সাঁঝের মায়া পর্ব ৩১
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
ঝুম বৃষ্টি যাকে বলে। একেবারে আকাশ ভেঙে ঢল নেমেছে। খোলা আকাশের নিচে ভিজে একাকার হচ্ছে দুটো মানব মানবি। পা অত্যাধ্যিক ফুলে উঠেছে এই অল্প সময়ের মধ্যেই। পা টা টনটন করছে। ব্যাথায় মুখ কুচকে আছে তিতির। ঈশান নিঃশব্দে এগোচ্ছে গাড়ির দিকে। স্টেশন এর এদিকটা একদম অন্ধকার, বিদ্যুৎ চমকানোর কারণে এরই মধ্যে স্টেশন এর ইলেক্ট্রিসিটি চলে গিয়েছে। ছোট্ট একটা এনার্জি লাইটের টিমটিমে আলো মাত্র। না দেখা যাওয়ারই মতো। স্টেশন থেকে যত এদিকটা আসছে, তত আঁধার নামছে। কিছুক্ষণ আগেও ঝকঝকে আকাশ ছিলো। আকাশ জুড়ে চাঁদ তারার মেলা। কোত্থেকে ঝড়, বৃষ্টি এসে হাজির হয় তাদের দুর্দিনে কে জানে!
গাড়ির কাছে এসে সামান্য নিচু হয়ে দরজা খুলে তিতিরকে বসালো সিটে। দ্রুত পায়ে নিজেও উঠে এলো ড্রাইভিং সিটে। ট্যিসু বক্স থেকে একগাদা ট্যিসু বের করে কোনোমতে মুছলো নিজের মাথা। মাথা টনটন করছে। ঠান্ডা লেগে যাবে। তিতির এরও তাই। নাক পিটপিট করছে। এরই মধ্যে হাঁচি দিলো দু বার। ঈশানের দেখাদেখি নিজে মাথা মুছে নিলো।
ঈশান গাড়ি ছাড়ছে না। তিতির তাকালো তার দিকে।লোকটা তার দিকেই স্থির দৃষ্টি তে তাকানো। অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো সে দৃষ্টিতে। মাথার জবজবে ভেজা চুল গুলো কপালে এসে পরে আছে। গায়ের পাতলা ডাস্টি গ্রিন শার্ট টা লেপটে আছে পেশল দেহের সাথে। ওপরে দু তো বোতাম খুলে দৃশ্যমান চিকচিকে বুকটা। তিতির দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।মিনমিনে গলায় বলে,
____”গাড়ি ছাড়ছেন না কেনো! “
____”লুক অ্যাট মি…”
ঈশানের অতি গম্ভীর কন্ঠেও তাকালো না তিতির। যেমন ছিলো তেমন বসে থেকেই বললো,
____”বলুন।”
____”তাকাতে বললাম তো আমার দিকে। কানে যায় না কথা!”
তিতির এবার বিরক্ত ভাব নিয়ে তাকালো ভ্রু কুচকে।পুনরায় আগের সেই একঘেয়ে গলাতেই বললো,
____”যাচ্ছেন না কেনো? এর চেয়ে নয়ন ভাইয়ের সাথে ফিরলেই পারতাম।”
মেজাজ এমনিতেই খারাপ।তার ওপর বাড়তি চটাং চটাং কথা পোষালো না ঈশানের।
____”বাড়ি থেকে আসার সাহস তোকে কে দিলো সেটার জবাব দে তুই।”
তিতির যেনো অবাকই হলো।অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
____”কে দেবে!আমার সাহস নেই?”
____”বড্ড বেশি সাহস…
____”হওয়াই উচিত নয় কি?”
____”কেনো!কারণটা শুনি।”
হাসি পেলো যেনো তিতিরের।কারণ!তার কাছে এখন কারণ জানতে চাওয়া হচ্ছে! এত অপমান করে এখন জিজ্ঞেস করা হচ্ছে কেনো এমন করলো সে।ব্যাঙ্গ করলো তিতিরের কন্ঠস্বর এবার ঈশানকে।
_____”দুনিয়ার সকল আত্মসম্মান, ইগো,ভালো,মন্দের বোধ একা আপনারই আছে? আর কারোর থাকতে পারে না!যখন ইচ্ছে হবে অপমান করবেন, বোঝা বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলবেন, ঘর থেকে বেড়িয়ে যেতে বলবেন, জীবন থেকে বেড়িয়ে যেতে বলবেন। আর আমি মাটি কামড়ে পরে থাকবো! কেনো? আমি এতিম বলে? আমার বাপ মা নেই বলে? হুম? কি মনে করেন নিজেকে! বিয়ে হয়েছে বলে আমি সব মেনে নেবো?”
ঈশান এর বুকের বা পাশ টা জ্বলে ওঠে। মেয়েটা অত্যন্ত বেশি বোঝে। অবশ্য বেশি বোঝাটাই স্বাভাবিক। সে যা বলে ফেলেছে তখন রাগের মাথায়। তিতির যা জেদি এটাই মানায় ওর সাথে। রাগ হলো নিজের ওপর সাথে তিতিরের ওপরও। তবে রাগ প্রকাশ হতে দিলো না।ঠান্ডা গলায় বললো,
____”সাহস দেখাতে গিয়ে মাঝরাতে বাড়ি ছেড়ে বেড়িয়ে এলি! যেখানে সবে কালকেই একই এলাকায়, একই রাস্তায় একটা রে*প প্লাস মার্ডার হলো। আমাদেরই চেনাজানা। কোথায় কোন শত্রু ঘাপটি মেরে বসে আছে জানা নেই। কার কি উদ্দেশ্য তাও জানিনা এখনো। ধারনা করা হচ্ছে তুখোড় কোনো সিরিয়াল কিলারের কাজ এটা। ঢাকা থেকে স্পেশাল ফোর্স পাঠানো হয়েছে তদন্তে। আর তুই এরকম একটা পরিস্থিতি তে জেদ, ইগো বজায় রাখতে বেড়িয়ে এলি! মনে হচ্ছে না ভুল করেছিস? তোর কিছু হলে সে দায় আমাকে দিয়ে যেতিস? সারাজীবন তোর ক্ষতি হওয়ার জন্য দায়ি,অপরাধী করে রেখে যেতিস? বাড়ির সবার কি অবস্থা হতো ভেবে দেখেছিস!”
