Home সে আমার সন্ধ্যাপ্রদীপ সে আমার সন্ধ্যাপ্রদীপ পর্ব ৫৫

সে আমার সন্ধ্যাপ্রদীপ পর্ব ৫৫

সে আমার সন্ধ্যাপ্রদীপ পর্ব ৫৫
নুসরাত সুলতানা সেঁজুতি

পুষ্পিতা নিভু চোখে চাইল।
মিহি কণ্ঠে বিভ্রম,
“ কীসের এনিভার্সারি?”
শাহেদ মুচকি হেসে বলল,
“ তোমার এখানে আসার। হ্যাপি এনিভার্সারি টু জয়েনিং হিয়্যার।”
মেয়েটা যেন আকাশ থেকে পড়ে। চোখমুখের বিস্ময় ঠিকড়ে আসে কথায়,
“ ক বছর হলো?”
“ পাক্কা দু বছর ম্যাডাম!”
পুষ্পিতার চন্দ্রমুখী আদল-খানায় মেঘ ভিড়ল সহসা। উদাস চোখ সরিয়ে, ফিরে চাইল দূরে। অস্পষ্ট আওড়াল,
“ এর মধ্যে দু বছর হয়ে গেল?”
শাহেদ বলল,

“ ফুলগুলো মা পাঠিয়েছেন। তুমি না কি চারাগাছও চেয়েছ?”
পুষ্পিতার উত্তর এলো না। গভীর ধ্যানে ওইপাড়ের আকাশ দেখছে সে। শাহেদ ভ্রু গোছায়।
গলার জোর বাড়িয়ে ডাকে,
“ পুষ্পিতা,শুনছো?”
মেয়েটা নড়ল একটু।
সতেজ জারবেরা তুলল মুঠোয়। কোমল পুষ্পে আঙুল বুলিয়ে বলল,
“ আন্টিকে ধন্যবাদ!”
“ আমি যে নিয়ে এলাম,আমাকে ধন্যবাদ দিলে না?”
“ আপনাকেও ধন্যবাদ।”
শাহেদ ফোস করে শ্বাস ফেলল। হতাশ গলায় বলল,
“ ধন্যবাদও যে কেউ এমন গোমড়ামুখে দেয়,তোমাকে না দেখলে বুঝতেই পারতাম না। মাঝেমধ্যে তো একটু হাসতেও পারো।”
পুষ্পিতা চুপ করে রইল। ঠোঁটের নড়চড় নেই। হাসাতো দূর, জ্বিভ খসে একটা শব্দও এলো না। তার নজর পিয়ানোর ফল বোর্ডে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

শাহেদের হতাশা প্রগাঢ় হয়। মেয়েটা এত চুপচাপ, নিষ্পৃহ। এরকম শান্ত তরুণী তার দেখা প্রথম কেউ।
আজ কয়েকশ দিন ধরে যে ওর চোখের সামনে থাকে,অথচ এক মুহুর্তের জন্যে একটখানি হাসতে দেখেনি।
শাহেদের আক্ষেপ হয় মাঝেমধ্যে। যে দেখতে এত সুন্দর, যার কথার স্বর এত রিনরিনে,চোখ-ঠোঁট সবেতে এক আমূল সৌন্দর্য! সে মেয়ে হাসলে কেমন লাগবে,দেখার ইচ্ছে জাগে ভীষণ।
পুষ্পিতার নির্লিপ্ততা কাটাতে চাইল সে। স্ফুর্ত চিত্তে বলল,
“ তুমি কিন্তু অল্প কদিনেই দারুণ শিখে ফেললে। কিন্তু সব সময় এই একই টোন বাজাও কেন? গানটা কি খুব বেশি পছন্দ?
অবশ্য অরিজিতের গান,পছন্দ নাহয়েও উপায় নেই।”

পুষ্পিতা এবারেও নিরুত্তর। এই গান যে ওর কাছে কী,কাকে বোঝাবে,কীভাবে বোঝাবে? দুচোখে পশলা মাখা বিষাদ সে ঢাকতে চাইল পরের কথায়।
প্রসঙ্গ পাল্টে শুধাল,
“ বাচ্চারা কোথায়?”
“ বাইরে,মায়ের কাছে। সেজন্যেই তোমাকে ডাকতে এলাম। যাবে?”
ও মাথা নাড়ল।
ছোটো করে বলল,
“ চলুন।”

রাত আটটা বাজতে চলল। অথচ এখনো ঘুম ভাঙেনি তীব্রর। গোটা দিনের সাথে পাল্লা দিয়ে সে দিব্যি বিছানায় লেপ্টে আছে। একবারও চোখ মেলেনি,খায়নি।
ছেলের অবস্থায় দুশ্চিন্তায় ছটফট করছেন লুৎফা । সকাল,দুপুর প্রত্যেক বেলা খাবার সামনে নিয়ে কাটালেন,তীব্র উঠলই না। ভদ্রমহিলা খাবার সমেত একবার ঘরে যেতে চেয়েছিলেন ওর,কিন্তু সাহস হয়নি।
পাছে যদি বিরক্ত হয়! রেগে যায়! ক্ষেপে গেলে ছেলেটাতো নিজের মাঝে থাকে না আজকাল। কেমন অদ্ভুত আচরন করে। ঊনিশ-বিশ হলে ভেঙেচুরে মাথায় তোলে বাড়ি। তাই জামশেদও নিষেধ করেন,খুব একটা ওর কাছে না ভিড়তে। কিন্তু মা তো! মায়ের মন কি আর অত নিষেধাজ্ঞা মানতে চায়?
ভদ্রমহিলার ক্লান্ত চোখ চকচকিয়ে উঠল তীব্রকে নিচে নামতে দেখে।
অমনি ছুটে গেলেন তিনি। হড়বড় করে শুধালেন,

