অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৩৯+৪০
সিনথিয়া ইসলাম সীমা
দক্ষ হাতে ড্রাইভিং করছে অনিল। এর মাঝেই পকেটে থাকা ফোনটা হাতে নিয়ে কাউকে কল লাগালো। একবার রিং হতেই ওপাশের ব্যাক্তি কল রিসিভ করলেন। কল রিসিভ হতেই অনিল ব্যাক্তি টির উদ্দেশ্যে বললো,
“ চাচা আনিকা ও হীরাকে কলেজ গেইট থেকে নিয়ে আসুন। ”
“ তুমি আনতে যাও নাই বাবা? ”
“ নাহ। ”
“ আচ্ছা আমি যাইতাছি। ”
“ ওকে ”
সালাম দিয়ে কল কেটে দিলো অনিল। তারপর আবারও ড্রাইভিং এ মনোযোগ দিলো। রাগে এখনো তার মাথার রগগুলো ফুলে আছে। হীরা দের হাসি মুখটা সামনে ভাসলেই সেটা আরও বেড়ে যাচ্ছে। রাস্তায় না হলে আজকে এদের একটা শিক্ষা দিয়ে ছাড়তো সে নিশ্চিত।
মুখটা বাংলার পাঁচের মতো করে অলস ভঙ্গিতে রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলছে হীরা ও আনিকা। তাপসি আর জারা অন্য রাস্তা দিয়ে তাদের বাড়ির উদ্দেশ্যে চলে গেছে কিছুক্ষন আগে। যাওয়ার সময় সবগুলোকে কথা শুনাতে ভূলে নি তাপসি। অবশ্য তার কথাতে তারা তেমন পাত্তাই দেয়নি। তারা তো তখন শুধু অনিলের চলন্ত গাড়ির দিক অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলো। অনিল এক বারো ফিরে তাকায়নি সে মুখগুলোর পানে। সে বড়ো বড়ো কদমে গাড়ির নিকট গিয়েই কোনদিক না তাকিয়ে ভিতরে ঢুকে গাড়ি স্টার্ট করে স্থান ত্যাগ করেছে।
সহসা নীরবতা ভেঙে আনিকা বলে উঠলো,
আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন
“ ভাইয়া তো চলেই গেছে ফুচকাগুলো খেয়েই নিতাম। এমনিতেই কপালে দুঃখ আছে তা নিশ্চিত। ”
“ হুঁ। তবে এখন তো অন্তত সাফাই গাইতে পারবো যে, আপনার জন্য ফুচকা খায়নি। খেলে তো সেটাও বলতে পারতাম না। ”
“ কথা একদম খাঁটি। ভাইয়া তো আমার নাগাল পাবে না, পেলেও একটু আকটু, যা ঝড় যাবে সব তোমার উপর দিয়েই। তোমাকে নিয়েই চিন্তা। ”
“ চিন্তা করে লাভ নেই কারণ আজকে আমাকে ঠান্ডা পানিতে গোসল করতে হবে আমি শিউর। ”
“ মানে! ”
“ উনি খালি আমায় দুটো শাস্তিই দেয়: এক এই কনকনে শীতে রাতের বেলা গোসল করা, দুই ইনজেকশন। ”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো হীরা। তার এমন দুঃখী ভাব দেখেও আনিকা দুঃখ প্রকাশ করতে পারল না উল্টো শব্দ করে হেসে উঠলো। তাকে হাসতে দেখে হীরা মন খারাপ করে বললো,
“ আপু তুমি আমার দুঃখের সময় মজা নিচ্ছ। ”
“ সিরিয়াসলি আমি মজা নিতে চাচ্ছি না তবে মজা নিজে নিজেই এসে যাচ্ছে। এমন শাস্তি ভাইয়া দেয় আমার বিশ্বাসই হচ্ছে না। ”
“ শুধু শাস্তি না, ঐদিন ফুচকা বানিয়ে খাওয়ার পরিবর্তেও উনি আমাকে গোসল করতে বলেছিলেন। ”
