Home অনুভবে তুমি অনুভবে তুমি পর্ব ৫০

অনুভবে তুমি পর্ব ৫০

অনুভবে তুমি পর্ব ৫০
লিজা মনি

আজ ইয়ানার প্রেগনেন্সির নয় মাস চলে। আর সবচেয়ে খুশির খবর সুমুর আজ কনসিভের দুই মাস হতে চলল। চারদিকে দিকে শুধু খুশির আমেজ চলছে। আহান প্রতিটা সময় ইয়ানার পাশাপাশি থাকার চেষ্টা করেছে। আহানের পাগলামি দেখে বাড়ির সবাই শুধু মিটিমিটি হাসত। আহান কারোর জন্য এতটা চিন্তিত হয়ে কাজ করে না। ইয়ানার প্রথম মিসক্যারেজের পর থেকে আহান আর ও বেশি সতর্ক হয়ে পড়েছে। এই নয় মাসে আহান ইয়ানাকে বাহিরে বের হতে দেয় নি। মাঝে মাঝে ইয়ানার খারাপ লাগলে আহান নিজে ইয়ানাকে বাগানে নিয়ে যেত।

কিছু সময় প্রাকৃতিক হাওয়া খাইয়ে আবার রুমে নিয়ে চলে আসত। ইয়ানা হুট হাট রেগে গেলে ও আহান কোনো কিছু বলত না । যেকোন সময় ইয়ানা কোনো কিছু খাওয়ার আবদার করে বসত। আহান কোনো অভিযোগ ছাড়াই সব কিছু করত। কিন্তু আহানের কথার বাধ্য হলে রেগে যেত। ইয়ানা মেঝেতে পা রাখতে গেলে ও সেটা আহানের অনুমতি নিয়ে রাখতে হয়। ইয়ানা ওয়শরুমে যাওয়ার জন্য আহান নার্স রেখে দিয়েছে। ইয়ানাকে একা একা সিঁড়ি দিয়ে নামা পুরো নিষিদ্ধ। আহান অফিসে গেলে মিটিং চলাকালীন সময় ছাড়া সবসময় ইয়ানাকে ভিডিও কলে এটেন্ড রাখে।

আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন 

আজ আহান অনেক দেরীতে অফিসে গিয়েছে। যাওয়ার আগে ইয়ানাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়ে গিয়েছে। ইয়ানা শুয়ে সূরা ইয়াসিন পাঠ করছিলো এমন সময় ফোনের রিংটনের শব্দ কানে আসে। ইয়ানা বিরক্ত নিয়ে ফোনের স্ক্রিনে তাকালে আহানের নাম্বার ঝলঝল করে ভেসে উঠে। ইয়ানা প্রায় কান্না করার মত অবস্থা। মনে মনে বিরবির করে বলে,,,

“” আল্লাহ জীবনে কি কেউ প্রেগনেন্ট হই নি। আমি কি তোমার দুনিয়ার ফার্স্ট কনসিভ করেছি। এই লোকের পাগলামি দেখলে তো তাই মনে হচ্ছে। একটা নিশ্বাস ফেললে ও যেনো উনি আতঙ্কে আতকে উঠে। এখন তো আর ঝর্না নেই তাহলে এত চিন্তা কিসের। মা হতে চাইছিলাম কিন্তু আমাকে তো একদম বন্ধী বানিয়ে ফেলেছে। ওয়শরুমে যাওয়ার জন্য নার্স লাগে লাইক সিরিয়াসলি। আল্লাহ ওনার পাগলামি থেকে আমাকে রক্ষা কর ”
ইয়ানার ভাবনার জগত থেকে বেরিয়ে আসে আহানের ঘর কাঁপানো ফোনের শব্দে। ইয়ানা ভয়ে ভয়ে মোবাইলের দিকে তাকিয়ে বলে,,
“” ওহহ নো ভাবনার কারনে ফোন ধরতে দেরী হয়ে গিয়েছে। আজ মাইর নিশ্চিত””
ইয়ানা শুকনো ঢুক গিলে ভয়ে ভয়ে বলে,,,,
“” হ..হ্যালো।

ওইপাশ থেকে শুধু বড় বড় নিশ্বাস নেওয়ার শব্দ আসছিলো। আহান চোখ বন্ধ করে নিজের চুল আকড়ে ধরে রেখেছে। আহান ইয়ানার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলে,,,,
“” কোথায় ছিলে এতক্ষন? ”
আহানের চোখ দেখে ইয়ানা ভড়কে যায়। এই কিছু সময়ের মধ্যে লোকটার কি হলো?
ইয়ানা — শুয়ে ছিলাম।
আহান — তাহলে ফোন রিসিভ কর নি কেনো?
ইয়ানা — রিসিভ করতে দেরী হয়ে গিয়েছে।

