সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৪
তানিয়া হুসাইন
ইশায়ার দিকে ঝুকে তার মুখে ফু দেয় ভীর,মুখের সামনের চুলগুলো সরে যায়।
ইশায়া মুখ ফিরিয়ে নেয়।
___ভীর ঠান্ডা গলায় বলে,
হুমমম, যাবি চলে।
কি দিয়ে যাবি বলতো?
এই পা দিয়ে।
তার কন্ঠে হিংস্র ইঙ্গিত।
তাইতো, ওয়েট।
বলে ভীর ইশায়ার পায়ের পাতায় হালকা একটা চুমু খেয়ে,সোজা হয়ে দাঁড়ায়।
ভীর হঠাৎই চিৎকার করে ওঠে,
__গার্ডস!
তার গলার চিৎকার যেন ঘরের দেয়াল কাঁপিয়ে তোলে।
কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ঘরের দরজায় ছুটে আসে কয়েকজন গার্ড।
ঘরের বাতাস ভারী, নিঃশব্দ—শুধু ভীরের গভীর শ্বাস আর আগুনঝরা দৃষ্টি।
ভীর চোখ তুলে তাকায় গার্ডদের দিকে।
চোখে হিংস্র উন্মাদনা, ঠোঁটে ঠান্ডা এক বিকৃত হাসি।
___আ*গুনের ব্যবস্থা কর, আর একটা মোটা লোহার রড।
এখনই আনো।
ভয়ে কাঁপুনি গার্ডদের শরীরেও ছড়িয়ে পড়ে, তবুও কেউ মুখ তুলে তাকানোর সাহস করে না।
শুধু মাথা নত করে আদেশ শোনে এবং দ্রুত বেরিয়ে যায় প্রয়োজনীয় সামগ্রী আনতে।
ইশায়া এক কোণে সিঁটিয়ে বসে আছে।
চোখ দুটো বিস্ফারিত, নিঃশ্বাস গলায় আটকে আসে।
সে জানে ভয়ঙ্কর কিছু হবে তার সাথে।
কিছুক্ষণ পর গার্ডরা ফিরে আসে,
তাদের হাতে একটা লো*হার চেম্বার, যার মধ্যে জ্বলছে লালচে কয়লা।
তার ওপরে বসানো একটা মোটা লোহার রড,
যেটা ধীরে ধীরে তপ্ত হয়ে উঠছে একেবারে লাল হয়ে আগুনের মতো জ্বলছে।
ঘরের অন্ধকারে রডের জ্বলন্ত আভা ছড়িয়ে পরছে,
ভীর সেই রডের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
তার চোখে পাথরের মতো শীতলতা।
তারপর ধীরে ধীরে রডটা হাতে তোলে নেয়।
ইশায়ার বুক কেঁপে ওঠে।
ভয় তার শরীরের প্রতিটি কোষে ছড়িয়ে পড়ে।
তার গাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে ভীরতা নয়, নিরুপায় কান্না।
ভীর ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসে।
ইশায়া আতঙ্কে বিছানার একপ্রান্তে সরে যেতে থাকে, কিন্তু তার পা যেন শরীরের সঙ্গে আর কাজ করছে না।
ভীর ইশারা করে গার্ডদেরকে,
গার্ডদের ভেতর থেকে রাণিয়া এগিয়ে আসে,
বাকিরা ও ঝাঁপিয়ে পড়ে ইশায়ার ওপর।
ইশায়া ছুটতে চাইলেও পারে না।
দু’জন তার হাত চেপে ধরে রাখে,
আরো দু’জন পা দুটো শক্ত করে ধরে বিছানার সঙ্গে।
সে চিৎকার করতে চায়, কিন্তু ভয় আর কান্নায় তার গলা রুদ্ধ হয়ে গেছে।
___ভীর এগিয়ে আসে।
তার হাতে এখন সেই লালচে আগুনে পোড়া রড।
তার কণ্ঠে অদ্ভুত রকম শান্তি, ভয়ানক ঠান্ডা।
কি হলো,
চলে যাবে বেইব? এই পা দিয়ে? তাই তো ভাবছো?
