Home সাঁঝের মায়া সাঁঝের মায়া পর্ব ৪

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪

সাঁঝের মায়া পর্ব ৪
দুর এ দিলশাদ্ দুআা

ইশান বিছানায় হেলান দিয়ে অফিসের কাজ করছিলো ল্যাপটপে।একটু পরেই বের হবে।এতদিন পর আসায় বন্ধুগুলো ফোন করে মাথা খাচ্ছে।ভাবি ভাবি করে মুখে ফ্যানা তুলে ফেললো।ভাবি কে না নেওয়ার অযুহাতেও এরা আরও কিছুক্ষণ বিরক্ত করবে। সে সেটা খুব ভালো করেই জানে।ইশান ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে মুখ তোলে।হাতড়ে বালিশের পাশ থেকে ফোনটা হাতে নেয়।আসার পর একবারও রুষার খোঁজ নেওয়া হয়নি।কালকের ঘটনার বিষয়টা মুখে না বললেও দারুণ বিরক্ত হয়েছে সে।সেই রাগ থেকেই আর ফোন দিতে ইচ্ছে হয়নি তার।
ফোন চেক করে ইশান,অবাক হয়।একবারও রুষার ফোন বা মেসেজ আসেনি।এমনটা কখনো হয়না।মেয়েটাই সর্বোক্ষন কল বা মেসেজের ওপর থাকে।আজ তসর ব্যাতিক্রম হওয়ার কারণ কি?ইশান চিন্তিত হয়।বাড়িতে কি বেশি সমস্যা মেয়েটার।সে নিজেই একবার ফোন করবে কি না ভাবতে লাগলো।দু বার কল ডায়াল করেও কল দিলো না কি মনে করে।

ফোন হাতে বারান্দায় এসে দাড়ালো। নিচে রোশনি,রিশা,রাফি তাদের পাশের বাসার ফ্রেন্ড গুলোর সাথে খেলছে।তার রুম আর পাশের রুমের বারান্দা টা তাদের বাগান এর দিকে।বাগান টা দারুন সাজানো,গোছানো।হরেক রকমের ফুল,ফলের গাছ,এমনও আছে যার হয়তো নামই জানেনা সে। এগুলো সব তার বোনেরা কোথা থেকে খুঁজে খুঁজে নিয়ে আসে।
একটা সুইমিং পুল আছে সেখানে,পাশে দোলনা।সুইমিং পুলে এই মূহুর্তে পানি নেই।মনে পরলো আজ রবিবার, আজকে সুইমিংপুল পরিষ্কার করা হয়।একটু দূরেই রহিম চাচা বাড়ির গাড়িগুলো ধুচ্ছে,আর রহমত মালি বাগানের আগাছা পরিষ্কার করছে।

ইশান পাশের বারান্দায় তাকালো।বারান্দা তো নয়,ছোটখাটো একটা গাছের সমাহার। লতায় পাতায় সাজানো বারান্দা। বারান্দায় একটা পাখির খাঁচা। ভিতরে একজোড়া টিয়া পাখি।একটা আরেকটার মাথায় খোঁচাখুঁচি করছে।রুমটায় কে থাকে!সত্যি তো।বাড়িতে আসা হয়না দু বছরের বেশি হয়ে গেছে।আগে তো এ রুম ফাঁকা থাকতো।এখন কে থাকে জানা হয়নি।নিশি,নূরি সবার রুমই আরেকপাশে,নয়নের ও তাই।মোটকথা এদিকটায় শুধু মাত্র এতদিন তার রুমটাই ছিলো।বাকি রুম গুলো ফাঁকাই থাকতো।থাকার কেউ ছিলো না,গেস্ট রুম হিসেবে ব্যবহার হতো।তবে বারান্দায় সাজানো অবস্থা দেখো বোঝা যাচ্ছে এ ঘরের এখন পারমানেন্ট মালকিন আছে সে অত্যন্ত সৌখিন। এ বাড়িতে এতো সৌখিন কে মনে তো পরে না…মাকে জিজ্ঞেস করতে হবে।