তিতির জবাব দিতে পারে না। সত্যিই তো তাই, তখন রাগে, জেদে হুট করে অমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে একদমই ঠিক করেনি সে। নিজের তো ক্ষতি হতেই পারতো সাথে গোটা পরিবার এর সকলে ভেঙে পরতো একেবারে। তবে ঈশানের সমানে সে মাথা নোয়ালো না। রাশভারি গলায় বললো,
_____”একা কোথায় ছিলাম! নয়ন ভাইয়া ছিলো তো সাথে… “
____”আমি ছিলাম কি?”
তিতির চমকে তাকায়, ঈশানের তপ্ত স্থির দৃষ্টি তার দিকেই তাক করা।
____”হ্যা??”
____”আমি ছিলাম তোর সাথে? “
____”না…”
____”তাহলে এই দুনিয়ার আর কোনো পুরুষের কাছে,কোনো পুরুষের মাধ্যমে নিরাপদ না তুই।”
ঈশানের এহেন কথায় চমকায় তিতির, থমকে থাকে।
____”আমার তো উল্টো আপনার কাছেই নিজেকে নিরাপদ লাগে না…
ঈশানের মেজাজ তিরতির করে বাড়ে তিতিরের বাঁকা বাঁকা কথায়।হিসহিসিয়ে ওঠে সে,
____অ্যম ইওর হাজবেন্ড ইস্টুপিট।”
কথার পিঠে আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে করছে না তিতিরের।মাথার যন্ত্রণা শুরু হয়ে গেছে ভালোমতো এরইমধ্যে। একরোখা,বদমেজাজি মানুষ এর সাথে যত কথা বাড়ানো যাবে তত কথা বাড়বে। কি দরকার! তিতির মাথা এলিয়ে দেয় সিটে। ঈশানের দৃষ্টি তখনো তিতিরেই তাক করা। তবে হুট করে আর কোনো কথা না বলে তিতিরের এমন চুপ হয়ে যাওয়া দেখে তার বোধহয় রাগ হওয়া উচিত ছিলো। কিন্তু রাগ হলো না। উল্টো চিন্তায় ছেয়ে গেলো মন। না চাইতেও ব্যাগ্র গলায় জিজ্ঞেস করলো,
_____”শরীর কি বেশি খারাপ লাগছে।”
তিতির চোখ মেললো না। ঈশানের এমন কন্ঠ তার কানে আসলে শরীর কেমন অবশ অবশ লাগে! কেনো জানা নেই তার…
____”না। তবে লাগবে। চলুন…”
ঈশান তারপরও কিছুক্ষণ চুপচাপ পরখ করে তিতিরকে। বাইরে তাকায়। বৃষ্টি কমার নামগন্ধ নেই। বৃষ্টির মধ্যে নিশ্চিত রাস্তার অবস্থা বেহাল এদিকটা। চাপা রাস্তা , পাশাপাশি বিলের মধ্যে দিয়ে। একটু বৃষ্টি তেই পানি উঠে যায় রাস্তায়। রাস্তার প্রশ্যস্ততা পরিমাণ করা যায়না। বিধায় অ্যাক্সিডেন্ট এর সম্ভাবনা প্রবল। আরেক উপায় অন্য দিকে ঘুরে যাওয়া। সেদিকে গেলে সময় লাগবে ডাবল…তবে তিতিরকে সাথে নিয়ে রিস্ক নিতে চাইলো না ঈশান। দেরি হলেও ভালো রাস্তা দিয়ে যাওয়াই ঠিক হবে। মেয়েটাকে এ নিয়ে পরে ধরবে সে
ছাতা মাথায় দেওয়া। তবুও বৃষ্টির আঁকাবাকা তীক্ষ্ণ ফোটায় শরীর নিমিষে ভিজে আসে। ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। এলোমেলো বাতাসে পাতলা ছাতা বেঁকে আসছে বারংবার। বাড়ির পিছনের রাস্তায় বাউন্ডারির দেয়াল ঘেষে ছাতা মাথায় দাড়িয়ে আছে নূরি।
গায়ের কালো জামার পুরোটাই প্রায় ভেজা। ঠকঠক করে কাঁপছে শীতল বাতাসে। ফোন হাতে সময় দেখলো।এ নিয়ে সাত-আটবার। ইয়াজ আসার কথা। কাল চলে যাবে ছেলেটা। আর কবে দেখা হবে কে জানে! এলাকায় এই হুট করে হওয়া বিশ্রি ঘটনা টার জন্য বাড়ি থেকে বের হওয়ারও পারমিশন নেই। ভয় তারও করছে না এমন তো না। এতো বড় ঘটনা ঘটার পরের দিনই রাত দেড়টার সময় একা একটা মেয়ে বাড়ির পিছন দিকে ফাঁকা রাস্তায় এই ঝুম বৃষ্টির মধ্যে একা দাড়ানো! আপাতত দৃষ্টিতে কোনো ভাবেই স্বাভাবিক হতে পারে না। অন্য সময় হলে কখনো এ সাহস নিয়ে এখানে এসে দাড়াতে পারতো না নূরি। কিন্তু আজ কিচ্ছু করার নেই। ইয়াজের অনুরোধ ফেলতে পারে না সে। আবার কতদিন এর জন্য দুরত্ব জানা নেই তার। শেষ একবার দেখা করবে না,তাই হয়?
তবে প্রায় ত্রিশ মিনিটের ওপরে দারানো এখানে সে। ভয়ে জবুথবু হয়ে গেছে একদম। ইয়াজের দেখা নেই। ভয়ার্ত দৃষ্টি বারংবার যাচ্ছে নিজের বাড়ির দিকে। আর ঘন্টাখানেক পরেই মা চাচিরা উঠবে সাহরীর রান্না করার জন্য, কোনো ভাবে যদি কারোর নজরে পরে কেলেঙ্কারি ঘটে যাবে। আর তাছাড়া বাইরের অযাচিত ভয়, কিছু এমনসেমন হওয়ার সঙ্কা তো রয়েছেই।
বৃষ্টির গতি বাড়ছে। শুধুমাত্র নূরির মাথার ওপরের অংশ সম্ভবত ভেজা থেকে একটু হলেও বাদ রয়েছে। তাছাড়া গোটা শরীর,এমনকি মুখ অবধি ভিজে একাকার। আরও মিনিট দশেক পর অদূরে লক্ষ করা গেলো একটা প্রাইভেট কার। দ্রুত গতিতে পিছনের ছোট গেটের ভিতরে এসে লেপটে রইলো নূরি। বাইরে ঘোর অন্ধকার, কারের ভিতরে আলোতে অতি কষ্টে লক্ষ করতে পারলো মানুষ টা আদতে ইয়াজই। গাড়িটা বাড়ি থেকে বেশ খানিকটা দূরেই থামলো।নূরি দ্রুত পায়ে এগোলো সেদিকে।
বাড়ির পিছনের এই রাস্তা টায় সচরাচর মানুষ জন চলাচলে করে না।পিছনের এদিকটা পুরোটা মাঠের পর মাঠ শুধু খেত আর খেত। এই রাস্তা সরাসরি চলে গিয়েছে মেইন রোডে। তবে এই রাস্তায় চলাচলে পথিমধ্যে শশান পরায় খুব একটা মানুষ এর যাতায়াত দেখা যায়না।
নূরি কাছে আসতেই গাড়ির দরজা খুলে গেলো।কোনোমতে ছাতাটা চাপিয়ে গাড়িতে উঠে বসলো সে। ছাতা খানা রাখলো পায়ের কাছে। নূরি ঢোকার সাথে সাথে বন্ধ হলো গাড়ির ভিতরের আলো।
