Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৮

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৮

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৮
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

—’ তোর আর বড়ভাইয়ার মধ্যে ফিজিকাল ইন্টিমেসির বিষয়টা এগিয়েছে , বার্বি?’
তিতিরের হাতে থাকা চিরুনি টা প্রায় পরেই যাচ্ছিলো । সেটা শক্ত করে চেপে ধরলো তিতির । নূরি এসেছে তার ঘরে । ভার্সিটিতে যাবে সে । তিতিরের কাছে এসেছে স্কার্ফের জন্য । ঈশান অফিসে বেড়িয়ে গিয়েছে ঘন্টাখানেক হলো । নিজেদের ঘর গুছিয়ে তিতির চুল চিরুনি করছিলো ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে । পিছনেই তার স্কার্ফটা ট্রায়াল দিচ্ছিলো নূরি । আচমকাই এহেন ব্যাক্তিগত প্রশ্নে ভীষন অপ্রস্তুত হলো মেয়েটা । রক্তিম আভা এসে ছেয়ে গেলো ফর্শা মুখখানায় । বোনের ইতস্ততা নূরিও বুঝেছে । বিষয়টা স্বাভাবিক করে ফেলার জন্য নরম স্বরে বললো,

—’ না মানে তোদের বিয়েটা যেভাবে হয়েছিলো । তারপর এতোগুলো দিন পেরিয়ে গেলো । বড়ভাইয়া মুখে বলে তোর দায়িত্ব নেবে , ভালো আছিস তোরা । কিন্তু আমার প্রশ্ন হলো সবাইকে সেটা জানাতে সমস্যা কি ? আই মিন তোদের বিয়ের বিষয়টা । সেটা কেনো বারবার লুকিয়ে রাখছে? দায়িত্ব, বিয়ে মানা এই বিষয়গুলো দিদার মন রক্ষার্থে নাকি নিজের মন থেকেই…’
তিতির ঠোঁট টিপে বসে আছে । জড়তার সাথে ধীরগতিতে হাত চলছে চুলে । নূরি একপলক ঘড়ির দিকে দেখলো। নিশি তৈরি হয়ে ডাক দিলেই বের হতে হবে । তিতিরের পাশে গিয়ে বসলো বিছানার এককোনায় । শান্ত সুরেই বললো,
—’ তোদের সম্পর্কের অগ্রগতি আমরা বুঝতে পারছি না। বড় মামাও বিষয়টা নিয়ে বিরক্ত। শুধু সে নয় । বাড়ির সকলেই। ‘
তিতির হাতের চিরুনি টা রেখে ওড়নার এক কোনা হাতের মুঠোয় নিয়ে মিহি গলায় বললো,
—’ সেরকম কিছু না ছোটপু । তোমার ভাই জানাতে চাচ্ছে না, তার পিছনে কারণগুলোও ফেলনা নয় । আমিও জোর করিনি তার জন্য । ‘

—’ সেটা না হয় বাইরের বিষয় । কিন্তু আমি যেটা বললাম? তোদের ব্যাক্তিগত সম্পর্ক? স্বামী স্ত্রীর ঘনিষ্ঠতা? এটা তো ঘরের বিষয়। চার দেয়ালের বিষয়। সেটায় এগোচ্ছিস না কেনো তোরা?’
কথাটা বলেই নূরি নিজ উদ্যোগে তিতিরের হাতটা নিজের হাতের মুঠোতে নিলো
—’ জানি বিষয়টা ব্যাক্তিগত। তবুও জানতে চাইবো। কারণ শুরু তে ভাইয়া অন্য মেয়ের কথা… ‘
নূরির কথায় বাধা দিয়ে উঠলো তিতির। ডানে বায়ে মাথা নেড়ে বললো,
—’ উহু, সেসব কিছু ছিলো না, নেইও । কিন্তু… ‘
—’কিন্তু? ‘
—’ কিন্তু তুমি যেটা জিজ্ঞেস করলে অতো দূর ও এগোয়নি সম্পর্ক টা।’
নূরি যেনো অবাকই হলো । ঈশানের দেওয়া আদরের চিহ্ন সময় অসময় তিতিরের শরীরে পেয়েছে তারা। বড়দের সামনে সবসময় ঢেকে চলাফেরা করলেও, তারা বোনেরা যখনই নিজেদের মতো থাকতো ,তিতির বরাবরই অসাবধানী । এ নিয়ে তমা কত খেপিয়েছেও মেয়েটাকে৷
—’এগোয়নি মানে ! তোরা এখনো ফিজিকালি ইন্টিমেট…আই মিন স্বামী স্ত্রীর সম্পর্ক তৈরি হয়নি?’
ভীষন জড়তা কাজ করছে তিতিরের মধ্যে। এতো গভীরে প্রশ্ন সে নূরির থেকে আশা করেনি। তমা হলে বিষয়টা স্বাভাবিক ছিলো। তবে তার সাধাসিধা মস্তিস্কে এতো কিছু ভাবার প্রয়োজনবোধ করলো না। নতমস্তকে জবাব করলো।

