Home অকস্মাৎ প্রণয় অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৪৭+৪৮

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৪৭+৪৮

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৪৭+৪৮
সিনথিয়া ইসলাম সীমা

সোফায় মুখোমুখি অবস্থায় বসে আছে আনিকা ও সাদিকের পরিবার। সেই কখন থেকেই তাদের মাঝে কথা হচ্ছে আনিকা ও সাদিকের বিয়ের ব্যাপারে। গতকাল রাতে সাদিকের কথা মতো হীরা তার শাশুড়ি মাকে জানিয়েছিল তার পরিবারের আসার কথা। সাথে এটাও বলেছে আনিকা যেই ছেলেকে ভালোবাসে সেটা আর কেউ নয় তার নিজেরই ভাই, যা সেদিন রাতেই জানতে পেরেছে হীরা। ভদ্রমহিলা প্রথমে টাস্কি খেয়ে গিয়েছিলেন তারপর যখন জানলেন সাদিক আনিকার কলেজের শিক্ষক ছিলো তখন এ নিয়ে আর কথা বাড়াননি তিনি।

খুশিমনেই তাদের অ্যাপায়ন এর ব্যাবস্থা করেছেন। হীরাও সব কিছু ভুলে নিজের পরিবারকে দেখার খুশিতে আত্মহারা। এতক্ষন নিচেই ছিলো মেয়েটা, মা- বাবাকে দেখতেই এক চোট কান্না- কাটির পর্ব চুকিয়েও ফেলেছে। মিনিট খানেক হবে আনিকার রুমে গেছে সে। কথার প্রথমেই সাদিক সকলের উদ্দেশ্যে অনুতপ্ত হয়ে জানিয়েছে, “ এতদিন তার একটা ভূল বুঝাবুঝির কারণেই এসব হয়েছে যার জন্য সে খুবই দুঃখিত।” ক্ষমাও চেয়েছে সবার নিকট, বাদ পড়েনি অনিলের কাছেও। অনিল প্রথম থেকেই নীরব দর্শক। সে শুধু হীরার আব্বু- আম্মুর সাথে টুকটাক কথা বলেছে। তারপর থেকে সকলের কথা শুনে যাচ্ছে, কিছু বলার প্রয়োজন বোধ করছে না । সবাই মিলে আজকেই ঘরোয়া ভাবে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এত কিছুর পর আর কেউই আনুষ্ঠানিক বিয়ের চিন্তা মাথায় আনে নি। এখন শুধু আনিকার অভিমতের অপেক্ষা। সে যা চায় তাই হবে।

আরও গল্প পড়তে আমাদের গ্রুপে জয়েন করুন

বিছানায় স্ট্যাচুর মতো বসে আছে আনিকা। আর হীরা তার সামনে বসে বসে তাকে একবার সাদিকের সাথে কথা বলার অনুনয় করছে। অথচ আনিকার এক কথা সে সাদিকের সামনেও যাবে না। আনিকার কাটকাট নিষেধাজ্ঞায় মুখে ব্যার্থতার ছাপ ফুটে উঠলো হীরার। গতকাল রাতের কথা এখনো আনিকাকে বলেনি সে। সাদিক কিছু বলতে নিষেধ করেছে তাকে শুধু বলেছে আনিকাকে রাজি করিয়ে ছাদে নিয়ে আসতে বাকিটা সে নিজেই দেখে নিবে। পারিবারিক ভাবেই তাদেরকে একা কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ছাদে অপেক্ষা করছে সাদিক, এইদিকে আনিকা খাট থেকে নড়ছেই না। না পেরে এবার সাদিককে মেসেজ করল হীরা,

“ ভাইয়া আপু আসছে না। ”
সাথে সাথেই ওপাশ থেকে সাদিক রিপ্লাই করল,
“ ওকে আমিই আসছি। ”
বলেই বড়ো বড়ো পা ফেলে ছাদ থেকে নেমে এলো সে। গিয়ে থামল একেবারে আনিকার রুমের সামনে। ড্রয়িং রুমের এক সাইডে সোফায় বসে থাকা কারোরি উপরের দিকে নজর নেই। তারা নিজেদের কথায় ব্যাস্ত। গলা ঝেড়ে রুমের ভেতরে ঢুকলো সাদিক। ভাইকে দেখতে পেয়ে রুম থেকে বেরিয়ে পরল হীরা। দরজা খোলা রেখেই আনিকার সামনে এগিয়ে গেলো সাদিক। বিছানার এক পাশে দাঁড়িয়ে অপর পাশে মাথা নিচু করে বসে থাকা আনিকার উদ্দেশ্যে বলল,