আরও বেশি হাসি পেলো আনিকার। হাসতে হাসতেই অবাক হয়ে কিছু বলতে নিবে তার আগেই তাদের সামনে এসে আচমকা একটি গাড়ি ব্রেক কষলো। প্রথমে কিছুটা ভয় পেলেও পরবর্তীতে গাড়ির ভেতরে পরিচিত লোকটিকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। গাড়িতে উঠতে উঠতেই আনিকা ড্রাইভার চাচার উদ্দেশ্যে বললো,
“ চাচা আপনাকে আসতে বলেছে কে? ”
“ কিছুক্ষন আগে অনিল বাবায় কইলো। ”
“ ওহ। ”
আর কোনো কথা বললো না তারা, পুরো রাস্তা চুপচাপ চললো।
রাতে হীরার রূমে বসে আনিকা ও হীরা পায়চারি করছে।কিছুক্ষন পরেই অনিল এসে পরবে। আর সেটা নিয়েই চিন্তিত তারা। কীভাবে অনিলের রাগ কমানো যাবে তা নিয়েই মূলত ভাবনায় ডুবে আছে তারা। হীরা স্কুল থেকে ফিরে সারাদিন ছটফট করেছে। মেয়েটার খুব খারাপ লাগছে, সে ফুচকা খেতে চেয়েছিলো বলে ঐদিন তার ডাক্তার সাহেব নিজে ফুচকা বানিয়ে দিলো আবার আজকেও এতো কিছু করার পর তাদের জন্য গাড়ি পাঠালো। আর সে কিনা তার ডাক্তার সাহেবের কথা অমান্য করে ফুচকা খেতে চলে গেলো- ভাবতেই নিজের প্রতি নিজেরই রাগ হচ্ছে তার। তার ডাক্তার সাহেব তো তার ভালোর জন্যই এসব খেতে নিষেধ করেছে। আজকের পর সে আর কখনো ফুচকাই খাবে না বলে মনে মনে পণ করলো।
“ এই হীরা, দেখো গুগল মামু কী বলে! ”
আনিকার কণ্ঠে ভাবনার জগৎ থেকে ফিরে আসলো হীরা। ভ্রূ জোড়া কুঁচকে বললো,
“ কোন মামু? ”
“ আরে গুগল মামু! তাকে জিজ্ঞেশ করলাম কীভাবে স্বামীর রাগ ভাঙ্গানো যায়। দেখো কী উত্তর দিয়েছে। ”
হীরার ফোন নিয়ে বিছানায় গুগল সার্চ করে বললো আনিকা। তার কথায় পা বাড়িয়ে তার নিকট এগিয়ে গেলো হীরা। মোবাইলের মাঝে চোখ বুলাতেই বিষ্ময়ে হা হয়ে গেলো মেয়েটা। চোখ, মুখ কুঁচকে বললো,
“ ছি আপু, তোমার মামু কী আজাইরা কথা বলে এসব। ”
চোখ ছোটো ছোটো করে ফেললো আনিকা। বললো,
“ ঠিকই তো বলেছে। তুমি কথা না বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি শাড়ি পরো তারপর বাকি কাজ যেভাবে যেভাবে বলেছে সেভাবে সেভাবেই করবে। ”
“ আমি শাড়ি পড়লে উনি আমায় আরও আগে কেটে গাঙে ভাসিয়ে দেবে। আমাকে শাড়ি পরতে নিষেধ করেছেন উনি। ”
“ ওমা কেন! ”
“ জানিনা। ”
পরাজিত সৈন্যের মতো মুখটা শুকিয়ে গেলো আনিকার। আর কিছু না বলে সে চুপচাপ বিছানায় বসে হীরার এপাশ থেকে ওপাশ হাঁটা দেখতে লাগলো। এর মাঝেই নিঃশব্দে রুমে প্রবেশ করলো অনিল। সাথে সাথেই বিছানা থেকে এক লাফে নেমে গেলো আনিকা। দাঁড়ালো হীরার পাশ ঘেঁষে। প্রস্তুতি নিয়ে নিলো কথা শুনার। তবে তাদের দুজনকে অবাক করে দিয়ে অনিল কিছু না বলে স্টেথোস্কোপ ও অ্যাপ্রনটা নির্ধারিত স্থানে রেখে ওয়াশরুমে চলে গেলো। সে যেতেই বিস্মিত বদনে মুখ চাওয়া চাওয়ি করলো তারা। আনিকা ভ্রু নাচিয়ে জানতে চাইলো, “ কী হলো” উত্তরে হীরা ঠোঁট উল্টালো।