—’ উহু।’
এই মূহুর্তে নূরির মাথায় কি চলছে বোঝা গেলো না। মুখের ভাবভঙ্গি অতি স্বাভাবিক।
—’ বিয়ের এতোগুলো দিন হয়ে গেলো বার্বি। এখনো এটা বললে চলে? বড়ভাইয়ার জীবনে আদৌ কেউ আছে কি-না সেটা জানতে চাসনা?’
তিতির জড়তা ভুলে মাথা তুললো। ঠোঁট কামড়ে বললো,
—’ তোমার ভাইয়ের জন্য নয়। আমার জন্য বিষয়টা এগোচ্ছিলো না আরকি।’
—’ তোর জন্য? কেনো?’
—’ আমাদের সম্পর্ক যখন স্বাভাবিক হলো আমরা দু’জনেই চাচ্ছিলাম দুজনকে একটু সময় দিতে। তারপর তো তোমার ভাই ঢাকা গেলো, আমার… আমার মান্থলি প্রবলেম । সব মিলিয়েই আরকি। এখনো এগোয়নি আরকি।’
নূরি স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয় বোনের দিকে অনেকক্ষণ। তার যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে। ওদিকে নিশির গলার হাঁকডাক শুনতে পাওয়া যাচ্ছে। নূরি বিছানার এক কোনা থেকে তার ব্যাগ তুলে কাঁধে নিতে নিতে শীতল গলায় বললো,
—’ ওই একটা বিষয়ে দুটো মানব মানবির সম্পর্কের পুরো সমীকরণে পরিবর্তন ঘটে, বার্বি। একে অপরকে আটকে রাখার মাধ্যমও ওটা। আমার মনে হয় আর সময় না নেওয়াই ভালো। তোকে কথাটা আগেও বলেছিলাম কিন্তু।’

ভর দুপুরবেলা। খড়খড়ে রোদ চারিদিকে। সূর্য একেবারে মাথার ওপরে এসে কটাক্ষ করছে যেনো। দেওয়ানবাড়ি নিস্তব্ধ একপ্রকারে । তার কারণও আছে। বাড়ির ছেলেমেয়েরা সবাই স্কুল কলেজে । আজ থেকে নিশি, নূরির ভার্সিটিও খুলেছে। ওরাও আজ নেই। কর্তারা তো সব অফিসেই। বাড়িতে এই মূহুর্তে তিন গিন্নি আর তিতির ছাড়া কেউ নেই। তারাও যার যার ঘরে দরজা ভেজিয়ে ভাতঘুমে মগ্ন । তিতির দুপুরের খাবার খেয়ে ঘরের মধ্যে ব্যাস্ত সময় পার করছে। টুকিটাকি জিনিসপত্র গুছিয়ে নিচ্ছে মাঝারি একটা ব্যাগের মধ্যে । দু তিন দিনের জন্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আরকি।

অফিস থেকে ঈশান ফেরা মাত্র চন্দ্রা দেওয়ানের আশ্রমের দিকে রওনা দেবে ওরা দুজন। রাহেলা ছেলেমেয়ে দুটোকে সকাল সকাল রওনা দিয়ে দিতে বললেও ঈশানের কাজের ব্যাস্ততায় সেটা হয়ে ওঠেনি। পথঘাটের অবস্থা খুব একটা ভালো না। শহরের ভিড়ভাট্টা থেকে একটু বাইরের দিকেই যেতে হবে। রাস্তা খুব একটা নিরাপদ নয় রাতের বেলা। তবে কিছু করারই নেই। এতোদিনের অনুপস্থিতিতে রাইসুল দেওয়ান ছেলের ওপর একগাদা কাজ ঠেসে দিয়েছেন। রাগ থেকেও বলা যায়। ছেলেকে জব্দ করতে মরিয়া যেনো সে।
বাড়ির বাইরেও মানুষজনের সমাগম একদম নেই। জৈষ্ঠ্যের এই গরমে এমন ভর দুপুরে কোন বেআক্কলই বা বাইরে ঘোরাঘুরি করবে নেহাৎ দরকারি কাজ ছাড়া! জমিতে ধান কাটার মৌসুম চলছে, শেষের দিকেও বলা যায়। হাতে গোনা কয়েকটা জমি বাদ আছে। বাকিসব খা খা করছে একদম। সে-সবে ব্যাস্ত চাষিরা হয়তো ধান মাড়াইের কাজে ব্যাস্ত, কোনোটায় বা তাদের গিন্নিরা সে ধান সেদ্ধ করে ঘরে তোলার কাজে মগ্ন।
তিতিরের ভার্সিটির ক্লাস শুরু হবে সামনে রবিবার থেকে। ঈশানের সাথে সেটা নিয়েও কথা বলা দরকার। হোস্টেলে ফিরতে হবে জলদিই। তবে এবারে প্রথম পড়াশোনায় এতো অনিহা কাজ করছে তার। হোস্টেল যাওয়া মানে ঈশানকে ছেড়ে থাকা। এই কয়দিনের বিবাহিত জীবনের অভ্যস্ততায় এটা বেশ বুঝে গিয়েছে– ঈশানকে একদণ্ড না দেখে সে থাকতে পারে না। অথচ যেতেও হবেই। অবশ্য হোস্টেলে ফিরে যেতে না চাওয়ার আরও কিছু কারণ অবশ্যই আছে। তারমধ্যে একটা রাহাত। অন্যটা সেই অজানা ফোনকল। দুটোকেই আজকাল ভয় করে তার। রাহাতের ফ্ল্যাট তার হোস্টেলের ঠিক পাশের বিল্ডিং। অপর দিকে ওই ফোন কলের মালিক কে, কি উদ্দেশ্যে বারংবার তাকে বিরক্ত করছে সেটাও জানে না। ঈশানকে জানানো হয়নি এখনো। তিতির মন শক্ত করে বসলো। আজকে মনে করে ঈশানকে সেটা না বললেই নয়।