“ উঠেছিস বাবা! খিদে পায়নি? খাবার দেবো?”
তীব্র কিছু বলল না। অগোছালো চিত্তে এক ধাপ নামল সিঁড়ির।
লুৎফা ফের বললেন,
“ কী খাবি বাবা? ভাত দেই?”
ঘাড় নাড়ল সে। নেশার তোড় এখনো ভালো করে কাটেনি। টকটকে লাল চোখে ঝাপসা দেখছে অনেকটা। মাথার দু পাশ ফেঁপে উঠেছে ব্যথায়।
এক কাপ উষ্ণ ক্যাফেইন এই মুহুর্তে ভীষণ জরুরি। অথচ তীব্র টা-টু শব্দ করল না। ঠোঁট নেড় কফি বলতেও যেন হাজার টন অনীহা।
ও টলতে টলতে সোফায় এসে বসল।
লুৎফা খাবার বাড়তে যাচ্ছিলেন,আচমকা দেয়ালে আঁটা টেলিফোনটা তারস্বরে বাজে। কোমলমতি রমণী বিরক্ত হলেন একটু!
এই সময় আবার কে!
ঝটপট গিয়ে রিসিভার কানে গুঁজলেন তিনি। গেটের সিকিউরিটি গার্ড ফোন করেছেন। কণ্ঠে নম্রতা,

“ ম্যাডাম ছোটো স্যারের বন্ধু এসেছেন,নাহিদ। দেখা করতে চাইছেন,পাঠাব?”
লুৎফা কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়লেন। তীব্র তো কারো সাথেই যোগাযোগ রাখতে চায় না।
প্রখর দোটানা নিয়ে ছেলের দিকে চাইলেন তিনি।
“ বিট্টু, নাহিদ এসেছে। দেখা করবি?”
তীব্রর শ্রান্ত চোখে চাইল।
একটু চুপ থেকে বলল,
“ ডাকো।”
লুৎফা অনুমতি দিয়ে ফোন রাখলেন। কিছু সময় পরেই বাড়ি ঢুকল নাহিদ। দু বছরে তার আমূল বদল ঘটেছে। ক্লিন শেভ করা চকচকে গাল গুলো খোচা খোচা দাঁড়িতে ঢাকা। বেশভূষায় পাকাপোক্ত সাহেবিয়ানা! সরল মুখখানায় আজকাল অল্পস্বল্প গম্ভীরতা থাকে। বিলুপ্ত
সেই বোকা বোকা ভাব। নাহিদ চৌকাঠে এসে থমকায়।
সোফায় বসা তীব্র ঠিক তার মুখোমুখি। কতদিন পর দেখা!
আবেগের ঘনঘটায় ছেলেটা আপ্লুত হয়ে পড়ল৷ পুরোনো সুরম্য অতীত ভেবে চোখের কোনে চিকচিক করল জল।
ইস,কী অবস্থা

বিট্টুর! হ্যাঁ, আগেও উসকোখুসকো ছিল। কিন্তু তাই বলে
এতটা অগোছালো? এতটা বিধ্বস্ত?
বিট্টু, কত রাত ঘুমাস না তুই?
নাহিদের বুকের ভেতরটা ঝুপ করে ডুব দিলো বিষাদে।
আচ্ছা, ওদের সেই বিট্টুটা কোথায়? যে কথায় কথায় নাহিদকে ধমকাত।
ভাইয়ের মত গলা জড়িয়ে এক বিছানায় ঘুমাতো দুজন।
যার চোটপাটে নাহিদ রাতে ঠিকঠাক ঘুমাতে অবধি পারেনি।
আর ঐ যে তীব্রর পড়তে বসার দৃশ্যগুলি? ঘুমে টলতে থাকা নাহিদকে জোর করে সামনে বসিয়ে রাখা।
আনাড়ি হাতে রান্না করার সময়টা,

প্রতি সপ্তাহের একটা রাত বন্ধুমহল হইহই করে কাটানো,কোথায় গেল ওসব?
নাহিদ হাত ভাঁজ করে এনে,সিক্ত চোখ মুছল। কনুইয়ে গোটানো শার্টের হাতা ভিজল কিছুটা। কিন্তু তীব্র যেমন পাথর বেশে ছিল,অমনই বসে থাকে। রাগ,ক্ষোভ,কিংবা ভালো লাগা? মুখায়বে কোনো কিছুরই কোনো চিহ্ন নেই।
লুৎফা হেসে বললেন,
“ নাহিদ,কেমন আছো?”
“ ভা..ভালো। আপনি কেমন আছেন?”
“ ভালোই। বোসো! কথা বলো,আমি আসছি।”
লুৎফা রান্নাঘরের পথ ধরলেন। গতিতে ভীষণ ব্যস্ততা।
তীব্র সারাদিন দাঁতে দাঁনা কাটেনি। একটু খেতে চাইল, দেরি করা যাবে না। যদি ফের মত ঘুরে যায়!
তীব্রর পা দুটো সেন্টার টেবিলের ওপর তোলা। নাহিদ কাছে এলে নামাল সেটা। সামনের সোফা দেখিয়ে বলল,

“ বোস।”
ছেলেটা ছলছলে চোখে চেয়ে রয়।
প্রচণ্ড ইচ্ছে জাগে, একবার গিয়ে জড়িয়ে ধরতে ওকে।
গেল না।
বসল চুপচাপ। ও বলল,
“ হঠাৎ এলি,কী ব্যাপার?”
নাহিদ পালটা প্রশ্ন করল,
“ তুই কি খাওয়া দাওয়া ঠিক করে করিস না,বিট্টু? অনেক শুকিয়ে গেছি…”
তীব্র বাধ সাধল কথাতে। বিরক্তি নিয়ে বলল,
“ এসব ফ্যাচফ্যাচ শুনতে চাই না। যেটা বলতে এসেছিস,সেটা বলে বিদেয় হ।”
মুখের ওপর কর্কশ জবাবে নাহিদের মন খারাপ হলো না। সে তো জানে,তার বন্ধু এখন কী অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।