“ ভাইয়ার রাগ মনে হয় চলে গেছে। যাইহোক আমি এবার যাই। ”
বলেই হীরাকে বিদায় জানিয়ে রূমে চলে আসলো সে।
রূমে এসে প্রথমেই নিজের ফোনটা হাতে নিলো সে। দেখল তাপসির আইডি থেকে অনেকগুলো নোটিফিকেশন এসেছে। লক খুলে আইডিতে প্রবেশ করলো সে। প্রথমেই একটা ভয়েস ফরওয়ার্ড পাঠানো। সেটাতে চাপ দিলো সে। পুরো ভয়েসটা শুনে আনিকা নিজেই টাস্কি খেয়ে গেছে। কী ভয়েস রে ভাই! তার বান্ধবী কী শুধু শুধুই পাগল হইছে। আরেকটু উপরে উঠতেই একটা স্ক্রীনশট পেলো সেটায় চাপতেই চোখের সামনে একটা পরিচিত নাম্বার ভেসে উঠলো। বিস্ময় নিয়ে আবারও নাম্বারটা দেখলো আনিকা। নাহ, সে ভূল দেখছে না- এটা নিরব ভাইয়ার নাম্বার। তারমানে এই লোকই তার বান্ধবীর সাথে বাঁদরামি করেছে! আজকে ঐ লোকের একদিন তো তার একদিন। যা ভাবা তাই, খুঁজে খুঁজে সবার নিচে অবহেলায় পরে থাকা আইডি টা বের করলো সে। জীবনে মেসেজ না করা আইডি তে এই প্রথম ডিরেক্ট কল দিয়ে বসলো। দু’বার রিং হতেই ওপাশ থেকে কল রিসিভ হলো। সাথে ভেসে উঠলো বিস্মিত কণ্ঠ,
“ ওরে বাপরে অমাবশ্যার রাতে চাঁদ উঠলো নাকি আজ! ”
“ এই আপনার সমস্যা কী? ”
“ সমস্যা! কই সমস্যা? এইটা আবার কী! ”
” আপনার কী সব কিছু মজা মনে হয়? একটা মেয়ের ফিলিংস নিয়ে মজা করতেও কী আপনার বিবেকে বাঁধে না। ”
আনিকার এমন অগ্নিশর্মা ঝাঁজ মিশানো কন্ঠ শুনে সিরিয়াস হলো নিরব। শান্ত স্বরে বললো,
“ কী হইছে রে আনু বুড়ি? বুঝাইয়া বল কিছু মাথায় ঢুক তাসে না আমার। ”
“ আপনি তাপসির সাথে এমন করলেন কেন? ”
“ এই ভাই, এইগুলা কী উল্টা পাল্টা এ,বি,সি কইতাছস! তপসি, তাপসি কেডা আবার? ”
“ নাম জানেন না অথচ এতো প্রেমময় ভয়েস পাঠিয়ে দিয়েছেন তাও আবার ডেয়ার পালন করতে গিয়ে! একবার ভাবলেন না যে, ওপাশের মেয়েটার উপরে তা কেমন প্রভাব ফেলবে! ”
মূল ঘটনা মাথায় কেচ করলো নিরবের। বুঝতে পারলো আনিকা কার কথা বলছে। মেয়েটা এখনো তাকে মনে রেখেছে! এই মেয়ে কী সত্যিই প্রেমে পড়ে গেলো নাকি! আর কিছু ভাবতে পারলো না সে। আনিকার থেকে জানতে চাইলো,
“ তোর বান্ধবী কী এখনো মনে রেখেছে ঐ সব? ”
তাচ্ছিল্যের হাসি হাসলো আনিকা। বললো,
“ যে ভয়েস দিয়েছেন, আমিতো শুনে ভাবতেও পারিনি এটা আপনি হবেন! এমন ভয়েস দিয়ে আবার জানতে চাইছেন মনে রেখেছে কিনা! এমন ভাবেই মনে গেঁথে রেখেছে যে, মেয়েটা এখন হাসতেই ভূলে বসেছে। আপনার ভয়েসের মাঝেই হারিয়ে থাকে দিবা রাত্রি! ”
মুখের ভাষা হারিয়ে ফেললো নিরব। তার জীবনেও মনে হয় সে এতোটা সিরিয়াস হয়নি আজকে যতটা হয়েছে। তার এখন মন চাচ্ছে তার বন্ধুদের গিয়ে হাড় গোড় ভেঙ্গে ড্রেনে ফেলে দিতে। তবে এসব করলেও কী এখন আর মেয়েটাকে স্বাভাবিক করা যাবে! দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে। বললো,