_____”এতক্ষণ লাগলো তোমার আসতে! এতো রাতে কতক্ষণ হলো দাঁড়িয়ে ছিলাম আন্দাজ আছে, তার ওপর এই বৃষ্টি… “
ইয়াজ দারুণ ব্যাস্ত হলো,
____”ভয় পেয়েছো? হ্যা?”
____”পাবো না? দম আটকে আসছিলো আমার…”
ইয়াজ মাথায় হাত বুলায় নূরির।নরম গলায় বলে,
____”সরি জান।রাস্তা টা এতো কনফিউজিং।বুঝতে পারছিলাম না। তাছাড়া এখনি রওনা দিবো। তোমাকে না দেখে গেলে শান্তি পাচ্ছিলাম না তো।”
নূরির মনের ভারি বোঝা নিমিষেই সরে যায়। নরম গলাতে বলে,
____”এই বৃষ্টির মধ্যে সকালে গেলে চলছিলো না?”
আলতো হাতে জড়িয়ে নিলো ইয়াজ নূরি কে। কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললো,
____”রাত টা কি তাহলে তোমার ঘরে থাকতে দেবে!”
দু হাতে ইয়াজ কে ঠেলে নিজে সরে এলো নূরি।চোখমুখ কোচকালো।
____”বাজে কথা খালি। মা কেমন আছে?”
শব্দ করে হাসলো ইয়াজ।গাল টিপলো নূরির।
____”এখন ভালো।”
____”আরুশমি কেমন আছে?”
____”জ্বর সামান্য। “
____”বাসায় কে কে এখন?”
____”বাবা,মা আরুশমি আর হেল্পিংহ্যান্ড।”
____”বাড়িতে আমাদের কথা কবে জানাবে?”
____”জানিয়েছি।”
বড় বড় চোখে তাকালো নূরি।ইয়াজ মিষ্টি মিষ্টি হাসছে তার দিকে তাকিয়ে।
____”বলেছো! কবে? আমাকে তো বলো নি…”
____”এটাই তো সারপ্রাইজ ছিলো ম্যাডাম…”
নূরি খামচে ধরলো ইয়াজের হাত। উত্তেজিত গলায় বললো,
____”কি বলেছেন ওনারা?”
ইয়াজ মুগ্ধ হাসলো। দু হাত বাড়ালো। হাস্কি গলায় বললো,
____”দেন ফার্স্ট হাগ মি।”
অধৈর্য হলো নূরি। তবে জড়িয়েও ধরলো।।ইয়াজ সন্তুষ্ট হলো। ধীর গলায় বললো,
____”জলদি তাদের নাতি নাতনি সমেত বউমা কে নিয়ে যেতে বলেছে।”
____”সত্যি?”
হাতের বাধন দৃঢ় হলো নূরির। খুশির চোটে পানি এসে গেছে মেয়েটার আখিজোড়ায়। প্রফুল্লচিত্তে বললো,
____”আমি তাহলে জানাবো বাসায়?”
____”বাবা মা কে নিয়ে আমি আসি? সেটা ভালো হয় না?ঈদের এক-দু দিন পর?”
আজকে খুশিতে পাগল হওয়ার দিন বোধহয় নূরির! যা শুনলো মাত্র তা কি ঠিক! নাকি স্বপ্ন দেখছে কোনো! তাদের এতদিন এর ভালোবাসা পূর্নতা পাবে!
____”ঠিক আছে।”
দু হাতের আজলায় নিলো ইয়াজ নূরির মুখ।আহ্লাদী গলায় বললো,
____”কাঁদছেন কেনো! হু? ভরসা ছিলো না আমার ওপর?”
____”ছিলো তো।”
____”তাহলে? তাহলে চোখের পানিটা কেনো?”
নাক টানলো নূরি।ফোপাঁতে ফোপাঁতেই হাসতে হাসতে বললো,
____”খুশিতে…”
ইয়াজ কপালে কপাল ঠেকালো।নাকে নাক ঘষলো।
এক হাত চলে গেলো নূরির কোমড়ে।চমকায় নূরি। সত্যি বলতে এই স্পর্শে সে দারুন ভয় পায়। স্বস্তি খুঁজে পায়না কখনো, কেমন অস্বস্তি চেপে ধরে। দু হাতে সরিয়ে দেয় ঈশাজ কে।নিজেও পিছিয়ে এসে বসে। নিচু হয়ে ছাতা টা তুলতে তুলতে বলে,
_____”প্লিজ ইয়াজ। এক ভুল বারবার করতে এসো না। আমি কমফরটেবল নই। ”
_____”আজ বাদে কাল বিয়ে হচ্ছে আমাদের নূরি।”
_____”তাহলে আজ বাদে কাল সম্পর্কটা গভীরে টানতে সমস্যা কোথায়।এতগুলো বছর যখন গিয়েছে আর কয়টা দিনও যাবে। অসম্ভব কিচ্ছু না। প্লিজ।”
_____”তোমার এতে সমস্যা কেনো বলতে পারো?”
____”বিদায় দেওয়ার আগে এই ঘৃন্য একটা টপিক নিশে ঝগড়া ভালো লাগবে? তাছাড়া সেদিন যতটুকু যা করে ফেলেছিলে সেটার ট্রমা থেকে আমি এখনো বের হতে পারিনি ইয়াজ। তাছাড়া আমাদের ওই ছবিগুলো…