কথা বলতে সময় নিলো সে। ভেতরটায় আবেগ সামলে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা। সে তো আর তীব্রর মতো পাথুরে মানব নয়। তার কষ্ট হয়। দুঃখ হয়। নাহিদ চাইলেও এসব অনুভূতি কঠোরতার আড়ালে লুকিয়ে ফেলতে পারে না।
জ্বিভে ঠোঁট চুবিয়ে হাতের কার্ডটা বাড়িয়ে দিলো সে। বলল,
“ এই সপ্তাহে আমার আর নূহার কাবিনের তারিখ ঠিক হয়েছে। তুই যদি আসতি! না মানে, নূহাও খুব করে চাইছিল। ও তোকে ফোন করেছিল অনেক বার। ধরিসনি। আমার সাথেও আসতে চেয়েছিল,আমিই মানা করলাম। তাই বলছিলাম যে,যদি থাকিস বিয়েতে। আমি নিজে এসে তোকে নিয়ে যাব না হয়!”
তীব্র সাথে সাথেই বলল,
“ যাব না।”

নাহিদের উদ্বেগ চুপসে যায়। যদিও জানতো, এমনটাই হবে। বিট্টু যে এখন গাজীপুরের নাম শুনতেও পারে না।
অথচ ওর জন্যে এত দিন নাহিদ বিয়ে করেনি। নূহাও রাজি ছিল না। তাদের জীবনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিন,পুষ্পিতা তো আগে থেকেই নেই। তীব্রও যদি না থাকে!
কিন্তু বিপত্তিটা বেঁধেছে আয়েশার স্ট্রোক হতেই। ভদ্রমহিলা এক মাস আগে আচমকা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। ডাক্তার-হাসপাতাল ছোটাছুটি করিয়ে সুস্থ হলেন শেষে। তারপরপরই, নূহার গ্রাজুয়েশন পার করিয়ে বিয়ে দেয়ার যে চিন্তা ছিল? সেথায় এখন আমূল বদল এসেছে । যদি হুট করে ওনার কিছু হয়ে যায়, তখন
মেয়েটার কী হবে? চোখ বোজার আগে যদি নাহিদের হাতে তুলে দেয়া যায়! সেজন্যেই রাতারাতি দুই পরিবার বৈঠক বসিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কাবিনের। কিন্তু বিট্টু যদি সত্যিই না যায়!
নাহিদ চোটপাট করতে পারল না। খুব রাগ দেখিয়ে অধিকারও ফলাল না,কেবল তীব্রর অসুস্থতা ভেবে। শুধু টলমল চোখে বসে রইল অমন।
তীব্র চ সূচক শব্দ তুলল জ্বিভে।

“ এখানে কাঁদার মত কিছু হয়েছে? এমন ভাব করছিস,যেন আমি না গেলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে!”
“ সেটাই তো। তুই কে,যে তুই না যাওয়ায় আমি কাঁদব? তুই আমার পর। আমিও তোর পর। এমনই তো ভাবিস তুই। কিন্তু আমি তো তেমনটা ভাবতে পারি না৷ সেজন্যে সবার প্রথম কার্ডটা নিয়েই ছুটে এসেছি তোর কাছে। কিন্তু তুই তো পণ করেছিস গাজীপুরে পাও ফেলবি না। দোষ করল পুষ্পি…”
তীব্র গর্জে উঠল মাঝপথে,
“ ওর নাম নিবি না।”
হুঙ্কার শুনে থেমে যায় নাহিদ। কিছু সময় থম ধরে থাকে।
তারপর আচমকা গিয়েই ওর সামনে বসে পড়ল। তীব্র ভড়কে যায়। নড়চড়ের আগেই,
নাহিদ ভেজা চোখে অনুনয় করল,
“ প্লিজজ বিট্টু,তুই প্লিজ আয়। আমার জীবনের এত বড়ো একটা দিন তোকে ছাড়া আমি কল্পনাও করতে পারব না। প্লিজ! আমি হাত জোড় করছি,দরকার হলে তোর পা ধরছি..”
নাহিদ হাত বাড়তে গেলেই তীব্র ছিটকে পা সরাল। রেগে বলল,
“ কী হচ্ছেটা কী? পাগল হয়েছিস?”

“ হ্যাঁ হয়েছি। তুই নিজে ভালো নেই,আমাদেরও ভালো থাকতে দিচ্ছিস না। আমি শেষ বারের মতো বলে দিচ্ছি,বিয়েতে তোকে থাকতেই হবে। তুই যদি না যাস,খোদার কসম আমি মাঝপথেই বিয়ে ছেড়ে কোথাও একটা চলে যাব। জেদ তোর একার নেই,আমারও আছে।”
তীব্র চুপ। একভাবে নাহিদের চটচটে মুখখানা দেখল কিছু পল। ফোস করে শ্বাস ফেলে বলল,
“ ঠিক আছে, যাব।”
উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ল ছেলেটা।
“ সত্যি? তুই যাবি?”
“ এক কথা বারবার বলতে ভালো লাগে না।”
না লাগুক,তীব্র যাচ্ছে তো। নাহিদ প্রশান্ত শ্বাস টানল। মুখায়বে ঝলমলে তারা। একটা কাজ অন্তত হয়েছে। এখন বাকিটা…

তক্ষুনি লুৎফা এলেন। ফুলিও ছুটে ছুটে খাবার রেখে যাচ্ছে। কত আয়োজন! চারকোনা টেবিলটা মুহুর্তে ভরে গেল তাতে।
লুৎফা এসে বললেন,
“ বিট্টু,আয় বাবা নাহিদকে নিয়ে খেতে আয়।”
ও বলল,
“ পরে খাব।”
“ কেন? সারাদিন তো কিছু খেলি না। এখন আবার!”
“ সারাদিন যখন না খেয়ে মরিনি,তাহলে দুঘন্টা পর খেলেও মরব না। ঢেকে রাখো।”
লুৎফার মুখটা কালো হয়ে যায়। নাহিদ খেয়াল করল সেটা। আগ বাড়িয়ে বলল,
“ আন্টি,আমি তো আপনাদের নিজেদেরই লোক। আমাকে বেড়ে খাওয়াতে হবে না। আর বিট্টুকেও না হয় আজকে আমিই সার্ভ করব? আপনি বরং যান,ঘরে গিয়ে বিশ্রাম নিন।”