“ আজকাল দেখছি আমাকে দেখে পাবনার মহিলারা ও লজ্জা পায়। ”
সাদিকের এমন খোঁচা মারা কথায় কোনোরূপ প্রতিত্তর করল না আনিকা। পা নামিয়ে হাঁটা ধরলেই সাদিক পিছন থেকে বলল,
“ বিয়ের আগে ছুঁতে ইচ্ছুক নই আমি, এখান থেকে এক পা নড়লে সিদ্ধান্ত বদলাতে সময় লাগবে না। ”
“ মরে গেলেও আপনার মতো প্রতারককে বিয়ে করবো না আমি। ”
হুংকার ছুঁড়ে বলল আনিকা। তাতে বিন্দু মাত্রও পাত্তা দিলো না সাদিক। বলল,

“ তুমি বিয়ে করবে সাথে তোমার ভাইয়ের বোনও করবে। ”
কটমট করে তাকালো আনিকা। পরপর আবারও রুম ছাড়তে নিতেই সাদিক বলল,
“ ভালোবাসি মিস. ইরাবতী। অনিলের শত্রু হয়ে নয় তোমার সেই উগান্ডার পুরুষ হয়ে ভালোবাসি। রাস্তার সেই অপরিচিত পুরুষ হয়ে ভালোবাসি। ”
না চাইতেও পা যুগল থেমে গেলো আনিকার। এই প্রথম সাদিক তাকে ভালোবাসার কথা সরাসরি বলল। আগে বললেও “ ভালোবাসি” শব্দটা ব্যবহার করে কখনোই বলেনি। প্রিয় পুরুষের মুখের ভালোবাসি শব্দের মধ্যে বুঝি এতোই শক্তি? যা নারীর সকল জেদকেও হার মানিয়ে দেয়!

“ সব কিছুর জন্য আই অ্যাম এক্সট্রিমলি স্যরি। তবে হ্যাঁ সব মিথ্যার ভিড়েও তোমার প্রতি আমার ভালোবাসা সত্যি ছিলো। তুমি অনিলের বোন সেটা জানার আগেই তোমাকে আমার ভালো লেগেছিলো। সবশেষে এটাই বলবো, জানি এতো সহজে ক্ষমা করার মতো ভূল আমি করিনি তাই বলছি আমার বউ হয়ে যাও আর সারাজীবন ধরে এই ভূলের শাস্তি দাও! ”
আনিকা স্তব্ধ, মুখে রা নেই তার। তবে এইবার চোখ তোলে তাকালো সাদিকের দিক। চোখে চোখ মিললো দুজনের। আদান প্রদানে হলো সকল অভিযোগ, অভিমান। আনিকার নিস্তব্ধতা দেখে তার দিক কিছুটা এগিয়ে এলো সাদিক। নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়িয়ে বলল,
“ আজকে এই অধমের নামে তিন কবুল বলে দিও, কথা দিচ্ছি এদেহে প্রাণ থাকতে দ্বিতীয়বার অভিযোগের সুযোগ দেবো না। ”
বলেই আনিকাকে পাশ কাটিয়ে নিঃশব্দে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো সাদিক। তার যাওযার পানে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আনিকা। এভাবে বলার পরেও কী নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারবে সে?

বেলা গড়িয়েছে বেশ, কিছুক্ষনের মধ্যেই আসরের আযান পড়বে মসজিদের মাইকে। সোফার এক পাশে সব মেয়েদের মাঝে বিয়ের শাড়ি পরে বসে আছে আনিকা। তার সামনেই শার্ট প্যান্ট পরে থুতনিতে হাত দিয়ে বসে আছে সাদিক। হয়তো অপেক্ষা করছে সামনে থাকা রমনিটির মুখে কাঙ্ক্ষিত শব্দটি শুনার। হাত, পা কাঁপছে আনিকার সাথে বুক ধড়ফড় করছে ক্ষণে ক্ষণে। সকলে তাকে আশ্বাস দিয়ে যাচ্ছে অনবরত। এক পর্যায়ে কাঁপা গলায় চারপাশে ধ্বনিত হলো একটি পবিত্র শব্দ,