ইশায়া মাথা ঝাকায়, দুঃখী ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকায়, যার মানে না,
সে কষ্ট পাচ্ছে এটা তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে।
____যাওয়ার কথা ভাবছো কিন্তু তোমাকে তো আমি আর হাঁটার মতো অবস্থায় রাখবোই না।
আর পা দিয়ে তুমি কি করবে বলোতো,
তুমি কিছু চাওয়ার আগেই আমি সব হাজির করে এনে দেবো তোমার পায়ের কাছে।
এই পৃথিবীর যা কিছু সুন্দর, যা কিছু বিলাসবহুল, যা কিছু চাওয়া যায় সব দেবো।
কিন্তু শুধু এটা চাইবে না,মুক্তি।
কারণ রাজভীর আলবারেয বেঁচে থাকতে তুমি তার কাছ থেকে মুক্তি পাবে না।
আমি যদি মরেও যাই, তাও তুমি আমার হাত থেকে রেহাই পাবে না।
তোমার কাছে অন্য কেউ আসার সব রাস্তা আমি বন্ধ করে দেবো।
ভীর কথা বলার ফাঁকেই হাঁটু গেড়ে বসে যায় ইশায়ার সামনে।
তার চোখ পড়ে ইশায়ার ছোট ছোট কোমল পায়ের পাতায়।
সে একটা পা এক হাতে শক্ত করে ধরে।
ইশায়া তখন আতঙ্কে কাঁপছে,
ছটফট করছে, কাঁদছে, কাকুতি-মিনতি করছে,
___না, দয়া করুন… এমন করবেন না প্লিজ।
__ভীর ঠোঁটে এক বিদ্রূপ হাসি টেনে বলে,
দয়া? ওটা তো আমি করতে জানি না, লিটল হার্ট।
তবে চিন্তা করো না, কষ্টটা খুব বেশি দিই না আমি।
আর তুমি তো আমার জান তোমাকে কি আমি কষ্ট দিতে পারি বলো।
____বলতে বলতেই সে ধীরে ধীরে সেই জ্বলন্ত রডটা ইশায়ার পায়ের কাছে লাগাতে নিলেই,
___ ইশায়া চিৎকার করে কেঁদে ওঠে,
আমি কোথাও যাবো না! আমি যাবো না! আ… আম…আমি আপনার কাছেই থাকবো!
দয়া করুন…. দয়া করুন বলতে বলতেই কেঁদে ওঠে ইশায়া।
____ভীর তখনও মুখে ঠান্ডা অভিব্যক্তি নিয়ে বলে ওঠে,
___হ্যাঁ?
কী বললেন?
শুনতে পেলাম না তো, ম্যাডাম।
___ইশায়া ছটফট করে, গলার সবটুকু জোর দিয়ে বলে,
আমি কোথাও যাবো না!
আপনার কাছেই থাকবো। আমি যাবো না.এমনটা করবেন না প্লিজ।
____ভীর এবার উঠে দাঁড়ায়।
ঠোঁটে সেই হিংস্র বিজয়ের হাসি।
গুড, ভেরি গুড।
তুমি কোথাও যেতে পারবে ও না।
আমিই তোর বর্তমান,
আমিই তোর ভবিষ্যৎ।আর যদি কখনও গলার আওয়াজ দেখি,
তবে এর থেকেও ভয়ংকর কিছু হবে মনে রাখিস।
আমাকে খারাপ হতে বাধ্য করিস না।
বলেই ভীর রডটা মাটিতে ছুড়ে ফেলে দেয়।
লোহার রডটা ঠক করে শব্দ করে পড়ে।
শুধু একটা জিনিস স্থির
ভয়ের রাজত্বে, ইশায়ার মুক্তির আর কোনো নামমাত্র পথ নেই।
___ভীর একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইশায়ার চোখে।
তার চোখ দুটো লালচে, ক্লান্ত নয় উন্মাদনা আর আধিপত্যে ভরা।