নূরির ভার্সিটির ক্লাস শেষ হয়েছে দুপুর দেড়টার দিকে। বাড়ির গাড়ি করে এসেছে, ফিরবেও বাড়ির গাড়িতেই। এই মূহুর্তে ভার্সিটি ক্যাম্পাসের ভিতরে ছোট্ট একটা ক্যাফেতে বসে আছে সে। নিশির ক্লাস শেষ হবে আরও ঘন্টাখানেক পর। একসাথেই বাড়ি যাওয়ার কথা দুজনের।
ক্যাফে ভর্তি সব স্টুডেন্টরা। আড্ডায় ব্যাস্ত। নূরির অবশ্য বন্ধুবান্ধব একটু কমই। যারাও আছে বেশিরভাগই প্রথম দিন বলে আসেনি হয়তো বা। তার হাতে একটা কোল্ড কফি। সেটা নাড়াচাড়া করছে প্রায় মিনিট বিশেক হলো। সেটা মুখে দেওয়ার কথাও হয়তো বা ভুলে বসে আছে সে। চোখমুখ অস্বাভাবিক শুকনো হয়ে আছে।

—’ একটা ক্যাপাচিনো…’
নূরির পাশের চেয়ার টেনে বসতে বসতে কেউ একজন ওয়েটারকে ক্যাপাচিনোর বায়না টা দিলো। অতি পরিচিত অথচ অনাকাঙ্ক্ষিত কন্ঠস্বরে বিষ্ফরিত নয়নে মুখ তুলে তাকালো নূরি। রুহ আত্মা কেঁপে উঠলো একপ্রকারে। অস্ফুটস্বরে শুধু উচ্চারণ করতে পারলো ব্যাক্তিটির নামটা।
—’ইয়াজ?’
ইয়াজ একগাল হেসে চোখের সানগ্লাস টা নামিয়ে রাখলো টেবিলটায়। শার্টের ওপরের বোতাম একহাতে আলগা করতে করতে অস্থির ভঙ্গিতে বসলো। চোখেমুখে নিদারুণ ক্লান্তি এনে বললো,
—’প্রচন্ড গরম, জান । অথচ কি খাটনিই না খাটতে হচ্ছে তোমার বোনটার জন্য। ‘
নূরির মুখ রক্তশূণ্য। ভয়ার্ত চোখে তাকালো এদিকওদিক। কেউ-ই ওদের খেয়াল করছে না। ইয়াজের মাথায় একটা কালো ক্যাপ। মুখ অর্ধেক ঢেকে আছে তাতেই। অস্থির মন নিয়ে খুঁজলো পরিচিত কোনো মুখ। কাকে পাবে? আর কারই বা আশা করছে সে। ইয়াজ নূরির হাতের কোল্ড কফিটা নিজের দিকে টেনে নিয়ে চুমুক দিতে দিতে বললো,
—’ যা জানতে বলেছিলাম, জান?’
নূরি পাথর হয়ে বসে থাকে। শ্বাস নিতেও ভুলে গেছে যেনো। ইয়াজের তো আজ আসার কথা ছিলো না। কোথা থেকে এসে হাজির হয়েছে? আবার কোন মতলবেই বা এসেছে। ঈশান আর তিতির আজ বাড়িডে থাকবে না। আবার কোন ঝামেলা ঘটাবে লোকটা। নূরি ভাঙা ভাঙা আওয়াজে বললো,

—’ হুম।’
—’ ইও্যর সিস্টার ইজ স্টিল ফ্রেশ? ‘
ইয়াজের অশ্লীল ইঙ্গিতে গা রি রি করে ওঠে নূরির। লোকটার শরীরে কড়া পারফিউম এর ঘ্রানে শ্বাসকষ্ট হচ্ছে তার। অস্বস্তি তে মিশে যাচ্ছে। নূরির জবাব না পেয়ে ইয়াজের কন্ঠস্বর খানিকটা কঠিন শোনালো এ যাত্রায়। চাপা ধমকে জিজ্ঞেস করলো,
—’ তোমার ভাই ছুঁয়েছে আমার তিতিরকে?’
নূরি মাথা নিচু করে ডানে বায়ে মাথা নাড়তেই বিজয়ের হাসি ফুটলো ইয়াজের চোখেমুখে। নিজের খসখসে হাতটা এগিয়ে নিয়ে রাখলো নূরির হাতের ওপর। বিদ্যুৎ স্পৃষ্টের মতো কেঁপে উঠলো নূরি। ভালোবাসার অনূভুতিতে নয়। ঘৃনায়। আলগোছে হাত টা সরিয়েও আনলো।
—’ তুমি এখানে কি করছো? আমি তো জানাতামই বিষয়টা।’
—’ভাবলাম নিজে কানে প্রত্যক্ষভাবে শুনে আসি। তাছাড়া তোমাকে মিস করছিলাম কি-না।’
নূরির মুখের কোনো ভাবান্তর হলো না। ঘাবড়ে আছে সে এখনো। লোকটার চরিত্র সম্পর্কে যা টের পেয়েছে। নিশিকে সামনে পেলে আবার কি থেকে কি করে বসবে।
নূরি যথাসম্ভব শান্ত স্বরেই বললো,

