
রুষা হাসে।মাথা ঝাকায়।
___”যাক চিনেছো তাহলে।”
তিতিরের বুকের ভিতরটা ততক্ষণে দুমড়েমুচড়ে উঠেছে।খেয়াল করলো শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কোনো এক দুঃস্বপ্নর মুখোমুখি সে হয়েছে এখন।দম আটকে।এলো তার।পলক ফেলতে ভুলে গেছে সে জেনো।
___”প্রথমে কলে তোমার চেহারা মনে করতে না পারলেও এখানে দেখে পেরছি।তোমাদের ফ্যামিলি ফটো দেখিয়েছিলো ঈশান।ওখানে তুমি তখন বেশ ছোট ছিলে তো।তবে চেহারার বেশ এখনও।”
যুক্তিটা মোটেই বিশ্বাসযোগ্য মনে হলো না তার কাছে।কি করা উচিত তার,কি বলা উচিত
একবার নজর বুলালো বসারত রুষার পুরো শরীরের দিকে।শিরশির করে উঠলো তার শরীর।বুকে চিনচিন ব্যাথা অনূভব হলো।এই সেই শরীর যাকে কি না তার স্বামী স্পর্শ করেছে।এর জন্য এতকিছু।
তিতির নিজেকে ধাতস্থ করলে সময় নিয়ে।

___”ও…আমি চিনতে পারিনি আপনাকে।আসলে দেখিনি কখনো।”
___”ইট’স ওকে।তোমার বাড়ির সবাই আমার কথা জানে। তুমি জানতে না।”
___”,আমি বাড়িতে থাকিনা খুব একটা।ছুটিতে এসেছি।তাই শোনা হয়নি।”
এবারও হাসলো রুষা।তিতির গভীর চোখে দেখছে মেয়েটাকে। মেয়েটা সত্যি সুন্দর। তার থেকেও কি!কি জানি!হবে হয়তো।মেয়েটার প্রতি আচমকা এক আকাশ সমান বিতৃষ্ণা কাজ করলো তার।হাসি হাসি মুখটা আর স্বাভাবিক রাখতে পারলো না।না চাইতেও রুক্ষ লাগলো।তবে এখন মাথার মধ্যে ঘুরছে ঈশানের বলা বেশ কিছু কথা।রুষাকে ছোঁয় নি ঈশান!হাবিজাবি বলা সে রাতের কথাগুলো।
___”একা এসেছো কোনো কাজে?”
আচমকা একটা মিথ্যা বলে বসলো তিতির।কানের পাশে চুলগুলো গুজতে গুজতে বললে,
___”ঈশানের সাথে এসেছি।”
রুষা বোধহয় চমক খায় একটা।তার জানা মনে তিতির ঈশানের চেয়ে প্রায় আট নয় বছরের ছোট হবে।সেখানে এত অবলীলায় ঈশান কে নাম ধরে ডাকায় হতভম্ব হলো সে।তাছাড়া সে পাগলের মতো কল করে যাচ্ছে ঈশানকে।ঈশান কল তুলছে না।না বোঝার মতো করে বলল কার সাথে। তিতির এবারেও একই ভঙ্গিতে বললো,

___”ঈশান…”
রুষা খানিক হাসলো।
___”ভাইয়ের সাথে ঝগড়া হয়ে নিশ্চয়।বকেছে?”
তিতির ভ্রু জোরা বাকালো।একই বাঁকা কন্ঠে বললো,
___”আমি কি বাচ্চা!বকবে কেনো?”
রুষা অপ্রস্তুত হলো কি বলবে ভেবে পেলো না হয়তো।
___”আমার জানা মনে ঈশান তোমার থেকে বেশ বড় বয়সে।”
___”হুম তা বড়…নয় বছর সম্ভবত।নাকি আট হিসেব করিনি।”
রুষার মুখের এতক্ষণের হাসি এবার বিলীন হলো।আশপাশে তাকালো।তিতিরের দিকে ফিরে বললো,
___”ঈশান কোথায়?”
তিতির আলগোছে ততক্ষণে কল দিয়েছে নিয়াজকে।নিয়াজ কলে আছে প্রায় দু মিনিট।মেয়েটা যে রুষা এটা তার হতভম্ব মাথায় ঢোকার পরই কি মনে করে কল টা করেছে নিয়াজকে।এর কারণ জানা নেই তিতিরের।নিয়াজও বুঝদার মানুষ একটা।কি সুন্দর রুষার কন্ঠ শুনে চুপ করে আছে।নিয়াজের পাঠানো ছোট্ট মেসেজটা পড়লো তিতির।রুষার কোনোকথা বিশ্বাস করতে স্পষ্টত না করা।সে এসে আজ সব বলবে মেয়েটা সম্পর্কে।তিতির আড়চোখে মেসেজ টা পড়ে রুষার দিকে মুখ তুললো,

___”চুড়ি কিনতে গেছে আমার জন্য। “
তিতিরের কথায় রুষা বড় বড় চোখ করে তাকায়।ঈশান গেছে চুড়ি কিনতে!তবে নিজেকে বুঝিয়েও ফেলে সঙ্গে সঙ্গেই।বোন হয়।বাচ্চা মেয়ে বায়না করেছে হয়তো।
এদিকে এক মার্কেটের বাথরুম জোনে এসে হা করে ফোন লাউডে দিয়ে নিয়াজ শুনছে তিতির আর রুষার কথোপকথন। সে ছুটে যেতে পারছে না মেয়েটার কাছে।নিশি বাথরুমে গিয়েছে।তখনই কলটা এসেছে।এই অবস্থায় কি করে যায়।তিতিরের কথাটা বলা শেষ হতেই দ্রুত মেসেজ করে ঈশানকে।
ঈশান তখন বাইক নিয়ে বের হচ্ছে সবে।গন্তব্য নিয়াজের বাড়ি।তবে আচমকা নিয়াজেরই মেসেজে থতমত খায় সে।তার জানা মনে তিতির তো বাড়িতেই।মার্কেটে গেলো কখন!ঈশান ব্যাস্ত হয়ে বাইক ছোটায় সেদিকে।
রুষা খানিকক্ষণ গভীর ভাবে পরখ করে তিতিরকে।স্বর্গের অপ্সরী মেয়েটা।জীবন্ত মানুষ বলে মনে হয়না। এতো সুন্দর। কথাবার্তা কি এমনই কঠিন নাকি ইচ্ছে করে করছে বুঝতে পারলো না সে।

___”ঈশান তোমার সাথে!”
তিতির এমন ভঙ্গি করলো যেনো প্রশ্ন টা করে বেশ ভুল করে ফেলেছে রুষা।
___”হ্যা হবেনা!কার সাথে হবে।”
___”আমি কল করছিলাম।ব্যাস্ত হয়তো।”
___”কই না তো।”
রুষার মুখ কালো হয়।মাথা টানটান করে ওঠে।
___”কল করে আসতে বলো ওকে।ওর সাথে আমার কথা আছে।”
___”আপনি করুন।গেলো সবে।এখনই কল করে আসতে বলবো!রোজা রেখে ওকে এতোটা ঘোরাবো!একেবারে আসুক।তখন না হয়…
রুষা সে অপেক্ষা করেনা নিজের ফোন বের করে কল করে ঈশানকে।কল তোলে না।টানা ছয়বার কল করে থামে মেয়েটা।রাগে চোখ ইতিমধ্যে লাল হয়ে গেছে।তিতির নিজের বিচক্ষণ নয়নে দেখছে সেসব।এরই মধ্যে সপ্তমবারের কলে সুন্দর একটা রোবটিক্স মেয়েলি কন্ঠ ভেসে এলো।