মেয়েটার চোখের জলের কণা আর কাঁপুনি যেন তার হৃদয়ে বিন্দুমাত্র দয়া জাগায় না বরং একধরনের তৃপ্তি এনে দেয়।
তার ইশারাতেই গার্ডরা ইশায়াকে ছেড়ে দেয়।
ইশায়া মুক্তি পেতেই নিজেকে এক কোণে গুটিয়ে নেয়।
বিছানার এক কোণে চুপচাপ সিঁটিয়ে বসে পড়ে ।
গায়ে কাপড়টা এলোমেলো, চোখ দুটো ফোলা, শ্বাস দ্রুত আর অসংলগ্ন।
তার চোখ-মুখে ভয়ের ছাপ স্পষ্ট।
ভয়ে কাঁপছে সে।তার চোখ মাটিতে পড়া জ্বলন্ত রডে নিবদ্ধ।
___ভীর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটা উপভোগ করছে।
একটা ঠান্ডা, নির্মম তৃপ্তি তার বুকের ভেতর কাঁপছে।
___দেখো কী সুন্দর করে ভয় পেয়ে গুটিয়ে গেছে,
মনে মনে হাসে সে।
এমনটা করতো না সে।
না, সত্যি করতো না যদি ইশায়া মুখের ওপর কথা না বলতো,
যে সে চলে যাবে,তার কাছে থাকবেনা, আর এই রাজত্বে আর থাকতে চায় না এগুলো মানতে পারে না ভীর।
ভীর জানে মেয়েটার ভেতরে একধরনের তেজ আছে,
আর এই তেজটাই তার সহ্য হয় না।
এই মেয়ে বিদ্রোহ শুরু করার আগেই তাকে ভেতর থেকে ভেঙে চুরমার করে দিবে সে।
চিৎকার করে, ভয় দেখিয়ে নয় ভেতর থেকে এমনভাবে মেনে নিতে বাধ্য করবে যেন ইচ্ছার বিরুদ্ধে ও তার সাথেই থাকতে হবে।নিজেকে মানিয়ে নিতে হবে তার সাথে।
__তোকে আমি মারবো না।
আঘাত ও করবো না।
তবে এমনভাবে ঘিরে ফেলবো,
যাতে কোনোদিন তোর মাথায় আমাকে ছেড়ে যাওয়ার চিন্তাটাও না আসে।
—-ভীর নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে। তার চোখ যেন একটা তীক্ষ্ণ ছুরির মতো স্থির হয়ে রয়েছে ইশায়ার দিকে।
মেয়েটার গায়ে এখনো সেই সস্তা দেখতে জামাটি।
কান্না থেমে গেলেও মুখে ভয়ের ছাপ এখনও স্পষ্ট, শ্বাস অগোছালো।
ভীর কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে শান্ত, কিন্তু ঠাণ্ডা আগুনে জ্বলতে থাকা চোখে
___তারপরে হঠাৎ সে একদম গম্ভীর কণ্ঠে ডাক দেয়,
___মারিয়া এলেনা!
ঘরের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মধ্যবয়সী পরিচারিকা তড়িত্ প্রতিক্রিয়ায় এগিয়ে আসে।
তাঁর মুখে স্পষ্ট উদ্বেগ, কণ্ঠ জড়ানো,
___জি স্যর?
ভীর চোখ নামায় না, ইশায়ার শরীরের দিকেই তাকিয়ে, কঠিন কণ্ঠে বলে ওঠে,
___ওর শরীরে এখনো এই সস্তা জামা কেন?
তার গলায় বিরক্তি আর দম্ভের কাঁপন।
___তোমাদের এখানে রাখা হয়েছে কেন?
তোমরা কি ভুলে যাচ্ছো ও কে?
রাজভীর আলভারেযের বউয়ের গায়ে এই কাপড় কতটা অসম্মানজনক দেখায়?