“ কবুল ”
বলতে বলতেই মেয়েটার চোখ থেকে গড়িয়ে পরল দুফোঁটা অশ্রুকণা। বুক থেকে যেনো পাথর নামল সাদিকের। বড়ো করে শ্বাস টেনে নিলো সে। আনিকা তিনবার কবুল বলার পর কাজী সাহেব প্রয়োজনীয় কথা বার্তা সেরে সাদিকের উদ্দেশ্যে কবুল বলতে বললে, সাদিক আনিকার দিক তাকিয়ে এক দমে বলে দিলো,
“ আলহামদুলিল্লাহ কবুল, আলহামদুলিল্লাহ কবুল, আলহামদুলিল্লাহ কবুল ”
সকলে একসাথে সমস্বরে বলে উঠলো “ আলহামদুলিল্লাহ্ ”। বিয়ে সম্পন্ন হতেই আনিকাকে নিয়ে রুমে চলে গেলো হীরা। আনিকার পড়নে একটা কাজকরা সিম্পল বেনারসি শাড়ি। আনিকার মতামত জেনে অনিল যখন কাজী আনতে গিয়েছিলো তখন তার সাথে গিয়েই এই শাড়িটা এনেছে সাদিক।

“ এইযে বেয়াই সাব, ভাব নিয়েন না। এতো সুন্দর বেয়াইন থাকতেও দেইখাও দেখেন না। ”
বাইরে এখন খাওয়ার পর্ব চলছে। কিছুক্ষন পরেই আনিকার বিদায় হবে। মাত্র রুমে এসে ল্যাপটপ হাতে নিয়ে বসেছিলো অনিল। এর মাঝেই নিজের শাড়ির আঁচলটা হাওয়ায় ঘুরাতে ঘুরাতে এমন অদ্ভুত গান গেয়ে রুমে প্রবেশ করলো হীরা। চোখ ছোটো ছোটো করে তাকে পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার দেখলো অনিল। তারপর আবারও নিজের কাজে মন দিলো। অনিলের মনোযোগ না পেয়ে মুখটা চুপসে গেল হীরার। আজ দুটো দিন তার সাথে ঠিক করে একটু কথাও বলেনি এই লোক! এখনো দেখো কী ভাব দেখাচ্ছে! সে কী কম যায়? নেহাত এতদিন বাপের বাড়িটা লোডিং এ ছিলো। এইবার একেবারে ক্লিয়ার রাস্তা তার। আজকেই চলে যাবে সে, হুঁ! নিজের লাগেজ টা নামালো। তারপর ড্রয়ার থেকে নিজের কাপড়গুলো বের করতে করতে দুঃখী দুঃখী ভাব করে বলল,

“ হ্যাঁ রে ড্রয়ার, তুই মনে হয় আমাকে বড্ডো মিস করবি তাই নাহ? জানিনা আর কবে এসে তোকে ছুঁবো। কী করবো বল? আমার বাবার বাড়ির ড্রয়ার টাও হয়তো আমায় মিস করছে তাই এবার তার সাথেও একটু দেখা করে আসি। ”
ঘাড় ঘুরিয়ে নিজে নিজে বকবক করতে থাকা হীরার দিক এবার সরাসরি তাকালো অনিল। হীরাকে লাগেজের মধ্যে কাপড় পুরতে দেখে কপাল কুঁচকে গেলো তার। সাথে সাথে জিজ্ঞেস করল,
“ কোথায় যাচ্ছো তুমি? ”

ঈশ, এখন জিজ্ঞেস করতে এসেছে, কোথায় যাচ্ছে? এতক্ষন তাকে এক টুকরাও পাত্তা দেয়নি এখন সেও দেবে না। চুপচাপ নিজের কাজ করতে লাগল হীরা। অনিলকে জ্বালাতে আবারও নিজে নিজেই বলতে লাগল,
“ জানিস দেয়াল, আমার না বেয়াইয়ের সাথে প্রেম করার অনেক ইচ্ছে ছিলো। কিন্তু দেখ কী হলো! আমার কপালে রসকষহীন এক বুড়ো বেয়াই জুটলো। সবই আমার ফুটো কপাল! ”
হীরার এমন তেছরা কথায় অনিলের উপর তেমন প্রভাব পরল কী না বুঝতে পারল না হীরা। সে থুতনিতে হাত রেখে, দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে রেখেছে। আর কেমন করে যেনো হীরার দিক তাকিয়ে আছে! তার এমন চাহনি দেখে জ্বালানোর সব চিন্তা নিমিষেই গায়েব হয়ে গেলো হীরার। আর কিছু বলল না সে, ব্যাস্ত হাতে কাপড় ভাঁজ করতে শুরু করল।

“ পিপীলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে,
রুগীদের শিক্ষা হয় ইন্জেকশানের পরে! ”
আকস্মিক অনিলের মুখ থেকে এমন ভয়ংকর ছড়া শুনে কাপড়গুলো হাত থেকে পরে গেলো বেচারি হীরার। মস্তিষ্ক জানান দিলো, ” এখানে বেশিক্ষণ থাকা মোটেও কল্যাণজনক নয়। যত তাড়াতাড়ি এখান থেকে বিদায় হওয়া যায় ততই ভালো। ” তড়িঘড়ি করে বাকি কাপড়গুলো এলেমেলো করেই লাগেজে ঢুকিয়ে নিল হীরা। পরপর দ্রুত পায়ে রুম ত্যাগ করতে নিবে তার আগেই অনিলের শক্ত হাতের বাঁধনে আটকা পড়ল তার চিকন লাঠির মতো হাত টা। যদিও এতটাও চিকন নয় সে তবে অনিলের হাতের কাছে তেমনটাই মনে হচ্ছে তার। ঢোক গিললো মেয়েটা।

“ কোথায় যাবে তুমি? ”
“ আমাদের বাড়িতে। ”
ফটাফট উত্তর করল হীরা। ভিতরে ভিতরে ভয় পেলেও উপরে নিজেকে স্বাভাবিক দেখানোর চেষ্টা চালাচ্ছে সে। তবে তা কতক্ষণ টিকবে এটাই চিন্তার বিষয়।
“ কার থেকে পারমিশন নিয়েছ ? ”
“ আম্মুর থেকে। ”
আম্মু বলতে অনিলের আম্মুকে বুঝিয়েছে সে। তা বুঝতে অসুবিধা হলো না অনিলের। কারণ হীরা তার নিজের আম্মুকে “ মা ” বলে ডাকে।

“ হুম বুঝলাম, ভূল জায়গা থেকে অনুমতি নেয়ার জন্য আগে শাস্তি স্বরূপ আসল অনুমতি দাতার থেকে ইচ্ছেমতো ইঞ্জেকশান খেতে হবে আপনার। তারপর যেখানে যাবেন যেতে পারেন। ”
সে চলে যাবে এতে কোনো জায় আসে না এই লোকের! ইঞ্জেকশান নিলে যেখানে খুশি সেখানে যেতে পারবে সে? এবার বেশ রাগ হলো হীরার। বলল,
“ দিন আপনার যতো ইচ্ছে দিতে পারেন। ”
ভ্রু জোড়া উচুঁ হয়ে গেলো অনিলের। কিছুক্ষন হীরার নত করে রাখা মুখপানে চেয়ে, তার কোমড় খানিকটা উঁচিয়ে তাকে নিজের মুখোমুখি করল অনিল। হাত দিয়ে নাকে টুকা মেরে বললো,

“ গুড গার্ল। ”
এবার রাগে, দুঃখে শব্দহীন কেঁদেই দিলো হীরা। অনিলকে ধাক্কা মেরে বলল,
“ ছাড়ুন বলছি আমায়। আপনি এখন এক টুকুও ভালোবাসেন না আমায়। সময়ের সাথে সাথে আমার প্রতি ভালোবাসাও ফুরিয়ে…”
কথা সম্পূর্ণ করতে পারল না সে। এর আগেই এক জোড়া তপ্ত ঠোঁটে বন্ধ করে দিলো তার জবান। ছাড়া পাওয়ার জন্য মুচড় মুচড়ি শুরু করে দিলো মেয়েটা। তাতে অনিল আরও শক্ত করে চেপে ধরলো তাকে। অনিলের সাথে না পেরে থেমে গেল হীরা, শান্ত হয়ে অশ্রু বিসর্জন দিলো পুরোটা সময়। এক পর্যায়ে তাকে ছেড়ে দিলো অনিল। হীরার কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে বলল,
“ তুমি আমার এক দেখায় তৈরি হওয়া কোনো মোহমায়া নও- যা সময়ের সাথে ফুরিয়ে যায়,
তুমি আমার দীর্ঘদিনের পরিণামে গড়ে উঠা সেই অবিচ্ছেদ্য প্রেম যার অন্তরালে মিশে আছে আমার পুরো সত্ত্বা। ”