“আপনি যে নাম্বার এ কল করছেন তা এই মূহুর্তে ব্যাস্ত আছে।”
শুনশান রেস্তোরায় ফোনের ওপাশের শব্দ বেশ স্পষ্ট কানে এলো তিতিরের।ব্ল্যাকলিস্টে ফেলা হলো নাম্বার টা, বুঝতে বাকি রইলো না তিতিরের মনে মনে হাসি পেলো খুব।রুষার মুখটা দেখার মতো।মেয়েটাকে কেমন একটা ডেস্পারেট দেখাচ্ছে।তিতির কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দিলো এবার।খুব নরম গলায় বললো,
___”আপনাদের মধ্যে ঝামেলা হয়েছে?”
রুষা জোর করে হাসলো।তিতির আগ বাড়িয়ে বললো,
___”আমি কল করে আসতে বলি কেমন?”
রুষার জবাবের অপেক্ষা করলো না সে।কল করলো ঈশানকে।রুষাকে আশ্চর্য করে দিয়ে একবার রিং হওয়ার সাথে সাথেই কল তুললো ঈশান।অবশ্য মোটেই আদুরে কিছু বললো না।রামধমক দিলো মেয়েটাকে,
___”না বলে কেথায় গিয়ে বসে আছিস।গাধা?বাড়ির সবকটা একেকটা অবাধ্য।কতবার বলেছি একা একা না বের হতে।আমি একা আর কতদিলে সামলাবো।পাগল হবো আমি।”
নিজে রুষার মতে বোকামো একদম করেনি।সাউন্ড বেশ কমানো।কন্ঠ শোনা গেলে কি বলছে সেটা মোটেও দূরে থেকে শুনতে পাওয়া যাচ্ছে না।তিতির মিহি গলা বললো,

___”আমার চুড়ি কিনেছো?”
ঈশান বাইক চালাচ্ছিলো।বেশ স্পিডে।তিতিরের এমন কামুক কন্ঠে তুমি ডাক শুনে বাইক টালমাটাল হলে।কোনোমতে সামলে নিয়ে ধমকের সুরে বললো
,___”হোয়াট ননসেন্স। কোথায় তুই।”
___”চুড়ি পাওনি?ঈশান…কতবার বলেছি ওই চুড়ি টা আমার চাই।ওটা ছাড়া সমানে আসতে পারবে না কিন্তু নিয়াজ ভাই জানে কোনটা।ওটাই চাই আমার।জলদি এসো।”
তিতির ফোন কেটে দেয়।ফোনের ওপাশে রেখে যায় এক কিংকর্তব্যবিমুঢ় পুরুষকে।বাইক চালাতে পারছে না সে।সাইট করে ফাঁকা রাস্তায়।বুকের ভিতর কেমন দ্রিমদ্রিম শব্দ হচ্ছে। তিতির কি নেশা করেছে!নাকি আবার জ্বরটর এসেছে।সজ্ঞানে তাকে নাম ধরে তুমি ডাকছে।ভাবতেই শিরদাঁড়া নেয়ে শিহরন নামলো তার।নিয়াজ জানে মানে!নিয়াজ শেখাচ্ছে এসব তারমানে। কঠিন মুখে ঈশান কল করে নিয়াজ কে।কল ওয়েটিং।মহা সমস্যয় পরলো।তবে প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মেসেজ এলো নিয়াজ এর নাম্বার থেকে। ভ্রু জোড়ার মধ্যে সরু ভাজ ফেলে দ্রুত হাতে টাইপ করলো নিয়াজকে,

___”কি ঢোকাচ্ছিস তিতিরের মাথায় তুই?”
___”আমি বাচাচ্ছি তোকে।”
___”হেয়ালি করবি না।স্ট্রেট বল।”
মার্কেটের লোকেশন দিলো নিয়াজ।
___”এখানে চলে আয়।তোর বউয়ের জন্য চুড়ি কিনে রেখেছি। নিয়ে দে ওকে।”
___”আমার টকাস পয়সা নেই?”
___”আছে কিন্তু তুই ছোটলোক। ডিভোর্সই হবে।অন্তত একটা গিফট দে মেয়েটাকে।”
___”শাট আপ। তিতির কোথায়। “
___”আয় এখানে। চুড়ি নিয়ে যা প্লাস বউয়ের লোকেশন।ঘর ভাঙতে না চাইলে দ্রুত আসতে হবে দেওয়ান বাবু।এক্স এসে বসে আছে”
ঈশান মুখ কুচকায়।লোকেশন এখান থেকে বাইকে বিশ মিনিটের পথ আরও।

___”ও আসছে আপু।খুজে পায়নি চুড়ি। একটু সময় লাগবে। “
রুষার ধৈর্যের বাধ ভেঙেছে ততক্ষণে। রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে তার।ওষুধের সময় কি হয়ে এসেছে। এসেছে বোধহয়। ব্যাস্ত হাতে ব্যাগ হাতড়ে ওষুধ বের করে খেয়ে নিলো।কেমন উদভ্রান্ত দেখাচ্ছে মেয়েটাকে। কি একটা ইনজেকশন পুশ করলো হাতের রগে।তিতির বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে।ভয় হচ্ছে সামনের মেয়েটাকে ওর।কেমন একটা সাইকোপ্যাথ লাগছে চোখমুখ। তবে দিনদুপুরে আজব ভয় পেলে চলে!চোখমুখ শক্ত করে বসে রইলো।রুষা কপট হাসলো এবার।
___”ঈশান আমার ফোন ধরলো না ক্যানো।হু?”
তিতির নির্বিকার তাকিয়ে রয়।যেনো বোঝাতে চাইছে সে কি করে জানবে।রুষার গলা এবার আগের থেকে আরেকটু ভারি শোনায়।

___”তোমার কল ধরলো আমার টা কেনো ধরলো না।”
তিতিরের মাথায় আবার কি একটা ভর করলো।রুষা জেনো কোনো জোকস শুনিয়েছে এমন ভঙ্গিতে হেসে ফেললো শব্দ করে।রুষা ঘাড় বাঁকিয়ে তাকানো।স্বাভাবিক লাগছে না তাকে একদম তিতিরের।
হাসি থামিয়ে ঝুকে এলো টেবিলের ওপর।হাত ঠেকিয়ে শীতল গলায় বললো,
___”বিয়ে করা বউয়ের সাথে বান্ধবীর তুলনা করাটা কি ঠিক আপু?
রুষা সঠিক শুনলো কি না বোঝা গেলো না।তবে তার মুখের দিকে তাকতেই রক্তশূন মুখটা দেখা গেলো।
গলায় জড়িয়ে এলো রুষার।কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,
___ক..ক..কি বললে?”
তিতির কপট মায়া দেখিয়ে হাসলো।

___”জানেন না?কেমন বন্ধু আপনার?মনোমালিন্য বোধহয় একটু বেশিই হয়েছে।না হলে বিয়ে তে দাওদাত দিলো না!”
রুষা শব্দ করে উঠে দাড়ালো চেয়ার থেকে।একপ্রকার চিৎকার করে উঠলো,
___”কে বিবাহিত? “
___”ঈশান আর আমি।জানতেন না বুঝি!”
রুষা হতবিহ্বল হয়ে তাকিয়ে আছে।আশেপাশের মানুষ অনেকেই হা করে তাকিয়ে আছে ওর এমন ঔদ্ধত্য রুপ দেখে।তিতির ব্যাস্ত হয়ে বসতে বললো রুষাকে।রুষা বসলো।ধীর গলায় বললো,
___”মজা করছো হু?”
তিতির মনে মনে বিরক্ত হয়।যাকেই বলে সেই ভাবে মজা এটা।আশ্চর্য।
___”কাবিননামা দেখাতে হবে?”
তিতির অবিশ্বাস্য কাজটা করেও ফেললো।ল ইয়ারের কাছে যাওয়ার জন্য কাবিননামার ছবিও তুলে রেখেছিলো ঝটপট তুলে ধরলো রুষার সামনে।রুষা ফোনটা হাতে নিতে গেলে তিতির পিছিয়ে ফেললো হাত।দিলো না রুষার হাতে।

