Home সে আমার বন্দিনী সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯১

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯১

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯১
তানিয়া হুসাইন

দীর্ঘক্ষণ ইশায়াতে মত্ত থাকার পর অবশেষে ক্লান্ত শরীরটা বিছানায় এলিয়ে দেয় ভীর।
তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে।ঘরের ভারী নিস্তব্ধতার মাঝে শুধু তার অগোছালো শ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে।
ভীর একহাতে রিমোট তুলে নিয়ে এসির টেম্পারেচার একটু বাড়িয়ে দেয়।শরীরে ঘাম চিকচিক করছে।কপালের ভেজা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পড়ে আছে।
ভীর মাথা ঘুরিয়ে পাশে তাকায়।ইশায়া নিশ্চুপ হয়ে শুয়ে আছে চোখ বন্ধ তার।তার এলোমেলো চুল ছড়িয়ে আছে বালিশ জুড়ে।দ্রুত শ্বাসের সাথে বুক উঠানামা করছে ধীরে ধীরে।ভীর কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে।সেই দৃষ্টিতে ছিল এক অদ্ভুত মিশ্রণ উন্মাদ অধিকার, গভীর তৃপ্তি আর ভয়ংকর কোমলতা।ভীর ধীরে হাত বাড়িয়ে ইশায়ার গাল ছুঁয়ে দেয় সে।আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে সরিয়ে দেয় কপালের উপর পড়ে থাকা চুলগুলো।
ইশায়াকে চোখ খুলতে না দেখে ভীরের কপালে ভাজ পরে।এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হয়, মেয়েটা আবার অজ্ঞান হয়ে গেল না তো।
ভীর তাড়াতাড়ি ইশায়ার বাহু চেপে ধরে আলতো ঝাঁকায়। গলায় উৎকণ্ঠা নিয়ে ডাকে,

___বেবস…
কোন সাড়া নেই,ভীর এবার আরেকটু জোরে ঝাকায়।
ইশায়া শুধু ঘুমের ঘোরে অস্পষ্ট স্বরে, উম… উম… করে ওঠে। ইশায়াকে সাড়া দিতে দেখে ভীরের ভেতরের অস্থিরতাটা নরম হয়ে আসে।গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে সে। বুঝতে পারে, ইশায়া ঘুমিয়ে আছে।
তারপরই খানিক অবাক হয় ভীর।এত দ্রুত কেউ কিভাবে ঘুমিয়ে যেতে পারে।
পরক্ষণেই ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে ওঠে তার।
এই ঘুমকাতুরে মেয়ে যেকোনো পরিস্থিতিতেই ঘুমিয়ে যেতে পারে, সেটা ভীর খুব ভালো করেই জানে।
ভীর মাথা তুলে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে থাকে।
তার চোখে এখন ঘুম নেই।

