অন্তঃদহন পর্ব ২২
DRM Shohag
চোখের পলকে পেরিয়েছে আরও দু’সপ্তাহ। সেদিন ডায়রি পড়ার পর থেকে রিয়ার মতো চঞ্চল মেয়েটি ভীষণ শান্ত হয়ে গিয়েছে। সন্ধ্যা-ও মলিন মুখে থাকে। সৌম্য’র মাঝে মাঝে একটি দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে। যেখানে মিশে আছে স্বল্প সময়ে কিছু পরিচিত র’ক্তের চেয়েও আপন মানুষদের হারিয়ে ফেলার আক্ষেপ।
সৌম্য ধূলোমাখা গায়ে দু’টো ইট পেতে বসে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। পরনে পুরনো একটি জিন্স প্যান্ট, যা হাঁটুর নিচ বরাবর গুটিয়ে রেখেছে। গায়ে একটি সেন্ডো গেঞ্জি। একটি চেক শার্ট খুলে ইটের উপর রেখেছে। হাতে পায়ে ইটের গুড়ো দিয়ে ভরা।
বাড়ি করছে। সৌম্য অনেক খোঁজাখুঁজির পর এই কাজটি পেয়েছে আপাতত। সাতদিনের চুক্তিতে এক মিস্ত্রি হিসেবে কাজটি নিয়েছে।
একজন লোকের ডাকে সৌম্য ক্লান্ত শরীরটা টেনে নিয়ে গেল মেশিনের দিকে। এরপর একটি পাত্র মাথায় নিয়ে এগিয়ে গেল। সিমেন্ট, বালু, খোয়ার মিশ্রণ মেশিন থেকে ঢেলে একে একে সব পাত্রে ঢেলে দিলে সবাই যা যার পাত্র মাথায় নিয়ে যথাস্থানে রাখতে যায়। সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাত্রটি মাথায় নিয়ে লোকগুলোর পিছু এগোয়।
কাজ শেষ হতে হতে প্রায় বিকাল হয়ে এসেছে। সৌম্য পাইপের কাছে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে নিল। এরপর ইটের উপর রাখা তার চেক শার্টটি নিয়ে জড়িয়ে নেয়। শার্টের বেশ কয়েকজায়গায় ফুটো হয়ে গিয়েছে। যদি-ও বাইরে থেকে বোঝা যায় না। তবে খেয়াল করে দেখলে বোঝা যায়।
আরও গল্প পড়তে এখানে ক্লিক করুন
সৌম্য সামনে না এগিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে কিছু ভাবছে। গত পাঁচটা মাস এতো পরিমাণ ক’ষ্ট করেছে, সৌম্য’র মনে হয়, হয়তো একজন ভিক্ষুক-ও তাদের চেয়ে ভালো থাকতে পারে। তার দু’টো প্যান্ট আর দু’টো শার্ট। শার্ট-প্যান্ট দু’টোর কত জায়গায় ফুটো তার হিসেব নেই। শার্ট কোঁচকাতে কোঁচকাতে গায়ে ছোট হয়। কিন্তু সৌম্য’র নিজের জন্য খারাপ লাগে না। খারাপ লাগে তার বোনুর জন্য। তার মতোই তার বোনুর দু’টো জামা। জামা দু’টোর ছেড়া অংশগুলো সৌম্য’র চোখে লাগে। তার পকেটে আছে ৫০ টাকা। এইখান থেকে টাকা পাবে ১ সপ্তাহ পর। একজন লোক সৌম্য’র পাশে এসে দাঁড়ালে সৌম্য দোনোমনা করে ৫০০ টাকা ধার চায়। এক সপ্তাহ পর দিয়ে দিবে। লোকটি দিতে চাইছিল না, সৌম্য’র মুখ মলিন হয়। লোকটি কি যেন ভেবে সৌম্য’কে ৪০০ টাকা দেয়। আর বলে সময়মতো দিয়ে দিতে। সৌম্য খুশি হয়।
পকেটে ৪৫০ টাকা নিয়ে সৌম্য মার্কেট ঘুরছে। তার বোনুর জন্য একটা জামা কিনবে বলে। এতো অল্প টাকায় মনমতো জামা পায়না সে। তবুও অনেক খুঁজে খুঁজে একটি গোল জামা পায়। ৪০০ টাকা দাম। মার্কেট থেকে বেরিয়ে ফুটপাতের উপর বসা একজন লোকের কাছে জামাটি পেয়েছে। সৌম্য জামাটি নিয়ে নেয়।
শরীরটা ভীষণ দুর্বল লাগছে। সারাদিন কাজ করে গা ব্য’থা করছে। সৌম্য ভাবলো ৩০ টাকা ভাড়া দিয়ে একটি ভ্যানে উঠে বাড়ি ফিরবে। কয়েক পা এগিয়ে রাস্তার পাশে একটি কসমেটিকস এর ভ্যান দেখে সৌম্য আর এগোয় না। ভ্যানে বিদ্যমান নুপুরগুলোতে প্রথম সৌম্য’র চোখ পড়ল। নুপুরের প্রতি সন্ধ্যার দুর্বলতা সে জানে। অনেক আগে একজোড়া রূপোর নুপুর বানিয়ে দিয়েছিল সন্ধ্যাকে। একটি নুপুর হারিয়ে ফেলেছে। আরেকটি এখনো যত্ন করে রেখেছে। সৌম্য এগিয়ে গিয়ে নুপুরটির দাম জিজ্ঞেস করলে বলে দাম ৭০ টাকা। সৌম্য’র মন খারাপ হয়। তার কাছে আছেই ৫০ টাকা। দোকানদারের সাথে অনেকক্ষণ থেকে দামাদামি করে ৫০ টাকায় নুপুরটি কিনে বাড়ির পথ ধরে। শূণ্য পকেট, হাতে বোনুর জন্য একটি জামা আর একজোড়া নুপুর নিয়ে ক্লান্ত শরীরটা টেনে নিয়ে যায়। বোনুকে হাসাবে ভাবতেই যেন শরীরের ক্লান্তি খানিক দূর হয়।
প্রায় ৩০ মিনিট হেঁটে বাড়ি ফেরে সৌম্য। ধরনীতে সন্ধ্যা নামবে ভাব। উঠানে পা রাখলে দেখল সন্ধ্যা দরজায় বসে ভাত খাচ্ছে। সৌম্য এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
– বোনু তুই এতো দেরি করে খাচ্ছিস কেন?
ভাইয়ের কণ্ঠে সন্ধ্যা মাথা তুলে তাকায়। মাথা নাড়িয়ে বোঝায়, এমনি। সৌম্য ভাতের প্লেটের দিকে তাকালো। কাঁচা মরিচ দিয়ে ভাত মাখানো, এক কোণায় একটুখানি লবণ। এই খাবার তাদের রোজকার খাবার। মাঝে মাঝে একটু-আধটু ভালো-মন্দ খাবার খেতে পায়। প্রথম প্রথম সন্ধ্যা ভাত খাওয়ার পর পেট ধরে বসে থাকতো। চোখের কোণে জমা পানি নিয়ে তার দিকে তাকাতো। সৌম্য বুঝতো সন্ধ্যার পেট জ্বলত। কিন্তু এখন তাদের অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। তাছাড়া রিয়াদের অবস্থা ভালো নয়,, টাকার অভাবে একটা ছোট্ট ফোন পর্যন্ত নেই। সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলে সন্ধ্যার পাশে ঘরের দরজায় বসে। মৃদুস্বরে বলে,
– অনেক ক্ষুধা লেগেছে বোনু।
সন্ধ্যা ভাইয়ের ক্লান্তিতে ভরা মুখের দিকে তাকায়। তার ভাতের পাত থেকে সৌম্য’র মুখের সামনে খাবার ধরে। সৌম্য বিনাবাক্যে খাবার মুখে নেয়। সন্ধ্যা সবটুকু ভাত সৌম্য’কেই খাইয়ে দিল। সৌম্য’ও তৃপ্তি করে খায়। খাবার শেষে দুই ভাইবোন ঘরের ভেতর যায়। সন্ধ্যা প্লেট, হাত ধুয়ে রাখে। সৌম্য বিছানার উপর বসে জামা আর নুপুর জোড়া বের করে তার বোনকে কাছে ডাকে।
সন্ধ্যা সৌম্য’র পাশে গিয়ে বসলে সৌম্য প্রথমে নুপুর জোড়া সন্ধ্যার দিকে বাড়িয়ে দিলে সন্ধ্যা অবাক হয়ে তাকায় সৌম্য’র দিকে। সৌম্য মৃদু হেসে বলে,
– টাকা নেই বোনু। তাই রাস্তার পাশের নুপুর দিলাম। টাকা হলে আবার-ও রূপোর নুপুর বানিয়ে দিব।
সন্ধ্যার চোখে কোণে নোনাজল জমে। তার ভাই এতো ভালো কেন? সৌম্য তাড়া দিয়ে বলে,
– পর এটা।
সন্ধ্যা সৌম্য’র হাত থেকে নুপুর জোড়া নিয়ে তার দু’পায়ে পরে নেয়। এরপর সৌম্য’র দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে। সৌম্য’ও একটু হাসলো। এরপর তার আনা জামাটি সন্ধ্যার দিকে বাড়িয়ে দিলে সন্ধ্যা আগের চেয়েও অবাক হয়, সৌম্য মলিন গলায় বলে,
– স্যরি বোনু! অনেকদিন পর তোকে একটা জামা দিলাম। তোর দু’টো জামা-ই ছিঁড়ে গিয়েছে, যেখানে কাজ পেয়েছি, কয়েকদিন পর টাকা পেলে আরেকটা কিনে দিব।
সন্ধ্যা জানে সৌম্য’র পকেটে ৫০ টাকা ছিল। সকালে সে দেখেছে। ইশারায় বোঝায়, – টাকা কোথায় পেলে?