___”আজ পাঁচদিন বিয়ের।নববিবাহিতা আরকি।”
রুষা হাতের মুঠোয় ধরা পানির বোতল টা।সম্ভবত ছুড়ে ফেলতে চাইছে।চোখ বন্ধ করে নিজেকে কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রণ এর চেষ্টা চলছে।তবে যতটা রিঅ্যাক্ট আশা করেছিলো কেনো জানি তার মনে হলো রুষা ততটা দেখাচ্ছে না।আচমকা তার ফোন টুটটুট শব্দ করে বন্ধ হলো।যাহ্ চার্জ শেষ!ওপাশে এবার থমকালো নিয়াজ।নিশি এসে পাশে দাড়িয়েছে কিছুক্ষণ। আচমকা তিতিরের ফোন কাটায় আতংকিত হলো সে।নিশির দিকে ফিরলো।
___”তুমি দ্রুত ওখানে যাও।আমি ঈশানকে নিয়ে আসি।মেয়েটা সাইকোপ্যাথ।রাগের মাথায় এলোমেলো কিছু করে ফেললে সমস্যা। “
নিশি রেগে যায়।
___”এতক্ষণ বলোনি কেনো।যাওনি কেনো।আশ্চর্য। “
নিয়াজ কিছু বলার আগেই ছুট দেয় নিশি।

___”আপু জানতেন না একদম?”
রুষা রক্তিম চোখ নিয়ে তাকায়।বাঁকা হেসে বলে,
___”ভুল শুনিনি তাহলে।সত্যিই বিয়েটা হয়েছে। “
তিতির যতটা অবাক হওয়া উচিত রুষার এই কথা ততটা হয়না।কারণ তার শুরু থেকেই মনে হচ্ছিলো এ মেয়ে তাকে চেনে।তাদের বিয়ের খবরটাও ভালোমতো জানে।এমনকি সেদিন যখন সে কল ধরেছিলো তার আগে থেকেই জানতো মেয়েটা।এতক্ষণ অভিনয় করছিলো।অভিনয়ে বেশ সেরা।এই সাইটে গেলে বেশ নাম কামাতে পারবে।রুপ,গুন কোনোটাই কম নয়।মুখে অবশ্য সে প্রশংসা করা থেকে নিজেকে বিরত রাখলো।

___”জানতেন তাহলে!”
রুষা আচমকা এক হাত টেনে ধরলো তিতিরের।অস্বাভাবিক শক্ত করে ধরা সে হাত।তিতির ছাড়িয়ে নিতে চাইলো রুষা ছাড়লো না।বরং কেমন একটা কন্ঠে বললো,
___”আমি তো আগে ভালোবেসেছিলাম ঈশানকে।আমার কি দোষ ছিলো তিতির?”
ভালোবাসা!তার স্বামী কে!অন্য নারী!বুকের বা পাশে ছুড়ির আঘাত করলো যেনো কথাটা।হাত টা ঝটকা টানে সরিয়ে নিলো।
___”ভালোবাসা!ধরে রাখলেন না কেনো?ছেড়ে গেলেন কেনো?”
রুষা থমকায় তিতিরের কথায়।জবাব দিতে পারেনা।তিতির অবলোকন করে সে স্থির মুখটা।মায়া হওয়া উচিত তার?কিন্তু হচ্ছে না কেনো! এ মেয়ে তার আগে ঈশানের জীবনে ছিলো। কষ্ট হয়তো এই মেয়ের বেশি হচ্ছে, একজন মেয়ে হয়ে তার সেটা উপলব্ধি করা উচিত। কিন্তু করতে ইচ্ছে হচ্ছে না তার।পাষান হতে মন চাচ্ছে।স্বার্থপর হতে মন চাচ্ছে।রুষার জবাব না পেয়ে তিতির গম্ভীর গলায় বললো,

___”আমার জন্যও একজন অপেক্ষা করতো।আমিও একজনকে কথা দিয়েছিলাম,তার বউ হবো।আপনি আমাকে এমন একটা পরিস্থিতিতে কেনো ফেললেন।আপনি ওনাকে ছেড়ে না গেলেই আমাদের বিয়েটা হতো না হয়তোবা।কেনো গেলেন?দোষ তো আমিও আপনাকে দিতে পারি।আমাকে যে চাইলো,না আমি তার হতে পারলাম।আর আমি যাকে চাইলাম না সে আমসর হলো।সমীকরণ টা জটিল না?”
রুষার চোখ বজ্রকঠিন দেখাচ্ছে।হাতের মুঠোতে এখনো বোতল খানা শক্ত করে ধরা।তিতির না চাইতেই ইমোশনাল হলো এবার।চোখে পানি জমলো।আচমকা শোনা গেলো রুষা কঠিন কন্ঠস্বর।
___”ঈশান তোমাকে ছুঁয়েছে? “
স্তম্ভিত হয়ে গেলো তিতির।কি জবাব দেবে এটার!দেওয়া উচিত বাইরের মানুষের কাছে।তারপর এ মেয়ে কি জিজ্ঞেস করবে কতটা গভীরে ছুঁয়েছে! নিজের পরিস্থিতির সাথে মেলাবে তিতিরকে?না কি করবে!তিতির সরাসরি জবাব দিলো না।
___”ছুলেই কি না ছুলেই বা কি।কলঙ্ক মুছতে পারবেন?”
এহেন ইমোশনাল কথার ধারেকাছেও গেলে না রুষা।একই একঘেয়ে কন্ঠে পুনরায় সুধালো,
___” ছুঁয়েছে?”
তিতির দীর্ঘশ্বাস নিলো।কঠিন চোখে রাখলো রুষার দিকে।চোখাচোখি দুই নারী।রুষার স্বরে তাল মিলিয়ে বললো,
___”এর জবাব আমি আপনাকে দেবো না।”
রুষা বুঝি ভয় পেলো বেশ।মুখে আতঙ্ক ফুটে উঠলো এবারে।কন্ঠ নরম শোনালো,

____”আমার বুকের ভিতর দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে তিতির জবাব দাও।”
তিতির অসহায় চোখে তাকিয়ে রইলো স্বামীর প্রাক্তনের দিকে তার বুকের ভিতর দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে! তার যাচ্ছে না!স্ত্রী হয়ে অন্য নারী তাদের বিশেষ মূহুর্তের সওয়াল জবাব করছে।তীব্র অধিকার বোধে তার কেমন লাগছে!কেউ কি টের পাচ্ছে।পাচ্ছে না হয়তো।
___”আপনি ওর প্রাক্তন। আমি ওর স্ত্রী। আমি যদি আপনাকে একই প্রশ্ন করি।আপনাকে কখনো ছুঁয়েছে?”
রুষা সম্ভবত এই প্রশ্নের আশায় ছিলো।হাতের বোতলের বাধন ঢিলে হলো।বোতলা টা আলগোছে যত্ন সহকারে টেবিলের মাঝখানে রাখলো।হেলান দিয়ে বসলো চেয়ারে।আড়াআড়ি হাত ভাজ করলো বুকের ওপর।মুখে কঠোরতা বা মলিনতা কোনোটাই নেই আর।মুখ বেশ সত্সফূর্ত দেখালো।হাসি হাসি মুখ।তিতিরের বুকটা ছ্যাত করে উঠলো।সম্ভব হলে এই প্রশ্ন টার উত্তর সে ভুলিয়ে দিতো রুষাকে।কেনো করলো এ প্রশ্ন সে!রুষা ক্রুর হেসে জবাব দিলো,
___”যদি বলি হ্যা!যতটা ভাবছো তার থেকে গভির ভাবে ছুঁয়েছে। “