তবুও সে শুয়ে থাকে চুপচাপ, চোখ দুটো ধীরে বন্ধ করে।অনেকদিন পর আজ তার মাইন্ডটা একটু শান্ত।গত ক’দিনের টানাপোড়েন র*ক্ত, রাগ, অস্থিরতা সবকিছু কিছু সময়ের জন্য থেমে গেছে।একটা অদ্ভুত শান্তি কাজ করছে তার ভেতরে।চোখ বন্ধ করার কিছুক্ষণ পরই হঠাৎ একটা নরম হাত এসে আছড়ে পড়ে তার বুকের ওপর।
সাথে পায়ের ওপর অনুভব করে উষ্ণ, নরম শরীরের স্পর্শ।আর সেই স্পর্শ পেতেই ভীরের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসির রেখা ফুটে ওঠে।চোখ না খুলেই মৃদু হাসে সে।ইশায়ার এসব স্বভাবে বহু আগেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে ভীর।যেখানে সারাজীবন আলাদা বিছানায় একা ঘুমিয়েছে সে,
সেখানে এখন ইশায়াকে ছাড়া তার ঘুমই আসে না।
ঘুমের ঘোরে ইশায়ার হাত-পা ছুড়ে দেওয়া, নিজে থেকেই কাছে আসা তার বুকে নাক মুখ ঘসা, ইশায়ার এসব ছোট ছোট অভ্যাস ভীষণ পছন্দ ভীরের।এজন্য-ই তো এখন দূরে গেলে ঘুম হয় না তার।
ভীর চোখ খুলে কম্ফোর্টারে মুড়িয়ে থাকা শরীরটাকে আরো কাছে টেনে নেয়।একেবারে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নেয় তাকে।কম্ফোর্টারের নিচে দুটো উন্মুক্ত শরীর নিঃশব্দে একে অপরকে জড়িয়ে শুয়ে থাকে।এরপর ও ভীরের মনে হয়,সে কোনোভাবেই ইশায়াকে যথেষ্ট কাছে পাচ্ছে না।মেয়েটাকে একেবারে নিজের বুকের ভেতর ঢুকিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে তার।ইশায়াকে আরো শক্ত করে জাপটে ধরে চোখ বুজে ভীর,তার ভেতরটায় শান্তি নামে।
ভীর ইশায়ার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটায় না। তার বুকের সাথে জড়িয়ে থাকা মেয়েটার শান্ত মুখটা দেখতে থাকে টসটসে ঠোঁট দুটো রক্তিম হয়ে আছে,অদ্ভুত এক নরম অনুভূতি কাজ করে তার ভেতরে।এই দেখার শেষ নেই তার। ভীর আনমনে বলে ওঠে, তোমাকে দেখার তীব্র ইচ্ছা আমাকে বার বার তোমার কাছে টেনে আনে,নে*শা তুমি আমার,যা দিন দিন উন্মাদনায় পরিণত হয়েছে।তোমাকে দেখার ইচ্ছা আমার এই জীবনে মিটবে না মাইন লিটিল হার্ট।
শক্ত পুরুষালি হাত ইশায়ার মাথায় আলতো করে বুলাতে থাকে।আদুরে স্পর্শে ইশায়ার ঘুম আরো গাঢ় হয়।

_____সময় গড়ায়।
কিছুক্ষণ পর ইশায়ার ঘুম ছুটে যায়।চোখ খুলতেই দেখে সে পুরোপুরি ভীরের ভারী শরীরের চাপে আটকে আছে।নড়তেও কষ্ট হচ্ছে তার।তবুও বহু কষ্টে নিজেকে একটু সরিয়ে আনে ইশায়া।
পেটের ভেতর চিনচিনে ব্যথাটা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।অস্বস্তিতে শরীরটা কুঁকড়ে আসে তার।এভাবে খালি গায়ে আরেকজন সাথে লেপ্টে থাকতে এখনো অদ্ভুত লাগে ইশায়ার।অভ্যস্ত হয়ে গেছে তবুও প্রতিবারই ভেতরে ভেতরে গুটিয়ে যায় সে।

মাথা তুলে ভীরের দিকে তাকায় ইশায়া।কতগুলো দিন পর আবারো মুখোমুখি এই মানুষের সাথে,এই মানুষকে দেখার জন্য তার এই অবাধ্য মন কতোটা ছটফট করেছে, সে চেয়েও দমিয়ে রাখতে পারেনি সেই আকাঙ্ক্ষা।
ভীরের দিকে তাকিয়ে থাকতেই ইশায়ার মনে পড়ে যায় গ্র্যানির বলা কথাগুলো।মনে পড়ে ভীরের ছোটবেলার কথা।ছোট্ট একটা ছেলে যে খুব অল্প বয়সেই সব হারিয়েছে। সব কিছু ভাবতেই বুকের ভেতর অদ্ভুত ভারী অনুভূতি জমে ওঠে ইশায়ার।
কিন্তু পরক্ষণেই মনে পড়ে যায় তাদের সাথে হওয়া অন্যায়গুলো।র*ক্ত, মৃ*ত্যু, কান্না,হাহাকার সব।
ভীরের অতীত শুনে তার সত্যিই খুব খারাপ লেগেছে ইশায়ার,ভীষণ খারাপ লেগেছে।
তবুও কেন জানি নিজের সাথে হওয়া অন্যায়গুলো কিছুতেই ভুলতে পারে না সে।
হ্যাঁ সাফা যদি এই সবকিছুর সাথে জড়িত না থাকত,
তাহলে হয়তো কোনো না কোনোভাবে সে ভীরকে ক্ষমা করে দিতে পারত।
কিন্তু সাফার বিনিময়ে,না কখনোই না। সাফার নিজের ভাইয়ের জীবন শেষ হয়ে গেছে।তাদের ভালোবাসা স্বপ্ন সব শেষ।ফুফা-ফুফির কান্নার ওপর দাঁড়িয়ে সে নিজের সংসার সাজাতে পারবে না।কিছুতেই না।
চোখের কোণ বেয়ে নীরবে পানি গড়িয়ে পড়ে ইশায়ার।
সে আবার তাকায় ভীরের দিকে।বন্ধ চোখ,শক্ত চোয়াল,মুখে চাপ দাড়ি,এলোমেলো চুল ঘুমের মধ্যেও এই লোকটাকে ভয়ংকর লাগে তার।

