সাঁঝের মায়া পর্ব ৯
দুর এ দিলশাদ্ দুআা
বসন্ত আসি আসি করছে।হাতে গোনা আর কয়েকটা দিন পরেই পহেলা ফাল্গুন।গাছের পাতা ঝড়ে পরা শুরু করে দিয়েছে বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই। বর্তমান আবহাওয়ার সাথে মুড সুইং এর দারুণ একটা সম্পর্ক আছে।ঠান্ডা বাতাসে গাছের পাতা ঝরে পরার দৃশ্য কখনো কখনো পৃথিবীর সকল সৌন্দর্য কে হার মানায়,কখনো বা হারিয়ে যাওয়ার নিদারুণ ব্যাথা মনে করে দেয়।
তিতির সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠেছে আজকে।এতো রাত করে ঘুমানোর পরেও একাই সাঝ সকালে ঘুম ভেঙে গিয়েছে।তার কারণ অবশ্য অনেকগুলো।
প্রথমত বাড়িতে আসলে গ্রামের সকালের পরিবেশ এর থেকে সুন্দর আর কিছু হয়না।তার ওপর যদি সেটা হয় মাঘের শেষের কোনো সকাল।সকাল বেলা বেশ ঠান্ডা থাকে,তবে আগের মতো এতো কুয়াশা থাকে না।রাতের কুয়াশার শিশিরগুলে জমে থাকে লতা-পাতায়। তারপর তিতির এর টিয়াপাখি গুলো তো আছেই।সক্কাল সক্কাল হৈ হাঙ্গামা শুরু করে দেয়।সাথে গ্রামে আরও পাখির কলকাকলি তো আছেই।
তিতির বারান্দায় দাড়িয়ে আছে।সকাল ছয় টা বাজে।নিচে মালি কাকা আগাছা পরিষ্কার করছেন,পাশেই বেশ কয়েকটা মরিচ এর চারা দেখা যাচ্ছে।ড্রাইভার আংকেল গাড়ি ঘষামাজা করছেন।দারোয়ান টুলে বসে তসবি পড়ছে।
ঠান্ডা বাতাস বয়ে যাচ্ছে এই মূহুর্তে। শীত লাগছে বেশ।তিতির চাদর টা ভালোমতে জড়িয়ে নিলো গায়ে।পিছিয়ে বসলো বেতের চেয়ারটাতে। নিশি, নূরি আপু নিশ্চয়ই এতো সকালে ওঠে নি।বড় মামা,আর মামনী রা ছাড়া আর কেউই ওঠেনি সম্ভবত। নানুআপু নিশ্চয়ই নামাজ করে আবার শুয়েছে।
তিতির আবেশে চোখ বন্ধ করে নেয়।কি প্রশান্তির পরিবেশ। পরিষ্কার ঠান্ডা বাতাস নাক দিয়ে মাথায় গিয়ে লাগছে।দূরের জমিগুলো দেখা যাচ্ছে। কিছু জমিতে হাল বাওয়া হচ্ছে, কতগুলোতে ধানের চারা লাগানো হচ্ছে। তিতির এর এই মূহুর্তে খুব ইচ্ছে করছে খেতের আইল দিয়ে হাঁটতে যেতে।তবে একা একা নয়।কিন্তু কেউ তো ওঠেইনি এখনো।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিতির।পাশের টেবিলের নিচ থেকে টিয়াপাখির খাবার বের করে।কয়েকটা দানা দিয়ে দেয় খাঁচার বাটিতে।পাখিগুলো হামলে পরে খাবারের ওপর।তিতির মুগ্ধ হয়ে দেখছে।উঠে দাড়ালো।বাগানে যেতে ইচ্ছে করছে,খালি পায়ে হাঁটতে ইচ্ছে হচ্ছে। সিড়ি ভেঙে নিচে নেমে এলো সে।তিন মামণি রান্নার ঘরে রান্নার জোগাড় করছে।শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।এগিয়ে গেলো সে সেদিকটায়।
“হ্যা রে মা।রাতে ঘুম হয়নি?এতো সকালে উঠলি কেনো।”
“না বড় মামণী।ঘুম হয়েছে।জানোই তো বাড়ি আসলে আমার সকাল সকাল ঘুম ভাঙে।”
তিন জা হাসলেন। ছোট গিন্নি এগিয়ে এলেন।এক হাতে জড়িয়ে ধরলেন মেয়েকে।
“তুই বাড়িতে আসলে বাড়িটা পরিপূর্ণ হয় মা।খাবি কিছু,খিদে পেয়েছে?চা দেই?”