“ আচ্ছা আমি তোর বান্ধবীর সাথে কথা বলছি। তুই রাগিস না কুটনি। ”
“ আপনি যা ইচ্ছা তা করেন তবে আমার আগের বান্ধবী ফিরে না পেলে আপনার জীবনে আগুন জ্বালাবো আমি বলে দিলাম! ”
নিজের কথা শেষ হতেই খট করে কল কেটে দিলো আনিকা। ওপাশের অভিব্যাক্তি জানার প্রয়োজন বোধ করলো না।
“ডাক্তার সাহেব”
বিছানায় ল্যাপটপ নিয়ে নিঃশব্দে বসে থাকা অনিলের কাছে এগিয়ে এসে মিষ্টি স্বরে ডেকে উঠলো হীরা। উত্তরে নিশ্চুপ রইলো অনিল। মুখে আঁধার নেমে এলো তার। আবারও ডেকে উঠলো,
“ ডাক্তার সাহেব। ”
এবারও কোনো ধ্বনি উচ্চারিত হলো না অনিলের মুখ থেকে। ধীরে ধীরে গিয়ে অনিলের মুখোমুখি বিছানায় বসলো হীরা। ঢোক গিলে আবারও ডেকে উঠলো,
“ স্যরি,ডাক্তার সাহেব। আমি আর কখনো আপনার কথা অমান্য করবো না। আর তখন আমি সত্যি হাসতে চাইনি তবে হাসি এসে গেছে এতে আমার কী দোষ বলুন? সব দোষ ঐ হাসির।”
চোখ তোলেও তাকালো না অনিল। মনটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো হীরার। সাথে রাগও হলো বেশ। সাহস করে এগিয়ে গিয়ে ল্যাপটপ টা অনিলের সামনে থেকে সরিয়ে নিলো। হাত টা কাঁপল খানিক। সেদিকে ধ্যান না দিয়ে অনিলের একদম কাছ ঘেঁষে বসলো সে। অনিল চোখ বুঁজে শ্বাস নিচ্ছে বারংবার। যেনো রাগ সংযত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এর মাঝেই হীরা অসহায় কণ্ঠে বলে উঠলো,
“ আপনি আমায় শাস্তি দিন। দরকার হলে দশবার ঠান্ডা পানিতে গোসল করান আর নয়তো যতো ইচ্ছা ইনজেকশন দিন তবুও কথা বলুন ডাক্তার সাহেব। ”
বলতে বলতেই অনিলের গলা জড়িয়ে ধরলো সে। হীরার ঠান্ডা হাতের স্পর্শে চোখ মেলে তাকালো অনিল। তার লাল চোখগুলো দৃষ্টিগোচর হতেই কিছুটা কেঁপে উঠলো হীরা। ঢোক গিলে আমতা আমতা করে বললো,
“ আমি আর কোনোদিন এমন করবো না। প্লিজ কথা বলুন। ”
কিছুটা মনে হয় ধমলো অনিল। ঠোঁট নেড়ে বললো,
“ ওকে, এখন ঘুমোও। ”
বলেই নিজের গলা থেকে হীরার হাতগুলো সরাতে ব্যস্ত হলো সে। ব্যাপারটা মোটেও পছন্দ হলো না হীরার।সে আরও শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরলো অনিলের গলা। তার কান্ড দেখে অনিল ধমকের স্বরে বললো,
“ কী সমস্যা? ”
কিছু বললো না হীরা। এক হাতে অনিলের গলা জড়িয়ে অপর হাত অনিলের চোখের উপরে রেখে নিজের নারীসুলভ চিকন অধরযুগল দিয়ে অনিলের পুরুষালী ঠোঁট জোড়া ছুঁয়ে দিলো। নিজের কাজে নিজেই কারেন্ট শক খেলো মেয়েটা। সেকেন্ডের মধ্যেই সরে আসতে উদ্যত হলো সে। তবে তাকে নিজের সাথে চেপে ধরলো অনিল। কানের কাছে মুখ নিয়ে হিঁসহিঁসিয়ে বললো,