যেন চোখ খুললেই আবার এক ধ্বংসযোগ্য বাধাবে।
ইশায়ার দৃষ্টি ধীরে নেমে আসে ভীরের বুকের দিকে।
তার করা ক্ষতটার ওপর থেমে যায় চোখ।
মনে পড়ে যায় সেই রাতের কথা। মনে মনে ভাবে এদের সাথে থেকে তার ভেতরের কোমলতা ও হারিয়ে যাচ্ছে,সে কিভাবে এই কাজ করলো ভাবতে ভাবতেই অজান্তে ইশায়ার হাত এগিয়ে যায় সেখানে।আলতো করে আঙুল ছোঁয়ায় ক্ষতের ওপর।
ধীরে হাত বুলিয়ে সে সেখানে লম্বা গভীএ ক্ষত।

___বুকের ওপর নরম স্পর্শ অনুভব করতেই সদ্য ঘুম জড়ানো চোখ মেলে তাকায় ভীর। কাচা ঘুম ভাঙার কারনে চোখ দুটো লাল লাল হয়ে আছে তার, দৃষ্টিতেও অদ্ভুত তীক্ষ্ণতা।
ভীর প্রথমে নিজের বুকের ওপর রাখা হাতটার দিকে তাকায়।তারপর দৃষ্টি তোলে হাতের মালিকের দিকে।ভীর অবাক হয় ইশায়া জেগে থাকা অবস্থায় তাকে স্পর্শ করেছে দেখে।ভীরের চোখ আটকে যায় ইশায়ার টানা টানা চোখে।কয়েক সেকেন্ড নিঃশব্দে একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকে দুজন।দৃষ্টি বিনিময় হয়।
কিন্তু ভীরের রাগ উঠে ইশায়ার চোখের কোনে পানি দেখে,জিদ্দি মন তেতে ওঠে তার।এতো ভরিয়ে রাখার পর ও এই মেয়ে পোষ মানে না কেনো সে বুঝতে পারেনা।আর কি করবে সে কি করার বাকি আছে।
ভীরকে উঠতে দেখে ইশায়া হকচকিয়ে যায়, দ্রুত হাত সরিয়ে নেয়।এই জিনিসটা পছন্দ হয় না ভীরের।রাগ তড়তড়িয়ে বারে তার।
ইশায়া নিজেকেও সরিয়ে নিতে চায় ভীরের কাছ থেকে,
দুহাতে ভীরের প্রসস্ত বুক ঠেলে দূরুত্ব বাড়াতে চায়।কিন্তু ইশায়া নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার আগেই ভীর হেচকা টানে তাকে একেবারে নিজের কাছে এনে ফেলে।
এক সেকেন্ডও সময় নেয় না সে,পরের মুহূর্তেই আগ্রাসীভাবে কামড়ে ধরে ইশায়ার ওষ্ঠযুগল।