তিতিরের শরীর শিথিল হয়।কেমন বলহারা হয়।মনে হয় শূন্যে আছে সে।কান ঝনঝন করে ওঠে।এতক্ষণ ধরে বুকের মধ্যে যতটুকু আশা ভরসা ছিলো শব্দ করে খানখান হয়ে গেলো যেনো।মাথা চক্কর দিলো।বমি বমি লাগছে। বমি করে দিতে পারে খুব সম্ভব। রুষা পানির বোতল এগিয়ে দিলো সহানুভূতি সরুপ।
___”তোমাদের বিয়ের দিন ও আমার সাথে ছিলো সারাদিন জানো?আমরা একসাথে…
___”চুপ করুন দয়া করে।”
___”তোমার জানা উচিত তিতির।আমাদের ভালোবাসার…
___”আমার যা জানার জেনে গেছি আমি।আপনি থামুন।দোহাই লাগে।
রুষা মুখটা মলিন করে থামে।চোখেমুখে কৃত্রিম সহানুভূতি উপচে পরছে।তিতির তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখলো সে জ্বালাময়ী রুপ।তবে পরোয়া করলো না
মনকে তৎক্ষনাৎ শক্ত করে ফেললো।বাইরের প্রকৃতির দিকে তাকিয়ে জোরে জোরে শ্বাস ফেললো।মিলেই তো গেলো সব।ঈশানের প্রথম রাতের কথা আর রুষার আজকের কথা।কোনো ভুল নেই।একদম নেই।দ্বিতীয় রাতের কথা বোধহয় তার দেহে মত্ত হতে!তাকে ওই কথায় কাবু করতে!যাতে তিতির আবেগে পরে সমর্পন করে নিজেকে!হু!হাসি পেলো তিতিরের।সেও বেশ বোকা।বিশ্বাসই করে ফেলছিলো প্রায়।বুক চিড়ে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো।ঘিন্না হলে নিজের ওপর। ঈশানের ছোঁয়া মনে পরতেই গা গুলিয়ে উঠলো।
চোখ বুঝে রইলো কিয়ৎক্ষন।শ্বাস ছেড়ে বললো,

____”বেশ,তাহলে বাকি জীবনটা আপনাকে ছুয়ে কাটানোর জন্য আমি ওনাকে মুক্তি দেবো।মুক্তি দেবো এই কাগজ কলমের দেয়াল থেকে।আমার।জীবন কলঙ্কেই সই।”
রুষার মুখে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা গেলো না।কিছু বলতে যাবে তার আগেই তিতির বললো,
___”এটা তখনই ঘটবে যখন আমি আপনার কথার সত্যতা পাবো।”
রুষা তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো এবার।
___”লজ্জা থাকা উচিত। একট মেয়ে হয়ে মেয়ের ঘর ভাঙতে এসেছো তুমি।এতকিছু শোনার পর তুমি বলছো প্রমান!কি প্রমান চাও?নুড এক্সপেক্ট করো তুমি?আমাদের বিশেষ মূহুর্তের। “
তিতিরের ঘিন্নায় নাকমুখ কুচকে আসে।কঠিন গলায় বলে,

___”নিজের মতো অতো ছোট মন মানসিকতার মেয়ে আমাকে ভাবছেন কেনো!”
রুষা ততক্ষণে দাড়িয়ে পরেছে।নিজের হুশ খুয়িয়ে হাত বাড়িয়েছে তিতিরের গালের দিকে। সেটা কোনোমতেই গালের আশেপাশে আসতে দিলো না তিতির।সন্তর্পণে হাতের কবজি চেপে ধরে।
___”বাংলা সিরিয়াল পাননি আপু।যখন তখন এসে গায়ে হাত তুলবেন।এখানে সেখানে জন্মানো আগাছা নই আমি।বাপের বাড়ি,মায়ের বাড়ির দুই অতি জৌলুশ পূর্ন পরিবারের রক্ত আমার গায়ে।রেহনুমা আরশাদ তিতির এতো সস্তা এখনো হয়নি।যে নারী বিয়ের আগেই সতিত্ব বিলিয়ে দিয়েছে সেই দাবি করে,তার হাতে চড় খাবো।নো, নেভার।ঘোর থেকে বের হন আপু।লজ্জা আপনি করুন।না নারী জাতীকে সম্মান করলেন, না তো ধর্মকে।সবদিকেই কলঙ্ক আপনি।হারাম জিনিস করে সেই পাপ নিয়ে খোদার কাছে অভিযোগ করতেও মুখে লাগাম দেবেন একটু।খোদাকে একটু তো ভয় করুন।”
ঝটকা দিয়ে সরিয়ে দিলে তিতির রুষার হাতটা।লাল নীল হয়ে গেছে মেয়েটির মুখ। অপমান বেশ জায়গা মতো লেগেছে।তিতির আবার বাঁকা হাসে।

___”আমার স্বামীর সাথে যা বোঝাপড়া তা আমি করে নেবো। আপনার কথায় আমি সিদ্ধান্ত নেবো না।বিয়ে তাকে করেছি আমি।সুতরাং কোনো তৃতীয় ব্যাক্তির কথা শোনা আমার ধাঁচে নেই। “
রুষা ফুঁসে উঠলো।
___”তৃতীয় ব্যাক্তি আমি?আমাকে আগে..
___”,এক কথা বারবার বলবেন না।লেবু বেশি কচলালে তেঁতো লাগে।জানেন বোধহয়। আশেপাশে মানুষ আছে।চিৎকার করে নিজের ভার্জিনিটি খুয়িয়েছেন বিয়ের আগে। এহেন নির্লজ্জ কথাবার্তা জাহির করবেন না।আপনার মানসম্মান না থাকতে পারে।দেওয়ান বাড়ির বড় বউ হিসেবে আমার আছে।
আর রইলো বাকি আপনার কথা।আগে কি ছিলো বা ছিলো না সে হিসেব দেখাবেন না আমাকে। আপনি হারামে ছিলেন,আমি হালাল।সুতরাং খোদা কার প্রতি সদয় হবে বোঝার কথা তো।আশা করবো নূন্যতম লজ্জা থকালে অন্যের স্বামীর দিকে চোখ তুলে তাকাবেন না।”
তিতির আর এক সেকেন্ড দাড়ায় না সেখানে।নিজের পার্স হাতে দ্রুতপায়ে বিল মিলিয়ে বের হয় সেখান থেকে।পিছনে রেখে য়ায় রাগে ক্রোধে প্রায় মূর্ছা যাওয়া এক নারী অবয়ব।

ঈশান নিয়াজকে নিয়ে যতক্ষণে এখানে পৌচছে তিতির ততক্ষণে বেড়িয়ে গেছে এখান থেকে।ভিতরে এসে রুষাকে বা তিতিরকে কাউকে দেখতে পেলো না ঈশান।দরদর করে ঘামছে ছেলেটা।নিশিকেও দেখতে পাচ্ছে না।নিয়াজ দ্রুত কল করে নিশিকে।নিশি এসেও পায়নি তিতিরকে। রুষাকে সে চেনেনা।বিধায় এখানে রুষা ছিলো কিনা বলতে পারছে না সে।সিড়ি দিয়ে নামতে যাবে তখন ব্যাস্ত হয়ে উঠতে দেখা গেলো নিশিকে।মেয়েটার চোখমুখ কেমন শুকিয়ে গেছে।সে এতক্ষণ নিয়াজের সাথে ছিলো এসব চিন্তা এক নিমিষে ভুলে গেলে ভাইকে দেখে।ঝরঝর করে।কেঁদে ফেললো।
___”ভাইয়া বার্বিকে পাচ্ছি না তো।”
ঈশানে রুহ আত্মা সব শুকিয়ে এসেছে।ব্যাস্ত হয়ে তাকালো নিয়াজ এর দিকে।
___”,তুই হেয়ালি না করে আসতে পারিস নি!”
নিয়াজের মুখও চূড়ান্ত গম্ভীর। অপরাধবোধ এ ছেয়ে গেলো।নিশির কথা তো বলতে পারলোনা।বন্ধুর দিকে অসহায় ভাবে তাকিয়ে বললো,