সৌম্য উত্তর করে,
– যেখানে পাওয়ার পেয়েছি, তোকে এতো ভাবতে হবে না।
সন্ধ্যা তার ভাইয়ের দিকে চেয়ে আছে। শুধু তার জামা তো ছিঁড়েনি। তার ভাইয়ের শার্টগুলো ধোয়ার সময় সন্ধ্যা খুব দেখেছে সৌম্য’র শার্ট-প্যান্ট দু’টোর অবস্থা। অথচ তার ভাই কই না কই দেখে টাকা নিয়ে শুধু তার জন্য জামা আর নুপুর এনেছে। না চাইতেও চোখের কোণে পানি জমলো। সৌম্য এটা খেয়াল করে বোনের মনোভাব বুঝতে পারে। মৃদুস্বরে বলে,
– বোনু? আমি তো বললাম, কয়েকদিন পর টাকা পেলে তোর সাথে আমিও আমার জন্য কিছু কিনব। এবার একটু হাস।
সন্ধ্যা ভাইয়ের কথায় জোরপূর্বক একটু হাসলো।
পেরিয়েছে এক সপ্তাহ। সৌম্য গত সপ্তাহে চাকরির পরীক্ষা দেয়ার জন্য ঢাকায় গিয়েছিল। মূলত এই কারণেই সৌম্য’র পকেটে এক টাকাও ছিল না। নয়তো ১০০-২০০ টাকা থাকতো। আজ পরীক্ষার ফলাফল বেরিয়েছে। আর আনন্দের খবর সৌম্য’র চাকরিটা হয়ে গিয়েছে। ঢাকা ইসলামী ব্যাংকে [MTO] অফিসার পদে তার চাকরি হয়েছে।
অ্যাকাউন্টিং নিয়ে ঢাকা ভার্সিটি থেকে পড়ার পর এই স্টেজ সৌম্য’র জন্য একদম মানানসই। সৌম্য’র চাকরি হওয়ায় সে যতটা খুশি হয়েছে, ততটাই মন খারাপ। সেই ঢাকা শহর? যেখানে তার ইরাবতীকে খুব বাজেভাবে ভেঙে দিয়ে এসেছিল। আচ্ছা ইরাবতী কি তার কথা রেখে বিয়ে করে নিয়েছে? কথাটা ভাবতেই সৌম্য’র বুকে চিনচিন ব্য’থা করে উঠল। গলা শুকয়ে আসলো। চোখ বুজে বহুক’ষ্টে দু’বার ঢোক গিলল। তার ইরাবতী ভালো থাকুক। এটুকুই তার চাওয়া।
কিন্তু সে কি করে ওই শহরে থাকবে? যেখানে তার বোনুর কত বীভৎস স্মৃতি আছে। তাদের মা’রা’র চেষ্টা করা হয়েছে। সৌম্য’র মন স্বায় দেয় না। কি করবে সে?
সৌম্য সন্ধ্যার দিকে তাকালো। সন্ধ্যা জানালার পাশে বসে রাতের আকাশ দেখতে ব্যস্ত। মন খারাপ তার। মন খারাপের কারণের অভাব নেই তাদের। সৌম্য বুঝল তার বোনটার মন খারাপ করো বসে আছে। সৌম্য কিছু একটা ভেবে ডাকে,
– বোনু শুনছিস?
হঠাৎ ভাইয়ের ডাকে সন্ধ্যা পিছু ফিরে তাকায়। সৌম্য সন্ধ্যার পানে চেয়ে মৃদু হেসে বলে,
– চাকরিটা আমি পেয়ে গেছি বোনু, শুনছিস?
সৌম্য’র কথা শুনে সন্ধ্যা বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায়। সন্ধ্যা জানে তার ভাই গত সপ্তাহে চাকরির পরীক্ষা দিতে গিয়েছিল। তার ভাইয়ের সেই চাকরি হয়ে গিয়েছে? সৌম্য’র চাকরি হয়েছে, সাথে সৌম্য’র কথাটা বলার ধরন সন্ধ্যা হেসে ফেলল। বোনকে হাসাতে পেরে সৌম্য’ও মদু হাসলো।
সন্ধ্যা দ্রুত বিছানা থেকে নেমে এক দৌড়ে গিয়ে সৌম্য’কে জড়িয়ে ধরে। তার চোখজোড়া ভিজে গিয়েছে। কম ক’ষ্ট করেনি যে দুই ভাইবোন এই ক’টা মাস।
গত প্রায় ছয় মাস তারা অনেক ক’ষ্ট করেছে। গত ছয় মাস তারা মাছ, মাংস চোখে দেখেনি। নতুন জামা-কাপড় চোখে দেখেনি। কখনো কখনো না খেয়ে দিন পার করেছে, রিয়ারা আর তারা কিছু কিছু সময় একজায়গায় খাবার খেলেও, বেশিরভাগ সময় আলাদা-ই খাবার খায়। আর সৌম্য’র কাছে যখন টাকা থাকতো না, সে ভুলেও তা প্রকাশ করতো না। সৌম্য তাকে রুটিকলা এনে দিত। সন্ধ্যা সেই রুটি আর কলা অর্ধেক করে ভাইয়ের মুখে তুলে দিত।
দু’জন অভাবী ভাই-বোনের কত গল্প জমা হয়েছে এই কয়টামাসে। সাধন, সোহা, মামা মামি, সৃজা, সিজান সবাইকে হারানোর ব্য’থা, তাদের জন্য অজান্তেই গড়িয়ে পড়া কত কণা অশ্রু জমা আছে সে গল্পে। দু’ভাইবোনের মনের মানুষ, একজনের ইরাবতী, আরেকজনের শুভ্র-পাঞ্জাবি-ওয়ালা’র শূণ্যতায় কতশত য’ন্ত্র’ণা লুকিয়ে আছে সে গল্পে।
সৌম্য বোনকে আগলে নেয়। চুলের উপর একটা চুমু খেয়ে মৃদুস্বরে বলে,
– চাকরিটা ঢাকায় হয়েছে।
কথাটা শুনে সন্ধ্যা ছলছল দৃষ্টিতে দৃষ্টিতে তাকায়। সেই শহরে আবার তাকে যেতে হবে, যে শহর তাদের দু’ভাইবোনকে ক’ষ্ট ছাড়া আর কিচ্ছু দেয়নি। সেই শহরে তার স্বামী আকাশ থাকে। তার সাথে দেখা হয়ে গেলে সে কি তাকে আবার-ও ডিভোর্স দেয়ার জন্য উতলা হবে? ডিভোর্স হয়নি বলে, আকাশ এখনো তার স্বামী। এই শব্দ চারটে সন্ধ্যার মনে আজ-ও শান্তি দেয়, তা কি হারিয়ে যাবে? তার সৌম্য ভাইয়াকে আর কেউ মা’র’তে আসবে না তো? কিন্তু তার ভাইয়ের চাকরিটা তো খুব দরকার। আর কতদিন এতো অভাবে ম’র’বে তারা? রিয়ারাও কত ক’ষ্ট করে। সৌম্য ভাইয়া চাকরি করলে রিয়াদের ক’ষ্টের-ও লাঘব হবে না?