“ শান্ত সাগরে ঢেউ তুলেছেন তা থামবার আগ অব্দি আপনার নিস্তার নেই। ”
বলেই সময় ব্যায় না করে হীরার অধরযুগল আকড়ে ধরলো সে। নড়ে চড়ে উঠলো হীরা। এই টুকু ছুঁয়াতেই পায়ের তলা সহ শিরশির করে উঠলো মেয়েটার। তবে অনিলকে বাঁধা দিলো না। কিছুক্ষন পর অনিল নিজ থেকেই ছেড়ে দিলো হীরাকে। হীরার লজ্জায় নুইয়ে রাখা বদন খানা অবলোকন করে তাকে বুকে জড়িয়ে ঘুমের দেশে পারি জমালো।
সময়ের ধারাবাহিকতায় কেটে গেলো অনেকগুলো মাস। রোদেলা দুপুর, রাস্তায় ছুটে চলছে অগণিত যানবাহন। কলেজ গেইটের সামনে চুপচাপ সেগুলোই মন দিয়ে দেখছে হীরা। চুপচাপ থাকার প্রধান কারণ পাশে তার আপু রূপে বান্ধবীর অনুপস্থিতি। আনিকার এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হলো কদিন হয়েছে। যার দরুণ সে এখন বাড়িতেই থাকে। আর হীরা এখন কলেজ লাইফে পা রেখেছে। তবে কলেজে উঠার পর তার একটাই আফসোস, সেটা হচ্ছে আনিকার সাদিক স্যার কে দেখতে না পাওয়া। সাদিক নামটা শুনতেই মনের মধ্যে এক অদম্য ইচ্ছা জেগেছিল সাদিক কে দেখার তবে সেটা আর পূরণ হলো না তার। সে কলেজে আসার আগেই নাকি সাদিক স্যার এই কলেজ থেকে চলে গেছেন। আনিকার থেকে এইটুকু জেনেছিল সে। বেশি কিছু জানার ইচ্ছা থাকলেও সেটা মুখ ফোটে বলেনি। সাদা কলেজ অ্যাপ্রন পরিহিত হীরাকে এখন আর ছোটো মনে হয় না। যদিও এখন সে ছোটো ও নয় আর মাত্র এক দিন পরেই সে পরিপূর্ণ সপ্তদশী তে পরিণত হবে।
দাঁড়িয়ে থাকার মাঝেই সহসা সামনে ভেসে উঠলো এক ঘৃণিত মুখ। ভরকে গেলো মেয়েটা। সাথে সাথেই দু’কদম পিছিয়ে গেলো।
“ কেমন আছো হীরা? ”
সামনে থাকা পুরুষটির ভালো কথাগুলোও যেনো বিষাক্ত মনে হলো হীরার। সে নাক মুখ কুঁচকে চলে যেতে নিবে, সহসাই তার হাত ধরে ফেললো পুরুষটি। চমকে গেলো মেয়েটা। সে কল্পনাতেও ভাবতে পারেনি এই পুরুষ তার হাত ধরার সাহস করবে। ঘটনা বুঝে আসতেই তার অপর হাতটি চলে গেলো ঐ দামড়া যুবকের গালে। হীরার হাত ছেড়ে তার পানে চকিত চাইলো রনি। তবে এতক্ষনে যা হবার তা হয়েই গেছে, হীরার হাত টি তার হাতে বন্দি অবস্থাতে থাকার মধ্যেই সবেগে ছুটে গেলো একটি সদ্য থামা গাড়ি। হীরার সেদিকে খেয়াল নেই সে রাগে ফুঁসছে। আশেপাশের সকলের উৎসুক দৃষ্টি ও তাদেরই উপর। থাপ্পড় মেরে এক সেকেন্ড ও আর সেখানে দাঁড়ালো না হীরা। যেতে যেতেই তর্জনী উঁচিয়ে বলে গেলো,
“ নেক্সট টাইম অনুমতি ব্যাতিত অন্যের স্ত্রীর হাত ধরবেন তো পায়ের জুতো জোড়া আপনার গালে স্থান পাবে। ”
বলেই হনহন করে হেঁটে চললো হীরা। তার পিছন পিছন ছুটতে ছুটতেই রনি বলল,
“ আরে হীরা শুনো তো, আমি জানি তুমি বিবাহিত। আমি শুধু তোমার কাছে ক্ষমা চাইতে….”