_____” আর ইউ স্কেয়ার্ড?”
_____”তোমাকে সেই টপিকটা নিয়ে বলে লাভ নেই ইয়াজ।আই হ্যাভ টু গো।”
বেড়িয়ে যেতে উদ্ধত হতেই উঁচু করে বেঁধে রাখা চুলে টান পরলো নূরির।হেচকা টানে পিছিয়ে এসে পরলো ইয়াজের বুকে। ইয়াজের হাতের অস্তিত্ব গভীর ভাবে অনূভব করলো নিজের পেটের ওপর। হাত ধীরে ধীরে ওপরের দিকে উঠছে। আতঙ্কে গলা কাঠ হয়ে এলো তার। ছিটকে সরে যেতে চাইলো। সম্ভব হলো না। বরাবরের মতোই এই স্পর্শে সে কামুকতা,চাহিদা আর যৌ**নতা ছাড়া আর কিচ্ছু অনূভভ করতে পারলো না। যন্ত্রনায় শরীর হিম হয়ে এলো। চিৎকার করার উপায় নেই। আর না তো এই ঝড়-ঝঞ্ঝার মধ্যে গভীর রাতের অন্ধকারে ফাঁকা জায়গায় তার চিৎকার সে শুনবে। বুক চিড়ে কান্না এলো নূরির। ইয়াজ কথা দিয়েছিলো এই ভুল সে আর এ জীবনে করবে না। কিন্তু ইয়াজের মধ্যে সেসব এর কোনো লক্ষন দেখা গেলো না।
ইয়াজ আচমকা হাস্কিস্বরে বললো,
____”আই ওয়ান্ট ইউ রাইট নাও নূরি।”
____ই..ই..ইয়াজ না প্লি……
এদিককার রাস্তা ভয়ংকর খারাপ।এতটা খারাপ জানা ছিলো না ঈশানের। উঁচুনিচু প্রচন্ড। বাইরের বৃষ্টি এখন আর শুধুমাত্র বৃষ্টি তে সীমাবদ্ধ নেই,তীব্র বাতাস,সাথে বর্বর আওয়াজে বজ্রপাত তো বিনামূল্যে। চোখমুখ খিচে বন্ধ করে রাখা তিতিরের। একে তো ঠান্ডা লেগে গেছে,বরফ হয়ে আসছে শরীর, অন্য দিকে বাইরের এ অবস্থা। পায়ের ব্যাথা কমেছে অনেকটা। গাড়িতে বসিয়েই পায়ে আচমকা কেমন করে চাপ দিলো লোকটা, তখন ভয়ে গগনবিদারী চিৎকার করলেও খানিকপর থেকে ব্যাথা বেশ কমে এসেছে। তবে ফোলা ফোলা কমেনি এখনো। মনে হচ্ছে বাড়ি ফিরে মুভ লাগিয়ে নিলেই সকালের মধ্যে কমে যাবে।
ঈশানের নিজেরও অবস্থা বেহাল, বৃষ্টি তে ভেজার কারণে নয়! অন্য কারণে। তার কিন্তু তিতিরের মতো মোটেই ঠান্ডা লাগছে না। বরং উল্টো ফিল হচ্ছে। গরমে ঘাম ছুটে যেতে চাচ্ছে বেচারার। আড়চোখে তিতিরকে দেখে, চোখ সরিয়েও নেয় দ্রুত। মেয়েটা ঠকঠক করে কাঁপছে। এসিও চালু করতে পারছে না ওর জন্য। গাড়ির গ্লাস নামিয়ে দিলে বজ্রপাত এর তীব্র শব্দে আরও কাঁপছে। ঈশানের হয়েছে যত জ্বালা। আসমান জমিন এক করে মেজাজ খারাপ হওয়ার উচিত তিতিরের ওপর, অথচ হচ্ছে অন্য কিছু। কি যে ঝামেলায় পরে গেছে কি আর বলবে।
তিতির চোখ খোলে। ঈশানের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলে,
____” বৃষ্টির মধ্যে গাড়ি একদিকে একটু সাইট করা যায় না?”
___”যায়না। যত দেরি করবো তোর মতো জলন্ত আগুনের সাথে ততক্ষণ আটকে থাকতে হবে এখানে। আমাকে কি মানুষ বলে মনে হয় না? “
ঈশানের আচমকা ক্ষেপে ওঠার কারণ ধরতে পারলো না।ঈশান আচমকা গ্লাস নামিয়ে দিতেই ঝাপটা বাতাস এসে হানা দিলো গায়ে। শীতে ঠকঠক করে উঠলো মেয়েটা। দাঁতে দাঁত বাড়ি খেলো। আরও তেতে উঠলো ঈশান। কটমট করে তাকাতেই চোখমুখ কুচকে ফেললো। সরিয়ে নিলো দৃষ্টি। বিরক্তসূচক শব্দ করলো মুখে।গাড়ির গতি কমে এলো সহসা।
____”আর অমন ঠকঠক করে কাঁপছিস কেনো?একা তুই ভিজেছিস? আমি ভিজিনি? বে আক্কেল কোথাকার। তার ওপর পরেছে সাদা জামা। মেরে ফেল তুই আমাকে।”
তিতির হা হয়ে তাকিয়ে। শীত লাগলে কাঁপবে না!এ আবার কেমন কথা। তার শীত লাগলে সেও কাঁপুক মানা করেছে কে! সহসা মাথায় খেলে গেলো ঈশানের বলা সাদা জামার কথা! মাথা নিচু করে অবলোকন করলো নিজের ভেজা শরীর। হতভম্ব হয়ে গেলো সে। দু হাতে আড়াআড়ি করে আড়াল করলো সম্মুখভাগ। কঠিন গলায় বললো,
____”পরেছি না হয় বৃষ্টির মধ্যে ভুল করে সাদা জামা! তাই বলে আপনি বেহায়ার মতো তাকাবেন? চোখের পর্দা করুন।”
ঈশান ভ্রু কুচকে তাকালো। গাড়ির সাইট করলো এক পাশে। তিতিরের কথায় নয়। সে আসলেই হাতে শক্তি পাচ্ছে না কেনো জানি। তাছাড়া ঝড়ের গতি বেড়েছে,বৃষ্টির তোরে চোখে পরছে না রাস্তা। দাঁতে দাত চেপে বললো,
____”আর একবার আমাকে দোষ দিলে তুই বাঁচবি না বলে দিলাম। “
ঈশান প্রানপনে চেষ্টায় আছে দৃষ্টি তিতিরের মুখের দিকে রেখেই কথা বলতে। তা সম্ভব হচ্ছে না। বেহায়া নজর নেমে যাচ্ছে নিচের দিকে। ধমকে উঠলো আরেকদফা,
____”চুলগুলো সামনে আন বেয়াদব। বিড়াল ছানার মতো শরীর ওপর থেকে। অথচ মাপটাপ এতো পারফেক্ট কি করে! ঢাক সব.. অ্যাক্সিডেন্ট করিয়ে মারতে চাস তুই আমাকে?