“ তুমি আমার এক দেখায় তৈরি হওয়া কোনো মোহমায়া নও- যা সময়ের সাথে ফুরিয়ে যাবে,
তুমি আমার দীর্ঘদিনের পরিণামে গড়ে উঠা সেই অবিচ্ছেদ্য প্রেম যার অন্তরালে মিশে আছে আমার পুরো সত্ত্বা। ”
হৃদয়স্পর্শী প্রত্যেকটা শব্দের ভিতরে ঠিক কতোটা জাদু ছিলো জানা নেই হীরার। তবে শব্দগুলো কর্ণপাত হতেই চোখ দিয়ে অশ্রুগরা আপনা আপনিই বন্ধ হয়ে গেলো তার। নাক টেনে শ্বাস নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে বলল,
“ চলুন আমাদের বাড়িতে যাই? ”
“ এখন না কিছুদিন পরে যাবো। ”
“ আজকে যাওয়া যায় না? ”
“ গত দুদিন ধরে হসপিটাল যাওয়া হয় না। এখন যাওয়া যাবে না। কিছুদিন পর সময় ম্যানেজ করে যাবো। ”
“ আচ্ছা। ”

আর কথা বাড়াল না হীরা। অনিলের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে হাঁটা দিলো আনিকার রুমের উদ্দেশ্যে। একটু পরেই আনিকার বিদায় হবে তাই অনিলও আর বাধা দিলো না তাকে।
নিচে খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ এখন বিশ্রাম করছে সবাই। এই ফাঁকেই আনিকার রুমে আসলেন নাজিয়া বেগম। এগোলেন ছোটো থেকে বড়ো করা তার রাজকন্যাটার নিকট। আজ তার ঘরটা খালি করে চলে যাবে ছোটো থেকে পেলেপুষে বড়ো করা মেয়েটা- ভাবতেই বুকটা খালি খালি লাগছে তার। হাজার চেষ্টা করেও চোখের পানিদের আটকাতে পারছেন না তিনি। আনিকা কে জড়িয়ে ধরে হো হো করে কেঁদে উঠলেন, মায়ের কান্না দেখে এতক্ষনের আটকে রাখা কান্না টা দলাচাপা দিয়ে বেরিয়ে এলো আনিকার। শব্দ করে কেঁদে দিলো সেও।

হোক না ভালোবাসার মানুষের সাথে বিয়ে, মা- বাবাকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট কী আর কমানো যায়? সে তো পারছে না! একটু পর তাকে নিজের বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হবে- ভাবলেই বুক ভেঙে কান্না পাচ্ছে তার। মা- মেয়ের এমন বুক ভাঙা কান্নায় শিক্ত হয়ে উঠলো ঘরে থাকা প্রত্যেকটি সদস্যদের চোখ। তখনই রুমে প্রবেশ করলেন হীরার মা হাজেরা বেগম। তিনি এগিয়ে এসে আশ্বাস দিলেন নাজিয়া বেগমের উদ্দেশ্যে। তবে পরিবেশ তেমন একটা শান্ত করতে সক্ষম হলেন না। এক পর্যায়ে সবাই মিলে আনিকাকে ধরে নিচে নামিয়ে আনলো। তখনো নিঃশব্দে কেঁদে যাচ্ছে মেয়েটা।