___”আমি শোনার পাঁচ মিনিটের মাথায় নিশিকে যেতে বলি। “
ঈশান ভ্রুজোড়া কুচকে ফেলে।নিশির দিকে তাকায়।
___”ও আলাদা ছিলো কেনো!”
নিশি চোখের পানি মুছে বারবার ওড়নাতে।মাথা নিচু করে ফেলে। ফুপিয়ে ফুপিয়ে জবাব দেয়,
___”ভাইয়া ওর মান্থলি প্রবলেম এর সময় খুব প্রবলেম হয়।মাইগ্রেন বাড়ে,পেট ব্যাথা সাথে সেন্সলেস হয়েও যায়।বমি করে ভাসিয়ে ফেলে।”
ঈশানের বুকের ভিতর ধকধক।করছ।বোনকে কঠিন গলায় বলে,
___”তাহলে বের হতে গেলি কেনো হু?”
___”আমি না করেছিলাম।ওর কিছু পারসোনাল জিনিসপত্র লাগতো।আমি বলেছিলাম আমিই নিয়ে আসবো। তোমাকেও বলতে বলেছিলাম।তা ও রাজি হলে না।মার্কেটে ঢোকার সাথে সাথে মাথা ঘুরে যায় ওর।নিয়াজ ভাইয়ের সাথে দেখা হয়।আমরা ওকে এখানে আনি।নিয়াজ ভাইয়ের পরিচিত বলে।”
চুপ করলো নিশি।কান্নার তোড়ে কথা জড়িয়ে আসছে

___”আমরা যেতে চাইনি ওকে রেখে ও তখন বেশ সুস্থ বোধ করছিলো।তখন ওর জোরাজোরিতেই যাই।ও স্বাভাবিকই ছিলো।হুট করে নিয়াজ ভাইকে কল করে রুষার ভয়েজ শোনায়। আমি বাথরুম এ ছিলাম।আমি বের হওয়া মাত্র ছুটে এসেছি আমি।এসে পাইনি।আসতে সর্বোচ্চ দশ মিনিট লেগেছে।”
ঈশান জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে।ভয়ে কাঁপছে বুকটা।রুষাকে সে এক পয়সার বিশ্বাস করতে পারেনা।
নিয়াজ বন্ধুর কাধে হাত রাখলো।ভরসার গলায় বললো,
___”সাজিদ কে জানিয়েছি আমি।ও খোঁজ করছে।বললো লাস্ট লোকেশন এখানেই।”
___”রুষা সাইকোপ্যাথ নিয়াজ
ও মেয়েটার ক্ষতি করে ফেলবে না তো?”

ঈশানের বিধস্ত কন্ঠে চমকে উঠলো নিশি, নিয়াজ দুজনেই।
নিয়াজ বন্ধুর হাত ধরে টানতে টানতে বাইরে ছুটলো,পিছন পিছন নিশি।
যোহরের আজান পরেছে আরও আধঘন্টা আগে।দেড়টা বাজে এখন।রাস্তাঘাটে নামাজ পরতে মুসল্লীদের দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।রাস্তায় ভিড়ভাট্টা বেশ কমেছে।নামাজের সময় জন্য হয়তো।এতক্ষণ ধরে এদিকসেদিক খোঁজাখুজি করছে তিতিরকে
ঈশানের মাথা রাগে দপদপ করছে।মেয়েটা সেদিনও নিখোঁজ হলো তার আগে সুন্দরমতো ফোন বন্ধ। কি ফোন চালায় চার্জ থাকেনা!রোজা রেখে পাগলের মতো ঘোরাঘুরি তে চরম ক্লান্ত দেখাচ্ছে তিনজনকে।
আচমকা কল বেজে উঠলো ঈশানের।আননোন নাম্বার। ল্যান্ড লাইন দেখাচ্ছে।এ সময় ল্যান্ডলাইনে কে ফোন করতে পারে!ধরবে না ধরবে না করে এদিক-ওদিক ব্যাস্ত হয়ে তিতিরের খোজ করে উদাস ভঙ্গিতে কল টা তুলতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসে এক মেয়েলি গলা,

___”স্যার আমাদের এখানে একজন পেশেন্ট এসেছে। অ্যাক্সিডেন্ট এর।তেমন কিছু না হলেও প্রচন্ড দূর্বল।লাস্ট নাম্বার আপনার ছিলো। আইডি কার্ড।আছে পার্সে রেহনুমা নাম।”
ঈশান উত্তেজিত হয়।জানে পানি পায় যেনো।কপালে আঙুল ঘষে একপ্রকার চিৎকার করে জবাব দেয় মহিলাকে,
___”জ্বী আমার ওয়াইফ।আপনাদের লোকেশন প্লিজ।একটু দ্রুত বলুন।”
___“স্যার সিটি হসপিটাল।”
নিয়াজকে নিশির দিকে ঈশারা করে নিজে ছুট লাগায় নিজের রয়েল এনফিল্ড খানা নিয়ে।নিয়াজ গাড়ি আনেনি। নিশি,তিতিরের রিকশায় ঘুরতে চাওয়ার বায়নায়।দ্রুত সিএনজি দাড় করিয়ে নিশিকে নিয়ে উঠে বসে।
সিটি হসপিটাল খুব একটা দূরে নয় এখান থেকে।মিনিট দশেক।এর মধ্যে পৌছুলো ঈশান।উন্মাদের মতো ছুটে পৌছুলো পাঁচ নাম্বার ফ্লোরে।তিতিরের জ্ঞান ফেরেনি।ডাক্তার ঈশানকে দেখে একগাল হাসলো।অবাক হলো সম্ভবত। ততক্ষণে হন্তদন্ত নিয়াজ এবং নিশিও এসে পৌছেছে।ঈশানের পাশে নিয়াজকে দেখে হাসির প্রসার আর বাড়লো।ওরাও অবাক হলো বইকি।নিশি নেমপ্লেটে খেয়াল করলো গোটা গোটা ‘অক্ষরে লেখা ড. রিয়াদ।

___”লং টাইম নো সি হাহ?”
ঈশান হাসতে চেষ্টা করলো পুরানো বন্ধু রিয়াদ তার।বহু বছর পর দেখা হলো।অন্যসময় হলে উচ্ছসিত হতো সে এবং নিয়াজ।তবে এই মূহুর্তে কারোরই সে মনমানসিকতা নেই।তিনজনই ব্যাস্ত হয়ে তিতিরকে খুঁজতে ব্যাস্ত।
ঈশান হা মিলিয়ে অস্থির গলায় বললো,
___”রেহনুমা হেলাল?”
ড.রিয়াদ মাথা নাড়ে।
___”রুম ১০৭ এ।তোরা…”
___”আমার কাজিন।”
নিয়াজ, নিশি থমকায়।ঈশান বউ পরিচয় দিলো না!কাজিন বললো!এই মূহুর্তে সেটা নিয়ে জল ঘোলা করলো না।ড. রিয়াদ সম্ভবত খুশিই হলো।রিসেপশনিস্ট মেয়েটা ভুল শুনেছিলো তাহলে।মেয়েটা ম্যারেড নয়।
ইশারা করলো তার সাথে আসার।ঈশান ব্যাস্ত পায়ে এগোলো সেদিকে।তিতিরের জ্ঞান ফেরেনি।রাস্তায় বাইকের সমানে পরে মেয়েটা।বাইকার খুব সাহসের সাথে থামিয়ে ফেলে।তবে হালকা চোট পেয়েছে।সাথে শরীর দুর্বল থাকায় সেন্স লেস।