ইশান এবার ফোনটা ডায়াল করেই ফেললো রুষার নাম্বার এ।প্রথমবার রিং হয়ে কেটে গেলো।এবার তো আরও অবাক হওয়ার পালা।সে রুষা কে কল দিয়েছে আর সেটা রিসিভ না হয়ে কেটে গেছে এ জন্মে সেটা হয়েছে বলে তো মনে পরেনা। ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইলো নিচে ভাইবোন গুলোর খেলার দিকে।
রুষা কে সে ভালোবাসে কি না এটার থেকে কনফিউশান এর মধ্যে সে কখনো পরেনি।তাহলে কেনো বিয়ে করতে রাজি হয়েছে,সেটাও বোঝে না মাঝেমধ্যে। কারণ প্রেমিক প্রেমিকার চাহিদা সে কখনো রুষার মধ্যে ফিল করেনি,রুষা কাছে আসতে চেয়েছে বহুবার, এমনও হয়েছে সে নিজেও চেয়েছে কাছে যেতে,ভেবেছে একবার কাছাকাছি আসলে হয়তো ফিল করতে পারবে মন থেকে।কিন্তু মন সায় দেয়নি,অন্যায় হবে একটা মেয়ের সাথে, অসম্মান করা হবে এতে।আর সেটা যদি হয় ভালোবাসা অনুভব না করে তাহলে তো আরও।
এবার ফোনের শব্দে তাকালো।রুষার কল।স্বাভাবিক ভাবে কল টা ধরলো ইশান।

“হ্যালো।”
ওপাশ থেকে অত্যন্ত ধীরে উত্তর আসলো
“ইশান?”
“রুষা আর ইউ দেয়ার?”
“হুম।কেমন আছো ইশান”
“আমি ঠিক আছি,তুমি ঠিক আছো?তোমার বাবা এখন কেমন আছে…”
“বাবা ভালো আছেন মোটামুটি।”
রুষা খানিকটা দম নিলো যেনো।তারপর আবার মৃদু স্বরে ডাকলো।
“ইশান?”
“বলো,শুনছি।”
“তোমার বাসার সবাই আমার ওপর বিরক্ত হয়েছে তাইনা?”
“বিরক্ত হবে কেনো!ইট’স নরমাল,প্রবলেম হতেই পারে হুট করে,কেউ কিচ্ছু মনে করেনি।”
রুষা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।ফোনের এপাশ থেকে স্পষ্ট শুনতে পেলো সে।তারপর আবার সেই ধীরে স্বরে প্রশ্ন করলো।
“একটা সত্যি কথা বলবে?”
“কি?”
“তুমি কি আমাকে ভালোবাসো ইশান?”

ইশান বিরক্ত হয়।এ প্রশ্ন টা হাজার বার করে দিনের মধ্যে মেয়েটা।এমন নয় যে সে জবাব দেয় না।সেও হাজার বারই জবাব দিয়েছে। সে সেরকম কখনো ফিল করেনি।এমন নয় যে অন্য কারোর প্রতি ফিল করে তার জন্য। তার জীবন ভালোবাসা, হাবিজাবি ফিলিংস কোনো মেয়ের প্রতি কখনো আসেইনি।
“রুষা।কাম অন।এই ইস্টুপিট প্রশ্ন অনেকবার করেছো,আর আমি জবাবও দিয়েছি।”
“তাহলে বিয়ে করছো কেনো আমাকে?”

