Home সিন্ধুতে সন্ধির খোঁজে সিন্ধুতে সন্ধির খোঁজে পর্ব ৫৪

সিন্ধুতে সন্ধির খোঁজে পর্ব ৫৪

সিন্ধুতে সন্ধির খোঁজে পর্ব ৫৪
জাওয়াদ জামী

” কুহু , তুমি জানতে আজকে আমাকে সবাই মিলে অপদস্ত করবে ? সবকিছু জানার পরও তুমি আমাকে এই বাড়িতে ডেকেছ ! সবকিছু তোমার প্রি-প্ল্যান ছিল তাই না ? আমি বিপদে পরে তোমার কাছে সাহায্য চেয়েছি , আর তুমি আমাকে নিয়ে খেলেছ ? তোমার কাছে এটা আশা করিনি আমি। যে বড়মা কোনদিন আমার সঙ্গে উঁচু গলায় কথা বলেনি, আজ সেই বড়মাও আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। তুমি জানতে এসব কিছুই হবে। তারপরও তুমি আমাকে কিছুই জানাওনি কেন? ” তাওহীদ কুহুর দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠল।

” হেই , তুমি আমার সঙ্গে কথা বল । আমার স্ত্রীকে চোখ রাঙ্গাচ্ছো কেন ? আর হ্যাঁ, তুমিই ঠিকই বলেছ, এসবই প্রি-প্ল্যান ছিল। তবে সেটা কুহুর নয় , আমার । ও আমার কথামত কাজ করেছে । আমি ওকে যা যা বলতে বলেছি , ও তোমাকে সেগুলোই বলেছে । একদিন তুমি এই বাড়িকে , এই বাড়ির মানুষগুলোকে অসম্মান করেছিলে, অপমান করেছিলে। আমিও তাই তোমাকে এই বাড়িতে ডেকে এনেছি তোমাকে অপমান করব বলে । ” তাওহীদের রাগকে পাত্তা না দিয়ে তাহমিদ উল্টো উপহাস করল বড় ভাইকে।
ওদের দুই ভাইয়ের কথপোকথন শুনে বাড়ির সকলেই অবাক হয়ে গেলেন। তাহমিনা আক্তার এগিয়ে গেলেন কুহুর কাছে। কুহুকে নিজের দিকে ফিরিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

” কি হয়েছে আমাকে বলবি , মা ? তুই কি জানতিস আজ এই ছেলেটা আমাদের বাসায় আসবে ? আমাকে সত্যিটা বল। ”
শ্বাশুড়ির প্রশ্নে কুহু কিছুক্ষণ ইতস্তত করে মুখ খুলল।
” তোমার মনে আছে মা , কয়েকমাস আগে তোমার শাড়ি-গহনা আমাকে দিয়েছিলে? সেদিন আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম , ভাইয়া যদি ফিরে আসে, তখন তুমি কি করবে? তুমি জবাব দিয়েছিলে, কোন বেইমানকে তুমি কোনদিনও এই বাড়িতে জায়গা দেবে না, মেনে নেবে না তাকে। সেদিনই আমি তোমাকে প্রশ্নটা কেন করেছিলাম জানো? তুমি যখন গহনা আনতে দিদুনের রুমে গেলে তখন আননোন নম্বর থেকে কয়েকবার ফোন এসেছিল । তুমি রুমে ছিলে না , তাই ফোনটা আমিই রিসিভ করেছিলাম। সেদিন ফোনটা ভাইয়া করেছিল। সে জানাল, এই বাড়িতে আসতে চায়। কিন্তু আমি তোমাদের কারও মনোভাব না জেনে ভাইয়াকে আসতে বলতে পারিনি। সেদিন যখন জানলাম , তুমি ভাইয়াকে চাও না। সেদিনই তোমার ছোট ছেলেকে একই প্রশ্ন করলাম। সে-ও একই উত্তর দিল ।

