সাঁঝের মায়া পর্ব ২
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
দিনের আলো নিভেছে অনেক আগেই।দেওয়ান বাড়ির আশেপাশে আজ প্রতিদিন এর থেকে বেশি আলো ঝলমল করছে।এই অসময়েও বাড়ির সব কর্তা,ছেলেমেয়েরা আজ যার যার কর্মস্থল থেকে নীড়ে ফিরে এসেছে।বাড়ির গিন্নিরা সারাটা দিন নানা আয়োজনে ব্যাস্ত ছিলেন।চন্দ্রকানন আজ বাড়ির বড় ছেলের আগমনের অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে।কারোর অপেক্ষা যেনো ফুরাচ্ছেই না।ভাইবোন গুলো এতোদিন পর বড় ভাই আসবে সাথে তাদের নতুন হবু ভাবিকে সাথে নিয়ে,হৈ চৈ করে বাড়ি মাথায় তুলছে। কর্তারাও তাই,কাজ কর্মের ব্যাস্ততাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাসায় এসে বসে রয়েছেন।তিন ভাই মিলে শশুর হওয়ার জন্য কেমন হতে হবে এই নিয়ে মশকরায় মেতেছেন।
তবে এই অতি আনন্দের মাঝেও নেই শুধু দুইজন। চন্দ্রা দেওয়ান আর তিতির। তিতির হোস্টেল থেকে আসতে পারেনি। আর এদিকে চন্দ্রা দেওয়ান সকালে সেই যে এসেছে,ঘর থেকেও বের হননি তিনি।বয়স হওয়াতে তার ঘর নিচতলাতেই।তবে বরাবরই খাওয়ার টেবিলে সবার সাথে আহার করেন তিনি,এটা তার গোটা জীবনের নিয়ম,নড়চড় হতে দেখেনি কেউ স্বজ্ঞানে।
তবে আজ তার ব্যাতিক্রম।সারাদিন খাবার,বা কোনো প্রয়োজন এ সে একবারও ঘরের বাহিরে আসলেন না,আর না তো কেউ ঘরে গেলে ভালোমতো কথা বললেন।এ নিয়ে সবারই চিন্তা আছেই,তবে তিনি স্পষ্ট বলে দিয়েছেন তিনি সুস্থ আছেন,তার কিচ্ছু হয়নি,সামান্য বিষয় নিয়ে মাতামাতি না করে যা নিয়ে সবাই ব্যস্ত ছিলেন সেটায় মন দিতে…সবাই একপ্রকার অনিচ্ছা স্বত্তেও আর ওনাকে ডাকাডাকি করেননি…
আগামীকাল ইংরেজি পরীক্ষা। তিতির সেই দুপুরের খাবার খেয়েই পড়ার টেবিলে বসেছে।টানা পড়ে এখন কোমড়,পিঠ ব্যাথা করছে।টেবিল ছেড়ে উঠে ফোন চার্জ থেকে খুলে চালু করে।বাড়ি থেকে অসংখ্য কল…
তিন মামা,বড় মামণী,নিশি আপু,নূরি আপু তাছাড়া নানুআপুর ফোন তো আছেই… এক-এক করে সবার সাথে কথা বলা শেষ করে সর্বশেষ ডায়াল করলেন চন্দ্রা দেওয়ান এর নাম্বার এ।তার নানুআপু যে এতো সহজে ফোন রাখবে না তা সে খুব ভালো করে জানে।
কয়েকবার রিং হতেই ফোন রিসিভ হলো।ওপাশ থেকে দারুন গম্ভীর গলা শুনে তিতির একটু হতচকিত হলো।
স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করলো
-নানু আপু?কেমন আছো?
-আলহামদুলিল্লাহ নানু। কেমন আছো তুমি।
-আমি ভালো আছি নানুআপু।তোমার কি শরীর খারাপ?কন্ঠ এমন শোনাচ্ছে কেনো তোমার?
চন্দ্রা দেওয়ান চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ, দম নিয়ে বলে,
-আমার কিছু হয়নি নানু।তুমি বাসায় আসলে না আজকে? সবাই কতোবার তোমাকে আসতে বললে,তুমি ছাড়া বাসায় কোনো কিছু হয়?ভালো লাগে কারোর…
তিতির এপাশ থেকে মুচকি হাসে,সে বোঝে তার নানুআপুর মন খারাপ এর কারণ,সে তো তার নয়নের মণি,শুধু তার নয় গোটা দেওয়ান পরিবার এর নয়নের মণি সে।মামা রা, মামণী রা,ভাই বোনেরা।পাগলের মতো ভালোবাসে তাকে।বাবা মা নেই এক সেকেন্ড এর জন্য বুঝতে দেয়না কেউ।
নানুকে আশ্বাস দিয়ে বলে
-আমার আর ৪ টা পরীক্ষা বাদ আছে নানুআপু।শেষ হলেই আমি সেদিনই বাড়ি ফিরবো,তুমি আবার আমার ভাগের সব খেয়ে শেষ করে রেখো না,দাঁত নেই একটাও,তাও তো আমার ভাগের জিনিস তোমার চাই চাই..