আহান — মোবাইলের কাছে থাকা সত্তেও দশ মিনিট লাগে ফোন ধরতে।
ইয়ানা চোখ বড় বড় করে তাকায়। আল্লাহ কি ভাবনায় পড়ে গিয়েছিলো দশ মিনিট ধরে আহান ফোন দিচ্ছে।
ইয়ানা চোরের মত করে আহানের দিকে তাকায়। আহান এইবার রেগে ধমক দিয়ে বলে,,,,,
“” সত্যি করে বলো কোথায় ছিলে? তোমাকে আমি বলেছিলাম যেখানে যাও মোবাইলে যাতে ফোন দেওয়ার সাথে সাথে পাই। এই এই মেয়ে বলি নি?
ইয়ানা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়।
ইয়ানা — কিন্তু আমি কোথাও যায় নি এখানেই ছিলাম।
আহান আবার ও ইয়ানাকে ধমক দিয়ে বলে,,,,

“” চুপ ফাজিল। তুমি জানো কি অবস্থা হয়েছিলো আমার। ধারনা আছে তোমার? আবার এমন করলে থাপরিয়ে অজ্ঞান করব বিয়াদপ “”
ইয়ানা আহানের ধমক খেয়ে মৃদু সুরে বলে,,,
“” সরি আর এমন হবে না।””
আহান ইয়ানার মুখের দিকে তাকায়। এই মুখটার দিকে তাকালে সব রাগ নিশ্বেস হয়ে যায়। এই মেয়েটা আহানের কাছে কি আহান আজও অনুধাবন করতে পারে নি। আহান ইয়ানার চুপসে যাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় বলে,,,,,
“” আমি যে ফল গুলো রেখে এসেছিলাম খেয়েছো? ”
ইয়ানা আবার ও ভড়কে যায়। আল্লাহ আজ কি ওর ধমক খাওয়া দিবস।
ইয়ানা — হ্য. হ্যা খেয়েছি।
আহান কপাল কুচকে বলে,,,,
“” ফ্রুটের প্লেইট দেখি “””

আহানের কথা শুনে ইয়ানা মাথা নিচু করে ফেলে।
আহান — কি হলো দেখাও।
ইয়ানা — না দেখালে হয় না?
আহান মৃদু ধমক দিয়ে বলে,,,,
“” এখন সব ফ্রুট আমার সামনে বসে খাবে। ”
ইয়ানা *—- বিশ্বাস করুন আমি ছোট থেকে ফ্রুট খুব অপছন্দ করতাম। আম্মু আমাকে ধমকিয়ে ও খাওয়াতে পারত না। তাও আপনার ধমক খেয়ে খেয়েছি অনেক। আর খেতে পারব না এইবারের মত ছেড়ে দিন।
আহান ইয়ানার কথা এড়িয়ে গিয়ে বলে,,,,,
“” তুমি খাবে নাকি আমি এখন বাসায় আসব? আর আমি বাসায় আসলে শুধ এইগুলো না আর ও অনেক কিছু দিব ”

ইয়ানা আহানের আসার কথা শুনে মেকি হাসি দিয়ে বলে,,,
” না না আসার দরকার নেই আর কষ্ট করে। আমি খাচ্ছি।””
আহান ইয়ানার আড়ালে একটা মুচকি হাসি দেয়।
আহান — হুম কুইক।
ইয়ানার ডেলিবারি সময় চলে এসেছে। ফলে আহান ইয়ানার প্রতি আর ও সচেতন হয়ে পড়েছে। খাবার থেকে শুরু করে সব কিছু আহান ডাক্তারের পররামর্শ অনুযায়ী খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। আর ইয়ানা আহানের ধমক খেয়ে এক প্রকার নিরুপায় হয়ে খেতে হচ্ছে।
ইয়ানা এক এক প্রকার বাধ্য হয়ে সব ফ্রুট শেষ করে। খাওয়া শেষ করে ইয়ানা আহানের পানে তাকায়।
আহান ইয়ানার তাকানো দেখে হাসি দিয়ে বলে,,,

“” এইভাবে তাকিয়ে লাভ নেই মিসেস। ধমক দিয়েছি বলেই খেয়েছেন যদি আদর করে বলতাম তাহলে হাজারটা বাহানা খুজতেন। ডাক্তারের ঔষধের থেকে আমার ধমক আপনার উপর বেশি কাজ করে। এখন তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ুন। আমি নয়টার দিকে চলে আসব। আপনাকে নিয়ে একটু বাহিরে যাব।””
বাহিরে যাওয়ার কথা শুনে ইয়ানা কপাল কুচকে বলে,,,
“” কি বলেছেন? না মানে লাস্ট কথাটা শুনতে পাই নি। “”

