হ্যালো 2441139 পর্ব ১৭
রাজিয়া রহমান
মানুষের জীবন নদীর মতো বহমান। নদীর এপাড় ভাঙে,ওপাড় ভাঙে কিন্তু নদী বহতা বন্ধ হয় না।জীবন মানেই যেনো একটা যুদ্ধক্ষেত্র। এই যুদ্ধক্ষেত্রে পিছে হাটার কোনো সুযোগ নেই।
পিয়াসা নিজের ভাগ্যকে মেনে নিয়েছে।জেনে বুঝে নিজের বাবা মা ছাড়া অন্য কাউকে বাবা মা বলে মেনে নেওয়া কতটা যন্ত্রণাদায়ক।সেই যন্ত্রণাদায়ক কাজটাই পিয়াসা বরণ করে নিয়েছে নির্দ্বিধায়, নিশ্চিন্তে, খুশি মনে।
মানুষের সবচেয়ে বেশি এক্সপেকটেশন থাকে নিজের বাবা মা’য়ের কাছে সেখানে তার নিজের বাবা মা-ই তো তাকে অনাকাঙ্ক্ষিত ভেবে ছেড়ে চলে গেছে নিজ নিজ সুখের সন্ধানে।
পিয়াসা ই ছিলো তাদের গলার কাঁটা।
নিজের মানুষ যখন ছেড়ে গেছে,রক্তের বন্ধন অস্বীকার করেছে সেখানে ভিন্ন রক্তের মানুষ তাকে রাজকুমারীর আসনে বসিয়েছে। পিয়াসা নিজেকে পাথর করতে চায়।কারো জন্য সে চোখের পানি ফেলবে না আর।শেষ বার কেঁদেছিলো পারভীন নামের মহিলা তাকে ছেড়ে যাওয়ার পর। এরপর পিয়াসা চোখ মুছে নিজের কাছে নিজে শপথ করেছে এরপর জীবনে যত বড় ঝড় আসুক,যত আঘাত আসুক পিয়াসা আর কাঁদবে না।
নতুন বাবা মা’য়ের কাছে এসে পিয়াসার যেনো আবারও নতুন করে জন্ম হলো।পিয়াসা এখন পিয়াসা চৌধুরী।
বাবা মা’য়ের আদরের মেয়ে। পিয়াসা আগের জন্মের কথা তাই মনে রাখে নি।দুঃখকে কখনো পুষতে নেই,দুঃখের কারণকেই মাটিচাপা দিয়ে দিতে হয়।পিয়াসা ও মনে করে পূর্ব জন্মের কিছুর আঁচ সে এই জীবনে তার জীবনে অথবা বাবা মা’য়ের জীবনে আসতে দিবে না।
এ বড় কঠিন যুদ্ধ। ভীষণ মনোবল না থাকলে এই যুদ্ধ করা যায় না।এই যুদ্ধ বাহিরের দুনিয়ার সাথে যতটা তার চাইতেও বেশি নিজের সাথে নিজের।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
পিয়াসা নিজেকে বিশ্বাস করে। বিশ্বাস আছে বলেই সেদিন টেস্ট পরীক্ষা দিয়ে ফেরার সময় মালিহাকে দেখে ও পিয়াসা না চেনার মতো করে চলে এসেছে।
পিয়াসা এবার ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দিবে।টেস্ট পরীক্ষা শেষ হয়েছে চার দিন আগে। শেষ পরীক্ষার দিন বান্ধবীদের সাথে পিয়াসা বাশার মামার দোকানে ফুচকা খেতে বসে।
গল্প আড্ডায় মশগুল পিয়াসা দেখতে পায় নি রাস্তার উল্টো দিক থেকে কেউ একজন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
মালিহা এগিয়ে যায় পিয়াসাকে লক্ষ্য করেই।পিয়াসা তখন বান্ধবীদের সাথে কে কতটা ফুচকা খেতে পারে সেই চ্যালেঞ্জ নিয়ে ফুচকা খাচ্ছে। দম ফেলার সময় নেই তার সেই মুহূর্তে মালিহা এগিয়ে গিয়ে বললো, “পিয়া?”
পিয়াসা এক নজর তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নেয়। ৩ মিনিটে সবচেয়ে বেশি ফুচকা খেয়েছে পিয়াসা।
বিজয়ীর হাসি হেসে মালিহার দিকে তাকায়।
মালিহার চোখের নিচে কালি পড়েছে। দুই ঠোঁট শুকিয়ে গেছে।
আগের মতো সেই লাবন্যতা বিলীন হয়ে গেছে।
মালিহা আবারও বললো, “পিয়া মা?”