তিতির হেসে মাথা নাড়ে।”এখন না।বাগান থেকে হেটে আসি।সবাই উঠুক।তখন।”
ছোট মামনী মাথা নাড়লেন।
তিতির বাগানে এসে দাড়ালো।এক সাইটে জুতা খুলে পা রাখলো শিশিরভেজা ঘাসে।ইশশশ কি যে শান্তি।নিজের বাড়ির মতো শান্তি এ দুনিয়ায় আর কোথাও হয় নাকি।তিতির হাত বাড়িয়ে গাছ থেকে একটা নয়নতারা তুলে নিলো।আলতো হাতে গুজলো বা কানে।আরেকটা হাতে রাখলো,ঘুরাতে লাগলো।গুনগুনিয়ে গান গেয়ে হাঁটতে লাগলো গুটি গুটি পায় ভেজা ঘাসে।
সূর্যের রশ্মি দেখা যাচ্ছে,সূর্য উঠছে সবে।তিতির দোলনায় এসে বসলো।গদির মতো দোলনা।দু পা তুলে আরামে হেলান দিয়ে বসা যায়।কয়েকবছর আগেই তার মেজো মামা তার জন্য এটা নিয়ে এসেছিলো।মামা অবশ্য তার রুমেই সেট করে দিতে চেয়ছিলো,কিন্তু তিতির গার্ডেন এ সেট করেছে।
ক্রিং ক্রিং ক্রিং…
ফোনের বিকট আওয়াজে ঘুমন্ত অবস্থাতেই কপালে বেশ কয়েকটা ভাজ পড়লো ইশানের।উদাম শরীরে উপুর হয়ে শুয়ে আছে সে।কোমড়ে থ্রি কোয়ার্টার শর্টস।সাঁঝ সকালে কে ফোন করেছে।রাতে সাইলেন্ট করার কথা খেয়ালই ছিলো না।চোখ বোজা অবস্থাতেই হাতরাতে লাগলো। বালিশের তলা থেকে বের করলো ফোনটা।আধখোলা অবস্থায় তাকালো।রুষার নাম্বার দেখাচ্ছে।মোটেই আগ্রহ পেলো না।মেয়েটা বদলে গেছে পুরো,তার অভ্যাস অনঅভ্যাস এর তাল থাকে না আজকাল মেয়েটার।সে কখনো ছুটির দিনে এতো সকালে ওঠে!মাথা এলিয়েই রাখলো বালিশে।কল রিসিভ করে কানে ধরলো।
“হ্যালো।”
“ঘুমোচ্ছিলে?”
“উমম্”
“সরি ডিসটার্ব করার জন্য। কিন্তু আমার আসলে কিছু ইম্পরট্যান্ট কথা ছিলো।”
“উমম্ শুনছি।”
“আমার সাথে একবার দেখা করতে আসতে পারবে আজকে?”
“বাড়ির সবাই ঠিক আছে?”
“হ্যা সবাই ঠিক আছে।”
“তাহলে? ”
“অন্য একটা দরকার এ।”
“আনতে যেতে হবে?”