আর তাছাড়া আমি আগেই জানতাম , এই বাড়িতে ভাইয়ার নাম নেয়া নিষেধ। কথাটার সত্যতা আরেকদিন জানতে পেরেছিলাম। একদিন সন্ধি বাবার সামনে ভাইয়ার কথা বলেছিল। আর সেদিন বাবা সন্ধির ওপর ভীষণ রেগে গেছিলেন। দিদুন সেদিন বাবার সামনে উপস্থিত থাকা স্বত্বেও বাবাকে থামাননি। সেদিন আমি বুঝতে পেরেছিলাম , এই বাড়ির কেউই ভাইয়াকে চায় না। তারা মন থেকে ভাইয়াকে মুছে ফেলেছে। তাই একদিন সময় বুঝে তোমার ছোট ছেলেকে ভাইয়ার ব্যাপারে জানাই। তাকে জানাই , ভাইয়া বাড়িতে ফিরতে চায়। আর সেদিনের পর থেকে ভাইয়ার সঙ্গে নিয়মিত কথা হত আমার। আমি ভাইয়াকে সেগুলোই বলতাম, যেগুলো আমাকে তোমার ছোট ছেলে শিখিয়ে দিত। তবে আমি এটা জানতাম না , তোমার ছোট ছেলে ভাইয়াকে আজকের দিনে বাসায় আসতে বলবে । গতকাল যখন সে বলল , আজকে ভাইয়াকে বাসায় ডাকতে। তখন আমি সত্যিই অবাক হয়েছিলাম। ”

কুহুর কথা শুনে সকলেই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকালেন তাহমিদের দিকে। তাহমিদও সকলের দৃষ্টি বুঝতে পারল।
” এত অবাক হওয়ার কিছুই নেই । আমি শুধু এই সেলফিশকে এই বাড়িতে এনে ওর চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে চেয়েছিলাম ভুলগুলো , ওর করা অন্যায়গুলো । আমি বড়মার মুখে শুনেছিলাম , এই সেলফিশের জন্মের পর দাদু পরপর চারদিন আমাদের গ্রামসহ আশেপাশের কয়েক গ্রামের লোকজনকে দাওয়াত করে খাইয়েছিল। কয়েক মণ মিষ্টি বিলিয়েছিল বাড়িতে প্রথম নাতির আগমন উপলক্ষে। আর সেই আদরের নাতিই একদিন আমার দাদুকে স্বার্থপর বলেছিল। দাদু নাকি নিজের স্বার্থের জন্যই তার চার ছেলেকে নিজের কাছে রেখে দিয়েছিল!

চার ছেলেকে এই বাড়ি নামক কারাগারে থাকতে বাধ্য করেছিল। দিদুন এই কথাগুলো শুনে কিভাবে কেঁদেছে সেটা আমি জানি। নিজের প্রাণপ্রিয় নাতির কথাগুলো শোনার পর দিদুন তাকে মনেও রাখেনি। আজ আমি এই সেলফিশকে দিদুনের সামনে দাঁড় করিয়েছি , কারন আজ এ নিজের পূর্বের অপরাধের জন্য তড়পাচ্ছে। এটা দেখে দিদুন কিছুটা হলেও শান্তি পাবে। এর অবস্থা দেখে আমার মায়ের অপমান কিছুটা হলেও কমবে। আমার মাকে ও দিনের পর দিন কাঁদিয়েছে । আজ ওকে সবার সামনে এনে সবাইকে একটু শান্তনা দিতে চেয়েছি আমি । ও একদিন যেই বাড়িকে ঘৃণার চোখে দেখেছে , যে বাড়ির মানুষগুলোকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে। আজ সেই বাড়ির মানুষগুলোর সামনে ও মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে। এটাই বা কম কি? ”

” তুই…তুই একটা সাইকো। সাইকো না হলে আমার সঙ্গে এমন নিষ্ঠুর আচরণ করতে পারতিস না। ” রাগে কাঁপছে তাওহীদ।
” নিজের বাবার মত বড় চাচাকে একদিন তুমি বলেছিলে চাটুকার। আমার শান্তশিষ্ট বাবাকে বলেছিলে স্ত্রৈণ, আমার চাচাদের বলেছিলে, এরা দু’জন এক গোয়ালের গরু। আমার বাবা-চাচাদের অপমানের শোধ নিতে গিয়ে যদি আমাকে সাইকো হতে হয় , তবে আমি সেটাও হতে রাজি আছি। আর আমি যদি একবার সাইকোর রোল প্লে করি, তবে প্রথমে আমার হাতে খুন হবে তুমি। ”