আহান — শুনতে হবে না নিয়ে গেলে দেখতে পাবে। এখন চুপচাপ শুয়ে পড়বে। আর হ্যা ফোনটা প্রতিদিনিকার মত মিনি টেবিলের উপর রাখ। ওইখান থেকে তোমাকে স্পষ্ট দেখা যায়।
ইয়ানা আহানের কথা অনুযায়ী ফোনটা রেখে শুয়ে পড়ে। আহান ইয়ানার ঘুমন্ত মুখশ্রির দিকে তাকিয়ে কাজে মনযোগ দেয়। এক দিকে সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে অন্যদিকে ভিডিও কলে ইয়ানাকে দেখতে পাচ্ছে। আহান প্রতিটা মুহূর্তে ইয়ানাকে নিয়ে আতঙ্কে থাকে।

রুহান ছাদের রেলিং ধরে আকাশের দিকে এক পানে তাকিয়ে আছে। মানুষের অনুভুতি গুলো এমন কেনো? সব সময় ভুল জায়গায় ভুল মানুষদের উপর গিয়ে পড়ে।
রুহানে ভাবনার মাঝেই ফোনের শব্দ পায়। রিসিভ করে হ্যালো বলতেই,,,,
ওইপাশ থেকে — আমার ফোন রিসিভ করো না কেনো?
রুহান —- আহিয়া তুমি?
আহিয়া — হ্যা আমি।
রুহান —- কিন্তু এইটা কার নাম্বার?

আহিয়া — এইটা দাদুমনির বাটন ফোনের নাম্বার।আমার নাম্বার দিয়ে ফোন দিলে ফোন রিসিভ করেন না কেনো? জানেন কাল কতগুলো ফোন দিয়েছিলাম?
রুহান — কিন্তু আমাকে ফোন দিয়েছো কেনো তুমি?
আহিয়া —- জানেন না কেনো ফোন দিয়েছি?
রুহান —- দেখো আহিয়া তুমি বাচ্চা মানুষ। এই বয়সে সবার এমন একটু ভালো লাগা কাজ করে। আমার প্রতি ও তোমার ভালো লাগা কাজ করেছে।
আহিয়া ক্ষেপা কন্ঠে বলে,,,,

“” এই একদম বাচ্চা বলবেন না। আমি এখন কলেজে পড়ি। আর আমার অনুভুতির নাম ভালোলাগা নয় ভালোবাসা। বিগত চার মাস ধরে আপনার পিছন ঘুর ঘুর করছি আমাকে কি আপনার মানুষ মনে হয় না।””
রুহান মেকি হাসি দিয়ে বলে,,,,
“” মানুষ মনে হবে না কেনো? অবশ্যয় মানুষ মনে হয়। কিন্তু আমি তোমাকে ভালোবেসে আপন করতে পারব না। তুমি চৌধুরি ভিলার প্রান। অগ্নি চৌধুরীর জীবন তুমি আহিয়া। আর তিনি তার বোনকে এমন একজনের হাতে তুলে দিবেন যার শক্তি আছে ওনার সম পর্যায়ের। এমন কারোর কাছে না যে এখনো নিজের বাবার টাকায় চলাফেরা করে। হতে পারে আমাদের টাকা আছে কিন্তু তোমাদের মত এত আধিপত্য নেয়। আমার সাথে সম্পর্ক অগ্নি চৌধুরি কোনোদিন মানবে না। “”
আহিয়া কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বলে,,,,

“” এমন কেনো বলছেন। আমি দাদাভাইকে বুঝিয়ে বললে অবশ্যয় বুঝবে। আমি আজ পর্যন্ত যা চেয়েছি দাদাভাই কোনো কিছুতে মানা করে নি। এখন ও করবে না।
আহিয়ার কান্নামিশ্রিত কথা শুনে রুহানের বুকটা হাহাকার করে উঠে। এই মেয়ের কান্না যে সহ্য হচ্ছে না।
রুহান — সব চাওয়ার মাঝে পূর্নতা থাকে না। এই সন্ধ্যায় ছাদে না থেকে রুমে যাও।
আহিয়া কিছু বলার আগেই রুহান ফোন কেটে দেয়।
সে ওতো এই মেয়েকে প্রথম দেখায় নিজের মনে জায়গা দিয়েছিলো কিন্তু বাস্তবতা যে বড় কঠিন।
রুহানের কেটে দেওয়া ফোনের দিকে তাকিয়ে আহিয়া
রেগে দাতে দাত চেপে বলে,,,,
“” ভালোবাসি বলেছি বলে কি মাথায় উঠে গিয়েছিস। আমি ও দেখব কতদিন এড়িয়ে চলতে পারেন। আমি অগ্নি চৌধুরির বোন হয় ওনার থেকে কোনো অংশে কম না। আমি ও আর ভালোবাসি বলে আপনার কাছে ভিক্ষা করব না নিজে আসবেন আমার কাছে। এইটা আহিয়া চৌধুরি আপনাকে প্রতিজ্ঞা করলো মি, রুহান। এখন দেখবেন সেই ছোট আহিয়া কি কি করতে পারে।