“নাহ তার জন্য নয়।”
“কাম অন রুষা।তুই জানিস আমি এখন বাড়িতে আছি।এখন তোর বাসায় যাওয়া পসিবল? যা বলার ফোনে বল।”
“ইশান…
হঠাৎ চুপ হয়ে গেলো রুষা।ইশান চোখ পিটপিট করে তাকালো ফোনের দিকে।নাহ কল তো কাটেনি।
” রুষা?আর ইউ দেয়ার।”
তবুও বেশ কিছুক্ষন শব্দ পাওয়া গেলো না।তারপর শোনা গেলো রুষার গলা।
“ইশান আমি পরে কল করছি কেমন?বাবা বোধহয় ডাকছেন।”
“উমমম্ ওকে।”
কল রেখে উপুড় হয়ে চোখ বুঝে শুয়ে রইলো ইশান।আবার তাকালো।সময় দেখলো।ঘড়িতে আটটা বাজে।কমফোরটার সরিয়ে উঠে বসলো।হু হাতে মুখ ডললো,চুল গুলো পিছন দিকে ঠেলে দিলো দু হাতে।অসময়ে কল দিয়ে ঘুমের বারোটা বাজিয়ে দিলো মেয়েটা।কাজের কথাটাও বললো না।
বিছানা থেকে নেমে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেলো।ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে গায়ে সাদা টি শার্ট জড়িয়ে ফোন হাতে এসে দাড়ালো বারান্দায়। নিচে যেতে হবে।এক কাপ কফি না খাওয়া অবধি শান্তি নেই।মাথা ধরবে।
হঠাৎ নজর পরলো গার্ডেনের দোলনার দিকে।গুটিশুটি মেরে বেড়ালের বাচ্চার মতো একজন ঘুমোচ্ছে। ইশান ভ্রু কুচকে তাকিয়ে থাকে,এই সকাল বেলা ওখানে গিয়ে কে ঘুমাচ্ছে।নিশি,নূরি তো মনে হচ্ছে না।নেমে এলো নিচে।বুয়া কে কফি পাঠাতে বললো গার্ডেন এ।কাছাকাছি আসতেই চোখে পরলো সামনের মানুষ টাকে।তিতির ঘুমিয়ে আছে দোলনায়।ওড়না খানা গলায় ঝুলানো।তবে বেশিরভাগ অংশই ঘাসের ওপর পরে আছে।খোলা দীর্ঘ কেশরাশি গাসের ওপর লুটোপুটি খাচ্ছে।
কাত হয়ে দু হাত জোড় করে বা পাশের কানের নিচে দেওয়া।ইশান স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।সত্যি বিড়ালের বাচ্চাই লাগছে।হঠাৎ একটু নিচের দিকে চোখ পরতেই অপ্রস্তুত হয়ে পরলো সে।ওড়না টা গলায় পেচানো।বুকের ওপর নেই।কাত হয়ে শোয়ার ফলে জামার গলা বাকা হয়ে বেশ অনেকটাই শরীরের অংশ চকচক করছে।বিপদজনক ভাজ স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যাচ্ছে।বা পাশের অংশের বেশ ভেতরের দিকেই কালো কুচকুচে একটা তিল দেখা যাচ্ছে।
ঝট করে চোখ সরিয়ে নিলো ইশান।দু হাতে চোখ ডলে দোলনার অপর পাশের টেবিলে বসলো।ফিরে তাকালো তিতির এর দিকে।ওদিক কাত হয়ে আছে।বিরক্তি দেখা গেলো ইশান এর চোখে মুখে।মেয়েটা এক নাম্বার এর গাধা।ঘর নেই নাকি!এখানে খোলা আকাশের নিচে ঘুমানোর মানে হয়!আর কেউ এখন এদিক টায় না আসলেও একটু পর মালি আসবে,মালির সাথে তার ছেলেটাও কাজ করে।জোয়ান ছেলে তিতির এর থেকে খানিকটা বয়সে বড়।এ অবস্থায় দেখলে সে নিশ্চয়ই এতো সহজে চোখ ফিরিয়ে সরে যাবে না।আর ওড়না নেওয়ার স্টাইল এটা!কি আজব।এখনকার মেয়েগুলো রংঢং বোঝা যায়।পুরুষমানুষ এর হয়েছে যত জ্বালা।গিয়ে ঠিক করেও দিতে পারছে না।খারাপ দেখায় বিষয়টা।
হঠাৎই পায়ের আওয়াজে চমকে চোখ তুললো।নয়ন খবরের কাগজ হাতে এগিয়ে আসছে।ইশান তাকালো এক নজর তিতির এর দিকে।আরও বিপদ বাড়াতে মেয়েটা এখন সোজা হয়ে শুয়েছে। ঠিকের ঠিক কিচ্ছু হয়নি।উল্টো আরও চোখে পড়ছে এদিক থেকেও।ইশান চোখ ফেরালো আবার,নয়ন ততক্ষণে এসে বসে পরেছে বেতের চেয়ারটায়।ইশান খেয়াল করলো নয়নকে।খবরের কাগজে কিছু একটা মন দিয়ে পড়তে পড়তে আসছিলো।তাই তিতিরকে দোলনায় খেয়াল করেনি।
কাগজটা রেখে ইশানের দিকে চিন্তিত চোখে তাকালো,”
চাকরি বাকরি করবো না ভাই।সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছি।”
“কেনো আবার কি হলো?”