সৌম্য সন্ধ্যার মাথায় হাত রেখে বলে,
– তুই বললে আমি আবার সামনেবার পরীক্ষা দিব বোনু। তোকে তো কথা দিয়েছিলাম, তোকে আর ওই শহরে যেতে হবে না।
একটু থেমে আবার-ও বলে,
– কিন্তু আমি যে তোকে তোর পছন্দের সব খাবার খাওয়াতে চাই বোনু। তোকে আমার ঘরে রাজমাতা করে রাখতে চাই। তুই যে আমার ছোট মা! এসবের জন্য তো আমার চাকরিটা করতে হবে। তবুও তুই যা বলবি সেটাই করব।
সন্ধ্যার চোখের কোণে জমা পানির কণাগুলো এবার গড়িয়ে পড়ে। শত দুঃখ-ক’ষ্টের মাঝেও সন্ধ্যার নিজেকে বোন হিসেবে ভীষণ ভাগ্যবান লাগে। এরকম বেস্ট ভাইয়া কয়জন পায়? সন্ধ্যা সৌম্য’র ফোন নিয়ে তাতে টাইপ করে সৌম্য’র সামনে ধরলে সৌম্য তাতে চোখ বুলায়,
– তুমি চাকরি করে রিয়াদের হেল্প করলে ওদের আর এতো ক’ষ্ট থাকবে না। তুমি এই চাকরি ছেড়ে দিও না ভাইয়া। আমাদের সাথে আমাদের আল্লাহ আছে। আমি তোমাকে রাজপুত্রের মতো দেখতে চাই ভাইয়া, আর আমি-ও তোমার রাজমাতা হতে চাই।
লেখাগুলো পড়ে সৌম্য মৃদু হাসলো। তার বোনুর সবার চিন্তা মাথায় থাকে। তার মায়ের মতোই হয়েছে। সৌম্য সন্ধ্যার চোখের পানি মুছে দিয়ে মৃদু হেসে বলে, – যথাআজ্ঞা রাজমাতা।
সন্ধ্যা ঠোঁট প্রসারিত করে হাসে, তবে তা শব্দহীন।
পেরিয়েছে আরও এক সপ্তাহ। সৌম্য, সন্ধ্যা ছোট্ট একটি ব্যাগে তাদের একটি করে জামা, শার্ট-প্যান্ট ভরেছে। আর অপরটি গায়ে। কাপড়-ই দু’টো, কি আর নিবে?
দুইভাইবোন মূলত ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিচ্ছে। সৌম্যকে আরও দু’দিন পর অফিসে জয়েন করতে হবে। এক সপ্তাহের চুক্তিতে মিস্ত্রির কাজ করে গত সপ্তাহে কিছু টাকা পেয়েছে। যা দিয়ে তাদের যাতায়াত ভাড়াসহ ওখানে গিয়ে কয়েকদিন থাকার ব্যবস্থা হয়ে যাবে।
রিয়া সন্ধ্যাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে ওঠে। সৌম্য’রা ঢাকায় চলে যাবে শোনার পর থেকে রিয়া আরও চুপ হয়ে গিয়েছিল। আজ যাওয়ার সময় মেয়েটি কেঁদে ফেলল। সন্ধ্যার চোখের কোণে-ও পানি। কয়েকমাসের পরিচয়ে মেয়েটি কত আপন হয়ে গেল! সন্ধ্যা রিয়াকে ছাড়িয়ে দু’হাতে রিয়ার মুখ মুছে দিয়ে মাথা নাড়িয়ে কাঁদতে না করে। রিয়া ফোঁপানো কণ্ঠে বলে,
– তুই আবার আসবি তো এখানে? সৌম্য ভাইয়া তোকে নিয়ে আসবে? তোরা যেন সোহা আর সাধন ভাইয়ার মতো হারিয়ে যাস না।
বলতে বলতে আবার-ও কেঁদে ফেলে রিয়া। সন্ধ্যা রিয়ার গাল টেনে বোঝায়, সে আসবে। তার ভাইয়া ছুটি পেলেই চলে আসবে। রিয়া নিজেকে সামলায়। সন্ধ্যা, সৌম্য রিয়ার মায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ালে ভদ্রমহিলা দু’জনের গাল ছুঁয়ে বলে,
– আমাদের ভুলে যেও না তোমরা। সময় পেলেই সন্ধ্যাকে নিয়ে এখানে আসবে, বুঝেছ সৌম্য বাবা?
সৌম্য নিরব সম্মতি দেয়। এরপর সন্ধ্যা রিয়ার নানির সামনে গেলে তিনি সন্ধ্যার দিকে তাকায়। চোখের কোণে পানি তার। উপরে উপরে ভালোবাসা দেখাতে পারে না সে। সে দেখায় সৌম্য, সন্ধ্যা, রিয়া কাউকেই তার সহ্য হয় না। অথচ ভেতরটা ভালোবাসা দিয়ে ভরপুর। সন্ধ্যা রিয়ার নানিকে বেশ ভালোই বোঝে। রিয়ার নানি মুখ ফিরিয়ে বলে,
– চাকরি পেয়ে বড় হয়ে আমাদের যেন আবার ভুলে যেও না।
সন্ধ্যা রিয়ার নানিকে জড়িয়ে ধরলে বয়স্ক ভদ্রমহিলা সন্ধ্যার পিঠে হাত বুলিয়ে মলিন গলায় বলে,
– যাচ্ছ যাও। বেঁচেই যাচ্ছি আমি।
সন্ধ্যা মৃদু হাসলো। ইনি উল্টো কথা বলবে, অথচ কথায় কত আবেগ মেশানো। সৌম্য গলা ঝেড়ে বলে,
– বুড়ি তোমাকে কিন্তু সত্যি-ই ভুলে যাবো।
রিয়ার নানি কথাটা শুনতেই ভারী গলায় বলে,
– সে যাও ভুলে! আমার কি তাতে?
সন্ধ্যা রিয়ার নানিকে ছেড়ে চোখের কোণে লেগে থাকা পানি মুছে নেয়। রিয়ার নানি সৌম্য’র মাথায় বুলিয়ে বলে,
– আমার নাতনিকে দেখে রাখবা, বুঝছ?
সৌম্য হেসে বয়স্ক ভদ্রমহিলার দু’হাত ধরে মৃদুস্বরে বলে,
– তুমি তো আমার বোনকে হিংসা করেই কুল পাও না!
রিয়ার নানি কিছু বলল না। সৌম্য বুঝল মানুষটা ক’ষ্ট পাচ্ছে। মৃদুস্বরে বলে,
– তোমাকে অনেক মনে পড়বে নানি।
রিয়ার নানি আর ত্যাড়া উত্তর করলেন না। তার খুব খারাপ লাগছে। সৌম্য’র গাল ছুঁয়ে তার সে হাত ঠোঁটের কাছে নিয়ে চুমু খেয়ে বলে,
– সময় পাইলেই আসবা। আর সাবধানে যাই-ও বুঝছ?
সৌম্য মৃদু হাসলো। এরপর আর সময় ন’ষ্ট না করে সৌম্য-সন্ধ্যা রওয়ানা হয় তাদের যাত্রাপথে।
দিনের আলো মিলিয়ে আন্ধার নামতে শুরু করেছে।
সৌম্য সন্ধ্যাকে নিয়ে বাস থেকে নেমে দাঁড়িয়েছে। এখন কোথায় যাবে সেটাই ভাবছে। সেই সিম তো নেই, তাই সকলের নাম্বার-ও হারিয়ে গিয়েছে। নাম্বার থাকলে রিহানকে একটা কল করলে আজকের রাতটা ম্যানেজ করে নেয়া যেত।
সৌম্য একটি সিএনজি নিয়ে উঠে বসে তার বোনুকে পাশে নিয়ে। উদ্দেশ্য তার মেস যেখানে সে আর রিহান থাকতো।
প্রায় ৪০ মিনিট পর মেসের সামনে গিয়ে নামে সৌম্য। ভাড়া মিটিয়ে সন্ধ্যার হাত ধরে নামায়। পিছন থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে আসে,
– কে ওটা? সৌম্য?