হঠাৎ এমন আক্রমণে পুরোপুরি হতভম্ব হয়ে যায় ইশায়া।তার শরীর শক্ত হয়ে আসে।ইশায়া ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে।ইশায়া যত ছটফট করে ভীর তত আকড়ে ধরে তাকে,ইশায়া ভীরের গলা খাপছে ধরে,নখ দাবিয়ে দেয় চামড়ার ভেতর
কিন্তু তাতে আরো উন্মত্ত হয়ে ওঠে ভীর।ছটফট করতে করতে একসময় একেবারে শান্ত হয়ে আসে ইশায়া।প্রত্যেকবারের মতো একটা পরাজিত সৈনিকের মত নিজের হার মেনে নেয়।
কিন্তু ভীর থামে না তার জমে থাকা সমস্ত রাগ, ক্ষোভ, অস্থিরতা ইশায়ার ঠোঁটেই মিটায় সে।তার শক্ত, পুরুষালি হাত চেপে ধরে ইশায়ার নরম সত্তা,চাপা যন্ত্রণায় গোঙিয়ে ওঠে ইশায়া।সময় গড়াতে থাকে।আর ভীর আবারও নিজের কর্তৃত্ব ফলাতে থাকে ইশায়ার ওপর।ইশায়ার চোখ ছাপিয়ে নীরবে পানি গড়িয়ে পড়ে।কিন্তু ভীর তখন নিজের রাগে এতটাই অন্ধ যে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।

ইশায়ার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে ওঠে।এই মানুষটাকে দেখার জন্যই তো তার ভেতরটা এতদিন জ্বলছিল।প্রতিটা রাতে, প্রতিটা নিঃশ্বাসে সে শুধু ভীরকেই খুঁজেছে।কিন্তু এখন…এখন মনে হচ্ছে, এই লোক ছিলো না সেটাই ভালো ছিলো।ভীষণ রাগ হয় ইশায়ার।নিজের ওপরও,ভীরের ওপরও।তবুও নিষ্ঠুর সত্যিটা সে অস্বীকার করতে পারে না।ভীরের এই বেপরোয়া, হিংস্র স্বভাবটাই একসময় তার সবচেয়ে বেশি পছন্দ ছিল।
মনে পড়ে যায় অতীতের সেই দিনগুলো।যখন এই একই আগ্রাসন তাকে কাঁপিয়ে দিত ভালোবাসায়।
তখন সবকিছু মধুর ছিল। আর এখন,এখন সেই স্মৃতিগুলোই বিষাক্ত কাঁটার মতো শরীরে বিঁধে থাকে।সত্যটা সামনে আসার পর থেকে।
তবুও একটা জায়গায় শান্তি পায় ইশায়া।
জা*নোয়ারটা অন্তত তার হাতের শিকল খুলে দিয়েছে।
ইশায়ার ভাবনার মাঝেই ভীর কম্ফোর্টারে মুড়িয়ে ইশায়াকে কোলে তুলে নেয়।ইশায়া চোখ ছোট ছোট করে তাকায় তার দিকে।
ভীর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে ওঠে,

___চোখের কোণে আর এক ফোঁটা পানি দেখবো, তাহলে আমার থেকে খারাপ আর কেউ হবে না, মাইন্ড ইট।আমি ভুলে যাবো অসুস্থ বা অন্য কিছু।
ইশায়া দাঁতে দাঁত চেপে মনে মনে বলে,
__ শা*লা খা*চ্চর তোর থেকে খারাপ আর কেউ নেই-ই এই দুনিয়ায়।আমার জীবনে দেখা শ্রেষ্ঠ খারাপ লোক তুই।
ইশায়া চুপচাপ বিছানার একপাশে বসে আছে।
তার পরনে কালো রঙের প্লাজো আর ভীরের সাদা টি-শার্ট।
ঢিলেঢালা টি-শার্টটা হাঁটু পর্যন্ত নেমে এসেছে তার।
ভীরই পরিয়ে দিয়েছে তার টি-শার্ট।
মাত্র কিছুক্ষণ আগেই শাওয়ার নিয়ে বেরিয়েছে দুজন।
হাতের শিকল খোলা থাকায় অনেকদিন পর নিজের মতো নড়াচড়া করতে পারছে ইশায়া।
তাই ধীরে ধীরে উঠে গিয়ে দাঁড়ায় আয়নার সামনে।
পিছনে দাঁড়িয়ে ভীর মাথার ভেজা চুল তোয়ালে দিয়ে মুছছে।