ভীর এবার সরাসরি মারিয়ার চোখে তাকায়।
___তোমাদের কাজ কী?
ওকে কীভাবে সাজাতে হয়, তা যদি এখনো না জানো, তাহলে তোমরা এখানে থাকার যোগ্য না।
মারিয়া দ্রুত মাথা নিচু করে নেয়, কাঁপা কণ্ঠে বলে,
___ভুল হয়ে গেছে স্যর, আমি এখনই, এখনই ঠিক করে দিচ্ছি।
ভীর আবার ইশায়ার চোখে তাকায়, যেখানে ভয়, অভিমান আর অব্যক্ত প্রশ্ন ভেসে উঠেছে।
তার ঠোঁটে ঠান্ডা একটা হাসি খেলে যায়।
তার মন মস্তিষ্ক জুড়ে সবসময় এই মেয়েটি থাকে।
এই যে এখন সে তার চোখের সামনে এটাই তার জন্য আলাদা একটা প্রশান্তি।
এই মেয়ে তার সামনে থাকলেই তার ভালো লাগে।
___তৈরি কর ওকে,
শক্ত গলায় বলে ভীর।
___আমরা আজকেই রওনা দিব মেক্সিকোর উদ্দেশ্যে।
ভীর আর কোনো কথা না বলেই রুম থেকে বেরিয়ে যায় গটগটিয়ে, ভারী পদক্ষেপে।
তার চলে যাওয়া যেন পুরো ঘরের ভেতর থেকে বাতাস টেনে নিয়ে গেল।
বাইরে ডিয়েগো ইতিমধ্যেই মেক্সিকো ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গুয়াতেমালা এখন সম্পূর্ণ ভীরের নিয়ন্ত্রণে, একটি জয়ী রাজ্যের মতো মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
আর এই রাজ্য ছেড়ে যাওয়ার পরও সেটা তাদেরই থাকবে।
তার দখলকৃত রাজ্যের মধ্যে এখন গুয়াতেমালা ও একটি।
বাইরে প্রাইভেট জেট প্রস্তুত।
মারিয়া এলেনা ধীরে ধীরে ইশায়ার দিকে এগিয়ে আসে।
তার কণ্ঠে মৃদু সুর,
___ম্যাম!
কাছে যেতেই ইশায়া ভয় পেয়ে এক ঝটকায় দূরে সরে যায়, চোখ দুটো বিস্ফারিত।
মারিয়া হালকা গলায় শান্তভাবে বলে,
___আমি ম্যাম,ভয় পাবেন না।
ইশায়া কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে গোল গোল চোখে, সে বুঝে উঠতে পারছে না কিছুই,
তারপর হঠাৎ মারিয়া এলেনার কোমর জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে।
গলা চিড়ে বেরিয়ে আসে এক অসহায় মেয়ের কান্না।
তার কান্না যেন কোনো এক বন্দী পাখির আত্মচিৎকার,ঘরের বাতাস ভারি হয়ে আসে।
এক গার্ড এসে ইশায়ার হাত টেনে ধরে,
নরম গলায় বলে
___ম্যাডাম, বসের আদেশ, আপনাকে তৈরি হতে হবে।
আমাদের শীঘ্রই মেক্সিকোর উদ্দেশ্যে রওনা দিতে হবে।
তারা ইশায়াকে নিয়ে যায়।
গোলাপের পাপড়ি ভরা উষ্ণ বাথটাবে বসানো হয় তাকে।
মোলায়েম হাতগুলো আর লম্বা চুলে শ্যাম্পু মাখিয়ে দেয়, সুগন্ধি ভেসে বেড়ায় চারপাশে।
কিন্তু এই আভিজাত্য যেন তাকে গিলে খাচ্ছে সে কোনোদিনও এমন কিছু চাইনি।
শাওয়ার শেষে, তার গায়ে পরিয়ে দেওয়া হয় সাদা ফ্লোরাল গাউন পবিত্রতার সঙ্গে এক অদ্ভুত বন্দিত্বের প্রতীক।
তার আসল রূপ উন্মোচিত হয় মসৃণ ত্বক, ভেজা চুলে জ্বলজ্বলে মুখ, যেন কোনো রূপকথার রাজ্যের বন্দি রাজকন্যা।
রানিয়া হেয়ার ড্রায়ারের উষ্ণ হাওয়ায় তার লম্বা চুল শুকিয়ে দেয়,
মারিয়া এলেনা তার ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক আর চোখে কাজল আঁকে।
তার চোখের গভীরে এখনো ভয় জমে আছে, কিন্তু তবুও সৌন্দর্যের আলো ফুটে উঠছে।
মারিয়া লক্ষ্য করে ইশায়ার হাত ও গলা ফাঁকা।