গাড়ির নিকট এসে কান্নার বেগ আরও বৃদ্ধি পেল তার। আসিফ এহসান, বিল্লান এহসান ও অনিল সবাই মিলেও আনিকাকে শান্ত করতে পারছে না। উল্টো সকলকে কাঁদিয়ে ছাড়ছে মেয়েটা। এবার বাধ্য হয়ে এগিয়ে এলো সাদিক। এতক্ষন সে শুধু অসহায় চোখে তার সদ্য বিবাহিত বউয়ের কান্না দেখেছে। সারাক্ষন বকবক করে অন্যকে জ্বালিয়ে দেওয়া মেয়েটা যে এতটা কাঁদতে জানে তা ঘুণাক্ষরেও ভাবে নি সে। আনিকার কাঁধের উপর হাত রেখে নিজের পুরুষালী হাতের আয়ত্তে নিলো তার শরীরটা কে। আনিকার এসবে খেয়াল নেই সে কেঁদে যাচ্ছে অনবরত।

“ প্লিজ কান্না থামাও গো বউ, তোমার স্বামীর যে বুক পোড়ছে! ”
সাদিকের কন্ঠে যেনো সম্বিৎ ফিরলো আনিকার। সাদিকের মুখে “বউ” ডাক শুনে স্তব্ধ হয়ে গেলো মেয়েটা। মন গহীনে তৈরি হওয়া অনুভূতির কবলে পড়ে কান্না কমে আসল মুহূর্তেই। আনিকাকে শান্ত হতে দেখে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেললো সে। আনিকাকে গাড়িতে বসিয়ে সবার থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে উঠে পড়ল সেও। অতঃপর রওনা হলো কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।

“ তুই বিয়ে করবি কিনা ঐটার উত্তর দে আমায়। ”
কানের কাছে সেই কখন থেকে মায়ের বকবক শুনতে শুনতে বিরক্তিতে হাতে থাকা সিগারেটটা ছুঁড়ে ফেললো নিরব। শক্ত গলায় বলল,
“ তুমি কী পাগল হইয়া গেলা আম্মু! এক কথা বারবার বলে কান জ্বালাফালা করে দিচ্ছ আমার! ঘরে আসাটাই ভূল হইছে আমার। ”
বলেই বারান্দা থেকে ধুপধাপ পা ফেলে বেরিয়ে এলো নিরব। খাট থেকে জ্যাকেট টা হাতে নিয়ে রুম ত্যাগ করল। সাহেরা বেগমের চোখ ভিজে উঠল ছেলের কাণ্ডে। তিনি আঁচলে মুখ গুঁজে কাঁদতে কাঁদতে বললেন,

“ তোর কাছে আমার কোনো মূল্যই নাই। ছোটোবেলা থেকে যত্ন কইরা পাইল্যা ছেলে বড়ো করলাম আমি আর এহন সেই ছেলে একটা মাইয়ার লাইগা নিজেরে শেষ করতে উইঠা পইড়া লাগছে। তুই যা চাইছস তাই মানছি আমি। অথচ আমার কথার বিন্দুমাত্র দাম দেছনা তুই। থাক তোরা তগো মতো,, আমি মইরা গেলে তখন সুখে থাকিস। ”
তার জোর গলায় বলা প্রতিটা কথাই কানে পৌঁছালো নিরবের। তবে থামল না সে। গটগট পায়ে বাড়ি মূল ফটক অব্দি আসতেই সামনে পরল তার বাবা নাসির সরকার।

“ কোথায় যাচ্ছিস? ”
” বাইরে। ”
“ তোর সাথে কথা আছে আমার। ভিতরে চলো। ”
কী ব্যাপারে কথা বলবে তা ভালো করেই জানা আছে নিরবের। ভিতরে ভিতরে রাগে কটমট করলেও বাবার কথা অমান্য করল না সে। সোফায় গিয়ে বসলো বাবার সাথে।

“ আজ অব্দি কোনো সিদ্ধান্তই তোর উপর চাপিয়ে দেয়নি আমরা, সবসময় তুই যা চেয়েছিস তাই মেনে নিয়েছি। আজও দিবো না। শুধু এইটুকু বলবো, তোর মায়ের দিকটা একটু ভেবে দেখিস। তোর সাথে সাথে তোর মায়ের অবস্থাও কিন্তু বেগতিক হয়ে যাচ্ছে। আশা করি এই দুদিনে তোর চোখ এড়ায়নি সেটা। বিয়ে না করলে যে তুই আনিকাকে ভূলে যেতে পারবি তেমনটা কিন্তু নয়। বরং বিয়ের পর তুই অন্য একটা সম্পর্কে জড়িয়ে গেলে হয়তো তুই আনিকাকে ভুলতে পারবি না, তবে একটা সময় ওঁকে ছাড়া সেই সম্পর্কের মধ্যেই বাঁচতে শিখে যাবি। আর আমার বিশ্বাস আমার বন্ধুর মেয়ের সাথে তোর বিয়ে হলে ঐ মেয়ে ঠিক তোকে গুছিয়ে তুলতে পারবে। এখন সবকিছু তোর উপর নির্ভর করছে। তোর মায়ের দিক তাকিয়ে হলেও শেষ সিদ্ধান্ত টা নিস। ”
বলেই উঠে চলে গেলেন তিনি। পিছনে রেখে গেলেন চিন্তামগ্ন অবস্থায় বসে বসে থাকা নিরবকে।