লুৎফার মন খচখচ করছে। কিছুটা আহতও হলেন। ভেবেছিলেন,আজ ছেলেটাকে নিজের হাতে বেড়ে খাওয়াবেন। কতগুলো দিন তীব্র তার সামনে বসে ভাত খায়নি। আজ তো নেশার চক্করে দূর্বল হয়ে বাসায় ঘুমোচ্ছিল,অন্য দিন তো এ সময় বাড়ির আশেপাশেও তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না ।
মনের ক্লেশ,তিনি মনেই চাপা দিলেন। জামশেদ ঘরে একা আছেন। শরীর ভালো নেই বলে, ফিরেছেন তাড়াতাড়ি। ভদ্রমহিলা মাথা নেড়ে চলে গেলেন সে পথে।
নাহিদ কিছুক্ষণ প্রস্থান দেখল রমণীর।
এসির মাঝেও ঘামছে সে। চেহারায় উশখুশের ছাপ। ধড়ফড় করছে বুকখানা।
তীব্রর দূরদর্শীতায় সবটা ধরা পড়ল। কণ্ঠ সন্দিহান,

“ তুই কি আরো কিছু বলবি?”
চটক কাটার ন্যায় মুখ তুলল সে। এলোমেলো চিত্তে কথা খুঁজল কিছুক্ষণ।
কিছু তো বলার জন্যে ছটফট করছে ভেতরটা। কিন্তু শোনার পর বিট্টুর প্রতিক্রিয়া কী হবে,সেটাতেই ভয়।
মুখ খুলল রয়েসয়ে,
“ ইয়ে,বিট্টু আমার সাথে না ওরাও এসেছে।”
তীব্রর নীরস চাউনী দপ করে জ্বলে। হেলে থাকা পিঠ সটান করে সহসা।
সচেতন কণ্ঠে বলল,
“ কারা, শাফিনরা?”
ঢোক গিলে মাথা নাড়ল নাহিদ। তীব্র তড়াক করে উঠে দাঁড়াল। চ্যাঁচিয়ে বলল,
“ তুই ওদের সাথে এনেছিস? কেন, আমি বারণ করিনি? বল,করিনি বারণ?”
নাহিদ ঘাবড়ে গেল। কণ্ঠে উদ্বেগ,

“ বিশ্বাস কর,আমার কিছু করার ছিল না। ওরা খুব অনুরোধ করছিল তোর সাথে দেখা করবে বলে।”
“ না। আমি ওদের সাথে দেখা করব না। ওরা যেন এখানে না আসে। এক্ষুনি যেতে বল ওদের। এক্ষুনি!’’
তীব্রর কণ্ঠ শক্ত। ক্রমে আওয়াজ বাড়ছে। নাহিদ বলল,
“ একটু শান্ত হ,প্লিজ। ওরা দরজার বাইরেই দাঁড়িয়ে আছে।”
তীব্র কিছু বলবে,পূর্বেই কতগুলো পায়ের শব্দ এলো এখানে। মুশফিক,মিরাজ আর শাফিন এসেছে। আরমান দুদিন হলো অফিসের কাজে বাইরে গিয়েছে ঢাকার। চেনা তিনজনকে দেখেই, মুখের পেশি বদলে গেল তার।
তর্জন দিলো চড়া গলায়,
“ দাঁড়া।”
ওরা থমকায়। চলতি কদম সমেত দাঁড়িয়ে যায় স্থানে।
তীব্রর চোখমুখে জ্বলজ্বল করছে ক্রোধ। বলল ভীষণ কঠোর স্বরে
“ যে পথে এসেছিস,সেপথ ধরেই বেরিয়ে যা। কেউ আসবি না এখানে,কেউ না।”
তিনজন মুখ চাওয়াচাওয়ি করে। চোখে ওদের অন্যরকম ভাষা। সবার আগে মুখ খুলল মিরাজ,
“ কেন? কী করেছি আমরা? আমাদের ওপর তোর কীসের এত রাগ?”
তীব্র মুখ ঘুরিয়ে নেয়।
তার নিশ্চুপতায় একটু সাহস মিলল ওদের। মুশফিক দুপা এগিয়ে আসে। কণ্ঠে মোলায়েম,

“ তুই এরকম করছিস কেন, বিট্টু? আমাদের অন্যায়টা কী? নাহিদ তোর কাছে আসতে পারে,শুধু আমরা পারি না। কেন? বল না,আমরা কিছু করলে বলে দে। দরকার পড়লে মার। তাও এরকম দূরে সরিয়ে রাখিস না।
তোকে ছাড়া আমরা কেউ ভালো নেই।”
তীব্রর চোখ তখনো অন্যদিকে। পাষণ্ডের ন্যায় বলল,
“ আমার কোনো বন্ধুর দরকার নেই।”
শাফিন মুখ শক্ত করল। লম্বা পায়ে এসে দাঁড়াল তার সামনে।
“ এত সহজে কথাটা বলতে পারলি, বিট্টু? শব্দগুলো উচ্চারণ করতে তোর
একটু কষ্টও হোলো না?

অথচ তোর সাথে দেখা হয় না দেখে,সামনাসামনি দুটো কথা বলতে পারি না দেখে আমরা এক দণ্ডও শান্তিতে শ্বাস নিতে পারছিলাম না। সামনে
নাহিদের বিয়ে, আমাদের বন্ধুমহলে প্রথম বিয়ে কারোর।
আমাদের সবার তো একসাথে আনন্দে হইহই করার কথা।
বিট্টু চল না,আমরা সেই আগের মতো করে মিলেমিশে থাকি? দ্যাখ, তোর নিষেধ সত্ত্বেও আমরা সব ভুলে ছুটে এসেছি আজ। আর তুই আমাদের এভাবে তাড়িয়ে দিচ্ছিস?”
তীব্রর মন গলল না। অটল তার কণ্ঠস্বর,
“ আমি তোদের সাথে কোনো কথা বলতে চাই না। যেতে বলেছি, যা।”
শাফিন খেই হারাল সহ্যের। জেদ দেখিয়ে বলল,
“ না যাব না।