“কি পরিমাণ করাপশন সব জায়গায় দেখেছো?”
ইশান হাসে,”তা তো সবখানেই ”
“ওইটাই।কি দরকার প্রেশার নিয়ে।তোমার মতো জিনিয়াস নই যে সব কিছুর উর্ধ্বে হয়ে যাবে। এর চেয়ে ভালো বিজনেস এ জয়েন করে ফেলি।কি বলো?”
“তোর যেটা ভালো মনে হয়।আমি নিজেও ভাবছি।বাবা চাচ্চু দের ওপর প্রেশার কমাতে বোধহয় তোকে আর আমাকে হাত লাগাতে হবে যতদূর বুঝলাম।”
ইশান এর কথায় চকচক করে উঠলো নয়নের চোখমুখ।
“সত্যি ভাই।গ্রেট…ট্রাস্ট মি,বড় আব্বু দারুণ খুশি হয়ে যাবে।”
ইশান হাসে ভাইয়ের কথায়।রহিমা খালা এসেছে কফি দিতে।দু ভাইকে কফি ঠেলে দিয়ে চলে গেলেন উনি।
“উমমমম্ অসসসহ্য…পর্দা টেনে দে মিনুর বাচ্চা।”
ঘুমন্ত মেয়েলি গলার আওয়াজে চমকে আশেপাশে তাকায় নয়ন।ইশানও তাকিয়েছে বইকি।বিরক্তি তে মুখ ছেয়ে গেলো।ঘুমোনোর সময় মনে ছিলো না কোথায় ঘুমোচ্ছে? এখন ঘুমের ঘোরে উল্টাপাল্টা বকা হচ্ছে। নয়ন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।ভাইয়ের দিকে তাকালো বিষ্ময় নজরে।
“ও এখানে কি করে।”
ইশান নির্বিকার মুখ বানালো।চোখ সরিয়ে চুমুক দিলো কফির গ্লাসে।
“কি জানি।খেয়াল করিনি তো।মাত্রই দেখলাম।”
নয়নকে দারুণ চিন্তিত দেখালো।ঝটপট উঠে দারালো।দোলনার দিকে পা বাড়াতেই ইশান ডেকে উঠলো,”ওদিক কোথায় যাচ্ছিস…”
“ও এখানে কেনো দেখবো না?এখানে ঘুমোচ্ছে কেনো।কেমন বেকায়দায় ঘুমিয়ে আছে।ঠান্ডার মধ্যে। গায়ে কিছু নেই।”.