ফুল দিয়ে সজ্জিত বিছনায় গুটিশুটি মেরে বসে আছে আনিকা। একটু আগে সাদিকের চাচাতো বোন তাকে এই রুমে এনে রেখে গেছে। পুরো রুম জুড়ে রাজত্ব চলছে বাহারি রকমের ফুলের মিষ্টি সুবাস। দেয়াল থেকে শুরু করে বিছানা অব্দি- সব জায়গায় ফুলের ছড়াছড়ি। এতো ফুল আর অনুভূতির ভীড়ে ক্ষণে ক্ষণে অসস্তির পাল্লা ভারী হচ্ছে মেয়েটার। বুকের ভিতর চলছে অবাধ্য হৃদয়ের বেসামাল স্পন্দন। দরজার বাইরে সাদিকের কন্ঠে তা আরও শতগুণ বেড়ে গেলো। সাদিকের চাচাতো ভাই বোনেরা দরজা আটকে দাঁড়িয়ে আছে। সাদিককে ভিতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছে না। এতো এতো জার্নির পর আর কথা বাড়াতে ইচ্ছে হলো সাদিকের সে তাদের চাহিদা মিটিয়ে দিয়ে রুমে প্রবেশ করল। রুমে সাদিকের উপস্থিতি টের পেতেই আড়ষ্ঠতায় নুইয়ে পরল আনিকা।

“ লজ্জা পাওয়ার দরকার নেই, সিনেমার নায়কদের মতো ঘুমটা তোলে মধুময় বাক্য বলতে যাচ্ছি না আমি। নামাজ পড়তে আসো। ”
সাদিকের এমন কটু কথায় লজ্জারা আনিকার আশপাশ থেকে এক লাফ দিয়ে পালিয়ে গেলো। ক্ষিপ্ত হয়ে দুহাতে ঘুমটা তোলে সাদিকের দিক তাকালো সে। তাকে চিরপরিচিত রুপে ফিরে আসতে দেখে ঠোঁট কামড়ে হাসল সাদিক। উল্টো হয়ে ওয়াশরুমে ঢুকতে থাকা সাদিকের হাসিটা দৃষ্টিগোচর হলো না আনিকার।

ওযু করে সাদিক ওয়াশরুম থেকে বেরোতেই ত্রস্ত পায়ে বিছানা ছেড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়লো আনিকা। অতঃপর দুজন মিলে নফল নামায আদায় করে নিলো। নামাজ শেষ করে বিছানায় এসে চুলের সব ক্লিপ খুলে চুলগুলো হাতখোঁপা করছিলো আনিকা। সহসাই তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে পরল সাদিক। হাতগুলো উপরে তোলার দরুণ শাড়িটা ও একটু সরে গেছে আনিকার পেট থেকে। যার দরুণ সাদিকের মুখ গিয়ে সরাসরি তার মেদহীন মসৃন উদরে ঠেকলো। পুরো শরীর কেঁপে উঠলো মেয়েটার। সাদিকের চুলের মধ্যে হাত চলে এলো আপনা আপনিই। তবে সাদিকের তখনকার কথাটা মনে পরতেই রাগী স্বরে বলল,