সুমু রান্না করছে আর রায়ান তাকে হেল্প করছে। আর এইটা সেটা বলে খুচাচ্ছে। রায়ানের কাছে সুমুর রান্না একটা অভ্যাসে পরিনিত হয়েছে। নিজের বউয়ের হাতের রান্না ছাড়া অন্য কারোর হাতের রান্না খেয়ে পেট ভরে না। কিন্তু বউটা অসুস্থ তাই সে নিজে যতটুকু সময় পায় সুমুকে সাহায্য করে। সাথে জালানো তো ফ্রি আছেই। প্রায় অনেক্ষন পর রান্না শেষ করে সুমু টেবিলে খাবার পরিবেশন করে। রায়ান এক প্লেটে খাবার নিয়ে সুমুর মুখের দিকে ভাত তুলে ধরে। সুমু হাসি দিয়ে বলে,,,,
“” আপনি আগে খান সারাদিনে অফিস থেকে বাসায় এসেছেন। আগে নিজের যত্ন নিন মশাই।””
রায়ান মাথাটা নিচু করে সুমুর পেটে চুমু খেয়ে বলে,,,,
“” তোমাকে তো খেতে বলছি না আমি আমার পুচকু কে খেতে বলছি। তুমি শুধু হা করে থাকবে আর আমার সোনা সেই খাবার খাবে। “”

রায়ানের কথা শুনে সুমু হেসে উঠে। এরপর রায়ানের দিকে তাকিয়ে বলে,,,,
“” আচ্ছা। আমার কোনো দাম নেই। এখন সব পুচকেটার হয়ে গেলো?
রায়ান — বাচ্চার আম্মু সবার উর্ধ্বে এরপর সব কিছু। বাচ্চার আম্মু না থাকলে যে আমি রায়ান কখনো বাবা হতে পারতাম না। তাই এই বাচ্চার সাথে সাথে বাচ্চার আম্মুটা আমার জীবন।
রায়ানের কথা শুনে সুমুর চোখে পানি চলে আসে। রায়ান সুমুর দিকে তাকিয়ে হতাশ হয়ে বলে,,,,
“” হয়েছে আর কাঁদবেন না এখন আমাদের বাচ্চার কান্না করার সময় আপনার না।
সুমু ফিক করে হেসে উঠে। এরপর রায়ান সুমুকে খাইয়ে দিয়ে নিজে ও খেয়ে নেয়।
খাওয়া দাওয়ার শেষে এক পর্যায়ে রায়ান সুমুকে হুট করে পাজা কোলে নিয়ে নেয়।
সুমু রায়ানের দিকে কপাল কুচকে বলে,,,,

“” কি হয়েছে কোলে তুলেছেন কেনো নামান। “”
রায়ান সুমুর কোনো কথা না শুনে সুমুকে একদম নিয়ে বিছনায় নামিয়ে দেয়।
রায়ান সুমুর দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হাসি দিয়ে বলে,,,,
“” খুব শীত শীত লাগছে একটু প্রেমের আগুন লাগিয়ে দাও না বউ প্লিজ “”
সুমু রায়ানের কথা শুনে কটমট চোখে তাকায়। নির্লজ্জ গোয়েন্দা।
“” ওয়েট করুন দিয়াশলাই নিয়ে আসছি। পরে আগুন জালিয়ে যতখুশি শীত দুর করুন “”
রায়ান — মজা নিচ্ছো?
সুমু নিজের হাসি আটকিয়ে বলে,,,,,,
“” ওহুম একদম না। “”
রায়ান সুমুকে নিজের বক্ষে রেখে বলে,,,,
“” বেঁচে গেলে অসুস্থ বলে। নাহলে তোমার মজা করা আমি অন্যভাবে বন্ধ করতাম।