নয়ন আর ইশানের কিছু বলার অপেক্ষা করে না।দ্রুত পায়ে এগিয়ো যায় তিতির এর দিকে।কোমড়ে হাত রেখে দু দিকে হতাশার মাথা নাড়ে।নিচু হয়ে ওড়না টেনে ঢেকে দেয় শরীর।ইশান এর হাত শক্ত হয়ে যায় হুট করে,কি অবলীলায় কাজ টা করলো নয়ন।সে পারলো না কেনো।তারও তো উচিত ছিলো এটা।নয়ন আলতো হাতে মাথা ঝাকালো তিতির এর।তিতির উঠলো না।বরং আরও উল্টো পাশ ফিরে গলা পেচিয়ে ধরলো নয়নের।
ইশানের মেজাজ খারাপ হচ্ছে মেয়েটার ওপর।নয়ন পাজা কোলে তুলে নিলো তিতির কে।ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বললো,” ওকে রুমে দিয়ে আসি ভাই। ডেকে ঘুমটা নষ্ট না করি।”
ইশান নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছে।হালকা ভাবে মাথা নাড়ে।নয়ন তিতির কে কোলে নিয়ে চলে যায় বাড়ির ভিতর।ইশান স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সেদিকে।
কিছু একটা ফিল হচ্ছে। যেটা হওয়ার কথা নয়।অন্তত তিতির এর জন্য তো নয়ই।বোন হয় তার মেয়েটা।কই রুষাকে তো তাদের বন্ধু রা টাচ করে,পরে গেলে ধরে তার তো কখনো খারাপ লাগেনি। সে টক্সিক বয়ফ্রেন্ড নয় এটা নিয়ে বন্ধু মহলে বেশ প্রশংসা শুনতে পেতো সে।আজ এ মেয়েটাকে নিয়ে এমন রাগ হচ্ছে কেনো তাহলে।তাছাড়া বাড়ির সবার কথায় যতটুকু বুঝেছে সে নয়ন বেশ পছন্দ করো তিতিরকে,বাড়ির সবারও তাতে স্পষ্ট মত আছে বলে বোঝা যায়।আর অনেক আগে থেকেই নয়ন তিতির এর বিষয়টা সবাই মেনে নিয়েছে।হুট করে একদিন এর ব্যাবধানে তার এমন মনে হওয়ার কারণ কি!ছোটবেলায় এ মেয়ে তার জন্য পাগল ছিলো এখন নেই তারজন্য! ইশান নিজের ওপর দারুণ বিরক্ত হয়।এ কি ছেলেমানুষী চিন্তা ভাবনা।
মাঝখানে কেটে গেছে আরও চারটি দিন।তিতির আসার পর এ চারদিন এ সে মোটেই আনন্দ করতে পারেনি,বা বলা যায় সে মুডেই ছিলো না।থাকতে পারেনি।সেদিন সকালে তিতির হুট করে নিজেকে আবিষ্কার করে বিছানায়।চমকে উঠে বসতেই তার মনে পরে সে ভুলে ঘুমিয়ে গেছিলো দোলনায়।কে আনলো তাকে, ভাবতে ভাবতে বিছানা থেকেই নিজে চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ আসে কানে।ছুটে গিয়ে বুঝতে পারে শব্দ তার নানুর রুম থেকে আসছে।
চন্দ্রা দেওয়ায় অসুস্থ হয়ে পরেছেন।তিন দিন হাসপাতালে রেখে আজকেই বাড়িতো নিয়ে আসা হয়েছে তাকে।এ বাড়ির ওপরে এক প্রকার ঝড় বসে গেছে এ কয়টা দিন।
তিতির ফ্রেশ হয়ে বেড়িয়ে এলো।নিশি আপুর রুমে দিকে পা বাড়াতেই সটান সামনে এসে পরলো ইশান।
তিতির এর মুখ গিয়ে সজোরে ধাক্কা খেলো ইশান এর শক্তপোক্ত বুকে।বডি ওয়াস এর কড়া ঘ্রান পাওয়া গেলো মানুষটার শরীর থেকে।চমকে গিয়ে নাক ডলতে ডলতে ওপরের দিকে ঘাড় উঁচিয়ে তাকালো তিতির।ইশান চোখ লাল করে তাকিয়ে আছে তার দিকে।তিতির তড়িঘড়ি করে দুপা পিছিয়ে গেলো।ইশান একপ্রকার খেঁকিয়ে উঠলো,”দেখে চলা শিখিস নি?মেয়ে মানুষ এতো কেয়ারলেস হলে চলে?মেয়ে মানুষ এর জাতই উজবুক।”