“ ছুঁবেন আমায়, দূরে সরুন। ”
বলতে বলতেই সাদিকের মাথা ঠেলে দিয়ে সরানোর চেষ্টা চালাতে লাগল সে।
“ ছুঁবেনা এ কথাটি বলিও না আর,
একবার না করিলে ছুঁব শত বার। ”
“ বাংলা সিনেমার মতো মধুময় বাক্য বলতে পারেন না অথচ বদমাইশ মার্কা কথা ঠিকই বলতে পারেন। বদমাইশ লোক। ”
আনিকার মুখ থেকে কথাটা পুরোপুরি বেরোতেও পারল না তার আগেই সাদিকের শক্তপুক্ত শরীরের নিচে চাপা পড়ে গেলো তার পুরো কায়া। হাত দুটো বন্দি হলো সাদিকের পুরুষালী আঙুলের ভাঁজে।

“ হুশশশ, নতুন বউদের এতো কথা বলতে নেই। ”
কানের কাছে ফিসফিস করে বলা সাদিকের কথাটা কর্ণপাত হতেই স্তব্ধ হয়ে গেলো আনিকা। গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো মেয়েটার। ঢোক গিলে কিছু বলতে নিবে এর আগেই সেই উপায় বন্ধ করে দিলো সাদিক। সবসময় নড়তে থাকা ঠোঁট যুগলে রাজত্ব চললো চিরপরিচিত সেই প্রিয় পুরুষের। কোনো এক অপরিচিত সুখময় দুনিয়ায় হারিয়ে গেলো তারা দুজন। রাত গভীরের সাথে সাথে সেই দুনিয়ার আরও গভীরে ডুবে দুজনের মাঝে মিশে গেলো দুজনে।

সকালের সূর্য রশ্মি মেঘমালাদের ভেদ করেছে কী করেনি তার আগেই জেগে উঠলো পুরো সরকার বাড়ি। এতো দিনের নিস্তব্ধ হয়ে থাকা বাড়িটা যেনো আজ মেতে উঠেছে সকাল সকাল। প্রতিদিনের তুলনায় আজ যেনো একটু বেশিই ব্যাস্ততা তাদের। কারণ আজকে এ বাড়ির বড়ো ছেলে নাজদিদ সরকার নিরবের বিয়ে। যদিও তা আনুষ্ঠানিক নয়- তবুও যেনো খুশির কমতি নেই। গতকাল রাতেই বিয়েতে সম্মতি দিয়েছে নিরব। সেটা নিয়ে রাত থেকেই মাতামাতি চলছে পুরো বাড়িময়। অথচ যার বিয়ে তার কোনো খুঁজ খবরই নেই। বিয়েতে সম্মতি দেওয়ার পর এখন অব্দি একবারও দেখা পাওয়া যায় নি তার।

মায়ের রুম থেকে এসে সেই যে দরজা বন্ধ করেছে সে, এরপর আর দরজা খুলে নি। রাতে খেতে পর্যন্ত আসে নি ছেলেটা। সাহেরা বেগমের এ নিয়ে মন খারাপ হলেও ছেলে বিয়েতে রাজি হওয়ার খুশিতে তা বেশিক্ষণ টিকলো না। তার বিশ্বাস তার ছেলের জন্য যে মেয়েকে তারা আনছেন সেই মেয়ে অবশ্যই তার এই ছন্নছাড়া ছেলেটাকে আবারও আগের মতো হাসিখুশি করে তুলতে পারবেন। গত কয়েক বছর ধরে অফিসে কর্মরত অবস্থায় এক লোকের সাথে বেশ ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে নাসির সরকার এর। লোকটার বাড়ি ঢাকায়। চাকরির সূত্রে লোকটা এখানেই বেশিরভাগ সময় থাকেন। একদিন তার মেয়ে এসেছিলো তার অফিসে আর সেদিনই মেয়েটিকে দেখেছেন নাসির সরকার।

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৪৫+৪৬

এর আগেও অনেকবার ভিডিও কলে দেখেছিলেন সেই মেয়েকে। মেয়েটা বাবার প্রতি এতটাই যত্নশীল যে, কাজের মধ্যেই চার পাঁচবার ফোন দিয়ে বাবার খবর নেয়। আর এসব দেখেই তার মনে ধরেছে মেয়েটাকে। স্বামীর থেকে সব শুনে সাহেরা বেগমও পাগল হয়ে গেছেন সেই মেয়ের জন্য। গতপরশু মেয়ের ছবি দেখার পর সেই পাগলামির মাত্রা আরও বেড়েছে। এবং শেষ মেষ ছেলেকে রাজি করিয়েই ছাড়লেন তিনি।

অকস্মাৎ প্রণয় পর্ব ৪৯