ভীরকে দেখে চোখ ঘুড়িয়ে নেয় ইশায়া রাগে কটমটিয়ে উঠে সে,শাওয়ার নেওয়ার সময় ও শান্তি নেয় নি তাকে এই অসভ্য বর্বর লোকটা।
কোথায় চলে যাবে আসার কোন নাম গন্ধ থাকবে না আর যখন আসে পারে না তার জানটা খেয়ে ফেলতে,জা*নোয়ার একটা।শা*লা তোকে লাথি মেরে ইউ*গান্ডা পাঠিয়ে দিবো।
এদিকে ভীর দূরে দাঁড়িয়ে ও ইশায়াকে পর্যবেক্ষণ করছে।ইশায়ার বিডবিড়ানো লক্ষ্য করেছে সে,কিন্তু তার দৃষ্টি এখন অন্য জায়গায়, ইশায়ার শরীরের পরিবর্তন গুলো দেখছে সে।
তার পরনে শুধু কালো রঙের একটা ট্রাউজার।
সুদৃঢ়, পেশিবহুল শরীরটা দৃশ্যমান।
ভেজা ত্বকের ওপর ছড়িয়ে থাকা ক্ষ*তগুলোর দাগ তাকে আরো হিং*স্র দেখায়।তার শরীরে থাকা ট্যাটু জ্বলজ্বল করছে।

ইশায়াকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভীরও এগিয়ে যায় সেখানে।একেবারে এসে দাঁড়ায় ইশায়ার পেছনে।এতটাই কাছে যে ইশায়া নিজের পিঠে ভীরের শরীরের উষ্ণতা অনুভব করতে পারে।ভীর ইশায়ার কাধে চুমু খায়।তার হাত রাখে ইশায়ার বাড়ন্ত পেটের ওপর।আগের থেকে একটু বেড়েছে।খুব বেশি না,
তবুও বোঝা যায়।
এখানে তার অস্তিত্বও আছে,তার বেবি আছে,ভীরের চোখ অদ্ভুতভাবে নরম হয়ে আসে,হাত বুলোয় আলতো করে।
ইশায়া আয়নার দিকে তাকিয়ে থাকে।
দুজনের প্রতিবিম্ব পাশাপাশি ভেসে ওঠে সেখানে।
ভীরের বিশাল দেহের সামনে ইশায়াকে আরো ছোট লাগে।লম্বায় সে ভীরের কাঁধেরও নিচে।
হঠাৎ করেই কেমন যেন লাগে ইশায়ার।মাথার ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা নেমে আসে।সে আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।চুপচাপ সরে গিয়ে আবার বিছানায় বসে পড়ে।ভীর অবশ্য এসব নিয়ে কিছু ভাবে না।তার কাছে এসব নতুন নয়।ইশায়া সবসময়ই তার থেকে দূরে দূরে থাকতে চায়।যেন কাছে এলেই পুড়ে যাবে এমন হাবভাব তার।

___ভীর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ভেজা চুলগুলো ঠিক করছে।
আর এদিকে বিছানায় বসে থাকা ইশায়া হঠাৎ শুয়ে পড়ে।শরীরটা হঠাৎ-ই খুব খারাপ লাগছে তার।
প্রথমে খুব ক্ষীণ একটা ফুঁপানোর শব্দ ভেসে আসে।
শব্দটা কানে যেতেই ভীর ভ্রু কুঁচকে পিছন ফিরে তাকায়।
ইশায়াকে কুঁকড়ে যেতে দেখে কিছুক্ষণ বুঝতেই পারে না সে।হঠাৎ আবার কান্না কেন?
ভীর বিরক্ত গলায় বলে ওঠে,