“কে পিয়া মা?আপনার ভুল হচ্ছে।”
“না মা,আমার ভুল হয় নি।তুই আমার ভাইয়ের মেয়ে।আমার একমাত্র ভাই শাহেদের মেয়ে।আমি তোর ফুফু।”
“আপনার ভুল হচ্ছে আন্টি। আমার নাম পিয়াসা,চৌধুরী পিয়াসা বিনতে আনোয়ার। আমার বাবার নাম শাহেদ না,আমার বাবার নাম আনোয়ার। ”
মালিহা থমকে যায়।সে ভুলেই গেছে পিয়াসাকে তারা দত্তক দিয়ে দিয়েছিলো।তার নতুন বাবা মা তার সব জন্ম পরিচয় পরিবর্তন করে ফেলেছে হয়তো।
মালিহা ভালো করে তাকায় পিয়াসার দিকে।
এ যেনো কোনো রূপকথার রাজকুমারী। এই ভুবনমোহিনী রূপ, এই চোখের চাহনি সবকিছুই মালিহার কতো চেনা।একই রক্তের মানুষ দুজন অথচ কতো দূরত্ব আজ।
মালিহার ইচ্ছে করছে একটা বার পিয়াসাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কিন্তু সেই সাহস আর তার হলো না।পিয়াসাকে দেখেই মনে হচ্ছে সে কোনো ধনীর দুলালী।তার জন্ম যে একটা সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে এই পিয়াসাকে দেখলে কেউ আন্দাজ ও করতে পারবে না।
মালিহার কেমন যেনো আড়ষ্ট অনুভব হলো। পিয়াসার কাছাকাছি সে দাঁড়িয়ে আছে অথচ পিয়াসা এমন ভাবে বান্ধবীদের সাথে গল্প করছে যেনো এখানে কোনো মানুষ নয় কোনো পিলার দাঁড়িয়ে আছে। অথবা যে দাঁড়িয়ে আছে সে চির অচেনা তার।
অধিক শোকে মানুষ পাথর হয় মালিহা বইতে পড়েছে কিন্তু এবার নিজ চোখে দেখছে।
পিয়াসা শুধু পাথর না,সে হয়েছে শতাব্দী ধরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন বটবৃক্ষ। যাকে কোনো ঝড়-ঝঞ্ঝা ওপড়াতে পারে নি।
মালিহা ধীর পায়ে নিজের পথে হাটা শুরু করে দিলো।সময় পেরিয়ে গেছে অনেক। সংসারের হাল,সাবিহার বাচ্চাদের দায়িত্ব সবকিছু মালিহাকে নিতে হয়েছে।সাবিহা ডিভোর্সের পর কেমন একগুঁয়ে হয়ে উঠেছে। শান্ত নদীর মতো সাবিহা কেমন হিংস্র আর খিটখিটে হয়ে গেছে। ঠিক ততটাই শান্ত হয়ে গেছে মালিহা।জীবনে তার আর পাওয়া হলো না কিছু।এতো বছর পরে এখনো মানুষজন মালিহাকে দেখলেই সেসব ছবি,ভিডিওর কথা প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দেয়।
বারবার পাত্রপক্ষ আসে,কথা বলে তারপর নাকচ করে দেয়।একটা বছর ধরে এসব সহ্য করার পর মালিহা বুঝতে পারলো জীবনকে সে যতটা সহজ ভেবেছিলো জীবন তার চাইতে হাজার গুণ বেশি নিষ্ঠুর।পাপের শাস্তি পেতেই হয়।
কেউ ছাড় পায় না।
যেমন ছাড় পায় নি সাবিহা,জমিরন,মালিহা তেমনই ছাড় পায় নি কাদের।বিদেশে যাওয়ার এক বছর পর এক্সিডেন্টে দুই পা হারায়।
দেশে ফিরে যখন সাবিহাকে আবারও ফিরিয়ে নিতে চাইলো সাবিহা তখন একেবারে বেঁকে বসলো।
মালিহা একটা জুতার ফ্যাক্টরিতে কাজ করে।সংসার পুরোটা এখন মালিহার কাঁধে। মাঝেমাঝে ইচ্ছে করে সব ছেড়ে পালিয়ে যেতে।এতো অপমান, লাঞ্চনা আর নিতে পারছে না মালিহা।কিন্তু জীবন থেকে পালানোর উপায় তার জানা নেই।
পিয়াসা নিজের রুমে বসে গুনগুন করে গান গাইছে। মা এখনো স্কুল থেকে ফেরে নি।মা এখন হেড মিস্ট্রেস। আনোয়ার চৌধুরী চেম্বার থেকে ফিরে এলেন বিকেলে।
বাবাকে দেখে পিয়াসা এক গ্লাস বরফ শীতল পানি নিয়ে এগিয়ে গেলো।
আনোয়ার চৌধুরী সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বসে বললো, “আমাদের একটা ইনভাইটেশন আছে রে বাবা।আগামীকাল ঢাকায় যেতে হবে।”
পিয়াসা বাবার পাশে বসে বললো, “কি জন্য বাবা?”
“তোর সিরাজ আংকেল আছেন না?ওনার বড় মেয়ে বৈশাখীর বিয়ে। আমাদের দাওয়াত করেছেন।”
পিয়াসার বুক কেঁপে উঠে। সেই বাড়িতে যাবে আবারও?