হতভম্ব তিতিরের ঈশানের কথাগুলো ধরতে কিয়ৎক্ষন সময় লাগলো। বোঝা মাত্রই ঝড়ের গতিতে ভেজা চুলগুলো সামনে এনে ছড়িয়ে দিলো দু পাশে। লজ্জায় রাঙিয়ে গেলো গালদুটো।কাত হয়ে বসলো খানিকটা।মিনমিন গলায় কোনোমতে বললো,
____”আ..আ..আপনি সব দেখেছেন? হ্যা?প্লিজ, আর…আজ তাকাবেন না…”
তিতিরের লজ্জারুণ মুখের দিকে তাকাতেই বরাবরের মতো মাথা শূন্য হয়ে এলো ঈশানের। তিতিরের ফুলো ফুলো গালদুটো টমেটোর মতো লাল হয়ে গেছে। যথাসম্ভব ঘুরে বসেছে ওদিকটায়। সাদা জামা ভেদ করে জামার ভিতরে লেপটে থাকা কালো রঙের ছোট পোষাকটির অস্তিত্ব আরও কঠিনভাবে দৃশ্যমান। ভেজা কপাল থেকে ঘামের ফোটা হাতের উল্টো পিঠে মুছে ফেললো ঈশান। চুলগুলো সামনে নেওয়ায় বেড়িয়েছে অনেকটা উন্মুক্ত ফর্শা পিঠ।
একদিক আড়াল করতে অন্য দিকের হিসেবই নেই। বাঁকা হাসলো ঈশান। বাঁকা গলাতেই বললো,
____”আমার নামের হালাল ওগুলো।দেখারই জিনিস।দেখবো না? আজব কথাবার্তা। “
তিতির বিস্ফোরিত নয়নে ঘুরে তাকালো। কি ধরনের নির্লজ্জতা এগুলো। কান দিয়ে গরম ধোয়া বেড়োচ্ছে।নিজের শরীরের শীতলতা চোখের পলকে গায়েব হয়ে গায়ে ধরা দিলো উষ্ণতা। ঈশান বুঝলো মেয়েটার অতি আশ্চর্যতা। মনে মনে ভীষন হাসলো। তবে মুখ একইরকম রেখেই বললো,
____”ওয়ার্নিং তো বৃষ্টির আগেই দিলাম। আর তাছাড়া এমন তো নয় যে আজ প্রথম দেখছি। এর আগে তো নিজ ইচ্ছায়…
তিতির ডান হাত এগিয়ে মুখ চেপে ধরলো ঈশানের। নিজের সিট থেকে উঠে ঈশানের দিকে ঝুকে গেলো একদম।খোদা তার কপালে এরকম একজন নির্লজ্জ পুরুষ পাঠাবে এ জীবনে কল্পনায় ছিলো না তার। সেও রোমান্টিক, তাই বলে এহেন ধরনের! খোদা কিসের শাস্তি দিচ্ছেন যে তাকে! ব্যাগ্র গলায় বললো,
____”অসভ্য পুরুষ একটা…দোহাই লাগে আপনার। মুখে লাগাম দিন। কিছু বলবেন না। একটুও লজ্জা নেই? “
ঈশান খুব সহজেই সরিয়ে ফেললো তিতিরের হাত।শুধু সরালোই না। চোখের পলকে তিতির কে উঠিয়ে আনলো নিজের কোলের ওপর। হতবিহ্বল তিতির আকাশ থেকে পরলো একেবারে। আশ্চর্যের সীমানা পেরিয়ে গেলো। দু পা নিচে ছুয়িয়ে উঠে যাওয়ার জন্য শক্তি প্রয়োগ করলো। পারলো না, ঈশান ডান হাত পিছন দিয়ে পেটে গলিয়ে টেনে আনলো পিছন দিকে। ঠেকালো একদম গাড়ির সাথে। বা হাত হাটুর নিচ দিয়ে গলিয়ে শূন্যে তুললো পা। তিতির কি করবে বুঝে উঠে পারলো না সহসা। জবজবে ভেজা উত্তপ্ত দুটো মানব শরীর লেপটে আছে একে অপরের সাথে।
ঈশান তিতিরের রক্তিম গাল অবলোকন করে ধীর গলায় বললো,
____”অসভ্য আমি? তোর এটা মনে হয়? “
____”এটায় সন্দেহ আছে আপনার কোনো?”
____”আলবাত আছে।”
তিতির ভ্রু কুচকে তাকালো ঈশানের মুখের দিকে।তাকে ব্যাঙ্গ করতে ব্যাস্ত ওই অতি সুদর্শন পুরুষ।
____”নিজেকে সাধু সন্নাসী মনে করেন?”
____”তা কেনো হতে যাবো! আশ্চর্য! সাধু সন্ন্যাসী রা ভেজ টাইপ। বুঝিস সেটা কি? ওরা বিয়ে থা করেনা, বউসঙ্গ ওদের নেই। আমি তো সেটা হতে পারবনা। বউ সঙ্গ আমার দরকার, ভীষন দরকার। “
তিতিরের কান্না পায় এমন অবস্থায় বারবারই। লোকটা মাত্রাছাড়া বাজে কথা বলে। পুরুষ শক্তির সাথে পেরে ওঠে না বলে সহ্য করা ছাড়া উপায় থাকে না, অথচ লজ্জায়, ঘৃনায় মরে যায় সে এমন কথা শুনলে। তিতির কঠিন গলায় বলে,
____”আপনি এ ধরনের কথাবার্তা বন্ধ করবেন?”
____”কি ধরনের!”
তিতির সামনে রাস্তার দিকে তাকায়। অন্ধকারে কিচ্ছু চোখ পরে না। গাড়ির ভিতরে অতি মৃদু আলোর বাতি জ্বালানো।সেখানে দেখা যাচ্ছে শুধু একে অপরকে। শরীর শিরশির করে ওঠে তার। গলায় শুকিয়ে আসে।
____”ইশশশ একটুও লজ্জা নেই! এককাজ করুন, গাছের সাথে ধাক্কা মারুন গাড়ি। লজ্জায় এমনিতেও মরে যেতে মন চায় আপনার কথাবার্তা শুনলে…
ঈশান ফিচেল হাসলো। বা হাতে তিতিরের গালদুটো চেপে ধরলো । বৃত্তের আকার ধারন করলো গোলাপি ওষ্ঠ জোড়া। সেটা ঈশান কে টানলো খুব করে। আপাতত সে অবাধ্যতায় লাগাম টেনে রাখলো। অধরজোড়ায় দু দুটো জায়গায় সদ্য কেটে যাওয়ার চিহ্ন। একটু আগেই তার করা ক্ষত ও দুটো। ক্ষততে ব্যাথা দিতে বিবেক সায় দিলো না তার।
ভেজা ঠোঁট জোরা থেকে দৃষ্টি তুললো পুরো মুখে। হাস্কিস্বরে বললো,
____”কি আশ্চর্য মরবো কেনো! আমাকে কি পাগলা কুকুরে কামরেছে? এখনো ভার্জিনিটি খোয়ালাম না। উপোষ ভাঙ্গলাম না। বউকে ধরলাম না, খেলাম না। আগেই ওপরে চলে যাবো? খোদা পাপ দেবে না? কি যে বলিস…হাহ্…
তিতির এর শরীর থরথরিয়ে কেঁপে উঠলো ঈশানের অশ্লীল কথায়। চোখ খিচে বন্ধ করে বললো,
____”বাজে না বকে সরতে দিন আমাকে। কথায় কথায় কোলে তুলে নেন কেনো। অসহ্য…”
ঈশান অশ্লীল ভঙ্গিতেই হাসলো। হাতের চাপ প্রয়োগ করলো তুলতুলে উদরে। পায়ের আঙুল ভাজ হয়ে এলো তিতিরের। হাতের মুঠো শক্ত হলো।
ঈশান মুখ এগিয়ে নিলো তিতিরের কানের কানে। এক হাতে কানের ওপর ছেয়ে থাকা ভেজা চুলগুলো আলতো হাতে সরিয়ে ফেললো সামনে থেকে। শক্ত, ঠান্ডা আঙুলের নগ্ন স্পর্শ ঘাড়ে পরতেই অজান্তেই মাথা বেঁকে গেলো। চোখ তো বন্ধই… শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হলো। ঈশান ফিসফিস করে বললো,
____”তোর কষ্ট কমের জন্য কোলে তুলি! আর আমাকেই দোষ দিস? বাহ্। চমৎকার। তবে তুই চাইলে উল্টোটাও ট্রাই করতেই পারি…তুই নিচে,আমি ওপ…
____”আপনি… দুটো পায়ে ধরি। থামুন। আর ট্রচার করবেন না আমাকে। “
ঈশান মনে মনে হাসে।স্বাভাবিক গলায় বলে ওঠে,
____”ঠান্ডা লাগছে?”
____”না, চলুন বাড়ি যাবো।
____”বাড়ি ছেড়ে এসেছিলি কেনো?”
____”ওটা আমার বাড়ি নয় তাই।বোঝা আমি ও বাড়ির। “
____”রাগের মাথায় বলা কথা ধরতে আছে?
আমি বদমেজাজি জানিস না?”