চন্দ্রা দেওয়ান অন্য সময় হলে নিজেও নাতনির সাথে ঠাট্টা মশকরার মজলিস জমিয়ে ফেলতেন।আজ তা করলেন না।বরং শান্ত গলায় বললেন।তাড়াতাড়ি ফিরো নানু,তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছে…
তিতির এর মন খারাপ হয়ে যায়।নানুর গলা আজ দারুণ অসহায় শোনাচ্ছে।ফোন রেখে বারান্দায় এসে দাড়ায়।আকাশে তারা ঝলমল করছে।ইয়া বড় একটা চাঁদ দেখা যাচ্ছে।আজ কি পূর্নিমা!হবে হয়তো…
-রুষা।কেথায় তুমি।আজ সকালে বেরোবার কথা ছিলো।এখন সন্ধ্যা ৭ টা।ইউ নো আমি এতো কাহিনি পছন্দ করি না।বাসায় না জানালে আমি এতো কিছু মোটেও টলারেট করতাম না…
ফোনের ওপাশ থেকে জবাব আসে না।রুষা চুপ করে আছে।মেয়েটার এই এক সমস্যা। ধমক দিলে এমন চুপ করে থাকে।ইশান বিরক্ত হয়…
-আর ইউ দেয়ার রুষা!চুপ করে আছো কেনো!
-ইশান।আমি যেতে পারবনা।মা বাড়ি থেকে কল করেছিলেন,বাবার শরীরটা ভালো না।আমাকে বাড়িতে রওনা দিতে হবে। ভাইয়া নিতে আসছে।তোমাকে বলার সাহস পাচ্ছিলাম না…
-হোয়াট ননসেন্স। সাহস পাচ্ছিলে না মানে কি রুষা!
– এইতো তুমি রেগে যাচ্ছো।এটা জন্যই..।
ইশান এবার সত্যি রেগে যায়।
-উহু আমি তোমার আমার সাথে না যাওয়ার জন্য রাগ করছি না আমি।আমাকে ভরসা করে সমস্যা টার কথা না বলার জন্য রাগ করছি।তোমার ভাইকে আসতে হতো না।আমি তোমাকে বাড়ি পৌছে দিতাম।ইট’স ওকে।সাবধানে যেয়ো…
ইশান ফোন ছুড়ে দেয় বিছানার দিকে..মেজাজ খারাপ হচ্ছে তার।বাড়িতে সবাই আশা করে বসে আছে।সবার মনটা খারাপ হবে। এসব কারণেই সে এসব সম্পর্কে্,বিয়েশাদি অপছন্দ করতো সে…
রুষার সাথে সম্পর্কটা টক্সিক একটা সম্পর্ক…দোষ তার নাকি মেয়েটার বুঝে উঠতে পারেনা,যদিও বারবারই সে দোষ নিজেকেই দেয়,সম্পর্কে জড়ানোটা তার সিদ্ধান্ত একদম ছিলো না।বলা যায় রুষার পাগলামির জন্য সম্পর্কে জড়ানো,বরাবরই নিজের গুড লুক,আলফা ক্যারেকটার এর জন্য কলেজ ভার্সিটির সব মেয়ের হার্টথ্রব ছিলো ইশান আরশাদ দেওয়ান…
রুষা মেয়েটাও তার ব্যাচমেট,সুন্দরী, বুদ্ধিমতী, মেধাবী একটা মেয়ে।রুষা সে একই স্টাডি গ্রুপ এ ছিলো।রুষাই প্রথম দিন থেকে পাগল ছিলো ইশান এর জন্য। আর বাকি পাঁচটা মেয়ের মতোই।
তবে মেয়েটা যথেষ্ট ভদ্র, মার্জিত হওয়া বলা বাহুল্য তার প্রতি ইশান এর একট সফট কর্ণার ছিলো।তবে সম্পর্ক,ভালোবাসা এসব তার কখনো মনে আসেনি বোধহয়।তবে রুষা কে একটা বাজে পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতে তাদের সম্পর্কের একটা নাম দেওয়া! ভেবেছিলো ঝামেলা শেষ হলে রুষাও বুঝে যাবে ইশানের মনে ভালোবাসা নেই,বা শুধু পরিস্থিতিতে পরেই কাপল হওয়া,তখন ঠিক হয়ে যাবে সবটা।তবে সেটা হয়নি আর।রুষাই ছাড়েনি তাকে কখনো।