রিহানের কণ্ঠে সৌম্য দ্রুত উল্টো ঘুরে দাঁড়ালে রিহান সৌম্য’র চেহারা দেখে অবাক হয়। দ্রুত পায়ে এগিয়ে এসে সৌম্যকে জড়িয়ে ধরে। সৌম্য বা হাত রিহানের পিঠে রাখে। একটু পর রিহান সৌম্যকে ছেড়ে মলিন গলায় বলে,
– কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলি? একটা খোঁজ দিলি না। কত ফোন দিয়েছি। এটলিস্ট তোর খোঁজটা আমাকে দিতে পারতি না সৌম্য?
সৌম্য রিহানের কাঁধে হাত রেখে বলে,
– নাম্বার হারিয়ে ফেলেছি। ছিলাম একজায়গায়। চাকরি হলো বলে আবারও এই শহরে আসতে হলো।
রিহান অবাক হয়ে বলে,
– ইসলামী ব্যাংকের অফিসার, ঠিক বললাম তো?
সৌম্য মৃদু হাসলো। রিহান সৌম্য’র সাথে হাত মিলিয়ে বলে,
– সেইম টু ইউ ব্রো। আমি আরও ভাবছিলাম তুই এই এক্সাম দিলি কি-না!
সন্ধ্যা বারবার আশেপাশে চোখ বুলায়। লাস্ট যেদিন এই শহর ছেড়েছিল, সেদিনের সেই ভ’য়া’ব’হ স্মৃতি তার দোরগোড়ায় আবার-ও নাড়া দিয়েছে। এইদিক দিয়েই তো সে পা’গ’লের মতো দৌড়েছিল। পিছন পিছন দু’টো লোক তাকে তাড়া করছিল। আর তারপর তাকে ধরে-ও ফেলেছিল। সন্ধ্যার চোখের কোণে পানি জমে। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসে। সৌম্য’র সাথে সিটিয়ে দাঁড়ায়। সৌম্য ডান হাতে সন্ধ্যাকে আগলে নিয়ে বলে,
– কি হয়েছে বোনু?
সন্ধ্যা মাথা নিচু করে রাখলো। সৌম্য হয়তো কিছু বুঝল। রিহানের উদ্দেশ্যে বলে,
– একটা রুমের ব্যবস্থা করে দে আজকের রাতটার জন্য। আগামীকাল বাসা খুঁজব। এখানে থাকবো না।
রিহান একটু ভেবে বলে,
– আচ্ছা ব্যবস্থা করছি।
রিহান একটু সরে গেলে সৌম্য সন্ধ্যার মুখ উঁচু করে দেখল তার বোনুর চোখের জল গড়িয়েছে। সৌম্য ঢোক গিলল। সে এইজন্যই এই শহরে আসতে চায়নি কখনো। নিজেকে সামলে সন্ধ্যাকে জড়িয়ে ধরে মৃদুস্বরে বলে,
– আমাকে ক্ষমা করবি না বোনু? এই দেখ কথা দিচ্ছি, আমি থাকতে তোর গায়ে আর একটা আঁচ-ও লাগতে দিব না। আগের কথা ভুলে যা বোনু। তুই না আমার স্ট্রং বোনু!
সন্ধ্যা চোখ নামিয়ে রেখে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলে। সৌম্য আকাশপানে একবার তাকায়। এরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,
– জানিস বোনু, ইরাবতীর হয়তো বিয়ে হয়ে গিয়েছে।
কথাটা শুনতেই সন্ধ্যা যেন ঝটকা খেল। মাথা তুলে বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায় সৌম্য’র দিকে। ইরাকে সে খুব ভালো করে চেনে। সৌম্য বাড়ি গেলে সন্ধ্যা ইরার সাথে ভিডিও কলে কথা বলতো। ইরা সন্ধ্যাকে লুকিয়ে চুরিয়ে বলতো, সে সৌম্যকে কত ভালোবাসে। সন্ধ্যা যেন সৌম্যকে একটু মানায়। সৌম্য তো তার বোনুর কথা ফেলেনা। সন্ধ্যা ইরার কথামতো একদিন সৌম্যকে লিখে বলেছিল ইরার ব্যাপারে, বলেছিল সে ভাবি হিসেবে চায় ইরাকে। সৌম্য তাকে এক রামধমক দিয়েছিল সেদিন। একটু পর আবার তাকে বুঝিয়েছিল,
– ইরা অনেক বড় ঘরের মেয়ে। তার সাথে ইরার যাবে না।
সন্ধ্যা বুঝেছিল। সে ভাইয়ের সাথে দ্বিমত করেনি। তার ভাই মিথ্যা তো বলেনি। কিন্তু সন্ধ্যা এটা-ও বুঝেছিল, সৌম্য ইরা আপুকে ভালোবাসে। সৌম্য যে তাকে মা ডাকে। মায়ের চোখ ফাঁকি দেয়া যায়? সৌম্য সন্ধ্যার চোখ ফাঁকি দিতে পারেনি। তবে ইরা আপু সৌম্য’কে খুব ভালোবাসতো। সন্ধ্যার খুব খারাপ লাগতো। কিন্তু ইরা আপু অন্যকে বিয়ে করে নেয়ার মানুষ না। তার ভাইয়ের জন্য কত অপেক্ষা করেছে। আজ ভাইয়ের মুখে এমন কথা শুনে শক পেয়েছে মেয়েটা।
সৌম্য একটু হেসে সন্ধ্যার চোখের পানি মুছে দেয়। ইরার কথা সে তার বোনুকে বলতো না। কিন্তু সন্ধ্যার মন অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিতে কথাটি বলল। সন্ধ্যার বিস্ময় চাহনি দেখে সৌম্য মৃদুস্বরে বলে,
– আমার তুই ছাড়া কেউ নেই বোনু। আমার ছোট মাকে ক’ষ্ট দিস না। এই কথাটা রাখবি না?
সন্ধ্যা মলিন মুখে তার ভাইকে দেখল। নিজেকে সামলে বোঝালো সে আর কাঁদবেনা।
সৌম্য চাতক পাখির ন্যায় আন্ধার শহরে চোখ বুলায়। তার ক’ষ্ট হয়, সত্যি-ই কি তার ইরাবতী বিয়ে করে নিয়েছে?