আর কিছু বলতে পারলো না রনি। এর আগেই রাস্তায় থাকা লোকগুলো এগিয়ে এলেন। তন্মধ্যে হীরার বাবার বয়সী একজন লোক হীরার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়লেন,
“ এটা কী তোমার কিছু হয় মা? ”
“ না আঙ্কেল, এই লোক কিছু হয় না আমার। আমাকে ডিস্টার্ব করছেন উনি। ”
হাঁটতে হাঁটতেই অকপটে উত্তর করলো হীরা। তার উত্তর করতে দেরি অথচ লোকগুলোর রনির উপর হামলে পড়তে দেরি হলো না। একবার পিছু ফিরে সুনামধন্য ডা. রাফসান আহমেদ রনির করুন দশা দেখে হাসতে ভুললো না হীরা। আজকে নিজের সাহস দেখে নিজেরই অবাক লাগছে তার। আর এই সাহস সে পেয়েছে আনিকার থেকে। আনিকার সাথে থাকতে থাকতে, কথায় কথায় কান্না করে দেওয়া হীরাও আজ কাউকে গণধোলাই খাওয়ালো। ভাবতেই আনিকাকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিতে ইচ্ছে হলো তার। মনটা নেচে উঠল খুশিতে। তবে তা টিকলো না বেশিক্ষণ। অনিল আজকে এলো না কেন? সেটা ভেবেই আবার চিন্তিত হয়ে পড়লো।
সাদিকের সাথে দূরত্ব বাড়লেও এখনো ঝগড়া বন্ধ হয়নি আনিকার। কলেজ থেকে যাওযার পর প্রায় প্রতিদিনই সাদিকের সাথে কথা হয় আনিকার। কথার মাঝেই না চাইতেও কীভাবে যে, ঝগড়া বেধে যায়- তা নিজেই বুঝে না আনিকা। আজকেও ঝগড়া হয়েছে তাই গোমড়া মুখ নিয়ে সারাক্ষণ বসে আছে সে। ঝগড়ার প্রধান কারণ একটা মেয়ে। সাদিক বর্তমানে যেই কলেজে চাকরি করে, সেখানের একজন স্টুডেন্ট নবীন বরণ এর দিন সাদিকের সাথে পিক তোলে নিজের ফেসবুক আইডি তে পোষ্ট করেছে সাথে ক্যাপশন দিয়েছে,“ মাই ফেভারিট টিচার” আনিকার চোখে পোষ্ট টা পরতেই তেলে বেগুনে জ্বলে উঠেছে সে।
সেই নিয়েই সাদিকের সাথে বোম হয়ে আছে। বোম হওয়ার প্রধান কারণ অবশ্য সাদিক নিজেই। আনিকা যখন পিকটা শেয়ার করে জিজ্ঞেস করেছিলো, “ এটা কে? ” উত্তরে সাদিক জানিয়েছে মেয়েটা নাকি তার ফেভারিট স্টুডেন্ট সাথে একটা লাভের ইমোজি দিতেও ভূলে নি। আর সেটা দেখেই চটে গেছে আনিকা। সে জানে সাদিক তাকে রাগানোর জন্য এইগুলো বলেছে তবুও তার রাগ হচ্ছে। আজকাল এমন ছোটো খাটো বিষয় নিয়েই মেয়েটার রাগ হয়। তার কারণ টাও বোধ হয় সে আন্দাজ করতে পেরেছে। তবে তা নিজের মাঝেই চাপা রেখেছে। যতক্ষন না অব্দি সাদিক তাকে কিছু বলছে সেও বলবে না। দুজনেই দুজনের মনের কথা বুঝতে পারে তবুও স্বীকার করতে নারাজ। ঝগড়া করেই পুরো সময় কাটিয়ে দেয় তারা।
“ ইরাবতী মেয়েটা কেমন লাগে? আমার ফ্রেন্ড রা তো সবাই বলতেছে আমার সাথে নাকি ওঁকে অনেক ভালো মানায়? তোমার কী মনে হয়? ”
এইবার আর রিপ্লাই না করে পারলো না আনিকা। মোবাইলের মধ্যে নিজের সব জেদ প্রকাশ করতে করতে রিপ্লাই করলো,