ইয়ানা ঘভীর ঘুমে বুদ হয়ে আছে। মুখের উপর ঠান্ডা পানি পরতেই ধরফরিয়ে উঠে। চোখে মেলে আহানকে দেখতে পেয়ে রেগে বলে,,,,
“” এই রাতে আপনি ঠান্ডা পানি ফেলেছেন কেনো আমার উপর?
আহান একটা ব্যাগ হাতে দিয়ে বলে,,,,
“” এইটা পড়ে তৈরি হয়ে নাও। “”
ইয়ানা ব্যাগটাকে হাতে নিয়ে কপাল কুচকে বলে,,,,
“” কি এইটার মধ্যে?
আহান —- খুলে দেখে নাও।
ইয়ানা বক্সটা খুলে হা করে তকিয়ে আছে। কি সুন্দর একটি ড্রেস।
ইয়ানা —- এইটা কি আমার জন্য?
আহান — অন্য জনের জন্য আনার কথা ছিলো? দশ মিনিটের মধ্যে রেডি হয়ে আসবে। আর হ্যা মুখে কিছু দিবে না। কাজল ও না। ন্যাচারাল লুকে দেখতে চাই তোমাকে।
ইয়ানা — এত রাতে এইটা কোথায় পেলেন?
আহান — কানাডা থেকে আজ দিয়ে গেলো সন্ধ্যায়। কাজের চাপে আসতে পারি নি।
ইয়ানা অবাক হয়ে বলে,,,,,

“” আপনি কানাডা থেকে ড্রেস আনিয়েছেন কেনো? বাংলাদেশে কি পোশাক কম আছে। “”
আহান —- তোমাকে এত কিছু ভাবতে কে বলেছে যাও তারাতারি রেডি হয়ে আসো।
ইয়ানা আহানের কথা মত ট্রায়াল রুমে গিয়ে ড্রেস টা পড়ে নেয়। লালের মধ্যে পিঙ্ক কালারের ছোট ছোট পাথর। ড্রেসটা পড়তেই পাথরগুলো চিক চিক করতে থাকে।পুরো ট্রায়াল রুম ইয়ানার সৌন্দর্যে মুখরিত। এই রুপ দেখে নির্ঘাত একজনের হৃদয় ক্ষতবিক্ষত হবে। ইয়ানা দরজা ঠেলে ট্রায়াল রুম থেকে বের হয়ে আসে। আহান সেই কাদম্বিনীর দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত মোহে মোহিত হয়ে পড়ে। এই মেয়ে অগ্নি চৌধুরির অর্ধাঙ্গীনি তো?
আহান ইয়ানার দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে তার সামনে আরেকটা বক্স নিয়ে দাঁড়ায়।এরপর আয়নার সামনে দাড়া করিয়ে ইয়ানার ঘার থেকে কোমর পর্যন্ত চুল গুলো সরিয়ে একটা সাদা পাথরের হীরের হাড় পড়িয়ে দেয়। হাড়ের সাথে ম্যাচিং করা এক জোড়া কানের দুল পড়িয়ে দেয়। এরপর কানে চুমু খেয়ে বলে,,,,

“” বেঁচে গেলে আমার অনুভবের সেহজাদী আমার সন্তান তোমার গর্ভে বলে। নাহলে আজ অগ্নি চৌধুরী কোন সীমা অতিক্রম করত আপনার ধারনা ও নেই।””
এরপর আহান ইয়ানাকে পাজা কোলে নিয়ে সিড়ি দিয়ে নেমে আসে। ইয়ানা লজ্জায় এখনো আহানের বক্ষে নিজের মুখ লুকিয়ে রাখে। আহান ইয়ানাকে আলতো করে গাড়িতে বসিয়ে গাড়ির সিটব্যাল্ট লাগিয়ে দেয়। ইয়ানা আজ অনেক দিন পর বাহিরে বের হয়েছে। কিন্তু বাহিরের বাতাস ফিল করতে পারছে না। আহান পুরো গাড়ির কাউচ বন্ধ করে দিয়েছে।

ইয়ানা — এইদিকের কাউচটা তুলে দিন না?
আহান — কেনো?
ইয়ানা — একটু বাহিরের পরিবেশ ফিল করতে চাই।
আহান — নাহহ এখন রাত বাহিরের পরিবেশ দেখতে হবে না। আর মাত্র কয়েকটা দিন অপেক্ষা কর তখন বাহিরের পরিবেশ যত ইচ্ছে দেখো।
ইয়ানা আহানের কথার পৃষ্ঠে আর কিছু বলে না। ইয়ানা আহানের অবাধ্য হতে চাই না।