সন্ধ্যা সৌম্য’র বাহুতে মাথা ঠেকিয়ে মলিন মুখে চেয়ে রয়। এই শহরে আকাশ আছে। কথাটা ভাবতেই সন্ধ্যার মন উতলা হয়। কোথায় আছে সেই মানুষটা? কেমন আছে? তাকে কি ভুলে গেছে? প্রশ্নগুলো একে একে মনে আসলে মন ভার হয় সন্ধ্যার।
রিহান সৌম্য’কে তার এক পরিচিত মেয়ে ফ্রেন্ড এর বাসায় সৌম্যদের যেতে বলে। এখানে মেসে রুম তো ফাঁকা নেই। তাই সৌম্যকে চাইলে-ও রাখতে পারলো না। তাছাড়া সৌম্য তার বোনকে একা রাখবে না।
এরপর সৌম্য তার বোনকে নিয়ে রিহানের দেয়া ঠিকানায় চলে যায়।
পরদিন সৌম্য সন্ধ্যাকে নিয়ে সকাল সকাল বাড়িটি থেকে বেরিয়ে আসে। রিহানের মেয়ে ফ্রেন্ড, আর তার বোন,, অর্থাৎ তারা দু’বোন। ছোট বোন লামিয়া প্রায় সন্ধ্যার বয়সী। মেয়েটি সন্ধ্যার সাথে এক রাতেই খুব সুন্দর মিশে গিয়েছে। মেয়েটি সৌম্যকে সন্ধ্যাকে রেখে যেতে বললেও সৌম্য রাজি হয়নি। সে তার বোনকে নিয়ে এক চুল পরিমাণ-ও রিস্ক নিতে চায় না আর।
সৌম্য’র কাছে কয়েক হাজার টাকা আছে। সে এই টাকাগুলো খরচ না করে রেখেছিল এখানে এসে থাকার মতো একটি বাসা নিবে বলে, যেখানে ভালো পরিবেশ আছে, আছে তার বোনের নিরাপত্তা। ক্লান্ত সন্ধ্যাকে নিয়ে সৌম্য সারাদিন খুঁজে খুঁজে একটি বাসা পেয়ে যায়। সন্ধ্যাকে নিয়ে মাঝে মাঝে কোথাও বসে জিরিয়ে নিয়েছে তবে সন্ধ্যার হাত এক সেকেন্ড এর জন্য-ও ছেড়ে দেয়নি।
বিকালের শেষভাগে বাসা পেয়ে সৌম্য’র কাছে যা টাকা ছিল, তা এডভান্স হিসেবে দিয়ে বাসায় উঠে পড়ে।
রিহানের থেকে কিছু টাকা ধার নিয়ে সৌম্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র কিনে এনেছে সাথে, যা দিয়ে মোটামুটি তারা দু’ভাইবোন জীবন ধারণ করতে পারবে।
সময় কারো জন্য থেমে থাকে না। সে তার নিজ গতিতে চলে যায়। সেভাবেই একদিন একদিন করে পেরিয়েছে প্রায় ৫ মাস।
সৌম্য সন্ধ্যাকে নিয়ে একটি ভালো মানের ফ্লাটে থাকে এখন।
সিলেট থেকে ফেরার দু’দিন পর সৌম্য অফিসে জয়েন করে। সৌম্যদের বেতম মাসের মাঝামাঝি সময় দেয়া হয়। সেক্ষেত্রে সৌম্য তার অফিসে জয়েন করার ১৫ দিনের মাথায় বেতন পেয়ে যায়।
এরপর ধীরে ধীরে সৌম্য, সন্ধ্যা আর পাঁচটা শহুরে মানুষের মতো একটুখানি সুখের দেখা পায়, অভাব কে মাড়িয়ে জীবনটাতে একটুখানি রঙের ছোঁয়া লাগাতে পারে।
৩ মাসের মাথায় সৌম্য সন্ধ্যাকে একটি প্রায়ভেট কলেজে ভর্তি করে দেয়। সন্ধ্যা ক্লাস টেন পর্যন্ত পড়েছিল। তার গ্রুপ ছিল আর্টস্। কলেজে একই গ্রুপে ভর্তি হয় সন্ধ্যা।
সন্ধ্যা তার ঘরের বেলকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। ফজর নামাজ পড়ে বেলকনিতে এসে দাঁড়িয়েছে। পুরনো দিনের কিছু স্মৃতিচারণ করছিল। তার মনে পড়ে সেদিনের কথা,
যেদিন সৌম্য প্রথম মাসের বেতন ৪৮ হাজার টাকা পায়। সে টাকাটি উঠিয়ে সবার আগে বাড়ি ফিরে সন্ধ্যাকে জড়িয়ে ধরেছিল।
সন্ধ্যা দরজায় দাঁড়িয়ে তব্দা খেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সৌম্য কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যাকে ছেড়ে ভাঙা গলায় বলেছিল,
– বোনু তোর সকল ইচ্ছে করার চাবি পেয়েছি। এবার এক এক করে সব তালা খুলে ফেলব।
সন্ধ্যা সৌম্য’র কথার অর্থ বুঝতে না পেরে বোকাচোখে তাকিয়ে ছিল। সৌম্য’র চোখের কোণে পানি দেখে সন্ধ্যা সৌম্য’র গালে হাত দিয়ে বোঝায়,
– কি হয়েছে ভাইয়া?
এরপর সৌম্য সন্ধ্যাকে তার বেতন দেখায়। সন্ধ্যা ভাইয়ের দিকে ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। তখন সে নিজেই তার ভাইকে জড়িয়ে ফুঁপিয়ে উঠেছিল। সন্ধ্যার পরনে তখন-ও একটি ছেঁড়া জামা ছিল। হাঁড়িতে ছিল মোটা চালের ভাত। আর দু’টো মরিচ পোড়া, যা সন্ধ্যা কিছুক্ষণ আগেই মেঝেতে সাজিয়ে রেখেছিল তার আর তার ভাইয়ের জন্য।
এমন ঘরে যখন একটুখানি সুখের প্রদীপ জ্বলে ওঠে, তখন সেই সুখটুকুকে সাদরে গ্রহণ করার জন্য চোখের জল-ই হয়তো সবচেয়ে শান্তির।
কথাগুলো ভেবে সন্ধ্যা একটু হাসলো। আজও চোখের কোণে পানি জমেছে। সন্ধ্যা ডান হাতে নোনাজলটুকু মুছে নেয়।
আকাশপানে দৃষ্টি রাখে। আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ছোটাছুটি করছে।
এই বিশাল আকাশের নিচে তার মনের কোঠায় তার এক ব্যক্তিগত আকাশ-ও আছে, যে তার শুভ্র-পাঞ্জাবি-ওয়ালা। শুধু তার-ই। সেই মানুষটা তো তাকে নিয়ে ভাবে না। আর সে ভুলতেই পারেনা। এই যে ভাবলো একটু, তাতেই চোখজোড়া ঝাপসা হলো।
সন্ধ্যার অবচেতন মন বলে ওঠে,
– ইশ মানুষটা যদি আমাকে একটুখানি মনে রাখতো! একটুখানি চাইতো!
কথাটা ভেবে নিজেরই উপর-ই সন্ধ্যা বিদ্রুপ হাসলো। তার নিজেকে আয়নায় দেখা উচিৎ। কেন সে আকাশের মতো সুদর্শন মানুষকে নিয়ে ভাবে?
ভেতর থেকে উত্তর আসে,
– মন যে কারো কথা শোনে না। তাই তো ভাবে।
সন্ধ্যা ডান হাতে চোখের কোণের জমায়েত নোনাপানি মুছে নেয়। এরপর তার ঘরে আসে। ঘড়িতে সময় দেখল নয়টা পেরিয়েছে। সৌম্য’র অফিস আছে, তার-ও কলেজ আছে। সন্ধ্যা তার ভাইয়ের ঘরে গিয়ে দেখল সৌম্য এখন-ও ঘুমে বিভোর। ফজর নামা পড়ে ঘুমানোর অভ্যাস সৌম্য’র।
সন্ধ্যা এগিয়ে গিয়ে সৌম্য’র পায়ের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। মিটিমিটি হেসে সৌম্য’র দু’পায়ের তলায় কাতুকুতু দেয়।
সৌম্য ঘুমের ঘোরে বিরক্ত হয়ে নড়েচড়ে আবার-ও ঘুমায়। সন্ধ্যা আবার-ও একই কাজ করলে সৌম্য এবার দ্রুত উঠে বসে। রে’গে বলে,
– থা’প্প’ড় খাবি বোনু। ডেইলি এভাবে আমার ঘুমের বারোটা বাজাস। অন্যভাবেও তো ডাকা যায়।
সন্ধ্যা ঝাকি দিয়ে ওঠে। মুখ ফুলিয়ে তাকায় সৌম্য’র দিকে। সৌম্য দু’হাতে চোখজোড়া কচলে সন্ধ্যার দিকে তাকালে দেখল সন্ধ্যা ধুপধাপ পা ফেলে বেরিয়ে যাচ্ছে। সৌম্য অসহায় চোখে তাকায়। বিড়বিড় করল,
– ইশ! রাগ করে গেল!
.
এরপর সৌম্য একেবারে রেডি হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে নাস্তা করে নেয়। সন্ধ্যা রেডি করে রেখেছিল। খাবার শেষ হলে সৌম্য আর সন্ধ্যা একসাথে বের হয়।
সৌম্য’র পরনে ফরমাল পোষাক। কালো প্যান্ট, সাদা শার্ট। ইন করে শার্ট পরা। পায়ে কালো জুতো।
আর সন্ধ্যার পরনে কলেজ ড্রেস। মাথায় একটি সাদা জর্জেট ওড়না দিয়ে চুলগুলো ঢেকে রাখা।
সৌম্য একটা রিক্সা নিয়ে রিক্সায় উঠে বসে। পাশে সন্ধ্যা বসলে রিক্সা চলতে শুরু করে। সৌম্য একটু একটু পর আড়চোখে সন্ধ্যার দিকে তাকায়। সন্ধ্যা মুখ ফুলিয়ে রেখেছে। তার দিকে তাকাচ্ছে-ও না। সৌম্য গলা ঝেড়ে বলে,
– বোনু তুই না আমার ছোট মা? আমার একটাই বোনু, ধমক-ও একটাই দিয়েছি। রা’গ করছিস কেন?