তুই আগে উত্তর দে,আমাদের অপরাধ কী? তোকে বেশি ভালোবাসি,সব সময় সব ব্যাপারে প্রায়োরিটি লিস্টের ওপরে রাখি এটা আমাদের দোষ? কোথাকার কোন পুষ্পিতার জন্যে তুই এভাবে আমাদের দূরে ঠেলে দিতে পারিস না, বিট্টু। তোর কি একটু খারাপও লাগে না? একটু মনেও পড়ে না আমাদের? একটা মেয়ের জন্যে সব ভুলে গেছিস! এই আমরা তোর বন্ধু ছিলাম? এত ঠুনকো তোর বন্ধুত্ব?”
গড়গড়ে কথায় দাঁড়ি টানল শাফিন। নাহিদ চোখ খিচে জ্বিভ কাটল। শাফিনটা উত্তেজনায় আবার পুষ্পিতার প্রসঙ্গ তুলে ফেলেছে। একটু আগে ঐ মেয়েকে নিয়ে বলায় বিট্টু যেভাবে চটে গিয়েছিল,এখন কী করবে কে জানে!
শাফিনের শেষ কথায় ঝট করে ফিরল তীব্র। দুই ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
“ এসব তুই বলছিস শাফিন? তুই বলছিস বন্ধুত্বের কথা! তুই নিজে আদৌ বুঝিস, বন্ধুত্ব কী?”
ছেলেটা বিভ্রান্ত হয়! এক পল বাকিদের সাথে মুখ দেখাদেখি করে। বুঝতে না পেরে
বলে,

“ মানে?”
তীব্র দাঁড়িয়েছিল এতক্ষণ। আবার বসে পড়ল জায়গায়। সোফার ফোমে মাথা রেখে চোখ বুজল ক্লান্ত মুখে।
নিরুৎসাহিত বলল,
“ তোকে কোনো কৈফিয়ত দেবো না আমি। চলে যেতে বলেছি, চলে যা। এসব নোংরা কাসুন্দি ঘাঁটতে ইচ্ছে করছে না।”
শাফিনের কপালে ভাঁজ পড়ল। তলিয়ে গেল রহস্যে। কী বলতে চাইছে বিট্টু?
মুশফিকের খটকা লাগে।
সতর্ক চিত্তে শুধায়,
“ তুই এরকম কথা কেন বললি,বিট্টু? শাফিন কি কিছু করেছে?”
তীব্র চোখ বন্ধ রেখেই জানাল,
“ সেটা ওকে জিজ্ঞেস কর।”

সব কটা চোখ একইসাথে মুখের ওপর পড়তেই,শাফিনের সব প্যাঁচ বেঁধে যায়। হতভম্ব হয়ে বলে,
“ কী আশ্চর্য, তোরা আমাকে এভাবে দেখছিস কেন? আমি কী করেছি? বিট্টু এসব কী ফাজলামো হ্যাঁ? এমন ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে না বলে,যা বলার সোজাসুজি বলতে পারিস না?
আমি কিছু করলাম,আর আমিই জানি না? কিছু ঘটলেই আঙুল সব সময় আমার ওপর ওঠে কেন?”
শেষ দিকে তার গলার জোড় বাড়ল। কিন্তু হেসে উঠল তীব্র। শ্লেষের হাসি। চাইল ভীষণ শান্ত চোখে।
“ তুই কি সত্যিই কিছু করিসনি?”
শাফিন অনড় চিত্তে জবাব দেয়,

“ কী করব? তোর সাথে দেখা করতে এসেছি বলে আমার ওপর যাতা অভিযোগ তুলবি তা তো হতে পারে না।”
তীব্রর বিলাতি চোখ টিমটিমে। একপেশে হেসে বলল,
“ তুই আসলেই জাত অভিনেতা শাফিন। সত্যিই, আমি মুগ্ধ না হয়ে পারছি না।
আচ্ছা,একটা কথা বল তাহলে।
আমি সেদিন ট্রাকটাকে যাওয়ার জন্যে যথেষ্ট জায়গা দিয়েছিলাম। অথচ ওটা তাও ছুটে এসে আমার জিপে ধাক্কা মারল। কেন শাফিন,
তুই জানিস?”

শাফিনের বক্ষঃস্থল ছ্যাৎ করে উঠল। রুদ্ধ মস্তিষ্কে শুষ্ক হাওয়া ঢুকল এক ফালি।
যাতে আটকে পড়ল শ্বাসের তোড়। তীব্রর চোখের চাউনী শান্ত। কিন্তু শাফিনের মনে হলো,এই দৃষ্টির তোপেই হাত-পা জমে বসেছে তার।
সাদাটে চোখে এমন কিছু মেশানো,যা হয়ত কারো অতলে রাখা সবকিছু প্রযত্নে পড়তে পারে। হাওয়ার মতো ছুটে এসেই তীব্রর পা দুটো চেপে ধরল শাফিন।
হাউমাউ করে বলল,
“ বিট্টু,আমার ভুল হয়ে গেছে। আমাকে ক্ষমা করে দে!”
নাহিদ,মুশফিক মিরাজ,
বিস্ময়ে নিস্পন্দ হয়ে পড়ে। বাঁজ পড়ল তাদের সকলের মাথায়। মুশফিক হতবাক হয়ে বলল,
“ এর মানে? তোর এক্সিডেন্টের সাথে শাফিন যুক্ত?”
তীব্র নড়চড়হীন,উদ্বেগশূন্য। নিষ্প্রাণ চাউনী সফেদ সিলিং-য়ে আটকে। খুব আস্তে বলল,
“ পা ছাড়,শাফিন।”

সে শুনল না। বরং আরো দৃঢ় করল বাঁধন। কেঁদেকেটে বলল,
“ না, আমি ছাড়ব না। তুই আমাকে মাফ করে দে বিট্টু! আমি তখন নিজের মাঝে ছিলাম না। কী করতে কী করেছি,আমার সত্যি অনেক বড়ো ভুল হয়ে গেছে!”
মুশফিক রাগে কিড়মিড় করে উঠল। তেড়ে গিয়েই খপ করে তুলল ওকে। প্রকট চোখে চাইল শাফিন। মুশফিক শার্টের কলার খামচে ধরে।
চোখেমুখে ঘৃনার পাহাড় নিয়ে বলল,