____”রাগ, মাতাল দুটো অবস্থাতেই মানুষ সত্যি কথা বলে। আপনিও বলেছেন। “
ঈশান ঘোরলাগা চোখে তাকিয়ে তিতিরের কুচকে রাখা মুখের দিকে।বন্ধ চোখের পাপড়ি কাঁপছে। ওষ্ঠজোড়াও কামড়ে ধরে রেখেছে।বা পাশের সামনের চুল তো ঠেলে পিছনে সরিয়ে দেওয়া তারই হাতে।সাদা ফিনফিনে ভেজা জরজেট ওড়না খানা গায়ে ছড়িয়ে থাকলেও খুব একটা সুবিধা করতে পারছে না।কালো কাপড়ের অবয়ব স্পষ্ট ফুটে উঠছে।
নরম গলাতে বললো,
____”ওই দুটো সময়ও ক্ষেত্র বিশেষে সত্যি বলে, ক্ষেত্র বিশেষে মিথ্যা…
তিতির জবাব করে না।তাকায়ও না ঈশানের দিকে।ঈশানের খসখসে হাত তার পেট টা খামচে আছে। সেই স্পর্শে শ্বাস নেওয়া কষ্টকর হচ্ছে তার।
____”তিতির? “
____”বাড়ি যাবো।”
____”আমি যদি এখন বলি মন থেকে তখন তোকে কথাগুলো বলিনি। বিশ্বাস করবি না আমাকে?”
তিতিরের ধীরে ধীরে চোখজোড়া খুললো।কাঁপা কাঁপা দৃষ্টি ফেরালো ঈশানের মুখের দিকে। কেমন একটা কামুক দৃষ্টিতে তাকানো তার দিকে। ধীর গলায় বললো,
____”রাগ নিয়ন্ত্রন করতে না পেরে রাগের মাথায় একটা মেয়েকে আঘাত করা বা তিক্ত কথার তীরে ক্ষতবিক্ষত করা কোন ধরনের পৌরষ্যত্ব দেওয়ান সাহেব?”
____”অ্যাম সরি।”
নিজের কানকে বিশ্বাস করে উঠতে পারলো না তিতির। ঈশান আরশাদ দেওয়ান বললো সরি! তাও তাকে! ভুলই শুনলো হয়তো।আশ্চর্য গলায় জিজ্ঞেস করে বসলো,
____”কিহ?”
____”সরি তখনকার জন্য। “
শরীর শিথিল হলে তিতিরের।নাহ্ ভুল শোনেনি তো সে। ঈশান একই শব্দ পুনরায় বললো। তারমানে!
____”আপনি সরি বলতে জানেন?”
____”জানতাম না। আজ জানলাম।”
____”মানে?”
ঈশানের ঠান্ডা হাত স্পর্শ করলো তিতিরের উষ্ণ রক্তিম গাল।নরম গলায় বললো,
____”আজকেই প্রথম বললাম। তাই আজই টের পেলাম। আমি সরি ও বলতে জানি।”
তিতির বড় বড় চোখে তাকিয়ে। এমন অবিশ্বাস্য মূহুর্ত কল্পনা তেও আনেনা সে আজকাল। সরে যেতে মোচড়ামুচড়ি করলো আবার।
____”রাত পোনে দুইটা বাজে। বাড়িতে সকলে জেগে গেছে হয়তো। দ্রুত বাড়ি চলুন।”
ঈশান সরতে দিলো না তিতিরকে।হাতের সাহায্য মুখটা ঘোরালো নিজের দিকে।
____”আই হ্যাভ টু টেল ইউ সামথিং।”
ঈশানের এমন কন্ঠে কুন্ঠিত হয় মেয়েটা। আমতা আমত্তা করে।
____”বাড়ি গিয়ে শুনি। চলুন।”
____”উহু এখনই। “
তিতির বিরক্ত হয়। এই ভেজা শরীরে আর কতক্ষণ থাকা যায়। জ্বর জ্বর চলে এসেছে তার। ঈশানের শরীরের উষ্ণতাও টের পাচ্ছে। মানে হয় কোনো! তিতির অনিহা গলায় জবাব দেয়,
____”জলদি বলুন।”
____”তোর আমার ওপর এতো বিদ্বেষ কেনো? সময় অসময় ছুঁই বলে?”
এ আবার কি প্রশ্ন! এই সময় এটা প্রশ্ন করার সময়?
জানেনা কেনো বিদ্বেস? তাছাড়া তার কোথায় বিদ্বেষ ছিলো, যা ছিলো সব ঈশানেরই প্রথমে। সে তো শুধু এখন তৈরি করছে নিজের আত্মসম্মান থেকে।গম্ভীর গলায় বলল,
____”ধরে নিন তাই।”
____”তাহলে ভাব তো একবার। আমি তোর হাসবেন্ড। ধর্ম বলিস, অথবা দেশের আইন। সব ক্ষেত্রেই তোর ওপর পূর্ণ অধিকার ফলানোর অধিকার কিন্তু আমার আছে। তার পরও আমাদের মধ্যে থাকা দুরত্বর কারণে, দেয়ালের কারণে আমার ছোঁয়া তোর ভালো লাগে না।ঠিক? “
তিতির জবাব দেয় না। ঈশান একই গলায় বলে,
____”আচ্ছা আমি যদি অন্য সব পুরুষের মতোই তোর অনুমতির তোয়াক্কা না করে তোকে আমার করে নেই, তোর কি মনে হয়। আটকানোর সাধ্য, বা শক্তি কোনোটাই আছে তোর? নেই কিন্তু। যতবার মাঝপথে থেমেছি তোর কি মনে হয় না আমি চেয়েছি বলেই তুই বাচাতে পেরেছিস নিজেকে? “
____”ঘুরে ফিরে সেই আমাকে দূর্বল বলে নিজের পৌরষ্যত্ব দেখানোর চিন্তায় মরিয়া আপনি?”
ঈশানের রাগ হয়। তবে সমালেও নেয়। ভারি গলা বলে ____”যেটুকু জিজ্ঞেস করছি সেটুকুর জবাব দে আপাতত।”