সন্ধ্যা তবুও তাকালো না। সৌম্য ভাবুক হলো। ছোট মা বললে তো সন্ধ্যা গলে যায়। আজ গলল না কেন?
সন্ধ্যার কলেজের সামনে নেমে সৌম্য রিক্সা ভাড়া মিটিয়ে সন্ধ্যার হাত ধরে একটি দোকানে গিয়ে বলে,
– কি কি নিবি দেখিয়ে দে।
সন্ধ্যার মুখে হাসি ফুটল। সে সৌম্য’র থেকে ফোন নিয়ে কিছু লিখে সৌম্য’র হাতে ফোন দেয়। সৌম্য চোখ বুলিয়ে দেখল, – দু’টো কোণ আইসক্রিম সাথে অনেক ধরনের চকলেট, চকলেটের সংখ্যা ২০ টি হবে। প্রতিটি আলাদা আলাদা। সৌম্য হেসে সন্ধ্যার লিস্টের সব আইসক্রিম, চকলেট কিনে একটি পলিথিনে ভরে সন্ধ্যার হাতে দেয়। এরপর বিল মিটিয়ে দেয়। সন্ধ্যা হেসে তার ভাইকে ইশারায় ধন্যবাদ দিল। সৌম্য চোখ ছোট ছোট করে বলে,
– চকলেট পেয়ে আমাকে মনে পড়লো? কি লোভী হয়ে গেলি রে বোনু তুই!
সন্ধ্যা রে’গে তাকায়। সৌম্য হাসলো। কিছু বলল না। সন্ধ্যার হাত ধরে কলেজ গেইটের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে মৃদুস্বরে বলে,
– গেইটের ভেতর থেকে একদম বের হবি না, আমি দ্রুত নিতে আসবো।
এরপর সৌম্য সামনে গিয়ে একটি রিক্সা নিয়ে তার অফিসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়। এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয় তার অফিস।
বেশ কিছুক্ষণ পর রিক্সা থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে অফিসের সামনে বেশ অনেকটা সময় দাঁড়িয়ে থাকে সৌম্য।
হাতঘড়িতে একবার সময় দেখল, এখনো ১৫ মিনিট সময় আছে। হাতঘড়ির দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে রইল সৌম্য। তার ইরাবতী তাকে একটি ঘড়ি কিনে দিয়ে দিয়েছিল। ঘড়িটি ন’ষ্ট হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সৌম্য সেই ঘড়ি ফেলে দেয়নি। তার কাছে যত্ন করে রেখেছিল। কিন্তু ঘড়িটি তার কিছু প্রিয় মানুষের সাথে সাথে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। সৌম্য দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার ইরাবতী হারিয়ে গেল! বছর হতে চলল, ইরাবতী-ও তার খোঁজ করে না, সে-ও তার ইরাবতীর জন্য শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে।
এরপর সৌম্য উল্টো ঘুরে ইরার মাকে দেখে থমকে দাঁড়ায়। ইরার মা ছলছল দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সৌম্য’র দিকে। গালে হাত দিয়ে জিজ্ঞেস করে,
– কেমন আছো বাবা?
সৌম্য ঢোক গিলে। ইরার মা জিজ্ঞেস করে,
– তোমার বোন সন্ধ্যা কেমন আছে বাবা?
সৌম্য কথা বলতে পারছে না। চাইছে কথা বলতে, কিন্তু তার কথা বের হচ্ছেনা। তবুও বহুক’ষ্টে বলে,
– ভালো।
ইরার মা মলিন গলায় বলে,
– তুমি আর সন্ধ্যা বেঁচে আছো জানলে ইরার বাবা হয়তো আজ বেঁচে থাকতো!
সৌম্য বিস্ময় চোখে তাকায়। ইরার বাবা বেঁচে নেই? আর ইরা? সে কেমন আছে? আর তাদের সাথে ইরার বাবার বেঁচে থাকার কি সম্পর্ক?
ইরার মা মলিন গলায় বলে,
– ১০ মাস আগের কথা ভুলতে পারিনা বাবা।
সেদিন রাতে ইরার বাবা ইরাকে এসে বলল, বিয়ের প্রস্তুতি নিতে, তুমি নাকি বিয়ে করে নিয়েছ, সেই ছবি-ও আমার ইরা মাকে দেখালো। তুমি তো জানো বাবা, আমার মেয়েটা তোমার জন্য কত পা’গ’ল ছিল। আমি মা হয়ে আমার মায়ের কত পা’গ’লা’মি দেখলাম। কিন্তু মেয়েটাকে প্রশ্রয় দেয়ার সহস ছিল না।
তোমার আর এক মেয়ের বিয়ের ছবি দেখে আমার ইরা অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। মুখটা কেমন বেঁকে গেল। তাড়াতাড়ি করে মেয়েটাকে হসপিটাল নিয়ে গেলাম।
কথাগুলো বলে ভদ্রমহিলা থামে। তার কথা জড়িয়ে আসছে। সৌম্য ঢোক গিলে থেমে থেমে বলে,
– ইরাবতীর কি হয়েছিল আন্টি?
ইরার মা ঝাপসা চোখে চেয়ে বলে,
– ধৈর্য ধর বাবা। সব বলতেই তো আসলাম।
একটু থেমে আবার-ও বলে,
– ইরার বাবারা তিনবোন, একভাই। ইরার বাবা ছিল সবার বড়। আর তোমার মা জ্যোৎস্না ছিল সবার ছোট। সবচেয়ে ছোট বোন জ্যোৎস্না ছিল ইরার বাবার কলিজার টুকরো।
সৌম্য বিস্ময় দৃষ্টিতে তাকায় ইরার মায়ের দিকে। সে তো তাদের কোনো আত্মীয়দের চেনে না। আদো-ও কেউ আছে কি-না সেটা-ও জানতো না। ইরার বাবা তার মামা? কিভাবে সম্ভব? ইরার মায়ের কথায় সৌম্য কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলে।
ইরার মা আবার-ও বলেন,
– আমার বিয়ের পরের দিন তোমার মা তোমার বাবার সাথে পালিয়ে যায়। ইরার বাবাদের খুব দাপট আগে থেকেই। তোমার বাবাকে হাতের কাছে পেলে হয়তো ইরার বাবা নিজ হাতেই জ’বা’ই করে ফেলতো। তোমার মা বড় ভাইয়ের ভ’য়ে কই যে হা’রা’লো কে জানে! অনেক খুঁজে-ও তোমার বাবা মাকে খুঁজে পায়নি ইরার বাবা। খোঁজ কখনো থামায়নি। তার কথা, সে যেদিন তার বোন আর বোনজামাইকে কাছে কাছে সেদিন-ই দু’টোকে জ’বা’ই করে নদীতে ভাসিয়ে দিয়ে আসবে। মানুষটার কঠোরতা দেখে আমি-ও ভাবতাম সে কখনো তোমার মা বাবাকে খুঁজে না পাক। হয়তো তাদের খুঁজে পেলে সত্যি-ই মে’রে ফেলবে।
আমরা ইরার খবর পাওয়ার জন্য হসপিটালে বসে ছিলাম। তখন হঠাৎ ইরার বাবার ফোনে কল আসলে সে ফোন উঠায়। কথা বলতে পারছিল না ঠিক করে। ফোন লাউডে দিল। ওপাশ থেকে কেউ একজন বলল,
– আপনার ছোট বোন জ্যোৎস্না আজ থেকে প্রায় ৮ বছর আগে মা’রা গেছে। আর তার দু’টো ছেলে মেয়ে। আপনি যাদের মা’র’তে লোক পাঠিয়েছেন, তারা-ই, নাম সৌম্য আর সন্ধ্যা।
ইরার বাবা রে’গে বলে,
– কি বা’জে কথা বলছো? আমার বোন কিভাবে মা’রা গিয়েছে? আর ওর সন্তান ছিল?