—’ ঠিক কি কি করলে তুমি আমাকে আর আমার পরিবার কো মুক্তি দেবে, বলতে পারো? কোন পাপের শাস্তি দিচ্ছো তুমি আমাকে?’
ইয়াজ বাঁকা হাসলো। গলার স্বর খাদে নামলো তার।
—’ পাবলিক প্লেস বলে কৈফিয়ত চাওয়ারও সাহস করছো, জান?’
—’ হাতি কাঁদায় পরলে চামচিকেও লাথি মারে ইয়াজ। দেওয়ানদের সাথে লাগতে এসো না। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।’
ইয়াজ আওয়াজ করে হাসলো। তার অর্ডার করা ক্যাপাচিনো চলে এসেছে। নূরির কোল্ড কফির মগ টা ঠেলে দিয়ে নিজেরটাতে আয়েশ করে চুমুক দিলো।
—” অস্তিত্ব থাকলে তবে তো নিশ্চিহ্ন করা যায়, জান। যার অস্তিত্বই নেই তাকে ধরাছোঁয়া কি এতই সহজ? আর কে ধরবে? তোমার ভাই? সে তো নিজেই মরিচীকায় ডুবে আছে।’
নূরির চোখ জ্বলজ্বল করে ওঠে। রাগে,ঘৃনায়। তার ভুলের জন্য আজ কি এই মাশুল দিতে হচ্ছে? হয়তো তাই। নূরি আশেপাশে আবার তাকালো। ক্যাফে ভর্তি মানুষ। নিশির আসতে আর কিছুক্ষণ সময়। এই লোকটাকে সরাতে হবে এখান থেকে।
নূরি পুনরায় একই প্রশ্ন করতেই ইয়াজের মুখের হাসি মুছে কেমন গম্ভীর হলো। যেনো গভীর চিন্তায় মগ্ন।

—’কি করলে তোমাকে মুক্তি দেবো? কি করলে বলো তো? ‘
নূরি সরু চোখে তাকিয়ে আছে। সে খুব ভালো করেই যানে ইয়াজ শেষমেশ কি চাইবে, কাকে চাইবে। হলোও তাই। নূরির ধারনাকে সত্যি করে দিয়ে ইয়াজ বাঁকা স্বরে বললো,
—’তোমার বোনকে কষ্ট করে একটু আমার বেড অব্দি আনার ব্যাবস্থা করে দিলেই হবে। তোমার ভাই এখনো ছোঁয়নি বলে কথা। ঈশান আরশাদ দেওয়ানের বউ আমার আদরে, আমার বিছানায় গোঙাবে,কাতরাবে। এর থেকে বড় প্রাপ্তি আর কিছু হয় নাকি? হয়না তো। ওকে এনে দাও। আমি নিজে থেকে নিয়ে আসলে ঘন্টাখানেকের ব্যাপার হবে সেটা। কিন্তু কেনো করছি না বলোতো? তোমার ভাইকে একটু নাচাতে আমার খুব ভালো লাগছে। বলাবাহুল্য তোমার ভাইও আমাকে কম হ্যারাস করছে না। সমানে সমান ব্যাপার স্যাপার বুঝলে,জান।’
নূরি দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সে তো জানতোই আগে বা পরে ইয়াজের উত্তর একই থাকবে। অথচ বিগত তিনটে বছর পাগলের মতো ভালোবেসে গেলো লোকটাকে। ক্ষুনাক্ষরেও বুঝতে দেয়নি তাকে ওপরে ওপরে ব্যবহার করলেও ভিতরে সাজাচ্ছে তাদের ধ্বংসের পরিকল্পনা। নূরি দু হাত টেবিলে রেখে ঝুকে এলো ইয়াজের দিকে।
—’ ওকে পেলে আমাকে দেওয়া সব চুক্তি তুলে নেবে তুমি? মুক্তি দেবে?’
—’ স্বাচ্ছন্দ্যে । ওকে নিয়ে আমি ভ্যানিশ হবো। এদিকে তোমাদের পরিবার আবার আগের মতোন হয়ে যাবে। ভাইকে নতুন একটা বিয়ে করাবে, নিজে বিয়েশাদি করে সুখের সংসার বানিয়ে ফেলবে। সব ওকে তখন। ভালো না?’
—’ ওকে, ডিল ডান। পাবে তুমি তিতিরকে। আমি কথা রাখবো। তিতিরকে তুলে দেবো তোমার হাতে। তার বদলে চুপচাপ কারোর কোনো ক্ষতি না করে আমাদের মুক্তি দিয়ে চলে যাবে তুমি। এমুখো আর এজীবনে হবে না।’

গাড়ির এসি চলছে ফুল দমে । যদিও তিতিরের ছটফটে হাত বারবার নামিয়ে দিচ্ছে গাড়ির কাচ। আর ঈশান বিরক্ত দৃষ্টি দিচ্ছে ওর দিকে। ঈশান অফিস থেকে ফেরা মাত্র আর দেরি করেনি ওরা। তিতির সব গুছিয়েই রেখেছিলো। ঈশান ফেরা মাত্র রওনা দিয়ে দিয়েছে। অনেকটা পথ ।বের হতে হতেই এশার ওয়াক্ত পার হয়ে গিয়েছে । আরও দেরি হলে পৌছুতে পৌছুতে বেশ রাত হয়ে যাবে।
ওদিক থেকে চন্দ্রা দেওয়ান অবশ্য বলছিলো রাত করে রওনা না দিয়ে কাল সকালে না হয়। তবে ঈশান সে-সব শোনার পাত্র নয় মোটেই। ভূতপ্রেত বলা হোক বা মানুষ সে সেসবের পরোয়া কবে করেছে।
তাদের এলাকার রাস্তা পার হয়ে গাড়ি মেইন রোড ধরে চলছে। বাইরে সুন্দর শীতল বাতাস। রাতের বেলা জার্নি করার মজাই আলাদা। রাতের পরিবেশই অন্যরকম থাকে। তবে ঈশান কাচ নামাতে না দেওয়ায় বড্ড ক্ষেপে আছে তিতির। বাইরের এতো সুন্দর বাতাস রেখে এরকম বন্দির মতো এসি দিয়ে বসে থাকার মানে হয় কোনো!
—’আপনি বড্ড একরোখা ঈশান ভাই। কিছুক্ষণের জন্য একটু গ্লাস নামাতে দিলে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়?’