তিতির দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মুখ কঠিন হয়েছে এখন।
____”নাহ। নেই।”
____”ধর তোর সাথে আমি জোরজবরদস্তি করে তোর সবটুকু নিয়ে নিলাম। তোর আমার প্রতি ঘৃণা হবে কিন্তু। ঠিক?”
____”হু।”
ঈশানের মুখে ছটাক হাসির রেখা দেখা গেলো।সাথে সাথেই বললো,
____”আমি কিন্তু তোর হাজবেন্ড।”
তিতির ব্যাঙ্গ চোখে তাকালো।ব্যাঙ্গ করেই বললো,
____”তো? কোনো নারীর মন থেকে ভালোবেসে দেওয়া অনুমতি ছাড়া পুরুষের স্পর্শ বিষ হয়।”
____”হিসেব মেলা তো। আমি তোর বৈধ পুরুষ। তার পরও এটা বলছিস। পর পুরুষ এটা করলে তখন?”
আতকে উঠলো তিতির।সাথে বজ্রকঠিন হলো মুখ।
_____”পাপ, ধবংস। “
ঈশান এবার দৃশ্যমান হাসলো।জিজ্ঞাসু গলায় বললো,
____”সব নারীরই কি একই ধারনা?”
____”মানে?”
____”এইযে কোনো এক অদৃশ্য কারণে স্বামী হয়েও তোর ওপর অধিকার দিচ্ছিস না আমাকে। বিয়ের রাতে বলা কিছু কথার জন্য। পরে হাজার বার বললাম সেসব মিথ্যা ছিলো। তোকে যতটা গভীর অবধি ছুঁয়েছে তার এক শতাংশও আমি কোনো পরনারীকে ছুইনি। বিয়ের আগে, অথবা পরে। অথচ নারী রা পরপুরুষ কে অনায়াসে সে অধিকার দেয় কি কারণে এটার জবাব দিতে পারবি তুই? যেহেতু তুই একজন নারী।”
ঈশানের বলা কথাগুলো তিতিরের বুকের বা পাশটা কেমন খচখচ করে ওঠে। চোখে পানি চলে আসে অজান্তেই। আজকে কেমন অন্য ঈশানকে দেখছে যেনো সে।ধীর গলায় বললো,
____”ভালোবাসায় অন্ধ তারা।”
____”তার মানে যারা সেসবে বাঁধা দেয়, তারা ভালোবাসে না?”
তিতির সচকিত হয়।ঈশানের কথার প্যাচে।স্বাভাবিক গলায় বলে,
____”আমার কথা ধরতে পারেননি আপনি… ভালোবাসা আর ভালোবাসায় অন্ধ দুটো কিন্তু আলাদা। যারা ভালোবাসে তারা সামনের মানুষের সাথে নিজেকেও ভালোবাসতে জানে। আত্মসম্মানবোধ মূলত নিজেকেও ভালোবাসা।
আর যারা অন্ধ সে ভালোবাসায়। যে হিসেবে আপনি জিজ্ঞেস করলেন। আমিও তাহলে সে হিসেবেই উত্তর দিচ্ছি কিন্তু… ফিজিকাল নিড। তাইতো? বিয়ের আগে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়াটা অসুস্থ প্রেম, হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে শুধুমাত্র মানুষ টাকে নিজের কাছে ধরে রাখে নিজের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ বিলিয়ে দেওয়া। এটার থেকে পাপ, অন্যায় আর দ্বিতীয় একটা হয়না। বিয়ের পরও আমার মতে একই যুক্তি প্রয়োজ্য। স্বামী অন্য নারীতে মজে থাকলে, শুধু দিন শেষে শরীরের চাহিদা মেটাতে কাছে আসলে আমার মতে সেটাও পাপ,অন্যায়।”
_____”তবুও কিন্তু অহরহ হচ্ছে এসব।”
_____”হচ্ছে। কিছু নারী ইচ্ছে করে বিকিয়ে দিচ্ছে নিজেকে। আর কেউ ভালোবাসা নামক জালের ফাঁদে পরে অজান্তেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। ভালোবাসার মানুষ বলে যাকে ভরসা করে বিয়ের আগেই তার কাছে অসম্মানিত হচ্ছে।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঈশান।আর কিছু বলতে গিশেও বলতে ইচ্ছে হলো না কেনো জানি এই মূহুর্তে।
মৃদু গলায় বলে ওঠে,
_____” আমি তোকে ডিভোর্স দেবো না তিতির। সম্ভব নয় সেটা। তোকে আমার সাথেই থাকতে হবে। জোরজবরদস্তি নয়। আমার ধারনা তুই ও চাস।”
____”আপনি চান?”
____”চাই।”
____”হঠাৎ? “
____”হঠাৎ নয়। চাই বলেই বিয়ে টা হয়েছিলো। করেছিলাম আমি।”
____”ভালো তো বাসেন না।”
____”বাসতে বাধ্য করবি।”
____”ভালোবাসা জোর করে হয়?”
____”,তোর কিভাবে হয়েছে?”
তিতির অপ্রস্তুত হয় খানিকটা।শ্বাস আটকে আসে।মুখ অন্য দিকে ঘুরিয়ে বলে,
____”কে বললো আমার হয়েছে?”
ঈশান হাসে। কোনো সংকেত ছাড়াই ভেজা চুমু আঁকে তিতিরের ঘাড়ের বা পাশটায়।শরীর ঝাঁকি দিয়ে ওঠে তিতিরের। খামচে ধরে ঈশানের পা।ঈশান ফিসফিস করে বলে,
____”হয়নি? ভালোবাসিস না আমাকে? এর আগে দুই দুইবার বলেছিলি কিন্তু। “
তিতির হা করে শ্বাস নেয়।বুকের ওঠানামা দ্রুত হয়েছে।
____”তো? “
____”তো আর কি। তোর কিভাবে হলো আমার মতো একটা কাটখোট্টা পুরুষের প্রতি ভালোবাসা? হু? তোর যদি হতে পারে আমারও তোর প্রেমে পরা অসম্ভব নয় কিন্তু। চাইলেই ফেলতে পারিস।”