ওপাশ থেকে বলে,
– ছিল। আমি ভালোভাবে খোঁজ নিয়েই বলছি স্যার। ১০০% সিইওর।
কথাগুলো শুনে ইরার বাবা স্তব্ধ হয়ে যায়। এরপর ইরার বাবা আকাশের বাবাকে কল করে ভাঙা গলায় বলে,
– সাঈফ,, সন্ধ্যা, সৌম্য আমার বোনের ছেলে মেয়ে। ওরা জ্যোৎস্না’র মেয়ে সাঈফ।
আকাশের বাবা বলেন,
– সেটা তো আমি অনেক আগে থেকেই জানি।
ইরার বাব বিস্ময় কণ্ঠে বলে,
– জানো মানে? ওই লোকদের না করে দাও। আমার বোন আর নেই। ওর দু’টো প্রাণের গায়ে যেন আঁচ না লাগে।
আকাশের বাবার উত্তর,
– আঁচ লাগবে না শুধু। ম’র’বে-ও। চিন্তা কর না।
ইরার বাবা রে’গে বলে,
– ওদের কিছু হলে তোমাকে আমি জ’বা’ই করব সাঈফ।
আকাশের বাবা-ও রে’গে কল কেটে দেয়।
তখন-ই ভেতর থেকে ডাক্তার জানায়, ইরা স্ট্রোক করেছে। অবস্থা খুব খারাপ। এই খবর শুনে আমরা দিশেহারা হয়ে গেলাম। এর কয়েকঘণ্টা পর ডক্টর জানায়, আমার মেয়ে কোমায় চলে গিয়েছে।
ইরার বাবা এতো কঠোর হয়ে-ও মেয়েটার জন্য হাউমাউ করে কাঁদলো হসপিটালে বসে। বারবার বলছিল, তার জন্য মেয়ের এই অবস্থা। আমাকে বলছিল, ইরাকে বলতে,, সৌম্য’র বিয়ে হয়নি। সে মিথ্যা বলেছে। কিন্তু ইরা তো আমাদের কারো কথা শোনেনা।
এরপর ইরার বাবার ফোনে দু’টো ছবি পাঠায় আকাশের বাবা। একটি ছবি ছিল তোমার। পেটে চা’কু মা’রা অবস্থায় রাস্তায় পড়ে ছিলে তুমি। আরেকটি ছিল সন্ধ্যার। মেয়েটির উপর একটি লোক ছিল। ছবিদু’টো দেখে ইরার বাবা দু’হাতে মাথার চুল টেনে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল,
– আমার বোন আর নেই। আমার বোনের দু’টো প্রাণকে আমি মে’রে ফেললাম। আমার ইরা মা!
কথাগুলো বলতে বলতেই মানুষটা হার্ট-অ্যাটার্ক করে ওখানেই পড়ে ওখানেই মা’রা গেল। বোনের শোক, বোনের ছেলে মেয়ের শোক, মেয়ের শোক একসাথে সামাল দিতে পারলো না সে। চলে গেল ওপারে।
স্বাভাবিক থাকতে মানুষটা তার বোন, ইরা আর তোমাদের প্রতি কতই না কঠোর ছিল! অথচ সেদিন এই মানুষগুলোর জন্য-ই মানুষটা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।
কথাগুলো বলে ইরার মা থামলেন। চোখের পানিতে ভদ্রমহিলার হিজাব ভিজে গিয়েছে।
সৌম্য স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে রইল ইরার মায়ের দিকে। চোখদু’টো অসম্ভব লাল। বহুক’ষ্টে কাঁপা গলায় উচ্চারণ করল,
– ই.রা.বতী….
ইরার মা হিজাবের কোণা দিয়ে চোখ মুছে ভারী গলায় বলেন,
– আমার ইরা মা আমায় আর ডাকে না বাবা। ও তো তোমার শোক কাটাতেই পারলো না। আজ-ও ওর জ্ঞান ফেরেনি। আমার মেয়েটা কি আর কোনোদিন-ও আমাকে ডাকবে না?
কথাগুলো বলতে গিয়ে ইরার মা নিজেকে সামলাতে পারেন না।
সৌম্য’র পুরো শরীরটা ভূমিকম্পের ন্যায় কেঁপে উঠলো। তার ইরাবতীকে যেদিন কাঁদিয়ে রেখে এসেছিল, তারপরের দিন তার জন্য-ই তার ইরাবতী একেবারে ঘুমিয়ে গেল? সে তো তার ইরাবতীকে ভালো থাকতে দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু এটা কি হয়ে গেল? সৌম্য’র ভেতরটা গলা কাটা মিরগীর ন্যায় ছটফটিয়ে উঠল।
সৌম্য ইরার মায়ের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে চায়, তার আগে ইরার মা বলে,
– ইরার বাবা মা’রা যাওয়ার পর থেকে আমি ইরাকে নিয়ে আমার বাবার বাড়ি সিলেট গিয়ে থাকি। আজ ঢাকায় আসলাম ইরাকে ডক্টর দেখাতে। মেয়েটার একটু-ও উন্নতি হয়না।
এটুকু বলে ইরার মা রাস্তার ওপাশে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে বলে,,
– ওই অ্যাম্বুলেন্সে আমার ইরা আছে বাবা।
সৌম্য সাথে সাথে তাকালো অ্যাম্বুলেন্সটির দিকে। সে এক সেকেন্ড-ও দাঁড়ালো না। ব্যস্ত রাস্তাটি ব্যস্ত পায়ে দৌড়ে পার হয়ে গেল। অনেকে হয়তো সৌম্যকে বকলো। কিন্তু সেসব যে সৌম্য’র কানে যায় না। সৌম্য অ্যাম্বুলেন্স এর পিছনে এসে দাঁড়িয়েছে। পিছনে দরজা খুলে রাখা। ডানপাশের সিটটায় ইরা লম্বা হয়ে শুয়ে আছে। সৌম্য’র চোখে ইরার ফর্সা দু’পা আটকায়। সৌম্য নিঃশ্বাস নিতে পারছে না। মনে হচ্ছে এই পৃথিবীতে অক্সিজেনের বড্ড অভাব। বা হাতে নিজের গলা নিজেই চেপে ধরল।
অ্যাম্বুলেন্সের অপর পাশে ইরার মামাতো ভাই বসা ছিল। বয়স ২১ বছর। ছেলেটি সৌম্যকে দেখে অবাক হয়। সৌম্যকে তারা সবাই চেনে। যার জন্য তাদের বোনের এই অবস্থা, তাকে চিনবে না? ছবিতে দেখেছিল। ছেলেটি ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে ইরার মায়ের পাশে দাঁড়ায়।
সৌম্য ডান হাতে অ্যাম্বুলেন্স আঁকড়ে ধরল। চোখ দু’টো ভীষণ ঝাপসা ঠেকে। সৌম্য তার কাঁপা দেহ টেনে তোলে। অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে গিয়ে ইরার মাথার কাছে বসে পড়ে। মুহূর্তেই সৌম্য’র দু’চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পড়ে।
ইরার মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। কি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে সে। সৌম্য ইরার ডান হাত তার ডান হাতে আঁকড়ে ধরে। বা হাত ইরার কপালে রেখে ভাঙা গলায় ডাকে,
– ইরাবতী?
কথাটা বলতে গিয়ে সৌম্য ফুঁপিয়ে ওঠে। যেন কোনো বাচ্চা নিজের আবদার পূরণ না হওয়ায় কাঁদছে। ইরার ডান হাত সৌম্য নিজের কপালে ঠেকিয়ে ভাঙা গলায় বলে,
– ইরাবতী এভাবে থাকিস না। আমার ভীষণ ক’ষ্ট হচ্ছে তোকে এভাবে দেখতে। উঠে পড় ইরাবতী। আমি আর তোকে ছেড়ে কোথাও যাবো না। একবার কথা বল। ইরাবতী??
কথাগুলো বলতে বলতে নিঃশব্দে চোখের পানি ফেলে সৌম্য।
যে ইরাবতী সৌম্য’র একবার তাকানোতেই প্রাণ ভরে হাসতো। আজ তাকে সৌম্য কত ডাকছে, কিন্তু ইরাবতী তার সৌম্য’র ডাকে একটু-ও সাড়া দেয় না। একটুখানি চোখ মেলে তাকায় না। কেমন নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে তার ইরাবতী।
সৌম্য’র মনে হচ্ছে, তার বুকের সব হাড় একসাথে করে কেউ গুড়িয়ে দিচ্ছে। গলায় শক্ত কিছু বেঁধেছে যেন। বিড়বিড়িয়ে করুণ কণ্ঠে ডাকল,
– ইরাবতী?