তিতির মুখ বাকালো।সামান্য একটা বিষয়ের জন্য মেয়েজাতি তুলে বকাবকির কি আছে আশ্চর্য। কিছু বলার জন্য নিজেও চোখ গরম করে তাকালো।কিন্তু সামনের সুদর্শন পুরুষ মানুষ টাকে শক্তকথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না এখন কেনো যেনো।থ্রি কোয়ার্টার ঢোলা কার্গো প্যান্ট পরা।গায়ে নেভি ব্লু ফিটিং টি শার্ট।শরীরের পেশিগুলো স্পষ্ট দৃশ্যমান হয়ে আছে।হাতের পেশিগুলো ফুলেফেঁপে উঠে আছে।টপটপ করে পানি পরছে ভেজা চুলগুলো থেকে।সবে বোধহয় শাওয়ার নিয়ে বেরোলো।বোধহয় নয়,সত্যিই।কি পরিমাণ যে বডি ওয়াস এর ঘ্রান পাওয়া যাচ্ছে।তিতির নিজের মন কে ধমকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে পা বাড়াতেই টান পড়লো চুলে।হেচকা টানে দু পা পিছিয়ে আবার মুখোমুখি হলো ইশান এর।এক হাতে বৃথা টানাটানি করলো কয়েকবার হাত থেকে চুল ছারানোর।
ইশান বাঁকা হাসলো।মুখ এগিয়ে কানের কাছে এনে বললো,”ইশান আরশাদ এর গায়ের জোরকে হেলাফেলা ভেবেছিস?তোর মতো একটা বিড়ালের বাচ্চা ছটফট করলেই সে ছেড়ে দেবে!”
তিতির ব্যাথায় চোখমুখ খিঁচে বন্ধ করে আছে।লোকটার এমন ব্যবহার এর কারণ কি!সেদিন হসপিটালেও কষিয়ে রামধমক দিয়েছিলো।তার দোষ কি ছিলো!সে তো সামান্য টং ঘরে বসে চা খাচ্ছিলো,তখন যদি ওইটুকু সিটে গা ঘেঁষে হুট কেউ বসে তাতে তার দোষটা কোথায়।সে সরেই বসতো।তার আগেই ইশান এসে ধমকাধমকি করে ভেতরে নিয়ে আসে।সেকি যেনোতেনো ধমক!খালি বোধহয় পাবলিক প্লেস বলে গায়ে হাত তোলেনি।তিতির এর ইচ্ছে করছিলো লোকটা চুলের মুঠি ধরে গরম চায়ে চুবাতে।এখন যেমন ইচ্ছে হচ্ছে।
আরেকটা টান লাগতেই চোখে পানি চলে এলো তিতির এর।”কি আশ্চর্য।ছাড়ুন বলছি।এ কি স্বভাব। চুল ধরে টানছেন কেনো।বড় মামা কে কিন্তু বলে দেবো।”
ইশান বোধহয় আরও খেপে গেলো।পেঁচিয়ে ধরলো চুল,”বল যাহ।এখনই বলবি।”
“না ছাড়লে যাবো কিভাবে।ছাড়ুন।দেখুন যাই কি না যাই।ভাবছেন সাহস নেই আমার।”
ইশান রাগে চোখ বড় বড় করে ফেলে।”বেয়াদব। বড়দের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় শিখিস নি?”
“নাহ শিখিনি।এখন ছাড়ুন তো।বড় ভাই জন্য যা ইচ্ছে তাই করবেন নাকি।মগের মুল্লুক। ”
ইশানের এবার রাগটা আরও দ্বিগুণ হলো।কোনো কারণ ছাড়াই।”তাকা।তাকা বলছি। ”
তিতির ফট করে তাকালো।চোখ টলমল করছে।ইশানের দৃষ্টি তে গা কেঁপে উঠলো তিতির এর।ইশান ওপর থেকে নিচ অবধি চোখ বুলালো একবার।আবার চোখে চোখ স্থির করলো।
“এভাবে ওড়না নেওয়া কে শিখিয়েছে তোকে।”
“কিভাবে!”