____”ছল করা আমার রক্তে নেই। নিজ থেকে না চাইলে জোর আমার দ্বারা হবে না।”
____”ছল করতে হবে না।আই থিং উই নিড সাম টাইম।রাইট? “
___”হয়তো।”
____”তুই আমার ওপর এখনো রেগে।”
____”যা করেছেন এক মূহুর্তে ভুলে যাওয়া সম্ভব? “
____”আই হ্যাভ মাই রিজন।”
____”সেটা জানালে আমি কি মাইকিং করে জানিয়ে দিতাম সকলকে? “
____”দিতিস না।”
____”তাহলে?”
____”বাচ্চা তুই,বড্ড আবেগি। আমার সাথে আবেগ জায়না। আমি তোর দুনিয়ার মানুষ নই তিতির। আমাকে আবেগ আকড়ে থাকলে চলবে না।”
তিতির ছলছল চোখে ঈশানের দিকে তাকায়।
____”কি কারণ। আমি জানতে চাই। কেনো হুট করে আলাদা হলো আমাদের জগৎ। জবাব দিন।”
ঈশানের ঠান্ডা হাতের স্পর্শ তীব্র হয়ে তিতিরের গালে।তিতির নিজের হাত ছোয়ায় ঈশানের সে হাতে।আবেশে ঘাড় বাঁকিয়ে চোখ বোজে।চোখেের কয়েকফোটা পানি গড়িয়ে পরে ঈশানের হাতের।
____”শোনার সময় হয়নি এখনো তোর। আমি নিজেই জড়িয়ে আছি সে মরিচিকায়। তোকে আবার জড়াতে চাইনা।”
____”মিথ্যা আপনার সব মিথ্যা।ভালোবাসেন না আমাকে।”
কপালে কপাল ঠেকায় ঈশান। চোখ বুজে আছে দুজনেই। একে অপরের গরম নিঃশ্বাস আছড়ে পরেছে। শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত চলছে দুজনেরই।
____”বাসিনা।। তো? বাসবো…”
____”মিথ্যা…ছাড়ুন আমাকে।”
____”যেদিন সত্যই হবে সেদিন? “
____”আমি বাসি না আর ভালো আপনাকে। ঘৃনা করি। থাকতে চাইনা আমি আপনার সাথে। এতো এতো অপমান, অসম্মান … আমি চাইনা আর আপনাকে।”
____”আমার চাই।”
____”সারাজীবন এভাবে বসে বসে অপমান করার জন্য। “
____”নাহ আদর দেওয়ার জন্য। “
তিতির আচমকা খেয়াল করে তার জামার পিছনের চেইন খুলে ফেলা হয়েছে। চকিতে চোখ খোলে বাধা দেওয়ার আগেই দু পাশ থেকে বেশ খানিকটা নামিয়ে আনে জামা।গলার ওড়না টা কোলের ওপর হুটোপুটি খাচ্ছে।তিতিরের হাত ঈশানের শার্টের কলার খামচে ধরা।
____”আ..আ..আপনি মাত্র বললেন। আমি না চাওয়া অবধি আমাকে ছোবেন না।”
____”ছোবো না তো।”
____”তাহলে এসব…”
____উশশশশ্ একটু চুপ কর।”
তিতির চুপ করে না কিছু বলার আগেই ঈশান ঠোঁট ছোয়ায় মেয়েটার কন্ঠদেশে।টুকরো টুকরো চুমুর স্পর্শে ভিজে যাচ্ছে কন্ঠদেশ।ঈশান চুমুতে স্থির রইলো না।তীব্র কামড়ে জর্জরিত করলো পুরো কন্ঠদেশ, বক্ষজোড়ার অপরের অংশ, কাধ।ছোপ ছোপ রক্তাভ আভায় ছেয়ে গেলো পুরো উন্মুক্ত স্থান। তিতির বাধা দিতে চেয়েও পারছে না ঈশানের সাথে। ব্যাথায়, আবেশে গড়িয়ে পরছে নোনাজল।
মুখ তুললো ঈশান। ঠোঁট ছোয়ালো তিতিরের গালে।অবলীলায় শুষে নিলো দু গালের গড়িয়ে পরা নোনাজল।হাস্কিস্বরে বললো,
____”আজকের পর তুই না চাইলে তোর হাত ও স্পর্শ করবো না তিতির। যেদিন তোর মনে হবে আমি তোকে ভালোবাসি, তুই সইচ্ছায়, মন থেকে আমার হতে চাইবি, আমার গভীর স্পর্শ চাইবি, নিজেকে আমার মাঝে বিলিন করতে চাইবি সেদিন তোকে আমি স্পর্শ করবো।”
কথা বলতে পারছে না তিতির। জ্বলে যাচ্ছে শরীর। বুকের ওঠানমা দৃশ্যমান ভাবে চোখে লাগছে ঈশানের। চোখ বুজে নিজেকে ধাতস্থ করে নিলো। দ্রুত হাতে জামার চেইন লাগিয়ে, ওড়না দিলো গায়ে। দু হাত ছোয়ালো মেয়েটার দু গালে। আঙুলে স্লাইড করলো অধরোষ্ঠ। নরম গলায় বললো,
____”যেদিন মনে হবে তুই রেডি, আমি রেডি। সব ভুল বোঝাবুঝি, জটিলতার অবসান ঘটে আমাদের মন এক হবে। সেদিন কাছে আসবো আমি তোর। তোর বিশ্বাস, ভরসা, অনুমতি ছাড়া আর কিচ্ছু হবে না আমাদের। “
তিতির ততক্ষণে নিভু নিভু চোখ মেলে তাকিয়েছে। খুব করে বিশ্বাস করতে মন চাচ্ছে ঈশান কে। তার অবচেতন মন এর মধ্যে ভরসা, বিশ্বাস সব করে বসে আছে ঈশানকে।
_____”সময় দেওয়া উচিত কি আপনাকে?”
_____”সময় নেওয়াও উচিত। “
_____”কেনো?”
_____”তোর অতীত ভুলতে হবে। যে অতীতে অন্য পুরুষের অস্তিত্ব ছিলো সে অতীত মুছে ফেলতে হবে। আমি পুরুষ মানুষ, বারবার খেই হারিয়ে চলে আসি তোর কাছে। তোর তাই ধারনা আমি এই রকম সব নারীর কাছে? হুম? এই ধারনা তো?”
তিতির মাথা ঝুকিয়ে রাখে।
____”সেই ধারনা মিথ্যা ভুল প্রমানেও সময় চাই।তোরও আমারও। আমার জিনিসে অন্যের নজর আমি সহ্য করতে পারিনি আজীবন। অথচ তোর দিকে সবার নজর। কেনো? সে সুযোগ তুই দিস বলেই পায় তারা।”
অবাক হয় তিতির! সে দেয়! কাকে দিলো। রাহাত ভাইয়ের চ্যাপ্টার আগের। তখন তার জীবনে ঈশানের অস্তিত্বও ছিলো না। যে মূহুর্তে ঈশানের নামে কবুল পরেছে দুনিয়ার সব পুরুষ হারাম হয়েছে তার জন্য। মন থেকে মানে সে সেটা।
____”আমি দেই?
____”হয়তো বুঝতে পারিস না। কিন্তু দিস। আমি সেটা মানতে পারবো না। সুতরাং স্থির কর নিজেকে। মুক্তি তুই পাবিনা। মৃত্যুতেও না। এ জনম সে জনম কোনো জনমে আমি আমার জিনিস অন্য কারোর জন্য ছাড়বো না।”
____”এটা ভালোবাসা নয়।জেদ,একরোখামি।”
____”হলে তাই।তবুও।”
ঈশান তিতিরের কোমড় চেপে বসায় পাশের সিটে।তিতির কিছু বলার আগেই চুপ করিয়ে দেয়।
সাঁঝের মায়া পর্ব ৩০ (২)
____”আর কিছু বলিস না। আমি পারছি না আর। আই হোপ বুঝতে পারছিস কেনো! এই কষ্ট তোর বোঝার সাধ্যের বাইরে। বোঝাতে গেলে দুশ্চরিত্র খেতাম দিবি।ম্যারেটাল রে***প। কি যেনো বলেছিলি…”
ব্যাঙ্গ করে হাসে ঈশান।জোরে জোরে শ্বাস নেয়। তিতির ছলছল চোখে তাকানো। সব ঠিক হয়েও কিচ্ছু ঠিক হলো না। গভীর মরিচীকায় ডুবে দুজন। তবে এটা সত্যি। তাদের সত্যিই সময়েরই প্রয়োজন, অনেক প্রয়োজন।