ঈশান জবাব দেয় না। মন, মস্তিষ্ক এমনিতেই চটে আছে আজকে। অফিসে বাবার সাথে আরেকদফা ঝামেলা হয়ে গিয়েছে। সেখানে সারাদিনের কাজের প্রেশার, বাবার সাথে অশান্তি। বাড়িতে এসে একদন্ড বসারও সময় পায়নি। আবার মেয়েটাকে নিয়ে রওনা হয়ে গিয়েছে। এতোটা পথ ড্রাইভ করে যেতে হবে। এর মধ্যে সবকিছুই অসহ্য লাগছে। দিনে দুবার করে শাওয়ার না নিলে শান্তি লাগে না তার। আর এদিকে এই গরমে আজ সারাদিন একবারও শাওয়ার নেওয়া হয়নি। দুপুরের লাঞ্চ করা হয়নি, সকালের পর কফি খাওয়া হয়নি।
ঈশানের জবাব না পেয়ে আড়চোখে তাকায় তিতির। লোকটা অফিস থেকে ফেরার পরও একটা কথাও বলে নি তার সাথে। কি হয়েছে জিজ্ঞেস করতেই একটা অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে চুপ করিয়ে দিচ্ছে তাকে। কারণে অকারণে খেপে থাকে লোকটা। না বললে সমাধান হবে কি করে! তিতির আর কথা বাড়া না। কথায় কথা এতো ধমক শুনতে কারই বা ভাল্লাগে।

লোকেশন দেখে ঈশান। প্রায় আড়াই ঘন্টার পথ। পথের দুরত্ব বেশি না হলেও, রাস্তার দূর্গতির জন্য যাতায়াত খুবই কষ্টের। তার দিদা ওই অসুস্থ শরীর নিয়ে এই রাস্তায় কিভাবে চলাচল করে কে জানে। ঈশান এর আগে বেশ কয়েকবারই এসেছে তাদের আশ্রম গুলোতে। সুতরাং সব দিকের রাস্তার হদিশই জানা তার। ঘড়িতে সময় দেখে নিলো, তারপর তিতিরের গম্ভীর মুখটাও পরখ করে নিলো একদফা। সে যে সর্টকাট ধরে এগোতে চাচ্ছে সেটা একপ্রকার পরিত্যক্ত রাস্তা। নাহ,পরিত্যাক্ত নয় ঠিক। তবে রাত করে সেদিক দিয়ে কম মানুষেরই যাতায়াত হয়। লোক কুসংস্কার এর কারণে যাকে বলে আরকি। তবে ঈশানের সে-সবে চিন্তা নেই। চিন্তা তো তিতিরকে নিয়ে। মেইন রাস্তা ধরে এগোলেও সামনে বেশ খানিকটা পথ এই রাস্তায় ঢুকতে হবেই। তার থেকে ভালো এখান দিয়েই যাওয়া যাক। প্রায় মিনিট পঞ্চাশ সময় বাঁচবে। এখনই বাজে রাত নয়টা। পৌছুতে লেগে যাবে রাত বারোটা।
ঈশান বাউ করে গাড়িটা ঘুরিয়ে ফেললো হাতের ডান দিকের রাস্তার দিকে। রাস্তা যথেষ্ট প্রস্যস্ত। তাদের সামনে অদূরে একটা ট্রাকও যাচ্ছে এই রাস্তা ধরে। সে বেচারারও বোধহয় গন্তব্যে পৌছানোর ভীষন তাড়া।
তবে তিতির চমকে উঠলো। এই রাস্তা সম্পর্কে যা যা শোনা যায় তার কানেও এসেছে। আগে থেকেই তারা জানে এই রাস্তা সম্পর্কে। তাছাড়া আজ বের হওয়ার সময়ও রাহেলা বারবার করে বলে দিয়েছে সোজা রাস্তা ধরে যেতে। তিতির আতঙ্কিত মুখে তাকালো ঈশানের দিকে। সে মহাশয় চোয়াল শক্ত করে ড্রাইভ করে যাচ্ছে একমনে। তিতির কম্পিত কন্ঠে বললো,

—’ এ-এখান দিয়ে কেনো?’
—’চুপচাপ বসে থাক। ‘
তিতির নিজের কোমড়ের সিট বেল্ট আলগা করে ঘুরে বসলো ঈশানের দিকে। সামনে রাস্তার দিকে একনজর দিয়ে পুনরায় বললো,
—’ এই ঝোপঝাড়ের রাস্তায় এই অসময়ে যায় কেউ? গাড়ি ঘোরান। রাস্তাটা ভালো না। সবাই বলে।’
—’ বলুক। মামাবাড়ির আবদার পেয়েছিস। এতদূর এসে গাড়ি ঘোরাবো! ‘
তিতির চটে গেলো একপ্রকার। বাড়ির মানুষ ঈশানকেও পইপই করে বলে দিয়েছে এই রাস্তা ধরে না যেতে, ওদিকে চন্দ্রা দেওয়ান ও আন্দাজ করেছে নাতির মতিগতি। সেও সতর্ক করে দিয়েছিলো। কারোর কথা মানার প্রয়োজনবোধ করে না লোকটা। তিতির বিরক্ত কন্ঠে বললো,
—’ এতো জেদ কেনো বলুন তো? ‘
—’ ইচ্ছে করে নিয়ে এসেছি। ‘
তিতির বিষ্ময়মাখা গলা শুধালো,