” তাহমিদ , তোমার কথার মধ্যে ইন্টাফেয়ার করার জন্য সরি। তোমাদের ফ্যামিলির এসব ব্যাপারের মধ্যে আমাদের না থাকাই বেটার । আমি তমাকে নিয়ে বাসায় যাচ্ছি । ” ফারদিন দরাজ গলায় বলল।
” তুমিও আমাদের ফ্যামিলিরই একটা পার্ট । আর আজকে তোমাদের এখানে থাকতেই হত। তোমারও জানা দরকার, তমাপু পাগল হয়েছিল কেন ? আবার আজকে তমাপুর এই সেলফিশের মুখোমুখি হওয়া দরকার ছিল । তমাপুর বুঝতে হবে , সে একটা বেইমানের জন্য নিজের জীবনের পাঁচ-পাঁচটা বছর নষ্ট করেছে। কত বড় ভুল করেছে সে । এবার সময় এসেছে সামনে এগিয়ে যাওয়ার , নতুন করে বাঁচার । তমাপু , তোমার কি এখনও মনে হচ্ছে , এই লোকটা তোমার যোগ্য? যাকে তুমি নিজের থেকেও বেশি ভালবেসেছিলে, সে আদৌও তোমার ভালবাসা পাওয়ার যোগ্য ছিলই না, এটা মানতে পারলেই তুমি সুখী হবে। পারবে এটা মানতে? ”

” কেন পারব না ! আমি জীবনে সব পেয়েছি ৷ কোনকিছুরই অভাব নেই আমার। সংসার , স্বামী, সন্তান সৃষ্টিকর্তা সবই আমাকে উজার করে দিয়েছেন । তোর মত ভাই আছে আমার। কুহুর মত ছোট বোন আছে। আমার কি আফসোস করতে আছে বল? আমার স্বামী অযোগ্য কেউ নয় । সে আমাকে সম্মান করে। আমার কোন চাওয়া সে অপূর্ণ রাখে না। সে আমাকে ভালবাসে। তারপরও কেন আমি অতীত নিয়ে আফসোস করব ? হ্যাঁ , যে অতীত আমাকে চমৎকার বর্তমান দিয়েছে , সে অতীত হয়তো কোনদিনও ভুলতে পারব না। সে অতীতকে আমার হৃদয়ের গহীনের ঘৃণার কুঠুরিতে আবদ্ধ রাখব আজীবন। প্রতিটা দিন ঘৃণাভরে স্মরণ করব সেই অতীতকে । আর একবার যাকে ঘৃণা করা যায় , চাইলেও তাকে কখনোই ভালবাসা যায় না। বোঝাতে পেরেছি তোকে? এবার আমাদের যেতে হবে। গতকাল আমার শ্বশুর বাবা শুটকি ভর্তা খেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সময়ের অভাবে করতে পারিনি। আজকে বাবাকে শুটকি ভর্তা খাওয়াতেই হবে। কয়েকদিন পর আমরা আবার আসব। তুই না করিস না। যেতে দে আমাদের। ” তমাও দ্বিধাহীনভাবে বলল।
তমার কথা শুনে হাসল তাহমিদ। ওর বুক থেকে বড়সড় পাথর নেমে গেছে।

” ঠিক আছে যাও । আমি কালকে যাচ্ছি তোমার বাসায়। কালকে দেখব কেমন রান্না কর তুমি। ”
” দৃষ্টি , ফারজাহ কে নিয়ে আসবে প্লিজ ? ” তমা দৃষ্টিকে অনুরোধ করল।
” হুম। ”
একটু পরই দৃষ্টি ফারজাহ কে নিয়ে আসল৷
” এবার যাই চলুন। ” তমা মৃদুস্বরে ফারদিনকে বলল।
তমার কথায় ফারদিন হেসে ফারজাহ কে কোলে নিল।
” চল। ”
তমা সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিল। দরজার কাছে গিয়েও আবার ফিরে এসে দাঁড়ায় তাওহীদের সামনে।

” ভেবেছিলেন আমাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবেন। অবশ্য কিছুটা সফলও হয়েছিলেন । তবে সেটা আমার বোকামির কারনেই সম্ভব হয়েছিল । এতকিছুর মধ্যেও আপনি আমার অনেক বড় উপকার করেছেন । এই যে আপনার কাছ থেকে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর এমন একজনের দেখা পেয়েছি , যার সামনে দাঁড়ানোর যোগ্যতা আপনার নেই । আপনি যাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিলেন , সে তাকে আঁকড়ে ধরেছে । তাকে নতুনভাবে গড়েছে। নতুনভাবে বাঁচতে শিখিয়েছে। আপনার মত মানুষরা যেখানে কোনকিছু ভেঙে শান্তি পান , তেমনি উনার মত মানুষরা কোনকিছু গড়ার মধ্যে শান্তি খুঁজে নেয়।