অবাক চোখে ইশানের দিকে তাকিয়ে রইলো।ইশানের নজর অন্য রকম কেনো লাগছে।কি বলছে এ নজর!নজর অনুসরণ করতেই একটা হার্টবিট মিস হয়ে গেলো তিতির এর।দ্রুত হাতে ওড়না টানা দিয়ে নামালো বুকের দিকে খানিকটা।মানুষ টার তার থেকে বেশ লম্বা।নিচু হয়ে নিজের বুকের ওপর চোখ রাখতেই চমকে উঠলো তিতির।ডান হাত চেপে রাখলো বুকের ওপর।
“ভিতরে কি পরেছিস সেটা দেখাতে সবাইকে?”
“,তিতির লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিলো।”
“কি রে।পিংক পছন্দ খুব?”
তিতিরের মুখ হা হয়ে গেলো।লজ্জায় মুখ লুকানোর জায়গা পাচ্ছে না।তার ইনার এর রং পিংক।লোকটা তার মানে দেখে ফেলেছে।মেজাজ গরম হলো তিতির এর।দেখবে না আবার!জিরাফ এর মতো লম্বা।ওপর থেকে নিচে তাকালে যতো ঢাকাই থাকুক,কোনাকুনি দিয়ে ঠিক চোখে পরবেই।তাই বলে ওভাবে তাকাতে হবে।নিজের দৃষ্টি সংযত করবেনা অসভ্য মানুষ টা।
ইশান এবার বেশ শক্ত গলায় বললো,”ভালো করে জড়িয়ে নে গায়ে।ফাঁসির দড়ির মতো ঝুলিয়ে রাখার জন্য ওড়না না।”
“বালাই সাট।গলায় দড়ির মতো ঝুলিয়ে রাখবো কেনো!এটা তো মেয়েদের স্টাইল।ও আপনি বুঝবেন না।”
ইশান চোখ পাকালো,”যে বুঝ বুঝতে গেলে তোকে ফুপাতো বোন থেকে ফুপাতো বউ এর নজরে দেখতে হবে সে বুঝ বোঝার আমার দরকার নেই।যা বললাম শোন।”
তিতির চমকে উঠলো।কি সব কথাবার্তা। মুখ বাকালো।ঠোঁট উল্টে বললো,”আপনি তাহলে এরকম ঢিঙ্গি শরীর নিয়ে খালি গায়ে,হাফ প্যান্ট পরে ঘুরঘুর করবেন না একদম।আমার ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। মামাতো ভাই থেকে উহুম উহুম…বললাম না।মুখে বাধে।”
ইশানের রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে।এ কি বেয়াদব মেয়ে।কথাই শোনেনা,বোঝার চেষ্টা করে না।ওর ভালোর জন্যই তো বলা হচ্ছে।
“দেখে তো বোঝা যায়না।এতো কথা আসে কোত্থেকে? তুই আমার হাঁটুর বয়সী হবি।বেয়াদবি না করে কথা মান।”
তিতির নির্বিকার চোখে অন্য দিকে তাকিয়ে বললো,”সেম টু ইউ।”
“হোয়াট!”
“যেটা বললেন সেটাই।সেম টু ইউ।আর আমি যদি আপনার হাঁটুর বয়সী হই তাহলে নিজের এই বয়স্ক মাথাটা খাটিয়ে দয়া করে হাটুর বয়সী বাচ্চার দিকে নজর না দিয়ে নিজের বয়স্ক শরীর টা ঢাকুন।”
এ মেয়ে বলে কি।ইশান আরশাদ বয়স্ক। মেজাজ আরও তেতে উঠলো ইশানের।
সাঁঝের মায়া পর্ব ৮
“আমি বয়স্ক!অ্যাম ওনলি টুয়েনটি এইট।নারী জাতি বলতেই ঠ্যাটা,বাচাল।”
“পুরুষ জাতি বলতেই নজর…থাক বললাম না।বড় ভাই হন সম্পর্কে… ”
সিড়িতে পায়ের শব্দে চুল ছেড়ে দিলো ইশান।তিতির ঘার ডলতে ডলতে পাশ কাটিয়ে দ্রুত পায়ে চলে গেলো গেলো সেদিকটায়।ইশান পিছন তাকিয়ে দেখলো মেয়েটার ছুটে চলা।
“বেয়াদব কোথাকার।” বিরবিরিয়ে চলে এলো নিজের রুমে।