___একটু আগে কি বলেছিলাম তো…
কিন্তু কথাটা শেষ করার আগেই থেমে যায় সে।
কারণ ইশায়ার ফুঁপানোটা মুহূর্তেই তীব্র আর্তনাদে বদলে যায়।
দু’হাত শক্ত করে পেটে চেপে ধরে মোচড়াতে থাকে ইশায়া।মুখটা যন্ত্রণায় ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
ভীরের বুক ধক করে ওঠে।সে তড়িঘড়ি করে বিছানার কাছে গিয়ে ইশায়াকে ধরে।
__কি হয়েছে?
কণ্ঠে তার স্পষ্ট আতঙ্ক।
ইশায়ার কান্নার তীব্রতা দেখে ঘাবড়ে যায় ভীর।ইশায়াকে সামলাতে চায় সে কিন্তু পারেনা,এতটা অসহায় তাকে খুব কম সময়েই দেখা গেছে।
সে দ্রুত ইশায়াকে ঠিক করে বিছানায় শুইয়ে দেয়।
তারপর নিচু গলায় আবার জিজ্ঞেস করে,
___কি হয়েছে, লিটেল বার্ড? বলো আমাকে…
ইশায়া কাঁপতে কাঁপতে দু’হাতে নিজের পেট চেপে ধরে।
কষ্টে তার পুরো শরীর কেঁপে উঠছে।
কাঁপা কাঁপা গলায় সে বলে,

___পে… পেটে খ… খুব ব্যথা করছে।
ভীরের মুখের রঙ মুহূর্তেই বদলে যায়।কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে ওঠে তার।
এক সেকেন্ডও দেরি না করে দ্রুত ফোন বের করে ডাক্তারকে আসতে বলে।
ফোনটা ছুঁড়ে রেখেই আবার ইশায়ার পাশে ফিরে আসে ভীর।
তার হাতটা নিজের মুঠোর ভেতর শক্ত করে ধরে রাখে।
ইশায়াকে শান্ত করার চেষ্টা করে ভীর,
কিন্তু তার নিজের গলাই কাঁপছে।
___রিল্যাক্স জান… কিছু হবে না।সে আরো শক্ত করে ইশায়ার হাত চেপে ধরে।
কিছু হবে না তোমার, কিছু হতে দিব না আমি সব ঠিক হয়ে যাবে,সব ব্যথা কমে যাবে ট্রাস্ট মি।
ভীরের চোখে স্পষ্ট ভয়।
সেই ভয়, যেটা একজন নিষ্ঠুর মানুষও লুকাতে পারে না যখন নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটা কষ্টে ছটফট করছে।ইশায়া যন্ত্রণায় ভীরের হাত শক্ত করে খামচে ধরে থাকে।ভীর এক মুহূর্তের জন্যও তার হাত ছাড়ে না।
ডাক্তার আসে,ইশায়া তখনও বিছানায় কুঁকড়ে শুয়ে আছে।দু’হাত শক্ত করে পেট চেপে ধরে মাঝে মাঝেই ব্যথায় কেঁপে উঠছে।
ভীর তার পাশেই বসে।
চোয়াল শক্ত।কিন্তু চোখে স্পষ্ট দুশ্চিন্তা।

___ডাক্তার এসে প্রথমে দ্রুত ইশায়ার চেকআপ শুরু করে।ব্লাড প্রেসার, পালস, পেটের অবস্থা সব খুঁটিয়ে দেখেন তিনি।
তারপর গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করেন,
___ কী হয়েছে?
ভীর একদৃষ্টিতে ইশায়ার দিকে তাকিয়ে থেকেই বলে,
___হঠাৎ পেট ব্যথা শুরু হয়েছে।
ডাক্তার আবারও কিছুক্ষণ পরীক্ষা করেন।ইশায়ার পেটে হাত রেখে ধীরে ধীরে চাপ দিয়ে দেখেন কোথায় বেশি ব্যথা করছে।তিন মাসের বেশি হলে প্রেগনেন্সিতে হঠাৎ তীব্র পেট ব্যথা সাধারণত হয়ে থাকে কয়েকটা কারনে।
ডাক্তার শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করেন,
___কিছু উল্টাপাল্টা খেয়েছো?
ইশায়া চোখ তুলে ভীরের মুখের দিকে তাকায়।
তারপর ছোট করে মাথা নাড়ে।
___না।
ডাক্তার আবার বলেন,
___তাহলে হঠাৎ এমন হলো কেন?
ডাক্তারের কথায় ভীর কোন ভনিতা না করে সোজা সাপ্টা গলায় বলে ওঠে,
__ একটু আগে ই*ন্টিমেট হয়েছিলাম। তারপরই ব্যথা শুরু হয়।
ভীর কাট কাট গলায় বলে।