“ বান্দরের লেজের মতো চেহারা, কাকের ঠোঁটের মতো ঠোঁট, ইঁদুরের চোখের মতো চোখ, হাতির নাকের মতো নাক, ভারী মিষ্টি মেয়ে। আপনার মতো লঙ্কার বান্দর এর সাথে এই মেয়েই মানায়। নেহাত আমিই ভূল ধারনা পোষে রেখেছিলাম। ”
আবারও লিখলো,
“ উগান্ডা লোক কোথাকার আমাকে আর মেসেজ করলে খুন করবো আপনাকে! ”
সাথে সাথেই ওপাশ থেকে ডিরেক্ট কল দিয়ে বসলো সাদিক। কলটা খট করে কেটে দিতে ইচ্ছে হলেও সেটা না করে ফোনটা ধরলো সে। কন্ঠে সব ঝাঁজ মিশিয়ে বললো,
“ কী সমস্যা, কল দিলেন কেন? ”
“ ওমা, তুমিই তো বললে যেন মেসেজ না দেই তাই কল দিলাম। আমি আবার খুবই দায়িত্ববান পুরুষ। যে যা বলে তাই শুনি। ”
“ আপনি কিন্তু আমায় রাগাচ্ছেন! ”
“ তুমি বুঝি এতক্ষণ স্বাভাবিক ছিলে? ”
রাগ তরতর করে বাড়ছে আনিকার। রাগের চোটে কথাই বলতে ইচ্ছে করছে না তার।
“ আচ্ছা যাই হোক এখন আমি ক্লাসে যাচ্ছি আমার ফেভারিট স্টুডেন্ট এর ক্লাসে, পরে কথা হচ্ছে।”
বলেই ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো সাদিক। সাথে সাথেই ওপাশ থেকে ভেসে আসলো রাগান্বিত স্বর,
“আপনি একটা… ”
“ আমি একটা…? ”
“ আপনি একটা বান্দর। ”
“ আপনি একটা বান্দন্নী। ”
“ আপনি একটা উগান্ডার লোক! ”
“ আপনি একটা পাবনার মহিলা! ”
“ ধেৎ…”
“ অসহ্য লোক। ”
আনিকার মুখের কথাটা কেড়ে নিয়ে বললো সাদিক।তারা জানা আছে এখন আনিকা এটাই বলবে। তার কাণ্ডে না চাইতেও হেসে ফেললো আনিকা। হাসলো সাদিক ও। বললো,
“ আচ্ছা আল্লাহ হাফেজ, পরে কথা হচ্ছে। ”
“ আল্লাহ হাফেজ। ”
বলেই কল কাটলো আনিকা।
তারপর ফুরফুরে মন নিয়ে কল দিলো তার প্রাণপ্রিয় বান্ধবী তাপসিকে। একবার রিং হতেই কল রিসিভ করলো তাপসি। প্রাণখুলা হাসি উপহার দিয়ে বললো,
“ কীরে বাঁইচা আছিস তুই? ”
“ পল্টিবাজ মেয়ে, তোরে কল দিলে পাওয়া যায় না। আর আমার সাথে পল্টি নেও? ”
“ আরে নানু বাড়িতে আছি। তাই ফোনের কাছে থাকি না তেমন। আর একটা কথা জানিস আমার মামাতো ভাই যে সুন্দর রে… , আমিতো পুরো ক্রাশ খেয়ে গেছি। ”
“ তুই কী সত্যিই নিরব ভাইয়াকে ভূলে গেছস? ”
“ আরে ধুর… তুই এখনো উনাকে নিয়েই পইড়া রইছোস। আমি তো বললাম সবার মতো উনি ও আমার ক্রাশ ছিলো মাত্র। আর আমি যখন শুনছি উনি তোর ভাই তখনই আমার ক্রাশ ফ্রাস সব উইড়া গেছে। বান্ধবীর ভাইয়ার সাথে প্রেম! ছেহ…তোর আপন ভাই হইলে একটা কথা ছিলো।
“ ফাজিল ছেমরি! তাইলে প্রথমে এমন দেবদাস হইয়া থাকতি কেন? ”
“ ঐটা আবেগ ছিলো। এখন এসব নাই। আচ্ছা আম্মু ডাকতাছে এখন যাই। ”
বলেই কল কেটে দিলো তাপসি। গলায় আটকে থাকা কান্না টা বেরিয়ে আসলো নিমিষেই। মনে ভেসে উঠলো সেদিন রাতের কথোপথন,
রাত তখন ১০ টা কী এগারোটা, আনিকার বকাঝকায় সেদিন রাতে হঠাৎ তাপসির ফোনে কল এলো নিরবের। কাঙ্ক্ষিত মানুষের থেকে কল আসায় তা রিসিভ করতেও হাত কাঁপছিল মেয়েটার। কাঁপা কাঁপা হাতেই কল রিসিভ করে সালাম দিলো সে। সালামের উত্তর দিল নিরব। তারপর বললো,