“ তুই এত বড়ো অমানুষ শাফিন? এত বড়ো অমানুষ তুই!
তার মানে ওই ট্রাক ভাড়া করে তুই বিট্টুর এক্সিডেন্ট করিয়েছিস?”
শাফিন সাফাই দিতে চাইল। পূর্বেই, তার বাহু খাবলে নিজের দিকে ফেরাল মিরাজ।
উষ্মায় থরথর করে বলল,
“ তুই তাহলে এতদিন নাটক করছিলি আমাদের সাথে?
তুই সেই মেইন কালপ্রিট যার জন্যে আজ বিট্টুর এই অবস্থা?
কী করে পারলি,বল কী করে পারলি?”
মিরাজ ক্ষুব্ধ হাতে কলার ধরে ঝাঁকায়। নাহিদ বিমুঢ় চিত্তে আওড়ায়,
“ এত বড়ো বিশ্বাসঘাতকতা, তুই করতে পারলি শাফিন?”
একেক বন্ধুর একেক অভিযোগে, শাফিন ধৈর্য খোয়ায় ফের। নরম মুখের গড়নে বদল ঘটে সহসা। ঝাড়া মেরে কলার থেকে মিরাজের হাত সরাল সে। ক্ষোভে একাকার হয়ে বলল,

“ হ্যাঁ পারলাম। পারলাম আমি। তোরা আমার জায়গায় থাকলে তোরাও পারতি। এখন এত লেকচার দিচ্ছিস তো, খারাপ ভাবছিস আমাকে? কিন্তু একটা কথা সত্যি করে বলতো,
আমি যে ওকে বন্ধু ভেবেছি,ও কী করেছে আমার জন্যে?
পুষ্পিতা মেয়েটাকে তো আমি আগে পছন্দ করেছিলাম। বিট্টু সেটা বুঝেওছিল। কিন্তু তাও,তোদের সবার সামনে আমাকে সাবধান করে দিলো, আমি যেন পুষ্পিতার দিকে আর না তাকাই। কেন? মেয়েটার ওপর ওর নজর পড়েছিল বলে,মেয়েটা ওর হয়ে গেছে? আর আমার, আমার ইমোশোনের কোনো দাম নেই? সেদিন আমি যদি পুষ্পিতাকে ভুল করে তুলে না নিয়ে যেতাম,বিট্টুর সাথে ওর কোনোদিন দেখা হোতো?

আমি তো ওকে সেদিনই বলেছিলাম,যে আমার পুষ্পিতাকে ভালো লেগেছে। বিয়ের কথাও বলেছি। কিন্তু ও কী করল? ওর
পাওয়ার আছে,তাই ও যা বলবে তাই ঠিক? আর আমি, আমি কেউ না? কিচ্ছু না?
তাও আমি মেনে নিয়েছিলাম।
ভেবেছিলাম মায়ের চিকিৎসায় টাকা দিয়ে সাহায্য করেছে, তাই এসব মনে রাখব না। কিন্তু ওর আমার চুপ থাকা সহ্য হলো না। আমাকে দেখিয়ে দেখিয়ে পুষ্পিতার সাথে মেলামেশা, হাসাহাসি,রোমান্স! আমার চোখের সামনে মেয়েটাকে জড়িয়ে ধরে নাঁচ করছে। আমাকে পাঠাচ্ছে আংটি কিনে আনতে।
এসব করতে গিয়ে আমার যে কষ্ট হতো কেন বুঝল না বিট্টু?
ও মন্ত্রীর ছেলে। চাইলেই দেশের সেরা মেয়েকে বউ হিসেবে পাবে। তাহলে পুষ্পিতাকে তো পারতো আমার হাতে তুলে দিতে। কিন্তু তা করল না। নিজে উঠেপড়ে লাগল মেয়েটার পেছনে। যে নিজের খায়েস মেটাতে,বন্ধুকে কষ্ট দেয় সে কেমন বন্ধু,বল? বল সে কেমন বন্ধু?”

সবাই স্তব্ধ, বিস্মিত। হাঁ করে চেয়ে রইল শুধু। মিরাজ স্তম্ভিত আওড়াল,
“ শাফিন,তুই জানিস তুই কী বলছিস?”
“ হ্যাঁ জানি। জানি বলেই তো বলছি। আমি আর এসব নিতে পারছিলাম না। রোজ রোজ মেয়েটাকে সাথে নিয়ে ঘুরতে যাওয়া,ছবি তুলে পোস্ট করা ইনস্টায়। ওদের ওসব রঙতামাশা দেখে আমার গায়ে যাস্ট আগুন ধরে যেতো। পুষ্পিতাকে আমি বিট্টুর সাথে সহ্য করতে পারতাম না। তারপর
ভাবলাম, যে আমার কথা ভাবেনি আমিও তার কথা ভাবব না। পুষ্পিতাকে ওর এত পছন্দ? এত ভালোবাসা? ঠিক আছে,দুজন ওপরে গিয়ে প্রেম করুক। সেজন্য ওইদিন ট্রাক ভাড়া করে….”
বাকিটুক আর বলা হলো না। একটা দড় ঘুষির তোড়ে শাফিন ছিটকে পড়ল দূরে। প্রত্যেকে হকচকায়। বিকট চোখে ফিরে চায় শাফিন। নাহিদ ফোসফোস করে বলল,

“ জানোয়ার! আজ তোকে আমি মেরেই ফেলব।”
ও এগোতে নিলেই তীব্র শাফিনকে আড়াল করে দাঁড়াল। নাহিদ ফাঁক খুঁজল ওকে ধরতে।
চোখে-মুখে আগুন নিয়ে বলল,
“ তোর মতো মানুষ আমার বন্ধু? ছি! বিট্টু সরে যা। ও তোকে খুন করতে চেয়েছিল না? আজকে আমি ওকে খুন করব!”
তীব্র বলল,
“ নাহিদ,বিহেভ ইয়র শেল্ফ!’’
মুশফিক বলল,