—’ জেনে-বুঝে এমন ঝোপঝাড়ের রাস্তায় নিয়ে এলেন? মেইন রোড ধরে গেলে কি অসুবিধা হতো আপনার? মতলব তো সুবিধার না। কি করতে চাচ্ছেন?’
ঈশানের কপালে সরু ভাজ পরলো। মুখে বিরক্তসূচক শব্দও করলো। মেয়ে জাতী বলতেই বেশি বোঝে। বেশি কথা বলে। কমনসেন্সের কথা তো না বলাই ভালো। সে ওর স্বামী। স্বামী সাথে আছে। ঝোপঝাড়ে নিয়ে গেলে তাই যাবি। তা না। কে কি নিষেধ করে দিয়েছে সেটার দোহাই দিয়ে স্বামীকে উল্টাপাল্টা কথা বলা শুধু! ঈশান দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
—’কথার টোন আগে ঠিক কর। ঝোপঝাড়ে নিয়ে যাচ্ছি। মতলব ভালো না। এসব কি ধরনের কথাবার্তা? কি করতে চাচ্ছি মানে?’
তিতির দৃঢ় গলায় বললো,
—’আপনি সোজা পথ রেখে ঝোপঝাড়ে নিয়ো যেতে পারেন। আর আমি বলতে পারবো না? ‘
ঈশান শ্লেষাত্মক হাসলো। বাঁহাতের আঙুলে কপাল ডললো। অসহ্য মাথা যন্ত্রণা করছে। তিতিরের দিকে তাকিয়ে ভ্রু বাঁকিয়ে বললো,

—’ যে শুভ কাজ তোর শশুরের আলিসান মহলে সাজানো গোছানো বিছানায় এখনো হয়নি আমাদের। সেটা এই ঝোপেঝাড়ে সারবো? আমি ঈশান আরশাদ দেওয়ান। ইমেজ আছে আমার একটা। ষ্টুপিড কোথাকার।’
তিতির নাক সিটকে অন্য দিকে তাকায়। রাস্তার আশেপাশে বিশাল বিশাল গাছপালা। মাথার ওপরে চাঁদ জ্বলজ্বল করছে। গাড়ির হেডলাইন বন্ধ থাকলেও বোধহয় গোটা রাস্তা দৃশ্যমান থাকবে। তবে মোটেই তিতিরের কাছে সেটা রোমান্টিক মনে হচ্ছে না এই মূহুর্তে। ভয়ার্ত পরিবেশ বলা যেতে পারে। সেই যে শুরুতে তাদের সামনে দিয়ে একটা ট্রাক পার হয়ে গিয়েছে। এতক্ষণেও আর একটা গাড়ির দেখা পাওয়া যায়নি। তিতির রোবটের মতো বসে আছে। আর ক্ষনে ক্ষণে তাকাচ্ছে ঈশানের দিকে। মানুষ টার মুখ কেমন শুকনো লাগছে। তিতির শান্ত স্বরে বললো,
—’আপনার কি মাথা যন্ত্রণা করছে?’
—’করলে কি করবি? গাড়ি থামাবো? মাথায় হাত বুলিয়ে দিবি? চাঁদের আলোয় রোমান্স করি, আয়। ‘
তিতির ছিটকে সোজা হয়ে বসে। এই রাস্তায় গাড়ি থামিয়ে রোমান্স করার মতো মনমানসিকতা হয় কি করে কারোর! তার এ জীবনে হবে না। মিহি কন্ঠে বলে,

—’ এখন কি করে কি? পৌছাই। ঘুমানোর সময় মাথায় হাত বুলিয়ে দেবো।’
ঈশান নির্বিকার মুখ ড্রাইভিং এ ব্যাস্ত। মেয়েটার শেষ লাইন তার অস্থির মন আরও একটু অস্থির করে দিয়ে বসে আছে। এখন মনে হচ্ছে দু ঘন্টার রাস্তা দু মিনিটে পৌছে বউয়ের কোলে মাথা রেখে কখন ঘুমাবে!
তিতির পিছনে দিকে ফিরে ব্যাক সিট থেকে একটা ছোটখাটো ব্যাগ টেনে নিয়ে আসলো। সেটা রাখলো নিজের কোলের ওপর। ডোরেমনের ঝোলার মতো সেটা থেকে এক এক করে বের করলো একটা ফ্লাক্স, মগ আর কিছু শুকনো খাবারা। পাশের খচখচ আওয়াজে তাকাতেই ঈশানের চোখে পরলো সে-সব।
—’কফিটা খেয়ে নিন ভালো লাগবে।’
—’কফি আনলি কি মনে করে আবার?’
তিতিরের হাত থেকে কফির কাপটা নিলো ঈশান। ছোট্ট করে চুমুক দিতেই মস্তিষ্ক ঠান্ডা হলো অনেকটা। কি যে কফির ক্রেভিং হচ্ছিলো!
তিতির আরেকটা বক্স থেকে স্যান্ডউইজ বের করতে করতে বললো,