___”আ…ঈশান মেয়েটা বেশ উইক।অ্যানিমিয়া আছে প্রচন্ড রকমের।হিমোগ্লোবিন খুব কম।সাথে পিরিয়ড চলছে।মেইবি মেন্টাল ট্রমা যাচ্ছে।একটু দেখে শুনে রাখবি ওকে।”
ঈশান কাতর চোখে দেখে এলোমেলো চুলের পরে থাকা মেয়েটাকে।নিশি গিয়ে ততক্ষণে বোনকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছে।আরও টুকটাক কথা বলে বেড়িয়ে গেলো ডাক্তার।নিয়াজ এবার ধরলো ঈশানকে।
___”ও তোর কাজিন?”
___”তুই নিশিকে নিয়ে আমার বাইকে আয়।আমি ওকে সিএনজি তে নিয়ে যাই।”
___”আমার কথার জবাব দে তুই।”
ঈশান বিরক্ত মুখে বলে।
___”আগেই এত মানুষ কে জানাতে চাচ্ছি না আমি।রুষা কে চিনিস তোরা।রুষা এর আগে দুনিয়াদারি জানিয়েছিলো ও আমার গার্লফ্রেন্ড। ফ্রেন্ড সার্কেলের কারোর জানতে বাকি নেই।এখন বিয়ে করেছি তিতিরকে। রিয়াদ রা সুবিধার না জানিস তুই।ঝামেলা করতে ওস্তাদ। রুষা মানসিক রুগী।ওকে এসব বলে ক্ষেপিয়ে তোলার মানে আছে?আজ তিতিরকে ও যে কিছু করে ফেলেনি আল্লাহর কাছে হাজার হাজার শুকরিয়া।ওকে সুস্থ রাখতে,হেফাজতে রাখতে দুনিয়া থেকে আড়ালে রাখলে ক্ষতি কি।”
নিয়াজ সন্তোষ প্রকাশ করে ঈশানের যুক্তিতে।সত্যি বলেছে সে।রুষাকে যত মানুষ ঈশানের সাথে বিচ্ছেদ বা তিতিরের সাথে বিয়ের কথা জিজ্ঞেস করবে মেয়েটা তত মানসিক ভাবে ভয়ংকর হবে।তখন তিতিরের ক্ষতি করতে হাত ধুয়ে পরবে।

দেওয়ান বাড়িতে সবার মুখে চিন্তার ভাজ। দুপুরের পরপর তিতিকে জ্ঞান হারা অবস্থায় নিয়ে এসেছে ঈশানে।দরজা খুলে তিতিরকে ঈশানের কোলে এমন অবস্থায় দেখে চিৎকার চেচামেচি পরে গেছে গোটা বাড়িতে।চন্দ্রা দেওয়ান ওপরে যেতে পারছেন না নাতনির কাছে সিড়ি ভেঙে।অনবরত দোয়া পরে যাচ্ছেন এখান থেকে।গিন্নিরা পরপর এসে দেখে যাচ্ছেন মেয়েকে।রাইসুল দেওয়ান রা তিন ভাই অফিস থেকে ছুটে এসেছেন।ঈশান গম্ভীর মুখে শাওয়ার নিয়ে বের হলো।ঘরের মধ্যে প্রচন্ড ভিড়।একেরপর এক সবাই এসে ভিড় করছে।এই যেমন এখন ভাইবোনগুলো সবকটা এসে মরা কান্না জুড়েছে।ঈশান বিরক্ত চোখে সবকটাতে পরখ করে জোরেশেরে ধমক লাগালো।
___”পেশেন্ট এর পাশে এ কারনেই মানুষ জন থাকতে নিষেধ করে।তোদের কান্নার ঠ্যালায় পেশেন্ট নিজে কনফিউশান এ পরবে সে আদৌ বেচে আছে কি না।বের হ। “
ভাইয়ের ধমকে গুটিগুটি পায়ে বের হয় সবাই।ঈশান দরজার ছিটকিনি আটকে এসে বসে তিতিরের পাশে।ঠোঁটের পাশ টা কেটে গেছে।রক্ত জমাট বেধে আছে।হাত বাড়িয়ে বৃদ্ধাঙ্গুলি স্লাইট করলো নরম গোলাপি অধরের ওপর।
___”আমাকে মেরে ফেলবি তুই তিতির।মেরেই ফেলবি।পরপর দু দুটো দিন এরকম ভয় পায়িয়ে দিয়েছিস।তোকে হারানোর ভয়ে তো অর্ধেক আয়ুই বোধহয় কমে গেছে আমার।”

উঠে গিয়ে লক করা তার পারসোনাল ড্রয়ার থেকে কিছু একটা বের করলো।হাতের জিনিসট ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পরখ করলো।তিতিরের দিকেও তাকালো একবার।দীর্ঘশ্বাস ফেললো।হাতের জিনিসটা আলগোছে শার্টের নিচে প্যান্টের পিছনে গুঁজে ফেললো।গায়ে শার্ট জড়িয়ে বাইকের চাবি নিয়ে বের হয়।নিচে নামতেই দেখা হয় সবার সাথে। বাড়িসুদ্ধ সকলেই বসা ড্রয়িং এ।ঈশান কে অসময়ে ফিটফাট হয়ে বাইরে যেতে দেখে ভ্রু কপালে তোলে সকলে।রাইসুল দেওয়া ভীষন গম্ভীর গলায় একপ্রকার ধমকে ওঠে ছেলেকে।
___”মেয়ে টা অসুস্থ।জ্ঞান ফেরেনি এখনো।ওর কাছে থাকবে তা না।কোথায় যাচ্ছো!”
ঈশান শার্টের হাতা ধীরেসুস্থে ফোল্ড করে।বাবার দিকে না তাকিয়েই জবাব দেয়,
___”ইম্পরট্যান্ট কাজ আছে।ইফতার করে নিয়ো।রাত হবে ফিরতে।”
কাউকে কিছু বলার সুযোগই দিলো না আর ঈশান।দ্রুত পায়ে বেড়িয়ে গেলো।

প্রথম ইফতারে বাড়ির বড় ছেলে বাড়ি নেই।রাগে গজগজ করছেল রাইসুল দেওয়ান।ছেলের ফোন বন্ধ। তিতিরের জ্ঞান ফিরেছে ঈশান বেড়িয়ে যাওয়ার খানিক পরেই।নিশি,নূরি পাশেই ছিলো সবসময়। নিচে নামতে বারন করা সত্ত্বেও দূর্বল শরীর নিয়ে নেমেছে।এ বাড়িতে প্রথম ইফতার সবাই একসাথেই করে।দু চোখ লুকিয়ে খুজলো কাঙ্ক্ষিত মানুষ টাকে দেখতে পেলো না।তবে জিজ্ঞেস করলো না কাউকে।রাইসুল দেওয়ান তিতিরকে নিজের পাশে নিয়ে বসলেন।
___”এখন ঠিক লাগছে মা?”
মাথা ঝাকায় সে। তবে মোটেই ঠিক লাগছে না।পিরিয়ড এর ব্লিডিং বন্ধ হওয়ায় পেইন আপাতত নেই। তবে মাথার অসহ্য ব্যাথাটা আছে।তবে প্রকাশ করেনা।এমনিই তাকে নিয়ে অশান্তির শেষ নেই।রাইসুল সাহেব নয়নের দিকে ফেরে।সে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে তিতিরের দিকে।
___”তোমার ভাইকে পেয়েছো কলে?”
নয়ন মাথা নাড়ে।
___”অপেক্ষা করতে না করেছে।রাতেও খেয়ে ফিরবে।”
তিতির এর বুকটা আচমকা হু হু করে ওঠে
তার এ অবস্থা সত্ত্বেও বাইরে গেছে ঈশান!কি কাজ হতে পারে বাইরে আজকেও।অজানা আশঙ্কায় ভরে ওঠে মনটা।রুষার কাছে যেতে পারেকি?মান অভিমান ভাঙাতে!তা কি করে হয়।মনে মনে ধমকায় নিজেকে।অসম্ভব ও তো নয়।

তিতিরের অসহ্য মাথা ব্যাথা এখন বেশ কমেছে।রাহেলা এতক্ষণ তেল মালিশ করে গেলেন মেয়ের মাথায়।তিতির নিজের ঘরে এসেছে।এবার আচমকা পাঁচদিনেই পিরিয়ড ঠিক হয়েছে তার।এটা নিয়ে অবশ্য সে মহাখুশি। মাথা ব্যাথাটাও কমে এসেছে।শাওয়ার নেবে সে।সারাদিন এর ক্লান্তিতে গা চটচট করছে কেমন একটা।রাতের ডিনার সেরে বেশ সময় নিয়ে শাওয়ার নিয়ে বের হলো সে।বিছানার দিকে তাকিয়ে চোখ কপালে উঠলো।ঈশান বসে আছে।ধ্যান অবশ্য ফোন স্ক্রিনে। এইয়ে সমস্যায় পরলো।তার ঘরে এই সময়ে কেউ আসতো না।এ বাড়ির পুরুষ মানুষ রা তো জীবনে দরজায় নক না করে ঘরে ঢোকে না।কক্ষনো না।শুধু মাত্র এই অসভ্য লোকটা বাদে।তিতির যথারীতি জামাকাপড় নিয়ে ঢোকেনি তোয়ালে পেচানো।ঈশান একনজর দেখলো তিতিরকে।মন দিলো ফোনে।ক্যাটক্যাটে গলায় বললো,