হুট করেই পিয়াসার গলা শুকিয়ে যায়। লজ্জায় ইচ্ছে করে মাটির সাথে মিশে যেতে।
লম্বা সেই ছেলেটার মুখোমুখি হবে কিভাবে পিয়াসা?
মেয়ের পাংশুটে মুখের দিকে তাকিয়ে আনোয়ার চৌধুরী বললেন, “কি হয়েছে বাবা?কোনো অসুবিধা? ”
“হ্যাঁ বাবা,আমার এক্সাম চলে এসেছে। এখন কি বেড়ানোর সময় না-কি বাবা?পড়তে হবে আমাকে।”
“সবসময় এতো পড়তে হবে না বাবা।বইয়ে মুখ গুঁজে থেকে জীবনকে উপভোগ করবি না, তা তো হবে না।পড়ালেখার পাশাপাশি জীবনের সব সুখ উপভোগ করতে হবে।বিয়ে,দাওয়াত এসব সামাজিকতা পালন করতে হয় আমাদের বাবা । আমরা মানুষ, মানুষ সামাজিক জীব।
দেখিস না পশুদের মধ্যে কোনো সামাজিকতা নেই।মানুষ হওয়ার অনেক যন্ত্রণা বুঝলি।”
পিয়াসা কিছু বললো না। একটা গাঢ় অস্বস্তি মতে তার মন ছেয়ে গেলো।
শারমিন এসে যখন শুনলো রজনীর মেয়ের বিয়ের দাওয়াত তখন নিজেই মেয়েকে তাড়া দিলো লাগেজ গুছিয়ে নেওয়ার জন্য।
পিয়াসার কিছুতেই যেতে ইচ্ছে করছে না।
কিন্তু না গিয়ে ও উপায় নেই এবার।
এতো বছর আর ওই বাড়িতে যাওয়া হয় নি।শারমিন নিজেই যায় নি।রজনী এসেছিলো কয়েকবার। কিন্তু নিজেও বান্ধবীকে যেতে বলে নি। মহুয়া বেগমের সেদিনের রূঢ় ব্যবহার শারমিনের বুঝতে অসুবিধা হয় নি।
তার কারণে রজনীর সংসারে অশান্তি হোক শারমিন চায় নি।
কিন্তু এখন যখন মেয়ের বিয়ে তখন যেতেই হচ্ছে।
ভোররাতে নিজেদের গাড়ি নিয়ে বের হলো আনোয়ার চৌধুরী স্ত্রী কন্যাকে নিয়ে।
আজকে বৈশাখীর গায়ে হলুদ। রজনীদের বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সকাল ৭টা বেজে গেলো।
পিয়াসা গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ায়। ৫ বছর পর আবারও এসেছে। এই বাড়িটা এখনো আগের মতো আছে।সেই প্রথম বারের মতো এবার ও পিংকি ছুটে এসে পিয়াসাকে জড়িয়ে ধরে। আষাঢ় ছাদে ফুলের মালা লাগাচ্ছিলো। সেই প্রথম বারের মতো এবার ও আষাঢ় ছাদে দাঁড়িয়েই পিয়াসাকে দেখলো।
পিয়াসাকে দেখেই আষাঢ়ের খুব হাসি পেলো।
পিয়াসা এদিক ওদিক তাকিয়ে ছাদের দিকে তাকাতেই দেখে আষাঢ় তার দিকে তাকিয়ে আছে। আষাঢ়ের দিয়ে তাকাতেই পিয়াসার বুক ধড়ফড় করে উঠলো।
বিপদগ্রস্ত হরিণীর মতো লাফিয়ে ভেতরে ঢুকে গেলো পিয়াসা।
আষাঢ় হেসে ফেললো পিয়াসাকে পালাতে দেখে।একটা এক্সিডেন্টকে মেয়েটা এতো দিন ধরে মনে রেখেছে?
সন্ধ্যায় গায়ে হলুদের সময় মেয়েরা সবাই সবুজ রঙের লেহেঙ্গা পরবে বলে সিদ্ধান্ত নিলো। পিয়াসা সেই যে শেষ বার লেহেঙ্গা পরে এই বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলো তারপর আর লেহেঙ্গা পরে নি।
এই জন্মের মতো আর কখনো লেহেঙ্গা পরবে না সে।
হ্যালো 2441139 পর্ব ১৬
আজকেও সবাই মিলে যখন পিয়াসাকে জোরাজোরি করতে লাগলো পিয়াসা কিছুতেই রাজি হলো না।
সবার মাঝে পিয়াসাই একা থ্রিপিস পরে ছিলো।
আষাঢ় নিজের ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলছিলো।এতো গুলো মেয়ের ভীড়ে পিয়াসাকেই আলাদা করে চোখে পড়ছে।
মেয়েটা এতো ভয় পাচ্ছে কেনো?আষাঢ়ের মুখোমুখি, চোখাচোখি কিছুতেই হচ্ছে না।