___কথাটা শুণা মাত্রই ইশায়া শক্ত করে চোখ বন্ধ করে ফেলে।মনে মনে ভীরকে ঝাড়তে থাকে সে।নির্লজ্জ বেহায়া লোক একটা।
ডাক্তারও কয়েক সেকেন্ডের জন্য থতমত খেয়ে যায় ভীরের এমন উত্তরে।
কিন্তু ভীরের মুখে কোনো অস্বস্তি নেই।বরং আরো শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করে,
___কি হয়েছে ওর?এমন কেন হলো।
ডাক্তার এবার পরিস্থিতিটা বুঝতে পারেন। তিনি শান্তভাবে বলেন,
__এই সময়ে শরীর খুব সংবেদনশীল থাকে।
তাই বেশি রাফ মুভমেন্ট বা অতিরিক্ত চাপ অনেক সময় ব্যথার কারণ হয়।এই স্টেজে অনেক সময় ইন্টি*মেসির পর ইউটেরাইন ক্র্যাম্প হতে পারে। বিশেষ করে যদি শরীর দুর্বল থাকে বা চাপ বেশি পড়ে।
তারপর তিনি ইশায়াকে কিছু ওষুধ দেন,হালকা সেফ পেইন রিলিফ মেডিসিন, শরীর রিল্যাক্স করার জন্য অ্যা ন্টিস্পাসমোডিক, আর পর্যাপ্ত পানি ও বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দেন।
এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি হলো রেস্ট।স্ট্রেস কম রাখা।
আর শরীরে অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া।
প্রেসক্রিপশন লিখে, ডাক্তার ইশায়াকে কিছুক্ষণ অবজার্ভ করে আবার ভীরের দিকে তাকান।
___এখন উনার প্রেগনেন্সির তিন মাস পার হচ্ছে। এই সময়টা খুব গুরুত্বপূর্ণ।এই সময় থেকে খাবারের দিকে বেশি খেয়াল রাখতে হবে। আর হ্যাঁ ই*ন্টিমেট হতে পারবেন, তবে খুব কেয়ারফুলি। কোনো রাফনেস না। শরীরে চাপ পড়ে এমন কিছু করা যাবে না। উনি অস্বস্তি ফিল করলে সঙ্গে সঙ্গে থামতে হবে।
ডাক্তার আরো বলেন,

—প্রেগনেন্সির এই সময় মায়ের শরীর আর মানসিক অবস্থার প্রভাব বেবির ওপরও পড়ে। তাই উনাকে যতটা সম্ভব কমফোর্টেবল রাখতে হবে।
ভীর ডাক্তারের কথা শুনছে কিন্তু তার চোখ ইশায়ার দিকে।
ডাক্তার সবকিছু নির্দেশনা দেওয়ার পর গলা খাঁকারি দিয়ে আবার বলে,
আর একটা বিষয় মাথায় রাখবেন, যদি আবার এভাবে ব্যথা হয়, তাহলে কিছুদিন মেলামেশা এড়িয়ে চলাই ভালো। অন্তত শরীর পুরোপুরি স্টেবল না হওয়া পর্যন্ত।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯০

___গেট আউট।
ঠান্ডা, কড়া গলায় কথাটা বলে ওঠে ভীর।ঘরের ভেতর মুহূর্তেই নিস্তব্ধতা নেমে আসে।
ডাক্তার কয়েক সেকেন্ড হতভম্ব হয়ে ভীরের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
বিছানায় শুয়ে থাকা ইশায়াও বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকায়।
এই লোকটা কি বলছে!
ডাক্তারের মুখে স্পষ্ট অস্বস্তি ফুটে ওঠে।
তিনি আবার কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু তার আগেই ভীর মাথা তুলে তাকায় তার দিকে।
ভীরের চোয়াল শক্ত হয়ে আছে।চোখে এমন এক কড়া দৃষ্টি, যা দেখে ডাক্তার আর দ্বিতীয়বার কথা বলার সাহস পায় না।
ডাক্তার দ্রুত নিজের ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে যায় রুম থেকে।

সে আমার বন্দিনী পর্ব ৯২