___”এমন চুপসে দাড়িয়ে আছিস কেনো।এমন না তো দেখিনি!আর ও অনেক কিছুই দেখেছি।জামাকাপড় পরে ঘরে চল।”
তিতির কাচুমাচু করে বেড়িয়ে আলনার ওপর থেকে সুতি ওরনা সরিয়ে পেচায়। আলমারি খুলে দ্রুত হাতে জামাকাপড় নিয়ে বাথরুমে ঢোকে।বের হয় কিছুক্ষণ এর মধ্যে। ঈশান যথারীতি বসা সেখানেই।অসহ্য কর একটা।
তিতির মুখ বাকায়।
___”আপনাকে আর কতবার বললে আপনি দরজা নক করে ঢুকবেন?রাফির যে সেন্স আছে আপনার মধ্যে সেটাও নেই।”
ঈশান বোধহয় অবাক হলো বেশ।অবাক কন্ঠেই বললে,
___”বউ টা তো তুই ওদের নোস।ওরা তো নক করবেই।”
তিতির হতভম্ব হয়।মাঝেসাঝে ঈশানের হুটহাট কথাগুলো চমকে দেয় তাকে।চিরাচরিত গম্ভীর ঈশানের সাথে এহেন হেয়ালি যায়না একদম।

___”আপনি প্লিজ ঘরে যান।আমার শরীরটা ভালো লাগছে না।কথা বলার মুড নেই.”
ঈশান বিনাবাক্যে উঠে আসে বিছানা থেকে।তিতির হাফ ছাড়তে ছাড়তে চিৎকার করে ওঠে হঠাৎ। সে শূন্যে ভাসছে।ঈশান আলগোছে পাঁজা কোলে তুলে নিয়েছে তাকে।তিতিরের চিৎকার এ তপ্ত নজর দিলো তার দিকে।
___”আর একবার চিৎকার করলে মুখ বন্ধ করাবো কিন্তু।
কথাটা বলেছে ঈশান তিতিরের ঠোঁটের দিকে ইশারা করে।তিতির দু হাতে মুখ চাপা দেয়।
___”এই ঘরে এসে কি সিনক্রিয়েট করতে চাস রোজরোজ।একবার বাড়ির সবার চোখে পরুক সেটা চাস!”
তিতির কথা বলে না।অসহ্যকর পুরুষ একটা।ঈশান পায়ের সাহায্য দরজা খুলে নিজে আসে নিজের রুমে।তিতিরকে বিছানায় শুয়িয়ে শব্দ করে বন্ধ করে দরজা।
___”তোর পিরিয়ড ঠিক হয়েছে?”
___”হু…”
মুখ ফসকে বলে ফেলে চোখ বড় বড় করে ফেলে মেয়েটা।সর্বনাশ করেছে।ঈশানই বা এই কথা জিজ্ঞেস করলো কেনো।গলা শুকিয়ে কাঠ হলো।এমনিতেই ঈশানের সমানে এলে তার দিনদুনিয়া কাপে।
ঈশান নিজের শার্ট খুলতে খুলতে এগিয়ে এলো তার দিকে।তিতির এলোমেলো দৃষ্টি এদিক সেদিকে সরাতে ব্যাস্ত।আমতা আমতা করে বললো,

___”ঠ..ঠ..ঠিক হয়নি পিরিয়ড।ঠিক হয়নি।”
___”চেক করি?”
মাথায় আকাশ ভেঙে পরলো তিতিরের।এ কি ধরনের বেলাল্লাপনা কথা বার্তা।দু হাতে ঈশানের উন্মুক্ত বুকে ধাক্কা দিয়ে সরে এলে বিছানা থেকে।মেজাজ খারাপ হলো তার।লোকটার কাছে একপ্রকার আতঙ্ক নিয়ে আসতে হয় তার।অসহ্যকর অনূভুতি। ক্রমাগত অসম্মান করে তাকে লোকটা।কান্না পেলো তিতিরের।কেমন কেঁপে উঠলো শরীর বিতৃষ্ণায়।
সোফায় এসে বসলো পা গুটিয়ে। ঈশান ততক্ষণে উদাম শরীর নিয়ে উপুড় হয়ে শুয়ে পরেছে সফেদ বিছানায়।তিতির না চাইতেও দেখলো।দু হাত বালিশের ওপরের দিকে দেওয়া। পিঠে প্রজাপতির ন্যায় কারুকার্য ফুটে উঠেছে।যথারীতি কোমড়ের ট্রাউজার নামতে নামতে বিপদসীমার কিনারায়।তিতির বিরক্ত সূচক শব্দ করে অন্য দিকে ফেরে।ঈশান আবার সোজা হয়েছে ততক্ষণে। পরখ করে তিতির এর অস্থির মনোভাব।মাথার নিচে দু হাত ভাজ করে দিয়ে শোয় সে।

___”তাকা এদিকে। “
তিতির তাকায় না।
___”বলুন।”
___”তাকাতে বলেছি।”
তিতির হতাশ চোখে তাকায়।হার্টবিট মিস হলো তার।মাথার মধ্যে কেথা থেকে এসে হানা দিলো হাজার একটা দুষ্ট পচা পচা চিন্তা।ঈশান চিত হয়ে সোয়া।নগ্ন পুরো ওপরের অংশ।লোমহীন ফর্শা বুক কেমন তেল চিকচিক করছে।পেটের কাছে সিক্সপ্যাকের ছাপ স্পষ্ট। ট্রাউজার কোমড় থেকে বেশ নিচে।ছয় খন্ডের শিল্পীর কারুকাজ নিচের দিকে ভি শেপ হয়ে নেমে গেছে।ইশারা করছে কিছু একটা।তিতির টেনেহিচড়ে দৃষ্টি সরায়।
___”আপনি দয়া করে ভদ্র হয়ে ঘুমাবেন।”
ঈশানের মুখে বিদ্রুপ এর হাসি ফোটে যেনো।
হাস্কিস্বরে বলে,

___”এখানে অভদ্রতার কি দেখলি?আমি ভদ্র নই?”
তিতির ভুলেও তাকচ্ছে না ঈশানের দিকে।বাঁকা হয়ে বসেছে।
___”জামাকাপড় পরে তারপর সোজা হয়ে শুতে।কি সমস্যা? প্যান্ট তো এ জীবনে ওপরের দিকে দেখলাম না।আরেকটু তুলতে কি সমস্যা? ইশশশ সব দেখাই যাচ্ছে।”
রাগ করবে নাকি হাসবে বুঝতে পারলো না ঈশান।মেয়েটাকে ইচ্ছে করে খেপাচ্ছে সে।রুষার কথা সরাসরি জিজ্ঞেস করে মানসিক প্রেশার দিতে চাচ্ছেনা।তবে মনোভাব বুঝতে চেষ্টা করছে।আড়মোড়া ভাঙলো আকর্ষণীয় ভঙি করে।হাস্কিস্বরে বললো,
___”আমার ঘর,আমার বিছানা,আমার শরীর আমি কিভাবে শুবো তোর থেকে শিখতে হবে?”
তিতির মুখ বাকায়। অসহ্য লাগছে এখন তার।রুষার কথা গুলে ঘুরপাক খায় এ লোক তার সামনে আসলে।প্রমান না পাওয়া পর্যন্ত শান্ত হবে না তার মন।তবে কেনো যেনো তার দৃঢ় বিশ্বাস ওই মেয়ে কিছু একটা মিথ্যা নিশ্চিত বলছে।তার অবচেতন মন তাকে জানাচ্ছে সে কথা।তিতির বিরবির করলো এবারে,