প্রশ্ন করলেও ইশায়া কোনো জবাব দেয় না, কেবল চোখ নামিয়ে রাখে।
মারিয়া কোনো কথা না বলে সাদা মুক্তোর মালা পরিয়ে দেয় তার গলায়,
আর ছোট্ট দুল।
শেষ ছোঁয়া হিসেবে আরেকজন এসে তার পায়ে হালকা সিলভার হিল পরিয়ে দেয়।
সব প্রস্তুতি শেষে,
তারা ইশায়াকে নিয়ে বের হয় বাইরের দিকে।
মেঘলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা হেলিকপ্টারের রটার ইতিমধ্যেই ঘুরছে, গর্জন যেন ভীরের উপস্থিতির আগাম ঘোষণা।
মারিয়া এলেনা ইশায়াকে বসিয়ে দেয় ভেতরে।
ইশায়া পুরোপুরি পাথর হয়ে বসে আছে কোনো অনুভূতির ঝলক নেই, যেন সে এখন কেবল একটি সুন্দর সাজানো মূর্তি।
মারিয়া এলেনা তার দিকে একবার তাকিয়ে নিঃশ্বাস ফেলে চলে যায়,
কারণ ভীর আসতে চলেছে, আর এখানে আর কারো থাকার অনুমতি নেই।
বেরিয়ে আসে ভীর,
সাদা ক্রিস্প শার্টের বোতামগুলো গলার কাছে খোলা, তার নিচে টানটান বুকের পেশী হালকা দেখা যাচ্ছে।
কালো ফিটিং প্যান্ট, আর তার ওপরে গা-ছমছমে কালো লম্বা কোর্ট হাওয়ায় সামান্য দুলছে।
উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ মুখশ্রী, তীক্ষ্ণ চোয়াল,
লম্বা, ঘন কালো চুল জেল দিয়ে নিখুঁতভাবে পিছনে সেট করা।
গত দুই দিন তার চোখে যে হিংস্র দহন ছিল, আজ তা নেই।
চেহারা এখন শান্ত, কিন্তু সেই শান্তি যেন আগ্নেয়গিরির সুপ্ত গর্জন যে কোনো সময় বিস্ফোরিত হতে পারে।
ভীর ধীর, ভারী পদক্ষেপে হেঁটে আসে হেলিকপ্টারের দিকে।
রটার ব্লেডের শব্দ আকাশে গর্জন তুলছে, কিন্তু তার চলার ছন্দে কোনো তাড়াহুড়ো নেই যেন গোটা পৃথিবী তার অপেক্ষায়।
হেলিকপ্টারে উঠতেই একজন গার্ড এগিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দেয়।
ভীর সামান্য ঝুঁকে ভেতরে ঢোকে,
তার চোখ সঙ্গে সঙ্গেই খুঁজে পায় ইশায়াকে।
তার চোখের দৃষ্টি নরম হয়,
এই চেহারায় আলাদা একটা সৌন্দর্য মিশে আছে যা তাকে শান্তি দেয়।
ইশায়া জানালার দিকে মাথা হেলিয়ে বসে আছে, তার লম্বা চুলগুলো সিটের ওপর ছড়িয়ে পড়েছে।
আলো এসে পড়ে তার মুখে,
ভীরের দৃষ্টি শীতল হয়ে আসে, কিন্তু তা কোনো শত্রুতার নয় এ এক গভীর, অধিকারী শান্তি।
ইশায়ার মুখের কোমল রেখাগুলো, তার ত্বকের আভা, এই অপরূপ সৌন্দর্য সবকিছু ভীরের মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ছড়িয়ে দেয়।
এ মেয়েটাই তার।
তার নিজের হাতের মুঠোয় বন্দি যেমন করে হোক, চিরকাল সে তাকে তার কাছেই রাখবে।
এই ইশায়ার জন্য সে সবকিছু জ্বালিয়ে দিতে পারে, তবুও তাকে ছেড়ে দেবে না।
ভীর এসে ধীরে বসে তার পাশে।
ইশায়া কোনো কথা বলে না, চোখ জানালার বাইরের দিকে স্থির।
হেলিকপ্টারের রটার ব্লেডের প্রচণ্ড গর্জন আকাশ চিরে এগোচ্ছে।
নীচে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে গুয়াতেমালার শহর, পাহাড় আর জঙ্গল সবকিছু যেন ক্রমে মুছে যাচ্ছে, ঠিক যেমন ইশায়ার পুরনো জীবনের স্মৃতি মুছে দিয়েছে ভীর তার জীবন থেকে।
ভীর ইশায়ার পাশে বসে।
তার দৃষ্টি স্থির তীক্ষ্ণ, গাঢ়, আর অদ্ভুতভাবে শান্ত।