—’ সারাদিন অফিসে ছিলেন। দুপুরে কি খেয়েছেন সেটাও তো জানিনা। সকালে শাওয়ার নিয়ে যায়নি। এসেও তো কোনোকিছুরই সময় পেলেন না। ঘন্টায় ঘন্টায় কফি লাগে। নিশ্চিত মাথা ধরবে জানতামই। খিদেও পাবে। তাই খাবারও নিয়ে এসেছি। ‘
ঈশান মুগ্ধ হলো। ভীষন মুগ্ধ হলো। খেয়াল হলো তিতিরের যত্নে হৃদ স্পন্দন ছুটছে তার। মেয়েটা এতোকিছু খেয়াল করে রেখেছে!
গাড়িটা অনেকটা ধীরগতিতেই চলছে। তিতির ভয় পাবে বিধায় গাড়িটা থামিয়ে খাবার খাচ্ছে না ঈশান। তিতির নিজের হাতের স্যান্ডউইজ টা ধরলো ঈশানের মুখে।
—’উমমম, হা করুন দেখি। খেয়ে নিন।’
ধুকপুক, ধুকপুক, ধুকপুক। ঈশান নিজের বুকের বাঁ পাশের জোরালো শব্দ বেশ টের পাচ্ছে। হতে পারে খুব সামান্যই এসব। তবে প্রেমিক পুরুষদের জন্য এতটুকুই আকাশসম মনে হয়। ঈশান বিনাবাক্যে কামড় বসায় তিতিরের হাতের স্যান্ডউইজ টাতে।

—’তুই খেয়েছিস রাতে।’
—’উহু। খাবো।’
ভ্রু কুচকে তাকায় ঈশান। সে না হয় তাড়াহুড়োয় সময় পায়নি। এ মেয়েতো বাড়িতেই ছিলো!
—’ খেয়ে বের হসনি কেনো?’
তিতির জবাব দেয় না। ঈশানে ঠোঁটের পাশে লেগে থাকা খাবারের অংশটুকু আঙুল ছুয়িয়ে মুছে ফেলে। এখন কি করে বলবে ঈশান সারাদিন না খেয়ে আছে জানার পর খাবার গলা দিয়ে নামতো না তার। পুনরায় খাওনোয় মনোযোগ দিয়ে মুখে বলে,
—’ খিদে পায়নি তখন। এখন পাচ্ছে। তাই এখন খাবো।’
ঈশান আর প্রশ্ন করে না। সারাদিন পর খাবার পেটে পরায় এখন বেশ ভালো লাগছে। তিতির একে একে খাবারগুলো শেষ করে ঈশানকে খায়িয়ে। নিজেও খেয়ে নেয়। পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবারই নিয়ে এসেছিলো। আশেপাশের গাছপালা পাতলা হয়েছে অনেকটাই। চাঁদের আলোও তাই বেশ বোঝা যাচ্ছে। গাড়ির ভিতরে মৃদু আওয়াজে মিউজিক প্লেয়ার ছেড়ে রাখা। একেরপর এক গান বেজে যাচ্ছে সেটায়।

—’ আর কতদূর? ‘
—’ঘন্টা দেড়েক।’
—’ টায়ার্ড খুব?’
—’খুবই।’
—’ আরও কিছু খাবেন? ফ্রুটস আছে কিছু।’
—”উমমম, না। তোর খিদে পেলে খেয়ে নে।’
তিতিরও মাথা নাড়ে। তার খিদে নেই। ঈশান ড্রাইভিং এর সময় বরাবরই কেমন একটা চুপচাপ থাকে। তিতির উশখুশ করে ওঠে। এত চুপচাপ ভালো লাগে! বেশ রাত হয়েছে। ঘুমানো যায়। কিন্তু ঘুম নেই চোখে।
হঠাৎ মাথায় আসলো সেই ফোন কলটার কথা। ধক করে উঠলো বুক। চোখের সামনে ভেসে উঠলো একটা গাড়ি, কানে বাজলো গগনবিদারী চিৎকার চেচামেচি। কেঁপে উঠলো তিতির। ঈশানকে বলা দরকার৷
—’কোনো সমস্যা? কিছু লাগবে?’
ঈশানও খেয়াল করেছে মেয়েটার নড়চড়। তিতির বড় করে শ্বাস টেনে বললো,
—’ আপনাকে কিছু কথা বলতে চাই, ঈশান ভাই।’
—’বল, শুনছি।’

—’ আমি যখন ক্লাস নাইনে পরি তখন আমার স্কুলের সামনে একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়। গাড়িটা সম্ভবত ব্রেক ফেল করেছিলো। তেড়ে আসছিলো আমার দিকে। কিন্তু ঠিক আমার সামনে কয়েক হাত সামনে থেকে আচমকা ঘুরে যায়। রাস্তার কিনারায় একটা বাচ্চা মেয়ে ফুল হাতে দাড়িয়ে ছিলো। গাড়িটা সোজা তার ওপর তুলে দেয়…’
একে একে সেদিনের সব ঘটনা খুলে বলে তিতির। সেদিনের পর থেকে মানসিক ট্রমা, তার চাচা, ডাক্তার সবার চেষ্টা এতগুলো দিন পর সুস্থ হয় সে। সে-সময় রাহাতও বেশ সাহায্য করেছিলো তিতিরকে। সেই রাস্তা থেকে জ্ঞানহারা অবস্থায় তিতিরকে হাসপাতালে নিয়ে যায় সয়ং রাহাত। ঈশান গভীর মনোযোগে ভ্রু কুচকে শুনে যাচ্ছে সবটা। এসব তার অজানা নয়। ইয়াজ তাকে বলেছে। গাড়িটা যে ইয়াজের ছিলো তাও ঈশান যানে।
তিতির এবার আসলো সেই ফোনকলের কথায়। এবার কেপে উঠলো ঈশানের হাত। গাড়ি থেমে গেলো আচমকা।
তিতিরের দিকে তাকিয়ে ব্যাস্ত কন্ঠে বললো,
—’ আগে কেনো বলিসনি?’
তিতির আমতা আমতা করলো খানিকটা। মিনমিন গলায় বললো,
—’ আ-আপনি সেদিন ঢাকা যাচ্ছিলেন। আপনাকে চিন্তায় ফেলতে চাইনি।’
ঈশানের কপালের রগ ফুলেফেঁপে উঠেছে আচমকা।
রাগী গলায় বললো,