___”অভদ্র কি সাধে বলি!”
ঈশান স্পষ্ট শুনলো সেটা।বিছানা ছেড়ে উঠে বসতেই আতঙ্কিত হলো তিতির।নিজের রুমে নিশ্চিন্তে অন্ততঃ ঘুমানো যায়।এ ঘরে এর লোকের সাথে থাকলে না এই লোককে ভরসা করে আর না তো নিজের বেহায়া শরীর,মন কে ভরসা করতে পারে।
তিতির গুটিসুটি মেরে ততক্ষণে জায়গা করে নিয়েছে সোফাতে।এক বিছানায় অসম্ভব।
___” এত বড় বিছানা সোফায় শুচ্ছিস কেনো!”
ঈশানের প্রশ্নের জবাবে কাটকাট গলায় বললো,
___”আমার ইচ্ছে।”
___”বাংলা সিরিয়াল দেখে শিখেছিস এসব।বেডে আয়।কুইক।”
___”আপনার সমস্যা টা কোথায় বুঝতে পারছি না আমি।আপনি ভালোমতো ঘুমান গিয়ে।আমাকে টানাহেঁচড়ার মানে কি!”
___”নাটক কম করে বিছানায় আয়।ঘুমাবো।”
তার বিছানার যাওয়ার সাথে ওনার ঘুমের কি সম্পর্ক বুঝলো না তিতির।
___”অসহ্যকর একটা পুরুষ আপনি ঈশান ভাই।ক্ষনে ক্ষনে রঙ পাল্টান।”
ভাই ডাকটা অসহ্য লাগে আজকাল ঈশানের।কঠিন গলায় বললো,
___”আমার সেই রঙে রঙিন হতে না চাইলে দ্রুত আয়। আর বলতে যেনো না হয়।আর একবার বলতে হলে চোখের সামনে খালি লাল রঙ দেখাবো।”
তিতির ঠোট উল্টে প্রশ্ন করে,

___”অন্য রঙে কি সমস্যা…”
ঈশান ঘুরে বিছানার দিকেই যাচ্ছিলো।তিতিরের প্রশ্নের জবাবে থমকে দাড়িয়ে ঘাড় বাকায়।কেমন একটা অশ্লীল হাসি দেয়,হাস্কিস্বরে গেয়ে ওঠে,
All I see is red, red oh red
Now all I see is…
তিতিরের হাত পা সিটিয়ে আসে।এই মুভি ঈশান ভাইও দেখেছে।গা রি রি করে ওঠে শিহরনে।কোনোমতে বলে ওঠে,
___”ছিহ্ অশ্লীল। এসব মুভিজ দেখেন আপনি! অসভ্য…”
ঈশান বিছানার কাছে গিয়ে ফিরে আসে আবার।গাল চেপে চোখ চোখ মেলায়।
___”মুভি টা ভালো না বুঝি?তা তুই না দেখলে জানলি কিভাবে হুম?একা আমি অশ্লীল? এখন জবাব দে।”
তিতিরের শরীর কাপে ঈশানের শরীরের ঘ্রানে।চোখ বুজে থাকে।ঈশান গভীর দৃষ্টিতে পরখ করে বউ নামক নারীটির তিরতির করে কাঁপতে থাকা ঠোঁট, চোখের পাপড়ি। ঠোঁট দাবিয়ে চুমু খেতে নিশপিশ করছে নিজের অধরজোড়া।তবে তা করবে না সে।নিজ থেকে তিতির অনুমতি না দিলে এহেন কর্মকাণ্ড ঘটানো সম্ভব নয় তার।নিঃশব্দ হাসে।কানের কাছে মুখ নিয়ে হাস্কিস্বরে বলে,

___”আয় মুভিটা দেখি।ভুলে গেছি আমি।”
তিতির ভূত দেখার মতো বড় বড় করে ফেলে চোখ।ছিটকে সরে যেতে চায়।ঈশান ততক্ষণে বন্দি করে এনে বসিয়েছে নিজের।কোলের ওপর।এক হাতে কোমড়ে টেনে নিজের সাথে মিশিয়ে অন্য হাতে ল্যাপটপ টা সেট করে সামনে বালিশ রেখে।তিতির ছটফট করছে সরে যেতে।কোলের ওপর বসে থাকত হবে কেনো।সম্ভব না কি!লোকটা পাগল এক নাম্বার এর।পাগল না সেয়ানা পাগল।
___”আমি এসব দেখবো না। ছাড়ুন।”
___”আমি দেখি বলে তো অশ্লীল বললি।এমন আনরোমান্টিক বউ দিয়ে জীবন চলবে কি করে আমার।”
___”আমি আনরেমান্টিকই ভালো।ছাড়ুন। “
___”আমার চলবে না।ঈশান আরশাদ এর বউকে চরম রোমান্টিক হতে হবে।দু একটা খাট না ভাঙলে কিসের রোমান্টিক আবার।”
কেউ বোধহয় ইলেকট্রনিক শক দিচ্ছে বারবার তিতিরকে।লোকটা এতো ঠোঁট কাটা কল্পনা তেও ভাবেনি আগে।গম্ভীর মুখের আড়ালে এমন বেহায়াপনা।

___”ছাড়বেন?”
ঈশানের তিতিরের পেটের ওপর খামচে ধরে রাখা হাতের চাপ দ্বিগুণ দৃঢ় করে।নিঃশ্বাস বন্ধ করে ফেলে তিতির এবারে।শ্বাস আটকে আসছে।ঈশান মুখ ডুবায় তিতিরের ভেজা চুলে।প্রান ভরে নেশাখোর এর মতো শ্বাস টানে।নাক ঘষে চুলের ওপর দিয়েই।তিতির খামচে ধরে ঈশানের উরু।ঈশান এর মুখে হাসি নেই এখন আর।বুকটা জ্বলছে।
___”আর নড়াচড়া করলে হাত টা পেট থেকে ওপরে উঠবে বলে দিলাম।”
মূহুর্তে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে চুপ হয়ে যায় তিতির।ছটফটে ভাব কমে।
___”স্বাভাবিক ভাবে শ্বাস নে।এক হয় বন্ধ করে ফেলিস নয়তো এমন ভাবে শ্বাস টানিস আমার শ্বাস আটকে আসে।স্বাভাবিক থাকতে পারিস না?দোষ তো দিস বরাবর আমার।আমাকে সিডিউস করে টা কে শুনি?”
তিতিরের মাথায় হাত।বলে কি!সে সিডিউস করে! প্রথম রাতে না হয় জ্বরের ঘোরে ভুল করে ফেলেছিলো।বাকিদিনও অ্যাক্সিডেন্টলি ভুলের ওপরই।তারও বা দোষ কোথায়।

সাঁঝের মায়া পর্ব ২৬ (২)

___”আমি মোটেই আপনাকে স..স..সিডিউস করিনা।”
___”তাহলে কি আমাকে দেখে সিডিউস হোস।”
কথার জালে ফাসানোর ধান্দা শুধু।
___”ম..মোটেই না।আপনার কনট্রোল নেই।
ঈশান বাঁকা হাসে।জামা গলিয়ে হাত রাখে নরম নগ্ন পেটে।শীতল হাতের স্পর্শে ঝাঁকি দিয়ে ওঠে শরীর।
___”মুভি টা দেখবো।তারপর দেখবো কে কন্ট্রোল হারায় ওকে।ঠিক যেমন আছিস পুরো মুভি এই পজিশন এই থাকতে হবে।রাজি?
তিতিরের ইচ্ছে করছে এখনই হার মেনে নিতে।সে খুব ভয়ংকর পজিশনে আছে।একদম ঈশানের ওপর।অস্বাভাবিক হৃদস্পন্দন বাড়ছে তার।

সাঁঝের মায়া পর্ব ২৮