ইশান চুপ করে থাকে।কারণ এটার জবাব ও রুষার জানা।মেয়েটা ইশান কে খুব ভালোবাসে।ইশানকে সবরকম ভালো রাখার চেষ্টা করে মেয়েটা।তাছাড়া ক্যাম্পাসে, ফ্রেন্ড সার্কেলের সবাই জানে একটা ডিপ সম্পর্ক রয়েছে তাদের মধ্যে, এখন মেয়েটাকে বিয়ে না করাই ঘোর অসম্মান কর তাকে।তাছাড়া অ্যারেন্জ ম্যারেজ তো মানুষ করে নাকি!দুজন দুজনকে ভালো মতো চেনে,মেয়েটা তাকে চায়,ভালোবাসে,বোঝে।বিয়ে করতে সমস্যা তো নেই।
“তুমি মেয়ে রুষা,তোমার একটা সম্মান আছে।আমি তোমাকে বিয়ে না করলে আমার কিচ্ছু যাবে আসবে না,ট্রাস্ট মি! কিন্তু তোমাকে লোকে কথা শোনাবে।এর দায় ও কিন্তু তোমার?তুমি আমাকে ভালোবেসেছো।নিজেই সম্পর্কের একটা নাম দিয়েছো।আমি সায় দিয়েছি তোমার কথা ভেবে।কিন্তু কিছু যদি অ্যাকচুয়ালি যায় আসে সেটা তোমার।এ কারণে আমি তোমাকে বিয়ে করবো।তাছাড়া আমার জীবনে অন্য কোনো নারী নেই,যার কারণে তোমাকে রিজেক্ট করবো।”
রুষা চুপ করে থাকে।সে জানতো ইশান এই জবাব ই দেবে। শেষ লাইন টা শুনতে তার বড্ড ভালো লাগে।ইশান এর জীবন সে ছাড়া অন্য কোনো মেয়ে নেই।হ্যা এটা ঠিক ইশান তাকে কখনো ভালোবাসি বলেনি,হয়তো বাসে না।যেটা আছে সেটা রেসপেক্ট, বন্ধুত্ব।কিন্তু তবুও…
রুষার হঠাৎই বুকের ভিতর চিনচিন ব্যাথা শুরু হয়।

“ইশান?”
“হুম”
“আমাার তোমাকে কিছু বলার আছে”
“শুনছি,বলো.”
“আমি যদি তোমাকে বিয়ে না করি,তুমি কি খুব কষ্ট পাবে?”
এহেন কথা সে এক্সপেক্ট করেনি বোধহয়।অবাক হয়ে যায়।পর মূহুর্তের মধ্যে স্বাভাবিক স্বরে বলে,
“সেটা তো জানিনা,আমি কষ্ট পাবো কিনা,তবে তোমার জন্য কষ্ট হবে।কারণ আমাকে ছেড়ে গেলে কষ্ট টা বোধহয় তুমিই পাবে।আমার থেকে বেশি।”
রুষার বুক চিড়ে যেনো হতাশার চিৎকার বেড়িয়ে আসতে চাইছে।কান্না পাচ্ছে তার।
“ইশান।রাখি কেমন।মা ডাকছে”
“হুম, টেক কেয়ার অ্যান্ড ডোন্ট ওয়ারি”

সব জামাকাপড় গুছিয়ে স্যুটকেসে তুলছে এক এক করে তিতির।কাল সকাল সকাল বেড়িয়ে পরতে হবে।সকাল বলতে ভোরে ট্রেন।পৌছুতে পৌছুতে সন্ধ্যা হয়ে যাবে।বাড়ি থেকে মামা বারবার বলছিলো তারা কেউ আসবে।তিতির নিজেই নিষেধ করেছে।এতো জার্নি করে নিতে আসার কোনো দরকারই নেই।তাছাড়া টিকিট কেটে সিটে বসে পরলে সারা রাস্তা আর কিসের টেনশন।রাত হলে শুধু স্টেশন থেকে পিক করে নিয়ে গেলেই হবে।মিনু টা এর মধ্যে আর আসবে না।ওর ডিপার্টমেন্ট এর এক্সাম তো আরও ১০ দিন আগে শেষ হয়েছে।একটু মন খারাপ হলো তার।সামনে ঈদ,এক্সামও শেষ এই সেমিস্টারের।তারমানে প্রায় ২ মাসের ছুটি।ইশশশ এ দু মাস বেস্ট ফ্রেন্ড এর সাথে দেখা হবে না।

হঠাৎ ফোনের রিং বেজে উঠলো।রাহাত ভাই নাম ভেসে উঠছে।তিতির নিঃশব্দ হাসলো।সে জানতো রাহাত ভাইয়ের কল আসবে,আসবেই।এবং এটাও জানে এখন রাহাত ভাই তার সাথে দেখা করতে চাইবে।সে তো আর বাচ্চা না,রাহাত ভাই যে হিসেবেই হোক,তাকে যে যথেষ্ট পছন্দ করে এটা সে খুব ভালো করে জানে।না হলে যে ছেলে এদিক সেদিক কোনো মেয়ের দিকে জীবনে চোখ তুলে তাকায় না সে ছেলে কেনো ওর এতো খেয়াল রাখতে যাবে।হাসিমুখে ফোন টা রিসিভ করলো তিতির।
“হ্যালো!”
“তিতির,হ্যালো?”
“জ্বী রাহাত ভাই বলুন।”
“তুমি কি ব্যাস্ত আছো এখন?”
“তেমন একটা না,প্যাকিং করছিলাম আরকি।”
“ওহ্”
“কিছু বলবেন?”
“না মানে আসলে…”