একটা সময় পর ভালোবাসা তৈরি হয়ে গেছে বোধহয়,নাকি হয়নি সে আজও বুঝে ওঠে না।তবে আর দশটা সম্পর্কের মতো বোধহয় কখনো ফিল করেনি ইশান,সুযোগ পায়নি হয়তো,নাকি সুযোগ নিজেই দেয়নি,সে সেটা জানেনা!সম্পর্কটা ধরেও রেখেছে বোধহয় রুষাই,সে ছিলো কি না এ সম্পর্কে আর বাকি প্রেমিক দের মতো আজও হাতড়ে খুজে পায়না উত্তর।
অনেকবার ভেবেছে ইতি ঘটাবে সম্পর্কের,কিন্তু স্পষ্টই বুঝতে পারতো রুষা তাকে পাগলের মতো ভালোবাসে, আর হুট করে হার্ট করা ইশানের ক্যারেকটার এর সাথে যায়না কখনো,তবে সে ছেড়ে গেলেও বোধহয় চিট করেছে কথাটা ঠিক খাটতো না তাদের মধ্যে।সারারাত জেগে ফোনে রোমান্টিক কথা বলা,কাজ কামাই করে ডেটে যাওয়া,আগামী শত বছরের সাংসারিক পরিকল্পনা করা,বাচ্চাকাচ্চার নাম ঠিক করা,শাড়ি পান্জাবী পড়ে কাপল হয়ে হেটে বেড়ানো কাপলদের এসব কাহিনী কখনো হতো না তাদের মধ্যে। তবে রুষাই সম্পর্কের একটা নাম ঠিক করে থেকে গেছিলো তার সাথে, এই অবধিই…
তাছাড়া মেয়েটা সত্যি বলতে ভালো!বর্তমানে বিয়ের চাপও রুষারই দেওয়া।চাপ না ঠিক হয়তো,অনুরোধ,আবদার,মেয়েটার ভালোবাসার অবদার।
এটা নিয়েও ভেবে ভেবে মাথার চুল সাদা করার দশা ইশান এর।হুট করে বিয়ের চাপ দিচ্ছিলো রুষা।যতই সে বাহানা দিক,যে ভাবেই হোক একটা নাম দেওয়া ছিলো এই সম্পর্কের,তার কিছু না যেতে আসতে পারে,এতকিছুর পর পারমানেন্ট নাম না দিলে নিশ্চয়ই রুষাকে অসম্মানিত করা হবে!তাছাড়া পরিবার থেকে বিয়ের চাপ, মা,দিদার নিত্যদিনের।নিজের বিবেকও বলছিলো ৪ বছর মেয়েটা কোনো এক্সপেকটেশন না রেখে থেকে গেছে,হালাল একটা সম্পর্কে বাধলে ক্ষতি নেই তো,আর তাছাড়া মেয়েটা চলে গেলে এখন ইশানও বোধহয় কষ্ট পাবে,পাবি কি!দেবদাস হওয়া তার সাথে যাবে না তবে ইগো যেমন হার্ট হবে, কোথাও না কোথাও ব্যাথা একটু হবে হয়তো! …
ইশান গা এলিয়ে দেয় সোফায়…ফোন হাতে নেয়।বাড়িতে জানানো দরকার। আজ রাতে আর রওনা দিতে ইচ্ছে হচ্ছে না,এতদূর ড্রাইভ করতে ক্লান্ত লাগছে…
পর মূহুর্তেই কিছু একট ভেবে উঠে বসে।সব প্যাকিং করাই ছিলো।গাড়ির চাবি নিয়ে বেড়িয়ে পরে।
বাড়ির সবার মজা নষ্ট করার মানেই হয়না,অপেক্ষার একটা মূল্য আছে…
তিতির অনেক্ক্ষণ হলো হেটে হেটে পায়চারি করেছিলো।সমস্যা টা হলো তার রুমে কয়েল শেষ হয়ে গেছে।
প্রচুর মশা,সে মশারী টাঙিয়ে ঘুমাতে পারেনা,এদিকে রুমে কয়েল শেষ।এই মূহুর্তে তার মোটেই বাহিরে যেতে মন চাচ্ছে না একা একা…
কিন্তু পরিস্থিতি দেখে বুঝলো রাতে ঘুমের দফা রফা হবে এখন আলসেমি ভেঙে না বের হলো।আলনা থেকে ওড়না টা মাথায় পেচিয়ে ফোন আর টাকা হাতে বের হয় সে…রাস্তার কিনারা ধরে হাতে শুরু করে।দোকান এখান থেকে ১০ মিনিটের পথ।
গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে হেটে যাচ্ছে তিতির।হঠাৎ পিছন থেকে একটা ডাকে পা থামলো তার।খুব পরিচিত কণ্ঠস্বর চমকে পিছন ফিরলো…
-রাহাত ভাইয়া!