—’আর কি বলেছে?’
—’ আমার জন্য নাকি মেয়েটার অ্যাক্সিডেন্ট…আমি দায়ী… ‘
আচমকা ফুঁপিয়ে উঠলো তিতির। এই বিষয়টা কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিলো তাকে। ঈশান রেগে থাকতে পারলো না। তিতিরের কান্না নরম করে ফেললো তাকে।
ঝুকে এলো তিতিরের দিকে। আদুরে ভঙ্গিতে নিজের পুরুষালি হাতের স্পর্শ করলো তিতিরের ঘাড়ে। টেনে আনলো নিজের দিকে। নিজের ঠোঁটের ছোঁয়ায় শুষে নিলো তিতিরের গালে গড়িয়ে পরা নোনাজল। আলতো চুমু খেলো মেয়েটার চোখের পাতায়।
—’ ইউ আর নট গিলটি। কিচ্ছু করিসনি তুই। তোর জন্য কিচ্ছু হয়নি। কাঁদছিস কেনো?’
তিতিরের দু হাত ততক্ষণে ঈশানের পেটের কাছের শার্টের অংশ আকড়ে ধরা। ওই ফোনকল গুলো পাওয়ার পর থেকো অপরাধবোধে চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যাচ্ছিলো সে। কান্নামাখা গলায় বললো,
—’গাড়িটা আমার দিকে আসছিলো। আমাকে বাঁচাতে নাকি ওই মেয়েটার… ‘

ঈশান তিতিরের মাথা টেনে চেপে ধরলো নিজের বুকে। গাড়িটা তিতিরকে চাপা দিতে আসছিলো। কথাটা যতবার কানে আসে, হৃদয় থমকায় তার। তার থেকেও বড় কথা মেয়েটার সাথে যা হয়েছে সবই ঈশানকে শাস্তি দেওয়ার জন্য। তার পরিবার কে আঘাত করার জন্য। তখন না হয় বিন্দুমাত্র অনূভুতি ছিলো না মেয়েটার প্রতি। আর না তো কখনো ভেবেছিলো এই মেয়েটা বউ হবে তা। কিন্তু হয়েছে, সেটাই হয়েছে। ভাগ্য তাদের কোথা থেকে কোথায় এনে এক করে দিয়েছে। মেয়েটাকে হারানোর কথা ভাবতেই পারে না ঈশান।
তার মরুভূমির জীবনে একপশলা বৃষ্টি হয়ে নেমেছিলো এই নারীটি। প্রেমহীন জীবনে প্রথম বসন্তের ছোঁয়া দিয়েছে এই মেয়ে। জোরজবরদস্তির বিয়ে রুপ নিয়েছে মাতাল প্রেমে। আজকাল কঠিন ভাবে টের পায় সে।
তিতিরের ফুঁপিয়ে কান্নায় কেঁপে উঠছে ঈশানের বুক। ভিজে উঠছে শার্টটা। মেয়েটা প্রকাশ না করে কতটা মানসিক যন্ত্রনা মনে চেপে ছিলো,ভাবতেই বুকটা দুমড়েমুচড়ে উঠলো ঈশানের। সিল্কি চুলে হাত বুলোতে বুলোতে বললো,
—’ আমি বলেছিলাম তোকে। আমি অন্ধকারের মানুষ, তিতির। আমার সাথে সংসার করতে গেলে অনেক কিছুর মুখোমুখি হতে হবে তোকে।’

তিতিরের কান্না থামে আচমকা। ওই ঘটনার সাথে ঈশানের সম্পৃক্ততা কোথায়! তার উত্তরও দিলো ঈশান নিজেই।
—’ লোকটা আমার শত্রু, তিতির। আমার থেকে তোকে দূরে করতে মরিয়া সে। তবে আর কোনো খারাপ হতে দেবো না আমি। কারোর সাথেই। আগলে রাখবো তোকে।
যেকোনো মূহুর্তে, যখনি মনে হবে দুনিয়ার এই জঘন্য রুপ তুই দেখতে পারছিস না, সহ্য করতে পারছিস না। এই বুকটা সবসময় তোর জন্য। এখানে চুপটি করে মুখ লুকাবি। বাকিসব সামলে নেবো আমি। কেমন?’
তিতির নাক টানলো। মাথা নাড়লো ওপর নিচ। ঈশান শুকনো চুমু আকলো তিতিরের মাথায়।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪৭

—’ এ-সব নিয়ে ধীরেসুস্থে বসে আমরা আলোচনা করবো। কেমন ? আশ্রমে পৌছাই তারপর। ‘
তিতিরের খেয়াল হলো অনেকক্ষণ যাবৎ এখানে থেমে আছে তাঁদের গাড়ি। রাত গভীর হচ্ছে, অথচ এই জঙ্গলের রাস্তা এখনো পার হতে পারেনি তারা। তিতিরের পাশে রাখা ব্যাগট্যাগ ঈশান হাত নিয়ে ব্যাক সিটে রাখতে ঘুরলো। নিজের কান্নামাখা মুখটা ওড়নায় মুছে নিলো তিতির। মুখের সামনে থেকে ওড়না সরাতেই আচমকা চোখ পরলো সামনের দিকে । একহাত চলে গেলো ঈশানের হাতের দিকে। খামচে ধরলো ঈশানের বাহু। অস্ফুটস্বরে চিৎকার করে উঠলো,
—’ঈ-ঈশান ভাইই…’

সাঁঝের মায়া আকাশপ্রিয়া ক্রসওভার পর্ব