“ তুই একদম এর মাঝে আসিস না, বিট্টু। শাফিন বেইমানি করেছে,ওকে আমাদের কাছে ছেড়ে দে।”
নাহিদ শান্ত হতে পারছে না। সরল ছেলেটার আকষ্মিক ভয়ানক রূপে শাফিন নিজেই ভড়কে গেল। যে নাহিদ কোনোদিন একটা পিপড়েও মারেনি,সে আজ ওর গায়ে হাত তুলল?
শাফিনের চিবুকের ধার টেবিলের কোনায় বিঁধেছিল। একটু কেটে রক্ত বেরিয়ে এসেছে। সেই রক্ত হাতে ছুঁয়ে ছেলেটা তাজ্জব চেয়ে থাকে।
তীব্র বন্ধুদের কথায় কান দিলো না। নিশ্চুপ গিয়ে ওকে মেঝে থেকে তুলল। ঠোঁট কেটে বেরিয়ে আসা রক্ততে টিস্যু চাপাতেই,আশ্চর্য বনে গেল শাফিন। তীব্র রক্ত মুছে দেয়। কাষ্ঠ হেসে বলে,
“ আমি অনেক আগেই বুঝেছিলাম,এই কাজটা তোর। কবে বুঝেছিলাম জানিস? সেদিন গাজীপুর থেকে ফেরার পথে তুই যখন জিজ্ঞেস করলি,

“ এক্সিডেন্টের কেসে আমার কাউকে সন্দেহ হয় কী না!
আমি ড্রাইভারের মুখ দেখেছি কী না! ট্রাকের নেমপ্লেট দেখেছি কী না? সেদিন। সেদিন তোর চোখেমুখের চিন্তা,
আমার উত্তর শুনে তোর স্বস্তি পাওয়া, পুরোটা আমি স্পষ্ট দেখেছিলাম।”
শাফিন বিহ্বল নেত্রে ঢোক গিলল। ও ফের বলল,
“ মুখে কিছু বলিনি। কিন্তু বিশ্বাস ভাঙার তাণ্ডবে আমার বুকটা আরেকবার চুরমার হয়ে গেছিল শাফিন।
সেদিন থেকেই ভাবলাম, জীবনে আর কোনো বন্ধু রাখব না। নাহিদ বড্ড সোজা ছেলে! তাই ওকে ফেরাতে পারিনি। কিন্তু তোর থেকে দূরে থাকার অজুহাতে,আমি মিরাজদের সাথেও মিশতে চাইনি। আবার আমাকে মারতে চাওয়ার জন্যে তোকে কিছু বলতেও চাইনি।”
তুই ভয় পাস না,তোকে আমি আজকেও কিছু বলব না।”
মিরাজরা বিহ্বল হয়ে একে অন্যকে দেখল। নাহিদ হতবুদ্ধি বনে বলল,

“ কী বলছিস কী বিট্টু? সব কিছুর মূলে ও জেনেও তুই ওকে ছেড়ে দিবি?”
“ হ্যাঁ। দেবো,কারণ একদিক থেকে এসব হয়ে ভালোই হয়েছে। ও এমন না করলে তো,আমি
আরেক প্রতারককে চিন্তামই না। জানতেই পারতাম না,একটা পবিত্র মুখের আড়ালে মেয়েরা কত ছলনা পুষে রাখে।”
শাফিনের জবজবে মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ভয়ে নয়,
ব্যথায়,যন্ত্রনায়। বিট্টু সব জেনেশুনেও এতদিন ওকে কিচ্ছু বলেনি। আজকে ও রাগের বশে কত কি উগড়ে দিয়েছে। বিট্টু তাও এত শান্ত?
অথচ ও কতোটা প্রতিশোধ পরায়ণ ছিল শাফিনের থেকে ভালো কে জানে! কেউ চোখ তুলে চাইলেও, গায়ে হাত তুলত। সে আজ! একটা শোকের তোপে ছেলেটা এমন পাথর হয়ে গেল? পুষ্পিতার প্রতি এত ভালোবাসা বিট্টুর? যার দূরে যাওয়ায় ছেলেটা আজ নিজের মাঝে নেই!
মিরাজ বলল,

“ বিট্টু,তুই প্লিজ এই ব্যাপারটা অন্তত এভাবে ছেড়ে দিস না। ও যা করেছে তাতে ওকে ইমিডিয়েট পুলিশে দেয়া উচিত। আমি এক্ষুনি আঙ্কেলকে ডেকে আনছি!”
ও পা ফেলতে গেলে তীব্র বাধা দিলো। বলল,
“ না। আমি যা বললাম তাই হবে।”
তারপর শাফিনের এলোমেলো জামাটা সে ঠিকঠাক করে দেয় ।
“ তুই এখন যা শাফিন। আর কখনো আমার সামনে আসিস না।
তোর জন্যে আমি একটা নতুন দুনিয়া চিনেছি। তাই চাইব,
তোর আর পুষ্পিতার মতো সব প্রতারক যেন পরেরবার ফুল হয়ে জন্মায়। তাহলে অন্তত তোরা বুঝবি কোনো কিছু ছিঁড়ে নেওয়ার ব্যথা কাকে বলে!’’

“ বিট্টু..”
“ কিছু শুনব না আমি। যা।”
তীব্র ধাক্কা মারল ওকে। পড়ে যেতে নিয়েও, নিজেকে সামলায় শাফিন। তারপর অসহায় চোখে মিরাজের দিকে চাইল। সহসা মুখ ফিরিয়ে নিলো সে।
এরপর মুশফিককে দেখল শাফিন। সেও তাই।
নাহিদও কটমটিয়ে চেয়ে। চোখের ভাঁজে কী অপার ঘৃনা! বন্ধুদের এই দৃষ্টিতে শাফিনের বুক খণ্ডখণ্ড হয়! অপরাধবোধে চুইয়ে আসে মন। ভেতরটায় উথলে আসা কান্না ঠেসে সে বাড়ি ছাড়ে দ্রুত।
তীব্রর চোখের কোনে জল জমেছে। কেউ দেখার আগেই আঙুল দিয়ে ছিটকে ফেলল সেটুকু। ঘর জুড়ে নীরবতা! কারো মুখে কথা নেই। প্রত্যকেই নিথর চিত্তে দাঁড়িয়ে।
ভাণ্ডারের শব্দ-বাক্য হয়ত শুষে নিয়েছে শাফিন। শাফিনের প্রতারণা।
আর সেই নীরবতাকে সাক্ষী রেখে, ওপরে সিঁড়ির দোরগোড়ায় স্তম্ভের ন্যায় দাঁড়িয়ে রইলেন জামশেদ। খসখসে মুঠোয় সিমেন্টের শক্ত হাতলটাকে চেপে ধরলেন শুধু।