তিতির আবার নিঃশব্দে হাসে।এমন স্ট্রং পারসোনালিটির একটা পুরুষ মানুষ কিনা তার মতো একটা বাচ্চা মেয়ের সামনে সামান্য একটা কথা বলতে গিয়ে তোতলাচ্ছে।ভাবা যায়।তার শব্দ করে হেসে উঠতে মন চাচ্ছে।কিন্তু মনের ইচ্ছা মনে রেখে খুব স্বাভাবিক গলায় জিজ্ঞেস করলো।
“রাহাত ভাই?কিছু বলবেন?”
রাহাত বোধহয় একটু দম নিলো।বললো
“একটু বের হতে পারবে?আমি নিচে দাড়িয়ে আছি।”
তিতির জানতো এটাই বলবেন তিনি।
“আমি আসছি।অন্ধকার হয়ে গেছে,গেটের সামনে আসুন।”
ফোন রেখে পোষাক পাল্টে নিলো সে।একটু হাঁটতে ইচ্ছে হচ্ছে লোকটার সাথে। ওড়না গায়ে জড়িয়ে বেড়িয়ে এলো। এসেই দেখলো গেটের সামনে রাহাত পায়চারি করছে।তিতির তাকিয়ে রইলো।নেভি ব্লু টি শার্ট,ব্ল্যাক প্যান্ট।তার থেকে বেশ লম্বা,সুদর্শন একটা পুরুষ অপেক্ষা করছে তার জন্য। তিতির মুচকি হেসে গেট খুলে বেড়িয়ে এলো।
“রাহাত ভাই।”

তিতির এর ডাকে রাহাত পিছন ফিরলো।তিতির একটা সারা চুড়িদার পড়া।হালকা করে বোধহয় খোপা করা,মাথায় ওড়না দেওয়া।বরাবরের মতো মুগ্ধ হলো রাহাত।নরম গলায় বললো,
“কোথাও যাই?এখানে দাড়িয়ে কথা বলা খারাপ দেখায়”.
তিতির এগিয়ে আসে।রাহাতের পাশে এসে আলতো গলায় বলে
” চলুন,কোথায় যাবেন?হাঁটবেন?”
“বেশ তো।চলো”
দুজন পাশাপাশি হাটছে।পাশের পার্কে ঢুকলো তারা।মর্নিং ওয়াক বার নরমাল হাটাহাটি, টাইম পাস এর জন্য দারুণ একটা জায়গা।রাহাত বারবার আড়চোখে তিতির কে দেখছে।মেয়েটাকে দেখলেই তাার বুকের ভিতর ঝড় ওঠে।ইশশশ বাচ্চা একটা মেয়ে, অথচ সেই বাচ্চাটার প্রেমে পাগল হয়ে বসে আছে সে ভাবা যায়!
“কাল চলে যাচ্ছো?
এতক্ষণ পর রাহাতই প্রথম প্রশ্ন টা করলো।
” জ্বী।এক্সাম তো শেষ,বাসা থেকে বারবার কল দিচ্ছে,তাছাড়া ইদের ছুটি,সব মিলিয়ে… ”
“সেমিস্টার শেষ তো।তার মানে একদম পরের সেমিস্টারের ক্লাস শুরু হওয়ার সমশ আসবে?”
তিতির নিঃশব্দে মাথা ঝাকায়।
“দু মাসের মতো প্রায়।”