আহানের বিলাশ বহুল কালো গাড়িটি গিয়ে থামে একটি বাড়ির সামনে। বাড়িটা চৌধুরি মঞ্জিল থেকে আর ও সুন্দর। আহান ইয়ানার হাত ধরে গাড়ি থেকে নামায়। এরপর বাড়ির গেইড খুলে বাড়ির ভিতর প্রবেশ করে। ইয়ানা চার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। তিন তলা বাড়িটির মধ্যে যেনো সৌখিনিতায় ভরপুর। এক পাশে বাগান বাহারি রকমের ফুল। আরেক পাশে সুইমিংপুল।চারদিকে লাইটের আলোর মধ্যে এই অন্ধকারে ও সব কিছু দিনের আলোর মত স্পষ্ট।একটা বিরাট এড়িয়া জুড়ে বাড়িটি করা হয়েছে। কিন্তু ইয়ানা ভেবে পায় না এই বাড়িটি কার? আহান ইয়ানার হাত ধরে দরজা ঠেলে ঘরের ভিতরে প্রবেশ করে। ভিতরে সাদা পার গোলাপি টাইলসে পুরো বাড়ি সৌন্দর্যে মোঁ মোঁ করছে। দামী আসবাব পত্র সব মিলিয়ে চৌধুরি ভিলা থেকে অনেক সুন্দর এই বাড়িটি। ইয়ানার চোখ ধাধিয়ে আসছে। আকস্মিক আহান ইয়ানার চোখ বন্ধ করে একটা রুমে নিয়ে যায়। ইয়ানা সব কছু দেখে এমনি স্তব্দ হয়ে আছে। কিছুক্ষন পর আহান ইয়ানার চোখে ছেড়ে দেয়। সামনের দিকে তাকাতেই ইয়ানার চোখ চরকগাছ। কি সুন্দর করে সাজানো হয়েছে পুরো রুম। ইয়ানার পিঙ্ক কালার খুব পছন্দ পুরো রুম পিঙ্ক কালারের সাজে সজ্জিত হয়ে আছে। ইয়ানা জজ্ঞাসা দৃষ্টিতে আহানের দিকে তাকায়। আহান ইয়ানার দৃষ্টি বুঝতে পেরে হাসি দিয়ে বলে,,,,,

“” পছন্দ হয়েছে? “”
ইয়ানা কি বলবে বুঝতে পারছে না। এইসব কিছু আহান করেছে এইটা বুঝতে পেরেছে। আবেগে তার চোখ দিয়ে পানি চলে আসছে। কান্না আসছে প্রচুর। কিন্তু কান্না করা যাবে না আহান রেগে যাবে। এখন ইয়ানা আহানকে রাগাতে চাই না।
ইয়ানা —- খুব পছন্দ হয়েছে। বিশ্বাস করবেন না আমি ঠিক কতটা খুশি হয়েছি।
আহান ইয়ানার কপালে চুমু খেয়ে একটা টেবিলের সামনে নিয়ে যায়। টেবিলটা গোলগাল কাচা ফুল দিয়ে সাজানো। ফুলের মাঝ খানে একটা মাজারি সাইজের কেক রাখা। কেকের উপরে লেখা “অগ্নি চৌধুরির বাচ্চার মাকে মাতৃত্বের অভিনন্দন।”

আহান ইয়ানার হাতে একটা রিং পরিয়ে দেয়। যেই রিং এর সেইম ডিজাইন আহানের হাতে ও আছে। আহান রিং পরিয়ে ইয়ানার হাতে আলতু চুমু খেয়ে বলে,,,
“” আমার সেহজাদীর উপহার আমাকে বাবা হওয়ার সুখ দেওয়ার জন্য।
এরপর আহানের প্রথম দেওয়া রিং এর উপর ছুয়ে বলে,,,,
“” তুমি আমাকে প্রশ্ন করতে না যে এই রিংটা আমার কাছে কি? এই রিংটার কারনে তুমি মিসেস অগ্নি চৌধুরি হতে পেরেছো। আজ আমাকে বাবা হওয়ার আনন্দ দিতে পারেছো। তোমার গর্ভে আমার অস্তিত্ব ধারন করতে পেরেছো””
ইয়ানা —- কিভাবে?
আহান মুচকি হাসি দিয়ে বলে,,,,