প্রহরে প্রহরে রাতের মাত্রা তখন অনেক। সুনসান রাস্তায় ফুটপাত ধরে হাঁটছিল শাফিন। মুখের দশা দুরূহ। পরিতাপের আগুনে ছারখার হচ্ছে বুক।
আজ যেন হাড়েহাড়ে টের পেলো, রাগ-হিংসে কক্ষনো, কারো জন্যে ভালো কিচ্ছু বয়ে আনে না।
এই যে শাফিন, আজ কেমন চোখের পলকেই সব হারিয়ে ফেলেছে। বিট্টুর মতো বন্ধু! যে কী না আজ অবধি ওকে বিপদে একা ফেলে যায়নি। মায়ের চিকিৎসা থেকে শুরু করে সব বিপদে আজ পর্যন্ত নির্দ্বিধায় পাশে দাঁড়ানো মানুষটাই তো বিট্টু!
তারপর মিরাজ,মুশফিক,নাহিদ। ওরাও তো ওর থেকে দূরে সরে গেল। আরমান যখন সবটা শুনবে,হয়ত সেও চলে যাবে।

এত বছরের বন্ধুত্ব কি শাফিন একমাত্র নিজের ভুলেই শেষ করে দেয়নি?
ছেলেটার অস্থির লাগে। বক্ষপটে ফ্যাসফ্যাসে শ্বাস। ফুটপাতের আইল ধরে ধপ করে বসে পড়ল সে। মাথার চুল টেনে টেনে ঝরঝর করে কাঁদল কিছুক্ষণ। আচ্ছা,
ও কি আবার পেছনে ছুটে যাবে? আবার গিয়ে পা ধরবে বিট্টুর? ওকে মারুক, কাটুক যা ইচ্ছে করুক সব শাফিন মাথা পেতে নেবে। এই যে বিট্টু কিছু না বলে ছেড়ে দিলো? এতেই যেন তার অনুশোচনার পাহাড়টা প্রচণ্ড ভারী হয়েছে। এই ভার কী করে বইবে শাফিন?
বিবেকের দংশনে প্রতিনিয়ত ধুঁকে ধুঁকে মরে যাবে না?

আচমকা একটা নীল জিপ এসে ব্রেক কষল সেথায়।
শব্দে চোখ তুলে চাইল শাফিন। পুলিশের গাড়ি।
ইউনিফর্ম পরা লোকগুলো পটাপট নামলেন। মুখের সামনে
পুলিশ দেখে শাফিন উঠে দাঁড়াল। সবার সামনের লোকটা শুধালেন,
“ তুই শাফিন?”
মাথা নাড়ল ও।
অফিসার বললেন,

“ চল।”
“ চল মানে? কো কোথায় যাব?”
“ শ্বশুর বাড়ি। তোকে আপায়ায়নের ব্যবস্থা করেছি।”
মাথায় আকাশ ভাঙল তার।
“ কেন? কী করেছি আমি?”
ভদ্রলোক ফটাফট বললেন,
“ সাথে ইয়াবা নিয়ে ঘোরার কারণে তোকে গ্রেফতার করা হচ্ছে!”
শাফিন জড়বুদ্ধি বনে বলল,
“ ইয়াবা!
কী উল্টো-পাল্টা কথা বলছেন? আমার কাছে ইয়াবা থাকবে কেন?”
“ উল্টো-পাল্টা কথা? এই ওকে চেক করো তো!”
পাশের লোকটি ধমকে বললেন,
“ হাত তোল।”

শাফিন নাক ফুলিয়ে দুই হাত তুলল। একে মন মেজাজ খারাপ। তারওপর এসব উটকো অশান্তি।
ভদ্রলোক ওর বুক পকেট থেকে হাত নামিয়ে সারা গা হাতালেন। প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়েই,আবার বের করলেন সেটা।
মুঠোর মধ্যে কতগুলো প্যাকেট এলো সাথে। যা দেখে চমকে উঠল শাফিন। বিস্ময়ে থমকে বলল,
“ এসব, এসব কী করে…”
অফিসার চট করে ওর কলার মুঠোয় পুড়লেন।
কটমটিয়ে বললেন,
“ নেই নাকি? তাহলে এগুলো কী?”
“ বিশ্বাস করুন,এসব কোত্থেকে এলো আমি জানি না।”
“ জানিস কী না জানিস, সেসব থানায় গেলেই বোঝা যাবে। এই তোলো এটাকে!”

সে আমার সন্ধ্যাপ্রদীপ পর্ব ৫৪

সহসা দুজন দুহাত চেপে ধরে, হিড়হিড় করে তাকে গাড়িতে টেনে তুলল । শাফিন ছাড়া পেতে হাঁসফাঁস করে ওঠে। চিৎকার করে বলে,
“ স্যার,আমি কিছু করিনি। আপনাদের কোথাও ভুল হচ্ছে। আমার কথাটা একবার শুনুন!”
অফিসার ক্রুর হেসে সামনের সিটে বসলেন। গাড়ি ছাড়া হলো। সাথে সাথে কাউকে একটা ফোন করলেন তিনি। হৃষ্ট চিত্তে বললেন,
“ কাজ শেষ, স্যার। তুলেছি গাড়িতে। আপনি ভাববেন না, যেমন যেমন বলেছেন তেমন তেমনই করব। এমন কেস ফাইল করব না,মরার আগ অবধি জেলে বসে পচবে।”

সে আমার সন্ধ্যাপ্রদীপ পর্ব ৫৬