আপনার সঙ্গে উনার এটাই পার্থক্য। আপনি আমাকে ছুঁড়ে না ফেললে উনাকে পেতাম না আমি। আর উনাকে না পেলে নিজেকে নতুন করে চিনতেও পারতাম না। আপনি চলে যাওয়াতে দিনশেষে আমার সঙ্গে ভালোকিছুই ঘটেছে। এজন্য একটা ধন্যবাদ আপনাকে দেয়াই যায় । ধন্যবাদ। দহনের দুনিয়ায় আপনাকে স্বাগতম। এবার আপনিও বুঝবেন , প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণা কতটা তীব্র । এই যে আপনি এখন প্রতিনিয়ত পুড়বেন , আর আমি তখন অন্য কারও মাঝে মত্ত থাকব। কারও ভালবাসায় নিজের দুনিয়া গড়ব আমি। আপনি পুড়তে পুড়তে নিঃশেষ হবেন, আর আমি কারও ভালবাসায় পূর্ণ হব। ” কথাগুলো বলেই আর দাঁড়াল না তমা। ফারদিনের হাত ধরে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
তমার কথাগুলো শুনে তাওহীদের চোখের কোনে পানি জমল। সত্যিই ও আজ নিঃস্ব। ওর হারানোর মত আর কিছুই নেই।

” তোমার কি মনে হয় , এই বাড়ির ত্রি সীমানায় থাকা তোমার উচিত ? আমাদের প্রত্যেকের কাছে তুমি একটা মরিচীকা বৈ কিছুই নও , এটা বুঝতে পেরেছ? নাকি আবার নতুনভাবে বোঝাতে হবে? ” তমা চলে যেতেই বলে উঠলেন সাবির আহমেদ রাশেদীন।
” বাবা , আমাকে ফিরিয়ে দিও না । তোমাদের ছাড়া আমি সত্যিই একা। কোন অস্তিত্বই নেই আমার। ” তাওহীদ আরও একবার অনুনয় করল।

” তুই নিজের প্রয়োজনে আমাদের কাছে এসেছিস। যেহেতু এখন তোর পাশে কেউ নেই , সেহেতু এখন আমাদের প্রযোজনিয়তা অনুভব করছিস। কিন্তু যখন নতুন কাউকে পেয়ে যাবি , তখন দিব্যি আমাদের ভুলে যাবি। তোর স্বভাবটাই এমন । তোকে চিনতে আমার বাকি নেই । সেই ছোটবেলা থেকেই তুই বড্ড স্বার্থপর। মাঝেমধ্যে আমার মনে হত , আমার আব্বার সঙ্গে তোর কোন পার্থক্য নেই। যারা শুধু নিজের প্রযোজনকেই বড় করে দেখে । কিন্তু নিজের সন্তান হওয়ার কারনে কথাটা আমার মনের ভেতরেই রেখে দিয়েছিলাম । আজ কথাটা না বলে পারলাম না । আমরা শুধুমাত্র তোর প্রয়োজন হতে পেরেছি , তোর প্রিয়জন হইনি কখনোই। অতীতে যা হওয়ার হয়ে গেছে। নতুন করে তোর প্রয়োজন আর হতে চাই না আমরা। তুই তোর মত থাক, আমাদেরকেও আমাদের মত থাকতে দে। আরও একবার তোর ছায়া পরে এই সংসারে অশান্তি সৃষ্টি হোক সেটা চাই না। ফিরে যা তোর স্বপ্নের দুনিয়ায়। আশা করি নতুন কাউকে পেয়ে যাবি। তোর জন্য সব সময় দোয়া থাকবে আমার । এবার অন্তত তোকে কেউ সুখী করুক। সুখী হ তুই। এবং সেটা আমাদের ছাড়াই। ”

কথাগুলো বলেই তাহমিনা আক্তার নিজের রুমে চলে গেলেন। আজ তিনি কাঁদবেন। নিজের ভুল বুঝতে পেরে তার সন্তান ফিরে এসেছিল তার কাছে। কিন্তু তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন নিজের সন্তানকে। তিনি ছেলেকে যতটাই ভালবাসেন , ততটাই ভালবাসেন এই বাড়ির প্রতিটা মানুষকে। ছেলের কাছে আঘাত পেয়ে নিজেকে শক্ত করেছেন অনেক আগেই । আরও একবার ছেলের কাছে আঘাত পেতে চান না তিনি ।

সিন্ধুতে সন্ধির খোঁজে পর্ব ৫৩

কারন তিনি জানেন , ভবিষ্যতে একই কাজ করতে দুইবার ভাববে না তাওহীদ। সে ছেলেটাই এমন। নিজের স্বার্থ ছাড়া কখনোই কিছু ভাবতে পারে না সে। তাই আরেকবার তাওহীদকে সুযোগ দিতে চাননি তাহমিনা আক্তার।

সিন্ধুতে সন্ধির খোঁজে পর্ব ৫৫