রাহাতের গলা কেমন অসহায় এর মতো শোনাচ্ছে।তিতির তাকালো তার দিকে।রাহাত সামনে তাকিয়ে আছে।
“রাহাত ভাই,ওইখানটায় বসি চলুন।”
সামনে একটা লেকের সামনে বসার ব্যাবস্থা।সেখানটায় আরাম করে বসলো তিতির।রাহাত বসলো না।ওকে বসিয়ে একটা বাদামের দোকান দেখে এগিয়ে গেলো।বাদাম নিয়ে ফিরলো।বসলো তিতির এর পাশে।
“নাও,বাদাম খাও।বাইরে থেকে কিছু স্ন্যাকস্ আনতে হতো।ভিতরে বাদাম ছাড়া আর কিচ্ছু পেলাম না সরি।”
“এ মা সরি কেনো বলছেন! গল্প করতে করতে বাদাম টাই বেস্ট ”
রাহাত হাসলো।বাদাম এর খোসা ছাড়িয়ো তিতির এর হাতে গুজে দিতে থাকলো।
“আমি পারবো রাহাত ভাই।”
“পারবে না সেটা কখন বললাম!দিচ্ছি নাও।”
তিতির বিনা প্রতিবাদে হাতে নিতে থাকে।

রাহাত এবার হালকা ঘুরে বসলো তিতির এর দিকে।তিতির তাকালো জিজ্ঞাসু চোখে।
“তিতির তোমাকে আমার কিছু বলার আছে।আজ শুনতে হবে তোমাকে।দু মাস এর জন্য থাকবে না।এতদিন অপেক্ষা করা সম্ভব নয় আমার জন্য। ”
হঠাৎই তিতির এর বুকের ভিতর ঢিপঢিপ শব্দ করতে লাগলো।সে যা ভাবছে তাই নয় তো।নাহ্ এটা তো সে হতে দিতে চায়না।কেনো চায়না সেটা সে জানেনা,শুধু জানে সামনের মানুষ টা যেটা বলতে চায় সেটা সে এখো শেনার জন্য প্রস্তুত নয়।
ব্যাস্ত গলায় থামতে বললো রাহাত কে।
“রাহাত ভাই,এখন কোনো সিরিয়াস আলোচনা না করি?বাড়ি থেকে এসে শুনবো কেমন?”
“নাহ্ তিতির।আজকে শুনতে হবে তোমাকে যা বলবো আমি।”
তিতির মাথা নিচু করে চুপ করে থাকে।
“তিতির?”
তিতির চোখ তুলে তাকায় না।নিচু হয়েই উত্তর দেয়।

“জ্বী…”
“আমি যেটা এখন বলবো খুব ভেবে চিন্তে বলছি কেমন?তাই কথাটা শোনার পর এটা ভাববে না আমি হুট করে দু এক দিনের ফয়সালায় বলছি।ঠিকাছে?”
তিতির উত্তর দেয় না।মুখ তুলে তাকায় রাহাত এর দিকে।সে খুব করে চাইছে রাহাত কথাটা না বলুক।সে কিভাবে বোঝাবে তার মনে মানুষ টার জন্য আলাদা কোনো অনূভুতি নেই,কিন্তু মানুষ টাকে সে অসম্ভব সম্মান করে,পছন্দ করে।
“আমি তোমাকে ভালোবাসি।বিয়ে করতে তোমাকে আমি।”
জানা উত্তর, তবুও চোখ খিচে বন্ধ করে নিলো তিতির।
রাহাত এবার তিতির এর ডান হাতট আলতো ভাবে টেনে নিজের হাতের মুঠোয় নিলো।তিতির চোখ খুলে আবার তাকালো।

“বিয়ে করবে আমায়?অনেক ভালো রাখবো পরী।অনেক।তোমার জীবনের সকল দুঃস্বপ্ন দূর করে দেবো আমি,জ্ঞানে, অজ্ঞানে কোনো মূহুর্তেই তোমার চোখে পানি আসতে দেবো না।”
তিতিরের চোখে পানি এসে যায়।সে কিভাবে বলবে তার মনে কিচ্ছু নেই মানুষ টার জন্য। সে হাত সরিয়ে নেয় না।বরং অন্য হাত টা রাখে রাহাতে হাতের ওপর।তিতির এর স্পর্শ পেয়ে আশা নিয়ে তাকিয়ে থাকে রাহাত।
“রাহাত ভাই,আপনি অসাধারণ একজন মানুষ। আপনার মতো মানুষ আমার জীবনে আসেনি এর আগে।আমি আপনাকে খুব সম্মান করি,আপনার সিদ্ধান্ত কেউ।কিন্তু আমার সম্পর্কে আপনার কিছু জানা দরকার। ”
রাহাত আগ্রহ চোখে তাকিয়ে থাকে তিতির এর পরের কথা শোনার জন্য।