“” এইটার মধ্যে ক্যামেরা ফিট করা ছিলো তোমার চব্বিশ ঘন্টার খবর আমার কাছে ছিলো””
ইয়ানা অবাক হয়ে বলে,,,,
“” তারমানে যেদিন চট্টগ্রাম গিয়েছিলাম আপনি সব জানতেন?
আহান — হুম।
ইয়ানা অভিমানী কন্ঠে বলে,,,,,
“” জানার পর ও বসে ছিলেন? আমাকে অন্যের জন্য সাজতে দিলেন? প্রথম দিন গিয়ে কয়েকটা থাপ্পর দিয়ে নিয়ে আসতে পারলেন না?
আহান — আনতে পারতাম তো। যদি চাইতাম তাহলে ঘর থেকে ও বের হতে পারতে না আর চট্টগ্রাম যাওয়া তো বিলাসিতা। অগ্নি চৌধুরি অসময়ে কোনো কাজ করে না সঠিক সময় আসলে ঠিক নিজের জিনিস নিয়ে নেয়। সঠিক সময়ের ব্যবধানে তোমাকে ও নিজের করে নিলাম।
ইয়ানা আহানকে জড়িয়ে ধরে বলে ,,,,,

“” খুব ভালোবাসি আপনাকে আহান। সারাটা জীবন এই ভালোবাসা নিয়ে কাটাতে চাই।
আহান ইয়ানাকে আলতো চেপে ধরে বলে,,,,
“” আমি ও খুব করে চাই তোমায় জন্ম জন্মান্তর।””
এরপর আহান ইয়ানার কপালে ঠোঁট ছুইয়ে দিয়ে বলে,,,
আহান — আমরা কি এই কেক টা কাটতে পারি।
ইয়ানা — হুম।
এরপর এক রাশ খুশি আর ভালোবাসা নিয়ে ইয়ানা আর আহান কেক কাটা সম্পন্ন করে। ইয়ানার ঠোঁটের কোনে কেক লেগে আছে।যা আহানকে ইয়ানার ঠোঁটের কাছে টানছে। ইয়ানা আহানের দিকে হাত দিয়ে কেক বাড়িয়ে দিলে আহান বলে,,,,

“” আমি নিজেরটা নিজে নিয়ে নিচ্ছি। “”
এরপর আলতোভাবে ইয়ানার ঠোঁট আকড়ে ধরে। কিছুক্ষন পর আহান ছেড়ে দিয়ে বলে,,,
“” এই নাও নিয়ে নিয়েছি।'”
ইয়ানা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। সাথে সাথে আবার নাক মুখ খিচে ফেলে। পেটে সামান্যের তুলনায় বেশি ব্যাথা অনুভব হচ্ছে।
আহান ইয়ানার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,,,,,
“” তুমি ঠিক আছো? ”
ইয়ানা আহানের চিন্তিত মুখস্রির দিকে তাকিয়ে হেসে বলে,,,,
“” আপনার মেয়ে ফুটবল খেলছে। “”
আহান — আচ্ছা তাই নাকি।
এরপর আহান ইয়ানার উচু পেটে চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,,,,

“” ফুটবল খেলো ভালো কথা কিন্ত বেশি লাফালাফি করো না। লাফালাফি করলে মাম্মাম ব্যাথা পাবে। তোমার মাম্মামের ব্যথা তোমার বাবা সহ্য করতে পারে না। তুমি তো আমার লক্ষি বাচ্চা তাই বাবার কথা শুনবে। অতিরিক্ত লাফালাফি করবে না কেমন “””
আহানের কথা শুনে ইয়ানা ফিক করে হেসে উঠে।
আহান — হাসছো কেনো?
ইয়ানা — আপনাদের কথা শুনে। কিন্ত আহান এই বাড়িটা কার?
আহান — এইটাই তোমার হাজবেন্ডের বাড়ি। এইখানে আমি থাকতাম। তুমাকে বিয়ে করার পর আমি চৌধুরি মঞ্জিলে থাকা শুরু করি। নাহলে আগে আমি চৌধুরি মঞ্জিলে মাসে এক বার যেতাম।
ইয়ানা অবাক হয়ে তাকায়।এই বাড়িটা আহানের। ওর জামাই একটু বেশি বড়লোক হয়ে গেলো না।
ইয়ানা এই সুন্দর মুহূর্তকে আর ও মধুর করার জন্য আহানের দিকে তাকয়ে বলে,,,

” আপনার কন্ঠে একটা গান গেয়ে শুনান না ”
আহান চোখ ছোট ছোট করে বলে,,,,
“” শুনতে চাও? ”
ইয়ানা — হুম।
আহান — এখানে ওয়েট করো আমি রুম থেকে গিটার নিয়ে আসছি।
কিছু সময়ের ব্যাবধানে আহান গিটার নিয়ে এসে ইয়ানার সামনে দাঁড়ায়। এরপর ইয়ানাকে একটা চেয়েরে বসিয়ে দিয়ে নিজে ও ইয়ানার মুখোমুখি হয়ে বসে। এরপর গিটারের সুর তুলতে তুলতে বলে,,,,,,