মানুষ টা হাসিমুখে এগিয়ে এলো।সাদা টি শার্ট,প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে তিতিরের পাশে এসে দাড়িয়ে বললো
‘ চলো হাঁটতে হাঁটতে কথা বলি,সামনের দোকানেই যাচ্ছিলে তো?”
তিতির মাথা নাড়ে,হাঁটতে থাকে দুজন।
রাহাতই আগে প্রশ্ন করে
“পরীক্ষা কেমন দিচ্ছো?”
তিতির এক হাতে মাথার ওড়না টা আরেকটু টেনে আনে।নরম গলায় বলে—
“জ্বী ভালো ভাইয়া”
“কাল তো ইংরেজি পরীক্ষা, না?”
তিতির মাথা নেড়ে হ্যা জানায়..
বাকি রাস্তা কেউ আর কোনো কথা বলে না।রাহাত আড় চোখে তাকায় তিতির এর দিকে।রাস্তার নিয়ন আলো আছড়ে পরছে মেয়েটার মুখে।কি দারুণ দেখাচ্ছে।
দোকান থেকে কয়েল কিনে তিতির রাহাতের দিকে তাকায়,জিজ্ঞেস করে
“আপনি এখন ফিরবেন?
” হ্যা চলো”
রাহাত তিতির এর সাথেই আবার ফিরতে থাকে।সে খানিকটা অবাকই হয়।রাহাতও তো নিশ্চয়ই কিছু কিনতেই এসেছিলো,কই কিনলো না তো।
কিন্তু জিজ্ঞেস করা হয়ে ওঠে না,রাহাত তার ৮-৯ বছরের বড়।তার ভার্সিটির ও সিনিয়র ছিলো,বর্তমানে তার হোস্টেল এর পাশের ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন নিজের মা আর ছোট বোন কে নিয়ে।রাহাত তাদের হোস্টেল এর ১ তলা থেকে ১৩ তলা অবধি মোটামুটি সব মেয়েদের ক্রাশ।
রাহাতের অবশ্য তা নিয়ে মাথাব্যাথা মোটেও নেই।কখনো কোনো মেয়েকে পাত্তা দিতেও কেউ দেখেনি,তবে তিতির বেশ অবাক হয় যখন হরহামেশাই রাহাত ভাই তার খোঁজ খবর রাখে।
এই যেমন আজ রাতের বিষয়টস,তিতির হালকা হলেও বুঝতে পারছে রাহাত ভাই হয়তো তার জন্যেই বেরিয়েছে!আবার কাকতালীয়ও হতে পারে বইকি!
তার প্রতি রাহাত ভাইয়ের আলাদা কিছু অবশ্য হোস্টেল এর বাকি মেয়েদের ও নজর এড়ায় না…
তিতির অবশ্য এতো গভির এ কখনো ভাবেনি,ভাবার ইচ্ছা হয়নি আরকি।কেনো হয়নি এটাও জানেনা সে,মিনুটা দিনের মধ্যে শ বার ঘ্যানঘ্যান করে এটা নিয়ে,সে নিজেও ভাবতে চেয়েছে হয়তো…
তিতির হোস্টেল এর সমানে চলে এসেছে ইতিমধ্যেই।
সাঁঝের মায়া পর্ব ১
-ভাইয়া আসি তাহলে।
রাহাত মাথা নাড়ে।
-যাও,বেশি রাত জাগার দরকার। আর একা একা মাঝরাতে ছাদে ওটারও দরকার নেই।
তিতর চমকে তাকায়।
-আপনি জানলেন কি করে!
রাহাত উত্তর দেয়না।হালকা হেসে পকেট দু হাত রেখে হাটা দেয় তার ফ্ল্যাটের দিকে…