“আমার বাবা মা নেই রাহাত ভাই।আমি এতিম।কিন্তু কথাটা বলা উচিত নয় আমার,আমি বলিও না।কারণ বাবা মার অভাব আমার তিন মামা,মামনী রা কখনো বুঝতে দেয়নি।বাবা মার মতো আগলে রেখেছে আমার তিন বাবা মা।বিশাল পরিবার আমার।আমার নানুআপু এখনো বেচে আছেন। তিনি আমাদের জন্য যা সিদ্ধান্ত নেন আমরা সেটাই মেনে নেই।তারা আমসর জন্য অনেক করেছে,অনেক করেছে মানে সবই তারা।আমি তাদের মতামত ছাড়া, সম্মতি ছাড়া এক পা ও চলতে পারবো না।এমন নয় তারস আমাকে বাঁধা দেবে।দেবে না।কিন্তু আমিই নিজেই চাইনা,আমি চাইনা আমার মুখের দিকে তাকিয়ে, আমসর খুশির জন্য তারা আমার সিদ্ধান্ত জোর করে মেনে নিক।”
তিতির দম নেয়।রাহাত হাতটা শক্ত করে আকড়ে ধরে।

“আমি কি জোর করে মেনে নেওয়ার মতো ছেলে তিতির?আমাকে মানতে পারবেন না তারা?”
“আমি সেটা বলিনি রাহাত ভাই।কথাটা শেষ করতে দিন।বললাম তো আমি আপনার সিদ্ধান্ত কে সম্মান করি।কিন্তু আমার এখানে কিচ্ছু বলার নেই।আপনি আমার পরিবার কে জানান।বিয়ে করতে চান বললেন তাইতো।প্রস্তাব দিন আপনার পরিবার নিয়ে।তারা যদি সম্মতি দেয়,আমি হাসিমুখে বিয়ে করবো আপনাকে।কথা দিলাম।”
রাহাত হাসলো। হাতটা ছাড়লো না।নিজের হাতের মুঠোয় নিয়েই বললো।
“বেশ তো।তোমার সব কথা সই।যেটা বলবে সেটাই হবে।কাল বাড়ি যাও।আমার মা হজ করতে গিয়েছেন।তিনি সামনে মাসে ফিরলে আমি আমার পরিবার নিয়ে যাবো তোমাকে চাইতে।তখন কিন্তু মানা করতে পারবে না।”
“করবো না মানা।চলুন এখন।গেট লক করে দেবে দেরি হলে।আর হাতটা…”
রাহাত হাত ছেড়ে দিলো ব্যাস্ত হয়ে।মাথা চুলকালো।
” চলুন ম্যাডাম।আজকে হাত ছেড়ে দিচ্ছি,কিন্তু একদিন গোটা জীবনের জন্য হাতটা ধরবো।আর ছাড়াছাড়ি নেই কিন্তু।

সাঁঝের মায়া পর্ব ৩

তিতির শব্দ করে হেসে উঠলো।রাহাতের মনে হলো সাগরের ঢেউ এর মধুর শব্দ বয়ে গেলো মাত্র।
“আমি সকালে অপেক্ষা করবো হোস্টেল এর সমানে।স্টেশন অবধি ড্রপ করে দিয়ে আসবো।”
“না করলে শুনবেন না জানি।তাই না করলাম না।ঠিকাছে। ”
তিতির কে হোস্টেলে পৌছে রাহাত বাসায় ফিরে আসলো।মেয়েটাকে মনের কথাটা বলে বুকের একটা বোঝা নেমে গেলো যেনো।মা ফিরলেই সাথে সাথে মেয়েটাকে হালাল ভাবে সোজা বউ বানিয়ে নিশে আসবে।রাহাত খুব ভালো ভাবে বুঝতে পারছে এ তিতির কে ছাড়া এ জীবন তার চলবে না।অসম্ভব…

সাঁঝের মায়া পর্ব ৫