সৌম্য সন্ধ্যাকে রেখে যাওয়ার পর সন্ধ্যা লামিয়ার জন্য গেইটের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল।
লামিয়া ডাকলে সন্ধ্যা আবার-ও গেইট থেকে বাইরে বেরিয়ে আসে। লামিয়া সন্ধ্যার সাথে একই ক্লাসে পড়ে। সৌম্য আর সন্ধ্যা প্রথম রাত লামিয়াদের বাসায়-ই ছিল। সেখান থেকে পরিচিত, কলেজে এসে দু’জনের মাঝে ভালো একটি ফ্রেন্ডশিপ হয়ে গিয়েছে।
লামিয়া সন্ধ্যার হাত ধরে একটি দোকানে যায়, সে সন্ধ্যার মতোই আইসক্রিম-চকলেট খাওয়া পাবলিক। সন্ধ্যা মূলত লামিয়ার থেকেই এই অভ্যাস পেয়েছে। প্রথম প্রথম বাচ্চাদের মতো সৌম্যকে দোকানে টেনে নিয়ে যেত। এখন সৌম্য নিজে থেকেই কিনে দেয়। লামিয়া তার পছন্দ অনুযায়ী আইসক্রিম, চকলেট কিনে আবার-ও কলেজ গেইটের দিকে যায়।
তখন-ই কলেজের সামনে আকাশ গাড়ি সাইড করে গাড়ির ভেতর থেকে আকাশ আর শিমু নেমে দাঁড়ায়। শিমু ছোট করে বলে,
– আকাশ ভাইয়া আমাকে নিতে আসবা?
আকাশ ছোট করে করে বলে,
– হুম।
শিমু কলেজ গেইটের ভেতরে চলে গেলে আকাশ গেইটের পাশে উল্টো ঘুরে দাঁড়ায়। পরনে সাদা পাঞ্জাবি, সাদা গ্যাবার্ডিন প্যান্ট। পাঞ্জাবির হাতা ছেড়ে দেয়া। গোটাতে ভালো লাগে না তার। মন-মেজাজ ভালো না থাকলে এসব কিছুই ভালো লাগে না। এই ব্যস্ত শহরে এতো এতো মানুষের ভীরে তার সন্ধ্যামালতী ছাড়া সে ভীষণ একা। তার জীবনের রঙ তার সন্ধ্যামালতী, যে হারিয়ে গিয়েছে।
কেউ কল করায় পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোন বের করে কলে কথা বলায় ব্যস্ত হয় আকাশ।
সন্ধ্যা, লামিয়া আকাশকে পাস করে যাচ্ছিল, হঠাৎ একটি মেয়ের সাথে ধাক্কা খেয়ে সন্ধ্যার হাত থেকে দু’টো আইসক্রিম মাটিতে পড়ে যায়। আইসক্রিম দু’টো পড়েছে একদম আকাশের পায়ের কাছে। সন্ধ্যা কোনোদিকে তাকায়নি। দ্রুত নিচু হয়ে আইসক্রিম দু’টো তুলতে নেয়, আকাশ কথা বলতে বলতে পা এদিক-ওদিক করলে তখন-ই তার বাম পা এসে পড়ে আইসক্রিম দু’টোর উপর। কোণ আইসক্রিম দু’টো একদম চ্যাপ্টা হয়ে ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে। সন্ধ্যা চোখ বড় বড় করে তাকায়। সে খাবে বলে আইসক্রিম দু’টো ব্যাগ থেকে বের করে হাতে নিয়েছিল। আর এই লোক তার আইসক্রিম দু’টো পুরো ইন্না-লিল্লাহ করে দিল! সন্ধ্যার ভীষণ রা’গ হলো। তার মুখের খাবার কেড়ে নিল!
আকাশের মনে হলো তার পায়ের নিচে কিছু পড়ে গলে গেল, সে কথা বলা থামিয়ে মাথা নিচু করে তাকায়, তখন-ই সন্ধ্যা রা’গে ডান হাতে আকাশের পায়ের গিরার উপর অংশে প্যান্টের উপরেই খামচে ধরে। আকাশ অবাক হয়, দ্রুত তার পা ঝাড়া মে’রে সরিয়ে কিছু বলার আগেই সন্ধ্যা দ্রুত উল্টো ঘুরে দৌড় দেয়, আকাশ ডান হাত বাড়িয়ে মেয়েটির ব্যাগ টেনে তার সামনে দাঁড় করাতে চেয়েছিল। কিন্তু মেয়েটির পিঠের ব্যাগের বদলে হাতে চলে এসেছে সন্ধ্যার জর্জেট ওড়না।
সন্ধ্যা এক সেকেন্ড এর জন্য থেমে গিয়ে ভ’য় পেয়ে আবার-ও দৌড়ে কলেজ গেইটের ভেতরে প্রবেশ করে।
আকাশ বিস্ময় চোখে তাকায়। ব্যাপারটা কি হলো? আশেপাশে সবাই আড়চোখে আকাশের দিকে তাকাচ্ছে। আকাশ অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সকলের দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে সে জনসম্মুখে কলেজের মেয়ের ই’জ্জ’ত নিয়ে টানাটানি করছে। ভাগ্যিস মুখে মাস্ক আছে, নয়তো আজকের হেডলাইন হতো, ঢাকা উত্তর মহানগরের সভাপতি লু’ই’চ্চা!
আকাশ দৃষ্টি নিচু করল দেখল, দু’টো আইসক্রিম গলে বেরিয়ে এসেছে। মেয়েটির উপর আকাশের ভীষণ রা’গ হলো। দু’টো আইসক্রিম ন’ষ্ট হয়েছে সে নাহয়, চারটে কিনে ক্ষ’তিপূরণ দিয়ে দিত। কিন্তু এই কলেজ পড়ুয়া বাচ্চা মেয়ের এসব কি ধরনের অ’স’ভ্য’তা’মি? মেয়েটিকে কোনোভাবে ধরতে পারলে আগে ঠাটিয়ে একটা থা’প্প’ড় মে’রে ভদ্রতা শেখাতো।
হাতের ওড়না দূরে ছুঁড়ে ফেলে বড় বড় পা ফেলে গাড়িতে উঠে জায়গাটি প্রস্থান করে আকাশ।
লামিয়া সন্ধ্যাকে খুঁজছে। এই ব’ল’দি দৌড়ে কই লুকালো? সে তো আকাশকে চিনতে পেরেছে। অর্থাৎ আকাশ যে উত্তরার সভাপতি এটা চিনতে পেরেছে। চেনার কারণ এই কলেজে শিমুর ভাই আকাশ সভাপতি এটা মোটামুটি অনেকেই জানে। সে দোকান থেকে আইসক্রিম, চকলেট কেনার সময় আকাশ আর শিমুকে দেখেছিল। তাই আকাশের মুখ না দেখেও বুঝেছে এটা শিমুর ভাই সভাপতি।
আর এই সন্ধ্যা কয়েকদিন হলো এসে না চিনে, না জেনে কি করে ফেলল এটা?
আশেপাশে খুঁজতে খুঁজতে দেখল সন্ধ্যা একটি গাছের আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যা আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে তার ওড়না না থাকায়। মাথায় কাপড় ছাড়া সে কারো সামনে যায় না। এখন সেটাই তো তার কাছে নেই।
লামিয়া সন্ধ্যার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে রে’গে বলে,
অন্তঃদহন পর্ব ২১
– তুই কি পা’গ’ল? কি করলি ওটা? চিনিস ওই লোককে?
সন্ধ্যা অসহায় মুখে দু’দিকে মাথা নাড়ায়, অর্থাৎ সে চেনে না। লামিয়া কপালে একটা থা’প্প’ড় মে’রে বলে,
– উনি এই উত্তরার সভাপতি। তোর এই কলেজে আর পড়া হবে না। বিদায় নেয়ার জন্য প্রস্তুত হো।
সন্ধ্যা চোখ বড় বড় করে তাকায়। তার ঘাম ছুটছে। তার ভুলের জন্য এখন তাকে কলেজ ছাড়তে হবে? সৌম্য ভাইয়া শুনলে খুব ক’ষ্ট পাবে। এখন সে কি করবে?