মাঝে মাঝে রটার ব্লেডের কম্পনে ইশায়ার চুলগুলো সামান্য দুলে এসে ভীরের কাঁধ ছুঁয়ে যাচ্ছে,
যা ভীরকে অদ্ভুতভাবে তৃপ্তি দিচ্ছে।
ইশায়া জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে, কিন্তু জানালার ওপারের দৃশ্যগুলো আর তার চোখে পৌঁছায় না।
তার চোখের গভীরে কেবল অচেনা শূন্যতা যেন পৃথিবীর সব রঙ মুছে গেছে।
কিন্তু ভীর জানে এই শূন্যতার ভিতরে কোথাও তেজ আছে, আগুন আছে আর সে সেই আগুন চিরকাল নিজের মুঠোয় রাখতে চায়।
একসময় ভীর সামান্য এগিয়ে আসে, তার কনুই সিটের আর্মরেস্টে ভর দিয়ে, মুখ ঠিক ইশায়ার পাশেই থামায়।
তার চোখ ইশায়ার মুখের প্রতিটি রেখা অনুসরণ করে নাকের ধার, ঠোঁটের হালকা কাঁপন, পাপড়ির ছায়া।
এ যেন কোনো শিকারি তার সবচেয়ে মূল্যবান শিকারকে গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করছে, কিন্তু ক্ষতি করার জন্য নয় বরং এমনভাবে বন্দি রাখতে চায়, যেন সে আর কখনো পালাতে না পারে।
হেলিকপ্টার ক্রমে মেক্সিকোর সীমান্তের দিকে এগোচ্ছে।
নীচে নদী, বনভূমি, মরুভূমি সবকিছু পেরিয়ে।
হেলিকপ্টারের গর্জন ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়, অবতরণের সাথে সাথে গুয়াদালাহারার বাতাস ছড়িয়ে পড়ে কেবিনে।
ইশায়া, জানালার পাশে হেলান দিয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে।
তার নিঃশ্বাস ধীর, মুখে শান্তির ছায়া যেন এই অল্পক্ষণের জন্যে অন্তত বন্দিত্বের ভয় ভুলে গেছে।
ভীর দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকে তার দিকে, কিন্তু ডাক দেয় না।
এই মুহূর্তটুকু নষ্ট করতে তার ইচ্ছা হয় না।
হেলিকপ্টারের দরজা খুলতেই, ঠান্ডা হাওয়া ভেতরে ঢুকে পড়ে।
ভীর নিঃশব্দে এগিয়ে এসে, ইশায়ার ঘুমন্ত দেহটাকে আলতো করে পাজাকোলে তুলে নেয়।
তার বাহুতে ইশায়া অবলীলায় মানিয়ে যায় যেন সে বহুদিনের চেনা কোনো জায়গায় ফিরে এসেছে, যদিও এ স্থান তার কাছে বন্দিশালা।
সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে ভীর, চারপাশে অ*স্ত্রধারী গার্ডদের ভয়ংকর নীরবতা।
প্রতিটি পদক্ষেপে কেবল তার বুটের শব্দ, আর হেলিকপ্টারের ধীরে থেমে যাওয়া রটারের সাঁই সাঁই আওয়াজ।
হেলিকপ্টার পেছনে মিলিয়ে গেলে সামনে দেখা যায়
দূরে বিশাল প্রাসাদ, ঝলমল করছে, অন্ধকারের বুকের মধ্যে দাঁড়ানো এক আলোর সাম্রাজ্য।
গেটে পাহারাদারদের লাইন, মশালের আলো, আর কড়া চোখে চারপাশ পর্যবেক্ষণ।
ভীর এগিয়ে যায় প্রাসাদের দিকে।
উঁচু দেয়ালের উপর বাতাসে পতপত করে উড়ছে আরো একটি পতাকা,
সদ্য দখল করা গুয়াতেমালার পতাকা।
সে আমার বন্দিনী পর্ব ৫৩
এ যেন পুরো বিশ্বকে ঘোষণা এই রাজ্য এখন রাজভীর আলভারেজের দখলে।
প্রাসাদের দরজা খুলে গেলে, ভেতরের সোনালী ঝাড়বাতির আলো ইশায়ার মুখে পড়ে।
সে তখনও ঘুমন্ত, কিন্তু এই আলোয় তার মুখ আরও নিষ্পাপ, আরও দুর্লভ লাগে।
ভীরের ঠোঁটে এক অদ্ভুত তৃপ্তির রেখা ফুটে ওঠে,
সে কেবল একটি রাজ্য নয়, তার সবচেয়ে মূল্যবান রত্নটিও নিজের হাতে ধরে রেখেছে।