“ তোমার নাম কী? ”
“ তাহরিমা খান তাপসি। ”
“ সুন্দর নাম। আমি নাজদিদ সরকার নিরব। আনিকার খালাতো ভাই। ”
চমকে উঠল তাপসি। অবাক মিশ্রিত কন্ঠে বললো,
“ কার ভাই! ”
“ আনিকার খালাতো ভাই। আজকেই আনিকা আমাকে কল করেছিলো আর সেখান থেকেই জানতে পারলাম তুমি নাকি ওঁর ফ্রেন্ড। এখন আমি তোমাকে কিছু কথা বলবো সেগুলো মন দিয়ে শুনো। ”
“ হুঁ বলুন। ”
“ ঐ দিন আসলে সম্পূর্ণ অচেনা ভাবেই তোমাকে ভয়েস টা পাঠিয়েছিলাম। খেলার মাঝে আমার বন্ধুরা আমাকে ডেয়ার দিয়েছিলো আমি প্রথমে নিষেধ করেছিলাম তবে ওঁরা বললো আমি নাকি মেয়েদের সাথে কথা বলতে ভয় পাই এন্ড আমার ভয়েস শুনে নাকি মেয়েরা বমি করে দিবে- সেই ভয়ে আমি ভয়েস দিতে ভয় পাচ্ছি। ওদের কথা শুনে আমার জেদ হয়েছিলো তাই আমি ওদের ডেয়ার এ সম্মতি দেই। তারপর প্রথমে একটা অচেনা নাম্বারে এড হই, সৌভাগ্য বসত ঐ টা ছেলে ছিলো। দ্বিতীয় বারেও ছেলে হয়। তৃতীয় বারে ছেলে হলে ডেয়ার ক্যানসেল হওয়ার কথা ছিল তবে দুর্ভাগ্য বসত তৃতীয়বার আবোলতাবোল নাম্বার চাপলাম আর তোমার সাথে এড হয়ে গেলাম। তখন এতো কিছু না ভেবেই মজা আর জেদের বশে ঐ ভয়েস টা দিয়েছিলাম আমি। ভাবিনি সেটা তোমার উপর কেমন ইফেক্ট পড়বে। আমাকে ক্ষমা করে দিও প্লিজ তোমাকে হার্ট করার কোনো ইন্টেনশন আমার ছিলো না তাপসি। ”
প্রিয় মানুষটার মুখে নিজের নাম টা শুনতে পেয়েই যেনো স্তব্ধ হয়ে গেলো তাপসি। নিজের নামটা কারো কন্ঠে এতোটা মধুর শুনায় তা জানা ছিলো না তার। তার ভাবনার মাঝেই নিরব আবারও বলতে লাগলো,
“ আর হ্যাঁ আরেকটা সত্য আজ তোমায় বলি। যেটা আনিকা ও জানে না। তবে খুব শীঘ্রই জানবে। আমি আনিকাকে ভালোবাসি, প্রধান কথা ওঁকেই বউ বানতে চাই। আমার পরিবার এবং আনিকাদের পরিবার সবাই জানে বিষয়টা শুধু আনিকা ছাড়া। আনিকার এইচএসসি পরীক্ষার পর আমাদের পরিবার যাবে বিয়ের কথা বলতে। আল্লাহ চাইলে তখনই আমাদের বিয়ে হবে। কিন্তু….”
এখানেই তাকে থামিয়ে দিলো তাপসি। বললো,
“ আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আনিকার দিকটা দেখে নিবো। আপনার ভালোবাসার অপূর্ণতার দায়ের আসামী হবো না আমি। আমি বুঝতে পেরেছি বিষয়টা এখানে আপনার কোনো দোষ নেই। ”
অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৩৭+৩৮
“ থ্যাঙ্ক ইউ তাপসি। ব্যাপারটা বুঝার জন্য। ”
“ ওয়েলকাম ভাইয়া। ভালো থাকবেন। ”
এখানেই শেষ হয়েছিলো তাদের কথোপকথন। অথচ আনিকার কাছে সে কতকিছু বানিয়ে বলেছিল। ভাবতে ভাবতেই চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি নির্গত হলো তার। দেয়ালের দিক তাকিয়ে ভাঙা গলায় বললো,
“ আমার এই রিক্ততায় পরিপুর্ণ জীবনে
তার আগমন ছিলো নিছক এক মরিচীকার মতো…! ”