~ আমি তোমার কাছেই রাখব… আর মনের কথা হাজার।
~ দিয়ে তোমার কাজল আঁকব.. আজ সারাদিনটা আমার।
~ তুমি বৃষ্টি হয়ে নামলে… আর অন্য চিন্তা আমার।
~ আমি তোমার কাছেই রাখব… আর মনের কথা হাজার।
~ দিয়ে তোমার কাজল আঁকব… আজ সারাদিনটা আমার।
~ হালকা হাওয়ার মত চাইছি এসো এখন.. করছে তোমায় দেখে অল্প বেইমানি মন।
~ বাধবো তোমার সাথে আমি আমার জীবন।
~ আমি তোমার কাছেই রাখব.. আর মনের কথা হাজার।
~ দিয়ে তোমার কাজল আঁকব… আজ সারাদিনটা আমার।
ওওওওওওও.. ওওওওওওওওও.. ওওওওওওও

~ চাইলে আস্কারা পাক বেঁচে থাকার কারন…আজকে হাতছাড়া যাক ব্যাস্ততার বারন ।
~ লিখবো তোমার হাতে আমি আমার মরন।
~ আমি আমার কাছেই রাখব.. আর মনের কথা হাজার।
~ দিয়ে তোমার কাঁজল আঁকব.. আর মনের কথা হাজার।
~ তুমি বৃষ্টি হয়ে নামলে… আর অন্য চিন্তা আমার।
~ আমি তোমার কাছেই রাখব.. আর মনের কথা হাজার।
আহান গানের প্রতিটি লাইন ইয়ানার দিকে তাকিয়ে বলেছে। ইয়ানা ও মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে আহানের চোখের দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে আছে। আহানের শরীরে লং ব্লেক কোর্ট। হাতে গিটার খুব সুন্দর লাগছে। নিজেকে সবচেয়ে সুখি মনে হচ্ছে ।

আহান — কি হলো মেডাম এইভাবেই তাকিয়ে থাকবেন।
ইয়ানা — তার পর ও কেনো তৃষ্না মিটে না। খুব সুন্দর বাংলা গান বলতে পারেন আপনি।
প্রায় অনেক্ষন ভোলোবাসার মুহূর্ত কাটিয়ে এখন রাত প্রায় একটার কাছাকাছি। সময় যত অতিবাহিত হচ্ছে ইয়ানার পেইন যেনো আর ও বৃদ্ধি পাচ্ছে। দাতে দাত চেপে সহ্য করে যাচ্ছে। আহান যখন বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্য গাড়িতে বসায় তখন ইয়ানার সকল সহ্যের সীমা পার হয়ে যায়। ইয়ানা পেটে ধরে আল্লাহ বলে চিৎকার দিয়ে উঠে। ইয়ানার চিৎকার শুনে আহান অশান্ত হয়ে পড়ে। ইয়ানা ব্যাথায় ছটফট শুরু করে দেয়।

অনুভবে তুমি পর্ব ৪৯

শক্ত হাতে আহানের ব্লেজার খামচে ধরে। ইয়ানার প্রত্যেকটা চিৎকার আহানের হৃদয়ে তীরের ফলার মত গেথে গিয়ে ক্ষত বিক্ষত করে দিচ্ছে। ইয়ানার ব্লিডিং গাড়ির সিট লাল হয়ে পড়েছে। আহান বুঝতে পারে ডেলিবারি পেইন হচ্ছে। কিন্ত ইয়ানার ডেলিভারি ডেইট তো আর ও পরে। আহান ইয়ানাকে নিজের সাথে চেপে ধরে দক্ষ হাতে ড্রাইবিং করে হসপিটালের সামনে আসে। যেহেতু আগের থেকে আহান সব কিছু ঠিক করে রেখেছিলো তাই হসপিটালে পৌছানো মাত্র ওই ইয়ানাকে সবচেয়ে VIP রুমে সিফট করা হয়। ইয়ানা ডুকার আগে পর্যন্ত নিভু নিভু নেত্র ফেলে আহানের বিধ্বস্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে ছিলো আর সুরা পাঠ করছিলো।
আহান কেবিনের বাহিরে স্তব্দ হয়ে বসে পড়ে। অজানা ভয় আবার ও আকড়ে ধরে। মনে হচ্ছে ভিতর থেকে শেষ হয়ে যাচ্ছে।

অনুভবে তুমি পর্ব ৫১